নারী-প্রসঙ্গ

নারী-প্রসঙ্গ

বর্তমানে নারী অধিকার,নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন চটকদার ও হৃদয়গ্রাহী বুলি শুনা যায়।এসব মজাদার শ্লোগান মূলতঃ পশিচমা  চিন্তা-চেতনা প্রসূত। তার তাৎপর্য ও সুদূর প্রসারী  অভিপ্রায় অভিসন্ধি উদ্ঘাটন করা সবার পক্ষে সম্ভবও নয়। ফলে বিভ্রান্তির পাল্লা ভারি হওয়াই স্বাভাবিক।  এক্ষেত্রে ইসলামী জ্ঞানের  অভাবে অনেক সাধারণ লোক বিশেষ করে বহু নারী এসব বস্তাপঁচা বিষয়কে পাশ্চাত্যের পরম আশীর্বাদ হিসাবে গহেণ করে। তাই এ সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা হল।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীতে এমন দুটি বস্তু রয়েছে যেগুলো গোটা বিশ্বের অস্তিত্ব, সংগঠন ও উন্নয়নের স্তম্ভ। একটি হচ্ছে নারী , অপারটি হচ্ছে সম্পদ। এ দুটো বস্তুই আবার পৃথিবীতে দাঙ্গা হাঙ্গামা, রক্তপাত এবং নানা রকম অনিষ্ট ও অকল্যাণের কারণ। এ দুটি বস্তুই আপন প্রকৃতিেিত পৃথিবী গঠন, নির্মাণ ও উন্নয়ন এবং তার উৎকর্ষের অবলম্বন। কিন্তু যখন এগুলোকে তাদের প্রকৃত মর্যাদা , স্থান ও উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তখন এগুলোই দুনিয়ার সবচাইতে ভয়াবহ ধবংসাত্মক রুপ পরিগ্রহ করে।

কুরআন মানুষকে একটি জীবন-বিধান দিয়েছে। তাতে উল্লেখিত দুটো বস্তুকেই যথার্থ স্থানে এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে তাদের দ্বারা সর্বাধিক উপাকারীতা ও ফল লাভ হতে পারে এবং যাতে দাঙ্গা-হাঙ্গামার চিন্হটিও না থাকে।

নারী সৃষ্টির রহস্য

বর্তমানে পাশ্চাত্য চিন্তা-চেতনার  লোকজন প্রপাগান্ডা চালায় যে, ইসলাম নারীকে পর্দায় আবৃত রেখে শ্বাসরুদ্ধ করে দিয়েছে । তাদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করা হয়েছে। এসব অপপ্রচারের  মূলভিত্তি যে নারী সৃষ্টির রহস্য  ও মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা ,তা বলার অপেক্ষা রাখে না।  বর্তমানে জোরে শোরে আওয়াজ তোলা হচ্ছে যে, নারীদেরকেও পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ কর্ম ও চাকরী করতে হবে। এই সমতা ব্যতীত দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা হয়নি যে, নারী পুরুষ উভয় যদি একই ধরণের কাজের জন্য সৃষ্টি হত তাহলে উভয়ের শারীরিক গঠন ও অবকাঠামো আলাদা আলাদা হওয়ার কি দরকার ছিল?
পুরুষের শারীরিক গঠনের চেয়ে নারীর শারীরিক গঠন ভিন্ন্ । এই ভিন্নতার রহস্য কি? নারীর সভাব-চরিত্র থেকে পুরুষের স্বভাবযাত ভিন্ন হওয়ার তাৎপর্য কি? যোগ্যতা আর ক্ষমতার বৈচিত্র ও পার্থকক্য যে গঠনগত, তা সুস্পষ্টই লক্ষ্য করা যায়। এর পরও একথা বলা যে, নারী পুরুষের কোন তফাৎ নেই তা যে নিতান্ত ও সুস্পষ্ট বাস্তব বিরোধি বক্তব্য তা দিবালোকের ন্যায়ই সুস্পষ্ট ।  খোলা চোখে দেখা যায় যে, নারী পুরুষের শারীরিক অবয়ব সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু আধুনিক ফ্যাশন ও রুচি সেই প্রকৃতিগত পার্থক্য মুছে দিতে বধ্যপরিকর। যার ফলে নারীরা পুরেষের পোষাক আর পুরুষরা নারীদের পোশাক পড়তে শুরু করে দিয়েছে । চুল রাখছে না নারী , রাখছে পুরুষরা ।

মানুষের দুটি জীবনধারা

বস্তুত মানুষের দুটি ভিন্ন জীবনধারা রয়েছে। একটি হচ্ছে গৃহস্থালি অন্যটি হচ্ছে বাড়ীর বাইরের ।

এই দুটি বিভাগ এমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জরিত যে, তার মধ্যে একটি বাদ দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন-যাপন করা সম্ভব নয়। গৃহের অভ্যন্তরে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনাও জুরুরী আবার ঘরের বাইরের কাজ তথা জীবিকা নির্বাহ ও রুটি-রুজি উপার্যনের যথাযথ ব্যবস্থাও জরুরী। যখন এই দুটি কাজ যথাযথভাবে পরিচালিত হবে তখনই সাভাবিক জীবন প্রবাহ ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

নারী -পুরুষের কর্মবিভাগ

কর্ম ও দায়িত্ব বিভাজন করে দিয়ে প্রত্যেককে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও মর্যদার অধিকারী করে দেয়া হয়েছে  ইসলামি জীবনধারায় । এই পর্যায়ে গৃহের আভ্যন্তরীন কাজকর্ম নারীর দায়িত্বে দেয়া হয়েছে। আর বাইরের কষ্ঠসাধ্য কাজকর্ম ও জীবিকা নির্বাহের  ফিকির পুরুষের কর্তব্য । শারীরিক গঠন , প্রকৃতিও এর যৌক্তিকতার স্বাক্ষ দেয়।

নবী-দুহিতা হযরত ফাতেমা রা. এর দায়িত্বে ছিল বাড়ীর কাজ-কর্ম সম্পাদন, আর হযরত আলী রা. এর দায়িত্বে ছিল ঘরের বাইরের কাজ-কর্ম আঞ্জাম দান।

পবিত্র কুরআনের সূরা আহযাবের ৩৩ নয় আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “আর তোমরা স্ব গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচিন যোগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। ” এখানে প্রত্যক্ষভাবে নবী পতœীগণকে এবং পরোক্ষভাবে সকল মুসলিম রমনীকে সাভাবিকভাবে গৃহে অবস্থান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।  প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার বিধান আলাদা । কিন্তু নারী সৃষ্টির মৌলিক তও¦ এটই যে, তারা গৃহস্থালি কাজ-কর্ম যথাযথভাবে আঞ্জাম দিবে।

নারী স্বাধীনতার অন্তরালে

যে সমাজে পবিত্রতার কোন মূল্য নেই, চারিত্রিক শুদ্ধতা-শুচিতার পরিবর্তে যেখানে আর্থিক উন্নয়নকে মূখ্য জ্ঞান করা হয় সেখানে নারী-পুরুষের কর্ম বিভাগ পর্দা, লজ্জা-শরম প্রভৃতি শুধু অনাবশ্যক নয় বরং প্রগতির প্রতিবন্ধক মনে করা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে চারিত্রিক মূল্যবোধ যখন শিকেয় তোলা হয় তখন তারা একদিকে বৈধ স্ত্রী রাখার দায়বদ্ধতা ও খরচ যোগানোর বিষয়কে ঝামেলা মনে করে অন্য দিকে লামপট্য মনোভাবের কারণে নিজেদের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে প্রতি নিয়ত তাদের নারী দর্শন নিশ্চত করার হিন মানসে “নারী স্বাধীনতা আন্দোলন ” শ্লোগান তোলা হয়।  নারীদের উপলব্ধিতে দেয়া হল যে, এখন স্বাধীন ভাবে জীবন প্রবাহের দিন কাল , বদ্ধকক্ষে থাকার দিন ফুরিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিলাশিতায় গা ভাসিয়ে দেয়ার মুখ্য সময় এটাই, তাই পুরুষের সাথে ল্লা দিয়ে নারীদের এগিয়ে চলা এ যোগের দাবী। জাগতিক সম্মান আর উচুঁ উচুঁ পদ মর্যাদা তাদের অপেক্ষায় প্রতীক্ষমান।

অবলা নারী এসব আকর্ষণীয় শ্লোগান শুনে প্রভাবিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পড়ল । অপপ্রচারের সকল মাধ্যমে নারীদের আশ্বস্ত করা হল যে, শত শত বছরের বন্দি জীবনের অবসান ঘটিয়ে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যবসাকে রমরমা করতে সেলস গার্ল, মডেল কন্যা প্রভৃতি উপাধি দেয়া হয়েছে । তার এক একটা অঙ্গ জনসম্মুখে , বেআব্রু করে গ্রাহককে আকৃষ্ট করা হয়েছে । যে নারীর মাথায় ইজ্জতের মুকুট শোভা পেত এবং যাকে সতীত্বের হার পরানো হতো, সে নারী পর পুরুষের ক্লান্তি দূর করতে বিনোদন সামগ্রীতে পরিনত হয়েছে।

নতুন সভ্যতার উদ্ভট দর্শন

অপপ্রচারের বাহুবলে এই উদ্ভট দর্শন মানুষের মানসে বিষবাম্পের ন্যায় ছাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যে, নারী নিজের বাসা-বাড়িতে আপন ছেলে -মেয়ে  স্বামী ,পিতা-মাতা বা শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে থাকা চরম অপমান । একই মহিলা পরপুরুষের খাবার রান্না করা তাদের আপ্যায়ন করা , দোকান-পাটে মৃদু হাসির আড়ালে বাহারী ঠোঁট দ্বারা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা এবং অফিসে বসদের মনোরঞ্জন করার নামই স্বাধীনতা ও সম্মান! বর্তমানে নারীদের দ্বারা অফিস-আদালতে দীর্ঘক্ষণ কাজ করিয়ে গৃহস্থালি কাজ করানো হয় চরম নিষ্ঠুরতার সাথে। গলাবাজি করা হচ্ছে যে, দেশ উন্নয়নে নারীর অবদান ও অংশগ্রহণ থাকা দরকার । অন্যথায় দেশ পিছিয়ে যাবে। এসব বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, পুরুষের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সামগ্রিক অংশগ্রহণ স্বওে¦ও বর্তমান দেশ এগিয়ে নিতে হলে নারীর অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমান পুরুষ বেকার তো নেই তাই পুরুষ শ্রমিকের ঘাটতি পুরনের প্রয়োজনে নারী শ্রমিক নিয়োগের তাগিদেই এই শ্লোগান তোলা হচ্ছে । অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এর সম্পূর্ণ উল্টো।

পারিবারিক বন্ধনের সমাপ্তি

পাশ্চাত্যের ধাঁচে আজ পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ফলে পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গে পড়েছে। যেখানে মায়ের কোল ছিল শিশুর প্রথম পাঠশালা, সেতার কর্মক্ষেত্রে মায়ের সময় দেয়ার প্রয়োজনে , পিতা তার অফিসের তাগিদে শিশুর জন্য ডে কেয়ার বা নার্সারী ব্যতীত কোন গন্তব্য নেই। কখনো বা স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘ বিরহের ফলে টানাপোড়েনের দরুন পরপুরুষের সাথে হৃদ্যতা ও সখ্যতা গড়ে উঠে । এক পর্যায়ে অবৈধ সম্পর্ক চাপিয়ে পরকিয়া প্রবল হয়ে উঠে।

বাড়ি অসামান্য কীর্তির স্থান

নারীদের জীবনে অস্বভাবিক সাফল্য বয়ে আনতে পারে সেই পদ্ধতি যা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে । বলা হয়েছে, “তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর”। একজন নারী স্বীয় ঘরে থেকে নিজের সন্তানদের যথাযথ লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক যে চরম উৎকর্ষ  আর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে তা বাসার বাইরে থেকে চাকরি বা অন্য কিছু করে কখনো করতে পারবে না । তাই পাশ্চাত্যের লোভনীয় ফাঁদে না পড়ে নারীকে স্বীয় সম্ভ্রম শ্লীলতা ও মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসা জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পোশাক সম্ভ্রম ও শালীনতার প্রতীক

মানুষের প্রকৃতির সাখে পোশাকের রয়েছে নিবির সম্পর্ক । লজ্জা মানুষের সহজাত গুণ। আর সেই গুন ও ধাতের তাগিদেই মানুষ পোশাকের ব্যবহার করে আসছে শুরু থেকেই । কিন্তু যারা লজ্জা, শ্লীলতা খুইয়ে প্রকৃতিগত গুণ হাত ছাড়া করে ফেলেছে, তাদের শারীরিক ও দেহবল্লরি প্রদর্শনে আটঁ সাটঁ পোশাক পরিধান করতে কোন দ্বিধা সংকোচ বোধ হয় না । অধর্নগ্ন হয়ে চলাফেরা করতে তাদের বিবেকের দংশনে দংশিত হতে হয় না । সমাজের সর্বত্র সরব পদচারনার মাধ্যমে আজ তারা নির্দ্বিধায় জানান দিচ্ছে যে, এমন উর্বশী ললনার পর্দার কোন প্রয়োজন নেই।

বিয়ে পার্টি, বর্ষবরণ মিনি সুন্দরী প্রতিযোগিতা

বর্তমানে বিয়ে শাদী নব বর্ষসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবে উপচে পড়া বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা দেখে শালীনতা মাথা হেঁট হয়ে যায়। মেয়েরা পাল্লা দিয়ে তাদের সুডৌল অঙ্গ-প্রতঙ্গ শোভা বাহার আর হাস্যলাস্যময় ভঙ্গিমায় অন্য পুরুষ ও তরুণ শ্রেণীকে আকৃষ্ট করেত তৎপর । এ যেন এক মিনি সুন্দরী প্রতিযোগিতা – তরুণ তরুণীদের বাধঁভাঙ্গা প্রাণের উচ্ছাস আর গোটা পরিবেশ ও আবহে সৃষ্টি করে এক আবেগঘন আবেদন । তার ওপর ভিডিও ফিল্মের কল্যাণে সেখান থেকে নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূর প্রসারী ছবি। ফলে বুনতে থাকে হাজারো কুকীর্তির জাল । শুরু হয় আবেগ ও কামতাড়নার উম্মাদনা । পরকীয়া প্রেম ও অপহরণের এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় অবলীলায় । এই পথেই আসে সহ¯্র বিপদ।

নারী অধিকার

নর নারীকে আল্লাহ তা‘আলা এমন গঠন আকৃতি ও স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যা সম্পূর্ণ ভিন্নতর । অথচ একের প্রতি অপরের আকর্ষণ অত্যন্ত প্রবল। নারী-পুরুষের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ভূমিকার অবদানেই গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতা । আল্লাহ তা‘আলা এই পৃথিবীর বুকে প্রথম মানুষ আদম আ. কে দীনের বাহক মনোনীত করে নবুওয়ত প্রদান করেন এবং সুনির্দিষ্ট জীবনবিধান অনুযায়ী চলার নির্দেশ দেন। মানুষকে আরল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলার জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক , সামাজিক ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পরম্পরা ধারায় বিভিন্নযুগে , বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তা‘আলা অনেক নবী রাসূল সা. প্রেরণ করেছেন ।

যুগে যুগে প্রেরিত নবী রাসূলের কথায় যারা ঈমান এনে আল্লাহর বিধান অনূযায়ী জীবন -যাপন করেছেন বা করছে তাদেরকে মুমিন বলে । আর যারা ঈমান আনেনি এবং আল্লাহর বিধানের বিপরীত নিজেদের খেয়াল খুশিমতো জীবন-যাপন করেছে  তাদেরকে বলে মুশরিক বা কাফির। প্রাচীন যুগে ওই সব কাফির আল্লাহর বিধান অমান্য করে নারীর প্রতি করেছে নির্মম অমানুষিক অত্যাচার ও জুলুম। তারা নারীকে মনে করত পুরুষের ভোগের উপকরণ । ওই সব যুগে নারীর মানসম্মান রক্ষা করা হতো না । ছিল না তাদের ইজ্জত ও আবরু রক্ষা করার অধিকার । তাদের প্রতি জুলুম-অত্যাচার , হত্যা-ধর্ষণ ইত্যাদি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যপার । নারী জাতির প্রতি ওই সব অত্যাচার আবহমানকাল ধরে চলে আসছিল। অবশেষে সর্বযুগে সর্বশেষে  সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পর আল্লাহ তা‘আলা তাকে নবুওয়তী দান করে মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর উপর কুরআন বা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান নাযিল করেন । এই কুরআনই বর্তমান দুনিয়ার মানুষের মুক্তির সনদ। আল্লাহর প্রেরিত মুক্তির সনদ অনুযায়ী চলার জন্য প্রিয় নবী সা. মানবজাতির প্রতি বিভিন্ন সময়ে রেখেছেন আকুল আবেদন।  তিনি শোষিত, বঞ্চিত ,নিপীড়িত মজলুম নর -নারীকে জালেমের অত্যাচার থেকে মুক্ত করে দান করেছেন নতুন জীবন । লাঞ্চিতা, অপমানিতা অধিকারহীনা নারী সমাজকে অধিষ্ঠিত করেছেন সম্মানের আসনে , দান করেছেন অসাধারণ    মর্যাদা ।

কুরআনে আছে-“তাদের কাউকে যখন কোন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তাদের মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয় । তাকে যে সংবাদ দেয়া হয় তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা স্বওে¦ও সে তাকে (কন্যা সন্তানকে) রেখে দেবে , না মাটিতে পুতে দিবে” {১৬ঃ৫৮-৫৯}

কুরআনের এ আয়াত থেকে তৎকালিন সমাজ ব্যাবস্থা যে কত কুৎসিত ছিল তা অনুমান করতে মোটেও বেগ পেতে হয় না । নিতান্ত পরিতাপের বিষয়, অধঃপতিত সমাজের ধংসাবশেষের স্তুপে দাড়িয়ে চরম অবহেলিত নারীকে সম্মানজনক আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন যে, রাসূলে আরাবী সা. তারই আদর্শ বর্তমান নারী সমাজের কাছে  একেবারেই মূল্যহীন ।

নারী শিক্ষা

গোটা বিশ্বের সমাজ ব্যবস্থা যখন নৈতিক অবক্ষয়ের করাল গ্রাসে পতিত ছিল । মনুষ্য স্বভাব ছাড়িয়ে  পাশবিকতার যখন জয় জয়কার তখনই আলোকিত পথের দিশা দিলেন মানবতার দিশারী নবী কুল শিরমনি হযরত মুহাম্মদ সা. , তিনিই সর্বপ্রথম নর-নারী নির্বিশেষে সবাইকে বিদ্যা শিক্ষার প্রতি আহবান করেছেন । ইসলাম পুরুষের মতো নারীর জন্যও শিক্ষা লাভ ফরয করেছে এবং শিক্ষার সাথে সাথে প্রশিক্ষণের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। নারীর প্রশিক্ষণের মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হচ্ছে তার মধ্যে সততা , লজ্জা, ন¤্রতা, ইজ্জত ও পবিত্রতার অনুভূতি সৃষ্টি করা , এসব গুণকে তার অভ্যাসে পরিণত করা । একটি জাতির উন্নতি , অগ্রগতি , অবনতি নির্ভর করে তাদের সন্তান সন্ততির শিক্ষা-দীক্ষার উপর । মা যদি শিক্ষিতা, নেককার, জ্ঞানী, চারিত্রবতী , বুদ্ধিমতী ও সচেতন হন তাহলে নিঃসন্দেহে তাদের সন্তানরাও ওইসব গুনে -গুনী হবে। একটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে নারী সমাজের সুষ্ঠু শিক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা শিক্ষিতা মেয়ে যে ঘরে প্রবেশ করবে সেটি আলোকিত হবে এবং তার ঘরে যে সন্তান জন্ম নেবে তারাও শিক্ষিত হবে। তাদের নৈতিক চরিত্র উত্তম হবে। একমাত্র ধর্মভীরু ও শিক্ষিতা মায়ের পরামর্শ পারে সন্তানকে মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, বেহায়াপনা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থ উপার্যন , অন্যের হক হরণ ইত্যাদি থেকে বিরত রাখতে। এজন্য কন্যা সন্তানকে প্রাথমিক অবস্থায় জরুরী ভিত্তিতে পৃথকভাবে ইসলামী রীতি অনুযায়ী শিক্ষিত করে তোলা একান্ত আবশ্যক।

মুসলিম নারীদের প্রাথমিক বিদ্যার্জন শেষে শালীনতা বজায় রেখে পর্দার পরিবেশ সম্পূর্ণ পৃথকভাবে গড়ে তুলতে হবে।  পিতার তও¦াবধানে মেযের স্বামীর তও¦াবধানে স্ত্রীর শিক্ষাদান ব্যবস্থা একসময় প্রচলিত ছিল। সেই ধারায় ফিতনা-ফাসাদের কোন আশংকা থাকে না। কিতাবে উল্লেখ আছে যে, আলেম স¤্রাট ছিলেন আল্লামা কাসানী, তার  স্ত্রী অত্যন্ত প্রতিভাবান বিদূষী ছিলেন । তার শ্বশুরের বাসার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ জ্ঞান ও ফিকাহ চর্চার কেন্দ্র । এক সময় তার শ্বশুরালয় হতে জারিকৃত ফতোয়ায় তার স্বাক্ষর, তার স্ত্যী ও তার শ্বশুর আলাউদ্দীন সমরকন্দী র. এর স্বাক্ষর থাকত। (ফতোয়া শামী: ১খঃ ১০০)

বর্তমানে চলছে উন্মুক্ত সহশিক্ষা । এর ফলে পাশবিকতা যেভাবে দাবানলের ন্যায় বিস্তার লাভ করেছে, সর্বত্র লাম্পট্য গোটা জাতিকে যেভাবে গ্রাস করেছে, এ ব্যাপারে দ্রুত যথাবিহিত ব্যবস্থা না নিলে পুরো জাতির নিকট ভবিষ্যত জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকারে পতিত হবে। মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে অনিবার্যরূপে।

উত্তরাধিকার তও¦

সূরা নিসার সপ্তম আয়াতে উত্তরাধিকারের দুটি মৌলিক নীতি ব্যক্ত করা হয়েছে ।

১.       জন্মের সম্পর্ক, যা মাতা-পিতা ও সন্তানদের মধ্যে রয়েছে।

২.       সাধারণ আত্মীয়তা । তবে যে কোন আত্মীয়তা যে কোন সম্পর্কই ওয়ারিস হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় । বরং নিকটতম আত্মীয় হওয়া শর্ত । কেননা নিকটতম হওয়াকে যদি মাপকাঠি করা না হয় তবে প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তিই সমগ্র ভূপৃষ্ঠের মানুষের মধ্যে বন্টন করা জরুরী হয়ে পড়বে । কেননা সব মানুষই এক পিতা-মাতা আদম  হাওয়ার সন্তান । মূল রক্তের দিক দিয়ে কিছু না কিছু সম্পর্ক  সবার মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।

উল্লেখ্য, ত্যাজ্য সম্পত্তির বন্টন প্রয়োজনের মাপকাঠিতে নয় । বরং আত্মীয়তার মাপকাঠিতে হবে । তাই আত্মীয়তার মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ তাকে বেশী হকদার মনে করা জরুরী নয় বরং সম্পর্কে যে  ব্যক্তি মৃতের অধিক নিকটবর্তী হবে সে দূরবর্তীর তুলনায় অধিক হকদার হবে। যওি প্রয়োজন ও অভাব দূরবর্তীর বেশী হয় । উল্লেখিত মূলনীতির ভিত্তিতে এতিম পৌত্রের উত্তরাধিকারের অহেতুক বিতর্কিত প্রশ্নটির আপনা আপনিই বের হয়ে আসে । পুত্রের তুলনায় পৌত্রীধিক অভাবগ্রস্থ হলেও কুরআনী আইনের দৃষ্টিতে সে ওয়ারিস হতে পারে না । তবে তার অভাব দূর করার জন্য অন্যান্য ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২২৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, নারীদের ওপর যেমন পুরুষের অধিকার রয়েছে এবং যা প্রদান করা একান্ত কর্তব্য । তবে এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, পুরুষের মর্যাদা নারীদের তুলনায় কিছুটা বেশী সূরা নিসার ৩৪ নয় আয়াতে শ্রেষ্ঠত্বের দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

১.       আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ হিকমত ও মঙ্গল চিন্তার কারণে একের উপর অন্যকে প্রাধান্য দান করেছেন । এতে পুরুষ জাতির শ্রম সাধনা কিংবা সে জাতির কোন ত্রুটি-বিচ্যুতির কোন প্রভাব নেই ।

২.       এর এই কারণ অবশ্য মানুষের সাধ্যায়ত্ত আমল । যেমন; পুরুষ নারীদের জন্য সম্পদ ব্যয় করে । তাদের মোহর প্রদান এবং ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার গ্রহণ করে ।

নারী পুরুষের সমান উত্তরাধিকার?

দায়িত্বভার আর সম্পদের মালিকানার মধ্যে ভারসাম্য থাকা যুক্তিসঙ্গত একটা বিষয় । নারীকে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক মিরাস দিয়ে খরচ করার দায়িত্বভার তাদের যিম্মায় না রেখে মূলত তাদেরকে জেতানো হয়েছে । কারণ নারীর বয়সের পরিক্রামা কখনও তার ব্যয়ভার পিতাকে বহন করতে হয় । আবার কখনও তার স্বামীকে বহন করতে হয় । কখনও বা তার সন্তানকে খরচ যোগাতে হয় । অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ পুরুষের কাধে অর্পিত । সে মতে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, পুরুষের জন্য মিরাসের যে দ্বিগুণ নির্ধারিত হয়েছে, তা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয় । পরোক্ষভাবে তা আবার নারীদের কাছে ফিরে আসে । উত্তরাধিকার বৈষম্য বলে অপপ্রচার করা সম্পূর্ণ মুর্খতা ও অদূরদর্শিতার পরিচায়ক ।

দিগন্ত-বিস্তৃত অনুগ্রহ

শত অন্যায়-অবিচার আর অশ্লীলতার পরও এই সমাজ ও জনপদ মহা দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে রেহাই পাওয়া মূলত ঃ রাসূলে আরাবীর আশীর্বাদ । তাঁর করুনার হাতছানি সার্বজনীন । তাই সময়ের এক ফোড়ঁ হিসাবে তওবা করে পরিশুদ্ধ হওয়ার দাবীর মুহূর্তের । অন্যথায় মহাকালের দুর্বিপাকে পড়ে গেলে দশ ফোঁড়ও কাজ হবে না । অতীতের অনেক দুর্বীনিত-উদ্ধত জাতির সকরুন পরিনতি সম্পর্কিত কুরআনের অসংখ্য আয়াত তার যথার্থ প্রমাণ । আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন  ।                                                                                                                                      { সমাপ্ত }

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s