সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি-(একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনা)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা(সঃ)-এর সাহাবীগণ তাঁহার কাছ হতে সরাসরি শিক্ষাপ্রাপ্ত মহান এক মানবগোষ্ঠী,যাঁহাদের সম্বন্ধে নবী করীম(সঃ)-এর উক্তি হলঃ اكرموا أصحابى فإنهم خياركم অর্থাৎ-“তোমরা আমার সাহাবীগণকে সম্মান কর। কেননা তাঁহারা তোমাদের মধ্যকার উত্তম মানব”।(মুসনাদে আহমদ) অন্যত্র তিনি সাহাবাদের মর্যাদা সম্মন্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেনঃ“ الله الله فى أصحابى لا تتخذوهم غرضا من بعدى فمن أحبهم فبحبى أحبهم ومن أبغضهم فببغضى أبغضهم অর্থাত-“সাবধান ! তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমার পরে তোমরা তাঁদেরকে (তিরস্কারের) লক্ষ্যবস্তু বানাইও না। যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে সে আমার প্রতি ভালোবাসা বশেই তাঁদেরকে ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে সে আমার প্রতি বিদ্বেষবশতঃ তাঁদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে”।(তিরমিযী,মুসনাদে আহমদ) তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ « لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ ». অর্থাত-“তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিওনা। তোমাদের মধ্যে যদি কেহ উহুদ সমপরিমাণ স্বর্ণও যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে,তবেও তাঁদের এক মুদ্দ বা তার অর্ধেক পরিমাণ(এক মুদ=১ রতল। আল্লামা শামী(রাঃ)বয়ান করেছেন যে, এক মুদ্দ ২৬০ দিরহামের সমপরিমাণ। দ্রষ্টব্যঃ আওযানে শরিয়্যাহ)আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার সমতূল্য হবেনা।(সহি বুখারী-হাদিস নং ৩৭১৭) হযরত ইবনে আব্বাস(রাঃ)হতে বর্ণিতঃ রাসুলুলুল্লাহ(সঃ) ইরশাদ করেছেন- ” من سب اصحابي فعليه لعنة الله والملائكة والناس اجمعين ” .অর্থাৎ -“যারা আমার সাহাবীদেরকে গালী দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহর,ফেরেস্তাদের,এবং জগতবাসীর অভিশাপ বর্ষিত হোক।(তাবরানী) উপরোল্লিখিত হাদিস সমুহ দ্বারা এ কথাই প্রমাণ হয় যে, সাহাবারা সত্যের মাপকাঠি। তাঁদের সর্ম্পকে কোন ধরনের সমালোচনা করা যাবেনা। এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের(রাসুলুল্লাহ সঃ কর্তৃক ঘোষিত নাজাত প্রাপ্ত দল) আক্বিদাও এটাই যেالصحابة كلهم عدول অর্থাৎ -সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর কোরানে তো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেনঃ رضى الله عنهم ورضوا عنه অর্থাৎ -“আল্লাহপাক তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট ও রাজী হয়ে গেছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট এবং রাজী হয়ে গেছেন।(সুরা বায়্যিনাহ-পারা-৩০) সুতারং এ পর্যন্ত প্রাপ্ত দলিলাদি দ্বারা এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাহাবায়ে কেরামগণ সমস্ত সমালোচনার উর্দ্ধে। তাঁদের ব্যাপারে যারাই বিরুপ মন্তব্য করবে বুঝতে হবে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রু।এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন দলও আছে,যারা মুখে ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লবের কথা বলে এবং সাহাবাদের সমালোচনা করতে কিঞ্চিত দ্বিধাবোধ করেনা। তাঁদের লেখনির মাধ্যমে উহা প্রকাশ পায়। আমার প্রশ্ন ঐ সকল প্রীয় পাঠকদের প্রতি যারা আমার এই লেখাটাকে পড়বে যে, “সাহাবাদের সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে এমন কোন ব্যক্তি কি কখনো মুসলমান হতে পারে????

 

আমার গত ৮ই জুনের লেখার উপর অনেক ভাই কমেন্ট দিয়েছিলেন। কিছু পক্ষে কিছু বিপক্ষে। পরের দিন ৯ই জুন রাইস উদ্দিন ভাই তার পোষ্টে (“সত্যের সন্ধানে-একটি পর্যালোচনা)” আমার লেখাটার পূনঃপ্রকাশ করতঃ এ বিষয়ের উপর তিনি একটি বিশ্লেষণা মূলক পর্যালোচনা করার প্রয়াস করেছেন। আবার ইসলামী কন্ঠ নামে আরেক ভাই এর পরের দিন ১০ই জুন একই বিষয়ের উপর একটি পোষ্ট দেন। যার শিরোনাম ছিল “সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি নাকি কোরান সুন্নার সত্যিকারের অনুসারী”?। আমার লেখার উপর প্রাপ্ত কমেন্টগুলির মধ্যে অনেকগুলি প্রশ্ন সহ আমার দেওয়া তথ্যকে খন্ডন করতঃ পাল্টা তথ্য উপাস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। যার কয়েকটি উত্তর ইতিপূর্বে আমি দিয়েছি। প্রথমতঃ আমি ঐ সকল বিষয় সমুহ নিয়ে আলোচনা করতে চাই যে বিষয়গুলির প্রতি ইতিপূর্বে দৃষ্টি আকর্ষণ করানো হয়েছে। সেগুলির মধ্যে যেমন,(১)সাহাবীর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ কি? (২) الصحابة كلهم عدول(আস-সাহাবাতু কুল্লুহুম উদূল)এর দ্বারা কি সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি বুঝায় নাকি উলুমে হাদিসের পরিভাষায় কেবলমাত্র হাদিস বর্ণনা কারীর গ্রহণযোগ্যতাকে বুঝায়? (৩)সমস্ত সাহাবারাই যদি সত্যের মাপকাঠি হত তাহলে রাসুলুল্লাহ(সঃ) সমস্ত সাহাবাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র ‘আশারায়ে মুবাশশারাকেই’ কেন জান্নাতের সু-সংবাদ দান করলেন? (৪) হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান(রাঃ) খলিফা হিসাবে কি রাশিদ(সঠিক পথপ্রাপ্ত) ছিলেন? (৫) সাহাবায়ে কেরাম যে,সত্যের মাপকাঠি এটা কি কোরান হাদিস দ্বারা প্রমাণিত? (৬) সাহাবায়ে কেরাম সম্বন্ধে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সঠিক আক্বিদা কি? (৭) এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত কারা? (৭) সাহাবিরা সত্যের মাপকাঠি হলে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ-যুদ্ধ সহ পরর্বতিতে হযরত আবু বকর(রাঃ) এর যামানায় কেন বিদ্রোহ দেখা দিল? (৮)চার খলিফার জামানাকে খোলাফায়ে রাশেদা বলাহয় অথচ তার পরেও সাহাবায়ে কেরামের খেলাফত ছিল কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদার অন্তর্ভূক্ত না করার কারন কি? (৯)রাসূল (সঃ) এর সাথে যারা ওহুদের যুদ্ধে রওয়ানা হয়েছিলেন তারা সকলেই সাহাবা ছিলেন কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর নেতৃত্বে যারা ফিরে গেল তারা কারা? (১০)তাবুকের যুদ্ধে বিভিন্ন কারনে যারা অংশ গ্রহন করেননি তাঁদের তিনজনের তওবা আল্লাহ মাফ করেদিয়েছেন কিন্তু বাকীদের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি তাদের মর্যাদা কি? সুপ্রীয় পাঠকবৃন্দ ! কেউ যদি সত্যকে মানতে চায় তাহলে তাঁর সম্মুখে সত্যকে উপাস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়। আর যদি সে বলে “ বিচার তো আমি মানব তবে, তালগাছটা আমার”। তাহলেতো আর বিচার করার প্রশ্নই আসেনা। সুতারং যারা নিরপেক্ষ থেকে সত্যকে উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা করবে তারা নিশ্চয় সত্যের সন্ধান পাবে। আসুন তাহলে এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। প্রথমতঃ সাহাবী কারা? উত্তরঃ সাহাবী আরবী শব্দ ‘সুহবাতুন’ ধাতু হতে নির্গত যার অর্থ সাহচর্য হওয়া ,সংস্পর্শে থাকা, সঙ্গ দেওয়া।(আল-ক্বামুসুল ওয়াহীদ, আল-মুফরাদাত,আল-ক্বামুসুল মুহীত,লিসানুল আরব) শরীয়তের পরিভাষায় সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি রাসুলের(সঃ)হাতে ইসলাম গ্রহন করে ঈমান এনেছেন এবং ঈমানী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। এবং রাসুলুল্লাহ(সঃ) এর সাথে তাঁদের সঙ্গ স্বল্প সময়ের জন্য হোক বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হোক। তাঁরা রাসুলুল্লাহ(সঃ) হতে হাদিস বর্ণনা করুক বা নাই করুক। তাঁরা রাসুলুল্লাহ(সঃ) এর সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণ করুক বা নাই করুক(নুঝহাতুন নযর, আল-ইসাবাহ ফী তাম’ঈজিস সাহাবা, আল-ইসতীয়াব ফী মা’রিফাতিল আসহাব, আক্বিদাতুত তাহাবী)। তাহলে এখানে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সাহাবা হওয়ার গৌরব মাত্র তাঁদেরই যারা রাসুলুল্লাহ(সঃ)এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ঈমানের উপর বহাল ছিল। আর যারা ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় মুরতাদ বা ইসলাম থেকে সরে গেছে শরীয়াতের দৃষ্টিতে তাঁদেরকে সাহাবা বলা যাবেনা। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহস(যে উম্মে হাবিবার স্ত্রী ছিল এবং তাঁরা উভয়ে একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিল পরবর্তিতে হাবশা হিজরত করার পর খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এবং ঐ অবস্থাতেই মৃত্যু বরণ করে। এবং রাবিয়াহ ইবনে উমাইয়্যাহ ইবনে খলফ)। ২নং প্রশ্নের উত্তরঃ আদালাহ ২ প্রকারঃ (১) আদালাতুন রিওয়ায়াহ(২) আদালাতুন মুতলাক্বাহ। “আদালাতুন রিওয়ায়াহ” = হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁরা সবাই উদুল অর্থাৎ তাঁরা যদি রাসুলুল্লাহ (সঃ) থেকে,বা অন্য কোন সাহাবী থেকে হাদিস বর্ণনা করে সেক্ষেত্রে তাঁরা নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য। “ আদালাতুন মুতলাক্বাহ”= দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহপাক ও তাঁর প্রীয় রাসুলুল্লাহ(সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে উম্মতের জন্য معيار حق সত্যের মাপকাঠী বানিয়েছেন। যাহা কোরান-হাদিস,ইজমায়ে উম্মাহ,আক্বিদায়ে আসহাবে মাযাহিবিল ফিক্বহিয়্যাহ দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহপাক কোরানের মধ্যে অসংখ্য আয়াত সমুহে সাহাবায়ে কেরামের কুরবানী-ত্যাগের বিনিময়ে তাঁদের প্রতি রেজামন্দি,জান্নাতের সু-সংবাদ সহ তাঁদের উচ্চ-মর্তবা ও ফজিলতের বর্ণনা তুলে ধরেছেন যাতে কোন মুনাফিক বা সাহাবাদের দুশমনরা তাঁদের নিয়ত বা চরিত্রের উপর আক্রমণ করতে না পারে। উলামায়ে উম্মত অনেক মেহনত ও পরিশ্রম করে এ রকম বিশেষ আয়াত সমুহ যেগুলি শুধুমাত্র সাহাবায়ে কেরামদের ঈমান ও আমল সম্বন্ধে নাজিল করেছেন ২০০ এর মত গণনা করেছেন। তার মধ্য থেকে নির্বাচিত কয়েকটি আয়াত পাঠকের সামনে তুলে ধরা হল। (১)সর্বপ্রথম আয়াত-كنتم خير أمة أخرجت للناس الخ অর্থাৎ -“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত,মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।(সুরা আলে-ইমরান-১১০) তাফসীরে তাবরীতে আয়াতের ব্যাখায় হযরত ওমরের(রাঃ) একটি উক্তি তুলে ধরেছেন-“لو شاء الله لقال انتم فكنا كلنا ولكن قال كنتم فى خاصة من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم অর্থাৎ “যদি আল্লাহপাক ইচ্ছা করতেন তাহলে কুনতুম না বলে “আনতুম খায়রা উম্মাতিন”বলতে পারতেন এবং সেক্ষেত্রে আমরা সকলেই এ আয়াতের আওতায় চলে আসতাম। কিন্তু! আল্লাহপাক এখানে সাহাবাদের মধ্যে বিশেষ জামায়াতকে সম্বোধণ করেছেন।(তাফসীরে তাবরী ৪র্থ খন্ড,পৃষ্টা নং ৬৩) এ ছাড়া তাফসীরে ইবনে কাসীরে হযরত ইবনে আব্বাসের(রাঃ) এই রিওয়ায়াতটি বর্ণিত আছে, “كنتم خير أمة أخرجت للناس قال هم الذين هاجروا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم من مكة إلى مدينة অর্থাৎ- “খায়রে উম্মত” দ্বারা ঐ সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম যারা মক্কা হতে মদিনাতে হিজরত করেছিলেন। নিঃসন্দেহে তাঁরা সাহাবায়ে কেরাম।(তাফসীরে ইবনে কাসীর ১ম খন্ড, পৃষ্টা নং ৫০৯) (২) দ্বীতিয় আয়াতঃ وكذالك جعلناكم أمة وسطا لتكونوا شهداء على الناس ويكون الرسول عليكم شهيدا অর্থাৎ “এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় বানিয়েছি। যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রাসুল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্যে।(সুরা বাক্বারাহ-১৪৩) উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা নসফী(রাঃ) وسطا“ওসাতানের” অর্থ خيارا ‘পছন্দনীয়’ এবং “উদুল” বা معيار حق (সত্যের মাপকাঠি) করেছেন। অর্থাৎ -“আমি তোমাদেরকে উম্মতের জন্য পছন্দনীয় এবং সত্যের মাপকাঠি বানিয়েছি।(মাদারিক ১ম খন্ড,পৃষ্টা নং ৬৪ ইবনে কাসীর-১ম খন্ড,পৃষ্টা ৫১০,২৫০,২৫১)।(৩) তৃতীয় আয়াতঃ والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبعوهم باحسان رضى الله عنهم ورضوا عنه وأعدلهم جنت تجرى تحتها الأنهار خالدين فيها أبدا ذالك الفوز العظيم অর্থাৎ “আর যে সব মুহাজির ও আনছার(ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম,যে সব লোক সরল অন্তরে তাঁদের অনুগামী,আল্লাহ তাঁদের প্রতি রাজি হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি রাজি হয়েছেন। আর আল্লাহ পাক তাঁদের জন্যে এমন উদ্যানসমুহ প্রস্তুত করে রেখেছেন যার তলদেশ দিয়ে নহরসমুহ প্রবাহিত হইতে থাকবে। সেখানে তাঁরা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান সফলতা।( সুরা তওবা-১০০) অত্র আয়াতে আল্লাহপাক সাহাবায়ে আনছার ও মুহাজিরদের উচ্চ মর্তবা ও ফজিলত বয়ান করার পাশাপাশি তাঁদেরকে মহান আদর্শ বানিয়েছেন ঐ সমস্ত সাহাবিদের জন্য যারা মর্তবার দিক দিয়ে তাঁদের তুলনায় কম এবং উম্মতের মধ্যে যারা নেককার দ্বীনদার শ্রেণী। শা’বী(রাঃ) বলেন যে,মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে অগ্রবর্তী ও প্রথম তাঁরাই যাঁরা হুদায়বিয়ায় বায়আ’তে রিযওয়ানের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। মুহাম্মদ ইবনে কা’ব আল কারাসী(রাঃ) বলেন যে,ওমর ইবনুল খাত্তাব(রাঃ) এমন একজন লোকের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন যিনি এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন-“”والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار الخ তখন ওমর (রাঃ)তাঁর হাতখানা ধরে জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘কে তোমাকে এটা এরুপে পাঠ করালেন?” লোকটি উত্তরে বললেনঃ “উবাই ইবনে কা’ব(রাঃ)”। তখন ওমর (রাঃ)বললেন চলো আমরা উবাই ইবনে কা’বের কাছে যাই এবং এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি। অতঃপর উবাই ইবনে কা’বের কাছে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কি এই আয়াতটি এভাবে পড়তে বলেছেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন ওমর(রাঃ)তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কি রাসুলুল্লাহ(সাঃ)কে এভাবেই পড়তে শুনেছেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। ওমর(রাঃ) বললেনঃ “তাহলে দেখা যাচ্ছে যে,আমরা এমন এক মর্যাদা লাভ করেছি যা আমাদের পরে কেউ লাভ করতে পারবেনা”।এ কথা শুনে উবাই ইবনে কা’ব(রাঃ) বলেন যে,এই আয়াতের সত্যতা প্রমাণকারী সুরায়ে জুমাআ’র প্রথম দিকের আয়াতটিও বটে। তা হচ্ছে-وأخرين منهم لمل يلحقوا بهم وهو العزيز الحكيم অর্থাৎ “আর(উপস্থিতরা ব্যতিত)অন্যান্ন লোকদের জন্যেও, যারা তাদের সাথে শামিল হবে,কিন্তু এখনও শামিল হয়নি,আর তিনি মহাপরাক্রান্ত,প্রজ্ঞাময়।(৪) সুরায়ে হাশরেও রয়েছেঃ “ والذين جاءؤا من بعدهم يقولون ربنا اغفرلنا ولإخواننا الذين سبقون بالإيمان ولا تجعل فى قلوبنا غلا للذين آمنوا ربنا إنك رؤف الرحيم অর্থাৎ “আর (তাদের জন্যেও)যারা(ইসলাম ধর্মে)তাদের(আনছার ও মুহাজিরদের)পরে এসেছে,যারা প্রার্থনা করে “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ক্ষমা করুন,আর আমাদের ঐ ভাইদেরকেও যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এবং ঈমানদারদের প্রতি আমাদের অন্তরে যেন ঈর্ষা না হয়। হে আমাদের প্রভু! আপনি বড় স্নেহশীল,করুণাময়।(৫)সুরায়ে আনফালেও রয়েছেঃ “والذين آمنوا من بعد وهاجروا وجاهدوا معكم فألئك منكم অর্থাৎ “আর যারা(নবী সাঃ এর হিজরতের)পরবর্তীকালে ঈমান এনেছে,হিজরত করেছে, এবং তোমাদের সাথে একত্রে জিহাদ করেছে,বস্তুতঃ তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত”। ইবনে জারীর(রাঃ) এটা রিওয়ায়াত করেছেন এবং বলেছেন যে,হাসান বসরী(রাঃ) انصار ‘আনছার’ শব্দটিকে পেশ দিয়ে পড়তেন এবং السابقون الأولون-এর উপর عطف করতেন। তখন অর্থ দাঁড়াবেঃ “মুহাজিরদের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী ও প্রথম এবং আনছার ও তাদের অনুসারীদের প্রতি আল্লাহপাক সন্তুষ্ট”। (৬) সুরায়ে ফাতাহ-এ আছেঃ “لقد رضى الله عن المؤمنين إذ يبايعونك تحت الشجرة অর্থাৎ “মুমিনরা যখন বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়’আত গ্রহন করলো তখন আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন।(সুরা ফাতাহ-১৮)

(৭) সুরা বাক্বারা,আয়াত নং ১৩৭-এ আছেঃ فإن آمنوا بمثل ما آمنتم به فقد اهتدىوا وإن تولوا فإنما هم فى شقاق অর্থঃ “অতএব তারা যদি ঈমান আনে,তোমাদের ঈমান আনার মত,তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়,তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতারং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। আয়াতে “তোমাদের ঈমান আনার মত”এর দ্বারা রাসুলুল্লাহ(সাঃ)এবং সাহাবায়ে কেরামকেই বুঝানো হয়েছে। আয়াতে তাঁদের ঈমানকে আদর্শ ঈমানের ও সত্যের মাপকাঠি সাব্যস্ত করে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত ঈমান হচ্ছে সে রকম ঈমান, যা রাসুলুল্লাহ(সাঃ)-এর সাহাবায়ে কেরাম অবলম্বন করেছেন। সে ঈমান ও বিশ্বাস থেকে যদি চুল পরিমাণও ভিন্ন হয়,তাহলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নহে।(৮) অন্যত্র আল্লাহপাক ইরশাদ করেনঃ يبشرهم ربهم برحمة منه ورضوان وجنت لهم فيها نعيم مقيم অর্থঃ “তাঁদের প্রভূ তাঁদেরকে নীজ রহমত,সন্তুষ্টি(রেজামন্দি) এবং এমন জান্নাতের সু-সংবাদ দিচ্ছেন যার মধ্যে বিরাজ করছে তাঁদের জন্য অফুরন্ত নেয়ামতসমুহ।

হাদিসের বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি হওয়া প্রমাণিতঃ

عن أبى بردة رضي الله عنه قال : قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم – النجوم أمنة للسماء فإذا ذهبت النجوم أتى السماء ما توعد ، وأنا أمنة لأصحابي فإذا ذهبت أتى أصحابي ما يوعدون ، وأصحابي أمنة لأمتي فإذا ذهب أصحابي أتى أمتي ما يوعدون.

অর্থঃ হযরত আবু বুরদাহ(রাঃ) হতে বর্ণিত যে,রাসুলুল্লাহ(সঃ) ইরশাদ করেছেন যে, নক্ষত্র সমুহ আসমানের জন্য আমানত স্বরুপ। যখন নক্ষত্রগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাবে,তখন আসমানকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কেয়ামত চলে আসবে। এবং আমি আমার সাহাবীদের জন্য আমানত স্বরুপ। অতএব যখন আমি ইহকাল ত্যাগ করব তখন তাঁদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের(সাহাবাদের) মধ্যে ইজতেহাদি মতানৈক্য দেখা দিবে। এবং আমার সাহাবীরা উম্মতের জন্য আমানত স্বরুপ। অতএব যখন তাঁদের যুগের অবসান ঘটবে তখন আমার উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন রকমের ফেতনা-ফ্যাসাদের সুত্রপাত ঘটবে।(মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড,পৃষ্টা নং ৩০৮) উক্ত হাদিস দ্বারা বুঝা গেল যে,সাহাবায়ে কেরামের যুগ ছিল স্বর্ণের যুগ। তাঁদের মধ্যে কিছু বিষয়াদি নিয়ে পারস্পরিক মতানৈক্য থাকলেও ইসলামের বিরুদ্ধে কোন প্রকারের ফেতনা-ফ্যাসাদ মাথাচাঁড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। রাসুলে কারীম সাঃ-

এর রেখে যাওয়া আমানতের(দ্বীন) মধ্যে কিঞ্চিত পরিমাণ খেয়ানত হতে দেননি। এমনকি হযরত আবুবকর(রাঃ) এর খেলাফতের প্রারম্ভিক সময় কিছু মুনাফেক(নামধারী মুসলমান) ও কিছু সংখ্যক নওমুসলিমরা যাকাত দিতে অস্বীকার করার কারনে হযরত আবুবকর সিদ্দিক(রাঃ) বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দিলেনঃ أينقص الدين وأنا حى؟ অর্থঃ “আমি জিবিত থাকতে দ্বীনের ক্ষতি হবে তাহা কখনও সহ্য করা হবেনা। কিন্তু ! সাহাবাদের তিরোধানের পরে দ্বীনের মধ্যে ঈমান বিদ্ধেংশী বিভিন্ন মারাত্নক ফেরকা সমুহের আত্নপ্রকাশ ঘটে তারমধ্যে শিয়া, রাফেজী,খারেজী, মুতাজিলা,ক্বাদিয়ানী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। (২) রাসুলে কারীম(সাঃ) সমস্ত উম্মতকে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলে গেছেনঃ ستفترق أمتى ثلاثا وسبعين فرقة كلهم فى النار إلا واحدة : قالوا من هى يا رسول الله! قال: ما أ نا عليه وأصحابى অর্থঃ“ অতিশীঘ্র আমার উম্মত তেহাত্তর(৭৩) ফের্কায় বিভক্ত হয়ে পড়বে। তন্মধ্যে মাত্র একটি দলই মুক্তিপ্রাপ্ত এবং জান্নাতী হবে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেনঃ সেই মুক্তিপ্রাপ্ত সৌভাগ্যশালী দলটি কারা এবং এত বড় সৌভাগ্য লাভের ভিত্তি কোন নীতি বা আদর্শের উপর ? উত্তরে নবী(সাঃ) বললেন,যে নীতি,তরীকা ও আদর্শের উপর আমি এবং আমার সাহাবায়ে কেরাম আছেন।(তিরমিজী শরীফ,ইবনে মাজা,মুসনাদে আহমদ,আল-মুসতাদরাক)উক্ত হাদিসের মধ্যে আল্লাহর রাসুল(সাঃ) স্পষ্ট বলেছেন যে,আমি যেমন সত্যের মাপকাঠি,এবং আমার যেমন সমালোচনা করা যাবেনা। এবং বিনা বাক্যে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ ব্যতিরেকে যেমন নাজাতের,ঈমানের,এবং মুক্তির অন্য কোন পথ নাই,তদ্রুপ আমার সাহাবাগণও সত্যের মাপকাঠী ও সকল প্রকার সমালোচনার উর্দ্ধে এবং তাঁদের অনুকরণ ও অনুকরণ ব্যতিরেকে উম্মতের নাজাতের বা মুক্তির কোন বিকল্প পথ খোলা নাই। এবং সাহাবাদেরকে মানলে রাসুলকে মানারই শামিল। এবং এ ব্যাপারে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ(সাঃ) উম্মতকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।(৩) عن عبدالله بن مسعود رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم أنه قال: خيرالناس قرنى ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم অর্থঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ)হতে বর্ণিত যে,রাসুলুল্লাহ(সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে,সর্বোত্তম মানুষ(সাহাবায়ে কেরাম) আমার যুগের। তারপর তাদের পরের যুগের লোকেরা(তাবেয়ী),তারপর তাদের পরের যুগের লোকেরা(তাবে-তাবেয়ী)-বুখারী,মুসলিম।(৪) عن الإرباض بن سارية: قال النبى صلى الله عليه وسلم: عليكم بسنتى وسنة خلفاء الراشدين المهدين الخ অর্থঃ ইরবায ইবনে সারিয়া(রাঃ)হতে বর্ণিত যে,রাসুলুল্লাহ(সাঃ)ইরশাদ করেছেনঃ তোমরা আমার এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীন(রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর সুন্নতকে(আদর্শ) শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরবে।(আবু দাউদ,তিরমিযী,ইবনে মাজা,মুসনাদে আহমদ,মুসনাদে বাযযার,ইবনে হিব্বান,মুসতাদরাক লিল-হাকিম,তারীখে দিমাশক লি-ইবনে আসাকির,আল-মু’জামুল কাবীর,আল-আওসাত,আল-কাবীর লিত্তাবরানী)ইমাম নববী(রাঃ) কাছরাতে তুরুকের কারনে হাদিসটিকে মজবুত বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়াও মুহাদ্দিসানে কেরামদের নিকট হাদিসটি অনেক প্রসিদ্ধ এবং হাদিসটি হাসানের স্তরের। হাদিসটির দ্বারা প্রমানিত হয় যে,রাসুলের আদর্শ যেমন উম্মতের জন্য গ্রহণযোগ্য,তদ্রুপ সাহাবায়ে কেরামের আদর্শও গ্রহণযোগ্য। সুতারং সাহাবায়ে কেরাম যে,সত্যের মাপকাঠি এর মধ্যে কোন সন্দেহ রইলনা।

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠিঃ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ)ঃ- হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)এর সাহাবায়ে কেরাম উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম জামায়াত,সর্বাধিক পবিত্র চরিত্র ও নম্র স্বভাবের অধিকারী, দ্বীনের ভিত্তি মজবুত করার জন্য এবং রাসুলুল্লাহর(সাঃ) সঙ্গী বানানোর জন্য তাঁদেরকে নির্বাচন করেছেন। তাঁদের মর্যাদা উপলব্ধি কর। তাঁদেরকে অনুসরন কর। তাঁদের সীরাত ও চরীত্রকে জীবনের সম্বল বানিয়ে নাও। কারন তাঁরা আল্লাহর কাছ থেকে হিদায়াত প্রাপ্ত।(মিশকাত-২য় খন্ড,পৃঃ ৩২)

ইমামকুল শিরোমনি ইমাম আবু হানিফা(রাঃ)ঃ-আমি ইসতেদলালের(দলিল তালাশ করা) ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কোরানকে অনুসরন করি। যদি কোরানে না পাই তাহলে রাসুলের(রাঃ) হাদিসকে অনুসরণ করি। অন্যথায় সাহাবায়ে কেরামের আছারকে(ছাহাবীদের কথা,কাজ ও সমর্থনকে বলা হয়) গ্রহন করি। (তাহযিবুত তাহযীব-১০ খন্ড,পৃঃ-৪৮০)

ইমামুল মুহাদ্দিসীন ইমাম বুখারী(রাঃ)ঃ-সাহাবায়ে কেরাম শরীয়াতে মুহাম্মদীর বুনিয়াদ বা মূল-ভিত্তি।

ইমাম আবু দাউদ(রাঃ)ঃ-খোলাফায়ে রাশেদীনের(রাদিয়াল্লাহু আনহুম)জীবন চরিতই প্রকৃত ইসলাম।

ইবনে মাজাহ্ ঃ-সাহাবায়ে কেরামের জামায়াতই দ্বীনের মূল ভিত্তি।

ইমাম মুহিউদ্দিন আবু জাকারিয়া ইবনে শারফ আন্-নববী(রাঃ)ঃ-সাহাবায়ে কেরামের সত্যবাদিতা ও ন্যায়-পরায়ণতার উপর সমস্ত উম্মতের ঐক্যমত।(শরহে মুসলিম,২য় খন্ড,পৃঃ-২৭২)

ইমামুল কালাম ইবনে হুমাম(রাঃ)ঃ-সমস্ত ইমামদের ঐক্যমতে সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি। (তাক্বরীরুল উসুল-২য় খন্ড,পৃঃ-২৬)

ইমাম সুবুকি(রাঃ)ঃ-সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি।

শাহ্ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসে দেহলবী(রাঃ)ঃ-সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্টিত।(ইজালাতুল খাফা)

ইমাম তাহাবী(রাঃ)ঃ-আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ঐক্যমতে সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি। তবে আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে,তাঁরা মাসুম(নিস্পাপ)নন,তবে মাহফুজ(সমালোচনার উর্দ্ধে)। তাঁদের দ্বারা ভুল হওয়া স্বাভাবিক। তাঁরা মুজতাহিদ(দ্বীনের সংস্কারক)ছিলেন। ইজতেহাদি ভুলের কারনে তাঁদের মধ্যে যে (মুশাজারাত)মতানৈক্য দেখছিল এ ব্যাপারে সুকুত(নিরব)থাকাটাকে প্রাধন্যতা দেওয়া হয়েছে। আর ইজতিহাদের ক্ষেত্রে সঠিক হলে দ্বীগুন পুরস্কার পাবেন আর ভুল হলে একগুন। তবে তাঁদের সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি আল্লাহপাক মাফ করার ঘোষণা করে দিয়েছেন। (আক্বিদাতুত তাহাবিয়্যাহ)

রাসুলুল্লাহ(সাঃ) এর হুশিয়ারীঃ-

রাসুলুল্লাহ(সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ-إذا ذكر أصحابى فامسكوا অর্থঃ “যখন আমার সাহাবাদের আলোচনা হয় তখন তোমরা তোমাদের জিহ্বার উপর লাগাম দিও।(জামে সগীর,পৃঃ-২৬) কিন্তু ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মওদূদী সাহের তাঁহার লিখিত কিতাব “খিলাফত ও মুলুকিয়্যাত” এর মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের(রাঃ) দোষ চর্চা করতে গিয়ে একটুও বিচলিত হননি। এবং তিনি সমালোচনার করতে কোন প্রকার কসর অবশিষ্টও রাখেননি। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি মানতে নারাজ। কারন সাহাবায়ে কেরাম ভুলের উর্দ্ধে নয়। তিনি বলেনঃ রাসুলের(সাঃ) সাহাবাগন সত্যের মাপকাঠি নন। তাঁরা সমালোচনার উর্দ্ধে নন। তাঁদের জেহেনী গোলামী করা যাবেনা। তাঁদের দোষ-চর্চা করা যাবে। তাঁদের ভিতর এতটা বিশ্বস্ততা নাই যে,কোন মানুষ বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁদের অনুকরণ-অনুসরণ করতে পারে। (দসতুরে জামায়াতে ইসলামী-পৃঃ ৪)

তাই আজ মওদূদী সাহেবের উত্তরসূরীরা তার আদর্শকে বাস্তবায়ন করার জন্য তার বিতর্কিত তাফহীমূল কোরান সহ অন্যান্ন পুস্তিকাদি তাঁদের পাঠ্যসূচীতে শীর্ষস্থানে রেখেছেন। আশা করি প্রীয় পাঠক ও পাঠিকাবৃন্দ আমার এই পোষ্টটি দ্বারা নিশ্চয়ই উপকৃত হবেন। আর যারা সাহাবাদেরকে সত্যের মাপকাঠি মানতে নারাজ,তারাতো অবশ্যই আমার লেখাকে মাইনাসের বন্যা দিয়ে ভাসিয়ে দিবে, তবে কাহারো পিলাচ আর মাইনাচের আশায় আমি এই লেখাটি পোষ্ট করিনি,বরং সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে অন্ততঃ এতটুকু লিখে হলেও আল্লাহপাক ও তাঁর প্রীয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর সন্তুষ্টি পাওয়াই আমার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহপাক আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন(আমীন)

One thought on “সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি-(একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনা)

  1. Mahdi says:

    Facebook
    Munirul
    Home20+
    Friend Requests
    Messages
    Notifications
    Account Settings
    সাহাবীগনকে সত্যের মাপকাঠি না মানা নিয়ে মাওঃ মওদুদীর বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
    May 10, 2013 at 5:20am

    মাওলানা মওদুদী (রহ: ) “সত্যের মাপকাঠি এবং যাচাই বাছাই” সম্পর্কে যে আলোচনা রাখেন, সেটা তৎকালীন পাকিস্তান জামায়া’তে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৩নং ধারার ৬ নং উপধারায় লিখিত আছে । মাওলানার আলোচনাটি নিন্মরূপ :-

    “আল্লাহর রাসুল (স: ) ছাড়া অন্য কোন মানুষকে সত্যের মাপকাঠি বানাবেনা ।কাউকে যাচাই বাছাইয়ের উর্ধে মনে করবেনা । কারো অন্ধ গোলামীতে নিমজ্জিত হবে না, বরং আল্লাহর দেয়া এ পূর্ণ মাপ কাঠির মাধ্যমে যাচাই ও পরখ করবে ‘এবং এ মাপকাঠির দৃষ্টিতে যার যে মর্যাদা হতে পারে, তাকে সে মর্যাদাই দেবে’।”

    মাওলানার এ আলাচনা থেকে দুটি কথা স্পষ্টত: জানতে পারা যায়:

    ১।আল্লাহর রাসুল (স: ) ছাড়া কেউ সত্যের মাপকাঠি নয় ।

    ২।আল্লাহর রাসুল (সা: ) ছাড়া কেউ যাচাই বাছাইয়ের উর্ধে নয় ।

    মাওলানার উল্লিখিত কথাগুলোর উপর কোন কোন মহল অভিযোগ করে বলেছেন যে, যদি এ কথাগুলো মেনে নেওয়া যায় তা হলে সাহাবায়ে কিরাম (রা: ) সত্যের মাপকাঠি হচ্ছেন না এবং তাদের উপর তানকী’দ বা যাচাই বাছাই বৈধ হয়ে যায় । অথচ কো’রআন ও হাদীসে তাদের অনেক মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে । আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন رضى الله عنهم و رضوا عنه অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্ত্তষ্ট হয়েছেন এবং তারাও সন্ত্তষ্ট হয়েছেন আল্লাহর প্রতি ।

    আর রাসুলে করীম (স: ) বলছেন اصحابي كالنجوم باىهم اقتدىتم اهتدىتم
    অর্থাৎ আমার সাহাবীগণ তারকা সদৃশ, তোমরা তাদের মধ্য থেকে যার অনুসরণ করবে হেদায়েত পাবে ।অতএব যারা এ আকীদা পোষণ করবে যে সাহাবায়ে কিরাম (রা: )সত্যের মাপকাঠি নন এবং যাচাই বাছাইয়েরও উর্ধে নন, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বহির্ভূত।

    সন্মানিত পাঠকবৃন্দ।আসুন, আমরা কোরআন ও হাদীসের আলোকে আলোচনা করে দেখি সত্যিই কি মাওলানা মওদুদী (রাহ ) এ কথাগুলো বলার কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত থেকে বহির্ভূত হওয়ার যোগ্য, না নিছক ,একটা অপবাদ মাত্র ।

    কোরআন শরীফের আলোকে মিয়ারে হক :

    আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরীফে এরশাদ করেছেন :
    ذالك خير واحسن تاويلا – فان تنازعتم فى شئ فردوه الى الله والرسول ان كنتم تؤمنون بالله واليوم الاخر
    “যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মত বিরোধ হয় তাহলে উহা আল্লাহ ও তার রসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও । যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখ । উহাই উত্তম এবং পরকালের দিক দিযেও মঙ্গলজনক”।(সূরা নিসা , আয়াত নং-৫৯)

    এ আয়াতে একটি কথা লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তায়ালা “তোমরা” বলে যে সম্মোধন করেছেন এর মধ্যে সাহাবায়ে কিরাম (রা: ) ও রয়েছেন । সুতরাং স্পষ্টত: বুঝা গেল সাহাবায়ে কিরাম (রা: )সহ কিয়ামত পর্যন্ত আগত মুমিনদের একে অন্যের সাথে মত বিরোধ হতে পারে । একজন সাহাবীর সাথে যেমন অন্য একজন সাহাবীর মত বিরোধ হতে পারে ,তেমনি একজন সাহাবীর সাথে এমন ব্যক্তি যিনি সাহাবী নন তারও মত বিরোধ হতে পারে । কিন্ত এমতাবস্থায় ফয়সালাকারী হবে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতে রাসুল (স: )।

    অতএব বুঝা গেল মিয়ারে হক বা সত্যের মাপকাঠি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতে রাসুল (স: )। যদি সাহাবায়ে কিরাম (রা: )সত্যের মাপকাঠি হতেন তাহলে গায়রে সাহাবী (যিনি সাহাবী নন) তো দুরের কথা একজন সাহাবীর অন্য সাহাবীর সাথে মতবিরোধের কোন অধিকার থাকত না, কিংবা মত বিরোধের সময় প্রত্যেক সাহাবী নিজ নিজ মতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার হুকুম হত, এবং গায়ের সাহাবীকে বিনা দ্বিধায় সাহাবীর মতকে গ্রহণ করার উপর বাধ্য করা হত।

    অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন মতবিরোধের সময় কেউ কারো মত গ্রহণ না করে বরং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতে রাসুল (স: ) যে ফয়সালা দেয় উভয় পক্ষ তা মেনে নিতে হবে । সুতরাং সত্যের মাপকাঠি একমাত্র আল্লাহর কিতাব কোরআনে করীম এবং সুন্নতে রাসুল (স: )।সাহাবায়ে কিরাম বা অন্য কেউ নন । কারণ মিয়ারে হক বলতে এ জিনিষকেই বুঝায় যার অনুসরণ ও অনুকরণ উহার সত্য হওয়ার প্রমান এবং যার বিরোধিতা উহার বাতিল হওয়ার পরিচয় বহন করে । আর এটা ঐ জিনিসই হতে পারে যা নিশ্চিত সত্য এবং বাতিল হওয়ার এতে কোনরূপ আশাংকা নেই।এবং এটা প্রকাশ্য যে, নিশ্চিত সত্য মাত্র দুটি জিনিষ, আল্লাহ তায়ালার কিতাব কোরআনে কারীম এবং রাসুলে করীম (স: ) এর সুন্নত । সুতরাং মিযারে হক শুধুমাত্র এ দুটোকেই মানতে হবে । অন্য কাউকে নয় ।

    মাওলানা মওদুদী (রহ: )কে মিয়ারে হক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ঠিক একথাটাই বলেছেন:-

    “মিয়ারে হক বলতে আমরা সেই বস্তুকেই বুঝি , যার অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্যে হক বা সত্য নিহিত আছে এবং যার অবাধ্যতার মধ্যে বাতিল বা অসত্য নিহিত আছে।এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখো যায় যে, আল্লাহর কিতাব ও রাসুলে করীম (স: ) এর সুন্নতই হচ্ছে একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।সাহাবীগণ মাপকাঠি নন , বরং তারা হচ্ছেন আল্লাহর কিতাব ও রসুলের সুন্নতের মাপকাঠি অনুসারে সত্যের পূর্ণ অনুসারী।কোরআন ও হাদীসের মাপকাঠিতে পরখ করে আমরা এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হযেছি যে, সাহাবাদের জামায়াত একটি সত্যপন্থি জামায়াত । তাদের ইজমা অর্থাৎ সর্ব সম্মত সিদ্ধান্তকে আমরা শরীয়তের প্রামান্য দলীল রূপে এজন্যে মেনে থাকি যে, কোরআন ও হাদীসের সাথে সামান্যতম বিরোধমুলক বিষয়েও সকল সাহাবাদের একমত হযে যাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। দেখুন-(তরজমানুল কোরআন, জিলদ ৫৬, সংখ্যা ৫)

    হাদীসের আলোকে মিয়ারে হক :

    عن ملك بن انس رض قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم تركت فيكم امرين لن تفعلوا ماتمسكتم بهما كتاب الله وسنة رسوله
    “হযরত মালিক বিন আনাস (রা: ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলে করীম (স: ) বলেছেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটো জিনিস রেখে গেলাম । যতক্ষন তোমরা এ দুটো জিনিসকে শক্ত ভাবে ধারণ করবে ততক্ষণ তোমরা কখনও পথভষ্ট হবে না । এ দুটো জিনিস হচ্ছে আল্লfহর কিতাব তথা কোরআন শরীফ এবং তার রাসুলের সুন্নত”।

    উক্ত হাদীস দ্বারা স্পষ্টত: বুঝা যাচ্ছে যে সত্য, ন্যায় ও সঠিক পথে থাকতে হলে মানুষকে কেবল মাত্র এ দুটোই শক্ত ভাবে ধারণ করতে হবে। এ দুটির অনুসরণের মধ্যেই সত্য নির্হিত এবং বিরোধিতার মধ্যে বাতিল নিহিত । সুতারং মিয়ারে হক শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাতে রাসুল (স: )। সাহাবায়ে কিরাম (রা: ) ও যদি মিয়ারে হক হতেন, তাহলে উক্ত হাদীসে রাসুল (স: ) কিতাব ও সুন্নাহ উল্লেখ করার পর পরই তাদের কথা উল্লেখ করতেন ।

    তা ছাড়া সাহাবায়ে কিরাম (রা: ) যদি মিয়ারে হক হতেন তাহলে তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কথা বা অভিমত শরিয়তের মধ্যে দলীল হিসেবে গণ্য হত।অথচ তাদের ব্যক্তিগত অভিমত শরিয়তে দলীল হিসেবে গণ্য হয়না । এ ব্যাপারে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন এবং নির্ভর যোগ্য উলামায়ে কিরামদের অভিমত নিন্মরূপ:

    হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ইমাম সারাখসীর অভিমত :

    وانما كان الاجماع حجة باعتبار ظهور وجه الصواب فيه بالاجماع عليه وانما يظهر هذا فى قول الجماعة لافى قول الواحد الاترى ان قول الواحد لايكون موجبا للعلم وان لم يكن بمعا بلته جماعة يخالفونه
    (كتاب الاصول)
    “সাহাবাদের ইজমা (ঐক্যমত) এজন্যই দলীল হিসাবে গৃহীত হয়ে থাকে যে, সবাই একটি ব্যাপারে একমত হওয়াতে এর সত্যতা নির্ভূলভাবে প্রতীয়মান হয় , কিন্ত একজনের কথায় তা হয় না । তুমি কি দেখোনা , একজনের কথায় সঠিক জ্ঞান অর্জিত হয় না, যদিও এর কেউ বিরোধীতা না করে । (দেখুন-কিতাবুল উসুল ১ম খন্ড, সাহবাদের ইজমা সম্পর্কীয় আলোচনা। )

    ইমাম সারাখসী আরও বলেন :

    “অভিমত হিসেবে কোন সাহাবার কাছ থেকে কোন ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে এবং এটা এমন স্পষ্ট কথা যা অস্বীকার করা যায় না । আর অভিমত অনেক সময় ভূল হয়ে থাকে । অতএব সাহাবীদের একজনের ব্যক্তিগত মত ভূল কিংবা নির্ভূল হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এ ধরণের অভিমত বিরোধী মতও ত্যাগ করা যাবে না , যেমনিভাবে কোন তাবেয়ীর কথায় কিয়াসকে ত্যাগ করা যায় না । দেখুন: কিতাবুল উসুল ২য় খন্ড পৃষ্টা নং-১০৫

    দার্শনিক ইমাম গাযযালীর অভিমত :

    ইমাম গাযযালী المستصفى গ্রন্থের ১৩৫ পৃষ্টায় কাওলে সাহাবী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন : অনেকের কাছে সাহাবীর মাযহাব স্বাভাবিকভাবে দলীলের সূত্র । আর অনেকের মতে কিয়াস বহির্ভূত মাসআলায় তা দলীল হিসাবে গণ্য এবং অনেকের কাছে আবু বকর (রা: ) ও উমর (রা: ) এর কথা দলীল হিসেবে গৃহীত । অত:পর তিনি বলেন :

    আমাদের কাছে এসব কথা বাতিল বলে গণ্য।যে ব্যক্তির ভূল হবার সম্ভাবনা আছে এবং যার নিস্পাপ ও নির্ভূল হবার কোন প্রামান্য দলীল নেই । তার দলীল রূপে গৃহীত হতে পারেনা।কাজেই সাহাবীদের ব্যক্তিগত কথা কিভাবে দলীল হতে পারে ? অথচ তাদের ভূলের সম্ভাবনা আছে । আর দলীলে মুতাওয়াতির বা আসামানী দলীল ছাড়া কিভাবে তাদের নিস্পাপ হওয়ার দাবি করা যেতে পারে ? তাদের মধ্যে মত পার্থক্য বিদ্যমান থাকা সত্তেও কিরূপে তাদের দলকে নিস্পাপ বলে ধারণা করা যায়? আর দুজন মাসুম বা নিস্পাপ ব্যক্তিদের মধ্যে মতপার্থক্য সম্ভব হয় কেমন করে ? তা ছাড়া সাহাবারা নিজেরাই তো তাদের মধ্যে মত পার্থক্য বৈধ হবার ব্যাপারে একমত।আবু বকর ও উমর (রা: ) পর্যন্ত তাদের বিরোধীমতের ইজতেহাদকারীদের অস্বীকার করেননি , বরং মুজতাহিদ যেন ইজতেহাদী মাসআলায় তার ইজতেহাদের অনুসরণ করে এটা অবশ্য পালনীয় করে দিয়েছেন । সুতরাং সাহাবাদের নিস্পাপ হওয়ার দলীল না থাকা , তাদের পরস্পরের বিরোধীতা করা বৈধ এবং তাদের নিজেদেরই একথা বলে দেয়া যে, তাদের বিরোধিতা করা বৈধ– এ তিনটি কথাই আমাদের আকাট্য দলীল।

    এরপর ইমাম গাযযালী (রহ: ) ইমাম শাফিযীর দুটি কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেন।প্রথমটি হলো যদি কোন সাহাবীর কথা প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং কারো বিরুদ্ধে কোন মত পাওয়া না যায় , তাহলে এর অনুসরণ করা জায়েয , ওয়াজিব নয় । পরবর্তীতে তিনি নূতন মত ব্যক্ত করে বলেন :- لا ىقلد العالم صحابىا كما لا ىقلد عالما اخر
    অর্থাৎ কোন আলেম যেমন অন্য আলেমের তাকলীদ বা অনুসরণ করেন না ঠিক তেমনি কোন সাহাবীরও যেন তাকলীদ না করেন ।

    ইমাম গাযযালী (রাহ: ) আরও বলেন :-
    وهو الصحيح المختار عندنا ادكل ماول على تحريم تقليد العالم للعالم لايفرق فيه بين الصحابى وغيره
    এইটিই আমাদের কাছে সহীহ ও গ্রহণ যোগ্য কথা । কারণ যে সমস্ত দলীলের ভিত্তিতে এক আলেমের জন্য অন্য আলেমের তাকলীদ হারাম প্রমানিত হলো, সেগুলোর ব্যাপারে একজন সাহাবীও একজন গায়রে সাহাবীর মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করা যাবেনা।

    যারা সাহাবীদের ফযীলত সম্পর্কীয় আয়াত ও হাদীস দ্বারা তাদের অনুসরণ করা জাযেয় ও কর্তব্য বলে দলীল পেশ করেন , সে সব দলীলের জবাবে ইমাম গাযাযলী (রাহ: )বলেন:-
    قلنا هذا كله ثناء يوجب حسن الاعتقاد فى عملهم ودنيهم ومحلهم عند الله تعالى ولايوجب تقليدهم لاجوازا ولاوجوبا

    আমরা সাহাবীদের ফযীলত সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীস সমূহকে তাদের প্রশংসা জ্ঞাপক দলীল হিসেবে মনে করি। সেগুলো দ্বারা তাদের আমল, দ্বীনদারী এবং আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা সম্পর্কে সুধারনা পোষন করা কর্তব্য বলে প্রমাণিত হয ।কিন্ত এসবের মাধ্যমে তাদের অন্ধ অনুসরণ করা জায়েয ও কর্তব্য বলে প্রমানিত হয় না । জবাবের শেষাংশে তিনি বলেন :- كل ذالك ثناء لايوجب الاقتداء اصلا
    এসব প্রশংসা ও মর্যাদা জ্ঞাপক দলীল এর দ্বারা অনুসরণ করা কর্তব্য এটা প্রমাণিত হয় না।

    ইমাম শাফিয়ীর অভিমত :

    وقال الشافعى فى قوله الجديد لايقلد احدمنهم اى لايكون قوله دليلا وان كان لايدرك بالقياس
    ইমাম শাফিয়ীর সর্বশেষ মতামত এই যে, সাহাবীদের কারও অনুসরণ করা যাবেনা , অর্থাৎ তাদের ব্যক্তিগত কথা শরীয়তের মধ্যে কোন দলীল নয় । ঐ সমস্ত মাসআলায়ও যে গুলোতে কিয়াসের কোন দখল নেই ।
    দেখুন –(مقدمت فتح الملهم)

    ইমাম শওকানীর অভিমত:

    ইমাম শওকানী ارشاد الفحول গ্রন্থের الاستدلال নামক সপ্তম অধ্যায়ের পঞ্চম অনুচ্ছেদে কাওলে সাহাবী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন :

    সত্য কথা হলো সাহাবীর ব্যক্তিগত কথা শরীয়তের কোন দলীল নয় । কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতের প্রতি মুহাম্মদ (স: ) ছাড়া অন্য কাউকে প্রেরণ করেননি।তিনি আমাদের একমাত্র রাসুল (স: ) আর কিতাব ও আমাদের জন্য মাত্র একটি।সমস্ত উম্মতকে আল্লহর কিতাব ও তার নবীর সুন্নত অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপার সাহাবী ও গায়রে সাহাবীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।প্রত্যেকই শরীয়তী বিধানের আওতাধীন এবং কিতাব ও সুন্নত অনুসরণে সমান ভাবে আদিষ্ট । যারা বলেন যে, আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নত ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে দলীল কায়েম হতে পারে, তারা দ্বীনের ব্যাপারে একটি প্রমানহীন কথা বলেন ।

    শাহ ওলিউল্লাহর অভিমত :

    শাহ ওলিউল্লাহ (রহ: ) তার রচিত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থের প্রথম খন্ডের শেষাংশে التنبىه على مسائل শিরোনামের একটি পরিচ্ছেদে বলেন :
    قد صحّ اجماع الصحابة كلهم اولهم عن اخرهم واجماع التابعين اولهم عن اخرهم واجماع تابعى التابعين اولهم عن اخرهم على الامتناع والمنع من ان يقصد منهم احد الى قول انسان منهم اوممن قبلهم فياخذه كله
    সাহাবী , তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলের ঐক্যমতে প্রমানিত যে, তাদের কোন একজনের পক্ষে ও তাদের মধ্য থেকে কিংবা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তির কথা দ্বিধাহীন ভাবে ও অকুন্ঠ চিত্তে গ্রহণ করা বৈধ নয়।অত:পর তিনি বিভিন্ন ইমামগণের অভিমত পেশ করেণ :

    ইমাম মালেকের অভিমত :
    مامن احد الا وهو ماخوذ من كلامه ومردود عليه الا رسول الله
    একমাত্র রাসুল (স: ) ছাড় এমন কোন লোক নেই , যার কথা কিছু গ্রহণ যোগ্য ও কিছু বর্জন যোগ্য হবে না ।

    ইমাম শাফিয়ীর অভিমত :
    لا حجة فى قول احد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم وان كثروا
    “রাসুল ছাড়া অন্য কারো কথা দলীল হতে পারে না । যদি ও তারা সংখ্যায় বেশী হন ।

    ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের অভিমত :
    ليس لا حد مع الله ورسوله كلام
    “কারো কথা আল্লাহ ও তার রাসুলের কথার সমান হতে পারে না ।

    মওলানা মওদূদী (রহ: )এ প্রতিপক্ষের দলীলের অসরতা :

    যারা সাহাবায়ে কিরাম (রা: ) কে মিয়ারে হক বলে দাবী করেন , তারা নিন্মের হাদীসটি দলীল হিসেবে পেশ করেন : قال رسول الله صلى الله علىه و سلم اصحابي كالنجوم باىهم اقتدىتم اهتدىتم
    “রাসুল (স: )বলেছেন আমার সাহাবীগণ তারকা সদৃশ, তোমরা তাদের মধ্য থেকে যাকেই অনুসরণ করবে হেদয়াত পাবে ।
    এ হাদীসটি আসলে একটি জয়ীফ বা দুর্বল হাদীস । আর জয়ীফ হাদীস কখন ও দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না । এটা সর্বসম্মত কথা ।

    হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনে কিরামের অভিমত নিন্মরূপ:

    বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে আব্দুল বার তার লিখিত
    “جامع بيان العلم” নামক কিতাবে এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন :

    هذا اسناد لاتقوم به حجة
    অর্থাৎ এ হাদিসটির সনদ এমন যার উপর ভিত্তি করে কোন বিষয়ের দলীল হিসেবে এটাকে পেশ করা যায় না ।

    প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাযম বলেন :
    هذه رواية ساقطة خبر مكذوب موضوع باطل لم يصح قط
    এটি হচ্ছে একটি পরিত্যাক্ত বর্ণনা একটি মিথ্যে মন গড়া জালিয়াতি পূর্ণ এবং অসারতা পূর্ণ বাতেল খবর । এর সত্যতা কোন কালেই প্রমানিত হয়নি ।

    হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেন : এ হাদিসটির যাবতীয় সনদই দুর্বল। (দেখুন- تخريج كشاف)

    ইমাম শওকানী বলেন :
    فيه مقال معروف
    অর্থাৎ এ হাদিসটির সনদ সম্পর্কে বিশেষ কথাবার্তা ও মন্তব্য রয়েছে ।
    (দেখুন – ارشاد الفحول)

    তিনি আরো বলেন , এর একজন রাবী অত্যন্ত দুর্বল এবং ইবনে মুঈনের মতে মিথ্যাবাদী। ইমাম বুখারীর নিকট সবোর্তভাবে পরিত্যাজ্য । ইমাম বুখারী এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন : انه منكر الحديث অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি হাদীস শাস্ত্রে অপরিচিত ব্যক্তি।

    ইমাম আবু হাতেম (রহ: ) এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন : ضعيف جدا অর্থাৎ সে খুবই দুর্বল । বিখ্যাত হদিস বিশারদ ইয়াইয়া ইবনে মুঈন এ হাদীসের বর্ণনা কারী সম্পকে বলেছেন: لا يساوى فلسا অর্থাৎ এ হাদীসটির বর্ণনা কারীর মূল্য এক পয়সারও সমান হতে পারে না ।

    হাফেজ ইবনে কাইয়্যুম :
    علام الموقعين নামক গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে القول فى التقليد অধ্যায়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, এ রেওয়ায়তটি মোটেই শূদ্ধ নহে ।

    এ ছাড়াও মাওলানার প্রতিপক্ষরা সাহাবায়ে কিরামদের ফযিলত সম্পর্কিত কোরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াত ও হাদীস দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন।এ গুলো সম্পর্কে ইমাম গাযযালীর জওয়াব একটু আগেই বর্ণনা করেছি।পাঠক ভাইদেরকে তাদের দৃষ্টি একটু পছনে নিয়ে ঐ জওয়াবটি দেখে নেয়ার অনুরোধ জানাই ।

    সম্মানিত পাঠকবৃন্দ এ দীর্ঘ আলোচনা থেকে আশাকরি বুঝতে পেরেছেন যে, আল্লাহর রাসুল ছাড়া কেউই সত্যের মাপকাঠি নয় । কারো ব্যক্তিগত কথা কিংবা অভিমত অবশ্য পালনীয় নয়। সুতরাং মাওলানা মওদূদী(রহ: ) এর কথা “আল্লাহর রাসুল ছাড়া কাউকে সত্যর মাপকাঠি বানাবে না “ এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদার বিরোধী কোন কথা নয়, এবং একথা বলার কারণে মাওলানা মাওদুদী (রহ: ) আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত থেকে বেরও হননি।বরং মাওলানার কথাই যর্থাথ কথা । যারা সাহাবায়ে কিরামদেরকে সত্যের মাপকাঠি বলে দাবী করেন তারা প্রকৃত পক্ষে অনুসরণের ক্ষেত্রে সাহাবা (রা: ) কে রাসুল (স: ) এর সম মর্যাদায় নিয়ে যান ।

    উপমহাদেশের উজ্জল নক্ষত্র আল্লামা জাফর আহমদ উসমানীর ফতোয়া:

    কালিমায়ে ইসলামের দ্বিতীয় অংশ محمد رسول الله এর অর্থ এই যে, এখন একমাত্র আল্লাহর রাসুল ছাড়া অন্য কেউ সত্যের মাপকাঠি নয় । এ জন্য উক্ত ধারণা প্রত্যেক মসুলমান মাত্রের আকিদা হওয়া উচিত। ইমাম মালিক (রহ: ) রাসুলে করীস (স: ) এর কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন , এই কবরে যে মহান ব্যক্তি শায়িত আছেন, তিনি ছাড়া অন্য সবার কথা যাচাই বাছাই করে দেখতে হবে।একথা পরিষ্কার যে, ইমাম মালিকের এ কথার অর্থ নবী ছাড়া অন্য সবাই ।এ থেকে অহেতুক নবী ওলিদের অবমাননা বের করা যুলুম । (দেখুন,৮০ জন উলামার দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী )

    তাফসীরে মাজেদীর লেখক মাওলানা আব্দুল মাজিদ দরিয়াবাদীর অভিমত :

    আপনি মৌলিক আকিদা সম্পর্কীয় যে উদ্ধতিটি পাঠিয়েছেন , তা সম্পূর্ণ সঠিক।এবং প্রত্যেক মসুলমানের এই আকিদা হওয়া উচিত। আল্লাহর রাসুলকে সত্যের মাপকাঠি স্বীকার করার ভিতর দিয়ে অন্যান্য নবীদের স্বীকৃতিও এসে গেছে। প্রশ্নকারীর সম্ভবত: তানকীদ(যাচাই) এবং তাওহীন(অসম্মান) এর মধ্যে ব্যবধান জানা নেই।মুহাদ্দিসীনরা হাদীস বর্ণনাকারীরদের কি কঠোর ভাবে যাচাই বাছাই করেছেন , এত কি তারা সাহাবায়ে কিরামদের অসম্মান কারী হয়ে গেলেন ?

    অনুরূপভাবে প্রশ্নকারীর সম্ভবত : অনুসরণ ও অন্ধ অনুকরণের পার্থক্য জানা নেই । অনুসরণ তো উস্তাদ, পিতা –মাত এবং বুজুর্গ ব্যক্তিদের করা হয়ে থাকে আর অন্ধ অনুকরণ একমাত্র নিষ্পাপ রাসুল ছাড়া অন্য কারো হয় না । (জামায়াতে ইসলামী ৮০ জন উলামার দৃষ্টিতে )

    Note: লেখাটি মাওলানা বশিরুজ্জামান লিখিত “সত্যের আলো” নামক বই থেকে নেয়া হয়েছে।পৃষ্ঠা ২৭-৩৯

    http://imbd.blog.com/?p=271

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s