সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি-১

সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি

সংকলনে : মুহিউদ্দীন হাতিয়ূভী

উস্তাজুল হাদীস : আল-জামিয়াতুল্ ইসলামিয়া মাইজদী, নোয়াখালী।

প্রাক কথা : ‘সাহাবা’ ওইসব ভাগ্যবান মনীষী, যাঁরা ঈমানের সাথে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাাৎলাভে ধন্য হয়েছেন এবং ঈমানের সাথে ইন্তেকালের সৌভাগ্য লাভ করেছেন। সাাৎ মানে স্বচে রাসূলকে দেখা বা রাসূল তাঁদেরকে দেখা। অতএব ওইসব অন্ধ ঈমানদারও সাহাবীদের অন্তর্ভূক্ত, যাঁরা স্বচে রাসূলকে দেখার সৌভাগ্য হয় নি; কিন্তু রাসূল সা. স্বচে তাঁদেরকে দেখেছেন। যেমন হ. আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাক্তুম রাঃ। (শরহেনুখবা, ৮১-৮২পৃঃ) ‘মাপকাঠি’ অর্থ পরিমাণ করার দণ্ড বা মানদণ্ড, যাকে ইংরেজীতে বলা হয় ংঃধহফধৎফ। (ব্যবহারিক বাংলা অভিধান ৯৭৭পৃঃ) আর ‘সত্য’ বলে ঈমান-আক্বীদাসহ শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধানকে বোঝানো হয়েছে। সবটা মিলে ‘সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি’ (ঝধযধনধ-ব শবৎধস রং ঃযব ংঃধহফধৎফ ড়ভ ঃৎঁঃয) -কথাটার অর্থ দাঁড়ায়, গোটা দ্বীনকে বোঝা ও তা আমলে পরিণত করার জন্য সাহাবায়ে কেরাম হচ্ছেন মানদণ্ড বা মাপকাঠি।

আহ্লে সুন্নাত ওয়াল্ জামাতের আক্বীদামতে সাহাবায়ে কেরাম সম্বন্ধে নিম্নবর্ণিত আক্বীদা বিশ্বাস সকল মুসলমানের অন্তরে বদ্ধমূল থাকা আবশ্যক।

১. সাহাবায়ে কেরাম উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠতম নেককার মানুষ।

২. তাঁরা নবীদের মতো মাসূম নন; বরং তাঁরা সকলেই মাগফূর তথা তাঁদের মধ্যে কারও থেকে কোনো সময় সাধারণ ভুলচুক হয়ে গেলেও তাঁরা বিলম্ব না করে তাৎণিক তওবা ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজকে পবিত্র করে নিয়েছেন।

৩. মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন সাহাবীদের প্রতি চির সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন।

৪. তাঁরা মুসলিম মিল্লাতের জন্য মি’য়ারে হক (معيار حق) বা সত্যের মাপকাঠি।

৫. তাঁদের দোষত্র“টি খোঁজাখুঁজি করা, তাঁদের সমালোচনা করা, তাঁদেরকে খাট বা তুচ্ছ নজরে দেখা এবং তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন না করা মারাত্মক গুনাহ ও আল্লাহর লা’নতের কারণ।

কোন্ গুণে সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি?

বিষয়টি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বাণী দিয়েই শুরু করা যাক।

عن عبد الله بن مسعود رضي الله تعالى عنه قال من كان مستنا فليستن بمن قد مات فإن الحي لا تؤمن عليه الفتنة، أولئك أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم كانوا أفضل هذه الأمة أبرها قلوبا وأعمقها علما وأقلها تكلفا، اختارهم الله لصحبة نبيه ولإقامة دينه، فاعرفوا لهم فضلا واتبعوهم على أثرهم وتمسكوا بما استطعتم من أخلاقهم وسيرهم فإنهم كانوا على الهدى المستقيم- رواه رزين -مشكواة- ৩২

অর্থাৎ, হ.আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যে ব্যক্তি কারও তরীকা অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাঁদের তরীকা অনুসরণ করে, যাঁরা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কেননা জীবিত ব্যক্তি ফিতনা থেকে নিরাপদ নয়। (হয়ত বাকী জীবনে কোনো দ্বীনি ফিতনায় পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে।) তাঁরা হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহাবীগণ, যাঁরা এ উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ছিলেন, স্বচ্ছ অন্তঃকরণ ও সুগভীর জ্ঞান হিসেবে এবং স্বল্পতম ছিলেন কৃত্রিমতার দিক থেকে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে তাঁর নবীর সাহচর্য ও স্বীয় দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁদের ফযীলত ও মর্যাদা উপলব্ধি কর, তাঁদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে চল এবং যথাসাধ্য তাঁদের আখলাক ও চরিত্রকে আঁকড়ে ধর। কেননা তাঁরা সরল-সঠিক পথে ছিলেন। Ñরাযীন, মিশকাত-৩২ পৃঃ (মাও. নূর মুহাম্মদ আ’জমী রহ. -এর অনুবাদ অবলম্বনে)

কঠিন পরীায় চূড়ান্ত সাফল্যার্জন : হ.আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, সাহাবীগণ ছিলেন নবী মুহাম্মদ সা.- এর উম্মতদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্র্ষ্ঠেতম নেককার ব্যক্তি। অর্থাৎ তাঁদের অন্তরাত্মা ছিল ঈমান ও ইসলামের আলোতে আলোকিত। এখ্লাস ও দ্বীনদারীর উপর অটলতার গুণে ছিল গুণান্বিত। চূড়ান্ত পর্যায়ের পূর্ণ ঈমানের মতো মহা সম্পদে ছিলেন তাঁরা ধন্য। দুনিয়াবিমুখতা, আত্মিক পবিত্রতা ও মহান আল্লাহর ভয়ভীতিতে তাঁদের পুরো জীবন ছিল সমৃদ্ধ। তাঁরাই ছিলেন সেই পুন্যাত্মা দল, যাঁরা সর্বপ্রথম রাসূল সা.- এর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্বীন প্রচারের েেত্র তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। দ্বীনের প্রচার ও প্রসার এবং দ্বীনকে দুনিয়ার বুকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাঁরা যে কঠোর ত্যাগ-তিতিা, যুলুম-নির্যাতন ও অবর্ণনীয় যাতনার সম্মুখীন হয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মানবজীবনের এমন কোনো কষ্ট নেই, যার শিকার তাঁরা হন নি। এমন কোনো পরীা ছিল না, যা তাঁদেরকে করা হয় নি।

মূলত এসব কিছু প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলার ইশারায় হয়েছিল, যার একমাত্র ল্য ছিল সাহাবীগণকে এ বিষয়ে যাচাই করা যে, তাঁদেরকে যেই গুরুত্বপূর্ণ মিশন পরিচালনা ও রাসূল সা.- এর সাহচর্যের মতো যেই সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে, সে জন্য তাঁরা চিন্তা-চেতনা, মন-মগজ ও ধ্যান-ধারণার দিক থেকে যোগ্যতাসম্পন্ন কি না? তাঁদের অন্তরসমূহ কঠিন থেকে কঠিন বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর শোকর আদায়ে সম কি না?

দেখা গেল তাঁরা সেসব পরীায় উত্তীর্ণ হয়েছেন একশ’ একশ’ নম্বরে। সুতরাং যখন তাঁদেরকে ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির ব্যাপারে পরীা করা হয়েছে, তখন তাতে তাঁরা সুকঠিন ইস্পাততুল্য ধৈর্যের পাহাড় হয়ে মহান আল্লাহর অধিক পরিমাণে শোকর আদায়ে মশগুল হয়েছেন এক মুখকে হাজার মুখ বানিয়ে। স্পর্ষকাতর পরিস্থিতিতে ভয়াবহ বিপদাপদের পিচ্ছিল পথেও তাঁদের পদযুগল স্খলনের পরিবর্তে লাভ করেছে সুদৃঢ়তা ও অটলতা। অন্তরে পূর্ণ ঈমান নিয়ে অটল পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা পরিপূর্ণ দ্বীনের উপর। দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অবিশ্বাস্য ধৈর্যের এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চিরস্মরণীয় অকৃত্রিম প্রেম-ভালোবাসার। তাঁদের মূল্যবান এ গুণের ব্যাপারে কোরআন শরীফে খোদ্ আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেনÑ أولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের অন্তরকে শিষ্টাচারের জন্য শোধিত করেছেন। Ñসূরা- হুজুরাত- ৩

শিা-দীা : তাঁদের মধ্যে এক একজন সাহাবী শিা-দীা, মান-মর্যাদা, জ্ঞান-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা ও বিবেক-বিবেচনায় এমন নূরের মিনার (আলোর সুউচ্চ স্তম্ভস্বরূপ) ছিলেন, যার আলো দ্বারা সারা দুনিয়া যুলুম ও মুর্খতার অন্ধকার দূর করতঃ শিা-সততা, শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও মনুষ্যত্ববোধের রশ্মী হাসিল করেছিল। তাই তো দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে কেউ হাদীস ও তাফসীরে ছিলেন সুদতাসম্পন্ন, কেউবা আবার ফিক্ব্হ ও ক্বিরাতের ইমাম ছিলেন। কারও মধ্যে তাসাওউফ ও ফারায়েজের ইল্ম ছিল পরিপূর্ণ। আবার কারও মধ্যে আদব আখলাক ও শিষ্টাচারের পরিধি ছিল সাগরসম ব্যাপৃত। মোট কথা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় ইল্মের দিক থেকে ছিলেন যোগ্যতাসম্পন্ন ও পারঙ্গম। এমনটা শুধু পুরুষ সাহাবীগণই ছিলেন না; বরং মহিলা সাহাবীগণও আপন আপন জায়গায় ইল্ম ও মা’রিফাতের দীপ্ত সূর্য ছিলেন। ইহা একমাত্র রাসূল সা. এর মোবারক সংস্রবের অনিবার্য ফলশ্র“তি এবং তাঁর মমতাপূর্ণ দৃষ্টির বরকত ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আচার আচরণে সরলতা : সাহাবায়ে কেরাম রূহানী লাইনে মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জীবনাচারে ছিল না কোনো ধরনের বৈচিত্র্য ও লৌকিকতা। অবশ্য, দুনিয়াবি লাইনে কেউ কেউ ধন-সম্পদের অধিকারী কিংবা মতা ও নেতৃত্বের মসনদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বটে; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের মাঝে পরিলতি হয় নি কোনো ধরনের বিশেষত্বভাব; বরং তাঁদের চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথাবার্তা, ভরণ-পোষণ সবই ছিল সাধারণ লোকের মতো স্বাভাবিক ও সাদামাঠা। (যেমন তাঁরা) না নগ্নপদে চলাফেরা করতে লজ্জাবোধ করতেন; না খালি মাটিতে নামায পড়তে বা শুতে বসতে সঙ্কোচবোধ করতেন। না মাটি বা কাঠের তৈরি প্লেটে খানা খেতে ইতস্তত করতেন; না অন্যের উচ্ছিষ্ট পানি বা খাবার খেতে ঘৃণাবোধ করতেন।

কথাবার্তায় শিষ্টাচার : কথাবার্তায় তাঁদের শিষ্টাচার ছিল এমন যে, প্রত্যেক সাহাবীর নিজ নিজ আলাপ আলোচনায় কোনো সময় ভদ্রতা ও শালীনতা হাতছাড়া হয় নি। তাঁরা অহেতুক ও অনর্থক কথাবার্তা এবং অনাহূত আলাপ আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন। তাঁরা কথা বললে ওই সব কথাই বলতেন, যা নিতান্ত দরকারী বা উদ্দেশ্যসম্বলিত ও অর্থবহ। কোনো মাস্আলার সমাধান নিজের জানা না থাকলে, পরিষ্কার বলে দিতেনÑ এ সম্পর্কে আমার জানা নেই। এদিক সেদিক ঘুরিয়ে নিজ থেকে বানিয়ে বলার চেষ্টা করতেন না; বরং জিজ্ঞাসাকারীকে তাঁর চেয়ে বেশী জানেন এমন একজনের প্রতি দিক নির্দেশনা দিয়ে বলতেনÑ অমুককে জিজ্ঞাসা করুন। এভাবে ইল্ম অর্জনের েেত্র তাঁরা ছিলেন এমন যে, যাকে নিজের চেয়ে অধিক ইল্মের অধিকারী বলে জানতেন, চাই তিনি বয়সের দিক থেকে নিজের থেকে ছোটও হোন না কেন, তার কাছে গিয়ে কিছু শিখতে মোটেও লজ্জাবোধ বা কুণ্ঠাবোধ করতেন না ।

জীবন যাপনের উপায়-উপকরণ : তাঁদের জীবন যাপনের উপায়-উপকরণ এবং তার নিয়মনীতিতেও ছিল না কোনো ধরনের কৃত্রিমতা বা লৌকিকতা। খাদ্য-খাবার ও পোশাক-পরিচ্ছদ যখন যা কিছুর ব্যবস্থা হত, তখন তা-ই অবলম্বন করতেন। অর্থাৎ যখন যে ধরনের খাবার সামনে আসত, তখন তা-ই খেতেন। পোশাক পরিচ্ছদের মধ্যে যখন যা মিলত, তখন তা-ই ব্যবহার করতেন। মোটাসোটা হলেও পরিধান করতেন। আবার ভালো হলেও তা পরিধান করতেন। এমন নয় যে, লোকসমাজে নিজেদের বুযুর্গি ও দুনিয়াবিমুখতার সুনাম কুড়ানো বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে শুধু মোটাসোটা পোশাককেই অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে মজাদার বা সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা হলে, তা মহান আল্লাহর নে’মত মনে করে আগ্রহের সাথে খেতেন। আবার সাধারণ থেকে সাধারণ খাবারের ব্যবস্থা হলে, তা অত্যন্ত সবর-শোকরের সাথে খেতেন। সাহাবীগণের ইবাদত বন্দেগি, লেনদেন, আখলাক ও ‘আদত তথা স্বভাব চরিত্র, জীবনোপায় ও জীবন-যাপনরীতি এক কথায় তাঁদের জীবনের প্রতিটি অংশজুড়ে ছিল এখলাস ও অকৃত্রিমতা।

সবচেয়ে বড় গুণ রাসূলের সাহচর্য : পূর্বেই বলা হয়েছে যে, সাহাবীগণের এই শিষ্টাচার ও আদর্শ একমাত্র রাসূল সা. -এর মোবারক সাহচর্যেই অর্জিত হয়েছিল। আর রাসূল সা. শিষ্টাচার লাভ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা থেকে। এমর্মে নবীজী সা. ইরশাদ করেন,أدّبني ربي فأحسن تأديبي “আমার রব আমাকে শিষ্টাচার শিা দিয়েছেন এবং তা সুন্দরভাবে শিা দিয়েছেন।”

এটা অবশ্যই সর্বজনস্বীকৃত যে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো হক্কানী পীরের হাতে বয়আত গ্রহণ করে (আর আত্মশুদ্ধির পথে দিন দিন এগুতে থাকে) তবে দেখা যায়, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ওই ব্যক্তি পূর্বে যেমনই থাকুক না কেন, পীরের খেদমত ও তার আনুগত্যের সুবাদে সে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায়। তাহলে এটা কেন অসম্ভব হবে যে, যখন সাহাবীগণ নিজেদের পুরো জীবনকে রাসূল সা.- এর খেদমতে সোপর্দ করতঃ তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজকে অরে অরে পালন করেছেন, তবুও তাঁরা উম্মতের মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদার উচ্চাসনে আধিষ্ঠিত হবেন না; উম্মতের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন না? এ ব্যাপারে কারও দ্বি-মত থাকার তো কথা নয়। Ñমাযাহেরে হক (উর্দূ)-১ম খণ্ড, ২২৬Ñ২২৮পৃঃ

সকল সাহাবী জান্নাতী ও আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত।

কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আহ্লে সুন্নাত ওয়াল্ জামাতের আক্বীদা হচ্ছেÑ সাহাবীগণ গুনাহ করতে পারেন; কিন্তু এমন কোনো সাহাবী নেই, যিনি গুনাহ থেকে তওবা করে পবিত্র হন নি। তাঁদের দ্বারা কোনো পদস্খলন বা ভ্রান্তিমূলক কিছু হয়ে থাকলেও তা ছিল অধিকাংশ েেত্র ইজ্তিহাদী ভুল। তাই সেগুলোকে গুনাহের মধ্যে গণ্য করা যায় না; বরং হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী তদ্দ¡ারা তাঁরা একটি সওয়াবের অধিকারী। আর বাস্তবে যদি কোনো গুনাহ্ হয়েই যায়, তবে প্রথমত তা তাঁদের সারা জীবনের সৎকর্ম এবং রাসূল সা. ও ইসলামের সাহায্য ও সহযোগিতার মোকাবিলায় শূন্যের কোঠায় থাকে। দ্বিতীয়ত তাঁরা ছিলেন অসাধারণ আল্লাহভীরু। সামান্য গুনাহের কারণেও তাঁদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠতো। তাৎণিকভাবে তওবা করতেন এবং নিজের উপর গুনাহের শাস্তি প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হতেন। এছাড়া তাঁদের নেক এত বেশি ছিল যে, নেক দ্বারা তাঁদের গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যেতে পারে। সর্বোপরি আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের মাগফিরাতের ব্যাপক ঘোষণা দিয়েছেন বিভিন্ন আয়াতে। শুধু মাগফিরাতই নয়; বরং رضي الله عنهم বলে তাঁর চির সন্তুষ্টির আশ্বাসও দান করেছেন। অতএব সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক বাদানুবাদ ও মতবিরোধের ঘটনাকে সামনে রেখে তাঁদের কাউকে মন্দ বলা বা সমালোচনার পাত্র বানানো নিশ্চিতরূপে হারাম এবং রাসূল সা. এর ভাষ্য অনুযায়ী অভিশপ্ত হওয়ার কারণ এবং নিজের ঈমানকে বিপন্ন করার শামিল।

والسبقون الأولون من المهجرين و الأنصار و الذين اتبعوهم بإحسان رضي الله عنهم و رضوا عنه أعدالله لهم جنت تجري تحتها الأنهر ذالك الفوز العظيم

অর্থাৎ, প্রথম পর্যায়ের অগ্রবর্তী মুসলমান মুহাজির ও আনসার (অর্থাৎ সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম) এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে পরিপূর্ণভাবে (অর্থাৎ তাবেয়ীন) আল্লাহ সে সমস্ত লোকের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। মহান আল্লাহ তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন এমন জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে থাকবে তারা চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। Ñসূরা তওবা-১০০

এই আয়াতে সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে শর্তহীনভাবে رضي الله عنهم বলা হয়েছে। অবশ্য তাবেয়ীনদের ব্যাপারে সাহাবীদের ইত্তেবা তথা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের শর্তারোপ করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবায়ে কেরাম সবাই কোনো রকম শর্ত ছাড়াই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভে ধন্য। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, গুনাহ মা করা ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি হয় না। কাযী আবু ইয়ালা রহ. বলেন আল্লাহ তা‘আলা ঔইসব লোকের জন্যই সন্তুষ্টি ঘোষণা করেন, যাদের সম্পর্কে জানেন যে, সন্তুষ্টির কারণাদির উপরই তাদের ইন্তেকাল হবে। সূরা নিসার ৯৫নং ও সূরা হাদীদের ১০নং আয়াতে সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক তারতম্য উল্লেখ করে শেষে বলা হয়েছে, وكلا وعد الله الحسنى অর্থাৎ, তাদের (মধ্যে পারস্পরিক তারতম্য থাকা সত্ত্বেও) সবাইকে আল্লাহ তা‘আলা হুসনা তথা উত্তম পরিণতির (জান্নাত ও মাগফিরাতের) ওয়াদা দিয়েছেন। এর পর সূরা আম্বিয়ার ১০১নং আয়াতে হুসনাপ্রাপ্তদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, إن الذين سبقت لهم منا الحسنى أولئك عنها مبعدون অর্থাৎ, যাদের জন্য আমার প থেকে পূর্বেই হুসনার ওয়াদা হয়ে গেছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে।

পরের পোষ্ট সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি-২

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s