মাযহাব ও এর শরয়ী ফায়সালা

মাযহাব ও এর শরয়ী ফায়সালা

আল্লাহ পাক তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমারা আল্লাহ পাক-এর ইতায়াত (অনুসরণ) করো এবং আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর রয়েছে তাঁদের ইতায়াত করো। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে আল্লাহ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করো। অর্থাৎ যেই উলিল আমর আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেশী অনুগত ও নৈকট্যশীল বা যার মতের স্বপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলীল-আদিল্লাহ বেশী রয়েছে তাঁকে বা তাঁর মতকে অনুসরণ করবে। যদি তোমরা আল্লাহ পাক ও ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাক। এটাই কল্যাণকর এবং তা’বিল বা ব্যাখ্যার দিক দিয়ে উত্তম।” (সূরা নিসা ৫৯)

কুরআন শরীফের এ আয়াত শরীফের মধ্যে আল্লাহ পাক বান্দার জন্য ইতায়াত বা অনুসরণের কাইফিয়াত ও তরতীব বর্ণনা করেছেন।

প্রথমতঃ আল্লাহ পাক-এর ইতায়াতের কথা বলা হয়েছে। তা তো কেবল নবী-রসূল আলাইহিমুছ ছালাত ওয়াস সালামগণের পক্ষেই সম্ভব। কারণ তাঁদেরকেই আল্লাহ পাক ওহী নাযিলের মাধ্যমে সবকিছু জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ করেন, “আমি তাঁদের প্রতি ওহী নাযিল করতাম।” (সূরা ইউসূফ ১০৯, সূরা নহল ৭৪, সূরা আম্বিয়া ৭)

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াতের কথা বলা হয়েছে। এটা তো হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের জন্যই খাছ। কারণ, আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁরাই দেখেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে ওহীর ইলম জেনে, শুনে, বুঝে আমল করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত করলো সে মূলতঃ আল্লাহ পাক-এরই ইতায়াত করলো।”(সূরা নিসা ৮০)

তৃতীয়তঃ উলিল আমরের ইতায়াতের কথা বলা হয়েছে। এটাই মূলতঃ পরবর্তীকালের উম্মতের জন্য নির্ধারিত বিধান। এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফের উল্লিখিত আয়াত শরীফসহ আরো বহু আয়াত শরীফ ইরশাদ হয়েছে। যেমন কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা ঈমান আনো যেরূপ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ঈমান এনেছেন।” (সূরা বাক্বারা ১৩)

“(ঈমান ও আমলে) সর্বপ্রথম প্রথম স্থান অধিকারী আনছার ও মুহাজির অর্থাৎ হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ এবং ইখলাছের সাথে উক্ত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের অনুসরণকারী সকলের প্রতিই আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট, তাঁরাও আল্লাহ পাক-এর প্রতি সন্তুষ্ট। হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ও তাঁদের অনুসারীদের জন্য এরূপ বেহেশত নির্ধারিত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত হতে থাকবে, তাঁরা চিরদিন সে বেহেশতে অবস্থান করবেন, যা তাঁদের বিরাট সফলতা।” (সূরা তওবা ১০০)

“যে ব্যক্তি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচরণ করে, তার কাছে সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং মু’মিনণের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐদিকেই ফিরাবো যে দিকে সে রুজু হয় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। আর জাহান্নাম নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান।” (সূরা নিসা ১১৫)

এখানে মু’মিনণের পথ বলতে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের পথ, অতঃপর তাবিয়ীন, তাবি তাবিয়ীন ও ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের পথকে বুঝানো হয়েছে।

আল্লাহ পাক সূরা ফাতিহার মধ্যে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দান করে সে পথে চলার জন্য দু’য়া শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, “(আয় বারে ইলাহী!) আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শণ করুন। তাঁদের পথ যাদেরকে আপনি নিয়ামত দান করেছেন।” (সূরা ফাতিহা ৫-৬)

কাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে সে প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ পাক নিয়ামত দান করেছেন- নবী, ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও ছালিহগণকে এবং তাঁরাই উত্তম বন্ধু বা সঙ্গী।” (সূরা নিসা ৬৯)

আল্লাহ পাক সূরা ফাতিহার মধ্যে নবী, ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও ছালিহগণের পথ তলব করতে বলেছেন এবং তাঁদেরকে অনুসরণ-অনুকরণ করে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করতে বলেছেন। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, পথ হচ্ছে দু’টি। প্রথমতঃ নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথ। দ্বিতীয়তঃ ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও ছালিহগণের পথ তথা উলিল আমরগণের পথ।

উল্লেখ্য, উলিল আমরগণের মধ্যে প্রথম স্তরের উলিল আমর হচ্ছেন হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ। তাঁরা প্রত্যেকেই উম্মাহর জন্য অনুসরনীয়, অনুকরণীয় ও পথপ্রদর্শক ছিলেন।

আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন, “যদি তোমরা না জান তাহলে আহলে যিকিরগণের নিকট জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও।” (সূরা আম্বিয়া ৭)

অত্র আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- “আমরা সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণই আহলে যিকিরের অন্তর্ভূক্ত।” (তাফসীরে কুরতুবী)

অর্থাৎ আল্লাহ পাক নিজেই উম্মাহর জন্য কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ বুঝতে ও আমল করতে উলিল আমরগণের অর্থাৎ সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ইতায়াত ও পায়রবী করাকে ফরয-ওয়াজিব সাব্যস্ত করেছেন। বিশেষ করে হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের যামানা অতীত হওয়ার পর উম্মাহর জন্য মাযহাবের চতুষ্ঠ্যের ইমামগণের অনুসরণ ব্যতীত কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ মুতাবিক আমল করা সম্ভব নয়। কারণ, এই ইমাম ব্যতীত আর কেউই শরীয়তের যাবতীয় মাসায়ালা-মাসায়িল লিপিবদ্ধ করেননি। কাজেই, শরীয়তের প্রতি আমল করতে গেলে এই চার ইমামের একজনকে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এটা ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত। যদি কোন মাযহাব মান্য করা না হয় তাহলে শরীয়ত থেকে খারিজ হয়ে যাবে।

হাদীস শরীফের দৃষ্টিতে মাযহাব গ্রহন করা ফরয-ওয়াজিবঃ

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি শরীয়তের সঠিক তরীক্বা অনুসরণ করতে চায়, তার উচিত হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর প্রিয় হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের অনুসরণ করা। সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণই উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম, তাঁরা আত্মার দিক দিয়ে অধিক পবিত্র, ইলমের দিক দিয়ে গভীর ইলমের অধিকারী, তাঁরা লোক দেখানো কোন আমল করতে জানেনা, আল্লাহ পাক তাঁদেরকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –এর সাথী হিসেবে মনোনীত করেন। সুতরাং তাঁদের মর্যাদা-মর্তবা, ফাযায়েল-ফযীলত, শান-শওকত সম্পর্কে অবগত হও এবং তাঁদের কথা ও কাজের অনুসরণ কর এবং যথাসম্ভব তাঁদের সীরত-ছুরতকে গ্রহণ কর, কারণ তাঁরা হিদায়েত ও সিরাতুল মুস্তাকীন –এর ঊপর দৃঢ়চিত্ত ছিলেন।” (মিশকাত শরীফ)

“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্‌ফাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সম্পর্কে আল্লাহ পাককে ভয় কর, আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সম্পর্কে আল্লাহ পাককে ভয় কর। আমার পরে তাঁদেরকে তিরিস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। তাঁদেরকে যারা মুহব্বত করলো, তা আমাকে মুহব্বত করার কারণেই। এবং তাঁদের প্রতি যারা বিদ্বেষ পোষণ করলো, তা আমাকে বিদ্বেষ পোষণ করার কারণেই। তাঁদেরকে যারা কষ্ট দিলো, তারা আমাকে কষ্ট দিলো, তারা আল্লাহ পাককে কষ্ট দিলো। আর যারা আল্লাহ পাককে কষ্ট দিলো, তাদেরকে আল্লাহ পাক শীঘ্রই পাকড়াও করবেন।” (বুখারী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্‌ফাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আল্লাহ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে নামায পড়লেন। অতঃপর আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে এমন মর্মস্পর্শী নছীহত করলেন যাতে আমাদের চক্ষুসমূহ অশ্রুসিক্ত এবং অন্তরসমূহ বিগলিত হলো। এ সময় একজন সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলে উঠলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এটা যেন বিদায় গ্রহণকারীর শেষ নছীহত। আমাদেরকে আরো কিছু নছীহত করুন। তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাদেরকে আমি আল্লাহ পাককে ভয় করা এবং তোমাদের ইমাম বা উলিল আমরের কথা মান্য করা এবং তাঁর অনুগত থাকার জন্য নছীহত করছি যদিও তিনি হাবশী গোলাম হন। আমার বিদায়ের পর তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে সে অনেক ইখতিলাফ বা মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমারা আমার সুন্নতকে এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রশিদীনের সুন্নতকে মাড়ির দাঁত দ্বারা শক্তভাবে আঁকড়িয়ে ধরবে।” (আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত)

“হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার পর আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইখতিলাফ (মতবিরোধ) সম্পর্কে আমি আল্লাহ পাককে জিজ্ঞাসা করেছি।’ আল্লাহ পাক আমাকে বললেন, ‘হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নিশ্চয়ই আপনার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আমার নিকট তারকা সমতুল্য। প্রত্যেকেরই নূর রয়েছে। তবে কারো নূরের চেয়ে কারো নূর বেশী। সুতরাং, তাদের যে কোন ইখতিলাফকে যারা আঁকড়িয়ে ধরবে, তারা হিদায়াত পেয়ে যাবে। কারণ তাঁদের ইখতিলাফগুলো আমার নিকট হিদায়াত হিসাবে গণ্য।’ অতঃপর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ প্রত্যেকেই তারকা সাদৃশ্য, তাঁদের যে কাউকে তোমারা অনুসরণ করবে, হিদায়াত প্রাপ্ত হবে’।” (মিশকাত শরীফ)

হাদীস শরীফের উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বর্ণনার দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, উলিল আমরের অনুসরণ ব্যতীত আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা এবং কুরআন-সুন্নাহ তথা শরীয়ত মুতাবিক চলা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রদর্শিত বা অনুসৃত পথই সতন্ত্র একটা মাযহাব ছিলো। যার অনুসরণে হযরত তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ চলতেন।

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, মাযহাবের উৎপত্তি হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ থেকে শুরু হয়েছে। আর তাবিয়ীনে কিরাম এবং তাবি তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মধ্যে অনেকেই মাযহাবের ইমাম ছিলেন। কেননা শুরুর যামানায় অনেকেই মুজতাহিদ ছিলেন, উনারা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ পড়ে নিজেই ইজতিহাদ করে চলতেন, কারো অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু তাবিয়ীনে কিরাম এবং তাবি তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের যুগ অতিবাহিত হওয়ার শেষ দিকে অর্থাৎ দু’শত হিজরীর পর ইমাম-মুজতাহিদ্গণ অনুসন্ধান করে দেখলেন যে, কেবলমাত্র চার ইমামের মধ্যেই দ্বীনের পরিপূর্ণ মাসায়ালা রয়েছে। তাই চতুর্থ হিজরী শতকে তাঁরা এ ফতওয়া উপর ইজমা বা ঐক্যবদ্ধ হলেন যে, চার মাযহাবের যে কোন এক মাযহাব অনুসরণ করা ফরয-ওয়াজিব এবং তা অমান্য করা বিদায়াতী ও গুমরাহী।

হাদীস শরীফে রয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-এর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইলম তিন প্রকার। এক- আয়াতে মুহকামাহ, দুই- সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নতসমূহ, তিন- ফরীদ্বায়ে আদিলাহ বা ন্যায়সঙ্গত ফরযসমূহ। ইহা ব্যতীত যা রয়েছে তা অতিরিক্ত।” (আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত)

মূলতঃ মাযহাবের ইমামগণের অনুসরণ এবং ত্বরীক্বার ইমামগণের অনুসৃত পথের অনুসরণই হচ্ছে হাদীস শরীফে বর্ণিত ফরীদ্বায়ে আদিলাহ অন্তর্ভূক্ত।

মুসাল্লামা’ কিতাবে আছে, “যে ব্যক্তি মুজতাহিদ (মতলক্ব) নয় যদিও সে আলিম, তথাপি তা জন্য তাক্‌লীদ অর্থাৎ কোন এক মাযহাবের অনুসরণ করা ফরয।”

হযরত মুল্লা জিউন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “সাধারণের জন্য আলিমগণকে এবং আলিমদের জন্য মুজতাহিদগণকে অনুসরণ করা ওয়াজিব।” তিনি আরো বলেন, “চার মাহাবের কোন একটাকে অনুসরণ করা ওয়াজিব।” (তাফসীরে আহ্‌মদিয়াত)

হযরত আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যারা মুজতাহিদ (মতলক্ব)-এর ক্ষমতা রাখে না, তাদের কোন এক ইমামের মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব।” (জামউল জাওয়াম)

হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “কোন এক মাযহাবের অনুসরণ করা ওয়াজিব।” (ইহ্‌ইয়াউ উলুমিদ্দীন)

এছাড়াও হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি “আল মালুম”কিতাবে,

হযরত আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “যাজিযুল মাযাহিব” কিতাবে,

হযরত আল্লামা বাহারুল উলূম রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাহ্‌‌রির” কিতাবে,

হযরত আল্লামা ইবনে আব্দুর নূর রহমতুল্লাহি আলাইহি “হারী”কিতাবে,

হযরত শাহ্‌ ওয়ালীউল্লাহ্‌ মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি “ইকদুল জিদ” ও “ইনছাফ” কিতাবে,

“তাফসীরে আযীযী”, “সিফরুছ সায়াদাত” কিতাবে,

“ফয়জুল হারামাইন” কিতাবে কোন এক মাযহাবের অনুসরণে চলা ওয়াজিব বলা হয়েছে, অন্যথায় গুনাহ হবে।

হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “কিমিয়ায়ে সায়াদাত”কিতাবে বলেন, “কোন এক মাযহাব মান্য না করলে মহাপাপী হবে।”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s