মাযহাব ও তার অপরিহার্যতা

মাযহাব ও তার অপরিহার্যতা

হযরত আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী (দা.বা.)

[চট্টগ্রামের দামপাড়াস্থ জমিয়াতুল ফালাহ্ ময়দানে বিগত ২৪, ২৫ ও ২৬ জানুয়ারী ২০০১ইং তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলনের প্রথম দিন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব হযরতুল আল্লাম মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী যে বয়ান পেশ করেন, বিষয়বস্তুর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে বাণীবদ্ধ ক্যাসেট থেকে তা পাঠক সমীপে পত্রস্থ করা হল। -নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম]

—————————————————————————————–

শ্রদ্ধেয় সভাপতি, হযরাত উলামায়ে কিরাম, সম্মানিত সুধী সমাজ!

মুসলমান হিসেবে আমরা প্রত্যেকে জানি ও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্ তাআলা অকারণে মানুষ সৃষ্টি করেন নি। কোন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যেই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এই বিশেষ উদ্দেশ্যটি সম্পন্ন করার নিমিত্তে মানুষকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। এই মর্মে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন-

*** {সূরা মুমিন-115 আয়াত}***

অর্থাৎ- তোমরা কি মনে করেছ আমি তোমাদেরকে অকারণে সৃষ্টি করেছি। কখনো নয়। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে একটি বিশেষ কাজের জন্য সৃষ্টি করেছি। সে কাজটি সম্পাদন করার জন্য তোমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি। দুনিয়ার সীমিত জীবনে তোমরা সে কাজটি সম্পন্ন কর কি-না, তার হিসাব দেওয়ার জন্য আমি আল্লাহর আদালতে তোমাদের একদিন আসতে হবে। এমন নয় যে, তোমাদেরকে অকারণে সৃষ্টি করেছি, অকারণেই দুনিয়ায় পাঠিয়েছি। হেলায়-খেলায়, রং-তামাশায় জীবন কাটিয়ে দিবে এবং এজন্যে তোমাদেরকে কোন হিসাব-নিকাশ দিতে হবে না, আমার কাছে আসতে হবে না, ব্যাপারটি এমন নয়।

নিশ্চয় আল্লাহ্ তাআলা কোন একটি সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার নিমিত্তেই আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। কাজটি সম্পন্ন করলাম কি-না, সে জন্যে আখিরাতে আল্লাহর আদালতে হাজিরা দিতে হবে। কি সেই কাজ, তার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন-

*** {সূরা যারিয়াত-56 আয়াত}***

অর্থাৎ- মানব-দানবকে আমি সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য। মানুষ আল্লাহর ইবাদত করবে, এ কাজের জন্য সৃষ্টি করে তাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছি। আর ইবাদত কোন পদ্ধতিতে করবে, সে পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার নিমিত্তে লক্ষাধিক নবী-রাসূল দুনিয়াতে প্রেরণ করেছি। সারমর্ম হচ্ছে, আল্লাহ্ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। আর লক্ষাধিক নবী-রাসূল দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাঁকে ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য।

প্রথম কথা হচ্ছে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁর ইবাদতের নিমিত্তে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আর ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য সকল নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। তবে দুনিয়াতে জীবন-যাপনের জন্য আনুষঙ্গিক কিছু কাজ করতে হয়। সেগুলো মূলতঃ ইবাদত নয় বরং দুনিয়াবী কাজ। যেমন খেতে হয়, ঘুমাতে হয়, পায়খানা-প্রস্রাব করতে হয়, রুজি-রোজগার করতে হয়। এগুলো মানুষ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং আনুষঙ্গিক। আল্লাহ্ তাআলা মানুষের জীবনের আনুষঙ্গিক কাজগুলোরও নীতিমালা ও বিধি-বিধান তৈরী করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহর বিধান মত এবং রাসূলের তরীকা মত দুনিয়ার কাজও করবে, তাদের সে কাজের বিনিময়েও আল্লাহ্ তাআলা সাওয়াব দান করবেন। বিষয়টি সহজে উপলব্ধির জন্য একটি উদাহরণ পেশ করছি।

হাদীস শরীফে হযরত রাসূলে মাকবুল (সা.) ইরশাদ করেন- কেউ যদি ইশা’র নামায জামাআতের সাথে আদায় করে ঘুমায়, তাহলে অর্ধ-রজনীর ঘুম তার ইবাদতে লেখা হয়ে যায়। অতঃপর ঘুম থেকে উঠার পর ফজরের নামাযও যদি জামাআতের সাথে আদায় করে, তাহলে বাকী অর্ধ রাতের ঘুমও তার ইবাদতে লেখা হয়ে যায়।

ঘুম হল মূলতঃ একটি দুনিয়াবী কাজ। প্রকৃতপক্ষে ঘুম কোন ইবাদত নয়। ইশা’র নামায আদায় করা ইবাদত এবং জামাতের সাথে আদায় করা নবীর তরীকা। ফজরের নামায আদায় করা হল ইবাদত, জামাআতের সাথে আদায় করা নবীর তরীকা। এখন কেউ যদি রাতে নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে নবীর তরীকা মত জামাআতের সাথে ইশা’র নামায আদায়ের ইবাদত করে এবং ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নবীর তরীকা মত জামাআতের সাথে ফজর নামায আদায়ের ইবাদত করে, তাহলে ইশা থেকে ফজর পর্যন্ত যে নিদ্রাযাপন ছিল দুনিয়াবী তথা মূল বিষয়ের আনুষঙ্গিক কাজ, মূল ইবাদত সঠিক পন্থায় করার কারণে সেই দুনিয়াবী আনুষঙ্গিক কাজকেও আল্লাহ্ তাআলা ইবাদতে রূপান্তরিত করে তাকে পূর্ণ রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করার সাওয়াব দান করবেন।

এ প্রসঙ্গে বলতে চাই, দুনিয়াবী কাজ মানুষের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। মানুষ সৃষ্টি করে আল্লাহ্ তাআলা দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। যারা আল্লাহ্ তাআলার ইবাদত সঠিক পন্থায় ও নবীর তরীকা মত পালন করবে, দুনিয়ার প্রাত্যহিক কর্মগুলোতেও আল্লাহ্ তাআলার বিধি-বিধানের প্রতি খেয়াল রেখে, নবীর তরীকানুযায়ী করবে, তখন দুনিয়ার কাজও ইবাদতে পরিণত হয়ে যাবে। কাজেই মানুষের জীবনের মূল কাজ আল্লাহর ইবাদত করা। যারা শুধুমাত্র দুনিয়ার কাজ করে, ইবাদত করে না, এরা দুনিয়াতে তাদেরকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়ে গেছে। এদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- {আদ দুনিয়া জিফাতুন ওয়া ত্বালিবুহা কিলাব}

মানব সৃষ্টির মুখ্য উদ্দেশ্য তথা পরকালের অনন্ত জীবনের কথা ভুলে গিয়ে যারা শুধু ক্ষণস্থায়ী জীবনের ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়, তাদের জন্য দুনিয়ার ভোগের সামগ্রীসমূহ মৃতপ্রাণীর ন্যায়। আর পরকালের অনন্তকালের কথা ভুলে গিয়ে ক্ষণস্থায়ী জীবনের নিমিত্তে ব্যতিব্যস্ত হওয়া কুকুরের কাজের ন্যায়।

আজ সমাজের দিকে তাকালেই দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষের রাত-দিন ২৪ ঘন্টায় অবসর নেই, শুধুই ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। একটুও ফুরসত নেই ইবাদতের। এরা মূলকাজ নিয়ে ব্যস্ত, না-কি আনুষঙ্গিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত? এ ধরনের লোকদের ব্যাপারেই আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের সামগ্রীগুলো মৃতপ্রাণীর ন্যায়। আর এসব সামগ্রীগুলোর মাধ্যমে ভোগ-বিলাস উপভোগ করা কুকুরের মৃতপ্রাণী ভক্ষণের ন্যায়।

দুনিয়াবী কাজ মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য না হলেও যেহেতু পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকার নিমিত্তে সম্পাদন করতে হয়, তাই আল্লাহ্ তাআলা এসব ব্যাপারে কিছু বিধি-বিধান দিয়েছেন। অপর দিকে মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য ইবাদতের জন্যও কিছু বিধি-বিধান দিয়েছেন। এসব বিধি-বিধানের সমষ্টিকেই ধর্ম বলা হয়। আল্লাহ্ তাআলা নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে সেই ধর্ম পালনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)এর মাধ্যমে মানুষের জন্য পালনীয় ধর্মকে পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন।

সুতরাং ইসলাম অপূর্ণ নয়, বরং পরিপূর্ণ একটি ধর্মের নাম। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের নাম। এ ব্যাপারে একটু বিশ্লেষণ পেশ করতে চাই। মানুষের জীবনে যত কাজ করতে হয়, সব কাজের বিধান আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে অথবা আকার-ইঙ্গিতে বর্ণনা করে দিয়েছেন, কিন্তু মানব জীবনের যাবতীয় করণীয় কাজের কথাই শুধু আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেননি; বরং আরো অনেক কিছু বর্ণনা করেছেন। যদি বলা হয়, মানব জীবনের পরিপূর্ণ বিধানের নাম ইসলাম, তখন কুরআনের তের ভাগের বার ভাগই ইসলাম থেকে বহির্ভত হয়ে যায়।

মুফাস্সিরীনে কিরামের এক প্রসিদ্ধ বিবরণ মতে পবিত্র কুরআনের আয়াতের সংখ্যা ৬৬৬৬। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ আয়াতে রয়েছে বিধি-বিধান। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আয়াতের মধ্যে মানব জীবনের যাবতীয় করণীয় বিধান রয়েছে মাত্র ৫০০ আয়াতে। অবশিষ্ট ছয় হাজার আয়াতে কোন বিধান নেই। কি আছে এসব আয়াতে এ ব্যাপারে পরে অবহিত করব।

সুতরাং যদি বলা হয়, ইসলাম মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ একটি বিধানের নাম, তখন কুরআনের এক ক্রয়োদশাংশের নাম হয় ইসলাম, বাকী দ্বাদশাংশ কুরআন ইসলাম বহির্ভত হয়ে যায়। কাজেই ইসলাম শুধু মানব জীবনের কাজ-কর্মের বিধি-বিধান নয়। তবে হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, মানব জীবনের যত ধরণের কাজ আছে, তার বিধি-বিধান, নিয়ম-নীতি সুস্পষ্টভাবে অথবা অস্পষ্টভাবে, পরিস্কারভাবে কিংবা আকার-ইঙ্গিতে কুরআন বর্ণনা করে দিয়েছে বটে, কিন্তু ইসলাম এ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো কিছু মিলিয়ে সকল অংশের সমষ্টির নাম ইসলাম। সুতরাং ইসলামের কমপ্লিট ডেফিনেশন তথা পূর্ণ সংজ্ঞা এটি নয় যে, ইসলাম মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধি-বিধান।

কুরআনের সাড়ে ছয় সহস্রাধিক আয়াতের মধ্যে ৫০০ আয়াতে বিধান আছে। অবশিষ্ট ছয় সহস্রাধিক আয়াতসমূহে আছে ওয়ায। আল্লাহর বিধান পালন করলে কি পুরস্কার পাওয়া যাবে, আর লংঘন করলে কি শাস্তি ভোগ করতে হবে, তার বিবরণের নাম হচ্ছে ওয়ায। এসব আয়াতে কোন বিধান নেই, আছে শুধু ওয়ায। অথচ কুরআনের ৫০০ আয়াত শুধু ইসলাম নয়, সব আয়াতই ইসলাম। তাহলে ইসলামের কমপ্লিট ডেফিনেশন কি? শুধু বিধান পালন করার জন্য আল্লাহ্ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেন নি। বিধান কেউ স্বেচ্ছায়ও পালন করতে পারে, আবার জবরদস্তি মূলকভাবেও পালন করতে পারে। কাউকে জবরদস্তিমূলকভাবে বিধান পালন করালে সে বিধান পালন আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য পরিস্কার ভাষায় আল্লাহ্ তাআলা বলে দিয়েছেনঃ “লা ইকরাহা ফিদ্দীন” অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই।

একথার ব্যাখ্যা হচ্ছে, কেউ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে, স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম কবুল করতে না চায়, তাকে জবরদস্তি করে ইসলামে আনার কোন বিধান নেই। এক ব্যক্তি রোযা রাখতে চায় না, তার ইচ্ছা নেই রোযা রাখার। আপনি যদি জবরদস্তি করে তাকে দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত রাখেন, তাহলে এটা রোযা হবে না, আল্লাহর ইবাদত হবে না, হবে না কোন পুণ্যের কাজ। তাহলে আল্লাহর বিধান কখন পালন করলে ইবাদত হয়?

স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহ সহকারে আল্লাহর বিধান পালন করলেই কেবল তা ইবাদত বলে গণ্য হবে। আর মানুষের অন্তরে ততক্ষণ পর্যন্ত আগ্রহ, আসক্তি সৃষ্টি হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তরে দুটি জিনিস প্রবেশ করবে না। এই দু’টি জিনিসের একটি হল, আল্লাহর মুহাব্বত, অপরটি হল আল্লাহর আযাবের ভয়। মানুষের অন্তরে আল্লাহর ইশ্ক-মুহাব্বত, ভালবাসা প্রবেশ না করলে তার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আসে না। যে পরিমাণ মুহাব্বত থাকলে আল্লাহর ইবাদত করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়, সে পরিমাণ মুহাব্বত অবশ্যই থাকতে হবে। অপরদিকে যে পরিমাণ আযাব ও গযবের ভয় মানুষের মধ্যে থাকলে নিষিদ্ধ বস্তু থেকে সে বিরত থাকে, সে পরিমাণ ভয় অন্তরে পোষণ করা আবশ্যক। এতে মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আসে। সে তখন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আল্লাহর বিধান পালনে সচেষ্ট হয়। সুতরাং কেবল বিধানের নামই ইসলাম নয়, বরং বিধান ও ভক্তির সমষ্টির নাম হচ্ছে ইসলাম। বিধানের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি মানুষের ভালবাসা, প্রেম, ভক্তিকে ইসলামের সংজ্ঞায় যুক্ত করলে কুরআনে কারীমের কোন আয়াতই ইসলাম বহির্ভত হয় না; বরং সমস্ত আয়াতই ইসলামের সংজ্ঞায় চলে আসে এবং এভাবেই ইসলামের কমপ্লিট ডেফিনেশন তথা পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা নিরূপণ সম্ভবপর।

এতক্ষণ যাবত আপনাদেরকে যে কথাটি অনুধাবন করাতে সচেষ্ট ছিলাম তা হচ্ছে, কুরআনের বিধান সম্বলিত ৫০০ আয়াতই কেবল ইসলাম নয়। অবশ্য মানবের জীবন বিধানসমূহ পরিস্কারভাবে কিংবা আকার-ইঙ্গিতের এই আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে বটে। এই বিধানসমূহ পালনের জন্য যে ভক্তি ও ভয়ের প্রয়োজন, তা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের অবশিষ্ট ছয় সহস্রাধিক আয়াতে ওয়ায করেছেন। এসব বিধি-বিধান ও ওয়াযের সমষ্টিই হচ্ছে ইসলাম। এজন্য কুরআন শরীফের প্রথম সরার প্রথম আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা “আলহামদু লিল্লাহি আহ্কামিল হাকিমীন” বলেননি, বরং “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” বলেছেন। আল্লাহ্ নিছক একজন শাসক নন। মান্য করুক বা না করুক, জবরদস্তিমূলক মানুষের উপর হুকুম চাপিয়ে দিলেন, এমন শাসক নন। বরং আল্লাহ্ তাআলা একজন পরিপূর্ণ অভিভাবক।

শাসক আর অভিভাবকের পার্থক্য যারা বুঝে না তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু”র অর্থ করে- এক আল্লাহ্ ছাড়া কোন শাসনকর্তা নেই। ‘শাসনকর্তা’ আর ‘অভিভাবকে’র মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। খুব সহজ একটি উদাহরণ দ্বারা কথাটি উপস্থাপন করছি। এক ব্যক্তি ৫ বছরের ছেলেকে লেখাপড়ার জন্য মাদ্রাসা-মক্তব কিংবা স্কুলে প্রেরণ করল। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাসনকর্তা বা শিক্ষক এই ছেলেকে পড়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। পড়া না শিখলে শাসন করেন। ছাত্রকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া, ছাত্র থেকে পড়া আদায় করা এগুলো হচ্ছে উস্তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এই ছেলের খাওয়া-পরা কিংবা বাসস্থানের দায়িত্ব উস্তাদের উপর বর্তায় না। এতদ্ভিন্ন এই ছাত্রের জীবনের যাবতীয় চাহিদা পুরণ, ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণও উস্তাদের যিম্মাদারী নয়। এগুলো হচ্ছে পিতার কর্তব্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিতা তার সন্তানের শাসনকর্তা না অভিভাবক? আর উস্তাদ ছাত্রের জন্য অভিভাবক না শাসক? আপনারা এখন বুঝতে সক্ষম হয়েছেন যে, শাসক ও অভিভাবকের মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে। শাসনকর্তা বিধান প্রয়োগের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করবেন কিন্তু তার যাবতীয় চাহিদা পুরণ করবেন না। অথচ অভিভাবক তার যাবতীয় চাহিদার ব্যাপারে সদাসতর্ক ও সজাগ থাকেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন শুধু শাসনকর্তাই নন, বরং তিনি একজন পরিপূর্ণ অভিভাবকও। এজন্য রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের প্রথম সরার প্রথম আয়াতে “আলহামদু লিল্লাহি আহ্কামিল হাকিমীন” না বলে “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” বলেছেন।

‘হাকিম’ ও ‘রব’ এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ‘হাকিম’ অর্থ শাসক এবং ‘রব’ অর্থ অভিভাবক। অভিভাবক শাসকও হতে পারেন। কিন্তু শাসক কখনো অভিভাবক হতে পারেন না। পিতা তার সন্তানকে শাসন করতে পারেন কিন্তু শাসন পর্যন্তই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার খোরপোষ, বাসস্থান ও জীবন নির্বাহের ব্যবস্থাদি করাও তার দায়িত্ব। পক্ষান্তরে উস্তাদ সবক পড়িয়ে, পড়া আদায় করে, আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েই স্বীয় দায়িত্ব শেষ করেন। সুতরাং পিতা ও উস্তাদের মধ্যে যে ব্যবধান, শাসনকর্তা ও অভিভাবক তথা ‘রব’ ও ‘হাকিমে’র মধ্যে সে ব্যবধান বিদ্যমান।

আল্লাহ্ তাআলা যদি শুধু শাসক হতেন, তাহলে ইসলাম একটি জীবন বিধানের নাম হত। আল্লাহ্ হচ্ছেন পরিপূর্ণ অভিভাবক। সুতরাং কেবল বিধান সমষ্টির নামই ইসলাম নয়; বরং আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভয়-ভীতি, শ্রদ্ধা-ভক্তি, প্রেম-ভালবাসার সমষ্টিতেই যে অর্ঘ্য নিবেদিত হয়, তা-ই হচ্ছে ইবাদত তথা ধর্ম পালন। নিছক জীবন বিধানই পূর্ণাঙ্গ ধর্ম নয়।

এতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম জীবন বিধান ও ভক্তির সমষ্টি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম, বিধান নয়। কেননা, বিধান ছাড়া শুধু ভক্তি করাকে বৈরাগ্যতা বলে, আর ভক্তি ছাড়া শুধু বিধান পালনকে নাস্তিকতা বলে। যাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভক্তি নেই, বরং বিধানের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আছে, তারা নাস্তিক্যবাদের দিকে ধাবিত হয়। আর যারা বিধান অনুসন্ধান না করে শুধু ভক্তি পোষণ করে, তারা বৈরাগ্যতার পথে ধাবিত হয়। ইসলামে যেভাবে নাস্তিকতার স্থান নেই, তেমনিভাবে বৈরাগ্যতার স্থানও নেই।

এখন আমরা বিধান সম্বলিত ৫০০ আয়াতের ব্যাপারে আলোচনা করব। ইসলাম ধর্মে আল্লাহ্ তাআলা যেসব বিধি-বিধান দিয়েছেন মানুষের জন্য, এগুলো শুধু কিছুকাল দুনিয়ায় বিচরণের জন্য নয়, বরং ক্বিয়ামত পর্যন্তের জন্য স্থায়ীভাবে পালনীয় করে দিয়েছেন। এক আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা পরিস্কারভাবে বিধান নাযিল সমাপ্ত করার কথা ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-

*** {সূরা মায়িদা-3 আয়াত}***

হযরত রাসূল আকরাম (সা.)এর বিদায় হজ্বের ভাষণের দিনকে উল্লেখ করে আল্লাহ্ তাআলা ঘোষণা করেন- “আজকের দিনে তোমাদের দ্বীনকে আমি পরিপূর্ণ করে দিয়েছি।” দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেওয়ার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম লিখেন, এই আয়াত যখন নাযিল হয়েছিল তখন যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা.) দুনিয়ায় আরো কয়েক মাস, মুহাররম, সফর, রবীউল আউয়ালের ১২ তারিখ অর্থাৎ তিন মাসাধিক কাল আমাদের মাঝে অবস্থান করেছিলেন। এই আয়াত নাযিল হওয়ার পরও আয়াত নাযিল হয়েছিল। যেমন-

*** {সূরা বাক্বারা-281 আয়াত}***

যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখেই যদি ধর্ম পরিপূর্ণ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে পরে আরো আয়াত নাযিল হল কিভাবে? যখন আয়াত নাযিল হওয়া বাকী রয়ে গেল, তখন ধর্ম পরিপূর্ণ হল কিভাবে? এ প্রশ্নের সমাধান কল্পে দু’য়ের মাঝে এক সামঞ্জস্য বিধান করে মুফাসসিরীনে কিরাম লিখেন- উক্ত আয়াত দ্বারা বিধি-বিধানগুলো পরিপূর্ণ হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে। ভক্তির আয়াতগুলোও পরিপূর্ণ হয়ে গেছে- তা বোঝানো হয়নি। অর্থাৎ আজকের দিনে বিধি-বিধান সংক্রান্ত আয়াতসমূহ সম্পূর্ণরূপে নাযিল হয়ে গেছে। এরপর বিধান সম্বলিত কোন আয়াত নাযিল হবে না। যদি আয়াত নাযিল হয়, তাহলে হবে ওয়ায, ভক্তি প্রভৃতির আয়াত। সুতরাং আমরা বুঝলাম, উক্ত আয়াত দ্বারা ইসলামের বিধি-বিধান সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়া সমাপ্ত হয়ে গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ফখরে বাঙাল’ আল্লামা তাজুল ইসলাম (রাহ্.)। জানিনা আপনারা তাঁর নাম শুনেছেন কি-না, কিংবা কেউ তাঁকে দেখেছেন কি-না। তিনি তৎকালে এই বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। সে সময় মিশরের প্রেসিডেন্ট দুনিয়ার বড় বড় আলেমগণকে দাওয়াত করেছিলেন একটি বিশ্ব উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ‘ফখরে বাঙাল’ মাওলানা তাজুল ইসলাম (রাহ্.) মিশরের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে যোগ দেন। এবং একটি অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে জনৈক মিশরী আলেম (উল্লেখ্য, মিশরের অধিকাংশ আলেম দাড়ি রাখেন না। বড় বড় আলেম-পণ্ডিত, হাদীস-ফিক্বাহ্ জানেন কিন্তু দাড়ি রাখেন না। জানা এক কথা, আর মানা আরেক কথা। এটি মুজতাহিদগণের আরেক যোগ্যতা যে, তিনি যা জানেন তাঁকে তা মানতে হবে। আপনি নিজেই যদি পাপাচারে লিপ্ত থাকেন, তাহলে কি বিশ্বাস যে, আপনি নিষ্ঠার সাথে ইজতিহাদ করছেন?), যার মুখে দাড়ি নেই, ‘ফখরে বাঙাল’ (রাহ্.)এর কাছে এসে দরখাস্ত করলেন যে, আপনার অধিবেশনে একটু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হবে কি-না? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কোন বিষয়ে বক্তব্য দিতে চান? বল্লেন, আমি নবীর সুন্নাত সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। দাড়ি নেই মুখে অথচ নবীর সুন্নাত সম্পর্কে বক্তব্য দিতে ইচ্ছুক!

আমাদের দেশে একটি তথাকথিত সুন্নী সম্প্রদায় আছে, যাদের মধ্যে সুন্নাতের নাম-গন্ধও নেই অথচ তারা নাকি সুন্নী। তার মুখে নবীর সুন্নাত নেই অথচ সুন্নাত সম্পর্কে বক্তব্য দিতে ইচ্ছুক। ফখরে বাঙাল (রাহ্.) তাকে বললেন-******

অর্থাৎ আপনি সুন্নাত সম্পর্কে বক্তৃতা দিতে ইচ্ছুক অথচ আপনার মধ্যেই সুন্নাত নেই। তখন সে আলেম বলেন-****

অর্থাৎ ইসলাম তো দাড়ির মধ্যে নিহিত নয়। তদুত্তরে ফখরে বাঙাল (রাহ্.) বলেন-*****

অর্থাৎ একথা ঠিক যে, দাড়ির মধ্যে ইসলাম নিহিত নয়, কিন্তু ইসলামের মধ্যে তো দাড়ি আছে। অতঃপর সে আলেম আর কোন যুক্তি পেশ করতে না পেরে নিরুত্তর হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সে বক্তব্য রাখার সুযোগ পায়নি।

দুনিয়ার বড় বড় পণ্ডিতবর্গ, যাদের নিকট ইমাম আযম আবু হানিফা (রাহ্.), ইমাম শাফিঈ (রাহ্.), ইমাম মালেক (রাহ্.) এবং ইমাম আহ্মদ ইব্নে হাম্বাল (রাহ্.)এর ইজতিহাদ পোষায় না, যাদের নিকট সাহাবায়ে কিরাম, তাবিঈন ও তাবে তাবিঈনে ঈযামের ইজতিহাদ পোষায় না, যারা নতুনভাবে ইজতিহাদ করতে চান, এধরনের কিছু আলেম ফখরে বাঙাল (রাহ্.)এর অধিবেশনে দরখাস্ত পেশ করলেন, আমরা পূর্ববর্তী ইমামগণের ইজতিহাদ মানব কেন? আমরা নতুনভাবে ইজতিহাদ করব। এমন পণ্ডিতের দেখা আপনারাও হয়তো পেয়ে থাকেন, যারা বলেন ইজতিহাদের দরজা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। একথা ঠিক, ইজতিহাদের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি, ক্বিয়ামত পর্যন্ত খোলা থাকবে। কিন্তু কোন ব্যক্তি সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, সেটাই দেখার বিষয়।

এরকম একটি দাবী ফখরে বাঙাল (রাহ্.)এর অধিবেশনে উপস্থাপিত হলে তিনি বলেন, ভাল কথা, আপনারা ইজতিহাদ করুন। তবে ইজতিহাদ করার আগে ইজতিহাদের মূল উৎস পবিত্র কুরআনের সকল আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সকল হাদীস, সবগুলোর দরকার নেই মাত্র একহাজার হাদীস সনদসহ মুখস্থ বলুন। একহাজার হাদীস সনদসহ মুখস্থ বলার মত একজন আলেমও পাওয়া গেলনা। অতঃপর পাঁচশত হাদীসের কথা বলা হলে পাঁচশত হাদীস সনদসহ মুখস্থ বলার মতও কাউকে পাওয়া গেলনা। সবশেষে বল্লেন, ইসলামের বিধি-বিধান প্রমাণিত হয়েছে এমন অন্তত একশত হাদীস সনদ এবং বর্ণনাকারীদের জীবনেতিহাসসহ মুখস্থ বলুন। কিন্তু এরকম একজন আলেমও পাওয়া গেলনা। এরপর বল্লেন, যে হাদীস দ্বারা বিধি-বিধান প্রমাণিত সে হাদীস আপনারা বলতে পারেননি, ইজতিহাদ করবেন কিসের ভিত্তিতে?

উত্তরে তারা বল্লেন, মনে করুন আমার একটা হাদীস জানা আছে, আরেক জনের আরেকটা জানা আছে, আরেক জনের আরেকটা জানা আছে। এভাবে সকলের জ্ঞানের ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে ইজতিহাদ করব। ফখরে বাঙাল (রাহ্.) বল্লেন, একটি ঘোড়ার শরীরে যে পরিমাণ শক্তি আছে, একহাজার ছাগলের সম্মিলিত শক্তি হয়ত সমপরিমাণ হবে, কিন্তু এক হাজার ছাগল দিয়ে কি একটি ঘোড়ার কাজ হবে? ঠিক তেমনিভাবে এক হাজার আলেম হয়ত এক হাজার হাদীস মুখস্থ বলতে পারবেন, কিন্তু পূর্ববর্তী ইমামগণের যে প্রত্যেকেই প্রায় সবগুলো হাদীস মুখস্থ জানতেন, তাঁদের সমতুল্য যোগ্যতা হাজার হাজার আলেমের সম্মিলিত যোগ্যতা হবে কি? কখনো হবে না। যেমন হবে না এক হাজার ছাগল দিয়ে একটি ঘোড়ার কাজ।

আজকাল আমাদের সমাজে একদল পণ্ডিতের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা বলেন আমরা মাযহাব মানব কেন? ইমামদের অনুকরণ করব কেন? কুরআন-হাদীস আমাদের হাতে আছে। এগুলো দেখে দেখে আমল করব।

পাকিস্তানের কৃতি সন্তান মুফ্তী শফী (রাহ্.)এর সুযোগ্য সন্তান আল্লামা মুফ্তী তক্বী উসমানী, যিনি পাকিস্তানের শরীয়া বোর্ডের প্রধান বিচারপতি, তাঁর নিকট একবার এধরনের নামধারী এক ব্যক্তি হাদীসের কিছু কিতাবাদী নিয়ে এসে বল্ল- আমি মাযহাব মানিনা, হাদীস মানি। বলাবাহুল্য, এরা নিজেদেরকে কখনো আহ্লে হাদীস, কখনো লা-মাযহাবী, কখনো গাইরে মুক্বাল্লিদ আবার কখনো ছলফী বলে দাবী করে। এই চার নামে এরা পরিচিত। যে সমাজে যে নামে চলা যায় সে সমাজে সে নামে পরিচিত হয়। আসলে এরা সবাই এক ও অভিন্ন। সেই ব্যক্তি বলল- আমি মাযহাব মানি না, হাদীস মানি। হাদীসে আছে, পায়ু পথে বায়ু বের হলে ওয নষ্ট হয়ে যায়। এখন বায়ু বের হল কি-না এটা প্রমাণ হবে শব্দ শুনে অথবা দুর্গন্ধ পেয়ে। এটি একটি হাদীস। এই হাদীস অনুযায়ী যদি শব্দ এবং দুর্গন্ধ এ দু’টোর কোনটি পাওয়া না যায়, তাহলে এরূপ বায়ু নির্গত হলে ওয নষ্ট হবে না।

উক্ত লোক কোন মাযহাব মানে না। মানে রাসূলের হাদীস। অথচ ভিন্ন আরেক হাদীসের বর্ণনায় উল্লেখ আছে, শব্দ শুনলে বা দুর্গন্ধ পেলে বায়ু নির্গত হওয়া প্রমাণ হবে- এটা সবার ক্ষেত্রে নয়, বরং যাদের সন্দেহ জাগে যে, বায়ু নির্গত হল কি-না, শুধুমাত্র তাদের জন্য।

এখানে লোকটি উপরোক্ত হাদীস দু’টির একটির খবর রাখে আরেকটির খবর রাখে না। যেটির খবর রাখে সেটির উপর আমল করছে। কিন্তু যে হাদীসটির খবর রাখে না সেটির উপর আমল করছে না। অথচ লোকটির দাবী মতে সে মাযহাব মানে না, হাদীস মানে। এটাই কি হাদীস মানার স্বরূপ। আর জানা হাদীসটির উপর আমল করতে গিয়ে কি সে সারা জীবন বায়ু ছেড়ে ওয না করে নামায পড়ে যাচ্ছে না?

১৯৯৬ সনে কুয়েত সফরের সময় জনৈক আহ্লে হাদীস ছলফী আমাকে প্রশ্ন করেন- মাগরিবের নামাযের আযানের পর দুই রাকাআত নফল নামায পড়লেন না কেন? অথচ হাদীসে আছে-******

অর্থাৎ- প্রতি ওয়াক্ত নামাযের আযানের পর ইক্বামতের আগে কিছু নফল নামায আছে। উক্ত হাদীসের উপর আমল করলেন না কেন? যে নবীর হাদীস মানল না সে নবীকে মানল কোথায়?

হানাফী মাযহাবের বিধান হচ্ছে- মাগরিবের আযানের পর ইক্বামতের আগে কোন নফল নামায নেই। তবে অন্য ওয়াক্তে আছে।

আমি তাকে বল্লাম- এ ব্যাপারে রাসূলের হাদীস কি একটাই, না আরো আছে? সে বল্ল, আর কি আছে? আমি বল্লাম- আরেকটি হাদীসে যে আছে-*****

অর্থাৎ- “প্রত্যেক আযান আর ইক্বামতের মাঝে নফল নামায আছে কিন্তু মাগরিবে নেই।” আপনি তো “নফল নামায আছে” সম্বলিত হাদীসটি শিখেছেন “কিন্তু মাগরিবে নেই” সম্বলিত হাদীসটি শিখেননি।

নবীর সকল হাদীস একমাত্র মুজতাহিদ ইমামগণ ছাড়া দুনিয়ায় আর কারো জানা নেই। কাজেই সকল হাদীসের উপর আমল করতে হলে মাযহাব ছাড়া কোন পথ নেই।

হানাফী মাযহাবের আরেকটি মাসআলা হচ্ছে, তাকবীরে তাহ্রীমা কোথায় বাঁধতে হবে তৎসংক্রান্ত এক হাদীসে নাভীর উপরে হাত বাঁধতে বলা হয়েছে। আরেক হাদীসে সিনার উপর বাঁধতে বলা হয়েছে। এখানে দু’রকম হাদীস পাওয়া গেল। হানাফী মাযহাব মতে যেহেতু দু’টোই রাসূলের হাদীস। সুতরাং যথাসম্ভব রাসূলের কোন একটি হাদীসের উপর আমল বাদ দেওয়া যাবে না। নাভীর উপর হাত বাঁধার হাদীস পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, আর সিনার উপর হাত বাঁধার হাদীস মহিলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এহেন সমন্বয় সাধন করে তবুও সকল হাদীসের উপর আমল নিশ্চিত করতে হবে। এই চিন্তা থেকেই হানাফী মাযহাবে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। কিন্তু তথাকথিত আহ্লে হাদীসের দাবীদার যারা, তারা নবীর হাদীসের উপর আমলের দাবী করে এক হাদীস অনুযায়ী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সিনার উপর হাত বাঁধে। অথচ নাভীর উপর হাত বাঁধার হাদীসের উপর আমল ছেড়ে দিল। এর নাম আহ্লে হাদীস হল কি করে?

১৯৯৯ সালে মধ্যপ্রাচ্যের জনৈক শেখ আমাকে প্রশ্ন করলেন- আবু হানীফা আমাদের নবী, না মুহাম্মদ (সা.)? আবু হানীফার কথায় দুই মিছিলে আসর নামায পড়ব, না মুহাম্মদ (সা.)এর কথায় এক মিছিলে আসর নামায পড়ব? সাধারণ মানুষের জন্য এটা একটা কঠিন মাস্আলা। আলেমদের জন্য কঠিন নয়। সকলের জন্য একটু সহজবোধ্য করে বলার চেষ্টা করছি।

আসর নামাযের ওয়াক্ত সম্পর্কিত দু’টি হাদীস বর্ণিত আছে। এজন্য মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে দ্বিমত পরিলক্ষিত হয়। আগেই উল্লেখ করেছি, কুরআন-হাদীসের বর্ণনা ভঙ্গির বিভিন্নতাসহ বিভিন্ন কারণে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য হতে পারে। কিন্তু মতপার্থক্য হলেও সব মতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এসব মতপার্থক্যের কারণসমূহের মধ্যে প্রথম কারণ হচ্ছে, কোন বিষয়ে যদি কুরআন-হাদীসে কোন প্রকার বিবরণ উল্লেখ না থাকে, বরং মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতিহাদ করে তা বের করতে হয়, তখন মতভেদ সৃষ্টি হয়। অথবা কুরআন-হাদীসে আছে বটে, কিন্তু সুস্পষ্ট ও পরিস্কার ভাষায় নেই, বরং আকার-ইঙ্গিতে রয়েছে। সে ইঙ্গিতটা সনাক্ত করতে আবার ইজতিহাদ করতে হয়, তখন মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে দ্বিমত সৃষ্টি হয়। অথবা আকার-ইঙ্গিতে নয়, বরং সুস্পষ্ট ও পরিস্কার ভাষায়ই আছে কিন্তু ভাষার প্রয়োগ ক্ষেত্রের মাঝে ব্যবধান রয়েছে। এই প্রয়োগ ক্ষেত্রের ব্যবধানের কারণে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়।

দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কুরআনের এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে-

*** {সূরা বাক্বারা-228 আয়াত}***

অর্থাৎ তালাক প্রাপ্তা মহিলারা তিন ‘কুরু’ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, অন্য স্বামীর নিকট বিবাহ বসবে না। ‘কুরু’ আরবী শব্দ। এটি পরস্পর বিরোধী দ্ব্যর্থবোধক। ‘কুরু’ শব্দের এক অর্থ হচ্ছে মহিলাদের ঋতুগত অবস্থা। আরেক অর্থ হচ্ছে মহিলাদের পবিত্রকালীন অবস্থা। এখানে ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) ঋতুগত অবস্থাকে গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফিঈ (রাহ্.) পবিত্রকালীন অবস্থাকে গ্রহণ করেছেন। কুরআন-হাদীসের এসব বর্ণনা ভঙ্গির বিভিন্নতার কারণে মুজতাহিদগণের ইজতিহাদে পার্থক্য হয়েছে।

একই কারণে ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.)এর মতে সর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পর থেকে সর্যাস্ত পর্যন্ত বিকাল বেলার এই সময়টার বেশীর ভাগ সময় হল যোহরের ওয়াক্ত আর অল্প সময় হল আসরের ওয়াক্ত। যারা এক মিছিল, দুই মিছিল বুঝবেন না তাদের বোঝার সুবিধার্থে এভাবে বলা হল। এ ব্যাপারে দুই ধরনের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে আছে- বেশীর ভাগ সময় থাকা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল আসর নামায পড়েছেন। আরেক হাদীসে আছে- বেশীর ভাগ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর রাসূল (সা.) আসর নামাযের সময় ধার্য করে দিয়েছেন। একই বিষয়ে একই রাসূলের পক্ষ থেকে দুই রকম বর্ণনা থাকবে কেন? এরূপ প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। মূলতঃ স্থান-কাল-পাত্র-অবস্থাভেদে এরূপ হয়ে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যের সেই শেখ আমাকে বল্লেন- ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) যে বলেন, বেশীর ভাগ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর আসর নামায পড়তে হবে, আমি তা মানি না। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর কথা মানি। তিনি বলেছেন- কম সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে আসর নামায পড়তে হবে। তিনি তার দাবীর স্বপক্ষে বুখারী শরীফের একটি হাদীস পেশ করেন। আমি বল্লাম, আপনি যেরূপ আবু হানীফা (রাহ্.)কে নবী মানেন না, আমিও তেমনি আবু হানীফা (রাহ্.)কে নবী মানি না। আপনার নবী যেমন মুহাম্মদ (সা.), তেমনি আমার নবীও তিনিই। দুনিয়ায় আমার নবীর এমন কোন হাদীস নেই যেখানে এক মিছিলে আসর পড়ার কথা বলা হয়েছে। আপনার দাবীর স্বপক্ষে একটি হাদীসও আপনি দেখাতে পারবেন না। তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। আমি বল্লাম- আপনি যদি এরূপ কোন সহীহ্ হাদীস দেখাতে পারেন, তাহলে হানাফী মাযহাব ত্যাগ করে আপনার কথা মেনে নেব। তিনি বুখারী শরীফের একটি হাদীস দেখালেন। তাতে বর্ণিত হয়েছে, প্রথম প্রথম যখন নামায ফরয হয়, তখন হযরত জিব্রাঈল (আ.) হুযর (সা.)কে এক মিছিলে আসর নামায পড়িয়েছেন। এক মিছিল কথাটার অর্থ আপনারা ধরুন সর্য পশ্চিমাকাশে হেলে যাওয়ার কিছু সময় পর। আর দুই মিছিল অর্থ ধরুন সর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার অনেক সময় পর। শেখকে প্রশ্ন করলাম, রাসূলের এই হাদীসটি ‘ক্বাওলী’ না ‘ফে’লী’। হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.)এর হাদীস তিন প্রকার। এক. ‘ক্বাওলী’, দুই. ‘ফে’লী’, তিন. ‘তাক্বরীরী’। রাসূলের উক্তিকে ক্বাওলী হাদীস, কর্মকে ফে’লী হাদীস এবং সমর্থনকে তাক্বরীরী হাদীস বলা হয়। হাদীস শাস্ত্রের একটি মূলনীতি হচ্ছে, ক্বাওলী এবং ফে’লী হাদীসের মধ্যে যদি বিরোধ দেখা দেয় এবং উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কোন উপায় না থাকে, তাহলে ফে’লী হাদীসের উপর ক্বাওলী হাদীস প্রাধান্য পাবে।

শেখকে বল্লাম, আপনার পেশকৃত হাদীসটি ফে’লী হাদীস। দেখুন বুখারী শরীফের আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফজর থেকে যোহর পর্যন্ত এক দল কর্মচারী কর্ম করে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক পেল, যোহর থেকে আসর পর্যন্ত আরেক দল কর্মচারী কর্ম করে একই পরিমাণ পারিশ্রমিক পেল। আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত আরেক দল কর্মচারী কর্ম করে একই পরিমাণ পারিশ্রমিক পেল। প্রথম দল ইহুদীদের দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় দল খ্রীস্টানদের দৃষ্টান্ত। আর তৃতীয় দল আমার উম্মত মুসলমানদের দৃষ্টান্ত।

উক্ত হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) সময়ের ব্যবধান বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ফজর থেকে যোহর পর্যন্ত অনেক লম্বা সময়, যোহর থেকে আসর পর্যন্ত মাঝারী লম্বা সময়, আর আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত স্বল্প সময়। শেখকে বল্লাম- আমার পেশকৃত হাদীসটি হচ্ছে ক্বাওলী হাদীস। আপনারটি হচ্ছে ফে’লী হাদীস। আপনার হাদীসটি যেমন বুখারী শরীফের, তেমনি আমারটিও বুখারী শরীফের। এবার আপনার এবং আমার পেশকৃত ক্বাওলী এবং ফে’লী হাদীসের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তখন পূর্বোক্ত মূলনীতি অনুযায়ী ক্বাওলী হাদীস প্রাধান্য পাবে।

সুতরাং ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) কর্তৃক বর্ণিত মাস্আলা হুযর (সা.)এর বিশুদ্ধ ক্বাওলী হাদীসের অনুকূলে। কাজেই আমি মান্য করি ইমাম আবু হানীফাকে নয়, বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)কে। কিন্তু আপনার ইমাম আবু হানীফার মাস্আলা না মানার কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর হাদীস মানা সম্ভব হল না।

উপরোক্ত দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে আমি আপনাদের যে কথাটি বোঝাতে চাচ্ছি সেটি হচ্ছে, চার মাযহাবের চার ইমাম, চার ইমামের চার মাযহাব এগুলোর কোন একটি যদি বর্তমান দুনিয়ার কেউ না মানে, তাহলে তার পক্ষে কুরআন-হাদীস মানা সম্ভব হবে না। কারণ ফিক্বাহ্ শাস্ত্রের এসব ইমামগণ আমাদের থেকে অনেক অনেক বেশী কুরআন-হাদীস জানতেন এবং বুঝতেন। তাঁদের সাথে আমাদের কোন তুলনাই চলতে পারে না। আল্লাহ্ তাআলা নিজেই পরিস্কার ভাষায় কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন-

*** {সূরা নাহল-43 আয়াত}***

অর্থাৎ- তোমরা যদি না জান, তাহলে যারা জানে তাদের থেকে জেনে আমল কর। এরপর সেই ছলফী শেখকে বল্লাম- দেখুন! আপনি আবু হানীফা (রাহ্.)কে মান্য করেন, না ইমাম বুখারী (রাহ্.)কে মান্য করেন? সলফী তো হচ্ছে পূর্ববর্তীদের অনুসারীরা। আর পরবর্তীদের অনুসারীরা খলফী। ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) হচ্ছেন আগের এবং ইমাম বুখারী (রাহ্.) হচ্ছেন তাঁর পরের। আপনারা পরবর্তীদের ইমাম বুখারী (রাহ্.)কে মান্য করে সলফী দাবী করেন কিভাবে? আর আমাদেরকে বলেন আমরা সলফী না। অথচ আমরা মান্য করি পূর্ববর্তীদের, আপনাদের সে খবর আছে কি? উল্লেখ্য, ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.) ইমাম বুখারী (রাহ্.)এর পিতার আমলের লোক ছিলেন।

ফিক্বাহ্ শাস্ত্রের কিতাবে পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ রয়েছে যে, বর্তমান দুনিয়ায় যেহেতু ইমাম আবু হানীফা (রাহ্.)সহ অন্যান্য ইমামগণের ন্যায় কুরআন-হাদীসের যথার্থ জ্ঞানধারী আর কেউ নেই। কাজেই যে ব্যক্তি বলবে মাযহাব মানি না, কুরআন-হাদীস মানি, সে বোকা নয় কি? সে কুরআন-হাদীস সম্পর্কে কিছুই জানে না, মানবে কি? কুরআন-হাদীস মানতে হলে চার মাযহাবের কোন এক মাযহাব মানতে হবে। যারা মাযহাব মানে তারাই কুরআন-হাদীস মানে। যারা মাযহাব মানে না, প্রকৃতপক্ষে তারা কুরআনও মানে না, হাদীসও মানে না। আল্লাহ্ তাআলা আমাদের সবাইকে সকল মুজতাহিদ ইমাম এবং তাঁদের মাযহাব অনুসারে কুরআন-হাদীস মত জীবন-যাপন করার সৌভাগ্য দান করুন। আমীন॥

2 thoughts on “মাযহাব ও তার অপরিহার্যতা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s