বিদ`আত ও কুসংস্কার

মীলাদ মাহফিল প্রসঙ্গ

মীলাদ এর আভিধানিক অর্থ জন্ম ,জন্মকাল ও জন্মতারিখ। পরিভাষায় মীলাদ বা মীলাদ মাহফিল বলতে বোঝায় রাসূল সা. এর জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা বা জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনার মজলিস। তবে আমাদের দেশের প্রচলিত মীলাদ মাহফিল বলতে সাধারণতঃ বোঝায় ঐ সব অনুষ্ঠান , যেখানে মওজূ’ রেওয়ায়েত সম্বলিত তাওয়ালূদ পাঠ করা হয় , রাসূল সা. এর প্রশংসামূলক বিভিন্ন কাসীদা পাঠ করা হয় , ও সমস্বরে দুরূদ শরীফ পাঠ করা হয় । অনেক স্থানে দুরূদ পাঠ করার সময় রাসূল সা. মজলিসে হাজির-নাজির হয়ে যান এই বিশ্বাসে কেয়ামও করা হয়। এসব করা হলে রাসূল সা. এর জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা হোক বা না হোক সেটাকে মীলাদ মাহফিল মনে করা হয়। আর এসব না হলে অর্থাৎ , তাওয়ালূদ পাঠ না হলে , সমস্বরে দুরূদ পাঠ না হলে সেটাকে মীলাদ মনে করা হয়না , চাই সে মজলিসে রাসূল সা. এর আলোচনা করা হোক বা না হোক। তাই প্রচলিত মীলাদ-মাহফিল আর সত্যিকার পারিভাষিক মীলাদ-মাহফিল তথা নবী কারীম সা. এর জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনার মাহফিল আমাদের সমাজে দুটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে।

 মীলাদ-মাহফিলের হুকুম

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে , আমাদের দেশে প্রচলিত মীলাদ- মাহফিল আর প্রকৃত মীলাদ-মাহফিল তথা নবী কারীম সা.এর বরকতময় জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা দু’টি ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেমতে প্রচলিত মীলাদ মাহফিল বিদ‘আত আর প্রকৃত মীলাদ-মাহফিল তথা রাসূল সা. এর করকতময় জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনার মাহফিল মুস্তাহাব । এ ব্যাপারে ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যার কিতাবুল বিদ‘আতে উল্লেখ করা হয়েছে,

নবী কারীম সা. এর জন্ম-বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা সভা অত্যন্ত পূণ্য ও বরকতময় যখন সেটা সব ধরণের প্রচলিত শর্ত-বন্ধন থেকে মুক্ত হবে। অর্থাৎ, সব ধরনের শর্ত-বন্ধন তথা সময় নিদিষ্ট করণ, কেয়াম ও জাল রেওয়ায়েত বর্ণনা করন ইত্যাদি ছাড়া শুধু নবী কারীম সা. এর জন্ম-বৃত্তান্তের আলোচনা কল্যাণ ও পূণ্যময় কিন্তু বর্তমান প্রচলিত মীলাদ সম্পূর্ণ শরী‘আত বিরোধী এবং বিদ‘আত ও গোমরাহী ।

 একটি সন্দেহ-নিরসন

যারা প্রচলিত মীলা-মাহফিলের বিরোধিতা করেন , প্রচলিত মীলাদ পন্থীদের পক্ষ থেকে তাদের ব্যাপারে নবী কারীম সা. এর প্রতি মুহাব্বত- ভালবাসা তথা প্রেম কম থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। অতএব এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , নিঃসন্দেহে নবী কারীম সা. এর প্রতি মুহাব্বত ও ভালবাসা পোষণ করা প্রকৃত ঈমানের দাবী । আর নবী কারীম সা. এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক বিবরণ এবং নবী কারীম সা. এর প্রতিটি কথা ও কাজকে বর্ণনা করা আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের মহান উপায়। তাই জীবনের এমন কোন মুহুর্ত নেই যখন নবী কারীম সা. এর জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করা নিষেধ। কিন্তু প্রচলিত মীলাদ-মাহফিলের বৈধতার জন্য দু’টো বিষয় দেখার রয়েছে ।

 দেখতে হবে প্রচলিত মীলাদ-মাহফিল নবী কারীম সা. সাহাবায়ে কেরাম এবং খাইরুল কুরুনের কারও থেকে প্রমাণিত কিনা ? যদি প্রমাণিত হয় , তাহলে মুসলামনদের এতে কুন্ঠাবোধ করার কোন অবকাশ নেই । কেননা ,তারা যা কিছু করেছে সেটাই দ্বীন । আর যদি প্রমাণিত না হয় , তাহলে তা দ্বীনী কাজ নয় বরং দ্বীন বহির্ভূত গর্হিত কাজ । কিন্তু নবী কারীম সা. এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ২৩ বৎসর ,খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের সুদীর্ঘ কাল অতঃপর তাবেঈন , তাবে তাবেঈনের সময়কাল ছিল প্রায় ৪০০ বৎসর। নবী প্রেম ছিল তাদের মাঝে চরম পর্যায়ের। নবীর প্রতি তাদের চাইতে বেশী ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন আর কেই করতে পারবে না। এতদ্বসওে¦ও খাইরুল কুরুনের এ সুদীর্ঘ সময়টিতে মীলাদ মাহফিল করার কোন প্রমাণ নেই। এখন প্রশ্ন হল- তাঁদের মাঝে নবী  প্রেম চুড়ান্ত পর্যায়ের থাকা সওে¦ও বিদ‘আতীদের কথিত ও আচরিত বরকতময় অসীম পূণ্যের এ কাজটি তাঁরা কেন করেননি? নিশ্চই তাঁরা এটাকে পূণ্যের কাজ মনে করেননি । সুতরাং খাইরুল কুরুনে যেটা পূণ্যের কাজ ছিল না সেটা এতদিন পর এসে পূণ্যের কাজ হতে পারে না। নবী কারীম সা. এবং খাইরুল কুরুণ-এর পূণ্যবান ব্যক্তিগণ যা বলেছেন তা-ই দ্বীন আর যা তাঁরা বর্জন করেছেন তা দ্বীন বহির্ভূত ।

 ২.প্রচলিত মীলাদ-মাহফিল না করাকে নবী প্রেম না থাকার নামান্তর আখ্যায়িত করা ভুল। নবী কারীম সা. কে ভালবাসা বা নবী প্রেমের পদ্ধতি কি তাও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আর তা হল নবী কারীম সা. এর সুন্নতকে ভালবাসা , নবী কারীম সা. এর সাহাবায়ে কেরামকে ভালবাসা, নবী কারীম সা. এর দেশের মানুষকে ভালবাসা , নবী কারীম সা. যা ভালবেসেছেন তাই ভালবাসা ইত্যাদি । হাদীসে এগুলিকে ভালবাসাই রাসূল সা. কে ভালবাসা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

 মীলাদ-মাহফিলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত  কোন সাহাবী , তাবেঈ , তাবে -তাবেঈ , মুহাদ্দিছীন কিংবা কোন ফকীহ ওবুযুর্গ এই মীলাদের প্রচলন করেননি । বরং মুসেল শহরের অপচয়ী ও ধর্মীয় ব্যাপারে উদাসীন বাদশাহ্ মুজাফফরুদ্দীন কুক্রী ইবনে ইরবিল (৫৪৯-৬৩০ হিঃ) এর নির্দেশে সর্বপ্রথম ৬০৪ হিজরীতে এই মীলাদ মাহফিলের সূচনা হয়।  এব্যাপারে মীলাদের স্বপক্ষে দলীলাদি সম্বলিত কিতাব রচনা করে বাদশাকে সহযোগিতা করেন দুনিয়ালোভী দরবারী  মৌলভী উমার ইবনে হাছান ইবনে দেহ্ইয়া আবুল খাত্তাব। (রাহে সুন্নাত)

এই বাদশার চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমাম আহমদ ইবনে  মুহাম্মাদ মিসরী মালেকী উল্লেখ করেন ,

كانت ملكا مسرفا يآمر علماء زمانه ان يعملوا باستنباطهم واجتهادهم وان لا يتبعوا لمذهب غيرهم حتى مالت اليه جماعة من العلماء وطاءفة من الفضلاء ويحتفل لمولد النبي صلى الله عليه وسلم

فى الربيع الاول و هو اول من الملوك هذا العمل . القول المعتمد فى عمل المل المولد.

অর্থঃ সে ছিল একজন অপচয়ী বাদশাহ্ । সে তার সময়কার উলামায়ে কেরামকে অন্যের মাযহাব অনুসরণ বর্জন করে নিজ নিজ ইজতিহাদ ও গবেষণা অনুসারে চলার নির্দেশ দিত । আর এতে দুনিয়া পুজারী উলামা ও ফুযালার একটি দল তার দিকে ঝুকে পড়ে । সে রবিউল আওয়ল মাসে মীলাদ-মাহফিলের আয়োজন করত । বাদ্শাহদের মাঝে এ-ই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি এই বিদ‘আতের (মীলাদ-মাহফিলের ) প্রচলন করেন ।

এ অপচয়ী বাদ্শাহ প্রজাদের অন্তরকে  নিজের দিকে আকুষ্ট ও অনুরক্ত রাখার জন্য এই বিদ‘আত উৎসবের আয়োজন করত , আর তাতে জাতির বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ অকাতরে অপচয় করত । এ অপচয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লামা যাহাবী রহ. বলেন,

كان ينفق كل سنة على مولد النبى صلى الله عليه وسلم نحو ثلاث مآة الف

অর্থাৎ সে প্রতি সৎসর মীলাদ-মাহফিলে প্রায় তিন লাখ  (দেরহাম/দীনার) ব্যয় করত।  (দুয়ালুল ইসলাম ২/১০৩)

দুনিয়ালোভী দরবারী মৌলভী উমার ইবনে হাছান ইবনে দেহ্ইয়া আবুল খাত্তাব যিনি মীলাদ-মাহফিল ও জশনে জুলুসের স্বপক্ষে দলীল প্রমাণ সম্বলিত কিতাব রচনা করে বাদ্শাহর কাছ থেকে প্রচুর অর্থ কড়ি হাতিয়ে নিয়েছেন , তার ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা করেন,

كثير الواقعة فى الائمة وفى السلف من العلماء خبيث اللسان احمق شديد المكر قليل النظر

فى امور الدين متهاونا

অর্থাৎ, সে আইম্মায়ে দ্বীন এবং পূর্বসূরী উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে অত্যন্ত আপত্তিকর ও গালিগালাজ মূলক কথাবার্তা বলত । সে ছিল দুষ্টভাষী , আহমক ও চরম ধোকাবাজ । আর ধর্মীয় ব্যাপারে ছিল চরম উদাসীন । (লিসানুল মীযান)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী আরো বর্ণনা করেন,

قال ابن النحار رايت الناس محتمعين على كذبه و ضعفه

অর্থাৎ. ইবনে নাজ্জার রহ. বলেন, আমি মানুষদেরকে তার (উমার ইবনে হাছান ইবনে দেহ্ইয়া আবুল খাত্তাব-এর) মিথ্যা ও অবিশ্বাসযোগ্যতার উপর ঐক্যবদ্ধ বা একমত পেয়েছি। (লিসানুল মীযান)

সুতরাং উপরোক্ত বিবরণ থেকে বোঝা গেল যে, মীলাদ মাহফিল প্রচলনকারীদের একজন হলেন প্রতারক , ধূর্তবাজ বাদ্শাহ , আরেকজন হলেন স্বার্থান্বেষী দুনিয়ালোভী মৌলভী । আর তাদের সাথে মিলিত হয়েছেন ঐ সকল পীর , সূফী-যারা ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতায় পৌঁছেননি । এ তিন দলের সমন্বিত প্রয়াস ও অপপ্রচারে সাধারণ জনগণ হয়েছেন বিভ্রান্ত। আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. যথার্থই বলেছেন,

و هل افسد الدين الا الملوك + و احبار سوء ورهبانها

অর্থাৎ, রাজা বাদশাহ অসৎ পন্ডিত ও সাধুরাই দর্মকে নষ্ট করে থাকে।

 প্রচলিত মীলাদ-মাহফিল সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের উক্তি

তাই সর্বযোগের হক পন্থীরা এবং সর্বস্তরের উলামায়ে কেরাম কঠোরভাবে এর (মীলাদ-মাহফিলের) বিরোধিতা করেছেন এবং বাতিল পন্থীদের সমস্ত ভ্রান্ত যুক্তি খন্ডন করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী রহ. (তার ফাতাওয়ার ১ম খন্ডের ৩১২নং পৃষ্ঠায়), ইমাম নাসিরুদ্দিন শাফেঈ  رشاد الاخيارগ্রন্থে, মুজাদ্দেদে আলফেসানী রহ.مكتوبات  ৫ম খন্ডের ২২ নং পৃষ্ঠায় এবং ইবনে আমীরুল হাজ্ব মালেকী রহ. সুস্পষ্ট রূপে বর্ণনা করেছেন,

ومن جملة ما احدثوا من البدع مع اعتقادهم ان ذلك من اكبر العبادات واظهار الشعائر ما يفعلون فى الشهر الربيع الاول من المولد وقد احتوى ذلك على بدع ومحرمات الى ان قال وهذه المفاسد مترتبة على فعل المولد اذا علم بالسماع فان خلا منه وعمل طعاما فقط ونوى به المولد ودعا اليه الا خوان وسلم من كل ما تقدم ذكره فهو بدعة بنفس نيته فقط لان ذلك زيادة فى الدين وليس من عمل السلف الماضين و اتباع السلف اولى

আল্লামা আব্দুর রহমান মাগরীবী তার ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেন,

ان عمل المولد بدعة لم يقل به ولم يفعله رسول الله صلى الله عليه وسلم والخلفاء الائمة –

كذا فى الشرعة الالهية –

অর্থাৎ, মীলাদকর্ম বিদ‘আত । রাসূল সা. , খোলাফায়ে রাশেদীন ও ইমামগণ কেউ এ ব্যাপারে বলেননি এবং তা করেননি।

আল্লামা আ‏হমদ ইবনে মুহাম্মদ মিসরী মালেকী (রহঃ) লিখেন-

قد اتفق علماء المذاهب الاربعة بذم هذا العمل – راه سنة از القول المعتمد فى عمل المولد

অর্থাৎ, মাযহাব চতুষ্ঠয়ের উলামায়ে কেরাম এই কাজ (মীলাদ) নিন্দনীয় হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ।

 প্রচলিত মীলাদ পন্থীদের দলীল-প্রমাণ ও তার খন্ডন

পূর্বের বক্তব্যে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, খাইরুল কুরুনে এই মীলাদ মাহফিলের সূচনা হয়নি । বরং ৬ষ্ঠ শতাব্দির পর এর সূচনা হয়েছে। সূচনা কারীদদের অবস্থা আলোচিত হয়েছে যে, তৎকালীন এক বদকার বাদশাহ এর পৃষ্টপোষকতা করেছেন । আর স¤্রাটের গৃহিত এই নীতির পরে সর্ব সাধারণের মাঝে এর ব্যপক প্রভাব পড়েছে। এমনকি বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গও এই বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছেন ।

এত কিছুর পর মীলাদের স্বপক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি প্রমাণ না দিতে পেরে প্রসিদ্ধ বিদ‘আতী মৌলভী আব্দুস সামাদ সাহেব  আরো অনেকে নিজেদের আত্ম প্রশান্তি ও অনুসারীদের সান্তনা প্রদানের জন্য তিহাত্তরজন মনীষীর তালিকা পেশ করেছেন , যারা মীলাদ অনুষ্ঠানকে পছন্দ করতেন ।

 কিন্তু এ তালিকায় সাহাবায়ে কেরাম , তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন এবং নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছীনে কেরামের নাম নেই। যাদের নাম আছে তাদের অধিকাংশই সূফীয়ায়ে কেরাম , মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহঃ)  এর কথা ( হালাল হারামের ব্যাপারে সূফীদের কথা সনদ নয়) অনুযায়ী যাদের আমল  গ্রহণযোগ্য নয়। আর যে কয়েকজন দার্শনিক আলেম রয়েছেন তারা ভ্রান্ত কিয়াসের শিকার হয়েছেন। আবার অনেকেই শুধু জন্ম বৃত্তান্তের আলোচনাতে মুস্তাহাব বা উত্তম বলেছেন , যেটাকে কেউ অস্বীকার করেন না । প্রচলিত মীলাদের কথা তারা বলেননি ।

মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব মীলাদেরস্বপক্ষে একটি দলীল পেশ করেছেন যে, হারামাইন শরীফাইনে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পবিত্র মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় এবং যে রাষ্টেই যাবে সেখানেই মুসলমানদের মাঝে এ কাজটি পাবে। বুযুর্গানে দ্বীন এবং উলামায়ে কেরাম এর বড় বড় ফায়দা বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন , সবযুগেই সবস্থানেই উলামায়ে কেরাম , মাশায়েখ ও সাধারণ মুসলমান মুস্তাহাব জেনে আসছেন-“মুস্তাহাব হওয়া-এর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে , মুসলমান কাজটিকে ভাল জানে।”

 খন্ডন

এই দলীলের উত্তর হল- তখন এ হারামাইন শরীফাইনও ছিল, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন তাঁরাও ছিলেন । তাঁরা কি মীলাদ মাহফিলের বরকত ও ফযীলত সম্পর্তে অবগত ছিলেন না ? তবে কেন তাঁরা করেন নি ? সাহাবায়ে কেরাম , তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন , আইম্মায়ে মুজতাহিদীন সকলেই এমন একটি উত্তম কাজ পরিত্যাগ করেছেন তা কি মেনে নেয়া যায় ?

আর শরী‘আতের ভাষ্যসমূহ (نصوص) এর মাঝে হারামাইন শরীফাইনের অনেক ফযীলত ও মর্যাদার কথা এসেছে । তবে হারামাইন শরীফাইন তথা সেখানকার আমল শরী‘আতের দলীল নয়। সেখানে শরী‘আত পরিপন্থী কাজের প্রচলনও হয়ে পড়তে পারে ।  শরী‘আতের দলীল মাত্র চারটি তথা কোরআন , হাদীস , ইজমা , কিয়াস । তাই হারামাইন শরীফাইনে যদি কোন ভাল কাজ হয় তাহলে ভাল نور على نور – । অন্যথায় কক্ষনো তা দলীল হতে পারে না । হারামাইনেও মাঝে মধ্যে অন্যায় কর্ম সংঘটিত হয়েছে তার প্রমাণ রয়েছে । মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) এক সময়কার হারামাইন শরীফাইনের অবস্থার বিবরণ দিয়ে বলেছেন,

فى الحرمين الشريفين من شيوع الظلم وكثرة الجهل وقلة العلم وظهور المنكرات وفشو البدع والسيئات واكل الحرام والشبهات

অর্থাৎ, হারামাইন শরীফাইনের মাঝে অন্যায় অত্যাচার ব্যাপক লাভ করেছে, অজ্ঞতা বেড়ে গেছে , ইলম কমে গেছে , অপ্রীতিকর কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে, বিদ‘আত প্রসার লাভ করেছে, হারাম ও সন্দেহপূর্ণ জিনিস খাওয়া বেড়ে গেছে। (মেরকাত ৫ম খন্ড ৬১৪ নং পৃষ্ঠা)

অতএব হারামাইন শরীফাইন দলীল হতে পারে না। আর মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব বলেছেন, মুস্তাহাব  হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, মুসলমান সেটাকে ভাল জানে । অথচ মুস্তাহাব তো অনেক- উঁচু জিনিস , বরং ( মোবাহ হওয়াটা) ও শরী‘আতের একটি হুকুম, যা নবী কারীম সা. এর কথা বা কাজ ছাড়া প্রমাণিত হয় না ।   এ ব্যাপারে আল্লামা শামী (রহঃ) লিখেছেন,     الاستحباب حكم شرعى لا بدله من دليل

অর্থাৎ, মুস্তাহাব হওয়া শরী‘আতের একটি হুকুম । তাই তার জন্য দলীলের প্রয়োজন রয়েছে।

সারকথা- উপরের এই সুদীর্ঘ আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, প্রচলিত মীলাদ-মাহফিল বিদ‘আত এবং দ্বীন-বহির্ভুত বিষয় । তবে রাসূল সা. এর বরকতময় জন্ম-বৃত্তান্ত এবং তাঁর আদর্শ আলোচনার মজলিস মুস্তাহাব ও উত্তম ।

 মীলাদে কেয়াম করা প্রসংঙ্গ

কেয়াম কাকে বলে

“কেয়াম” শব্দের আভিধানিক অর্থ দাঁড়ানো । আর মুআশারা তথা সমাজ সামাজিকতার পরিভাষায় “কেয়াম” বলতে বোঝায় কারও আগমনে দাঁড়ানো । আর মীলাদ প্রসঙ্গে উল্লেখিত  কেয়াম: দ্বারা বোঝানো হয়  বিশেষ ধরনের কাসীদা পাঠ করার পর রাসূল সা. মজলিসে হাজির হয়ে গেছেন ধারণায় “ইয়া নবী  …” বলার সময় দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুরুদ পাঠ করা ।

সমাজ-সামাজিকতায় কেয়ামের হুকুম

কোন বুযুর্গ তথা সম্মানী ব্যক্তি যখন স্বশরীরে আগমন করেন,তখন কোন কোন মুহূর্তে কোন ধরণের বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ি ছাড়া ক্বেয়াম করা (আগন্তুক ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া)বৈধ । এ ব্যাপারে ইমাম নববী (রহঃ)قوموا الى سيدكم  (অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের নেতার কাছে গিয়ে দাঁড়াও) হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন।

অন্যান্য উলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এ ভাবে যে, হযরত সাআদ ইবনে মু‘আয (রাঃ) আঘাত প্রাপ্ত ছিলেন । নবী কারীম সা. তাঁকে গাঁধার পিঠ থেকে নামানোর জন্য মজলিস থেকে উঠেছিলেন । এটা কোন সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে দাঁড়ানো নয়। এ ব্যপারে মুসনাদে আহমদে বিবরণ নিম্ন রূপঃ

قوموا الى سيدكم فانزاره من الحمار – অর্থাৎ, তোমরা তোমাদের নেতার কাছে গিয়ে দাঁড়াও তাঁকে গাঁধার পিঠ থেকে নামাও । এজন্যই  الى سيدكم “তোমাদের নেতার কাছে ” কথাটা বলেছে- لسيدكم  “নেতার জন্য” কথাটা বলেননি । ( মুসনাদে আহমদ)

যাহোক উপরোক্ত হাদীস অকাট্য অর্থ বোধক না হওয়ায় এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের আমল কি ছিল এবং নবী কারীম সা. কোন আমলটিকে পছন্দ করতেন, তা দেখা দরকার এবং সেটাই হবে আমাদের আমল । আর এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে যানা যায় হযরত আনাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত নিমোক্ত হাদীস দ্বারা-

عن انس قال – لم يكن شخص احب اليهم من رسول لله صلى الله عليه وسلم وكانوا اذا رآوه لم يقوموا لما يعلمون من كراهيته لذلك – رواه الترمذى فى اباب الاستيذان عن رسول الله صلى الله عليه وسلم – باب ماجاء فى ركاهية قيام الرجل للرجل وقال هذا حديث حسن صحيح غريب ورواه احمد حديث رقم ١٢٢٨٥ واسناده صحيح كذا فى هامشه

অর্থাৎ, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন , সাহাবায়ে কেরামের কাছে নবী কারীম সা. এর জাত মোবারকের চেয়ে বড় সম্মানের ও প্রিয় এ দুনিয়তে আর কোন কিছুই ছিল না , এতদসত্বেও তাঁরা নবী কারীম সা. কে দেখলে ক্বেয়াম করতেন না । যেহেতু তারা জানতেন নবী কারীম সা. এ কাজটিকে (তাঁর সম্মানে দাড়িয়ে যাওয়া ক্বেয়াম করাকে ) অপছন্দ করেন । (তিরমিযী ও মুসনাদে আহমদ)

মীলাদে কেয়াম-এর হুকুম

পূর্বে উল্লেখিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী কারীম সা. নিজের জন্য কেয়াম করাকে অপছন্দ করতেন। তাই সাহাবায়ে কেরাম নবী কারীম সা. এর প্রতি চরম ভালবাসা ও মহব্বত পোষণ করা সত্বেও নবী কারীম সা. যখন স্বশরীরে উপস্থিত হতেন তখন তাঁকে দেখতে পেয়েও তাঁরা দাঁড়াতেন না। তাই মীলাদ-মাহফিলে রাসূল সা. এর নাম আসলে যদি মেনে নেয়া হয় যে,তিনি হাজির হয়ে যান তবুও কেয়াম করা যাবে না। কেননা , নবী কারীম সা. এর জীবদ্দশায় ও তাঁর জন্য কেয়াম করা হত না এবং তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে কেয়াম করা তথা দাঁড়িয়ে যাওয়াকে পছন্দ করতেন না । তদুপরি মীলাদ-মাহফিলে রাসূল সা. এর নাম আসলে সেখানে রাসূল সা. এর আগমন ঘটে এটা শরী‘আতের কোন দলীল দ্বারাও প্রমাণিত নয় । বরং রাসূল সা. এর উদ্দেশ্যে দুরূদ পাঠ করা হলে তিনি সেখানে হাজির হন না বরং নির্ধারিত ফেরেশÍারা রাসূল সা. এর কাছে সে দুরূদ পৌঁছে দেন-এ কথা স্পষ্টঃ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে । হাদীসে এরশাদ হয়েছে,

عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صلى على عند قبرى سمعته ومن صلى على نا ءيا ابلغته رواه البيهقى فى شعب الايمان فى باب فى تعظيم النبى صلى الله عليه وسلم واجلاله وتوقيره – حديث رقم ١٥٨٣  وللحديث شواهد ساقها السخارى فى القول البديع

অর্থাৎ, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, যে আমার কবরের নিকট এসে আমার উপর দুরূদ পাঠ করবে আমি তা সরাসরি শুনব, আর যে দূরে থেকে আমার উপর দুরূদ পাঠ করবে তা আমার নিকট পৌঁছানো হবে । (শুআবুল ঈমান)

অন্য এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,

عن عيدالله بن مسعود رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان لله ملئكته سياحين فى الارض يبلغونى من امتى السلام رواه الدرمى فى كتاب الرقاق – باب فى فضل الصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم . حديث رقم .٢٧٧٤

واسناده صحيح كذا فى هامشه. ورواه النسائى فى كتاب الافتتاح – باب التسليم على النبى صلى الله عليه وسلم . ورواه ابن حبان صحيحه .حديث رقم ٩۰٢. واللفظ للدارمى

অর্থাৎ, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর কতক ফেরেশÍা রয়েছেন, যারা পৃতিবীতে ভ্রমণ করেন এবং আমার উম্মতের সালাম আমার নিকট পৌঁছান । (নাসায়ী, দারিমী ও ইবনে হিব্বান)

 কেয়াম সম্বন্ধে বিদ ‘আতীদের বক্তব্য ও তার খন্ডন

বিদ ‘আতীদের বক্তব্য হল মীলাদ-মাহফিলে রাসূল সা. এর নাম আসলে তিনি মজলিসে হাজির হয়ে যান । তাই তাঁর সম্মানার্থে কেয়াম করতে হবে অর্থাৎ. দাঁড়িয়ে যেতে হবে। বিদ ‘আতীগণ এই কেয়াম করাকে জায়েয এবং মুস্তহাব হিসাবে গন্য করেন। এমনকি এটাকে ওয়াজিব ও ফরয বলেও আখ্যায়িত করেন । আর কেয়াম না করনেওয়ালাদেরকে কাফের পর্যন্ত বলা হয়। ( এ কথার বরাত একটু পরেই উল্লেখ করছি।)

খন্ডন

পূর্বোল্লিখিত হাদীসে স্পষ্ট ঃ রাসূল সা. বলেছেন যে, তাঁর কাছে দুরূদ সালাম পৌঁছে দেয়া হয়, তিনি হাজির হন না। অথচ বিদ ‘আতীগণ বলেছেন তার বিপরীত। হাদীসে বর্ণিত আকীদার বিপরীত কোন বিষয় কিভাবে মুস্তাহাব এমনকি ফরয হয়ে যায় তা বোধগম্য নয় । আর যারা হাদীসে বর্ণিত আকীদা মোতাবেক মীলাদের মজলিসে রাসূল সা. এর হাজির না হওয়ার আকীদা রাখেন, তারা কিভাবে কাফের হয়ে যান তা আরও অবোধগম্য বৈ কি ? যারা কুরআন হদীসের বর্ণনা মোতাবেক আকীদা পোষন করেন তাদেরকে কাফের আখ্যায়িত করা ,  পক্ষান্তরে যারা কুরআন হাদীসের বর্ণনার বিপরীত আকীদা পোষণ করেন তাদেরকে খাঁটি মুসলমান মনে করাটা কি কুফরি নয় ?

একটি অপকৌশল প্রসঙ্গ

মীলাদ মাহফিলে রাসূল সা. হাজির হওয়ার বিষয় অস্বীকারকারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকদেরকে কাফের আখ্যা দেয়ার অপরাধকে ঢাকা দেয়ার জন্য প্রসিদ্ধ বিদ ‘আতী আলেম মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব বলেলেছেন যে, ‘মুসলমান মীলাদের মাঝে কেয়াম করাকে ওয়াজিব মনে করে’-এ কথাটি মুসলমানদের উপর অপবাদ মাত্র । কেননা , কোন আলেমে দ্বীন একথা লেখেনও নি বলেনও ন যে, কেয়াম করা ওয়াজিব । বরং সর্ব সাধারণও এ ধারণাই পোষণ করে যে, কেয়াম মীলাদ এগুলো পূণ্যের কাজ ।

মুফতী সাহেবের এ দাবী সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং অবাস্তব সম্মত । কেননা , মৌলভী আব্দুস সামী’ নিজের দাবীর স্বপক্ষে মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহ্ইয়া- মুফতীয়ে হানাবেলা থেকে বর্ণনা করেন,

يجب القيام عند ذكر ولادة صلى الله عليه وسلم – راه سنت از انوار ساطعه ٢٥۰

অর্থাৎ, নবী কারীম সা. এর জন্ম -বৃত্তান্তের আলোচনার সময় কেয়াম করা ওয়াজিব ।

অনুরূপভাবে বিদ‘আতীদের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য ফাতাওয়ার কিতাব “মাজমুআ ফাতাওয়া” অর্থাৎ, غا ية المرام এর ৫৫-৫৬-৬৭-৭১ নং পৃষ্ঠায় পরিস্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রত্যেক মীলাদ-মাহফিলে নবী কারীম সা. উপস্থিত হন। এবং তাঁর সম্মানে কেয়াম করা ফরয। কেয়াম না করনেওয়ালা কাফের ।

নবী কারীম সা. এর গায়েব জানা প্রসঙ্গ

গায়েবের পরিচিতি

“গায়েব” এর আভিধানিক অর্থ হল কোন জিনিস গোপন থাকা। যে জিনিস আমাদের থেকে গোপন রয়েছেতাকেও গায়েব বলা হয়।  আর শরী‘আতের পরিভাষায় “গায়েব” বলা হয় প্রত্যেক ঐ জিনিসকে যা বান্দার থেকে গোপন থাকে।

ইবনে কাছীর (রহঃ) সুদ্দী ও র্মুরা হামাদানী সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,

اما الغيب فما غاب عن العباد من امر الجنة و امر النار وما ذكر فى القرآن

تفسير ابن كيثر جلد١ ص٣٤

অর্থাৎ “গায়েব” হল ঐ জিনিস, যা বান্দা থেকে গোপন রয়েছে। যেমন জান্নাত জাহান্নামের অবস্থা সমূহ এবং কুরআনে কারীমে বর্ণিত বিষয়াবলী।

আইম্মায়ে আ‎‎হনাফের প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ ‘মাদারেক’ -য়ে বলা হয়েছে,

والغيب هو ما لم يقم اليه دليل ولا اطلع عليه مخلوق –

অর্থাৎ, ঐ জিনিসকে গায়েব বলা হয় , যার উপর কোন প্রমাণ বিদ্যমান নেই এবং কোন মাখলুক সে বিষয় অবগত নয়।

“গায়েব”এর স্তরভেদ 

গায়েব জানার মৌলিক স্তর প্রথমতঃ ২টি । যথা ঃ

(১)     [সত্তাগত] (২) [অন্য প্রদত্ত]

অন্য প্রদত্ত আবার দুই প্রকার যথাঃ

(১)     [ব্যাপক]   (২) [সীমিত]

ব্যাপক আবার দুই প্রকার যথা

(১)     [সর্বব্যাপী] (২) [সীমিত ব্যাপী]

এই সর্বমোট চারটি স্তর । এর মধ্যে তিনটির হুকুম প্রায় সর্বসম্মত । মতানৈক্য শুধু একটি তথা তৃতীয়টির মাঝে। আর এ মতানৈক্যটাই ইলমে গায়েব-এর ইখতিলাফ হিসাবে খ্যাত।

 স্তর চতুষ্ঠয়ের হুকুম

১ম প্রকার ঃ যে গায়েব এর জ্ঞানটা সত্তাগত অর্থাৎ, যার মাঝে অন্যের কোন হস্তক্ষেপ নেই। এ প্রকার ইলমে গায়েবের ব্যাপারে  সকলেই একমত যে, এটা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস । কেউ যদি কোন রাসূলের জন্য কিংবা কোন ওলির জন্যে সামান্যতম এরূপ সত্তাগত জ্ঞান সাবাস্ত করে , তাহলে সে সর্ব সম্মতিক্রমে মুশরিক ও কাফের হয়ে যাবে।

 ২য় প্রকার

যে গায়েবের জ্ঞানটা অন্য কোন সত্তা কর্তৃক প্রদত্ত এবং সেটা  সীমিত । অর্থাৎ, সামগ্রিক জ্ঞান নয় বরং বিশেষ বিশেষ জ্ঞান । এ প্রকার ইলমে গায়েব গায়রুল্লাহর জন্য প্রমাণিত। কেননা , আল্লাহ তা‘আলা আম্বিয়ায়ে কেরামকে ওহী ও ইলহামের মাধ্যমে কিছু বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন। সেমতে ওহী এবং ইলহামের মাধ্যমে যে সকল গায়েব এর বিষয় সম্পর্কে তাঁরা অবগত হয়েছেন। তা ছাড়া দুনিয়ার সকল বিষয়ে পুংখানুপুংখ জ্ঞান তাঁদের নেই।

৩য় প্রকার

যে গায়েবের জ্ঞানটা অন্য কোন সত্তা কর্তৃক প্রদত্ত এবং সেটা সর্বব্যাপী । অর্থাৎ, আদি অন্তের সমস্ত বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান । এ প্রকার ইলমে গায়েবের ব্যাপারে সকলের সর্বসম্মত বিশ্বাস হল এ প্রকারটিও আল্লাহর জন্য খাস ।  সুতরাং যদি কেউ এ ধারণা পোষণ করে যে, রাসূল সা. ও সার্বিক বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত, আল্লাহ তা‘আলার ইলম আর নবী কারীম সা. এর ইলমের মাঝে শুধু সত্তাগত ও অন্য প্রদত্ত এর পার্থক্য, তাহলে এই ধারণা পোষণকারীও মুশরিক ও কাফের হয়ে যাবে। এ সম্বন্ধে মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) উল্লেখ করেন-

من اعتقد تسوية علم الله ورسوله يكفر اجماعا كملا يخفى. الموضوعات الكبرى  ص ١١٩

অর্থাৎ,যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং রাসূল সা. এর ইলমের মাঝে সমতার বিশ্বাস রাখে, তাকে সর্ব সম্মতিক্রমে কাফের বলা হবে। যা কারো কাছে অস্পষ্ট নয়।

৪র্থ প্রকার

যে গায়েবের জ্ঞানটা অন্য কোন সত্তা কর্তৃক প্রদত্ত এবং সেটা আদি অন্তের অর্থাৎ, পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে নিয়ে জান্নাত জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ের সীমিত সামগ্রিক জ্ঞান । এ প্রকার ইলমে গায়েবের হুকুমের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।  আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা-বিশ্বাস মতে এ প্রকারটিও আল্লাহর জন্য খাস একান্ত । কিন্তু রেজাখানীসহ বেদ‘আতীদের আকীদা-বিশ্বাস হল নবী কারীস সা. ও এই প্রকার ইলমের  অধিকারী ।

খান সাহেব বেরেলভী বলেন,

অর্থাৎ, যা কিছু হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে- সবকিছুর জ্ঞান নবী কারীম সা. এর ছিল । পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে জান্নাত হাজান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত কোন ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্রস্য বিষয়ও নবী কারীম সা. এর জ্ঞান বহির্ভূত নয়।

নবী কারীম সা. এর গায়েব জানা সম্পর্কে সারকথা

নবী কারীম সা. এর গায়ের জানা সম্পর্কে আহলুস সন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা-বিশ্বাস হল নবী কারীম সা. কে তাঁর শান মত আল্লাহ্ তা‘আলার সত্তা ও সিফাত সম্পর্কে, অতীত ও ভবিষ্যতের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে বরযখ, কবরের অবস্থা, হাশরের ময়দানের চিত্র, জান্নাত , জাহান্নমের পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে এমন জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে যা কোন নবী কিংবা কোন নৈকট্য লাভকারী ফেরেশÍাকেও দেয়া হয়নি।  যার আন্দাজ একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলাই করতে পারেন। তবে সেটা আল্লাহ তা‘আলার “সর্ব বিষয়ের সামগ্রিক জ্ঞান” এর সামনে কিছুই নয়।

পূর্বে উল্লেখিত বিদ‘আতী ও রেজাখানীদের আকীদা বিশ্বাস হল যা কিছু হয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে -সেই সবকিছুর জ্ঞান নবী কারীম সা. এর ছিল। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে জান্নাত জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত কোন ক্ষুদ্রস্য ক্ষৃদ্রস্য বিষয়ও নবী কারীম সা. এর জ্ঞান বিহর্ভুত নয়। তাদের বক্তব্য হল নবী কারীম সা. এর আদি অন্তের সবকিছুর জ্ঞান ছিল। আহমদ রেজাখান রচিতالدولة المكيةبالمادة الغيبية  গ্রন্থে এবং আহমদ ইয়ার খান রচিতجاء الحق  গ্রন্থে স্পষ্টতঃ এ দাবী করা হয়েছে । অতএব যদিও তারা বলে নবী কারীম সা. এর সীমিত সামগ্রিক জ্ঞান ছিল, কিন্তু যখন বলে আদি অন্ত সবকিছুর জ্ঞান ছিল তখন সেটা আর সীমিত সামগ্রিক জ্ঞানের দাবী থাকেনা বরং সেটা হয়ে দাড়ায় আল্লাহর ন্যায় সর্বব্যাপী  জ্ঞান থাকার দাবি

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের দলীল

কুরআনে কারীমের বহু আয়াতে  “গায়েব-এর জ্ঞান” বিষয়কে আল্লাহর বিশেষ সিফাত বা বৈশিষ্ট্য হিসাকে উল্লেখ করা হয়েছে । আর সমস্ত মাখলূক থেকে এমনকি নবী কারীম সা.  থেকেও “গায়েব-এর জ্ঞান”কে নিবারিত করা হয়েছে । উদাহরণ স্বরুপ কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল।

قل لا يعلم من فى السموت والارض الغيب الا الله وما يشعرون ايان يبعثون (١)

অর্থাৎ. হে নবী! তুমি  বলে দাও যত মাখলূক আসমান ও যমিনে রয়েছে কেউ গায়েব জানে না । একমাত্র আল্লাহ ছাড়া । আর (একারণেই) তারা জানে না কবে পূনরায় উঠানো হবে । (সূরা  নামল ৬৫ )

قل لا اقول لكم عندى خزائن الله ولا اعلم الغيب ولا اقول لكم انى ملك  

অর্থাৎ, হে নবী! তুমি বলে দাও আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহ তা‘আলার (সমস্ত মাকদুরাতের ) ভান্ডার রয়েছে । আর না একথা বলি যে, আমি গায়েব জানি । আর না আমি তোমাদেরকে বলি আমি ফেরেশতা । (সূরা আনআম ঃ ৫০)

قل لا املك لنفسى نفعا ولا ضرا الا ما شاءالله ولو كنت اعلم الغيب لاستكثرت من الخير

وما مسنى السوء

অর্থাৎ, তুমি বলে দাও আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার ভাল-মন্দের উপরও আমার কোন কর্তৃত্ব নেই । আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলেতো আমি প্রভূত কল্যাণ লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না । (সূরা ৭-আ’রাফঃ১৮৮)

وعنده مفاتيح الغيب لا يعلمها الاهو

অর্থাৎ, তাঁরই নিকট রয়েছে গায়েবের চাবি , তিনি ব্যতীত কেউ তা জানে না (সূরা ঃ৮ আন্আমঃ৫৯)

يسئلونك عن الساعة ايان مرساها قل انما علمها عند ربى لايجايها لوقتها الا هو –

الى قوله قل انما علمها عند الله ولكن اكثر الناس لايعلمون

অর্থাৎ, তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে কিয়ামত কখন ঘটবে ? তুমি বলে দাও এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকেরই আছে । শুধু  তিনিই যথা সময়ে তার প্রকাশ ঘটাবেন । তুমি বলে দাও এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লারই আছে । (সূরা ৭-আ’রাফঃ ১৮৭)

এসব আয়াত এবং বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীসে জিব্রীলে এসেছে

ما المسئول عنها باعلم من السائل

অর্থাৎ, এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে বেশী জানে না ।

এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝে আসে যে , কেয়ামতের সুনিদিষ্ট সময় ও তৎসংশ্লিষ্ট বিস্তারিত বিষয়াদি নবী কারীম সা. থেকেও গোপন রয়েছে । সুতরাং দুনিয়া সৃষ্টির শুরু থেকে জান্নাত জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত সকল বিষয়ের পুংখানুপুংখ জ্ঞান নবী কারীম সা. এর ছিল এ ধারণা ঠিক নয় । নাবী কারীম সা. এর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সবকিছু সামগ্রিক জ্ঞান প্রমাণিত করা এবং নবী কারীম সা. কে আলেমুল গায়েব বা গায়েব জান্তা মনে করা পূর্বোল্লিখিত আয়াতসমূহ এবং হাদীসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ।

বিদ‘আতীদের দলীল ও তা খন্ডন

১ম দলীল

“জাআল হক্ক” নামক গ্রন্থে আহমদ ইয়ার খান সাহেব তাদের দাবীর স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন ,

وما كان الله ليطلعكم على الغيب ولكن الله يجتبى من رسله من يشاء

অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলার এই শান না যে, তিনি তোমাদের সর্বসাধারণকে গায়েবের ইলম/জ্ঞান দান করবেন । হ্যাঁ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণ থেকে যাকে চান তাকে মনোনিত করেন । (সূরা ৩-আলে ইমরান  ১৭৯)

উক্ত আয়াতের অধীনে তাফসীরে বাইযাভী ও তাফসীরে খাজেনের ব্যাখ্যা উল্লেখ করতঃ খান সাহেব বলেন, “এতে বোঝা যায় আল্লাহ তা‘আলার খাস ইলমে গায়েব পয়গম্বরের সামনে প্রকাশিত ও উদ্ভাসিত হয় ।কতক মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন যে, “কতক ইলমে গায়েব” দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা‘আলার ইলমের মোকাবেলায় কতক । আর দুনিয়ার শুরু থেকে জান্নাত জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত  সমস্ত জ্ঞানও আল্লাহর ইলমের মোকাবেলায় কতকই বটে ।

খন্ডন

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা‘আলা ওহী এবং ইলহামের মাধ্যমে আম্বিয়ায়ে কেরামকে গায়েবের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবগত করেন । কিন্তু এর দ্বারা কোন নবীকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ের বিস্তারিত জ্ঞান প্রদান করা হয় না । আর তাফসীরের কিতাবে উল্লেখিত কতক ইলমে গায়েব এর জাহিরী বা সুস্পষ্ট ও পরিস্কার ব্যাখ্যা হল কতক আংশিক জ্ঞান আল্লাহর ইলমের মোকাবেলায় কতক নয় । বিনা কারণে যাহিরী অর্থ ত্যাগ করা তাফসীর ও ব্যাখ্যার সহীহ নীতি নয় ।

২য় দলীল

فلا يظهر على غيبه احدا الا من ارتضى من رسوله

অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলা গায়েব বা অদৃশ্য বিষয়ে কাউকে অবগত করেন না তবে রাসূলদের মাঝে যাদের পছন্দ করেন । (সূরাঃ ৭২-জিনঃ২৬-২৭)

আহমদ ইয়ার খান সাহেব উক্ত আয়াতের অধীনে বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থের ব্যাখ্যা (যদিও তা তাদের দাবীর বিপরীত) উল্লেখ করতঃ বলেন, “এ থেকে বোঝা যায় আল্লাহ তা‘আলার খাস ইলমে গায়েব এমনকি কিয়ামতের ইলমও নবী সা. কে দেয়া হয়েছে । সুতরাং নবী সা. এর জ্ঞান থেকে বাকী রইল কী ?”

খন্ডন

এ আয়াতের পূর্বাংশে আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

قل ان ادرى اقريب ما توعدون ام يجعل له ربى امدا

অর্থাৎ, তুমিবলে দাও, আমি জানি না তোমাদের সাথে যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা অতি নিকটে না আমার প্রতিপালক তার জন্য দীর্ঘ সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন । (সূরাঃ ৭২-জিন২৬-২৭)

এ আয়াতে “ما توعدون” অর্থ ‘আযাব’ কিংবা ‘কিয়ামত’ । এতদুভয়ের যেটাই মুরাদ নেয়া হোক না কেন, সেটা ما كان وما يكون  এর অন্তর্ভুক্ত । সুতরাং সর্বাবস্থায় ما كان وما يكون  -এর কিছু বিষয় এমন রয়ে গেছে যার ইলম নবী কারীম সা. এর ছিল না ।

৩য় দলীল

তারা নি¤েœাক্ত হাদীসের মাধ্যমেও দলীল দেয়ার চেষ্টা করেছেন । হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন,

قام فينا رسول الله صلى الله عليه وسلم مقاما ما ترك شيئا يكون فى مقامه ذالك الى قيام الساعة الا حدث به حفظه من حفظه ونسيه من نسيه …. رواه البخارى ومسلم وابو داؤد

অর্থাৎ, একদা নবী কারীম সা. আমাদের মাঝে খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন । তিনি তাঁর খুতবার মাঝে কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিত হবে এমন কোন বিষয় বলতে ছাড়েননি । যে স্বরণ রেখেছে সে স্বরণ রেখেছে , আর যে ভুলে গেছে সে ভুলে গেছে ।  বোখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ)

 খন্ডন

বিদ‘আতীরা এরূপ বিভিন্ন হাদীসের মাধ্যমে দলীল দেয়োর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সে হাদীসগুলো তাদের মূলনীতি অনুসারেই দলীল হতে পারে না । মূলনীতি হল আহমদ ইয়ার খান সাহেব লিখেছেন-

ইলমে গায়েব অস্বীকারকারী নিজের দাবীর স্বপক্ষে দলীল দিতে চাইলে তাকে ৪ টি বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। যথাঃ (১) সেটা এমন আয়াত হতে হবে যার অর্থ হবে দ্ব্যর্থহীন অর্থাৎ, তাতে একাধিক অর্থের অবকাশ থাকতে পারবে না। (২) দলীলটি হাদীস হলে সেটা ‘মুতাওয়াতির’ হতে হবে।….ইত্যাদি।

অথচ তাদের প্রকৃত হাদীস একটিও ‘মুতাওয়াতির’ নয় । এতো গেল ইলযামি  উত্তর । তাহ্ক্বীক্বী উত্তর হচ্ছে-তাদের পেশকৃত হাদীসগুলোর কতেকের মতলব হল নবী সা. কিয়ামত পর্যন্ত যত বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হবে তা এবং বিভিন্ন ফিতনা ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামকে খুতবায় যা শুনিয়েছেন বিদ‘আতীগণ এগুলোকেই হুজুর সা. এর গায়েব জানার প্রমাণ দাঁড় করেছেন । অথচ এটা সব ধরনের বিষয়ে রাসূল সা. এর বক্তব্য ছিল না । বিশেষ এক ধরনের বিষয় ছিল । আমাদের এ বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায় আবূ দাঊদ শরীফে-এর নি¤েœাক্ত হাদীস দ্বারা । ইমাম আবূ দাঊদ পূর্বোক্ত হাদীস বয়ান করার পরপরই নি¤েœাক্ত হাদীসটি বয়ান করেছেন । পূর্বোক্ত হাদীসের  বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত হুযাইফা (রাঃ) ই বলেছেন যে,

والله ما ادرى انسى اصحابى ام تناسو والله ما ترك رسول الله صلى الله عليه وسلم من قائد فتنة الى ان تنقضى الدنيا يبلغ من معه ثلاث مأة فصاعدا الا قد سماه لنا باسمه واسم ابيه واسم قبيلته – رواه ابوداود فى اول كتاب الفتن

অর্থাৎ, আল্লাহর কসম! আমি জানি না আমার সাথীরা ভুলে গেছেন নাকি ভুলের ভান করেছেন । আল্লাহর কসম নবী কারীম সা. কিয়ামত পর্যন্ত ফিতনা সৃষ্টি কারীর কথা বলতে ছাড়েননি  । যাদের চেলা চামুন্ডার সংখ্যা হবে তিনশত বা ততোধিক । নবী কারীম সা. আমাদের সামনে তার নাম, তার পিতার নাম, তার গোত্রের নাম পর্যন্ত বলেছেন । (আবূ দাঊদ)

সুতরাং বোঝা গেল নবী কারীম সা. খুতবায় যা বলেছেন সে সব ফিতনা ও কিয়ামতের আলামত সংক্রান্ত । দুনিয়ার সকল বিষয় নয়।

তাদের পেশকৃত কতক হাদীসের উদ্দেশ্য হল নবী কারীম সা. এর সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে গায়েবের বিষয়াবলীর মধ্য থেকে শুধু শরীআতের বিধি-বিধান ও দ্বীনের বিষয়াবলী , যা নবী কারীম সা. এর শানের সাথে সংগতিপূর্ণ । হাদীসে পূর্বাপর অবস্থা থেকে এমনটিই বুঝে আসে ।

সুতরাং এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে , علم ذاتى এবং علم محيط با لكل  একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই একান্ত জ্ঞান। কোন রাসূল কিংবা গায়রে রাসূল তাতে শরীক নন  এবং কোন نص এর মাঝে মাখলূকের জন্যعالم الغيب  এর ব্যবহার দেখা যায় না।

সর্বশেষে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় তাহল মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব তার “জাআল হক্ক” গ্রন্থে স্পষ্টত ঃ উল্লেখ করেছেন যে, নবী কারীম সা. কে গায়েবের যে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তা দেয়া হয়েছিল মেরাজে । আর একথা সর্বজন বিদিত যে, মেরাজ হয়েছিল হিজরতের পূর্বে। এখন উল্লেখ করার বিষয় হল -মেরাজের রাতে নবী কারীম সা. কে গায়েবের জ্ঞান দেয়া হয়েছিল মেনে নিলে কি একথা বলার অবকাশ বের হয়ে আসেনা  যে, তাহলে বীরে মাউনার ঘটনায় সত্তুর জন সাহাবী নির্মমভাবে শহীদ হয়ে যাবেন- একথা জেনেও নবী কারীম সা. তাদেরকে প্রেরণ করেন । নাউযুবিল্লাহ কত নিষ্ঠুর ছিলেন তিনি! উহুদের যুদ্ধের বিষয়টিও সেরকম । হযরত আয়েশা (রাঃ) এর প্রতি যখন অপবাদ আরোপের ঘটনা ঘটে,তখন তিনি ওহীর অপেক্ষায় ছিলেন কেন? এভাবে নবী কারীম সা. এর জীবনের বহু ঘটনার কোন সুস্থ্য ব্যাখ্যা চলবে না , যদি মেনে নেয়া হয় যে, তিনি আদি -অন্তের সব বিষয় জানতেন।

নবী সা.-এর হাজির-নাজির হওয়া প্রসঙ্গ

হাজির ও নাজির শব্দ দুটো আরবী । হাজির অর্থ মওজুদ, বিদ্যমান বা উপস্থিত । আর নাজির অর্থ দ্রষ্টা । যখন এ শব্দ দুটোকে মিলিয়ে ব্যবহার করা হয় , তখন অর্থ হয় ঐ সত্তা, যার অস্তিত্ব বিশেষ স্থানে সীমাবদ্ধ নয় বরং তাঁর অস্তিত্ব একই সময়ে গোটা দুনিয়াকে আবেষ্টিত করে রাখে এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবস্থা তার দৃষ্টির সামনে থাকে ।

হাজির-নাজির সম্পর্কে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা।

পূর্বোক্ত ব্যাখ্যা অনুসারে হাজির-নাজির কথাটি একমাত্র আল্লাহতা‘আলার ব্যাপারেই প্রযোজ্য । হাজির-নাজির কথা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই সিফাত । নবী কারীম সা. এর ব্যাপারে হাজির-নাজিরের আকীদা পোষণ করা শরীআতগত ও যুক্তিগত উভয় দিক থেকে ভ্রান্ত ।

হাজির-নাজির সম্বন্ধে বিদ‘আতীদের আকীদা

বিদ‘আতীদের আকীদা হল রাসূল সা. সর্বত্র হাজির-নাজির । তাদের এ বিশ্বাসের পশ্চাতে মীলাদে কিয়াম করার বিষয়টার স্বপক্ষে দলীল দাঁড় করানোর চিন্তা -চেতনা কাজ করেছে। সেটি এভাবে যে, রাসূল সা. এর নামে দুরূদ শরীফ পাঠ করা হলে তিনি তা জানেন , যেহেতু তিনি হাজির-নাজির বা সর্বত্র উপস্থিত । তাই তাঁর উপস্থিতি হেতু কেয়াম করতে হবে।

বিদ‘আতীদের আকীদা মতে শুধু হুজুরে পাক সা. ই নন , বরং বুযুর্গানে দ্বীনও পৃথিবীর সবকিছুকে হাতের তালুর মত দেখতে পান । তারা দূরের ও কাছের আওয়াজ শুনতে পান। এবং মুহুর্তের মধ্যে গোটা বিশ্ব ভ্রমণ করেন এবং হাজার হাজার মাইল দূরের হাজতমান্দ ব্যক্তির হাজত পূর্ণ করেন ।

খন্ডন

নবী কারীম সা. সর্বত্র হাজির-নাজির এটা দ্বারা যদি নবী কারীম সা. এর সর্বত্র শারীরিক হাজির-নাজির থাকা উদ্দেশ্য হয় , তাহলে এটা যুক্তিগত ভাবে অসম্ভব এবং সুস্পষ্ট ভ্রান্তি । কারণ , এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, নবী কারীম সা. রওযা মোবারকে আরাম করছেন। এবং সমস্ত আশেকীনরা সেখানে গিয়ে হাজিরা দেন, যিয়ারত করেন । বিশ্বের যে কোন স্থান থেকে তাঁর প্রতি দুরূদ সালাম পাঠ করা হলে নিয়মিত  ফেরেশতাগণ সে দুরূদ ও সালাম তাঁর কাছে পৌঁছে দেন। এ সম্বন্ধে “মীলাদে কেয়াম এর হুকুম”শিরোনামে পূর্বে দলীল প্রমাণ সহ বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হয়েছে।

 আর নবী কারীম সা. সর্বত্র হাজির-নাজির এটা দ্বারা যদি তাঁর রূহানী হাজিরী উদ্দেশ্য হয়ে থাকে । অর্থাৎ, এই বোঝানো  হয়ে থাকে যে, দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর নবী কারীম সা. এর পবিত্র রূহের জন্য সর্বস্থানে বিচরণ করার অনুমতি রয়েছে, তাহলে বলা হবে সর্বস্থানে বিচরণের অনুমতি থাকার দ্বারা বাস্তবেই সর্বস্থানে উপস্থিত থাকা জরূরী নয় । বরং তিনি যে সর্বত্র হাজিন-নাজির থাকেন না , তার প্রমাণ ইতি পূর্বে দেয়া হয়েছে যে, তিনি সর্বদা রওযা মুবারকে আরাম করছেন । অতএব এখানে যদি কেউ অন্য কোন নির্দিষ্ট স্থানে নবী কারীম সা. এর উপস্থিতির কথা দাবী করেন, তাহলে সেটা হবে একটা স্বতন্ত্র দাবী । এর স্বপক্ষে দলীল চাই । অথচ এর স্বপক্ষে কোন দলীল নেই। সুতরাং দলীল বিহীন এমন আকীদা পোষণ করা নাজায়েয ।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের দলীল

১ম দলীল

আল্লাহ তা‘আলা নবী করীম সা. কে হযরত মূসা (আঃ) এর ঘটনা সম্পর্কে অবগত করার পর ইরশাদ করেন,

وما كنت بجانب الغربى اذ قضينا الى موسى الامر وما كنت من الشاهدين

অর্থাৎ, তুমি (তূর পর্বতের) পশ্চিম পাশ্বে উপস্থিত ছিলে না, যখন আমি মূসা (আঃ) এর কাছে হুকুম প্রেরণ করি । আর তুমি তার প্রত্যক্ষকারী ছিলে না । (সূরা ঃ২৮-কাসাসঃ৪৪)

সুতরাং বোঝা গেল- হযরত মূসা (আঃ) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় হমানবী সা.তূর পর্বতের পশ্চিম পার্শ্বে হাজিরও ছিলেন না নাজিরও ছিলেন না । তাহলে রাসূল সা. সর্বত্র হাজির নাজির  একথাটি সঠিক হয় কি করে ?

২য় দলীল

সূরা তওবায় আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وممن حولكم من الاعراب منفقون ومن اهل المدينة مردوا على النفاق لاتعلمهم نحن نعلمهم

অর্থাৎ, তোমার আশপাশের পল্লীবাসী ও মদীনাবাসীর মাঝে এমন কিছু মুনাফিক রয়েছে যারা মুনাফেকিতায় সিদ্ধ। তুমি তাদেরকে জান না । আমি তাদেরকে জানি । (সূরাঃ৯- তাওবা ঃ১০১)

দেখা গেল রাসূল সা. মদীনার আশপাশের অনেক লোক সম্পর্কে জানতেন না। তিনি সর্বত্র হাজির-নাজির থাকলে তো অকশ্যই সকলের সম্বন্ধে অবগত থাকতেন । তাহলে রাসূল সা. সর্বত্র হাজির-নাজির এ দর্শন সঠিক হয় কি করে ?

বিদ‘আতীদের দলীল ও তার খন্ডন

১ম দলীল

আহমদ ইয়ার খান সাহেব তার দাবীর স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে লিখেন-

يايها النبى انا ارسلنك شاهدا و مبشرا ونذيرا وداعيا الى الله باذنه وسراجا منيرا

অর্থাৎ, হে গায়েবের খবর প্রদানকারী  ! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে হাজির-নাজির, সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর সাথে তার নির্দেশে আহবানকারী এবং দীপ্তমান সূর্য রূপে প্রেরণ করেছি । (সূরাঃ৩৩-আহযাবঃ৪৫-৪৬)

আহমদ ইয়ার খান সাহেব বলেন, শাহেদ এর অর্থ সাক্ষীও হতে পারে আবার হাজির-নাজিরও হতে পারে । সাক্ষীকে শাহেদ বলার কারণ হল সে ঘটনা স্থলে উপস্থিত থাকে । আর হুজুর সা. কে শাহেদ বলা হয় একারণে যে, তিনি দুনিয়াতে গায়েব জগতের বিষয় দেখে সাক্ষ্য দেন। অন্যথায় অন্যান্য নবীগণও তো সাক্ষ্যদানকারী । তাহলে তফাৎ থাকল কোথায় ? অথবা একারণে যে, নবী কারীম সা. কিয়ামতের দিবসে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের পক্ষে চাক্ষুস সাক্ষ্য দান করবেন । আর এ সাক্ষ্য দেখা ছাড়া সম্ভব নয় । এমনিভাবে নবী কারীম সা. এর সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হওয়াও তাঁর হাজির-নাজির হওয়ার প্রমাণ ।  কেননা , অন্যান্য নবীগণ একাজ করেছেন শুনে , আর হুজুর সা. এ কাজ করেছেন দেখে। এ জন্যইতো স্বশরীরে মে’রাজ একমাত্র হুজুর সা. এরই হয়েছে। আবার সিরাজাম-মুনীরা বলা হয় সূর্যকে । এটা পৃথিবীর সর্বস্থানে বিরাজমান , প্রত্যেক ঘরে বিদ্যমান । তদ্রƒপ নবী কারীম সা. ও সর্বস্থানে বিদ্যমান । সুতরাং এ আয়াতের প্রত্যেকটি বাক্য থেকে নবী কারীম সা. এর হাজির-নাজির হওয়া প্রমাণিত হয়।

 খন্ডন

খান সাহেব এ সত্যটুকুও অবলোকন/অনুধাবন করেননি যে, সূর্য সর্বস্থানে বিদ্যমান নয় বরং যেখানে দিন সেখানে সূর্য বিদ্যমান আর যেখানে রাত সেখানে সূর্য অবিদ্যমান। সুতরাং এই উপমার মাধ্যমে খান সাহেবের দাবী প্রমাণিত না হয়ে বরং নবী কারীম সা. এর সর্বত্র হাজির-নাজির না হওয়াই প্রমাণিত হয়। নবীগণ শুধু গায়েব সম্পর্কে সংবাদ প্রদান করেন-এর দ্বারা কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর সবকিছু জানা ও দেখা প্রমাণিত হয় না। বরং আল্লাহ তা‘আলার ওহী ও ইলমের মাধ্যমে যতটুক ুজানেন তাঁরা ততটুকুই অবগত থাকেন ।

আর আহমদ ইয়ার খান সাহেবشاهد  এর যে অর্থ বর্ণনা করেছেন তা ঠিক নয়। বরং شاهد   শ্বদটি شهد يشهد  (س) থেকে ইসমে ফায়েল এর ছীগা । এর অর্থ হল নিশ্চিত ও সঠিক সংবাদ প্রদানকারী । এর জন্য আলেমুল গায়েব হয়ে দেখে সাক্ষ্য দেয়া জরূরী নয় । সুতরাং এ আয়াত দ্বারা কোনভাবেই নবী কারমি সা. এর হাজির-নাজির হওয়া প্রমাণ করা যায় না ।

অনুরূপভাবে আহমদ ইয়ার খান সাহেব কুরআনে কারীমের যে আয়াত নবী কারীম সা. এর হাজরি -নাজিরের স্বপক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করেছেন সেখানেই তিনি গলত ফা‏হমী বা ভুল বুঝার শিকার হয়েছেন । তিনি সূরা বাকারার ১৪৩ নং আয়াত , সূরা নিসার ৪১ নং আয়াত ও সূরা তাওবার ১২৮ নং আয়াত দ্বারাও এমনভাবে প্রমাণ পেশ করার চেষ্টা করেছেন, যা সাধারণ বোধ সম্পন্ন ব্যক্তির নিকটও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে ।

২য় দলীল

বিদ‘আতীগণ হুজুর সা. এর হাজির-নাজির হওয়ার পক্ষে আরও কিছু হাদীস উল্লেখ করেন, যার দ্বারা হুজুর সা. এর হাজির-নাজির হওয়া আদৌ প্রমাণিত হয় না ।

এ ব্যাপারে শেখ সা’দী (রহঃ) গুলিস্থায় সুন্দর বলেছেন,

কেউ হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছেন ব্যাপার কি ? শত সহ¯্র মাইল দূর মিশর থেকে ইউসুফ (আঃ) এর জামার ঘ্রাণ পান, অথচ কেনানের নিকটে এক কুঁয়ায় ইউসুফ (আঃ) এর ভাইয়েরা যখন তাকে নিক্ষেপ করল আপনি তা দেখতে পেলেন না ।

উত্তরে ইয়াকুব (আঃ) বলেছেন, আমাদের অবস্থা হল আকাশের চমকানো বিদ্যুতের ন্যায় । যা উদ্দীপ্ত হয়েই নিভে যায় । (অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা‘আলার মেহেরবানীর ফয়যান হয় তখন আমরা দূর দূরান্তে দেখতে পাই । তবে এ অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকে না অল্প সময় পর শেষ হয়ে যায় ।) কখনো আমরা বহু উঁচু আসমানে বসি , আবার কখনো নিজের পায়ের পিঠ পর্যন্ত দেখতে পাই না।

যে সমস্ত বিদ‘আতীরা অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি বশত ঃ শুধু নবী কারীম সা. নন বরং বুযুর্গানে দ্বীন সম্বন্ধেও হাজির-নাজির থাকার আকীদা পোষণ করেন, তাদের ব্যাপারে ফাতাওয়া হল-

ফাতাওয়ায়ে বায্যাযিয়ায় বলা হয়েছ।

قال علمائنا من قال ارواح المشائخ حاضرة تعلم يكفر

অর্থাৎ, আমাদের উলামায়ে কেরামগণ বলেনঃ যে সমস্ত ব্যক্তি এ কথা বলে যে, বুযুর্গানে দ্বীনের রূহ হাজির বা বিদ্যমান এবং সে সবকিছু জানে এমন ব্যক্তিগণ কাফের

 নবী কারীম সা. এর নূর ও বাশার হওয়া প্রসঙ্গ

নূর শব্দের অর্থ হল আলো, জ্যোতি । নূর শব্দটি প্রকৃত অর্থে ‘দৃশ্যমান’ আলো আর রূপক অর্থে ‘অদৃশ্যমান আলো’ তথা হেদায়েত , জ্ঞান ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । কুরআন-হাদীসে উভয় অর্থে নূর শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় ।  নূরদ্বয়ের মধ্য হতে অদৃশ্য নূরই আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের প্রধান উপায় । তাইতো ফেরেশতাগণ বাহ্যিক নূরের সৃষ্টি হওয়ার পাশা-পাশি অদৃশ্য নূরেরও অধিকারী ছিলেন । আর আদম (আঃ) মাটির সৃষ্টি হওয়া সত্বেও ফেরেশতাদের থেকে অনেক বেশী অদৃশ্য নূরের অধিকারী ছিলেন বিধায় তাঁর মর্যাদাও ফেরেশতাদের উর্ধ্বে । আর বাশার বা ইনসান শব্দের অর্থ হল মানবজাতি, আদম সন্তান ।

নবী  করীম (সা:)সম্পর্কে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা বিশ্বাসঃ

নবী কারীম সা. সত্তাগত দিক থেকে বাশার বা মানুষ, তবে গুণাবলী ও আমালাতের দিক থেকে অদ্বিতীয়  এবং নূর স্বরূপ । হযরত মাওঃ ইউসুফ লুদিয়ানভী সাহেব ইখতিলাফে উম্মত আওর সিরাতে মুস্তাকীম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবী কারীম সা. শুধু একজন মানুষই নন বরং সর্বোত্তম মানুষ, সমস্ত মানব জাতির সর্দার এবং আদম (আঃ) ও বনী আদমের জন্য মহান গৌরব । হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত- নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন,

انا سيد ولد ادم يوم القيامة واول من ينشق عنه القبر واول شافع واول مشفع – رواه مسلم –

فى كتاب الفضائل – باب تفضيل نبينا صلى الله عليه وسلم على جميع الخلائق

অর্থাৎ, আমি কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের সর্দার হব । সর্বপ্রথম আমার কবর খোলা হবে । আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং সর্বপ্রথম যার সুপারিশ কবূল হবে সে আমি । (মুসলিম)

নবী কারীম সা. সত্তাগত দিক থেকে একজন মানুষ, তেমনিভাবে হেদায়েতের দৃষ্টিকোন থেকে মানব জাতির জন্য নূরের স্উুচ্চ স্তম্ভ। সেই স্তম্ভের আলোক রশ্মি থেকেই মানব জাতির জন্য সঠিক পথের সন্ধান লাভ হয় । যার কিরণ মালা আজও দীপ্তিমান রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। সুতরাং নবী কারীম সা. বাশার তথা মানুষ হয়েও নূর তথা হেদায়েতের আলোকবর্তিকা । বস্তুত ঃ নবী কারীম সা. সহ সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম মানব জাতির অন্তর্ভুক্ত । নি¤েœ এ সম্পর্কে কয়েকটি আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করা হল-

قل انما انا بشر مثلكم يوحى الى انما الهكم اله واحد

অর্থাৎ,হে নবী ! তুমি বলে দাও আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ । আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয় এই মর্মে যে, তোমাদের মা’বূদই একমাত্র মা’বূদ ।’ (সূরাঃ ১৮-কাহ্ফঃ১১১)

অন্যত্র আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,

قل سبحان وبى هل كنت الا بشرا رسولا- وما منع الناس ان يؤمنوا اذ جاءهم الهدى الا ان فالوا ابعث الله بشرا رسولا – قل لو كان فى الارض ملئكة يمشون مطمئنين لنزلنا عليهم من السماء ملكا رسولا-

অর্থাৎ, হে নবী! তুমি বলে দাও আমার প্রতিপালক পূত-পবিত্র সত্তা । আমিতো একজন মানব, রাসূল মাত্র । লোকদের নিকট হেদায়েত এসে যাওয়ার পর এ উক্তি তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে যে, আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন । …। (সূরাঃ ১৭-বানী ইসরাঈলঃ৯৪-৯৫)

অনুরূপ আরও আয়াতে নবী কারীম সা. কে মানুষ বলা হয়েছে । তবে সাথে সাথে তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথাও বলে দেয়া হয়েছে যে, তিনি একজন মহান রাসূল । তাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী অবতীর্ণ হয় । হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) কর্তৃক বোখারী ও মুসলিমের এক হাদীসে নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন ,

عن ام سلمة عن النبى صلى الله عليه وسلم . انه سمع خصومة بباب حجرته فخرج اليهم فقال انما انا بشر و انه ياتينى الخصم – الى الحديث . متفق عليه. رواه البخارى ج/١ص٣٣٢ ابواب المظالم والقصاص – باب اثم من خاصم فى باطل وهو يعلم .

رواه مسلم فى كتاب الاقضية ص٧٤-

এ হাদীসে নবী কারীম সা. (নামাজের এক ঘটনা প্রসঙ্গে ) নিজের সম্পর্কে বলেছেন , আমিতো তোমাদের মতই একজন মানুষ ; তোমাদের যেমন ভুল হয় আমারও তেমন ভুল হয় । সুতরাং আমি যখন কোন জিনিস ভুলে যাব, তখন তোমরা আমাকে তা স্বরণ করিয়ে দিবে ।  (বোখারী)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হল যে, নবী কারীম সা. একজন মানুষ, -ফেরেশতা, জিন, কিংবা অন্য কোন মাখলূক নন । নবী কারীম সা. এর শরীর নূরের তৈরী নয়  বরং মানব জন্মের প্রাকৃতিক ধারা অনুসারেই নবী কারীম সা. এর সৃষ্টি হয়েছে । আর মানব সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন,

اذ قال ربك للملئكة انى خالق بشرا من طين

অর্থাৎ, আর স্বরণ কর যখন প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন ঃ আমি মাটি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করব ।(সূরা ঃ৩৮-সাদঃ ৭১)

অন্যত্র এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে ,

هو الذى خلقكم من تراب ثم من نطفة ثم من علقة ثم يخرجكم طفلا ثم لتبلغوا اشدكم ثم لتكونوا شيوخا —

অর্থাৎ, ঐ সত্তা, যিনি তোমাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর পানি দ্বারা , এরপর জমাট রক্ত , দ্বারা , তারপর তোমাদেরকে শিশু রূপে বের করেন । এরপর তোমরা যৌবনে পদার্পন কর , তারপর বাধ্যর্কে উপনীত হও । (সূরাঃ৪০- মু’মিনঃ ৬৭)

এসব আয়াতে সামগ্রিকভাবে মানব সৃষ্টির ধারা বর্ণিত হয়েছে । আর নবী কারীম সা. নিজের সৃষ্টি সমস্পর্কে ইরশাদ করেছেন ,

عن واثلةالاسقع يقول سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الله عز وجل اصطفى كنانة من ولد اسماعيل عليه الصلوة والسلام واصطفى قريشا من كنانة واصطفى من قريش بنى هاشم واصطفانى من بنى هاشم – رواه مسلم فى كتاب الفضائل ج/٢ ص٢٤٥ ورواه الترمذى فى اول ابواب المناقب وقال هذا حديث صحيح ج/٢ص٢۰١ واللفظ لمسلم

অথাৎ, হযরত ওয়াছিলা ইবনে আছক্বা’ (রাঃ) বলেন যে, আমি রাসূল সা. কে ইরশাদ করতে শুনেছিযে, আল্লাহ্ তা‘আলা ইসমাঈল (আঃ) এর বংশধর থেকে কিনানা-কে মনোনিত করেছেন। আর কিনানা থেকে কোরাইশকে , কোরাইশ থেকে বনূ হাশিমকে আর বনূ হাশিম থেকে আমাকে মনোনিত করেছেন । (মুসলিম ও তিরমিযী )

আবূ জা’ফর বাকের (রহঃ) থেকে বর্ণিত নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন,

انما خرجت من نكاح ولم اخرج من سفاح من لدن ادم ولم يصبنى من سفاح اهل الجاهلية شئى لم اخرج الا من طهره – رواه ابن سعد فى الطبقات الكبرى عن ابى جعفر الباقر مرسلا وكذا رواه عبد الرزاق قال ابن كثير فىالبداية و النهاية ج/٢ صفحة / ٢۰٩ هذا مرسل جيد –

অর্থাৎ, আমার জন্ম বিবাহের মাধ্যমে হয়েছে । কোন অবৈধ পন্থায় নয় । আদম (আঃ) থেকে নিয়ে (আমার মাতা-পিতা পর্যন্ত সমস্ত স্তর বৈধ বিবাহ-বন্ধনের মাধ্যমেই চলে আসছে ।) জাহিলিয়্যাতের কোন অবৈধ প্রদ্ধতি আমাকে স্পর্শ করেনি । পবিত্র ও বৈধ পদ্ধতিতেই আমার জন্ম হয়েছে । (তাবাকাতে ইবনে সাআদ ও মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক)

পূর্বোক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হল যে, মানব জন্মের প্রাকৃতিক ধারা অনুসারেই নবী কারীম সা. এর জন্ম হয়েছে । নূর থেকে নয় । এজন্যই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদার সুপ্রসিদ্ধতম কিতাব ‘শরহে আকাইদে নাসাফীতে’ রাসূল সা. এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে-

انسان بعثه الله لتبليغ الرسالة و الاحكام

অর্থাৎ, রাসূল সা. ঐ ব্যক্তি (মানুষ) কে বলা হয় আল্লাহ্ তা‘আলা যাকে (বান্দা পর্যন্ত) স্বীয় বিধি-বিধান ও রিছালত পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছেন।”

 বিদ’আতীদের দলীল ও তার খন্ডন

রেজাখানী উলামায়ে কেরামের আকীদা-বিশ্বাস যদিও এই যে, ‘নবী কারীম সা. মানুষ (বাশার) । যে এটাকে অস্বীকার করবে সে কাফের ।’ কিন্তু তারা কুরআনে কারীমের নি¤œাক্ত আয়াতে বর্ণিত নূর শব্দের ব্যাখ্যায় নবী কারীম সা. এর পবিত্র সত্তা মুরাদ বলে ব্যক্ত করে থাকেন । যার দ্বারা সাধারণ মানুষ এই বিভ্রান্তিতে পড়েন যে, নবী কারীম সা. নূরের তৈরী , অর্থাৎ তিনি মানুষ (বাশার) নন ।

আয়াতটি এই

قد جاء كم من الله نور و كتاب مبين يهدى به الله من اتبع رضوانه سبل السلام

অর্থাৎ, নিশ্চই আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে নূর (আলো) এবং স্পষ্ট কিতাব এসেছে । যার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তিকে শান্তির পথ দেখান, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে । (সূরা ঃ ৫-মায়িদা ঃ১৬)

এ আয়াতে নূর দ্বারা বোঝানো হয়েছে “কুরআনে কারীম” কে । আর كتاب مبين  — نور থেকে عطف تفسيرহয়েছে । এর প্রমাণ হল – (এক) আয়াতের পশ্চাদবর্তী অংশে يهدى به الله  বাক্যে به  তে এক বচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে । যদি  نور ও  كتاب مبين  দ্বারা পৃথক পৃথক দুটি বিষয় উদ্দেশ্য হত তাহলে এক বচনের সর্বনাম ব্যবহার করা সহীহ হত না ।

(দুই) নি¤েœা দুই আয়াতে যেমনিভাবে তাওরাত এবং ইঞ্জিলকে নূর বলা হয়েছে , তদ্রƒপ আলোচ্য আয়াতে ও “নূর” দ্বারা কুরআন উদ্দেশ্য হওয়াটাই যুক্তি সংগত এবং তা দ্বারা নবী কারীম সা. এর সত্তা উদ্দেশ্য নেয়া ভুল।

انا انزلنا التوراة فيه هدى و نور

অর্থাৎ আমি নাযিল করেছি তাওরাত , যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর । (সূরা ঃ ৫-মায়িদা ঃ ৪৪)

وآتينه الانجيل فيه هدى ونور

অর্থাৎ, আমি তাকে দান করেছি ইঞ্জীল, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর । (সূরা ঃ ৫-মায়িদাঃ৪৬)

 ২. আর একদল রয়েছে যারা বলে নবী কারীম সা. আল্লাহ্ তা‘আলার নূর সমূহের একটি নূর । যিনি বাশারিয়্যাতের তথা মানবের আবরণে আবির্ভুত হয়েছেন । অর্থাৎ, তারা বলতে চান যে, নবী কারীম সা.আল্লাহর প্রকাশ ছিলেন । আর অনেকে এ পর্যন্তও বলে যে, আহাদ তথা আল্লাহ আর আহমদ তথা নবী কারীম সা. এর মাঝে শুধু (মীম) বর্ণের মার্থক্য । (নাউযুবিল্লাহ)

 খন্ডন

এটা হুবহু ঐ আকীদা যা, ঈসা (আঃ)  এর ব্যাপারে পোষণ করে থাকেন যে, তিনিই খোদা তবে তিনি মানুষের রূপে আগমন করেছেন । এ আকীদা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত । কেননা সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তা কখনো এক হতে পারে না । উম্মত কর্তৃক এধরনের বাড়াবাড়ির আশংকা ছিল বিধায় নবী কারীম সা. এ ব্যপারে উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন,

عن عمر – رض- قال سمعت النبى صلى الله علي وسلم يقول لا تطرونى كما اطرت النصارى عيسى بن مريم فانما انا عبده ولكن قولوا عبدالله ورسوله – رواه البخارى فى كتاب الانبياء- باب قول الله عز وجل و اذكر فى الكتاب مريم الخ ج/٢صفحة ٤٩۰

অর্থাৎ, হযরত ওমর (রাঃ) থেকে বলেন, আমি নবী কারীম সা. কে বলতে শুনেছি  আমার প্রশংসায় তোমরা এতটা বাড়াবাড়ি কর না, যেমনটি ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে করেছি । (তারা ঈসা (আঃ) কে খোদা এবং খোদার বেটা বানিয়ে দিয়েছিল ।)

আমি তো আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর  প্রেরিত রাসূল । সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা  এবং রাসূলই বলবে ।  বোখারী)

৩. বাতিল পন্থীরা তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে কয়েকটি জাল হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করে  থাকেন । যা লোক মুখে হাদীস বলে প্রসিদ্ধ হলেও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো জাল হাদীস । নি¤েœ সেরূপ কয়েকটি প্রদত্ত হল ।

اول ما خلق الله نورى

(১)   আল্লাহ্ তা‘আলা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন ।

عن جابر .. سآلت رسول الله صلى الله عليه و سلم عن اول شئى خلقه الله –

قال هو نور نبيك يا جابر

(২) জাবের (রাঃ) বলেন , আমি রাসূল সা. কে আল্লাহ্ তা‘আলার সর্বপ্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বলেন , “ হে জাবের ! সেটা হল তোমার নবীর নূর”।

ا نا من نور الله وكل شئى منى

(৩)আমি আল্লাহ্ তা‘আলার নূর থেকে (সৃষ্টি) আর সব কিছু আমার নূর থেকে (সৃষ্টি)

انا من نور الله والمؤمنون من نورى

(৪)  আমি আল্লাহ্ তা‘আলার নূর থেকে আর মু‘মিনগণ আমার থেকে ।

انا من الله و المؤمنون منى

(৫) আমি আল্লাহ্ তা‘আলা থেকে আর মু‘মিনগণ আমার থেকে ।

(৬) আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূল সা. হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে তাঁর বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-একটি তরকা প্রতি ৭০ হাজার বছর পর পর উদিত হয়, আমি সেটিকে ৭০ হাজার বার উদিত হতে দেখেছি । এতে আপনি আমার বয়স আন্দায করে নিন । নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন-সেটিই ছিল আমার নুর ।

(৭) আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে, হযরত আদম (আঃ)  এর সৃষ্টির ১৪ হাজার বছর পূর্বে আমি সা. নূর আকারে বিদ্যামান ছিলাম ।

খন্ডন

বাতিল পন্থীদের দলীল হিসাবে প্রদত্ত এ হাদীসগুলোর ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে সিদ্দীক আল গমারী (রহঃ), শায়খ আহমদ ইবনে আব্দুল কাদের শানকীতী, হাফেজ ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাছীর সহ অন্যান্য অনেক হাদীস বিশেসজ্ঞ মন্তব্য করেছেন যে, এসবগুলোই জাল, মিথ্য ও বানোয়াট ।

৪. নবী কারীম সা. নূর ছিলেন-এ প্রসঙ্গে বিদ‘আতীগণ ঐ রেওয়ায়েত দ্বারাও দলীল দিয়ে থাকেন, যাতে বলা হয়েছে নবী কারীম সা. এর ছায়া ছিল না ।

 খন্ডন

এ সম্পর্কিত কোন সহীহ রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না । জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) তাঁর “খাসায়েসে কুবরা” গ্রন্থে এ রেওয়াতটি হাকিম তিরমিযীর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন । তবে নি¤েœাক্ত কারণ সমূহের ভিত্তিতে সে রেওয়ায়েতটি গ্রহণযোগ্য নয়-

(১) উক্ত রেওয়ায়েত বর্ণনাকারীদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুর রহমান ইবনে কায়ছ যা’ফরানী, যিনি গ্রহণযোগ্য রাবী নন । এমনকি তার সম্বন্ধে জাল হাদীস রচনা করারও অভিযোগ রয়েছে । তার সমস্পর্কে নি¤েœাক্ত মন্তব্যসমূহ লক্ষ্যণীয় ।

١. قال ابن حجر . متروك- التقريب ج/١ صفحة ٥٨٨

٢. قال ابوزرعة . كذاب. تاريخ بغداد جلد / ٨ صفحة ٢٧٧

٣. قال الامام مسلم . ذاهب الحديث . المصدر السابق

٤. قال ابو على . كان يضع الحديث . المصدر السابق-

(২) উক্ত রেওয়ায়েতটি মুরসাল যা, মুহাদ্দিছীনে কেরামের অনেকের নিকট দলীলযোগ্য নয় । বিশেষতঃ এরূপ হাদীস দিয়ে আকাইদের বিষয়ে দলীল দেয়া চলে না ।

(৩) রাসূল সা. কর্তৃক রৌদ্রে এবং চাঁদের আলোতে চলার অসংক্ষ্য ঘটনা রয়েছে । আর সাহাবায়ে কেরামের অভ্যাস ছিল রাসূল সা. এর ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র বিষয় বর্ণনা করা। যদি রাসূল সা. এর ছায়া না পড়ার মত একটি অলৌকিক বিষয় ঘটত, তাহলে তা অসংক্ষ সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হত । কিন্তু সেখানে মাত্র একটি রেওয়ায়েতে তা বর্ণিত হওয়া তাও একটি জয়ীফ রেওয়ায়েতে- এ বিষয়টি উপরোক্ত রেওয়ায়েতকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

 ৫. বিদ‘আতীগণ ঐ রেওয়ায়েত দ্বারাও দলীল দিয়ে থাকেন যাতে নবী কারীম সা. কর্তৃক নিজেকে নূর বানিয়ে দেয়ার দু‘আ বর্ণিত হয়েছে ।

তিনি বলতেন .  اللهم اجعلنى نورا

অর্থাৎ, হে আল্লাহ্ ! আমাকে নূর বানিয়ে দাও ।

 খন্ডন

তিনি নিজেকে নূর বানিয়ে দেওয়ার দু‘আ করতেন  এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি নূর ছিলেন না । আর বস্তুত ঃ এখানে নূর অর্থ হল হেদায়েতের নূর। তিনি নিজেকে নূর বানিয়ে দেয়ার দু‘আ করতেন তথা তাঁর হেদায়েতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে দেয়ার দু‘আ করতেন ।

 নূর ও বাশার প্রসঙ্গে দেওবন্দীদের বিরুদ্ধে

রেজাখানীদের একটি মিথ্যা অভিযোগ ও তার খন্ডন

রেজাখানী বা রেজভীগণ মাওঃ শাহ মুহাম্মদ ইসমাঈল শহীদ ও আকাবীরে দেওবন্দের ব্যাপারে একটি মিথ্যা অভিযোগ পেশ করে থাকেন যে, তারা নবী কারীম সা. কে নিজেরদের মত মানুষ মনে করেন এবং নবী কারীম সা. এর মর্যাদা বড় ভাইয়ের মত বলে মনে করেন ।

খন্ডন

এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা । আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের যে আকীদা,  দেওবন্দের শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহঃ) এর ও সেই আকীদা  । (আকাইদে ওলামায়ে দেওবন্ধ)

স্বয়ং হযরত মাওঃ শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহঃ) তাকবিয়াতুল ঈমান গ্রন্থে ৫৮ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

নবী কারীম সা. সমস্ত আম্বিয়া এবং আউলিয়ায়ে কেরামের সর্বদার ছিলেন । আর মানুষ তাঁর বড় বড় মু;যিজা দেখেছে , তাঁর থেকেই সমস্ত সুক্ষ্ম বিষয়াদী শিখেছে এবং বুযুর্গদের বুযুর্গী অর্জন হয়েছে তাঁরই অনুসরণের মাধ্যমে ।

 ওরশ প্রসঙ্গ

 ওরশ-এর অর্থ

ওরশ এর আভিধানিক অর্থ বিবাহ, বাসর । পরিভাষায় ওরশ বলতে বোঝায় বৎসরান্তে কোন ওলী  ও বুযুর্গের মাযারে সমবেত হয়ে ধুমধাম সহকারে ফাতেহাখানী. ঈসালে ছওয়াব , ভোজ ইত্যাদির আয়োজন করা ।

ওরশ-এর হুকুম

ওরশ-এর ক্ষেত্রে দুটো বিষয় পালিত হয়ে থাকে ।

(এক) বৎসরান্তে নির্দিষ্ট দিনে কোন ওলী  ও বুযুর্গের করব যিয়ারতে সমবেত হওয়া এবং ঈসালে ছওয়াব করা অর্থাৎ, মৃত্যৃ-বার্ষিকী পালন করা ।

(দুই) সংশ্লিষ্ট ওলী ও বুযর্গের কবর দূরে হলে প্রয়োজনে সেই উদ্দেশ্যে সফর করা ।

এখানে ওরশের হুকুম বুঝতে হলে এই দুটো বিষয়ের হুকুম পৃথক পৃথক ভাবে বোঝা আবশ্যক।

 ১ম বিষয়ের হুকুম

বুযুর্গানে দ্বীনের প্রতি সুধারণা রাখা এবং মহব্বত পোষণ করা , যথাযথভাবে তাঁদের পদাংক অনুসরণ করে চলা এবং তাঁদের মৃত্যু পর নিয়মানুসারে ইছালে সাওয়াব করা . তাঁদের মর্যাদা বুলন্দির জন্য দু‘আ করা- এসবই প্রশংসনীয় কাজ এবং উত্তম আমল সমূহের অন্তর্ভুক্ত । তবে কবর যিয়ারাতের জন্য কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে সকলেই সেদিনে সমবেত হওয়াকে শরী‘আত আদৌ সমর্থন করে না । বিশেষ করে বৎসরান্তে একটি দিনকে নির্দিষ্ট করা যাকে পরিভাষায় ওরশ বলা হয়-শরী‘আতে এর কোনই ভিত্তি নেই । নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন-

لا تجعلوا قبرى عيدا – مشكوة عن النسائى

অর্থাৎ, তোমরা আমার কবরকে ঈদ বানিও না ।

মুহাদ্দিসীনে কেরাম এর বিভিন্ন অর্থ ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ।

এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে “لا تجعلوا للزيارة اجتماعكم للعيد” অর্থাৎ, তোমরা ঈদে সমবেত হওয়ার মত যিয়ারতের জন্য সমবেত হয়ো না । আর ওরশের মাঝে এমন সমাবেশই ঘটানো হয়ে থাকে – যা থেকে নবী কারীম সা. নিষেধ করেছেন।

দ্বীতীয় ব্যাখ্যা বলা হয়েছে-

المراد الحث على كثرة زيارته ولا يجعل كالعيد الذى لا يآتى فى العام الامر تين –

كذافى المرقات ج/ ٣صفحة /١۰

অর্থাৎ, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল  মানুষকে বেশী বেশী যিয়ারতের উপর ইদ্বুদ্ধ করা এবং এই কবর যিয়ারতকে যেন ঈদের মত বানানো না হয় , যা বৎসরে দুই বার পালন করা হয় । বরং বেশী বেশী যেন যিয়ারাত করা হয় । আর ওরশও বৎসরে একবার উদযাপীত হয় । সুতরাং ওরশ করা হাদীস পরিন্থী  । আর নবী কারীম সা. এর কবরেই যখন ওরশ করা জায়েয নেই , তখন অন্য কারও কবরে তো এমনটি জায়েয হওয়ার প্রশ্নই আসে না ।

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহঃ) লিখেছেন-

لا تجعلوا زيارة قبرى عيدا – اقول هذا اشارة الى سد مدخل التحريف كما فعل اليهود والنصرى بقبور انبيائهم و جعلوها عيدا وموسما بمنزلة الحج – حجة الله البالغة . الاذكار وما يتعلق بها ج/٢ صفجة /٧٧ طبج مصر—

অর্থাৎ, নবী কারীম সা. যে বলেছেন, “তোমরা আমার কবর যিয়ারাতকে ঈদ বানিও না ।” আমি বলব, এর দ্বারা ইশারা করা হয়েছে যেন তাহ্রীফ (ধর্মে বিকৃতি সাধন) এর পথ বন্ধ হয়ে যায় । কেনান, ইয়াহুদ নাসারারা তাদের আম্বিয়া (আঃ) এর কবরেকে ঈদের মতো এবং হজ্জের মত মওসূমী বানিয়ে নিয়েছে ।

যেমনিভাবে হজ্জের জন্য বিশেষ সময়ে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তা আঞ্জাম দেয়া হয় ,ঠিক তেমনিভাবে ইয়াহুদী নাসারারা তাদের নবীদের কবরের সাথেও এমন করে থাকে । আর নামকে ওয়াস্তে মুসলামনরা আম্বিয়ায়ে কেরামের পরিবর্তে আউলিয়া কেরামের কবরের সাথে বরং বানাওয়াটি কবরের সাথে এমনটি করে থাকে । যা দেখে ইয়াহুদী নাসারাগণও লজ্জিত হয় ।

হযরত শাহ ওয়ালী ইল্লাহ (রহঃ) আরও লিখেছেন-

ومن اعظم البدع ما اخترعوا فى امور القبور واتخذوها عيدا – راه سنت از تفهيمات الهيه ج/٢ صفحة ٦٤—

অর্থাৎ, ঐ সকল বিষয়ও বড় বিদ‘আত সমূহের অন্তর্ভুক্ত, কবরের ব্যাপারে মানুষ যা উদ্ভাবন করেছেনএবং কবরকে তারা ঈদের মত মেলায় পরিণত করেছে।

হযরত শাহ্ আব্দুল আযীয (রহ.) বলেন, কবর যিয়ারাতের জন্য দিন নির্দিষ্ট করা বিদ‘আত । মূলত ঃ

যিয়াত করা জায়েয কিন্তু তার জন্য সময় নির্দিষ্ট করা (যা উলামায়ে সালাফের মাঝে ছিল না ) বিদ‘আত ।

হযরত কাজী ছানাউল্লাহ হানাফি বলেন,

لايجوز ما يفعله الجهال بقبور الاولياء والشهداء من السجود والطواف حولها واتخاذ السرج والمساجد عليها ومن الاجماع بعد الحول كالاعياد ويسمونه عرسا – تفسير مظهرى ج/٢ صفحة ٦٥-

অর্থাৎ, অজ্ঞ মূর্খরা আউলিয়া ও শুহাদাদের কবরের সাথে যা করে থাকে , এসব নাজায়েয । তথা-কবরকে সাজদা করা, কবরের চতুর্পাশে তওয়াফ করা, বাতি জ্বালানো , তাদের দিকে ফিরে সাজদা করা এবং বৎসরান্তে ঈদের মত সেখানে সমবেত হওয়া যাকে তারা ওরশ বলে ।

আর  ارشاد الطا لين   এর ১২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

আউলিয়ায়ে কেরামের কবরকে উঁচু করা , কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ করা, ওরশ করা, বাতি জ্বালানো – এ ধরনের আরও যা আছে সব বিদ‘আত । কতকতো হারাম আর কতক মাকরূহ । নবী কারীম সা. কবরের পাশে বাতি প্রজ্জলন কারী এবং সাজদা কারীদের উপর লা’নত করেছেন।

হযরত শাহ্ মুহাম্মদ ইসহাক (রহঃ) লিখেছেন-

ওরশের দিন ধার্য করা জায়েয নেই ।  (রাহে সুন্নাত আয মাসায়েলে আরবাইন পৃষ্ঠা ৩৮)

 ২য় বিষয়ের হুকুম

পূর্বে বলা হয়েছে বুযুর্গানে দ্বীনের কবর যিয়ারাত করা , মৃত্যুর পর নিয়মানুসারে তাঁদের উদ্দেশ্যে ঈছালে ছওয়াব করা, তাঁদের মর্যাদা বুলন্দির জন্য দু‘আ করা এসবই প্রশংসনীয় এবং উত্তম কাজ । সেমতে যদি কোন বুযুর্গের কবর ধারে কাছে হয়, তাহলে সেখানে উপস্থিত হয়ে দু‘আ করা ও শরয়ী তরীকায় সালাম পৌঁছানো এসব জায়েয । তবে যদি কোন বুযুর্গের কবর অনেক দূরে হয় তাহলে যিয়ারতের জন্য সেখানে সফর করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট বিতর্কিত বিষয় । যারা নিষেধের পক্ষে তারা নি¤েœাক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেন ।

عن ابى هريرة رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم قال لا تشد الرحال الا الى ثلاثة مساجد المساجد الحرام و مسجد الرسول صلى الله عليه وسلم و مسجد الاقصى – متفق عليه . رواه البخارى فى باب فضل الصلوة فى مسجد مكة و المدينة ورواه مسلم فى باب لا تشد الرحال الا الى ثلاثة مساجد واللفظ لمسلم

অর্থাৎ, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন, মসজিদে হারাম,রাসূলের মসজিদ (মসজিদে নববী) ও মসজিদে আকসা-এই তিন মসজিদের উদ্দেশ্য ব্যতীত সফর করা যাবে না ।  বোখারী ও মুসলিম)

হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহঃ) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আমার কাছে কবর, কোন আল্লাহর ওলীর এবাদত খানা এবং তূর পর্বত এসবগুলোই উপরোক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত ।

তিনি আরো বলেন, কেউ যদি আজমীর শরীফে খাযা মুঈনুদ্দিন চিশতি(রহঃ) এর কবরে কিংবা হযরত সালার মাসউদ গাজীর কবরে অথবা এ ধরনের অন্য কোন কবরে গিয়ে কোন প্রয়োজন পূরণের তলব করে, তাহলে সে হত্যা এবং যিনার চেয়ে মারাত্মক গুনাহ করল ।

হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নৌরী (রহঃ) হযরত আনওয়ার শাহ কাশমীরী-র বরাত দিয়ে বলেছেন আওলিয়ায়ে কেরামের কবর যিয়ারতের জন্য স্বতন্ত্রভাবে সফরের পক্ষে স্বতন্ত্র দলীল চাই । উপরোক্ত হাদীস যথেষ্ট নয় । যদিও ইমাম গাযালী (রহঃ) বলেছেন, উপরোক্ত হাদীসে তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের অতিরিক্ত কোন ফযীলত না থাকায় তার উদ্দেশ্যে সফর করতে নিষেধ করেছেন তবে বিভিন্ন ওলীর সাথে বিভিন্ন জনের মুনাসাবাত থাকার কারণে তাদের কবর যিয়ারাতের দ্বারা ভিন্ন ফায়দা হতে পারে এ হিসাবে তার জন্য সফর করাতে কোন ক্ষতি না থাকা চাই ।

আল্লামা শামী “মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা” এর বরাতে নি¤েœাক্ত হাদীস উল্লেখ পূর্বক তা দ্বারা কোন ওলীর কবর দুরে হলে তার জন্য সফর করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন ।

ان النبى صلى الله عليه وسلم كان يآتى قبور الشهداء بآحد على رآس كل سنة –

رد الطحتار ج/ ٣ مطلب فى زيارة القبور-

অর্থাৎ, নবী কারীম সা. প্রত্যেক বৎসরের মাথায় ওহুদ প্রান্তরে শহীদগণের কবরের কাছে আসতেন ।

তবে এই ইস্তিদলাল পূর্ণাঙ্গ নয় । কেননা , রাসূল সা.এর শুহাদায়ে ওহুদের কবর যিয়ারতের জন্য মদীনা থেকে ওহুদ মাত্র তিন মাইলের পথ ।

ওরশ-এর পক্ষে দলীল ও তার খন্ডন

মৌলভী আব্দুস সামী’ সাহেব , মুফতী আ‏হমদ ইয়ার খান সাহেব ও সুরেশ্বরীর  পীর সাহেব প্রমুখ ওরশপন্থী অনেকেই উপরোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা ওরশ পালন তথা নির্দিষ্ট দিনে কবরের কাছে গমন ও ঈছালে ছওয়াব করার পক্ষে দলীল দেয়ার চেষ্টা করেছেন যাতে বলা হয়েছে যে, নবী কারীম সা. বৎসরান্তে শুহাদায়ে ওহুদের কবরের পাশে যেতেন । অর্থাৎ, সেখানে যেয়ে সালাম বলতেন ও দু’আ করতেন । তাদের এ দলীল ঠিক নয় । কেননা এ রেওয়ায়েতে বৎসরান্তে নবী কারীম সা. এর গমনের কথা উল্লেখ আছে , তবে সেটি নির্দিষ্ট তারিখেই হত এমনটি হাদীস দ্বারা স্পষ্ট নয় । তদুপরি সেখানে ওরশের মত সমবেত হওয়া এবং কুরআন তেলাওয়াত ও ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদির কথা প্রচলিত ওরশ বলতে যা বোঝায় তার উল্লেখ নেই । উপরোক্ত রেওয়ায়েত দ্বারা শুধু এতটুকু বলা যেতে পারে যে, কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর হতে পারে । যদিও এই ইস্তিদলাল পূর্ণাঙ্গ নয় কেননা , পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূল সা. শুহাদায়ে ওহুদের কবর যিয়ারতের জন্য মদীনা থেকে ওহুদের পাদদেশে গিয়েছিলেন। এটাকে কোন সফর বলা যায় না । মদীনা থেকে ওহুদ মাত্র তিন মাইলের পথ।

মোটকথা এমন কোন সহীহ আকলী (যুক্তি গ্রাহ্য) ও নকলী (কুরআন হাদীসে বর্ণিত) দলীল নেই যা ওরশের বৈধতার পক্ষে দলীল হতে পারে ।

 ওরশ এর কথিত ফায়দা ও তার খন্ডন

মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেব ওরশ পালন তথা নির্দিষ্ট দিনে সমবেত হওয়ার উপকারীতা সম্বন্ধে লিখেছেন- ওরশের সময় নির্দিষ্ট করা হলে মানুষের জামায়েত হওয়া সহজ হয় । তারা সমবেত হয়ে, কুরআন তেলাওয়াত , কালিমায়ে তাইয়্যিবা এবং দুরূদ শরীফ ইত্যাদি পাঠ করে থাকে । এতে অনেক বরকত ও ছওয়াব অর্জিত হয় । মুফতী সাহেবের একথা গ্রহণযোগ্য নয় । কেননা, শায়খ আলী মুত্তাকী হানাফী লিখেছেন-

الاجتماع لقرائة القرآن على الميت با لتخصيص فى المقبر او المسجد او البيت بدعة مذمومة

অর্থাৎ, বিশেষ করে কবরস্থানে , মসজিদে এবং বাড়ীতে মৃত ব্যক্তির উপর কুরআন তেলাওয়াতের জন্য সমবেত হওয়া বিদ‘আত ।

সুতরাং সমবেত হওয়াটাই যখন বিদ‘আত তখন কুরআন তেলাওয়াতের জন্য জমায়েত হওয়ার কোন অর্থই হতে পারে না ।

 কবরে বাতি জ্বালানো প্রসঙ্গে

কবরে কোন ধরনের প্রদীপ , মোমবাতি , কিংবা আলো জ্বালানোর কোন ভিত্তি শরী‘আতে নেই । বরং শরী‘আত এগুলোকে অত্যন্ত কোপের দৃষ্টিতে দেখে । এগুলো নিষিদ্ধ । নি¤েœ এ ব্যাপারে কয়েকটি দলীল প্রদান করা হল ।

 ১নং দলীল

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) নবী কারীম সা. থেকে বর্ণনা করেন,

لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم زائرات القبور و المتخذين عليها المساجد و السراج- رواه ابوداؤد فى كتاب الجنائز ج/١ ص/ ٤٦١ ورواه النسائى فى كتاب الجنائز ج١  ص/٢٢٢

অর্থাৎ, নবী কারীম সা. কবর যিয়ারত কারীনী মহিলা, কবরকে সাজদার স্থান বানানেওয়ালা এবং কবরে বাতি প্রজ্জলন কারীর উপর লা;নত করেছেন । (আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)

উপরোক্ত হাদীসে নবী কারীম সা. আলেম এবং জাহেলের কবরের মাঝে কোন পার্থক্য করেননি বিধায় সব ধরনের কবরেই বাতি প্রজ্জলিত করা লা’নত জনক বলে প্রমাণিত ।

সুতরাং যে কাজের জন্য নবী কারীম সা. লা’নত বা অভিসম্পাদ করেছেন, সেকাজ কিছুতেই জায়েয কিংবা মুস্তাহাব হতে পারে না এবং তাতে কোন ধরনের বরকত  কল্যাণ থাকতে পারে না ।

 উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে বিদ‘আতীদের একটি অপব্যাখ্যা ও তার উত্তর

বিদ‘আতীগণ এ হাদীসের অপব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, উক্ত হাদীসে যেহেতু “আলা” (যার অর্থ উপরে )

বর্ণটি এসেছে , তাই তার দ্বারা কবরের উপর বাতি জ্বালানো নাজায়েয প্রমাণিত হবে, কবরের আশ-পাশে বাতি জ্বালানো না জায়েয প্রমাণিত হবে না ।

এরূপ ব্যাখ্যা অজ্ঞতার পরিচায়ক । কেননা “আলা” বর্ণটি উপর ও আশ-পাশ উভয় অর্থই জ্ঞাপন করে থাকে । যেমন ঃ কুরআনে কারীমে হযরত উযায়ের (আঃ) এর একটা ঘটনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,

او كالذى مر على قرية و هى خاوية على عروشها الاية

অর্থাৎ, তুমি কি সে লোককে দেখনি, যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যার বাড়ী ঘরগুলো ভেঙ্গে ছাদের উপর পড়েছিল । (সূরাঃ বাকারাহঃ ২৬৯)

এ আয়াতে “আলা” বর্ণটি উপরের অর্থে আসেনি যে, উযায়ের(আঃ) বস্তিবাসীর ঘর-বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছেন । বরং অর্থ হল বস্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছেন । অনুরূপ মে’রাজের হাদীসে এসেছে-নবী কারীম সা. বলেন,

فمررت على موسى – متفق عليه-

অর্থাৎ, মূসা (আঃ) এর কাছ দিয়ে আমার যাত্রা হয়েছে ।  বোখারী ও মুসলিম)

অনুরূপ কুরআনে এসেছে-

ولا تقم على قبره

অর্থাৎ, তুমি তার (মুনাফিকের ) কবরের পাশে দাঁড়াবে না । (সূরা তাওবা ঃ৮৪)

এসব স্থানে “আলা” বর্ণটি আশ-পাশের অর্থে এসেছে । সুতরাং উপরোক্ত হাদীস দ্বারা কবরের উপর বাতি দেয়া যেমনি ঘৃণিত কাজ বলে প্রমাণিত হবে , তেমনি কবরের আশ-পাশে বাতি দেয়াও । বরং দ্বিতীয়টি মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল এবং এখনো আছে । তাই এটিই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য বস্তু হওয়ার কথা । অতএব এটিই বেশী ঘৃণিত বলে প্রমাণিত হবে।

২নং দলীল

প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ)মৃত্যু কালে ওসিয়্যাত করে বলেছিলেন,

فاذا انامت فلا تصبحنى نائحة ولا نار – رواه مسلم فى كتاب الايمان – باب كون الاسلام يهدم ماكان قبله وكذا الحج و الهجرة ج/١ص/٧٦

অর্থাৎ, আমি যখন মৃত্যুবরণ করব,তখন কোন মাতমকারিনী মহিলা এবং আগুন যেন আমার সাথে না যায় । (মুসলিম)

হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) ও এই ওসিয়্যাত করেছিলেন । তিনি বলেছিলেন,

ولا تتبعونى بنار – موطآ امام مالك النهى ان تتبع الجنازة بنار ص/٧٨–        অর্থাৎ, তোমরা আমার সাথে আগুন নিয়ে যাবে না । (মুয়াত্তা মালেক)

এভাবে সাহাবায়ে কেরাম মৃত্যুর সময় ওসিয়্যাত করে গেছেন যে, তাদের সাথে যেন আগুন নিয়ে যাওয়া না হয় ।  অথচ আজকাল ধুমধাম করে কবরে বাতি দেয়া হচ্ছে ।

 বাতি জ্বালানোর একটি কথিত ফায়দা ও তার জওয়াব

বলা হচ্ছে-এর মাধ্যমে বুযুর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয় । কিন্তু আমাদের জেনে রাখা দরকার হুজুর সা. এর লা’নত কৃত কাজ করে এবং হাদীসের বিরুদ্ধাচারণ করে কোন সম্মান প্রদর্শন হতে পারে না ।

 কবরে বাতি জ্বালানো সর্বস্তরের উলামায়ে কেরামের নিকট নিষিদ্ধ

পূর্বে উল্লেখিত মুসলিম শরীফের হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহঃ) লিখেছেন-

وما اتبع الميت بالنار مكروه للحديث ثم قيل سبب الكراهة كونه من شعار الجاهلية وقال ابن حبيب المالكى كره تفاولا بالنار – شرح النووى فى هامش مسلم صفحة ٧٦—

অর্থাৎ, মাইয়্যেতের সাথে আগুন নিয়ে যাওয়া হাদীসের আলোকে মাকরূহ বা অপছন্দনীয় । আর মাকরূহ হওয়ার কারণ হল এটা জাহেলিয়্যাতের শি‘আর বা প্রতীক । ইবনে হাবীব মালেকী বলেন, বদফালী বা কুলক্ষণ জনক হওয়ার দরুন ( যেন তার মু‘আমেলাও আগুনের সাথে না হয় ) এটা মাকরূহ  ।

হাফেজ ইবনুল কাইয়ুম লিখেছেন-

نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن اتخاذ القبور مساجد و ايقاد السرج عليها –

زاد المعاد ج/١ص/ ١٧٩

অর্থাৎ, নবী কারীম সা. কবরকে সাজদার স্থান বানানো এবং তাতে বাতি জ্বালানোকে নিষেধ করেছেন ।

ফতওয়ায়ে আলমগিরীতে আছেÑ

وايقاد النار على القبور فمن رسوم الجاهليه والباطل والغرور – عالمكيرى ج/١ ص/١٦٧

অর্থাৎ, কবরে বাতি জ্বালানো জাহিলিয়্যাতের প্রথা/রুসূম, ভ্রান্তি এবং ধোকা ।

এক হাদীসে নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর কাছে সর্ব নিকৃষ্ট তিন ব্যক্তি । এর মধ্যে এক ব্যক্তি হল ইসলামের মাঝে জাহিলিয়্যাতের রুসূম তালাশ করে ।

মুফতী আহমদ ইয়ার খান সাহেবও বিভিন্ন ফতোয়া গ্রন্থের উদ্ধৃতি বর্ণনা করেছেন যে, কবরে বাতি জ্বালানো নিকৃষ্টতর বিদ‘আত ।

হযরত শাহ রফিউদ্দীন (রহঃ) লিখেছেন-

হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া যেমন ঃ কবরে বাতি জ্বালানো , কবরে পর্দা টানানো এবং গান-বাজানো যন্ত্র পাতি ব্যবহার করা নিকৃষ্টতর বিদ‘আত এবং এ ধরনের আসরে অংশ গ্রহণ করাও নিষেধ । (ফাতাওয়ায়ে শাহ্ রফিউদ্দীন পৃষ্ঠা ১৪)

সুতরাং  এ দীর্ঘ আলোচনা থেকে বোঝা গেল নবী কারীম সা. থেকে নিয়ে অদ্যবধি সমস্ত হক উলামায়ে কেরাম কবরে বাতি জ্বালানোকে লা’নত জনক, হারাম, মাকরূহ, বিদ‘আত বলে আখ্যা দিয়েছেন । অতএব কবরে বাতি জ্বালানোর মাঝে কোন ধরনের কল্যাণ থাকতে পারে না ।

                                                 {  সমাপ্ত }

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s