রফয়ে ইয়াদাইন বিষয়ে গায়রে মুকাল্লিদ মাযহাবের মুখোশ উন্মোচন

রফয়ে ইয়াদাইন বিষয়ে গায়রে মুকাল্লিদ মাযহাবের মুখোশ উন্মোচন

بسم الله الرحمن الرحيم

বর্তমান সময় মুসলমানদের জন্য কঠিন পরীক্ষার। যেসব বিষয়ে মুসলমানদের বর্তমানে বিভক্ত হতে হচ্ছে, তা ইতোপূর্বে হতে হয়নি। নতুন নতুন মাসআলা দাঁড় করানো হচ্ছে। এর কারণ একটি বলেই আমার মনে আসছে। তা হল- ফুক্বাহায়ে ইসলামের সাথে বিদ্রোহী মনোভাব পোষণ করে কুরআন হাদীস সম্পর্কে স্বল্প পড়াশোনা। আর এর সাথে সাথে নিজের মতকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা।

একদিন এক লোক তার কয়েকজন সাথীসহ আমার কাছে এল। নিজের পরিচয় দিয়ে বলেঃ “আমি ইসলামীয়াত ও আরবীতে এম এ করেছি। আর কুরআন হাদীস নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছি”।

আমি তাকে বললামঃ “হাদীসের কিতাবে কতিপয় এমন হাদীসও পাওয়া যায়, যা বাহ্যিকভাবে বিপরীতমুখী মনে হয়, এসব হাদীসের ক্ষেত্রে আপনারা কি একেক সময় একেক হাদীসরে উপর আমল করেন নাকি বিপরীতমুখী দুই বা তিন হাদীসের মাঝে একটি হাদীসকে রাজেহ তথা প্রাধান্য দিয়ে তার উপর আমল করে বাকি বিপরতীমুখী দুই বা তিন হাদীসকে ছেড়ে দেন?”

লোকটি বলতে লাগলঃ “সকল হাদীসের উপরতো কেউই আমল করতে পারবে না। তাই রাজেহ তথা প্রাধান্য পাওয়া হাদীসের উপরই আমল করা হয়। আর মারজূহ তথা অপ্রাধান্য পাওয়া হাদীসকে ছেড়ে দেয়া হয়”।

আমি বললামঃ “কিছু হাদীসকে রাজেহ আর কিছু হাদীসকে মারজূহ হওয়া কি আল্লাহ বা রাসূল সাঃ সাব্যস্ত করেন? না হাদীস বাতিল ও আমল করার ক্ষেত্রে নিজেদের অনিরাপদ সীদ্ধান্তের সাহায্য গ্রহণ করেন? সুনিশ্চিতভাবে আপনারা নিজেদের বা কোন উম্মতীর সীদ্ধান্তের উপরই আমল করে থাকেন। যদি তা’ই হয়, তাহলে আপনারা নিজেদের আহলে হাদীস বলেন কেন? কাজ করে করেন রায় তথা কিয়াস দ্বারা আর দাবী করেন আহলে হাদীস এটা কোন ধরণের আচরণ? তাহলে আল্লাহ তাআলার বাণী لم تقولون ما لا تفعلون তথা তোমরা কেন তা বল যা কর না? {সূরা সফফ-২} কেন আপনাদের স্মরণ থাকে না? এ বিষয়টি একটু পরিস্কার করে বলুনতো-

প্রথম মূলনীতি

লোকটি বলতে লাগলঃ “আমাদের প্রথম মূলনীতি হল, যে হাদীসের সনদ অধিক সহীহ আমরা এর উপর আমল করে থাকি। আর অন্য হাদীসের উপর আমল করি না। সনদ অধিক সহীহ হাদীস ছেড়ে যারা অন্য হাদীসের উপর আমল করে থাকে, তাদের আমরা হাদীসের উপর আমলকারী মনে করি না”।

আমি বললামঃ “ইমাম বুখারী রহঃ বলেছেন যে, হযরত আনাস রাঃ এর হাদীস “আসনাদ” তথা সনদের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী। যে হাদীসে এসেছে যে, “উরু সতরের অন্তর্ভূক্ত নয়”। এর মানে হল, উরু ঢাকা জরুরী নয়। আর জারহাদ এর হাদীস যাতে এসেছে যে, “উরু ঢাকা জরুরী” সেটি আহওয়াত তথা অধিক সতর্কতমূলক। অর্থাৎ এর উপর আমল করাটা সতর্কতামূলক। এভাবে আমরা উম্মতের মতবিরোধ এড়াতে পারি। {সহীহ বুখারী-১/৫৩, সালাত অধ্যায়, উরু সম্পর্কে বর্ণনার পরিচ্ছেদ}

তাহলে খেলার মাঠে যে সকল ছেলে মেয়েরা উরু বের করে খেলাধোলা করে থাকে, তারা উঁচু পর্যায়ের আহলে হাদীস? কারণ তারা সনদের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী হাদীসের উপর আমল করছে! আর আপনারা যারা উরু ঢেকে নামায পড়েন, এখনো উরু ঢেকে আছেন তারাতো কেউ আর আহলে হাদীস বাকি থাকেন না”।

আমরা কথা শুনে লোকটি পেরেশান হয়ে যায়। আমি তাকে বললামঃ “আপনার মূলনীতিটিও তো আপনাদের রায়ের উপর নির্ভরশীল, কুরআন বা সহীহ হাদীসের উপর নয়, তাই আপনি না আহলে হাদীস না আহলে রায়”।

দ্বিতীয় মূলনীতি

লোকটি এবার বলতে লাগলঃ “আমাদের দ্বিতীয় মূলনীতি হলঃ যখন মুত্তাফাক আলাই হাদীস পাওয়া যায়, অর্থাৎ যে হাদীস ইমাম বুখারী রহঃ এবং ইমাম মুসলিম রহঃ তাদের কিতাবে বর্ণনা করেছেন। তাহলে উক্ত হাদীসের উপর করা ফরজ বলে আমরা মেনে থাকি। আর এ দুই কিতাবের বিপরীত বর্ণনা যেসব হাদীসের কিতাবে আছে, সেসবের উপর আমরা কখনোই আমল করি না”।

আমি বললামঃ “এ মূলনীতি আল্লাহ তাআলা বলেছেন, না রাসূল সাঃ বলেছেন, না সাহাবায়ে কেরাম নির্ধারণ করেছেন, না মুজতাহিদ ইমামগণ নির্ধারণ করেছেন। হাফেজ আবু বকর মুহাম্মদ বিন মুসা আলহাযেমী আশশাফেয়ী রহঃ এর ওফাত ৪ বা ৫ হিজরীতে হয়েছে। তিনি শাফেয়ী মূলনীতি অনুযায়ী ৫০টি মূলনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু এ মূলনীতি একদমই উল্লেখ করেন নি যে, যে হাদীস বুখারী ও মুসলিমে পাওয়া যাবে সেটাই রাজেহ তথা প্রধান্য পাবে। আর শাইখুল ইসলাম ওয়ালা মুসলিমীন আল্লামা ইবনুল হুমাম রহঃ তো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, تحكم لا يجوز التقليد فيه এ বক্তব্যটি সম্পূর্ণ বে-ইনসাফী এবং এটা মানা জায়েজ নয়। {হাশিয়ায়ে বুখারী-১/১৫৮}

যাইহোক লোকটি একথার উপর খুবই জোর দিল যে, তারা মুত্তাফাক আলাই হাদীসের উপর করে থাকেন। আর এর বিপরীত অন্য কিতাবের হাদীসকে ছেড়ে দেন। আমি তাকে বললামঃ আপনার এ কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। প্রমাণ দেখুনঃ

রাসূল সাঃ এর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা বুখারী শরীফের ১ম খন্ডের ৩৬ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিম শরীফের ১ম খন্ডের ১৩৩ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। {দেখুন-সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২২,২২৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৪৭}

কিন্তু আহলে সুন্নাতের চার মাযহাবের কোন মাযহাবে একথা বলা নেই যে, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা ফরজ আর বসে প্রস্রাব করার হাদীস যেহেতু মুত্তাফাক আলাই নয়, তাই বসে প্রস্রাব করার হাদীস মুত্তাফাক আলাই হাদীসের বিপরীত হওয়ার কারণে বসে প্রস্রাব করা হারাম।

আপনারাও তো একথা বলেন না যে, ইংরেজরা যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে, তাই তারা পাক্কা আহলে হাদীস! আর আমরা যারা বসে বসে প্রস্রাব করে থাকি, তারা হাদীসের বিরুদ্ধবাদী!

ইমাম বুখারী রহঃ এর ছাত্র ইমাম তিরমিজী রহঃ এ মুত্তাফাক আলাই হাদীসের বিপরীত অধ্যায় পরিচ্ছেদ নির্ধারণ করেছেন باب النهى عن البول قائما তথা দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা নিষেধ হওয়ার বর্ণরা। তিনি  আরো বলেনঃ আমার নিকট দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা হারাম নয়, তবে আদবের পরিপন্থি। তবে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ বলেন যে, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা জুলুম। {তিরমিজী-১/৯, হাদীস নং-১২}

বুখারীর ১ম খন্ডের ৩১ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ১২৩ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূল সাঃ অজু করার সময় হাতের তালুতে পানি নিয়ে একই সাথে কুলি ও নাকে পানি দিতেন।  {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৮৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৭৮} কুলি ও নাকে পানি দেয়ার জন্য আলাদা আলাদা পানি নেয়ার বর্ণনা না বুখারীতে আছে, না মুসলিমে আছে। কিন্তু ইমাম তিরমিজী রহঃ ইমাম শাফেয়ী রহঃ থেকে বর্ণনা করেন যে, وقال الشافعي إن جمعهما في كف واحد فهو جائز وإن فرقهنا فهو أحب إلينا  অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী রহঃ বলেনঃ মুত্তাফাক আলাই হাদীসটির উপর আমল করে এক পানিতে কুলি ও নাকে পানি দেয়া জায়েজ, তবে আলাদা পানি নেয়া অধিক উত্তম। {সুনানে তিরমিজী-১/৮৪, হাদীস নং-২৮}

বুখারীর ১ম খন্ডের ১২২ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ১২৮ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ যদি বেশি কষ্ট না হতো, তাহলে আমি প্রত্যেক নামাযের সাথে মেসওয়াক করার হুকুম দিতাম। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৮৪৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬১২}

ইমাম তিরমিজী রহঃ বলেন যে, এ হাদীস আঠার জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২২} কিন্তু তারপরও অধিকাংশ লোক নামাযের বদলে অজুর সাথে মেসওয়াক করে থাকে। কিন্তু কেউতো তাদের গোনাহগার বলে না। হাদীসে বলেছে নামাযের সাথে মেসওয়াকের কথা, আর করা হয় অজুর সাথে, এ উল্টো আমল কেন করা হয়?

বুখারীর ১ম খন্ডের ৭৪ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ২০৫ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই হাদীস হল- রাসূল সাঃ নামাযের মাঝে স্বীয় নাতি উমামাকে বহন করে নামায পড়তেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৯৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১২৪০} আর বাচ্চাদের বহন করা ছাড়া নামায পড়ার কোন স্পষ্ট বর্ণনা না বুখারীতে আছে, না মুসলিমে আছে। তাহলে কি যে সকল নামাযীগণ বাচ্চাদের বহন করা ছাড়া নামায পড়ে থাকে, তা মুত্তাফাক আলাই হাদীসের বিপরীত হওয়ার কারণে তাদের নামায বাতিল?

বুখারী ১ম খন্ডের ৫৬ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ২০৮ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল সাঃ জুতা পরিধান করে নামায পড়তেন। জুতা খুলে নামায পড়ার কোন স্পষ্ট বর্ণনা বুখারী ও মুসলিমের কোথাও নেই। তাহলে কি যেসব খৃষ্টানরা জুতা পরিধান করে নামায পড়ে থাকে, তারা সকলে আপনাদের নিকট পাক্কা আহলে হাদীস? আর যেসব গায়রে মুকাল্লিদরা জুতা খুলে নামায পড়ে থাকে, তারা মুত্তাফাক আলাই হাদীসের উপর আমল না করার কারণে মুনকিরে হাদীস তথা হাদীস অস্বিকারকারী?

আপনারা কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে ডান হাতকে বাম কনুইয়ের উপর রেখে সিনার উপর হাত বেঁধে থাকেন।  আর এটাকে সুন্নতে মুআক্কাদা বলে থাকেন। অথচ এ অবস্থার কোন হাদীস বুখারী মুসলিমের কোথাও নেই।

বুখারীর ১ম খন্ডের ৫৫ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ১৬৪ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই হাদীসে যে আজানের কথা এসেছে, তাতে তারজী’ নেই। অথচ আপনাদের গায়রে মুকাল্লিদওয়ালা মসজিদের আজানের মাঝে তারজী’ দিয়ে মুত্তাফাক আলাই হাদীসের সাথে বিরোধীতা করা হয় কেন?

৮, ৯, ১০

সমগ্র উম্মত সানার সময় “সুবহানাকাল্লাহুম্মা ” আর রুকুর সময় “সুবহানা রাব্বিয়াল আজীম” আর সেজদার সময় “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” বলে থাকে। যা বুখারী মুসলিমের মারফূ হাদীসে বর্ণিত নয়।

অথচ বুখারীর ১ম খন্ডের ১০৩ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ২১৯ পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই বর্ণনায় সানার সময় “সুবহানাকাল্লাহুম্মা” এর স্থলে এসেছে “আল্লাহুম্মা বায়িদ বাইনী”। আর বুখারীর ১মম খন্ডের ১০৯ নং পৃষ্ঠা এবং মুসলিমের ১ম খন্ডের ২১৩ নং পৃষ্ঠার মুত্তাফাক আলাই বর্ণনায় রুকু ও সেজদার তাসবীহ “সুবহানা রাব্বিয়াল আজীম” ও “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” এর বদলে অন্য তাসবীহের কথা এসেছে।

এসব মুত্তাফাক আলাই বর্ণনার উপর আমল না করার কারণে কি পুরো উম্মত গোনাহগার হচ্ছে?

তৃতীয় মূলনীতি

বলতে লাগলঃ “আমাদের নিকট মূলনীতি হলঃ যেদিকে হাদীস বেশি সেটার উপর আমল করে থাকি, আর যেদিকে হাদীস কম সেটাকে ছেড়ে দেই”।

আমি বললামঃ-

ইমাম বুখারী রহঃ সহীহ বুখারীর ১ম খন্ডের ৪৩ নং পৃষ্ঠায় হযরত উসমান রাঃ, হযরত আলী রাঃ, হযরত জুবায়ের রাঃ, হযরত তালহা রাঃ, হযরত উবাই বিন কা’ব রাঃ, হযরত আবু আইয়ুব রাঃ, এ ছয়জন সাহাবী থেকে হাদীস এনেছেন যে, যদি কেউ বিবির সাথে সহবাস করে, আর বীর্যপাত হওয়ার আগেই আলাদা হয়ে যায়, তাহলে উক্ত ব্যক্তির উপর গোসল করা ওয়াজিব নয়। এ ছয়জনের বিপরীত এক হযরত আবু হুরায়রা রাঃ এর হাদীস এনেছেন। যাতে এসেছে যে, এরকম অবস্থায় গোসল ওয়াজিব হয়ে যায়।

এখানে অধিক বর্ণনা গোসল ওয়াজিব না হওয়ার পক্ষে থাকলেও সবাই এক বর্ণনার উপর নির্ভর করে বলছেন যে, গোসল ফরজ হয়ে যাবে। তাহলে আপনার মূলনীতি গেল কোথায়?

রাসূল সাঃ এর জুতা পরিধান করার হাদীস সনদের দিক থেকে মুতাওয়াতির। এ কারণেই গায়রে মুকাল্লিদ শায়েখ আলবানী লিখেছেনঃ وهو حديث متواتر كما ذكره الطحاوى অর্থাৎ এ হাদীসটি মুতাওয়াতির। যেমনটি বলেছেন ইমাম তাহাবী রহঃ। {সিফাতু সালাতিন নবী-৭০}

অথচ পুরো উম্মতের আমল হল এর বিপরীত। পুরো উম্মত থেকে নামাযে জুতা খুলে নামায পড়ার বিষয়টি আমল হিসেবে মুতাওয়াতির। সকল উম্মতের মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত্ব যে, রাসূল সাঃ এর জুতা পরিধান করে নামায পড়ার আমলটি একটি বিরল আমল ছিল। আর কখনো কখনো বিরল আমলের বর্ণনাও অনেক হয়ে যায়। তাই তাহক্বীক ছাড়া হাদীস বেশি দেখেই আমল করার মানসিকতা রাখাটা বোকামী বৈ কিছু নয়”।

আমি তাকে বললামঃ “দেখুন! আমাদের এখানে লোকেরা নাভীর নিচে হাত বেঁধে নামায পড়ে। এটি একটি পরিচিত আমল। তাই এটি বর্ণনা করার কোন দরকার নেই। কিন্তু যদি দুই একজন ব্যক্তি মাথার উপর হাত বেঁধে নামায পড়ে কয়েকদিন, তাহলে একথা পুরো শহরময় বর্ণিত হয়ে বেড়াবে। সবাই এটাকে বলতে শুরু করে দিবে। তাই বুঝা গেল যে, বর্ণনা অধিক হওয়ার দিকে লক্ষ্যা করা উচিত নয়। বরং অধিক আমল হওয়ার দিকে লক্ষ্য করা উচিত।

এ কারণেই রাসূল সাঃ এর জুতা পরিধান করে নামায পড়ার বিষয়টি যদিও খুব বিরল আমল ছিল। কিন্তু তারপরও তা পঞ্চাশের অধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন। অথচ জুতা খুলে নামায পড়ার বিষয়, যা রাসূল সাঃ এর সাধারণতঃ আমরণ আমল ছিল, সেটির বর্ণনা মাত্র দুই চার সাহাবী করেছেন।

এ কারণেই মূলনীতিবীদ উলামায়ে কেরাম লিখেছেন যে, الترجيح لا يقع بفضل عدد الرواة তথা সংখ্যাধিক্য তারজীহ তথা প্রধান্য পাওয়ার কারণ নয়। {নূরুল আনওয়ার-২০০}

এমনিভাবে সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করার হাদীস অনেক। এ কারণেই শায়েখ আলবানী লিখেছেনঃ وقد روى هذا الرفع عن عشرة من الصحابة তথা এ রফয়ে ইয়াদাইন দশ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। {সিফাতু সালাতিন নাবী-১৪৬} এমনিভাবে গায়রে মুকাল্লিদদের নিকট মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফক্বীহ ও উসূলী আবুল মুহাম্মদ আব্দুল হক আলহাশেমী আসসালাফী [মৃত্যু ১৩৯২ হিজরী] সাহেব স্বীয় কিতাব “ফাতহুল ওদূদ ফী তাহক্বীকি রফয়ে ইয়াদাইন ইনদাস সুজূদ” গ্রন্থে হযরত মালিক বিন আনাস রাঃ, হযরত আনাস বিন মালিক আনসারী রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ, হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ, হযরত উমায়ের বিন হাবীব রাঃ, হযরত হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ, হযরত ওয়াইল বিন হুজুর রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর বিন খাত্তাব রাঃ এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাঃ এ নয়জন সাহাবী থেকে সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করার হাদীস একত্র করেছেন।

এমনিভাবে প্রসিদ্ধ গায়রে মুকাল্লিদ আলেম আবু হাফস বিন উসমান আলউসমানী সাহেব স্বীয় রেসালা “ফজলুল ওদূদ ফী তাহক্বীকে রফয়ে ইয়াদাইন লিস সুজূদ” এ উল্লেখিত নয়জন সাহাবীর হাদীস এনেছেন। আর ফাতাওয়া উলামায়ে হাদীস এর ৪ নং খন্ডের ৩০৬ নং পৃষ্ঠায় লিখা হয়েছে যে, রফয়ে ইয়াদাইন [সেজদার সময়] মানসূখ তথা রহিত হয়নি। বরং এটা রাসূল সাঃ এর শেষ সময়ের আমল এটা ছিল। কেননা, মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ রাসূল সাঃ এর শেষ বয়সে মদীনায় সাক্ষাৎ করে। এরপর এমন কোন স্পষ্ট হাদীস পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এটি রহিত হওয়ার কথা বুঝা যায়। {আব্দুল হক্ব ওয়া ফায়যুল কারীম সিন্ধী}

এবার লক্ষ্য করুন! সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করার হাদীস অনেক। এরপরও অধিকাংশ হাদীসকে ছেড়ে দিয়ে কম হাদীসের উপর করে সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদানইনকে বর্জন করা হচ্ছে। তাহলে আপনারা মূলনীতি গেল কোথায়”।

এবার লোকটি উদভ্রান্ত হয়ে বলতে লাগলঃ “আচ্ছা! তাহলে আপনাদের কাছে তারজীহ তথা প্রধান্য পাওয়ার মূলনীতি কি?”

আমাদের মূলনীতি

আমি বললামঃ “আমাদের মূলনীতিতো একেবারে স্বভাবজাত ও সহজবোধ্য। কুরআন ও হাদীসের ব্যাপারে আমাদের মূলনীতি একটিই। যেমন মতভেধপূর্ণ হাদীস আছে। ঠিক তেমনি কুরআনে কারীমেরও মতভেদপূর্ণ কেরাত সাতটি। আমরা সেই সাত কেরাতের মাঝে একটি কিরাতের উপর তেলাওয়াত করে থাকি। যেটি সর্বত্র সাধারণ ও উলামা সকলের নিকটই মুতাওয়াতির। আর সেটি হল আবু আসেম কুফী রহঃ এর কেরাত এবং কারী আবু হাফস কুফী রহঃ এর বর্ণনা।

ঠিক একইভাবে আমরা মতভেদপূর্ণ হাদীসের ব্যাপারে মুজাতাহিদ ইমামগণ যে তারজীহ তথা প্রাধান্য দিয়েছেন, আমরা সেটি মেনে থাকি। আর আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মাঝে চারটি মাযহাব তথা হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী। যেভাবে আমরা কুরআনে কারীমের সাত কিরাতের মাঝে আমরা সেই কেরাতেই তেলাওয়াত করে থাকি, যেটি এখানে তিলাওয়াত হিসেবে মুতাওয়াতির। ঠিক তেমনি রাসূল সাঃ এর সুন্নত চার মাযহাবের ইমামগণ সংকলিত করেছেন। তাদের মাঝে আমাদের এখানে যেহেতু শুধুমাত্র হানাফী মাযহাবের পদ্ধতিই আমল ও শিক্ষায় সাধারণ ও উলামাগণের নিকট মুতাওয়াতির। এ কারণে আমরা যে সকল হাদীসকে হানাফী মাযহাবের ইমামগণ তারজীহ দিয়ে আমল করেছেন, এবং সে সকল হাদীস আমাদের এখানকার মুহাদ্দিসীন, ফুক্বাহা, আউলিয়ায়ে কেরাম, এবং সাধারণ্যের মাঝে আমল হিসেবে মুতাওয়াতির হয়েছে। আমরা সেগুলোকে রাজেহ হিসেবে আমল করি। আর বাকিগুলোকে মারজূহ মনে করে ছেড়ে দেই।

হযরত আসেম রহঃ এর কেরাত আমাদের এখানে তিলাওয়াত হিসেবে মুতাওয়াতির হওয়ার কারণে যেমন আমাদের কুরআনে কারীমের তেলাওয়াত সঠিক ও নির্ভূল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। ঠিক তেমনি আমাদের এখানে ফুক্বাহায়ে কেরাম ও সাধারণ মানুষের আমলের মুতাওয়াতির সূত্রে পৌঁছা নামাযের ব্যাপারেও কোন সন্দেহ নেই।

বিতর্ক

লোকটি আমার কথা শুনছিল। মুচকি মুচকি হাসছিল। অবশেষে বলতে লাগলঃ “আপনি রফয়ে ইয়াদাইনের কথা বললেন। আমি এই মাত্র একটি ক্যাসেট শুনে এলাম। যাতে আপনি শিয়ালকোটে রফয়ে ইয়াদাইন বিষয়ে একটি বিতর্কে পরাজিত হয়ে এসেছেন”।

আমি তাকে বললামঃ “পরাজয় কি প্রশ্নকারীর হয়? না দাবীকারীর? দাবীকারী যদি নিজের দাবী প্রমাণিত করতে পারে, তাহলে সে জিতে গেছে। আর যদি প্রমাণিত না করতে পারে, তাহলে সে হেরে গেছে। আমিতো উক্ত বিতর্কে প্রশ্নকারী ছিলাম। তাদের দাবীর স্বপক্ষে প্রমাণ চেয়েছিলাম। যা তারা উপস্থান করতে পারে নি। আর কিয়ামত পর্যন্ত তা পারবেও না ইনশাআল্লাহ।

শর্তসমূহ

আমি লিখিয়েছিলাম যে, আহলে হাদীসরা নিজেদের বৈশিষ্ট এই বলে থাকে যে, “আমরা শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর কথাই দলীল হিসেবে মেনে থাকি। কোন উম্মতীর কথা মানা তাকলীদ এবং শিরক। এ কারণে আমি গায়রে মুকাল্লিদ বিতার্কিক আল্লাহ ও রাসূল সাঃ ছাড়া কোন উম্মতীর কথা উপস্থাপন করবো না”।

আমি তাদের বলেছিলামঃ “তারা হাদীসের সহীহ, জঈফ এর সংজ্ঞা আল্লাহ ও রাসূল সাঃ থেকে পেশ করবে। কোন হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলতে চাইলে তা আল্লাহ ও রাসূল সাঃ থেকে প্রমাণিত করতে হবে। যদি তারা নিজেদের রায় বর্ণনা করবে, বা কোন উম্মতীর রায় পেশ করবে তখনি বিতর্ক খতম হয়ে যাবে। কেননা, তখন সে আর আহলে হাদীস হিসেবে আর বাকি থাকছে না। বরং মুশরিক হয়ে যাচ্ছে। মুশরিক আহলে হাদীসের সাথে বিতর্ক কী করে হতে পারে?

গায়রে মুকাল্লিদ হিসেবে তাদের উচিত কুরআন ও হাদীস থেকেই দলীল দিবে। তদুপরি তারা বলে থাকে যে, তাদের দ্বীন নাকি মক্কা মদীনাওয়ালা আর হানাফীদের দ্বীন কুফাওয়ালা। তাই তাদের কুরআনে কারীমের কোন আয়াত পড়ার কোন অধিকার নেই যে কেরাত কারী আসেম কুফী রহঃ এর কেরাত হবে। তারা কেবল মক্কা ও মদীনাওয়ালা কারীর কুরআনে কারীমের কেরাত পড়বে। আর প্রতিটি আয়াত সনদসহ বলতে হবে। কারণ মক্কা মদীনার কারীদের কেরাত এখানে মুতাওয়াতির নয়। এ কারণে এ কেরাতের সনদ জরুরী। আর হাদীসও এমন কিতাবের শুনাবে যেটা লিখেছেন মক্কার বা মদীনার অধিবাসী। আর ঐতিহাসিক সূত্রে প্রমাণিত করবে উক্ত হাদীস সংকলক না মুজতাহিদ ছিলেন না মুকাল্লিদ ছিলেন। বরং তিনি গায়রে মুকাল্লিদ ছিলেন। কেননা, তাদের নিকট কিয়াসকারী তথা মুজতাহিদ ব্যক্তি শয়তান। আর তাকলীদকারী ব্যক্তি মুশরিক। তাই তারা এমন কোন হাদীস পেশ করতে পারবে না, যে কিতাবের সংকলক মুজতাহিদ বা মুকাল্লিদ ছিলেন।

আমার এসব শর্ত মানতে তারা একদম অস্বিকার করে বসল। এবার আপনিই বলুন! এটা কি তাদের বিজয় ছিল না পরাজয়?”

এবার লোকটি বলতে লাগলঃ শর্তগুলোতো আপনি সহীহই উপস্থাপন করেছেন। কেননা, ওয়াদা পূর্ণ করার তাগীদ কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট। আর তারাতো এটাই বলে যে, “আমরা শুধু কুরআন ও হাদীস মানি। আমরা মক্কা মদীনাওয়ালা। তাকলীদ শিরক”। আর আপনিতো তাদের শুধু তাদের ওয়াদা পূর্ণ করার ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মাত্র। তাদের এসব শর্ত মানা উচিত ছিল। কিন্তু সত্য কথা হল এসব ওয়াদা তারা কোনদিন পূর্ণ করতে পারবে না”।

আমি বললামঃ “তাহলে তারা মিথ্যা ওয়াদাকারী সাব্যস্ত হল। আর যে দল স্বীয় ওয়াদা পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়, তারা কি বিজয়ী না পরাজিত”?

লোকটি বললঃ “পরাজিত”।

নতুন শর্তসমূহ

আমি বললামঃ “তারপর তারা শোরগোল শুরু করে দিল। বলতে লাগলঃ বিতর্কের শর্ত আগে থেকেই ঠিক করা আছে। আর সেটা হল সিহাহ সিত্তাহ তথা বুখারী [২৫৬হিজরী], মুসলিম [২৬১ হিজরী], আবু দাউদ [২৭৫ হিজরী], তিরমিজী [২৭৯ হিজরী], নাসায়ী [৩০৩ হিজরী] ও ইবনে মাজাহ [২৭৩ হিজরী] থেকে দলীল দেয়া যাবে”।

আমি বললামঃ “এ শর্ত না আমি ঠিক করেছি। না এ ব্যাপারে আমাকে জানানো হয়েছে। আর এতে খাইরুল কুরুনে লিখা কোন কিতাবই নেই। আর এসবের মাঝে কোন একটি কিতাবও না আহলে মক্কার কেউ লিখেছেন না আহলে মদীনার কেউ লিখেছেন। আর উল্লেখিত কিতাবের সংকলকের কারো ব্যাপারে আপনারা একথা প্রমাণ করতে পারবেন না যে, তারা কেউ ইজতিহাদের যোগ্যতাও রাখতেন না, আবার আবার কারো তাকলীদও করতেন না তাই তারা গায়রে মুকাল্লিদ ছিলেন। নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান সাহেব “ইতহাফুন নুবালা” গ্রন্থের ৪২৪ এবং শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী রহঃ “ইযালাতুল খাফা” এর ১ম খন্ডের ২৭১ নং পৃষ্ঠায় সিহাহ সিত্তার সকল সংকলককে ফার্সি বংশোদ্ভূদ বলে উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই আপনাদের হাকীকী ভাই আহলে কুরআনের লোকেরা আপনাদের প্রতি অভিযোগ উত্থাপন করে বলে যে, “আরবী কুরআনের পরিবর্তে কেন ছয়টি অনারবী কুরআন বানিয়েছো?”

আরবের কিতাব না হওয়ার কারণে ওসব কিতাব থেকে আপনাদের দলীল দেয়ার কোন অধিকার নেই।

রইল হানাফীদের বিষয়; আমি কতটুকু ইনসাফের কথা বলেছি। তাদের বলেছি যে, আপনারা গায়রে মুকাল্লিদ তাই আপনাদের উপর আবশ্যক হল এমন কিতাব থেকে হাদীস দেখাবেন, যে কিতাবের সংকলক না মুজতাহিদ ছিলেন না মুকাল্লিদ ছিলেন। বরং তিনি গায়রে মুকাল্লিদ ছিলেন। এমনিভাবে আপনারা একথা আমাকেও বলতে পারেন যে, আমি দলীল কেবল ওসব কিতাব থেকে পেশ করবো যার সংকলক হানাফী। যদি হানাফী নিজেই শাফেয়ী বা অন্যান্য মাযহাবের সংকলকের কিতাব থেকে দলীল দেয় তাহলে সে মাযহাবের বড়ত্বের প্রমাণ। তাই আমাকে কেবল হানাফীদের সংকলনকৃত হাদীসের কিতাব থেকেই দলীল দিতে বাধ্য করবে। বলবে যে, আমি কেবল মুসনাদে ইমামে আজম, কিতাবুল আসার লি আবীইউসুফ, কিতাবুল আসার লিইমাম মুহাম্মদ, মুয়াত্তা মুহাম্মদ, কিতাবুল হুজ্জাত লিইমাম মুহাম্মদ, শরহু মাআনিল আসার লিততাহাবী, মাশকিলুর আসার লিততাহাবী ইত্যাদি কিতাব থেকেই দলীল দিতে পারবো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, তারা হক ও ইনসাফকে মানলেতো!

অবশেষে আমি হাদীস পড়লামঃ রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ كل شرط ليس فى كتاب الله فهو باطل তথা প্রত্যেক ঐ শর্ত যা আল্লাহ কিতাবে নেই, তা বাতিল। {সিহাহ সিত্তাহ} আমি যখন বারবার হাদীসটি শুনাচ্ছিলাম। তখন নামধারী আহলে হাদীসদের ঘাম ঝরছিল। না পারছিল পালাতে না পারছিল কিছু বলতে। যদি হাদীস মানে, তাহলে তাদের শর্ত যাচ্ছে বাতিল হয়ে। আর যদি হাদীসটি অস্বিকার করে, তাহলে আহলে হাদীসের বদলে মুনকিরে হাদীস তথা হাদীস অস্বিকারকারী সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

এবার তাদের মিথ্যা আহলে হাদীস হওয়ার বিষয়টি একদম দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই বশীর কাসেমী সাহেব মিনতী করে বলেন যে, “শর্ত থেকে আমাদের বাঁচাও। আর মুনাজারা শুরু কর”।

এটা তাদের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের অপমানকর অবস্থা ছিল না?”

একটি মিথ্যাচার!

 এবার সে বলতে লাগলঃ “তোমাদের উসূলের কিতাব “মুআল্লামুস সুবূত” এ লিখা আছে যে, মুকাল্লিদ না কুরআন থেকে দলীল নিতে পারে, না হাদীস থেকে। তার দলীল কেবল তার ইমামের বক্তব্য। তাহলে আপনি কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল দেন কেন?”।

আমি বললামঃ “একদম ডাহা মিথ্যা কথা যে, মুকাল্লিদ কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল নিতে পারে না। আমাদের নিকটতো মুয়াজ রাঃ এর হাদীসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ তখনই জায়েজ যখন কোন বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের কোন স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকে। যদি থাকে তাহলেতো ইজতিহাদের প্রশ্নই উঠে না। এ কারণেই ইজতিহাদী বিষয়ে মুকাল্লিদের নিকট মুজতাহিদের বক্তব্য দলীল। তাই গায়রে মুকাল্লিদ ভাইদের উপর দায়িত্ব হল, তারা আমাদের উপস্থাপিত হাদীসের সহীহ জঈফ হওয়া হয়তো আল্লাহ তাআলার বক্তব্য দ্বারা সহীহ/জঈফ প্রমানিত করবেন। নতুবা রাসূল সাঃ এর বক্তব্য দ্বারা সহীহ/জঈফ প্রমাণিত করবেন। যদি কোনটাই না পারেন। তাহলে আপনাদের কোন অধিকার নেই যে, কোন হাদীসকে সহীহ বা জঈফ বলার। হ্যাঁ, তবে আমাদের বিরুদ্ধে কোন হাদীসকে সহীহ বা জঈফ প্রমাণ করতে আমাদের ইমাম থেকে উক্ত হাদীসের সহীহ জঈফ সম্বলিত বক্তব্য উপস্থাপিত করলে বা ইমামের ফাতওয়া উল্লেখ তা আমাদের বিরুদ্ধে ইলজামী দলীল হবে।

কিন্তু আপনিতো ক্যাসেট শুনেছেন! সেখানে কি লোকটি কোন একটি হাদীসকে আল্লাহ বা রাসূল সাঃ থেকে সহীহ বা জঈফ প্রমাণ করতে পেরেছে?

লোকটি বললঃ “একেবারেই না”।

আমি বললামঃ “সে কোন একটি হাদীসকে আমার ইমাম রহঃ এর বক্তব্য অনুপাতে সহীহ বা জঈফ প্রমাণ করতে পেরেছে?”

লোকটি বললঃ “এটাতো সে ব্যক্তির শোচনীয় পরাজয়”।

মূল মাসআলা

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “আপনি ভাল করেই জানেন যে, চার রাকাত নামাযে তারা আঠার স্থানে কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠিয়ে রফয়ে ইয়াদাইন করাকে সুন্নত পরিপন্থী বলে থাকে। আর চার রাকাত নামাযে দশ স্থানে সর্বদা কাঁধ পর্যন্ত উঠানোকে সুন্নতে মুআক্কাদা বলে থাকে। আর যারা এ রফয়ে ইয়াদাইন করে না, তাদের নামায হয় না বলে থাকে। এটি তারা সর্বস্থানে করে থাকে। কিন্তু গায়রে মুকাল্লিদ বিতার্কিক লোকটি একবারও স্বীয় জবানে এ দাবীটি বর্ণনা করেনি। অথচ আমি তাদের প্রতিটি বক্তৃতায় তাদের একথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তাদের জিহবাই পুড়ে যেত যদি একবার তাদের পুর্ণ দাবীটি বর্ণনা করতো। তারা এমনটি করলো না কেন? এ কারণে যে, তাদের এ পূর্ণ দাবীর পক্ষে একটি হাদীসও নেই”। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “আপনি কি তার মুখে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ দাবীটি ক্যাসেটে একবার হলেও শুনেছেন?”

লোকটি বললঃ “বিলকুল না”।

আমি বললামঃ “এটা কি নিজেদের কাপুরুষতা এবং অপমানের পরিচয়বাহী নয়?”

লোকটি বললঃ “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন”।

সুন্নতে মুআক্কাদা

আমি তাকে বললামঃ “সেতো দাবী খুব জোরে শোরে করেছে যে, এ রফয়ে ইয়াদাইন সুন্নতে মুআক্কাদা। কিন্তু এ সুন্নতে মুআক্কাদার হুকুম সে না আল্লাহ থেকে দেখাতে পেরেছে না রাসূল সাঃ থেকে দেখাতে পেরেছে। না সে আল্লাহ ও রাসূল সাঃ থেকে সুন্নতের কোন পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। সেতো নিজের অজ্ঞতা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের উপর এতটাই নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, সে উম্মতীদের উসূলে ফিক্বহ থেকেও সুন্নতে মুআক্কাদা সংজ্ঞা বলতে পারেনি। কেননা, সংজ্ঞা বলার পর রফয়ে ইয়াদাইনকে সুন্নতে মুআক্কাদা প্রমাণ করা সম্ভবই নয়।

হাদীস

পূর্ণ বিতর্কে সে সহীহ ও জঈফের সংজ্ঞাইতো কুরআন ও হাদীস থেকে দেখাতে পারেনি। আপনি কি ক্যাসেটে এসবের সংজ্ঞা শুনেছেন?” লোকটি বললঃ “একদম না”। আমি বলরামঃ “এরকম বিতার্কিকের লজ্জায় ডুবে মরা উচিত নয় কি?”। লোকটি বললঃ “ঠিকই বলেছেন”।

আমার প্রশ্ন

আমার প্রশ্ন, যা আমি আমার প্রতিটি বক্তৃতায় কতবার কত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় বলেছি যে, যেমন আমাদের কালিমা স্বীকার করা [আল্লাহকে] ও [গাইরুল্লাহকে] অস্বিকার করার সমন্বয়ে গঠিত। ঠিক তেমনি আপনারা আপনাদের দাবীর প্রমাণিত ও অপ্রমাণিত উভয় অংশের পূর্ণাঙ্গ দলীল দিন। বলুন যে, রাসূল সাঃ চার রাকাত নামাযে আঠার স্থানে [যথা দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাকাতের শুরুতে ৮ সেজদার আগে ও পরে] রফয়ে ইয়াদাইন করতে নিষেধ করেছেন, আর দশ স্থানে [যথা প্রথম ও তৃতীয় রাকাতের শুরুতে, আর চার রুকুর শুরুতে ও উঠতে] কাঁধ পর্যন্ত রফয়ে ইয়াদাইন করতে হুকুম দিয়েছেন। আর সাথে সাথে রাসূল সাঃ সর্বদা এর উপর আমল করেছেন। সাথে একথাও বলেছেন যে, যারা এভাবে রফয়ে ইয়াদাইন না করবে, তাদের নামায হয় না। আর উক্ত হাদীসটিকে আল্লাহ বা রাসূল সাঃ সহীহও বলেছেন।

এরকমভাবে হাদীস উপস্থাপন করলে আমি উক্ত হাদীস শুনার সাথে সাথে কোন প্রকার দলীল খোঁজা ও বিলম্ব করা ছাড়াই চার রাকাত নফল উক্ত পদ্ধতিতে পড়ে নিব। আর মৃত্যু পর্যন্ত উক্ত পদ্ধতির উপরই বহাল থাকবো।

তারা কি কখনো এরকম হাদীস শুনাতে পারবে”?

লোকটি বললঃ “জীবনেও পারবে না”।

আমি বললামঃ “তারা কখনো আমাকে বা আমার কোন সাথীকে কি বাধ্য করে বলেছে যে, তারা এ পাঁচটি বিষয় সম্বলিত একটি হাদীস দেখাবে তাই তারাও এভাবে চার রাকাত নামায পড়বে, আর আমরাও এভাবে চার রাকাত নামায পড়বো?”।

লোকটি বললঃ “কখনোই এমন হয়নি”।

আমি বললামঃ “ঠিক আছে। আমি এখনো এ দাবীর উপর আছি। তাই আমাকে উক্ত ক্যাসেট থেকে এরকম হাদীস দেখান আমি এখনি চার রাকাত নামায উক্ত পদ্ধতিতে পড়বো”।

লোকটি বললঃ “ক্যাসেটেতো এরকম কোন হাদীসের কথা নেই”।

আমি বললামঃ “এর দ্বারাতো একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তাদের নামায পদ্ধতি রাসূল সাঃ থেকে কিছুতেই প্রমাণিত নয়। যদি তাদের নামায সুন্নত অনুপাতে হয়, তাহলে নাউজুবিল্লাহ রাসূল সাঃ এর নামায খেলাফে সুন্নত হবে। আর যদি রাসূল সাঃ এর নামায সহীহ বলাই বাহুল্য সুনিশ্চিতভাবে তা সহীহ-ই, তাহলে তাদের নামায কিছুতেই সহীহ হতে পারে না”।

সাহাবায়ে কেরাম রাঃ

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “আপনি কি পূর্ণ ক্যাসেট শুনেছেন? তাহলে বলুনতো সে কি খোলাফায়ে রাশেদীন এবং বাকি আশারায়ে মুবাশশারা মাঝ থেকে কোন একজন থেকে তাদের আমলের এ পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি দেখাতে পেরেছে”।

লোকটি বললঃ “ না, পারেনি”।

আমি বললামঃ “তাহলেতো তাদের মতে আশারায়ে মুবাশশারার নামাযও খেলাফে সুন্নত হয়ে গেল, তাই নয়কি?”।

লোকটি বললঃ “হ্যা, তাইতো”।

আমি জিজ্ঞেস করলামঃ “কোন একজন মুহাজির, কোন একজন আনসারী, কোন একজন সাহাবী থেকে পূর্ণ বিতর্কের মাঝে সে কি তাদের নামাযের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি দেখাতে পেরেছে”?

-নাতো, পারেনি।

– তাহলে বুঝা গেল যে, তাদের মতে সকল সাহাবাগণ রাঃ খেলাফে সুন্নত নামায পড়তেন। যদিও একটি সুন্নতকেও ছেড়ে দিয়ে থাকেন [নাউজুবিল্লাহ]।

এর দ্বারা একথা পরিস্কার হয়ে গেল যে, তারা [গায়রে মুকাল্লিদ তথা কথিত আহলে হাদীস] যা কিছু তাদের কিতাব, তাদের প্রচারপত্র এবং নিজেদের বক্তৃতায় বলে বেড়ায় যে, রাসূল সাঃ এবং সমস্ত সাহাবাগণ তাদের মত করে নামায পড়েছেন, তা জঘন্য মিথ্যাচার। আল্লাহ তাআলা তাদের মিথ্যা থেকে তওবা করার তৌফিক দান করুন। আর আহলে সুন্নতদের তার প্রোপাগান্ডা থেকে হিফাযত করুন।

আইয়িম্মায়ে কেরাম

তারপর আমি জিজ্ঞেস করলামঃ “পূর্ণ ক্যাসেটে তাদের পূর্ণ দাবীটি কোন চার ইমামের কোন ইমাম থেকে প্রমাণ করতে পেরেছে?”

লোকটি বললঃ “কিছুতেই পারেনি”।

আমি বললামঃ “এর নামই জিতে যাওয়া?!

অংশ বিশেষের প্রমাণ

লোকটি বললঃ “সে যদিও তার পূর্ণাঙ্গ দাবীর উপর দলীল না দিতে পারলেও আলাদা অংশের উপরতো দলীল দেয়ার চেষ্টাতো করেছে”।

আমি বললামঃ “আচ্ছা শোন! এক কাদিয়ানী বলতে লাগল যে, “আমি কুরআনে কারীম থেকে দেকাতে পারবো যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী মসীহ এবং রাসূল ছিল”। যখন তার সামনে কুরআনে কারীম রাখা হল, তখন সে বলতে লাগল যে, “এক স্থান থেকেতো আমার দাবী প্রমাণ করতে পারবো না, তবে ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে দেখাতে পারবো”। তখন সে কুরআনে কারীমের এক স্থান থেকে ‘গোলাম’ শব্দ দেখালো, আরেক স্থান থেকে ‘আহমদ’ আরেক স্থান ‘মাসীহ’ আর আরেক স্থান থেকে ‘রাসূল’ দেখালো। এভাবে দেখানোর ফলে কি তার দাবী প্রমাণিত হয়ে গেছে”?

লোকটি বললঃ “না”।

আমি বললামঃ “কাদিয়ানী লোকটিতো চার স্থান দেখিয়ে নিজের দাবী প্রমাণের ব্যার্থ চেষ্টা করেছে, আর সেতো এটাও করতে পারেনি”।

নিষেধাজ্ঞা

আমি বলেছিলামঃ “যে আঠার স্থানে আপনারা রফয়ে ইয়াদাইন করেন না, এসব স্থানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার শব্দ দেখান। আর নয় স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন নিষেধাজ্ঞার শব্দ আমাদের থেকে দেখে নিন। আর ঐ আঠার স্থানে ক্ষেত্রে রফয়ে ইয়াদাইন রহিত হওয়ার দলীল দেখান, আর আমাদের থেকেও রহিত হওয়ার দলীর দেখে নিন। সেই সাথে ঐ আঠার স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করা হারাম বা মাকরূহ হওয়ার দলীল আমাদের দেখান। আর বাকি নয় স্থানের ক্ষেত্রে আমাদের থেকে হারাম ও মাকরূহের শব্দ দেখে নিন। আর এ আঠার স্থানের ক্ষেত্রে আপনারা রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়ার দলীল দেখান আর আমাদের থেকেও দলীল দেখে নিন।

এবার আপনিই বলুন! আঠার স্থানের মাসআলা বড় না নয় স্থানের? নিশ্চয় আঠার স্থানের। তাই আগে আঠার স্থানের রফয়ে ইয়াদাইন করার মাসআলাটির সমাধান হোক। তারপর নয় স্থানের। এবার আপনি একটি ভেবে চিন্তে বলুনতো! ক্যাসেটে লোকটি কি আঠার স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করার উপর নিষেধাজ্ঞা, রহিত হওয়া, হারাম বা মাকরূহ কিংবা ছেড়ে দেয়া সংক্রান্ত কোন দলীল দেখাতে পেরেছে”।

লোকটি বললঃ “না, দেখাতে পারেনি”।

নামায না হওয়া

তার দাবী- “দশ স্থানে যারা রফয়ে ইয়াদাইন করবে না, তাদের নামায হবে না” এর স্বপক্ষে কোন দলীল পেশ করতে পেরেছে”।

– না, একদম পারেনি।

– হাদীসে মুসীউস সালাত তথা যে হাদীসে রাসূল সাঃ এক গ্রাম্য সাহাবীকে নামাযের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, যে হাদীসটি বুখারী-১/১০৪, ১/১০৯, ২/৯২৪, ২/৯৮৬, মুসলিমের ১/১৭০, তিরমিজীর ১/৬৬, আবু দাউদের ১/১২৪, নাসায়ীর ১/১৪১, ১/১৬১, ১/১৭০, ১/১৯৪ এবং ইবনে মাজাহের ৭৪ নং পৃষ্ঠায় বিদ্যমান। উক্ত হাদীসে গায়রে মুকাল্লিদদের নামাযের ক্ষেত্রে আরকানে আরবাআ তথা চার মূল স্তম্ভ তথা বুকের উপর হাত বাঁধা, আমীন জোরে বলা, ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়া এবং রফয়ে ইয়াদাইন করা ইত্যাদির একটিও বলা হয়নি। কিছু কিছু বর্ণনায়তো একথাও এসেছে যে, রাসূল সাঃ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এভাবে নামায পড়ে নিলে [অর্থাৎ এ চারটি ছাড়াই] নামায পূর্ণ হয়ে যাবে।

মোটকথা সে এ আংশিক দাবীর স্বপক্ষেও দলীল দিতে পারেনি। শুধু শুধুই চিল্লাফাল্লা করে বেড়ায়। ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার একেই বলে।

৯ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করা

গায়রে মুকাল্লিদ বিতার্কিকের মনে হয় দশ পর্যন্ত গণনাও মনে ছিল না, তাই নয় আর দশের পার্থক্য বুঝতে পারেনি। সে দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইনকে সুন্নতে মুআক্কাদা বলে থাকে। আর এর উপরই শেষ পর্যন্ত আমল বাকি ছিল মর্মে দলীল দেখানো তার দায়িত্ব ছিল। সে দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করা সুন্নতে মুআক্কাদা এবং শেষ পর্যন্ত তা বাকি ছিল মর্মে শব্দ দেখাবেতো দূরে থাক, সেতো দশ পর্যন্ত গুনতেই ভুল করছিল। তারপর যখন তাকে বলা হল যে, ইমাম বুখারী রহঃ এ হাদীসকে ইমাম মালিক রহঃ এর সনদে নকল করেছেন। অথচ মুয়াত্তা মালিকে পাঁচ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইনের কথা এসেছে। আর বুখারীতে اذا كبر للركوع তথা “যখন রুকুর জন্য তাকবীর বলবে” শব্দ বলে পাঁচকে নয় বানানো হয়েছে। এছাড়া মদীনার ইমামের লিখা কিতাব মুয়াত্তা মালিকে লিখা হয়েছে رفع يديه তথা “তিনি হাত উঠালেন” শব্দ এসেছে, সেখানে মক্কার বাহিরের লেখকের সংকলিত বুখারীতে كان يرفع يديه তথা “তিনি হাত উঠাতেন” শব্দ বানানো হয়েছে। যার ভুল অনুবাদ করে আপনারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকেন। আপনারা মদীনার সাথে বিদ্রোহ করে পারস্যে কেন গেলেন? [ইমাম বুখারী পারস্যের]

এ তিন জিনিষের কোন জবাব সে ক্যাসেটে দিয়েছে?”

লোকটি বললঃ “নাতো একদমই দেয়নি”।

আমি বললামঃ “দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করার সাথে সুন্নতে মুআক্কাদা শব্দ এবং শেষ সময় পর্যন্ত তা বাকি ছিল মর্মে শব্দ দেখানো জনাবের দায়িত্বে ছিল। কিন্তু সে কিছুই দেখাতে পারেনি। আর আপনিতো ভাল করেই জানেন যে, একটি সুন্নত বাকি থাকলেও নামায খেলাফে সুন্নতভাবে আদায় হয়। নামায তাদের বক্তব্য অনুপাতে সুন্নত অনুযায়ী হওয়ার জন্য এরকম শব্দ হাদীসে থাকা জরুরী। অথচ যেহেতু বুখারী মুসলিমে তা নেই, তাই তাদের মতানুসারে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত খেলাফে সুন্নত নামায পড়েছেন। [নাউজুবিল্লাহ]। কেননা, একটি সুন্নত ছেড়ে দিলেও নামায খেলাফে সুন্নতই হয়।

সমস্ত গায়রে মুকাল্লিদরা পেরেশান হয়ে যায়। এ কেমন গায়রে মুকাল্লিদ বিতার্কিককে বিতর্ক করার জন্য মনোনিত করা হয়েছে, যে রাসূল সাঃ এর নামাযকে খেলাফে সুন্নত করতে শুরু করেছে!

দশমওয়ালা হাদীস

অবশেষে লোকটি বলতে লাগলঃ “এতেতো কোন সন্দেহ নেই যে, গায়রে মুকাল্লিদ ব্যক্তির দশ গণনাটির কথা মনে ছিল না। কিন্তু শেষেতো সে একটি দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইনের প্রমাণবাহী একটি হাদীস সে দেখিয়েছিল”।

আমি বললামঃ “কিন্তু তারপর উক্ত হাদীসের যে ব্যাখ্যা আমি উপস্থাপন করেছিলাম সেটা দেখেতো তারা সবাই পিলে চমকে গিয়েছিল। পুরো বর্ণনাটি লক্ষ্য করুন –

باب رفع اليدين إذا قام من الركعتين حدثنا عياش قال حدثنا عبد الأعلى قال حدثنا عبيد الله عن نافع

 : أن ابن عمر كان إذا دخل في الصلاة كبر ورفع يديه وإذا ركع رفع يديه وإذا قال ( سمع الله لمن حمده ) . رفع يديه وإذا قام من الركعتين رفع يديه ورفع ذلك ابن عمر إلى نبي الله صلى الله عليه و سلم

 رواه حماد بن سلمة عن أبوب عن نافع عن ابن عمر عن النبي صلى الله عليه و سلم . ورواه ابن طهمان عن أيوب وموسى بن عقبة مختصرا

 হযরত নাফে থেকে বর্ণিত যে, আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ নামায শুরু করলেন। তিনি আল্লাহু আকবার বলে রফয়ে ইয়াদাইন করলেন। আর যখন রুকু করলেন তখনো রফয়ে ইয়াদাইন করলেন। আর যখন সামিয়াআল্লাহু লিমান হামিদাহ বললেন তখন তিনি রফয়ে ইয়াদাইন করলেন। আবার যখন দুই রাকাত পড়ে দাঁড়ালেন, তখন রফয়ে ইয়াদাইন করলেন। আর এ পদ্ধতিকে রাসূল সাঃ এর দিকে নিসবত করলেন।

এটাকে হাম্মাদ বিন সালামা আইয়ুব-নাফে’-ইবনে ওমর- রাসূল সাঃ থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে তাহমান আইয়ুব থেকে এবং মুসা বিন উকবা থেকে সংক্ষিপ্তকারে বর্ণনা করেছেন। {সহীহ বুখারী-১/১০২, হাদীস নং-৭০৬, বুখারী রহঃ এর মৃত্যু-২৫৬হিজরী}

এ হাদীসে না ১৮ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইনের নিষেধাজ্ঞার কথা আছে, না উল্লেখিত আছে হাত কতটুকু উঠাবে। না সর্বদা এমনটি করার কথা উল্লেখ আছে। যেমন بال قائما তথা রাসূল সাঃ “দাঁড়িয়ে প্র¯্রাব করেছেন” একথার অনুবাদ এটা করা যেমন সম্পূর্ণ ভুল যে, “রাসূল সাঃ সর্বদা দাঁড়িয়ে প্র¯্রাব করেছেন” তেমনি রাসূল সাঃ রুকুতে গমন ও উঠার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূল সাঃ সর্বদা রুকুতে গমণ ও উঠার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন।

এছাড়া উক্ত হাদীসটিতে একথাও নেই যে, দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন না করলে উক্ত নামায শুদ্ধ হয় না। না এ হাদীসের সহীহ বা জঈফ হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ বা তার রাসূল সাঃ থেকে প্রমাণিত করেছে। আর সবচে’ বড় ধোঁকাতো এটা দিয়েছে যে, উক্ত হাদীসের আন্ডারলাইন করা অংশটি একদম ছেড়ে দিয়েছে। কত বড় ধোঁকাবাজী। বিতার্কিক লোকটি নিজে এবং তার সহকারীদের কেউ এ অংশটির কথা একদম বলেনি। সাথে হাদীসটির অনুবাদও করেছে ভুল। হাদীসে এসেছে মাজী মুতলাকের [সাধারণ অতীতকাল] অনুবাদ মাজী এস্তেমরারী [চলমান অতীতকাল] শব্দ দ্বারা করেছে।

যেহেতু এ হাদীসকে আল্লাহ বা রাসূল সাঃ সহীহ বা জঈফ বলেননি, তাই নামধারী আহলে হাদীসদের উক্ত হাদীসটিকে না সহীহ বলার কোন হক আছে, না জঈফ বলার কোন হক আছে। হ্যাঁ আমরা আহলে সুন্নত একথা বলি যে, হাদীসে মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর মুতাবেক যখন আল্লাহ ও রাসূল সাঃ থেকে কোন ফায়সালা পাওয়া না যায়, তখন মুজতাহিদ ইমামগণের ফায়সালাকে মেনে নেয়া উচিত। সে হিসেবে এ হাদীসের উপর চার ইমামের কোন ইমামেরই আমল নেই। তাই যেমন যে কেরাতকে সাত কারীই ছেড়ে দিয়েছেন সে কিরাত শাজ ও মাতরূক হওয়ার মাঝে কোন সন্দেহ নেই, তেমনি যে হাদীস চার ইমামই ছেড়ে দিয়েছেন। কোন ইমামই নিজের মাযহাব হিসেবে স্বীকৃতি দেননি, সে হাদীস শাজ হওয়ার মাঝে কোন সন্দেহ নেই।

ইমাম বুখারী রহঃ এর নিকট নিখাদ স্বর্ণখচিত সনদ হল -“মালিক আন নাফে’ আন ইবনে ওমর রাঃ”। উক্ত হাদীসটি ইমাম বুখারী রহঃ এর জন্মের আগেই উক্ত নিখাদ স্বর্ণখচিত সনদে “মুয়াত্তা মালিক” এবং “মুয়াত্তা মুহাম্মদ” এর মাঝে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কেননা, ইমাম মালিক রহঃ এর ওফাত হয়েছে ১৭৯ হিজরীতে। আর ইমাম মুহাম্মদ রহঃ এর ওফাত হয়েছে ১৮৯ হিজরীতে। অথচ ইমাম বুখারী রহঃ এর জন্ম হল ১৯৪ হিজরীতে। কিন্তু মুয়াত্তা মালিক ও মুয়াত্তা মুহাম্মদের শব্দ আর বুখারীর বর্ণিত শব্দের মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। মুয়াত্তাইনের শব্দ হল-

مالك عن نافع ان عبد الله بن عمر رض كان اذا افتتح الصلوة رفع يديه حذو منكبيه واذا رفع رأسه من الركوع رفعهما دون ذلك- (موطا مالك-৬১، موطا محمد-৮৭، جزء رفع يدين نمبر-৭৪)

মালিক নাফে থেকে বর্ণনা করেন যে, যখন আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ নামায শুরু করতেন, তখন রফয়ে ইয়াদাইন কাঁধ বরাবর করতেন। আর যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন এর চেয়ে নিচু করে হাত উঠাতেন। {মুয়াত্তা মালিক-৬১, মুয়াত্তা মুহাম্মদ-৮৭, জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইন-৭৪}

মদীনা মুনাওয়ারার ইমাম মালিক রহঃ যখন এ হাদীস লিখেছেন, তখন রফয়ে ইয়াদাইন পাঁচ স্থানে ছিল। এ হাদীসই যখন কুফাতে পৌঁছল তখনো রফয়ে ইয়াদাইন পাঁচ স্থানেই ছিল। কিন্তু একই বর্ণনা যখন বুখারাতে পৌঁছল তখন সেটা পাঁচ থেকে বেড়ে ১০ স্থানে হয়ে গেছে।

এছাড়া মদীনায় এ বর্ণনাটি হযরত ইবনে ওমর রাঃ এর নিজের আমল ছিল। রাসূল  সাঃ এর দিকে মারফু ছিল না। কুফাতেও সেটি আপন অবস্থায় বহাল ছিল। কিন্তু বুখারাতে তা পৌঁছে ইবনে ওমর রাঃ এর আমলকে রাসূল সাঃ এর দিকে মারফু করে দেয়া হয়েছে। এ কারণেই ইমাম আবু দাউদ রহঃ [ওফাত-২৭৫ হিজরী] ইমাম বুখারী রহঃ এর জীবদ্দশায়ই উক্ত ভুলের সংশোধন করে দিয়েছিলেন। তিনি আবু দাউদে লিখেছেন- قال ابو داود الصحيح قول ابن عمر ليس بمرفوع তথা আবু দাউদ বলেনঃ সহীহ কথা হল যে, ইবনে ওমর রাঃ এর বক্তব্যটি মারফু নয়। {সুনানে আবু দাউদ-১/১০৮}

মুয়াত্তা মালিক এবং মুয়াত্তা মুহাম্মদে স্পষ্টভাষায় ছিলঃ হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়েছেন। আর রুকুতে গমণ ও উঠার সময় এর চেয়ে কম উঠিয়েছেন। একথা বুখারী থেকে এবং জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

ইমাম আবু দাউদ রহঃ [ওফাত-২৭৫ হিজরী] বলেনঃ  قال ابو داود- رواه الليث بن سعد ومالك وايوب وابن جريج موقوفا (ص-১০৭) তথা আবু দাউদ রহঃ বলেনঃ লাইস বিন সাদ এবং মালিক আইয়্যূব এবং ইবনে জুরাইজ এটাকে বর্ণনা করেছেন “মাওকুফ” [রাসূল সাঃ এর দিকে নিসবত না করে সাহাবী পর্যন্ত নিসবত] হিসেবে। {সুনানে আবু দাউদ-১/১০৮}

আর ইমাম বুখারী রহঃ স্বীয় ভুলটি স্বীকার করেছেনঃ قال البخارى والمحفوظ ما روى عبيد الله وايوب ومالك وابن جريج والليث وعدة من اهل الحجاز واهل العراق عن نافع عن ابن عمر رض তথা ইমাম বুখারী রহঃ বলেনঃ সংরক্ষিত সেই বক্তব্যটিই, যা উবায়দুল্লাহ, মালিক, ইবনে জুরাইজ এবং লাইস ্ও আহলে হেযাজ এবং আহলে ইরাকীগণ নাফে আন ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণনা করেছেন। {জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইন-৮৩}

তাহলে কী দাঁড়াল? ইমাম বুখারী রহঃ ও স্বীকার করেছেন যে, এ বর্ণনাটি মূলত ইবনে ওমর রাঃ এর উপর মওকুফ।

এসব কথার কোন জবাব আমাদের লা মাযহাবী বিতার্কিক বন্ধুটি দিতে পারেনি।

ইমাম বুখারী রহঃ  رواه حماد بن سلمة عن أبوب عن نافع عن ابن عمر عن النبي صلى الله عليه و سلم . ورواه ابن طهمان عن أيوب وموسى بن عقبة مختصرا ইবারত দ্বারা যে تعليق উল্লেখ করেছেন। তার পূর্ণ বক্তব্যটি জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইনের ৫৩ থেকে ৫৪ পৃষ্ঠায় বিদ্যমান। তাতে “যখন দুই রাকাত শেষ করে দাঁড়ালেন” তখন রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন কথাটি নেই। যেন ইমাম বুখারী রহঃ এর দ্বারা দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করার বিষয়টি সংরক্ষিত হওয়ার দিকেই ইংগিত করে দিলেন।

যেহেতু ইমাম বুখারী রহঃ উক্ত ইবারত দ্বারা বিতার্কিক সাহেবের দশের সংখ্যা ঠিক থাকে না। তাই তিনি উক্ত ইবারতটি হজম করে ফেললেন। সেই ইবারতের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু দাউদ বলে দিয়েছিলেনঃ واسنده حماد بن سلمة وحده عن ايوب لم يذكر ايوب ومالك الرفع اذا قام من السجدتين তথা একমাত্র হাম্মাদ বিন সালামাই আইয়ুব থেকে উক্ত বর্ণনাটি রাসূল সাঃ এর দিকে নিসবত করেছেন। অথচ আইয়ুব এবং মালিক দুই সেজদা থেকে তথা দুই রাকাত পূর্ণ করে উঠে রফয়ে ইয়াদাইনের কথা উল্লেখ করেননি। {আবু দাউদ-১/১০৮}

শেষ ইবারতটি ইবনে তাহমান ও মুসা বিন উকবা এর তালীক। যেটা ইমাম বুখারী শেষে উল্লেখ করেছেন। যা বায়হাকীর ২য় খন্ডের ৭১ পৃষ্ঠায় এসেছে। তাতে না দুই রাকাত শেষে উঠে রফয়ে ইয়াদাইনের কথা আছে, না সেটি রাসূল সাঃ এর দিকে মারফু।

এটাই হল ইমাম বুখারী রহঃ এর শেষের ইবারত দ্বারা ইশারা যে, উক্ত বর্ণনাটি মারফু নয়, না দশ রফয়ে ইয়াদাইন প্রমাণিত। বুখারীর উক্ত ইবারতটি গায়রে মুকাল্লিদ সাহেব ইচ্ছেকৃত ধরা খাওয়ার ভয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

সনদ বিষয়ক পর্যালোচনা

বুখারীর ১০২ পৃষ্ঠার প্রথম রাবী হল আইয়্যাশ বিন ওলীদ। কিন্তু দিল্লি থেকে প্রকাশিত জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইন এর ১২ পৃষ্ঠায় আইয়্যাশের বদলে রাবী উল্লেখ করা হয়েছে আব্বাস। তাহলে এখানে রাবীটি সন্দেহযুক্ত হয়ে গেছে। আসলে রাবীর নাম কি? আইয়্যাশ না আব্বাস? এ কারণে গায়রে মুকাল্লিদ ফয়জুর রহমান সূরী সাহেব জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইনের ৩৮ পৃষ্ঠায় এবং পীর ঝান্ডা সাহেব “জালাল আইনাইন” গ্রন্থের ১২৬ পৃষ্ঠায় বিকৃত করে আব্বাসকে আইয়্যাশ বানিয়ে দিয়েছেন। যদিও “আররাসায়েল ফী তাহকীকিল মাসায়েল” এর চৌদ্দজন মুজাহিদ এটাকে আব্বাসই লিখে থাকেন। সেই সাথে খালেদ ঘরঝাকী সাহেব তার রেসালা “জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইনে” জুযয়ে বুখারীর উদ্ধৃতিতে আব্বাসই লিখেছেন রাবীর নাম। [দ্রষ্টব্য-৭০]

কিন্তু খালেদ ঘরঝাকী সাহেব যখন বুখারীর জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইন প্রকাশ করলেন, তখন সেটাকে বিকৃত করে আব্বাসের স্থলে আইয়্যাশ বসিয়ে দিয়েছেন।

দ্বিতীয় রাবী হলেন “আব্দুল আলা”। তিনি মুতাকাল্লাম ফি তথা যার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনগণ কালাম করেছেন এমন রাবী। মুহাদ্দিস বুন্দর রহঃ বলেনঃ “আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, তার উভয় পা অত্যধিক লম্বা। {মিযানুল ইতিদাল-২/৫৩১} তিনি মুতাকাল্লাম ফি রাবী হওয়া সত্বেও তিনি মুহাদ্দিস আব্দুল ওহাব এর বিরোধীতা করছেন। কেননা, আব্দুল আলা এটাকে মারফু করেছেন। যেমন বুখারীর ১ম খন্ডের ১০২ পৃষ্ঠায় রয়েছে। আর আব্দুল ওহাব এটাকে মাওকুফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেমন জুযয়ে বুখারীর ৪৮ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে।

পরের রাবীর ব্যাপারেও মতভেদ আছে। বুখারীর ১ম খন্ডের ১০২ পৃষ্ঠায় উবায়দুল্লাহ আর দিল্লি থেকে প্রকাশিত জুযয়ে বুখারীতে আব্দুল্লাহ লিখা হয়েছে। যাকে মাতরুকূল হাদীস হিসেবে মুহাদ্দিসীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন। এ কারণে পীর ঝান্ডা তার “জালাউল আইনাইন” এর ১৫৯ পৃষ্ঠায় এবং ফয়জুর রহমান সূরী সাহেব “জুযয়ে রফয়ে ইয়াদাইনের” ৪৮ পৃষ্ঠায় এটাকে বিকৃত করে উবায়দুল্লাহ বানিয়ে দিয়েছেন।

এসব কিছুর আশ্চর্য কথা হলঃ জুযয়ে বুখারীর ৮৩ পৃষ্ঠায় এসেছে যে, وزادا وكيع عن العمرى عن نافع عن ابن عمر رض عن النبى صلى الله عليه وسلم انه كان يرفع يديه اذا ركع واذا سجد তথা ওকী উমরী আন নাফে আন ইবনে ওমর রাঃ আন রাসূল সাঃ সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেনঃ নিশ্চয় তিনি রুকু ও সেজদা করার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করতেন।

আর ইমাম বুখারী রহঃ বলেন যে, এ অতিরিক্ত বক্তব্যটি গ্রহণযোগ্য। ব্যাস হয়ে গেল! গায়রে মুকাল্লিদ বিতার্কিক সাহেব! নিন! এবার আপনার দশের বদলে ছাব্বিশ রফয়ে ইয়াদাইন হয়ে গেল। সেই সাথে আপনারা প্রত্যেক চার রাকাত নামাযে ১৬টি সুন্নতের তরককারী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন।

এই হল এ হাদীসের মূল অবস্থা। যে হাদীসকে গায়রে মুকাল্লিদ ভাইয়েরা সকল সাহাবা, সকল তাবেয়ী এবং সকল আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনদের বিরুদ্ধে আমল বানিয়ে রেখেছে।

এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, ইমাম বুখারী রহঃ এর জন্মের পূর্বে থেকে ইমাম মুহাম্মদ রহঃ বলে গেছেন যে, হযরত আলী রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ থেকে বহুত মজবুতভাবে প্রমাণিত যে, তারা প্রথম তাকবীরের পর আর রফয়ে ইয়াদাইন করতেন না। আর তারা বদরী সাহাবী। যারা নবীজী সাঃ এর সাথে সামনের কাতারে নামায পড়তেন। আর তারা সুনিশ্চিতভাবে হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ এর তুলনায় রাসূল সাঃ এর ব্যাপারে অধিক বেশি জ্ঞাত ছিলেন। এ কারণে তাদের বর্ণনাটি প্রাধান্য পাবে। {কিতাবুল হুজ্জাত-৯৫}

তার ইমাম মুহাম্মদ রহঃ খোদ আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ থেকে রফয়ে ইয়াদাইন না করার বর্ণনা নকল করেন। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে, এবার ইবনে ওমর রাঃ এর ঐ বক্তব্যটিই প্রাধান্য পাবে, যা আহলে বদরের অনুপাতে হয়। এটা খুবই আশ্চর্যজনক কথা যে, ইমাম মুহাম্মদ রহঃ [মৃত্যু ১৮৯ হিজরী] এর এ আহবান যে, আহলে বদর কোন সাহাবী থেকে তাহরীমা ছাড়া রফয়ে ইয়াদাইন প্রমাণ করে দেখাও। এর সমর্থনে ইমাম বুখারী [মৃত্যু ২৫৬ হিজরী] এবং ইমাম মুসলিম [মৃত্যু ২৬১ হিজরী] বদরী সাহাবী থেকে কোন মারফু বা মাওকুফ হাদীস সহীহাইন এর মাঝে এনে দলীল দিতে পারেননি।

তারাই যেহেতু অক্ষম হয়ে গেলেন, তাহলে আর কে এটা পারবে?

শেষ জীবন পর্যন্ত

নামধারী আহলে হাদীস বিতার্কিক সাহেবের দাবীর একটি অংশ এটিও ছিল যে, আমরা যেভাবে রুকু ও সেজদার সাথে তাকবীরকে সুন্নত মনে করি, সেই সাথে এ দাবী করি যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত এ তাকবীরে ইন্তিকালিয়া করেছেন। তখন আমরা আমাদের এ দাবীর স্বপক্ষে সরীহ দলীল ও পেশ করে থাকি যে, রাসূল সাঃ সর্বদা এ তাকবীর বলতেন, এ পর্যন্ত যে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। {বুখারী-১/১১৪, নাসায়ী-১/১৭৩}

একই ভাবে নামধারী আহলে হাদীসরা তাদের দাবীর স্বপক্ষে ১৮ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করার নিষেধাজ্ঞা আর ১০ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করার পক্ষে প্রমাণ পেশ করার সাথে সাথে এমন শব্দ দেখাবে যাতে প্রমানিত হয় যে, রাসূল সাঃ মৃত্যু পর্যন্ত রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন। চাই তা বুখারীর বর্ণনা দ্বারা হোক বা মুসলিমের বর্ণনা দ্বারা হোক। কিন্তু এতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল। কেননা, এ বেচারাদের কাছে দলীল নামের কোন বস্তুই নেই। হ্যাঁ, অযথা চিৎকার আর চেঁচামেচি করেছে ইচ্ছেমত।

আমি লোকটি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনিইতো বলেছেন যে, আপনি ক্যাসেট শুনেছেন। আপনি কি শুনেছেন যে, ক্যাসেটে সিহাহ সিত্তাহ থেকে এমন কোন বর্ণনা বলেছে?

লোকটি বললঃ না বলেনি।

আমি বললামঃ তাকবীরে ইন্তিকালিয়া শেষ জীবন পর্যন্ত বাকি থাকার আরো একটি প্রমাণ আছে। সেটআ হলঃ হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ বলেনঃ রাসুল সাঃ তাকবীর বলতেন, হযরত আবু বকর রাঃ ও তাকবীর বলতেন, হযরত ওমর রাঃ ও তাকবীর বলতেন। {তিরমিজী-১/৫৯} হযরত উসমান রাঃ ও {নাসায়ী-১/১৭২}

এর মাধ্যমে একথা সুষ্পষ্টরূপে বুঝা যায় যে, এটাই ঐ নামায যার উপর রাসূল সাঃ হযরত আবু বকর রাঃ কে ছেড়ে গিয়েছিলেন। তারপর আবু বকর রাঃ হযরত ওমর রাঃ কে ছেড়ে গিয়েছিলেন। তারপর হযরত ওমর রাঃ হযরত উসমান রাঃ কে ছেড়ে গিয়েছিলেন । কিন্তু এমন সুষ্পষ্ট শব্দ গায়রে মুকাল্লিদ ভাইদের কাছে কোথায়?

অবশেষে নামধারী আহলে হাদীসরা হাদীস থেকে হাত গুটিয়ে ইতিহাসের দিকে দৌড় দেয়। বলতে লাগলঃ হযরত মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ নবম হিজরীতে ঈমান এনেছেন। তিনি রাসূল সাঃ কে রফয়ে ইয়াদাইন করতে দেখেছেন।

আমি বললামঃ

প্রথম কথা হল যে, মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ নবম হিজরীতে ঈমান এনেছেন এর একটি সনদ পেশ কর। সনদ তারা পেশ করতে পারেনি।

হযরত মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ এ হাদীসের সাথে আপনাদের কী সম্পর্ক? এর সনদেওতো তৃতীয় রাকাতের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইনের কথা উল্লেখ নেই। যেটাকে আপনারা সুন্নতে মুআক্কাদা বলে থাকেন। তাহলে আপনাদের দাবী অনুপাতে রাসূল সাঃ নবম হিজরীতে খেলাফে সুন্নত নামায পড়েছেন?

মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ এ হাদীস নাসায়ীর ১ম খন্ডের ১৭২ পৃষ্ঠায় এসেছে। যাতে রাসূল সাঃ এর সেজদায় গমণ ও উঠার সময় সেজদার কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আর ফাতাওয়ায়ে উলামায়ে হাদীস এর মাঝে এ হাদীসকে সহীহ এবং উক্ত হাদীসের উপর আমলকারীকে মৃত সুন্নতকে জিন্দাকারী হিসেবে এক শত শহীদের সওয়াবের অধিকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

এর দ্বারা বুঝা গেল যে, আপনারা চার রাকাত নামাযে ১৭ স্থানে সুন্নতকে নষ্ট করে থাকেন। ১৬ বার সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করা নবম হিজরী পর্যন্ত সুন্নত ছিল। যা আপনারা ছেড়ে দিয়েছেন। আর তৃতীয় রাকাতের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইন করা নবম হিজরীতে বিলকুল সুন্নত ছিল না, অথচ আপনারা এটাকে সুন্নত বানিয়ে দিলেন গায়ের জোরে।

সিহাহ সিত্তার সাথে দুশমনী

আপনিতো ক্যাসেট শুনেছেন! নামধারী আহলে হাদীস বিতার্কিক পূর্ণ বিতর্কে মক্কা মদীনার সাথে বিরোধীতা করেছে। এবার সিহাহ সিত্তার সাথেও বিরোধীতা শুরু করে। কেননা, নাসায়ী সিহাহ সিত্তার অন্তুর্ভূক্ত। ইমাম নাসায়ী রহঃ নাসায়ীতে ১/১৬৫, ১/১৭২ পৃষ্ঠায় সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করার বাব এনেছেন। তাতে তিনি হযরত মালিক বিন হুয়াইরিস রাঃ এর হাদীস এনেছেন। তারপর হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ এর হাদীস দ্বারা ওটাকে মাতরুকুল আমল তথা আমল হিসেবে পরিত্যজ্য সাব্যস্ত করেছেন। তারপর ১/১৫৮ ও ১/১৬১ পৃষ্ঠায় রুকুর রফয়ে ইয়াদাইনের বাব এনেছেন। তাতে ইবনে ওমর প্রমুখদের হাদীস এনেছেন। তারপর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ এর হাদীস দ্বারা এসবকে মাতরুকুল আমল তথা আমল হিসেবে পরিত্যাজ্য সাব্যস্ত করেছেন।

এটা হল একজন শাফেয়ী মুহাদ্দিসের বাব নির্ধারণ বিন্যাস পদ্ধতি। যেটাকে নামধারী আহলে হাদীসরা শুধুমাত্র সনদহীন ইতিহাস দিয়ে রদ করে দিতে চায়। আমিও অবশেষে সুনানে নাসায়ীর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ এর হাদীসটি হাওয়ালাসহ উল্লেখ করলাম।

عن عبد الله قال ألا أخبركم بصلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم قال فقام فرفع يديه أول مرة ثم لم يعد

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি কি রাসূল সাঃ এর নামায সম্পর্কে তোমাদের জানাবো? তারপর তিনি দাঁড়ালেন তারপর দুই হাত উঠালেন প্রথম বার। তারপর আর হাত উঠালেন না। {সুনানে নাসায়ী-১/১৫৮, হাদীস নং-১০২৫}

এ হাদীসে আমার পূর্ণাঙ্গ মাসআলা বিদ্যমান। যেমন আমাদের একত্ববাদের বিশ্বাস হল যে, আল্লাহ তাআলাকে এক বিশ্বাস করা, আর বাকি সকলকে অস্বিকার করা। এমনিভাবে আমাদের রফয়ে ইয়াদাইন এক স্থানে প্রমাণিত, বাকি সকল স্থানের অস্বিকার।

আমার মত পূর্ণাঙ্গ দলীল নামধারী আহলে হাদীসের কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ দাবী তথা ১০ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন প্রমাণ ও বাকি ১৮ স্থানের নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত একটি দলীলও দেখাতে পারেনি। কিয়ামত পর্যন্ত দেখাতেও পারবে না ইনশাআল্লাহ।

আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ এর হাদীস উপস্থাপন করলাম। যিনি বদরী সাহাবী এবং রাসূল সাঃ এর নামাযের প্রথম কাতারের মুসল্লি ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবীজী সাঃ ও তা’ই বলেছেন যে, “উলুল আহলাম ওয়ান নুহা” তথা প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব থেকে দ্বীন শিখ। আর আমাদের ইমাম মুহাম্মদ রহঃ ও বলেছেনঃ আহলে বদর সাহাবীগণ রাসূল সাঃ এর নামায বিষয়ে সবচে’ বেশি জানতেন। নামধারী আহলে হাদীস বিতার্কিক সাহেব নিজের দাবীর পক্ষে আহলে বদর সাহাবী থেকে একটি মারফু বা মাওকুফ হাদীসও দেখাতে পারেনি।

আমি এ বদরী সাহাবীর হাদীস উপস্থাপন করেছি, যে হাদীস তিনি কুফাতে বর্ণনা করেছেন। আর সমস্ত কুফাবাসী তথা সাহাবী, তাবেয়ী, তাবেয়ী, ফুক্বাহা ও মুহাদ্দিসীন এবং সাধারণ মুসলমানগণের নিরবচ্ছিন্ন আমল এর উপরই ছিল। অথচ নামধারী আহলে হাদীস বিতার্কিক নিজের পূর্ণাঙ্গ দাবীর উপর কোন সাহাবী, তাবেয়ী, তাবেয়ী, ফক্বীহ, মুহাদ্দিস বা সাধারণ মুসলমানগণের আমল প্রমাণ স্বরূপ উপস্থাপন করতে পারেনি।

এ হাদীসকে আল্লাহ তাআলা বা রাসূল সাঃ সহীহ বা জঈফ কোনটিই বলেননি। কিন্তু আহলে কুফার নিরবচ্ছিন্ন আমল এ হাদীস সহীহ হওয়ার পরিস্কার দলীল।

আলবানী গায়রে মুকাল্লিদ সাহেবও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, এ হাদীসে দোষণীয় কোন কারণ নেই। বরং তিনি স্পষ্ট ভাষায় একে সহীহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন{সহীহ ওয়া জঈফ সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-১০২৬, হাশিয়ায়ে মিশকাত}

একটি আশ্চর্যজনক অভিযোগ

যখন আমি সেজদাতে রফয়ে ইয়াদাইন সম্বলিত হাদীস পড়লাম তখন নামধারী আহলে হাদীস বিতার্কিক বলতে লাগলঃ “যখন তুমি এটাকে সহীহ মান, তাহলে এর উপর আমল কর না কেন?”

“এ বেচারারা এ কথাও জানা ছিল না যে, মানার জন্য সর্বদা আমল জরুরী নয়। দেখুন! মুসলমান এবং ইহুদীরা মুসা আঃ কে সত্য নবী বিশ্বাস করে থাকে। তাহলে মতভেদ কিসের উপর? সেটা হল এই যে, ইহুদীরা বলে থাকে যে, মুসা আঃ শেষ নবী। এ কারণে তারা ঈসা আঃ এর নবুওয়তকেও অস্বিকার করে থাকে। মুসলমানগণ বলে থাকেন যে, ইহুদীরা কিয়ামত পর্যন্ত মুসা আঃ কে শেষ নবী প্রমাণিত করতে পারবে না। এ কারণে হয়তো তারা দলীল দিবে নতুবা ঈসা আঃ কে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দিবে। এমনিভাবে মুসলমান এবং খৃষ্টানরা ঈসা আঃ কে নবী বিশ্বাস করে থাকে। কিন্তু খৃষ্টানরা বলে থাকে যে, ঈসা আঃ শেষ নবী। এ কারণে তারা রাসূল সাঃ এর নবুওয়তের অস্বিকার করে থাকে। এক্ষেত্রে মুসলমানগণ এটাই চায় যে, হয়তো তোমরা ঈসা আঃ এর শেষ নবীর প্রমাণ দাও, নতুবা রাসূল সাঃ এর উপর ঈমান আন। আর মুসলমানগণ রাসূল সাঃ কে শেষ নবী বিশ্বাস করে থাকে, এ কারণেই মুসায়লামায়ে কাজ্জাব এবং মুসায়লামায়ে পাঞ্জাব তথা কাদিয়ানীকে মিথ্যা নবী বলে থাকে।

যেমনিভাবে মুসলমানদের এ দাবী সঠিক যে, হযরত মুসা আঃ সত্য নবী, ইহুদীদের একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা যে, মুসা আঃ শেষ নবী। এখন ইহুদীদের কাছে মুসা আঃ এর নবী হওয়ার দলীল চাওয়ার কোন অর্থ হয় না। কারণ এটিতো আমরা মানিই। তাদের কাছে আমরা দলীল চাব যে, মুসা আঃ আখেরী নবী কিভাবে? এর দলীল দাও। যদি কোন ইহুদী মুসা আঃ এর নবী হওয়ার দলীল পেশ করতে থাকে, তাহলে সেই ইহুদী ধোঁকাবাজী করছে। সে নিজের সময়ও নষ্ট করছে, নষ্ট করছে অন্যদের সময়ও। ঠিক একইভাবে আমরা একথা বলি যে, রাসূল সাঃ থেকে সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করা প্রমানিত। কিন্তু একথা বলা যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত সেজাদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন সেটা হবে মিথ্যাচার এবং সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়ার হাদীসকে অস্বিকারকারীও সাব্যস্ত হয়।

ঠিক একইভাবে খৃষ্টানদের থেকে আমরা ঈসা আঃ এর নবী হওয়ার দলীল চাই না। কারণ তিনি যে, নবী একথা আমরা মানি। যদি খৃষ্টানরা ঈসা আঃ এর নবী হওয়ার দলীল পেশ করে করে, তাহলে এটি তাদের ধোঁকাবাজী ছাড়া কিছু নয়। তাদের দায়িত্বতো হল, ঈসা আঃ এর শেষ নবী হওয়ার প্রমাণ দেয়া। যে মিথ্যাচারের কারণে তারা রাসূল সাঃ এর শেষ নবী হওয়াকে অস্বিকার করে যাচ্ছে।

তারপর এ কথা ভাল করে বুঝে নিন যে, সেই খৃষ্টান বিশটি আয়াত এবং অসংখ্য হাদীস দিয়ে যদি ঈসা আঃ এর নবী হওয়া প্রমাণিত করে দেয়, তাহলে এটি কেবল ঈসা আঃ এর নবী হওয়ার দলীল হবে, শেষ নবী হওয়ার দলীল হবে না। আর এভাবে রাসূল সাঃ এর শেষ নবী হওয়া কিছুতেই অস্বিকার করতে পারে না।

আমাদের দাবী তাদের কাছে কেবল এই যে, তারা একটি আয়াত বা হাদীস দিয়ে একথা প্রমাণ করে দেখাক, যাতে বলা হয়েছে যে, ঈসা আঃ শেষ নবী। যেমন মুসলমানদের একথা বলা যে, ঈসা আঃ সত্য নবী। তারপর তাকে সত্য নবী বিশ্বাস করে রাসূল সাঃ কে শেষ নবী ও পালনীয় নবী হিসেবে বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ সহীহ। ঠিক তেমনি একথাও সহীহ যে, রাসূল সাঃ রুকুতে গমণ ও উঠার সময় এবং সেজদাতে গমণ ও উঠার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন। কিন্তু একথা মিথ্যাচার যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত উক্ত স্থানসমূহে রফয়ে ইয়াদাইন করতে ছিলেন। এটি এমনি মিথ্যাচার যেমন খৃষ্টানদের দলীল হিসেবে ঈসা আঃ কে শেষ নবী মানা।

খৃষ্টানদের ঈমান ঈসা আঃ এর উপরও বাকি থাকে না। কারণ তিনি নবী ছিলেন। কিন্তু শেষ নবী ছিলেন না। তাই তাদের রাসূল সাঃ এর উপর ঈমান আনা জরুরী ছিল। ঠিক তেমনি নামধারী আহলে হাদীসদের না ঐ সকল হাদীসের উপর ঈমান আছে, যাতে প্রতিটি তাকবীরের সাথে রফয়ে ইয়াদাইন আছে, না ঐ সকল হাদীসের উপর ঈমান আছে, যাতে সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইনের কথা উল্লেখ আছে। সেই সাথে তাদের ঐ সকল হাদীসের উপরও ঈমান নেই, যাতে রুকু করার সময় রফয়ে ইয়াদাইন প্রমাণিত। কেননা, যেমনিভাবে খৃষ্টানরা ঈসা আঃ কে শেষ নবী বলে নিজের ঈমানকে নষ্ট করেছে, ঠিক তেমনি লোকদের কাছে শেষ সময় পর্যন্ত ১৮ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন নিষেধ ্আর দশ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন প্রমানিত বলে রাসূল সাঃ এর উপর মিথ্যাচার করেছে। আর রাসূল সাঃ এর উপর মিথ্যারোপ করার দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।

সেই সাথে তাদের ঐ হাদীসের উপরও ঈমান নেই, যাতে প্রথম তাকবীরের পর রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়ার বিষয় উল্লেখ আছে। এ মাসআলার সকল হাদীসকে অস্বিকার করেও নাম তাদের আহলে হাদীস। নাম আহলে হাদীস, কাজ মুনকিরীনে হাদীসের।

বিরোধ

একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, আমরা মুসা আঃ এর মুকাবিলায় ঈসা আঃ কে নবী মানি না। বরং মুসা আঃ এর পরের নবী ঈসা আঃ একথা বিশ্বাস করি। ঠিক তেমনি আমরা ঈসা আঃ এর মুকাবিলায় রাসূল সাঃ কে নবী মানি না। বরং ঈসা আঃ এর পরের নবী বিশ্বাস করি। যেমনিভাবে আমরা আল্লাহ তাআলার নবীদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করি না। এমনিভাবে প্রিয় নবীজী সাঃ এর প্রিয় হাদীসের মাঝেও বিরোধ সৃষ্টি করি না। আমরা বলে থাকি যে, রাসূল সাঃ সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন। তবে এটি বাকি ছিল, না রাসূল সাঃ ছেড়ে দিয়েছেন? সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করার হাদীসটিতে একথা উল্লেখ নেই। তবে কিয়াস একথা বলে যে, রাসূল সাঃ সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করতেই ছিলেন। কিন্তু এ কিয়াসের বিপরীত হাদীস পাওয়া গেছে। যাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূল সাঃ রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দিয়েছেন। তখন আমরা কিয়াস ছেড়ে দিয়ে হাদীস মেনে নিলাম। যে বর্ণনাটি নাসায়ী শরীফে বিদ্যমান। [ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে] এমনিভাবে রুকুর সময় রফয়ে ইয়াদাইন করা রাসূল সাঃ থেকে প্রমানিত। কিন্তু এটি মৃত্যু পর্যন্ত বাকি ছিল  কি না? একথা উক্ত হাদীসে উল্লেখ নেই। এখানেও কিয়াস একথা বলে যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন। কিন্তু এ কিয়াস কে আমরা ছেড়ে দিয়েছি, কারণ হাদীস পাওয়া গেছে। যাতে উল্লেখ আছে যে, রুকুতে গমণ ও উঠার সময়ের রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দিয়েছেন। তখন আমরা কিয়াস ছেড়ে দিয়ে উক্ত হাদীসকে মেনে নিলাম।

এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল যে, মুসা আঃ এর উপর ঈমান থাকতেই পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ঈসা আঃ কে বাতিল বলা না হবে। ঈসা আঃ এর উপর থাকতেই পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না নাউজুবিল্লাহ রাসূল সাঃ কে মিথ্যা বলা হবে। বরং একজন বিশ্বাস করে অন্যজনকে মানা যায়। যা স্বতসিদ্ধ মূলনীতি।

অথচ নামধারী আহলে হাদীসরা এরকম ভুল ধারণাই পোষণ করে থাকে। তাদের মতে রুকুর তাকবীরের সময় রফয়ে ইয়াদাইনের হাদীস মানাই যাবে না, যতক্ষণ না প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফয়ে ইয়াদাইন সম্বলিত হাদীসকে অস্বিকার করা হয়। আর শুধু এসব হাদীসকে অস্বিকার করার দ্বারাই তাদের ঈমান পূর্ণ হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত এ সকল হাদীসের সাথে এ মিথ্যা সম্পৃক্ত করে যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত এ আমলই করেছেন।

মোটকথা, মিথ্যা ছাড়া তাদের মতবাদ চলতেই পারে না। যদি সিহাহ সিত্তার বাহিরেও সিনার উপর হাদীস পাওয়া গেলেও এ মিথ্যাচার সাথে সংযুক্ত করে নেয় যে, রাসূল সাঃ এর শেষ জীবনের আমলও সীনার উপর হাত বাঁধার উপর ছিল। কোথাও যদি কোন জঈফ হাদীসও পায়, যাতে আমীনের কথা এসেছে, তাহলে সাথে সাথে এ মিথ্যা মিলিয়ে নেয় যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত জোরে আমীনেই নামায পড়েছেন। আর বাকি সকল হাদীসকে মিথ্যা বলা শুরু করে দেয়। আমাদের আহবান এখনো কায়েম আছে যে, শুধুমাত্র একটি হাদীস দেখান, যাতে ১৮ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন সর্বদার জন্য নিষেধের কথা আছে, আর দশ স্থানে কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠানোর হুকুম আছে। আর এর উপর রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত আমল করেছেন। সাথে সাথে বলে দিয়েছেন যে, এভাবে রফয়ে ইয়াদাইন না করলে নামায হবে না। আর এ হাদীসকে শরয়ী দলীল দিয়ে সহীহ প্রমাণিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, শরয়ী দলীল কেবল আল্লাহ তাআলা এবং রাসূল সাঃ বাণীই হতে পারে। এরকম দলীল উপস্থাপন করতে পারলে, আমরা তা মেনে নিয়মমাফিক আমল করা শুরু করে দিব।

আশরাফ সাহেব বলেনঃ হাফত রোযা আহলে হাদীস লাহুর ৩১শে মে ১৯৯৬ ঈসাব্দে উল্লেখ আছে যে, এ বিতর্কে মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া গুন্ধলেয়ী, মুনাজিরে ইসলাম কাজী আব্দুর রশীদ সাহেব, মাওলানা মুবাশিশর আহমদ রাব্বানী সাহেব, প্রফেসর আকরম জজ সাহেব, মুনাজিরে ইসলাম হাফেজ মুস্তাফা সাদেক সাহেব, মাওলানা আব্দুর রহমান কাজেমী সহ অন্যান্য ওলামায়ে কেরামও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এ সকল হযরত মিলেও নিজেদের পূর্ণাঙ্গ দাবীর স্বপক্ষে একটি হাদীসও উপস্থাপন করতে পারেনি।

তারপর আশরাফ সাহেব বলেনঃ বুখারী মুসলিম, মুয়াত্তা মালিক, এবং মুয়াত্তা মুহাম্মদের নাম “হাফত রোযা আহলে হাদীস” এর লোকেরা লিখেছে যে, এসব কিতাব থেকে আমাদের বিতার্কিকগণ সহীহ হাদীস উপস্থাপন করেছে।

আমি বললামঃ “আপনিই বের করে দিন। সহীহ হাদীসতো দূরে থাক ১৮ স্থানে রফয়ে ইয়াদাইনের নিষেধাজ্ঞা, আর ১০ স্থানে কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠানোর হুকুম এবং তা রাসূল সাঃ এর আজীবন আমল করা, আর সেই সাথে যে ব্যক্তি এভাবে নামায না পড়ে, তার নামায বাতিল, এবং উক্ত হাদীসকে আল্লাহ বা রাসূল সাঃ সহীহ বলেছেন মর্মে একটি হাদীস উপস্থাপন করে দিন”।

আশরাফ সাহেব বললেনঃ “যখন তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ দাবীর উপর একটি হাদীসও উপস্থাপন করতে পারেনি, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের কখনো আহলে হাদীস বলা উচিত হবে না।

আমি বললামঃ “শুধু তাই নয়, তাদের কাছে একেতো নিজেদের দাবীর পক্ষে কোন দলীল নেই। সাথে সহীহ হাদীসগুলোকে মিথ্যা বলেও প্রচার করে থাকে। যথা-

প্রত্যেক তাকবীরের সাথে রফয়ে ইয়াদাইনের হাদীসকে তাদের আল্লামা আলবানী সাহেব সহীহ মেনেছেন। অথচ তারা এটাকে অস্বিকার করে থাকে।

সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইনের হাদীসকে আবু হাফস দাজেলী, আব্দুল হক হাশেমী, আব্দুল করীম সিন্ধী এবং আল্লামা আলবানী সহীহ বলেছেন। অথচ তারা এ কে অস্বিকার করে থাকে।

রুকুর সময় রফয়ে ইয়াদাইনের হাদীস মানার দাবী করে থাকে, অথচ সাথে সাথে মিথ্যা সম্পৃক্ত করে যে, রাসূল সাঃ শেষ জীবন পর্যন্ত রফয়ে ইয়াদাইন করেছেন। এটা এমন মিথ্যা, যেমন মিথ্যা ঈসা আঃ আখেরী নবী হওয়া।

প্রথম তাকবীরের পর রফয়ে ইয়াদাইন আর না করার আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ এর হাদীসকে তাদের শায়েখ আলবানী সাহেব সহীহ বলেছেন। অথচ তারা এটাকে অস্বিকার করে থাকে।

যে দলটি একটি মাসআলার জন্য চার প্রকার হাদীসকে অস্বিকার করে থাকে। এ দলের নিজেদের আহলে হাদীস দাবী করা এমন, যেমন রাতকে দিন বলা। যদি হাদীস অস্বিকার করার নাম আহলে হাদীস হয়, তাহলে মুনকিরীনে হাদীস তথা হাদীস অস্বিকারকারী কাদের বলা হয়?

আশরাফ সাহেব বলতে লাগলেনঃ একেবারে সত্য বলেছেন। আলহামদুলিল্লাহ! আপনার কথায় আমার সন্দেহ একেবারে দূরিভূত হয়ে গেছে।

সূত্র- http://jamiatulasad.com/

One thought on “রফয়ে ইয়াদাইন বিষয়ে গায়রে মুকাল্লিদ মাযহাবের মুখোশ উন্মোচন

  1. moniruzzaman says:

    সব জায়গা রফয়ে ইয়াদাইনের কথা থাকলে আপনি করেন না কেন?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s