তারাবীর নামায ২০ রাক’আত : বিরোধিতাকারীরা আল্লাহ, রাসূল স. এবং পুরো উম্মাহের দুশমন

তারাবীর নামায ২০ রাক’আত :  বিরোধিতাকারীরা আল্লাহ, রাসূল স. এবং পুরো উম্মাহের দুশমন

মুসলিম উম্মাহকে প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে বর্তমান তথাকথিত আহলে হাদীস মানে সে যুগের ‘খারেজী’ জামাআত। যারা সাহাবয়ে কেরাম এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বর্তমান লা-মাযহাবী তথাকথিত আহলে হাদীসরাও একই চিন্তাধারা বাস্তবায়ন করতে মাঠে ময়দানে কাজ করছে।

ইসলামের সূচনালগ্নে যে দুটি বাতিল দল সৃষ্টি হয়ে ছিল তার মধ্যে একটি শিয়া তথা রাফেজী দ্বিতীয়টি খারেজী। সে যুগ থেকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তবে তাবেঈন ইমাম মুজতাহিদসহ সকলের চেষ্টা ছিল যে কোনো বাতিল দল থেকে ইসলামকে রক্ষা করা। বাতিল চিন্তা ধারার অনুপ্রবেশ থেকে ইসলামের হেফাজত করা। তাদের প্রচেষ্টায় ধারাবাহিকভাবে সঠিক ইসলাম আমাদের মাঝে পৌঁছেছে। কিন্তু বাতিলরা থেমে নেই। সে যুগেও বাতিলরা তাদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ইসলামকে কলুষিত এবং মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় রত ছিল। আজো আছে।  লা-মাযহাবী তথাকথিত আহলে হাদীস ইংরেজ শাসন এবং কিছু লুভাতুর কথিত মুসলমানের অবৈধ মিলনের অবৈধ সন্তান। এদের কাজ হলো ইংরেজ এবং ইহুদীদের নীলনকশা অনুযায়ী মুসলমানের মুখোশ পরে শিয়া এবং খারেজীদের বিভিন্ন চিন্তাধারা মুসলমানদের মাঝে প্রবেশ করে সঠিক ইসলাম থেকে তাদের দূরে সরানো এবং ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করে মুসলমানদের পরষ্পর দ্বন্ধে লাগিয়ে রাখা।  সে কারণে তারা কোনো মাসআলার সমাধান চায় না। সামধান করতে বসতে বললে বসে না। ফেতনা ছড়ানোই যাদের উদ্দেশ্য তারা সেরূপই করে থাকে।

এই লা মাযহাবী ইহুদীর বাচ্চারা এখন তারাবীর নামায নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে  যে, তারাবির নামায ৮ রাকআত। এর কোনো দলীল তাদের কাছে নেই। রাসূলের যুগ থেকে ২০ রাকআত পড়ে আসা তারাবীহ তাদের কাছে ৮রাকআত হলো কিভাবে? ১৪ বছর যে কথা শোনা যায়নি। আজ সে বিদআতই মুসলমানদের মাঝে বাস্তবায়ন করতে চায় এরা। শুধু তারাবীহ কেন বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বিভ্রান্তি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মসজিদে মসজিদে ফেতনা সৃষ্টি করছে। মুসলমানদের এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। এদের যে কুকীর্তি এরা মুসলমানদের মসজিদে নামায পড়তে পারার যোগ্যতা হারাচ্ছে। কারণ ফাসাদকারী আল্লাহ এবং রাসূলের দুশমন।

আমরা এখানে তারাবীহ সম্পর্কে  বিস্তারিত বিষয় উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছি। তারাবীহ ২০ রাকআত। রাসূল (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তবে তাবেঈন, সকল ইমাম মুজতাহিদ, মুহাদ্দিস, ফকীহসহ  সকল প্রকৃতমুসলমান ২০ রাকআত তারাবীহ পড়েে এসেছেন। ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকে এটিই প্রমাণিত সত্য। ৮ রাকআত কোনো তারাবীহ নেই। ৮ রাকআত তারাবীহ বলে যেসব ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে এগুলো সবই ইহুদী নিলনকশার বাস্তবায়ন। কেউ যদি মুসলমান হয়ে অর্থ লোভে নিজজীবনে ইহুদী নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায় তাতে আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু এরূপ লোভী ফেৎনাবাজরা সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করবে, বিভিন্ন ইহুদী মিডিয়ায় ইসলাম সম্পর্কে  অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মুসলিম উম্মাহে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়াস পাবে তা শরীয়তে হারাম। মুসলমানমাত্র এরূপ হারাম কাজ থেকে আবশ্যক।

হারাম মিডিয়া কেন সরাসরি মুসলমানদের সামনে আসেন। আলাপ আলোচনা করে বিষয়গুলো সমাধান করেন। আলোচনায়ও আসবেন না, মিডিয়ায় বড় আলেম সেজে ফেতনা ছড়াতে থাকবেন। এটিতো কাপুরুষ, ফেতনাবাজ এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাজ।

২০ তারাবীর দলীলসমূহ :

 প্রথম দলীল

রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম ২০ রাক’আত তারাবীহ পড়েছেন। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে আবী শাইবা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মুসান্নাফে লিখেন

“عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ- صلى الله عليه وسلم- كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ.”

“হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত , রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে ২০ রাক’আত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন ।

উপরোক্ত হাদীস এবং আরো অন্যান্য দলীল প্রমাণের আলোকে (যা আমরা আলোচনার প্রয়াস পাবো ) রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর সোনালী যুগ থেকে আজ পর্যন্ত তারাবীর নামায ২০ রাক’আত চলে আসছে। উল্লেখ্য যে, এই হাদীসটি হাদীস বিশারদগণের নীতিমালা অনুযায়ী যয়ীফ বা দুর্বল। কারণ এতে ‘আবু শাইবা’ নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছে । কিন্তু হাদীসটি দুর্বল বর্ণনায় আসা সত্ত্বেও সর্বাপেক্ষা সহীহ (বিশুদ্ধ) হাদীস বা মুতাওয়াতির হাদীস এর ন্যায় বিশুদ্ধ বা প্রমাণযোগ্য । তাই হাদীসটি নির্দ্বিধায় আমলযোগ্য । তবে এ বিষয়ে চলমান বিশ্বের উদীয়মান তথাকথিত নামধারী কিছু গবেষক মুসলমানদেরকে সংশয়ে ফেলে ধূ¤্রজাল সৃষ্টি করতে চায় ! তাই এসব সংশয়ের নিরসনের প্রয়াস পাবো ।                                                         ক. রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর হাদীস কখনো দুর্বল হতে পারে না । তিনি যেমন মহান তাঁর বাণীও মহান । তবে হাদীসের বর্ণনাকারীদের প্রতি লক্ষ্য করে, হাদীসকে দুর্বল ও বিশুদ্ধ আখ্যায়িত করা হয়। এ মর্মে যে হাদীসের বর্ণনাকারীর মধ্যে যেমন দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাবে হাদীসটি এতোই দুর্বল বলে বিবেচিত হবে এবং হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম থেকে বর্ণিত কি না এমন সংশয়ের সৃষ্টি করে ।

  তবে যদি ঐ বর্ণনাকারীর দুর্বলতা ও সংশয় চলে যাওয়ার মতো কোনো কারণ ঐ হাদীসের সনদে বা মতনে পরিলক্ষিত হয় তখন হাদীসটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এমনকি ‘কারণ’ শক্তিশালী হলে কখনো কখনো দুর্বল হাদীসটিই এক পর্যায়ে বিশুদ্ধ ও সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত হয়।

উপরোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে । কারণ এই হাদীসটি সনদের বিবেচনায় দুর্বল, এতে একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছে । কিন্তু এই হাদীসের বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলো ‘শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ কারণ রয়েছে’। রয়েছে খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কিরাম,তাবে’তাবেইন, মুজতাহিদ ইমামগণ ও মক্কা মদীনা সহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর আমল এবং তাঁদের ইজমা বা ঐক্যমত । আর এ ধরনের দুর্বল হাদীসকে      “الضعيف المتلقى بالقبول”

“দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও গৃহীত ও অনুসৃত ” বলা হয় ।                                     আর এ ধরনের দুর্বল হাদীস এক বা একাধিক বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীস অপেক্ষাও শক্তিশালী পরিগণ্য হয় ।হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন

 ” إذا تلقته الأمة بالقبول . ولا شك أن إجماع الأمة على القول بصحة الخبر أقوى من إفادة العلم من القرائن المحتفة ومن مجرد كثرة الطرق .”

“যে হাদীস অনুযায়ী আমল করা উম্মতের নিকট গৃহীত হয়েছে এবং যে বিষয় অনুযায়ী আমল করার প্রতি উম্মতের ঐক্য (ইজমা) চলে আসছে। নিঃসন্দেহে তা গ্রহণ করার মতো অনেক কারণ ও বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হাদীস অপেক্ষাও শক্তিশালী”।                                                                                                                                                                           ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) আরো সুস্পষ্টভাবে লিখেন

“أن الحديث  الضعيف إذا تلقته الأمة بالقبول عُمل به على الصحيح حتى إنه ينزل منزلة المتواتر.”

“দুর্বল হাদীস যদি উম্মত ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে , তখন এর উপর আমল করা হবে। এটাই হলো বিশুদ্ধ নীতি । এমনকি তখন ঐ দুর্বল হাদীসটি মুতাওয়াতির বা বিপুল সংখ্যক সনদে বর্ণিত সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ হাদীসের পর্যায়ে পরিণত হবে”।

ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী আরো লিখেন

“من جملة صفات القبول أن يتفق العلماء على العمل بمدلول حديث ، فإنه يقبل حتي يجب العمل به . وقد صرح بذلك جماعة من أئمة الأصول.”

“হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিদর্শন সমূহের একটি হলো , উলামায়ে কিরাম এই হাদীসের বিষয় বস্তু অনুযায়ী আমল করতে একমত হওয়া। তখন ঐ হাদীসটি গ্রহণ করা হবে । এমনকি এর উপর আমল করা ওয়াজিব হবে । উসূলে হাদীসের ইমামগণ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা ব্যক্ত করেছেন।                                 “ইমামুল আ‘ছর” আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)এর সুন্দর একটি সমাধান পেশ করেছেন । তিনি বলেন

” كان الإسناد لئلا يدخل فى الدين ما ليس منه ‘ لا ليخرج ما ثبت منه من عمل أهل الإسناد. “

“সনদের প্রয়োজন হয়েছে যাতে করে শরীয়তে নেই এমন কিছু শরীয়তে অনুপ্রবেশ করতে না পারে । যাদের উপর সনদ নির্ভর করে তাঁদের অনুসৃত আমলের দ্বারা যদি বিষয় ব¯ুÍ প্রমাণ হয়ে যায় তাহলে সনদের অজুহাতে ঐ বিষয়কে বাহির করার জন্য সনদের ধারা চালু হয়নি।

হাদীস বিশারদ ইমামগণের এই নীতিমালার আলোকে “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে (২০) বিশ রাক’আত তারাবীর নামায পড়েছেন ” হাদীসটি বিশুদ্ধ হাদীস অপেক্ষাও বিশুদ্ধ মুতাওয়াতির পর্যায়ে গণ্য হয়েছে এবং এর উপর আমল করাও অপরিহার্য ।

 খ. জনৈক আধুনিক গবেষক তার একটি বইয়ে  লিখেছেন , ২০ রাক’আত তারাবীর হাদীস অত্যন্ত দুর্বল । এমনকি তিনি এই হাদীসটিকে ‘মাওযু’বা জাল হাদীস বলতেও কুন্ঠাবোধ করেননি । তাই তার ভাষ্য মতে এ হাদীসটি অপর হাদীস দ্বারা অথবা অন্য কোনো কারণেই শক্তিশালী ও আমলযোগ্য হবে না।  তার উত্তরে আমি দু’ধরণের সমাধান পেশ করতেচাই         এক.   মুসলিম উম্মাহর সব ইমামগণ এ হাদীসটিকে উপরোল্লিখিত কারণে শক্তিশালী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবুও তার গবেষণা অনুযায়ী এ হাদীসটিকে তিনি যদি শক্তিশালী বা গ্রহণযোগ্য মনে না করেন তাহলে,  বিশ রাক‘আত তারাবীর তো আরো অনেক দলীল রয়েছে , ঐ সব দলীল গুলো থেকে যে কোনো একটি দলীল গ্রহণ করার দ¦ার তো তার জন্য খোলা রয়েছে । তার পরেও তিনি মুসলিম উম্মাহর ইজমা/ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন কোন স¦ার্থে? হাদীসে আছে যে ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হবে সে এভাবেই জাহান্নামে থাকবে।  আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন।

দুই.   গায়ের জোরে, মুখের বলে মহানবী সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর একটি হাদীসকে জাল বললেই জাল হয়ে যায় না । বাস্তবে যদি হাদীস হয় , আর এটাকে জাল বলা হয় তাহলে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর উপস্থিতিতে অবশ্যই এর হিসাব দিতে হবে । ইতিপূর্বে যুগ যুগ ধরে অসংখ্য মুজতাহিদ-গবেষকদের আবির্ভাব এ পৃথিবীতে হয়েছে । তাঁদের কেউই ঐ হাদীসটিকে অত্যন্ত দুর্বল বা জাল হাদীস বলেননি ; বরং যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ইমামগণ এই হাদীস ও এ বিষয়ের অন্যান্য দলীল প্রমাণের আলোকে সর্বকালেই বিশ রাক‘আত তারাবীর মতামত ব্যক্ত করে আসছেন। তবে উক্ত হাদীসে একজন বর্ণনাকারী আছেন ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবা। তাকে ইমামগণ দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন । তার কারণেই হাদীসটি দুর্বল । অন্যান্য সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। অবশ্য তার সম্পর্কে ইমামদের মন্তব্যে মত পার্থক্যও রয়েছে । যেমন , হাদীস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমাম, “আল কামেল” গ্রন্থের লেখক ইবনে আদী (রহ.) লিখেন

” له أحاديث صالحة ‘ وهو خير من إبراهيم بن أبى حية “

“ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবার অনেক হাদীস বিশুদ্ধও আছে। আর সে ইবরাহীম বিন আবূ হাইয়্যা থেকে উত্তম ”।

   আহলে হাদীস বন্ধুরা যাকে মিথ্যুক বলে, তাকে ইমাম ইবনে আদী বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা করেন বলে সত্যায়ন করলেন । সাথে সাথে তাকে ‘ইবনে আবূ হাইয়্যা’ থেকে উত্তম বলে অভিহিত করলেন । অথচ ঐ ইবনে আবূ হাইয়্যা সম্পর্কে হাদীস শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম ইবনে মাঈন (রহ.) বলেন “شيخ ثقة كبير” “আবূ হাইয়্যা হলো হাদীস শাস্ত্রের  শায়খ , নির্ভরযোগ্য উচ্চমাপের বর্ণনাকারী” ।

    উল্লেখ্য যে, ইমাম ইবনে আদী ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবাকে ‘আবূ হাইয়্যা’ থেকে উত্তম  বলেছেন । আর আবূ হাইয়্যা যেহেতু নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি, তাই ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবাতো আরো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণিত হলো ।

    কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের আহলে হাদীস ভাইয়েরা এ   সব উক্তি উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছে ‘হট লাইনে।    অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অসত্যের আশ্রয় নিচ্ছে। আরো লক্ষণীয় যে , ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবা সম্পর্কে ইমাম ইয়াযীদ বিন হারুন (রহ.) লিখেন

“ما قضى على الناس رجل ‘ يعنى فى زمانه أعدل فى قضاء منه .”

“আবূ শাইবার সময়কালে তাঁর চেয়ে  ন্যায়পরায়ন বিচার মানুষের মধ্যে অপর কেউ করেনি”।    বলাবাহুল্য, যে বিচারপতি মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ন হবে, দুর্নীতির আশ্রয় নিবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬ামের হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নিবে তা কল্পনাও করা যেতে পারে না। তবে বিচিত্র একটি ঘটনার কারণে তাঁর ব্যাপারে কারো মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে যার বিবরণ অবিলম্বে উপস্থাপন করা হবে ।   আশা করি এ আলোচনার আলোকে স্পষ্টভাবে বুঝে এসেছে যে, এধরনের একজন বর্ণনাকারীর হাদীসকে ‘চরম দুর্বল বা জাল’ বলা একমাত্র প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয় । তাই যুগ যুগ ধরে কোনো ইমাম তা করেননি । কিন্তু নতুন যুগের গবেষক হয়েও প্রাক্তন ও দক্ষ, বিচক্ষণ এবং ন্যায়পরায়ন ইমামদের নীতিতে অটল থাকার তৌফিক হলো না। তাদেরকে আপন মতাদর্শে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি।

গ. মুসলমানদেরকে বিব্রত করা ও সংশয়ে ফেলার জন্য তাদের আরেকটি পদ্ধতি হলো ,তারা ইমাম শু‘বার একটি বাক্য বিকৃত অর্থে পেশ করে থাকে ।

তারা বলে উপরোল্লিখিত হাদীসের বর্ণনাকারী ইবরাহীম বিন উসমান আবূ শাইবা, যার আলোচনা ইতিপূর্বেও হয়েছে, তাকে ইমাম শু‘বা বলেছেন :” كذاب” ’মিথ্যুক’ । নাউযুবিল্লাহ- ইমাম শু‘বা এমনভাবে বলেননি বরং তাদের কারচুপিটা বুঝার জন্য আমি কুরআনে কারীম থেকে একটি উদাহরণ পেশ করি। কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন “তোমরা নামাযের কাছেও যেও না, যখন তোমরা নেশাগ্রস্থ হও”।  জনৈক ভদ্রলোক এ আয়াতের শেষ অংশটা ছেড়ে শুধু প্রথম অংশটা গ্রহণ করেছে । আর এরই ভিত্তিতে নামাযটা বিদায় দিয়েছে চিরদিনের জন্য। কেননা কুরআনে আছে তোমরা নামাযের কাছেও যেও না !                                        এভাবেই তারা ইমাম শু‘বার উক্তিটির প্রথম অংশটা গ্রহণ করে শুধু বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে । আসলে ব্যাপারটি হলো, আবূ শাইবা কর্তৃক বর্ণিত একটি ঘটনাকে ইমাম শুবা’ অবাসÍব বলে অভিহিত করেছেন। ঘটনাটি হলো- আবূ শাইবা তাঁর উস্তাদ হাকাম এর সূত্রে ইবনে আবী লায়লা থেকে বর্ণনা করেন যে, সিফফীন যুদ্ধে সত্তর জন বদরী সাহাবী উপস্তিত ছিলেন । এ কথা শুনে শু’বা (রহ.) বলেন

”  كذب والله لقد ذاكرت الحكم ذاك وذكرناه في بيته فما وجدنا شهد صفين واحد من أهل بدر غير خزيمة بن ثابت.”

  “সে মিথ্যা (অবাস্তব) বলেছে , আল্লাহর শপথ; আমি হাকামের সহিত আলোচনা করে শুধু একজন বদরী সাহাবী পেয়েছি , তিনি হলেন খুযাইমা (রা.)

       এতে বোঝা গেলো যে, ইমাম শু’বা তাঁর হাদীস গ্রহণ করা, না করার ব্যাপারে কোনো মন্তব্যই করেননি । বরং বিশেষ একটি ঘটনার বর্ণনায় তার কথাকে অসত্যায়ন করেছেন ।ইমাম শু’বা (রহ.)বলতে চেয়েছিলেন সিফফীন যুদ্ধে একমাত্র খুযাইমা (রা.) ব্যতীত বদরী সাহাবী কেউ অংশ নেয়নি।  মূলত ঐ ঘটনায় ইমাম শু’বার নিজেরই ভুল হয়েছে, একারণেই ইমাম যাহাবী শু‘বার কথাকে খ-ন করে বলেন

 “سبحان الله ! أما شهدها علي ؟ أما شهدها عمار ؟

‘বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার! সিফফীনে কি হযরত আলী (রা.) উপস্তিত ছিলেন না? হযরত আম্মার (রা.) উপস্তিত ছিলেন না ?

হযরত আলী (রা.) ও আম্মার (রা.) তো বদরী ছিলেন ,তারাও তো সিফফীনে উপস্তিত ছিলেন। তাহলে তো এখানেই তিনজন হয়ে গেল ,তাহলে শু’বার কথা ঠিক হলো কি করে ?   উক্ত ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেই হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) আবূ শাইবা সম্পর্কে বলেন :- “كذبه شعبة فى قصةٍ”

“তাকে শু’বা নির্দিষ্ট একটি ঘটনায় অসত্যায়ন করেছেন”

 এছাড়াও আরবী ভাষায় ‘কিযব’ শব্দটি কখনো ‘ভুল বলেছে ’ অর্থে ব্যবহৃত হয় । যেমন বিতর নামাযের হুকুম সস্পর্কীয় এক হাদীসে আছে : ” كذب أبو محمد”      “আবূ মুহাম্মাদ ভুল বলেছে ।   এ মর্মে শু’বার উক্তির অর্থ হবে, ইমাম শু‘বা (রহ.) ইবরাহীমের বর্ণিত ঘটনাকে ভুল আখ্যা দিয়েছেন। আর মানুষের ক্ষেত্রে ভুল হওয়া স্বাভাবিক।  তবে বাস্তবে তো আবূ শাইবা ভুল করেননি, ভুল করেছেন শু’বা নিজেই। ভুল করলেই যদি মিথ্যা বলেছে বলে অপবাদ দিতে হয় তাহলে এ ঘটনায় ইমাম শু’বাকে-ই ‘মিথ্যা বলেছেন বলে অভিহিত করতে হয়। তবে আমরা এমন বলার পক্ষে নই।

এধরনের বিচিত্র ভুলের কারণে তার হাদীস গ্রহণ করা যাবে না এমন কোনো নীতি , কোনো ইমাম আদৌ ব্যক্ত করেননি।

ঘ. আহলে হাদীস বন্ধুদের অন্যতম একটি সংশয় হলো, ২০ রাক’আত তারাবীর হাদীসটি দু’টি হাদীসের সংগে সংঘর্ষ হয় ।

একটি হলো. আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস “রাসূলুল্লাহ সাল্ল-াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে এবং রমযান ছাড়া কখনো (বিতর সহ ) ১১ রাক’আতের বেশী পড়েন নি”।

 দ্বিতীয় হাদীসটি. হলো , জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত “রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম আট রাক’আত নামায পড়েছেন।

তাদের ভাষ্যমতে এ দু’টি হাদীস দ্বারা আট রাক’আত তারাবীহ প্রমাণ হয়। তাই এই সহীহ হাদীস দু’টির সঙ্গে ২০ রাক’আত তারাবীর হাদীসটি সংঘর্ষ হওয়ার ফলে বুঝা যায়, বিশ রাক’আতের হাদীসটি জাল ।

  নিরসন . এব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পরে আসবে । সংক্ষেপে কথা হলো : আয়েশা (রা.) এর হাদীসে তারাবীর কোনো আলোচনাই নেই ; বরং এতে বর্ণনা করা হয়েছে , রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম , তাহাজ্জুদ নামায ৮ রাক’আত পড়তেন । কেননা হাদীসেই উল্লেখ আছে উক্ত নামায রমযান ও রমযান ছাড়াও পড়তেন । আর তারাবীহ তো রমযান ছাড়া পড়া হয় না ।

 দ্বিতীয়ত . জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসের সূত্রে “ঈসা বিন জারিয়া” নামক একজন অতি দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছে । ফলে হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল। তাই এই হাদীসটি  গ্রহণযোগ্য বা উল্লেখযোগ্য নয়। অতএব ২০ রাক’আত তারাবীর নামাযের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এমন কোনো হাদীসই নেই । বিস্তারিত বর্ণনা শেষ অধ্যায়ে আসবে।

সুতরাং অন্য কোনো হাদীসের সঙ্গে সংঘর্ষমুখী বলে ২০ রাক’আত তারাবীর নামাযের হাদীস পরিহার করা বা জাল হাদীস বলে আখ্যায়িত করার কোন অবকাশ নেই ।

ঙ. হাদীসটি হযরত আয়েশা (রা.)-এর একটি হাদীস ও জাবের (রা.)-এর হাদীসের বিপরীত হয়। কেননা, এই হাদীসে বলা হয়েছে নবী করীম সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে জামাআত ছাড়া নামায পড়েছেন । আর আয়েশা ও জাবের (রা.) এর হাদীসে জামাআতের সঙ্গে নামায পড়েছেন বলে উল্লেখ আছে, এ কারণে হাদীসটি ‘মওযু’ জাল।

 সমাধান. ইবনে আবী শাইবা, আবদ্ ইবনে হুমাইদ ও তাবরানীর ‘কাবীর’ ও ‘আওসাত’ গ্রন্থে উক্ত হাদীসে “জামাআত ছাড়া” কথাটি নেই । শুধু বাইহাক্বীর বর্ণনায় একটি সূত্রে পাওয়া যায় । শুধু মানসূর ইবনে আবূ মুযাহিম ঐ শব্দটি উল্লেখ করেছেন।

আর মানসূরের তুলনায় অপর বর্ণনাকারীদের বর্ণনাগুলো শক্তিশালী । তাই তাঁদের বর্ণনাই প্রাধান্য পাবে । আর যদি জামাআত ছাড়া কথাটিকে সহীহ ধরেও নেওয়া হয়, তবে এটাকে ভিন্ন ঘটনা আখ্যা দিলে তো আর কোনো বিরোধিতা থাকে না ।

মুসলিম শরীফে  আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে দেখা যায়, তাঁরা কয়েকজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর সঙ্গে তারাবীতে দাঁড়িয়ে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে নামায সংক্ষিপ্ত করে ভেতরে চলে যান ।

এ ঘটনাটিও আয়েশা (রা.) এর বর্ণিত হাদীসের বিপরীত। তাই বলে কি এটিকেও জাল বলতে হবে ? হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) তো বলেছেন

والظاهر أن هذا فى قصة أخرى “”

“বাহ্যত এটা ভিন্ন কোনো ঘটনা হয়ে থাকবে”।

        এছাড়া পূর্বেও বলা হয়েছে ,জাবের (রা.) এর হাদীসটিও দুর্বল । তাই বারবার আলোচ্য হাদীসকে জাবের (রা.) এর হাদীসের বিপরীত বলে এটিকে জাল আখ্যা দেয়ার প্রয়াস অবান্তর।

দ্বিতীয় দলীল

সাহাবা ও তাবেয়ীগণ ২০ রাক’আত তারাবীহ পড়েছেন

সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর অনুসৃত আদর্শ এবং তাঁদের উক্তি ও আমল ইলমে হাদীসের কিছু  নিয়মনীতি ও শর্ত সাপেক্ষে জমহুরে উম্মত,ও চার মাযহাবের ইমাম-মুজতাহিদগণের নিকট অনুসরণীয় তথা শরীয়তের যাবতীয় ক্ষেত্রে প্রমাণযোগ্য।

রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী ও আমলকে যেমন হাদীস বা সুন্নত বলা হয়, তেমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর উক্তি ও আমলকেও হাদীস বা সুন্নত বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন ;

فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِى فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ গ্ধ

“যেনে রেখো ! আমার পর তোমাদের যারা জীবিত থাকবে তারা বহু মতপার্থক্য  দেখতে পাবে। তখন তোমাদের উপর আমার সুন্নত , আমার হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীন- সাহাবাগণের সুন্নত আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব। মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে, মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে  রাখবে । আর ধর্মীয় বিষয়ে  নবাবিষ্কৃত বিষয়াদি থেকে সতর্ক থাকবে । কেননা নবাবিষ্কৃত প্রতিটি বিষয়ই বিদআত, আর সকল বিদআতই ভ্রষ্টতা”।

অপর হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান

وتفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة كلهم في النار إلا ملة واحدة قالوا: ومن هي ؟ يا رسول الله ! قال ما أنا عليه وأصحابي “

“আমার উম্মত ৭৩ টি  দলে বিভক্ত হবে, তন্মধ্যে কেবল মাত্র একটি দল ব্যতীত অপরাপর সবাই দোযখী হবে। (তা শুনে) সাহাবাগণ আরজ করলেন , ইয়া রাসূলাল্লাহ ! মুক্তিপ্রাপ্ত এই দলটির পরিচয় কি ? তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইরশাদ  করেন ,যারা আমার এবং আমার সাহাবাদের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে” ।

      কুরআন ও হাদীসে এমন অসংখ্য দলীল প্রমাণ রয়েছে যেগুলোর আলোকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে সাহাবাগণের উক্তি ও আমল আমাদের জন্য আদর্শ এবং অনুসরণীয় তথা শরীয়তের দলীল।  তাই তাঁদের উক্তি ও আমলকে হাদীস বা সুন্নত বলা হয়। বরং তাঁদের উক্তি বা আমল যেগুলো কিয়াস ও গবেষণার মাধ্যমে বলার যোগ্য নয় , শুধু ওহীর মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব যেমন নামাযের তাকবীর ও নামায কতো রাক’আত হবে, এসব ক্ষেত্রে সাহাবাগণের উক্তি ও আমলকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  উক্তি ও আমল থেকে নিসৃত বা (মারফূয়ে হুকমী) গণ্য করা হয়।  কেননা তারাতো কুরআন নাযিলের অবস্থা স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছেন, দেখেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলসমূহ, শুনেছেন তাঁর অমীয় বাণী । তাঁরাইতো এসবকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন সবার আগে। তাই তাঁদের উক্তি ও আমল হলো কুরআন সুন্নাহ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিচ্ছবি।

বিশেষ করে কোনো একটি বিধানের ক্ষেত্রে যদি তাঁদের সম্মিলিত (ঐক্যবদ্ধ) কর্মধারা চলে আসে এবং তাঁদের পরবর্তীদের মাঝেও ঐ বিধানটি পর্যায়ক্রমে যুগে যুগে ধারাবাহিকভাবে চলে আসে , তখন ঐ বিধানটি এক-দুইটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত সহীহ হাদীস থেকেও অনেক শক্তিশালী (মুতাওয়াতির) দলীলে প্রমাণিত হয়। তাই তারাবীর নামায সম্পর্কে  সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর আমল ও মতামত আংশিক আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি।

হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক (রা.) এর যুগে তারাবীহ

নিয়মিত  জামাআতের সহিত তারাবীর নামায পড়লে এ নামাযটি উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যাবে , এমন আশঙ্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নামাযের নিয়মিত জামাআত পড়াননি। বরং অধিকাংশ সময় একাকীই পড়তেন। সাহাবায়ে কিরাম মসজিদে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট জামা‘আতে পড়তেন। কেউ কেউ একাকীও পড়তেন।

তারপর প্রথম খলীফা হযরত আবূবকর ছিদ্দীক (রা.) এর যুগেও এই অবস্থাই ছিল। তিনি  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করে এতে কোনো পরিবর্তন বা সবাইকে এক  ইমামের পেছনে জামা‘আতবদ্ধ করার প্রয়োজন মনে করেননি।

হযরত ওমর (রা.) এর যুগে তারাবীহ

 রমযানের প্রতি রাতে ইশার নামাযের পর জামা‘আতের সঙ্গে তারাবীর নামায পড়া ও তাতে কুরআন শরীফ খতম করার ধারাবাহিকতা হযরত ওমর (রা.) এর  খিলাফতকালে শুরু হয়।

সহীহ বুখারীর বর্ণনা. হযরত আব্দুর রহমান আলকারী (রহ.) বলেন ,আমি রমযান মাসে হযরত ওমর (রা.) এর সঙ্গে মসজিদে গেলাম, দেখলাম, লোকজন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারাবীর   নামায পড়ছেন। কেউ একা পড়ছেন, আবার কেউ দু’চারজন  সঙ্গে নিয়ে পড়ছেন। তখন হযরত ওমর (রা.) বললেন, তাদের সাবাইকে যদি এক ইমামের পেছনে জামা‘আতবদ্ধ করে দেই তাহলে মনে হয় উত্তম হবে। এর পর তিনি তাদেরকে হযরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) এর পিছনে এক জামা‘আতবদ্ধ করে দিলেন।

হযরত ওমর (রা.) এর উক্ত সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ “আত তামহীদ” এ লিখেন ‘হযরত উমর (রা.) এখানে নতুন কিছুই করেননি, তিনি তা-ই করেছেন যা খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করতেন। কিন্তু শুধু এই আশঙ্কায় যে নিয়মিত জামা‘আতে পড়লে, উম্মতের উপর তারাবীর নামায ফরজ হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি নিজে জামা‘আতের ব্যবস্থা করেননি। উমর (রা.) বিষয়টি ভালোভাবে জানতেন। তিনি দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর ওহী বন্ধ হয়ে গেছে , সুতরাং তারাবীর নামায ফরজ হওয়ার এখন আর আশঙ্কা নেই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দ মোতাবেক ১৪ হিজরীতে জামা‘আতে পড়ার ব্যবস্থা  করেন।

আল্লাহ তা‘য়া‘লা যেন এই মর্যাদা ও সুযোগ তার জন্যই রেখে দিয়েছিলেন। আবূ বকর ছিদ্দীক (রা.) এর অন্তরে এই বিষয়টি উদয় হয়নি। যদিও তিনি সামগ্রিকভাবে উত্তম ও অগ্রগণ্য ছিলেন।

বি. দ্র.

উপরোক্ত বর্ণনাটি বুখারী শরীফ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। যা সবার দৃষ্টিতে সহীহ-বিশুদ্ধ। এতে শুধু উল্লেখ আছে যে, উমর (রা.) একজন ইমামের পিছনে সবাইকে জামা‘আতবদ্ধভাবে নামায পড়ার ব্যবস্থা  করেছেন। কত রাক’আত তারাবীহ পড়বেন এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলেননি। তাই যারা বলে, ২০ রাক’আত তারাবীহ হলো উমরী নামায (!) তারা দু’টি উত্তর জেনে নিবেন।

এক.  তিনি ২০ রাক‘আতের নিয়ম চালু করেননি ; বরং তাদের এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে চলে আসা ঐ ২০ রাক’আতেরই অনুসরণ করে চলেছেন। তিনি শুধু সবাইকে জামা‘আতবদ্ধ হওয়ার ব্যবস্থা  করেছেন।

দুই.  তিনি ২০ রাক‘আত তারাবীর পদ্ধতি চালু করেছেন বলে যদি কেউ স্বীকার করে নেয় তাহলেও তো আমাদের জন্য এ পদ্ধতি মানা ওয়াজিব।কেননা তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠতম সাহাবী, খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম একজন। তাঁর কর্ম, কথা, আদেশ-নির্দেশ সবই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের মতো গ্রহণযোগ্য সুন্নত এবং শরীয়তে প্রমাণযোগ্য। যা ইতিপূর্বেই সংক্ষেপে আলোচনা করেছি।

এ পরিসরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারাবীর নামায যখন একাকী পড়া হতো বা জামা‘আতে পড়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না তখন তারাবীর নামায কতো রাক‘আত পড়া হবে এ বিষয়ে তেমন আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়নি। সে জন্যই তারাবীর নামায কতো রাক‘আত পড়া হবে , সে বিষয়ে ঐ সময়ের নির্দিষ্ট সংখ্যাভিত্তিক  বর্ণনা অত্যন্ত বিরল। কিন্তু যখন থেকে জামা‘আতবদ্ধভাবে একই ইমামের পিছনে প্রতিদিন নামাযের পদ্ধতি আরম্ভ হয়, মানুষের উপস্থিতি ও সমাগমও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারাবীর রাক‘আত সংখ্যাও তখন আর গোপন থাকেনি ; বরং ব্যাপকভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং সাহাবী তাবেয়ীগণ পরস্পর ও পরবর্তীদের নিকট বর্ণনা করতে থাকেন। এ ধরনের কয়েকটি বর্ণনা আমরা নি¤েœ উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ !

সাহাবী সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) এর বর্ণনা

সাহাবী সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) এর বর্ণনাটি কয়েকটি সূত্রে পৌঁছেছে। সেগুলো

হলো নি¤œরূপ

এক.  মুহাম্মাদ ইবনে আবী যিব বর্ণনা করেন ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা থেকে, আর তিনি বর্ণনা করেন সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে, তিনি বলেন

: كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ فِى شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً – قَالَ – وَكَانُوا يَقْرَءُونَ بِالْمِئِينِ ، وَكَانُوا يَتَوَكَّئُونَ عَلَى عِصِيِّهِمْ فِى عَهْدِ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ مِنْ شِدَّةِ الْقِيَامِ.

“তারা (সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীগণ) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত পড়তেন। তিনি আরো বলেন , তারা নামাযে একশত আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন। এবং হযরত উসমান (রা.) এর যুগে দীর্ঘ সময় নামাযের কারণে তাঁদের লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতে হতো”।

 এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে অনেকেই সহীহ বলেছেন,তাদরে মধ্্যে রয়ছেনে, ইমাম নববী, ওয়ালী উদ্দীন ইরাকী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও আল্লামা নিমাভী (রহ.) প্রমুখ।

  দুই. মুহাম্মাদ ইবনে জাফর (রহ.) বলেন , আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা , আর তিনি বর্ণনা করেছেন সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে তিনি বলেন

্র كنا نقوم في زمان عمر بن الخطاب بعشرين ركعة والوتر গ্ধ

“আমরা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত এবং বিতর পড়তাম।’’

      এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে মোল্লা আলী ক্বারী, তাজ উদ্দীন সুবকী,ইমাম নিমভী প্রমুখ ইমামগণ সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।

তিন.  তৃতীয় সূত্রটি হলো হারেস ইবনে আবী যুবাব বর্ণনা করেনসাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে :

” كنا ننصرف من القيام على عهد عمر وقد دنا فروع الفجر وكان القيام على عهد عمر ثلاثة وعشرين ركعة .”

“আমরা উমর রা. এর যুগে ফজরের কাছাকাছি সময়ে তারাবীর নামায থেকে ফিরতাম। আর উমর রা. এর যুগে তারাবীহ হতো (বিতরসহ ) ২৩ রাক‘আত”।

    এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে ইমাম ইবনে আিব্দল বার সহ অনেকেই সহীহ বলেছেন।

   চার.   সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে ৪র্থ সূত্রটির কয়েকটি শাখা আছে। সর্বাপেক্ষা  বিশুদ্ধ বণৃনাটি হলো নি¤œ রূপ,

ইমাম আব্দুর রাজ্জাক দাউদ ইবনে ক্বাইস  থেকে বর্ণনা করেন ,তিনি মুহাম্মাদ বিন ইউসূফ থেকে, আর তিনি সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন

أن عمر جمع الناس في رمضان على أبي بن كعب وعلى تميم الداري على إحدى وعشرين ركعة

“ হযরত উমর (রা.) জনগণকে উবাই ইবনে কা‘ব ও তামীমে দারীর পেছনে রমযান মাসে (এক রাক‘আত বিতরসহ) ২১ একুশ রাক‘আত পড়ার জন্য একত্র করতেন”।

    এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকেও ইমাম ইবনে আিব্দল বার সহ অনেকেই সহীহ বলেছেন।

      হযরত উমর (রা.) এর যুগে তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়া হতো এ হাদীসটির কয়েকটি বিশুদ্ধ সূত্র হতে আমি উপরে চারটি সূত্র (সনদ) উল্লেখ করেছি। হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত সব ইমাম ও হাফেযগণ এই হাদীসটিকে যুগ যুগ ধরে সহীহ বলে আসছেন। তন্মধ্যে ইমাম নববী, ইমাম সুবকী, ওলিউদ্দীন ইরাকী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী, মোল্লা আলী ক্বারী, ইমাম ইবনে আিব্দল বার, ইমাম নিমাভী প্রমুখ বিষেশভাবে উল্লেখযোগ্য।

    উল্লেখ্য যে, একটি সহীহ হাদীস যখন একাধিক বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়ে আসে তখন তা আরো শক্তিশালী এমনকি কখনো কখনো সর্বাপেক্ষা সহীহ বা মুতাওয়াতির হাদীসের মর্যাদায় পৌঁছে এবং এর কোনো সূত্রে আংশিক ত্রুটি থাকলেও তা মার্জনীয় বলে প্রমাণিত হয়।  কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আখেরী যামানার দু’জন আহলে হাদীস গবেষক (!) তা সহ্য করতে পারেনি । তাই ঐ বিশুদ্ধ হাদীসটিকে ত্রুটিযুক্ত সাব্যস্ত করার জন্য  তারা আদাজল খেয়ে নেমেছেন।

তারা যা মানে না , এতে ত্রুটি দেখাতেই হবে (!) খুঁত বের করতেই হবে (!) পরিস্থিতিটা যেন আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতোই। এই প্রতিহিংসার নীতিতে যুগশ্রেষ্ঠ বিচক্ষণ ইমামগণের সর্বসম্মত রায়কে তারা উপেক্ষা করে চলে। ফলে তারা অবান্তর আজগুবী ধারা রচনা করা , অসাধ্য লুকোচুরীর আশ্রয় নেয়া এবং অসংখ্য খেয়ানত ও অসাধুতা অবলম্বন করা , ইত্যাদি পথ বেছে নিয়েছে ।

অথচ ইতিপূর্বে কোনো তথ্যভিত্তিক গবেষক ইমাম ঐ হাদীসটিকে যয়ীফ বা দুর্বল ইত্যাদি কোনো মন্তব্য করেননি । তাই সৌদি আরব থেকেই তাদের সঠিক প্রতিউত্তর হিসেবে বেশ কয়েকটি বই লিখে তাদের স্বরূপ  উন্মোচন করেছেন।

এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে নি¤েœ এ বিষয়ে আংশিক আলোচনা করবো। যাতে করে তাদের আসল উদ্দেশ্য ও এর বাস্তব রূপ সবাই সহজে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

পূর্বোল্লিখিত হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তার তিনজন ছাত্র

 এক . ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা

 দুই  . হারেস বিন আবূ যুবাব

 তিন . মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ

     প্রথম ছাত্র: প্রত্যেক ছাত্র থেকে বর্ণিত হাদীস আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। প্রথম ছাত্র ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা থেকে তাঁর দুই ছাত্র দুইটি সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

      ক. মুহাম্মদ বিন আবূ যিব, তার সনদে হাদীসটি ইমাম বাইহাকী ‘আস-সুনানুল কুবরায়’ বর্ণনা করেন। এতে ২০ রাক‘আত তারাবীর কথা উল্লেখ হয়েছে।

      এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে অনেকেই সহীহ বলেছেন,তনমধ্যে ইমাম নববী, ওয়ালী উদ্দীন ইরাকী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও আল্লামা নিমাভী (রহ.) প্রমুখ।

      খ. মুহাম্মদ বিন জাফর, তার সনদে হাদীসটি ইমাম বাইহাকী ‘মা‘রেফাতুস সুনান’ নামক কিতাবে বর্ণনা করেন। এতে ২০ রাক‘আত তারাবীর বর্ণনাই এসেছে।

    এই সনদটিকে মোল্লা আলী ক্বারী, তাজ উদ্দীন সুবকী,ইমাম নিমাভী প্রমুখ ইমামগন সহীহ বলে অভিহিত করেছেন।

     দ্বিতীয় ছাত্র: হারেস বিন আবি যুবাবের হাদীস ২৩ রাক‘আত,  বা ৩ রাক‘আত বিতর ব্যতীত ২০ রাক‘আত তারাবীহ। মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে।   এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে ইমাম ইবনে আিব্দল বার সহ অনেকেই সহীহ বলেছেন।

    তৃতীয় ছাত্র: মুহাম্মদ বিন ইউসুফের বর্ণনাটিতে দুই ধরনের বিষয়ই এসেছে।

এক. ২১ রাক‘আত, বা ১ রাক‘আত বিতর ব্যতীত ২০ রাক‘আত, তারাবীর বর্ণনা। এটিও মুসান্নাফে আ:রাজ্জাকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকেও ইমাম ইবনে আিব্দল বার সহ অনেকেই সহীহ এবং সঠিক বলেছেন।

দুই. মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত এই সনদের অপর  শাখায়

“ রাক‘আতের” বিষয়টি ব্যতিক্রম ও গড়মিলভাবে বর্ণিত হয়েছে। তার সূত্রে ইমাম মালেক (রহ.) ১১ রাক‘আত এবং ইমাম মারওয়াযী ১৩ রাক‘আত বর্ণনা করেছেন। তাদের ভাষ্যে এই হাদীসে বিতর ব্যতীত ৮ রাক‘আত অথবা বিতর ও ফজরের সুন্নত ব্যতীত  ৮ রাক‘আত, তারাবীর প্রমাণ রয়েছে।

হাদীসটির সর্বমোট এই ৪টি সনদ। প্রত্যেক সনদেই ২০ রাক‘আত, তারাবীর বর্ণনা এসেছে। শুধু ৪র্থ সনদের শাখা সনদে ৮ রাক‘আত এর বক্তব্য রয়েছে।

আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুগণ ৪টি সনদে বর্ণিত ২০ রাক‘আত তারাবীর বর্ণনাগুলো উপেক্ষা করে, শুধু ৪র্থ সনদের শাখার বর্ণনা মতে ৮ রাক‘আত তারাবীর বিষয়টি পছন্দ করেছে। অথচ ৮ রাক‘আতের এই শাখা বর্ণনাটি অনেকগুলো ত্রুটির কারণে যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞ ইমামগণ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।কয়েক নি¤œ রূপ,

১. ঐ সব ত্রুটির একটি হলো মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত ৮ রাক‘আতের উক্ত বর্ণনাটি সাহাবী সায়েব (রা.) থেকে বর্ণিত অপর ৪টি বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীত। কারণ ঐ সব বর্ণনায় ২০ রাক‘আত তারাবীর বিবরণ এসেছে। বিশেষ করে মুহাম্মদ বিন ইউসুফেরই আরো দুইজন সাথী ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা এবং হারেস বিন আবু যুবাবও ২০ রাক‘আতই বর্ণনা করেছেন এবং মুহাম্মদ বিন ইউসুফেরই বর্ণনামতে অপর সনদে ২০ রাক‘আত উল্লেখ আছে যা মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকে সহীহ সনদে বর্ণনা হয়েছে। অবশ্য ৮  রাক‘আতের বর্ণনাটিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ। তবে চারটি বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীত হওয়ার কারণে, হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী ৮ রাক‘আতের বর্ণনাটিকে شاذ” ” বিচিত্র বর্ণনা বলা হবে। আর এ ধরনের বিচিত্র বর্ণনার বিধান হলো সব হাদীস শাস্ত্রবিদদের ঐক্যমতে “ مردود ” প্রত্যাখ্যাত।

  ২.  অপর একটি বড় ধরণের ত্রুটি হলো, মুহাম্মদ বিন ইউসুফের সূত্রে বর্ণিত ৮ রাক‘আতের বর্ণনাটি গড়মিল ভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মালেক (রহ.) এর সূত্রে ১১ রাক‘আত।  ইমাম মারওয়াযীর সূত্রে ১৩ রাক‘আত।  এবং মুসান্নাফে আ: রাজ্জাকের অপর বর্ণনায় উল্লেখ আছে একুশ রাক‘আত বা এক রাক‘আত বিতর ব্যতীত ২০ রাক‘আত। এ ধরনের গড়মিল বর্ণনাকে হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় বলে ” مضطرب “( গড়মিল বর্ণনা )। এর বিধানও হলো “ مردود ”  প্রত্যাখ্যাত।  এছাড়া হাদীসটি সমস্ত মুসলিম বিশ্বের ধারাবাহিক আমল ও মুসলমানদের ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্যের বিপরীত তো বটেই। এই ৮ রাক‘আতের বর্ণনায় এসব ত্রুটিগুলো থাকার কারণেই ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) লেখেন

وهو الصحيح” “روى غير مالك فى هذا الحديث احدى وعشرين

ইমাম মালেকের ৮ রাক‘আতের বর্ণনার বিপরীতে অন্যরা (বিতরের এক রাক‘আত সহ) একুশ রাক‘আত বর্ণনা করেছেন। আর সেটিই সহীহ ও বিশুদ্ধ।

 তিনি আরো লিখেন

إلاأن الأغلب عندى أن قوله احدى عشرة وهم

“আমার প্রবল ধারণা ১১ শব্দটি ভুল”।

এতো কিছুর পরেও ৮ রাক‘আতের প্রত্যাখ্যাত হাদীসটিকে আল্লামা মুবারকপুরী ও নাছিরউদ্দীন আলবানী সাহেব (রহ.) কুড়িয়ে তুলেছেন। আর ২০ রাক‘আতের বর্ণনাগুলো তাদের রচিত মতের বিপরীত হওয়ার কারণে এতে নানান অবাস্তব ত্রুটি বাহির করার অপচেষ্টা করেছেন। অথচ ইতিপূর্বে কোনো ইমাম থেকে এর কোনো নযীর নেই।

আশা করি পূর্বোল্লিখিত আলোচনা থেকে আমাদের পাঠকবৃন্দ আংশিক সচেতন

হওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে বিশ রাক‘আতের বর্ণনাগুলোতে তারা যে সব সংশয় পেশ করেছে সেগুলোর কিছু পর্যালোচনা নি¤েœর টীকায় উপস্থাপন করা হলো।

——————————————————————– টীকা

নিরসন. সাহাবী সায়েব বিন ইয়াযীদ (রা.) এর ছাত্র তিন জনই “ثقة” “নির্ভরযোগ্য”। অবিলম্বে  তা ব্যাখ্যা করবো। তবে মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত ৮ রাক‘আতের অংশটি কমপক্ষে দুই কারণে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।

    (১) সে একা , তার চেয়ে বেশী লোক ২০ রাক‘আত বর্ণনা করেছেন। তাই সে যতো বেশী নির্ভরযোগ্য হোক না কেন তার বর্ণনাটি شاذ” ” বিচিত্র , বিধায় তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।

     (২) তার বর্ণনায় গড়মিল রয়েছে, কখনো ১১ কখনো ১৩ কখনো ২১ রাক‘আত বর্ণিত হয়েছে। তাই এসব “مضطرب” গড়মিল বর্ণনা গ্রহণ করার উপায় নেই। এছাড়া হাদীস বিশারদগণের নিকট মামা-ভাগিনার রাজত্ব চলে না। সেখানে চলবে উসূল ও নিয়মনীতি।

এবার শুনুন , ২০ রাক‘আত বর্ণনার দু’জন ছাত্রের একজন ছিলেন ‘ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা’ তার সম্পর্কে ইমাম আহমদ , আবূ হাতেম ও নাসাঈ লিখেন “ثقة” নির্ভরযোগ্য এবং

ইমাম ইবনে মাঈন বলেন “ثقة حجة” নির্ভরযোগ্য প্রমাণযোগ্য। (তাহযীবুল কামাল ৩২/৭৩ ,জী ৭০১২)

অপরজন হলো, ইবনে আবী যুবাব, তিনিও সর্বসম্মতিক্রমে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তবে শেষ বয়সে তার স্মৃতি শক্তিতে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। উপরোক্ত হাদীসটি তাঁর এ অবস্থার পূর্বের না পরের জানা নেই । এই অজুহাত ধরে আলবানী সাহেব এতে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অথচ ইমাম ইবনে মাঈন (রহ.) তার সম্পর্কে লিখেন “مشهور”  তিনি ‘প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস’।  ইমাম আবূ যুর‘আ (রহ.) লিখেন “তার মধ্যে  কোনো অসুবিধা নেই”(তাহযীবুল কামাল ৫/২৫৪)।

    ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.) তাকে ‘আস সিক্বাত’ গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁকে ‘মাশাহীরে উলামায়ে আমছার’ গ্রন্থে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য  বর্ণনাকারী হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। এছাড়া তাঁর বর্ণিত ২০ রাক‘আতের হাদীসটির متابع সমস্থানে ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা ও অন্যান্যদের সমঅর্থবোধক বর্ণনাও প্রমাণ করে যে, তার হাদীসটি বিশুদ্ধ ও  গ্রহণযোগ্য এবং হাদীসটি তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পূর্বের বর্ণনা, পরের বর্ণনা নয়।

———————————————————————

টীকা

অতএব , এ দু’জনের বর্ণিত ২০ রাক‘আতের হাদীসের তুলনায় মুহাম্মদ বিন ইউসুফের একক বর্ণনার কোনো মূল্য নেই। ৮রাক’আতের বর্ণনা টিই প্রত্যাখ্যাত-মারদুদ ও শায বা বিচিত্র বলে গণ্য হবে। (দেখুন, আল ইসতিযকার, ইবনে আব্দুল বার -২/৬৮-৬৯।)

     খ. সংশয় : আল্লামা আলবানী সাহেবের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক সংশয়টি হলো, তিনি   বিশ রাক‘আত তারাবীর প্রত্যেকটি বর্ণনার ক্ষেত্রে লিখেন “এগুলো মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত ৮ রাক‘আত বর্ণনার বিপরীত (!)

নিরসন  আমি তাঁর নিকট জানতে চাই, তিনি কি দেখেননি যে, মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে বর্ণিত ৮ রাক‘আত তারাবীর (منفرد ، شاذ ، مضطرب ) একক, বিচিত্র, ও গড়মিল ত্রুটিযুক্ত বর্ণনাটি ২০ রাক‘আত তারাবীর একাধিক ( صحيح ،محفوظ ) বিশুদ্ধ ও অগ্রগণ্য বর্ণনার বিপরীত ?

এবার পাঠকগণই যাচাই করবেন, তার এসব বিতর্কের উদ্দেশ্য কী?

গ. সংশয় : ইতিপূর্বে কয়েক বার উল্লেখ করেছি যে, উপরোক্ত হাদীসটির ৪টি সনদেই ২০ রাক‘আতের বর্ণনা করা হয়েছে। তন্মধ্যে দু’টি সনদেই হাদীসটি ইমাম বাইহাক্বী তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন।

এ দু’টি সনদের প্রথমটি হলো সাহাবী সায়েব (রা.) এর তিন ছাত্রের একজন ইয়াযীদ বিন খুসায়ফা থেকে তার ছাত্র মুহাম্মদ বিন আবূ যিব এর বর্ণিত। তার সনদে হাদীসটি ইমাম বাইহাক্বী স্বীয় বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুনানে বাইহাক্বী’তে উল্লেখ করেছেন। উক্ত সনদে ইমাম বাইহাক্বীর উস্তাদের নাম হলো, আবূ আব্দুল্লাহ আল হোসাইন ইবনে ফাঞ্জুয়াইহ দীনুরী।

  মুহতারাম মুবারকপুরী সাহেব তার কিতাবে লিখেছেন

  “উক্ত উস্তাদের পরিচয় কোনো কিতাবেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই সে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী। অতএব তার সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি বিশুদ্ধ বলা যাবে না, বরং দুর্বল বলে গণ্য হবে।”

নিরসন.  উল্লিখিত বর্ণনাকারী ইবনে ফাঞ্জুয়াইহ মোটেই অজ্ঞাত নয় , বরং তাঁর পরিচয় অসংখ্য নির্ভরযোগ্য কিতাবে রয়েছে। তাঁর সম্পর্কে হাফেয যাহাবী (রহ.) “আল ইবার” কিতাবে এবং ইবনুল ইমাদ হাম্বলী “শাযারাতুয যাহাব” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন 😦 كان ثقة مصنفا )

  তিনি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ছিলেন , কিতাব প্রণেতা ছিলেন। (আল ইবার : ২/২২৭, এবং শাযারাতুয যাহাব : ২/২০০)

    ——————————————————————– টীকা

ইমাম যাহাবী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “সিয়ারু আ’লামিন নুবালা” এর ১৭ তম খ-ের ৩৮৪ পৃষ্ঠায় লেখেন  ” كان ثقة صدوقا ” তিনি নির্ভরযোগ্য সত্যবাদী  ছিলেন।  মুবারকপুরী ও আলবানী সাহেবের ভক্তবৃন্দরা এগুলো খুঁজে দেখলে পাবেন। কিন্তু আমার আশ্চর্য হলো তারা কোন ধরনের  মতাদর্শে বিভোর থাকার কারণে এই বর্ণনাকারীর পরিচয় খুঁজে পেল না। অথচ এই সনদে বর্ণিত হাদীসটিকে অনেকেই সহীহ বলেছেন, ইমাম নববী, ওয়ালী উদ্দীন ইরাকী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী, ইমাম ইবনে আিব্দল বার ও আল্লামা নিমাভী রহ. প্রমুখ। আত তা‘লীকুল হাসান, নিমাভী ২৫১-২৫২, ইলাউস সুনান ;৭/৭৪ , , নাসবুর রায়াহ ; ২/১৫৪, আল-মাজমু শরহে মুহায্যাব; ৪/৩২, আল মাছাবীহ ফী সালাতিত তারাবীহ, আলহাভী ;২/৭৪ শরহে মুআত্মা-মুল্লা আলী ক্বারী দ্র. আত তা‘লীকুল হাসান -২৫২

     ঘ. সংশয় : ইমাম বাইহাক্বী (রহ.) তার কিতাব ‘মা‘রিফাতুস সুনানে’ ইয়াযীদ বিন খুসাইফার অপর ছাত্র মুহাম্মদ বিন জাফরের সনদে বর্ণিত ২০ রাক‘আতের বর্ণনায় চারজন বর্ণনাকারীর উপর তারা আপত্তি তুলেছেন

এক. ইমাম বাইহাক্বীর উস্তাদ ‘আবূ তাহের ফক্বীহ’ কে কেউ সত্যায়ন করেনি। তাই তার হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে না।

নিরসন.  ‘আবূ তাহের ফক্বীহ’ সম্পর্কে কোনো ইমামের সত্যায়ন নেই, আসলে এ কাথাটির কোনো ভিত্তি নেই।

কেননা তাঁর সম্পর্কে ইমাম সুবকী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ আল কুবরাতে” লিখেন ” كان إمام المحدثين و الفقهاء بنيسابورفى زمانه ” “তিনি তাঁর যুগে নিসাপুরে সব মুহাদ্দিস ও ফক্বিহগণের ইমাম ছিলেন (৪/২৯)। ইমাম আব্দুল গাফের (রহ.) বলেন : ” إمام أصحاب الحديث بخراسان بالإتفاق بلا مدافعة ” “তিনি সবার ঐক্যমতে খুরাসানে হাদীস বিশারদগণের ইমাম , এতে কারো কোন দ্বিমত নেই। (তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ :৪/২০০)

        অতএব হাজার বছর পরে এসে এতে দ্বিমত করার আর অবকাশ নেই। এ ছাড়া এই বর্ণনার সমর্থনে (متابع) আরো সমঅর্থবোধক অনেকগুলো বর্ণনাতো আছেই।

   দুই.উপরোক্ত সনদে অপর এক বর্ণনাকারী আবূ উসমান। তদের দাবি হলো আবূ উসমানের জীবনী কোন কিতাবে পাওয়া যায় না । অতএব এ কারণেও হাদীসটি সন্দেহযুক্ত।

—————————————————————-

টীকা

নিরসন.   তাদের দাবি ঠিক নয়। কেননা তাঁর জীবনী সব জীবনীগ্রন্থেই রয়েছে। ইমাম যাহাবী (রহ.) তার বিশ্ববরেণ্য বর্ণনাকারীদের জীবনীগ্রন্থের ১৫নং খ-ের ৩৬৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেন : ” الإمام القدوة الزاهد الصالح ” “আবূ উসমান অনুসরণযোগ্য ইমাম ছিলেন, তিনি যাহেদ এবং ধর্ম ও হাদীসের ক্ষেত্রে সঠিক ছিলেন”। ইমাম হাকেম তাঁর সম্পর্কে বলেন :

“ما رأيت مثل إجتهاده ” “তার মতো শ্রেষ্ঠ গবেষক আর কাউকে পাইনি। (প্রাগুক্ত)

   এ ছাড়া ২০ রাক‘আতের অন্যান্য বর্ণনার সঙ্গে এ বর্ণনার (متابع) মিল তো আছেই।

   তিন. উক্ত সনদে আরেকজন বর্ণনাকারী হলো খালেদ ইবনে মাখলাদ। মাও: মুবারকপুরী ও আলবানী সাহেবের মতে সে দুর্বল, এমনকি শিয়া।

নিরসন .  শিয়া মতবাদ গ্রহণ মানেই তার হাদীস প্রত্যাখ্যান করতে হবে এমন কোনো নীতি কোনো মুহাদ্দিসই ব্যক্ত করেননি। বরং সে সত্য বলে কি না,  তার মতবাদের প্রতি মানুষকে আহবান করে কি না, তা দেখাই হলো উসূলে হাদীসের নীতি।

ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন ” لنا صدقه و عليه بدعته ” “তার বিদআ‘ত তার কাছে থাকবে আর আমরা তার সত্যটা গ্রহণ করবো।- মীযানুল এ‘তেদাল:১/৫)

এছাড়াও অনেককে তো শিয়া বলা হতো শুধু এ কারণেই যে তারা আলী (রা.) কে সব খলীফার উপরে প্রাধান্য দিতেন। এ ধরনের অসংখ্য বর্ণনাকারীদের হাদীস ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম গ্রহণ করেছেন। উপরোক্ত বর্ণনাকারী খালেদের হাদীসও ইমাম বুখারী ও মুসলিম গ্রহণ করেছেন। কারণ, তাঁরা  জানতেন তিনি শিয়া হলেও বাড়াবাড়িতে নেই এবং তিনি নির্ভরযোগ্য সত্যবাদী বর্ণনাকারী।

ইমাম ইবনে মাঈন (রহ.) তাঁর সম্পর্কে বলেন “ما به بأس ” তাঁর মধ্যে কোন অসুবিধাই নেই। ইমাম আবূ হাতেম (রহ.) বলেন ” يكتب حديثه ” তাঁর হাদীস লেখা যাবে। ইমাম আবূ দাউদ ও ইবনে হাজার বলেন :”صدوق ”  সে গ্রহণযোগ্য ও সত্যবাদী ব্যক্তি। (আল জারহে ওয়াত্তাদীল : খ.৩ জী; ১৫৯৯ , তাহযীবুল কামাল: ৮/১৬৫, মুকাদ্দামায়ে ফাতহুল বারী : পৃ:৫৬৮ , তাকরীব-(১৬৭৭)

চার. উক্ত সনদে তাদের সর্বশেষ আপত্তি হলো, সাহাবী সায়েব (রা:) এর ছাত্র ইয়াযিদ বিন খুসায়ফার উপরে। কারণ ইমাম আহমদ (রহ.) তাকে বলেছেন : منكر الحديث “হাদীসের মধ্যে মুনকার বা সে হলো আপত্তিজনক বর্ণনা কারী” ।

—————————————————————

টীকা

নিরসন. ইমাম আহমদ (রহ.) কোনো বর্ণনাকারীকে মন্দ বুঝানোর অর্থে ‘মুনকার’ বলেন না। বরং কখনো কোনো বর্ণনায় তাকে একক বুঝানোর অর্থে ব্যবহার করে থাকেন। যেমন অনেক নির্ভরযোগ্য বুখারী মুসলিমের বর্ণনাকারীকেও তিনি ‘মুনকার’ বলে অভিহিত করেছেন।

এমনকি বুখারী শরীফের প্রথম হাদীস “ইন্নামাল আ‘মালু বিন্নিয়্যাত” এর বর্ণনাকারী ‘মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম’ কেও তিনি ‘মুনকার’ বলেছেন, তাই বলে কি হাদীসটি দুর্বল? (হাদিউস সারী-৬১৬)

উপরোক্ত বর্ণনাকারী ইয়াযিদ বিন খুসায়ফার হাদীস ইমাম বুখারী ও মুসলিম সহীহাইনে গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া ইামাম আহমদ (রহ.) তো নিজেই অপর বর্ণনায় তাকে     ” ثقة “নির্ভরযোগ্য বলেছেন। অন্যান্য ইমামদের মধ্যে ইবনে সা‘দ, আবূ হতেম ও নাসাঈ প্রমুখ তাঁকে ” ثقة ” নির্ভরযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। আরো অগ্রসর হয়ে ইমাম ইবনে মাঈন বলেন : ثقة حجة নির্ভরযোগ্য তো বটেই বরং তিনি প্রমাণযোগ্যও। (তাহযীবুল কামাল:১১/২৯৬) যা পূর্বেও উল্লেখ করেছি।

এ পরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লামা আলবানী সাহেব বিভিন্ন আপত্তি তুলে যে হাদীসটিকে মানতে পারেননি ঐ হাদীসটি সুস্পষ্টভাবে সহীহ (বিশুদ্ধ) বলেছেন ইমাম মোল্লা আলী  ক্বারী এবং ইমাম তাজউদ্দীন সুবকী।

আর এ হাদীসেরই প্রথম সনদটি যা ‘সুনানে বাইহাক্বীতে’ রয়েছে সেটিকে “সহীহ” বলেছেন ইমাম নববী, ওয়ালী উদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও আল্লামা নিমাভী রহ.।

মৌলিকভাবে ৮-১০ জন যুগশ্রেষ্ঠ ইমামগণ এই হাদীসটিকে “সহীহ” (বিশুদ্ধ)  বলেছেন। আত তা‘লীকুল হাসান, নিমাভী (২৫১-২৫২) ইলাউস সুনান ৭/৭৪ ,  নাসবুর রায়াহ   ২/১৫৪, আল-মাজমু শরহে মুহাযযাব   ৩/৫২৭ শরহে মুআত্মা-মুল্লা আলী ক্বারী-দেখুন আসারুস সুনান-২৫২

এবার আশা করি, পাঠকগণের বিবেচনা করার সুযোগ হবে। এসব ইমামগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অগ্রগণ্য হবে, নাকি আখেরী যামানার গবেষকদের মনগড়া মতবাদের প্রাধান্য হবে ?

ঙ. সংশয় : তাদের সর্বশেষ একটি সংশয় হলো , উপরোক্ত ২০  রাক‘আত তারাবীর একটি হাদীস ইমাম আব্দুর রায্যাক (রহ.) তাঁর হাদীসের বিশাল ভান্ডার ‘মুসান্নাফে আব্দুর রায্যা’কে উল্লেখ করেছেন। আর শেষ বয়সে আব্দুর রায্যাকের স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছিল। উপরোক্ত হাদীসটি কোন সময়ের সংগ্রহ তা জানা নেই। হতে পারে হাদীসটি স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পরের সংগ্রহ। এমন আশঙ্কার  কারণে হাদীসটি দুর্বল হিসেবে গণ্য হবে।

—————————————————————-

টীকা

নিরসন .  ২০  রাক‘আত তারাবীর উপরোক্ত দলীলটি ইমাম আব্দুর রায্যাক (রহ.) বর্ণনা করেন দাউদ থেকে আর তিনি মুহাম্মদ বিন ইউসুফ থেকে আর তিনি বর্ণনা করেন সাহাবী সায়েব (রা.) থেকে। সনদটি অত্যন্ত عالى উঁচুমানের ও সংক্ষিপ্ত।  সাহাবী ও আব্দুর রায্যাকের মধ্যে মাত্র দু’জন বর্ণনাকারী। তাদের উভয়ই নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য।

কিন্তু হাদীসটি যাদের মতবাদের বিপরীত হয় তাদের তো এটিকে ত্রুটিযুক্ত প্রমাণ করতেই হবে। অন্যথায় তারা গবেষক হয় কেমন করে (!) তাই তারা আদাজল খেয়ে লেগেছে, খুঁজে পেয়েছে এই হাদীসের সংকলক, হাদীসের বিশাল ভান্ডার ১১ খন্ডে লিখিত বিখ্যাত কিতাব, ঐ মুসান্নাফ গ্রন্থের লেখক আব্দুর রায্যাককেই।  সুবহানাল্লাহ !

আব্দুর রায্যাক তো সবার ঐক্যমতে নির্ভরযোগ্য ইমাম। তাঁর কিতাব মুসলমানদের দলীলের ভান্ডার। তিনি ঐ হাদীস তাঁর উক্ত কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। কিতাবটি তো তিনি স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পরে লিখেননি বরং পূর্বেই  লিখেছেন। তাই উপরোক্ত ২০ রাক‘আত তারাবীর দলীলটিও স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পূর্বেই সংকলন করেছেন।

    তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে কিতাব লেখার আরো অনেক পরে, দুইশত হিজরী অতিবাহিত হওয়ার পর। আরবের প্রসিদ্ধ ও আস্থাভাজন গবেষক আল্লামা ড. নুরুদ্দীন ইত্র লেখেন

” أن ما دخله الاختلاط من حديثه هو ما يحدث به من حفظه بعد المأتين،أما حديثه قبل سنة مأتين ، و كذلك حديثه المدوَّن فى كتبه المعتبرة وعلى رأسها ؛المصنف ‘ فلا يزال حجةً “

 “ আব্দুর রায্যাক দুইশত হিজরীর পর যা মুখস্থ বর্ণনা করেছেন সেগুলোতে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার প্রভাব পরেছে। আর দুইশত হিজরীর পূর্বেকার বর্ণিত তাঁর সব হাদীস এবং তার কিতাবে সংকলিত হাদীস বিশেষত ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থের হাদীস সর্বদাই সবই নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য থাকবে”।

   ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) সহ অসংখ্য নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসগণ এমন মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন। (দেখুন-শরহে ইলালুত তিরমিযী : ২/৫৭৮ পার্শ্ব টীকা)

   কিন্তু আমার আশ্চর্য হলো আল্লামা আলবানী সাহেব এমন একটি সুস্পষ্ট বিষয় পাশ কাটিয়ে সংঘাতের পথ বেছে নিলেন কোন স্বার্থে ?

২০ রাক‘আত তারাবীর বর্ণনাগুলো একটি অপরটিকে শক্তিশালী করবে

উপরোল্লিখিত হাদীসটির ব্যাপারে আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী সাহেবের একটি সুস্পষ্ট খেয়ানত ও হাস্যকর অসাধুতার সঠিক সমাধান উপস্থাপন করা খুবই জরুরী মনে করছি। তিনি লিখেছেন ২০ রাক‘আত তারাবীর হাদীস একটি অপরটিকে শক্তিশালী করবে না।

   আমি বলি সাহাবা ও তাবেয়ীগণ উমর (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত  তারাবীহ পড়তেন। এ বর্ণনাটি সাহাবী সায়েব (রা.) থেকে ৪টি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। একটি সনদেও গঠনমূলক কোনো আপত্তির অবকাশ নেই। বরং বিজ্ঞ ইমামগণ এগুলোর প্রতিটিকেই সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা এ সনদগুলোতে দু’একজনের ব্যাপারে যদিও ‘স্মৃতি শক্তি লোপ পেয়েছিল বা সত্যায়ন নেই’ এমন অমূলক মন্তব্য কেউ কেউ করেছে, তবে হাদীসটি বিভিন্ন সনদে আসার ফলে একটি অপরটিকে শক্তিশালী করেছে। তাই এ সব অমূলক মন্তব্যের প্রতি দৃষ্টি না করে যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞ ইমামগণ এই হাদীসের সবকটি সনদকে সহীহ্ বলে আসছেন।

  উল্লেখ্য যে, কোনো হাদীসের সনদে যদি মিথ্যুক বা সর্বজন স্বীকৃত পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী থাকে তাহলে এ ধরনের হাদীস শক্তিশালী হয় না। আর স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া অথবা বর্ণনাকারীর ব্যাপারে কোনো ইমামের সত্যায়ন না পাওয়া ইত্যাদি কারণে যদি হাদীস দুর্বলও হয়, তবুও এই হাদীসের কয়েকটি সনদ পাওয়া গেলে একটি অপরটিকে শক্তিশালী করবে এবং হাদীসের সংশয় দূর করবে।

   উপরোক্ত ২০ রাক‘আতের কোনো বর্ণনাতে মিথ্যুক বা পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী নেই। যার চুলচেরা বিশ্লেষণ আমরা পেশ করেছি।

অতএব হাদীসটির ৪টি সনদের প্রত্যেকটিই একটি অপরটিকে শক্তিশালী করবে, বরং প্রতিটি সনদই বিশুদ্ধ হওয়ার কারণে হাদীসটি সর্বপেক্ষা সহীহ হাদীসে পরিণত হয়েছে।  কিন্তু আলবানি সাহেব এ ক্ষেত্রেও সব মুহাদ্দিসগণকে পাশ কাটিয়ে প্রকাশ্য খিয়ানতের আশ্রয় নিয়েছেন।

মোটকথা, খলীফা হযরত উমর (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার প্রচলন ছিল। এ বিষয়টি আমরা স্ববিস্তারে ইতি টেনেছি।  এ বিষয়ে আর লেখার কোনো প্রয়োজন মনে করি না।

তদুপরি উপরোক্ত বর্ণনার সাপোর্টে বা সমর্থন হিসেবে নি¤েœ দু’টি বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

  এক. তাবেয়ীগণের বর্ণনা

সাহাবী এবং তাবেয়ীগণ ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়তেন , অসংখ্য তাবেয়ীগণ এমন বর্ণনা ব্যক্ত করেছেন। নি¤েœ মাত্র কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করবোÑ

ক . তাবেয়ী রুফাই বিন মেহরান

    যিনি ‘আবুল আলীয়া’ নামে প্রসিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এর ইন্তেকালের মাত্র দু’বছর পর ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত ওমর (রা.) এর পিছনে তিনি নামায পড়েছেন।

তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ উস্তাদ সাহাবী হযরত উবাই বিন কা‘ব (রা.) এর ঘটনা বর্ণনা করেন

أن عمر أمر أبيا أن يصلي بالناس في رمضان فقال: إن الناس يصومون النهار ولا يحسنون أن ( يقرؤا ) فلو قرأت القرآن عليهم بالليل فقال: يا أمير المؤمنين هذا (شيء ) لم يكن فقال: قد علمت ولكنه أحسن فصلى بهم عشرين ركعة.

“হযরত ওমর (রা.) হযরত উবাই (রা.) কে রমযানে লোকদের নিয়ে নামায পড়ার নির্দেশ দেন। এবং বললেন, লোকজন দিনভর রোযা রাখে, কিন্তু তারা সুন্দরভাবে কুরআন পড়তে পারে না, তাই আপনি যদি রাতে তাদেরকে নামাযে কুরআন পড়ে শুনাতেন ! তখন তিনি বললেন, হে আমীরুল মু‘মিনীন! জামা‘আতবদ্ধভাবে কুরআন শুনানোর এ পদ্ধতি তো পূর্বে ছিল না। তিনি বললেন, আমি তা জানি, তবে তা খুবই উত্তম। এরপর সাহাবী হযরত উবাই (রা.) লোকদেরকে নিয়ে ২০ রাক‘আত পড়লেন”।

 হাদীসটির সনদ সহীহ। বুখারী ও মুসলিম শরীফে সংকলন হয়নি এমন বিশুদ্ধ হাদীসের ভা-ার ইমাম জিয়াউদ্দীন মাক্বদিসীর কিতাব ‘আল-মুখতারাহ’ এ  তা উল্লেখ করেছেন। ঐ কিতাবের গবেষক আরব দেশের প্রখ্যাত ড. আব্দুল মালিক এই হাদীসটির সনদকে ‘হাসান’ (উত্তম ও গ্রহণযোগ্য বলেছেন।  সহীহ্ হাদীস যেভাবে গ্রহণযোগ্য ‘হাসান’ হাদীসও এভাবেই গ্রহণযোগ্য  ও প্রমাণযোগ্য। এতে আল্লামা আলবানী সাহেবেরও  দ্বিমত নেই। অতএব এখানে আলোচনা আর দীর্ঘ করার প্রয়োজন নেই।

খ. তাবেয়ী হযরত আ:আযীয বিন রুফাই (রহ.)-এর   বর্ণনা

“كان أبى بن كعب يصلى بالناس فى رمضان بالمدينة عشرين ركعة ؛ ويوتر بثلاث.”

“হযরত উবাই বিন কা‘ব (রা.) রমযান মাসে লোকদের নিয়ে মদীনাতে ২০ রাক‘আত তারাবীহ এবং ৩ রাক‘আত বিতর পড়তেন”।

গ. তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী (রহ.) এর বর্ণনা

” إن عمر بن الخطاب جمع الناس على أبى بن كعب ؛ فكان يصلى لهم عشرين ركعة.”

“হযরত উমর (রা.) লোকদেরকে হযরত উবাই বিন কা‘ব (রা.) এর পিছনে একত্রিত করেন , তখন তিনি তাঁদেরকে নিয়ে ২০ রাক‘আত পড়েন”।

 ঘ. তাবেয়ী হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আনসারী (রহ.) এর বর্ণনা

” إن عمر بن الخطاب أمر رجلا يصلى بهم عشرين ركعة.”

“হযরত উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত  পড়ার আদেশ করেন”।

ঙ. তাবেয়ী হযরত ইয়াযীদ বিন রূমান (রহ.)-এর বর্ণনা

“كان الناس يقومون فى زمان عمر بن الخطاب ـ رضى الله عنه ـ فى رمضان بثلاث و عشرين ركعة .”

“হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর যুগে লোকজন (সাহাবা ও তাবেয়ীগণ) রমযান মাসে (তিন রাক‘আত বিতরসহ) ২৩ রাক‘আত পড়তেন”।

উল্লেখ্য যে উপরোক্ত বিষয়ে আরো অগণিত বর্ণনা রয়েছে। এজন্যই বিশ্ববরেণ্য গবেষক আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী (রহ.) লিখেছেন “কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দেয়ার একটি কারণ হলো এ বিষয়ে সাহাবী-তাবেয়ীগণের আসার (আমল-উক্তি) বেশী হওয়া।

বলা বাহুল্য ,২০ রাক‘আত তারাবীর পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেয়ার একটি কারণ হলো- এর পক্ষে তাবেয়ীগণের অনেকগুলো আসার (আমল-উক্তি) আছে। যেগুলোর  তুলনায় ৮ রাক‘আতের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো আসার নেই বললেই চলে।

বস্তুত : এ ধরনের বর্ণানাগুলো একাধিক হওয়ার কারণে এবং এর সমর্থনে বিশুদ্ধ হাদীস ও মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত আমলধারা বিদ্যমান থাকায় বর্ণানাগুলো সহীহ বা সর্বাপেক্ষা সহীহ পর্যায়ে গৃহীত। এতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব করার কোনো অবকাশ নেই।

কিন্তু আমাদের আহলে হাদীস ভাইদের অভিযোগ হলো ঐ বর্ণনাগুলোতে তাবেয়ীগণ সাহাবী হযরত ওমর (রা.) এর যামানার নয় তাই বর্ণনাগুলো “মুরসাল” বলা হবে। আর মুরসাল হলো দুর্বল। তাই এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।

সমাধান : ক. মূলত পরের বর্ণনাগুলো মুরসাল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাবেয়ী “আবুল আলীয়া” থেকে উল্লিখিত প্রথম বর্ণনাটি তো মুরসাল নয়। “আবুল আলীয়া” তো হযরত উমর (রা.) এর পেছনে নামায পড়েছেন।  তাঁর বিশুদ্ধ বর্ণনাটি এবং ইতিপূর্বে উল্লিখিত সাহাবী সায়েব (রা:) এর বিশুদ্ধ বর্ণনাটি তো গ্রহণ করতে পারতেন। আমরা তো এ মুরসাল বর্ণনাগুলো শুধু উপরে বর্ণিত সহীহ বর্ণনার সমর্থনে উল্লেখ করেছি।

 খ. মুরসাল বর্ণনাকে সবাই দুর্বল বলেন না। উম্মতের বিশাল অংশ মুরসাল হাদীসকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন।

এ বিষয়টা তারা লুকিয়ে রাখলেন কোন রহস্যের কারণে ? আলবানী সাহেব নিজেই তার ‘জানাইয’ গ্রন্থে মুরসাল হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। তিনি তো লিখেছেন    ” و إن كان مرسلا فهو حجة عند الجميع ” “ মুরসাল হাদীস তো সবার নিকট প্রমাণযোগ্য।  এবার তো আর লুকিয়ে রইল না। আমরা সবাই আসল রহস্য জেনে গেলাম।

গ. একটি বিষয়ে যদি একাধিক মুরসাল বর্ণনা থাকে বা এর সমর্থনে অবিচ্ছিন্ন সহীহ হাদীস অথবা মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন সম্মিলিত আমল বিদ্যমান থাকে , তাহলে এই ধরনের মুরসাল গ্রহণ করার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। যেমনটা এখানে ঘটেছে।

তাই আরব বিশ্বের মান্যবর, আহলে হাদীস ভাইদের ইমাম, সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষক শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেন

” المرسل الذى له ما يوافقه أو الذى عمل به السلف : حجة باتفاق الفقهاء”

“যে মুরসালের অনুকূলে অন্য কিছু  থাকে অথবা পূর্ববর্তীগণ এ অনুযায়ী আমল করে এমন  মুরসাল ফক্বীহগণের সর্ব সম্মতিক্রমে দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য”।

 দুই. ইবনে তাইমিয়ার অভিমত

হযরত উমর (রা.) এর যুগে সাহাবী তাবেয়ীগণ হযরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) এর পিছনে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়তেন। এ বিষয়ে আমাদের আহলে হাদীস ভাইদের কিছু সংশয় হয়। তাই  ২০ রাক‘আত বর্ণনাগুলোর সমর্থনে তাদেরই মান্যবর ইমাম , আরব বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষক শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর কয়েকটি  উক্তি  পেশ করা অতি জরুরী মনে করছি।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন

” إنه قد ثبت أن أبى بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة فى قيام رمضان و يوتر بثلاثٍ.”

“অবশ্যই প্রমাণ হয়েছে যে, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) রমযানে লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত পড়তেন এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়তেন”।

তিনি  আরো লিখেন ” ثبت من سنة الخلفاء الراشدين و عمل المسلمين .”

“খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত ও মুসলিম জাতির আমল দ্বারা এটি  প্রমাণিত”।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অন্যত্র লিখেন

فلما جمعهم عمر على أبى بن كعب كان يصلى بهم عشرين ركعة ثم يوتر بثلاث .”

“যখন উমর (রা.) লোকদেরকে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) এর পিছনে  জামা‘আতবদ্ধ করে দিলেন তখন তিনি ২০ রাক‘আত তারাবীহ এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়াতেন”।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আরো লিখেন

” فلما كان عمر رضى الله عنه جمعهم على إمام واحد ‘وهو أبى بن كعب الذى جُمع الناسُ عليه بأمر عمر بن الخطاب وعمر هو من الخلفاء الراشدين حيث يقول- صلى الله عليه وسلم- : “عليكم بسنتى و سنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدى  عضوا عليها بالنواجذ.”

“ উমর (রা.) সব সাহাবাকে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) এর পিছনে  জামা‘আতবদ্ধ করেছেন। উল্লেখ্য যে , উমর (রা.) খুলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম একজন , যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন  “আমার সুন্নত আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত অনুসরণ তোমাদের উপর অপরিহার্য , তা মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে রাখবে”।

  হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে তারাবীহ

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা.) এর যুগেও তারাবীর নামায এশার জামা‘আতের পর ২০ রাক‘আত জামা‘আতবদ্ধভাবে পড়া হত। হযরত সায়েব (রা.) এর বর্ণনায় হযরত উমর (রা.) এর খেলাফতকালের অবস্থা বর্ণনার সাথে সাথে হযরত উসমান (রা.) এর যুগের পরিস্থিতিও প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ আছে।

বর্ণনাটি নি¤œরূপ

كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ فِى شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً – قَالَ – وَكَانُوا يَقْرَءُونَ بِالْمِئِينِ ، وَكَانُوا يَتَوَكَّئُونَ عَلَى عِصِيِّهِمْ فِى عَهْدِ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ مِنْ شِدَّةِ الْقِيَامِ.

“তারা (সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীগণ) উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তারা নামাযে ১০০ আয়াত বিশিষ্ট সূরা সমূহ পড়তেন এবং হযরত উসমান (রা.) এর যুগে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাঁরা লাঠিতে ভর করে থাকতেন”।

হযরত সায়েব (রা.) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসটি একাধিক সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইতিপূর্বে বিশ্লেষণ সহকারে আমরা স্ববিস্তারে আলোচনা করেছি।

   হযরত আলী (রা.)-এর যুগে তারাবীহ

ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা.) এর যুগেও তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত চলতো। তিনি ইমামগণকে ২০ রাক‘আত পড়ার আদেশ দিয়েছেন। তাবেয়ী আবূ আব্দুর রহমান আস-সুলামী আলী (রা.) এর ব্যাপারে বলেন

عَنْ عَلِىٍّ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : دَعَا الْقُرَّاءَ فِى رَمَضَانَ ، فَأَمَرَ مِنْهُمْ رَجُلاً يُصَلِّى بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً. قَالَ : وَكَانَ عَلِىٌّ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ يُوتِرُ بِهِمْ.

“ হযরত আলী (রা.) রমযান মাসে কারীগণকে ডাকলেন এবং আদেশ দিলেন, তাঁরা যেন লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়ান। আর বিতর পড়াতেন আলী (রা.) নিজেই”।  বর্ণনাটি হাসান-গ্রহণযোগ্য।

 “অপর এক বর্ণনায় তাবেয়ী আবুল হাসানা (রহ.) বলেন :

: أَنَّ عَلِيًّا أَمَرَ رَجُلاً يُصَلِّي بِهِمْ فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً.

“হযরত আলী (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে রমযানে লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দিলেন”।

   হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর তারাবীহ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক সহচর প্রিয় সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর আমল সম্পর্কে ইমাম মারওয়াযী (রহ.) বর্ণনা করেন

” كان (ابن مسعود ـ رضى الله عنه) يصلى عشرين ركعة ويوتر بثلاثٍ .”

“ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ২০ রাক‘আত তারাবীহ এবং ৩ রাক‘আত বিতর পড়তেন”।

২০ রাক‘আত তারাবীহ রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর সময় থেকে যুগ যুগ ধরে অনবরত চলে আসছে। বিশেষ করে হযরত উমর (রা.) এর খিলাফত কালে তারাবীর নামায জামা‘আতবদ্ধভাবে পড়ার প্রতি গুরুতা¡রোপ করার ফলে পবিত্র মক্কা মদীনা সহ আরব-আজম তথা তামাম পৃথিবীতে মুসলমানদের নিকট এ বিষয়টা ব্যাপক ও সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

কয়েকটি অনির্ভরযোগ্য  বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতীত সর্বত্রই মুসলমানরা ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়তে থাকে বরং এতে সব মুহাজির ও আনসার সাহাবী এবং গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা/ঐক্যমত সংঘটিত হয়।

২০ রাক‘আত তারাবীর ব্যাপারে খুলাফায়ে রাশেদীন এবং অন্য সাহাবীর কোনো  ধরনের আপত্তি কোনো কিতাবে উল্লে¬খ নেই।

পবিত্র মক্কা-মদীনা সহ যুগ যুগ ধরে সর্বত্রই ২০ রাক‘আত তারাবীর নিয়ম চলে আসা-ই এই ইজমার (মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমতের) উজ্জল দলীল বহন করে। তারপরেও সুদৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করার জন্য মুসলিম বিশ্বের বরেণ্য কয়েকজন ইমামের উক্তি নি¤েœ প্রদত্ত হলো-

বিখ্যাত তাবেয়ী, ইমাম আ‘তা বিন আবী রাবাহ (রহ.) বলেন

أدركت الناس وهم يصلون ثلاثا وعشرين ركعة بالوتر .

‘‘ আমি লোকদেরকে (সাহাবী ও তাবেয়ীগণকে) পেয়েছি , তারা বিতর সহ ২৩ রাক‘আত পড়তেন’’

তাবেয়ী, আ‘তা (রহ.) এর উক্ত বর্ণনাটি সহীহ (বিশুদ্ধ) সনদে বর্ণিত। এতে একজন বর্ণনাকারীও দুর্বল নেই । এ ধরনের  বর্ণনা অন্যান্য বড় বড় তাবেয়ীগণ থেকেও রয়েছে।

এ সবকে সামনে রেখে ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) লিখেছেন

“ الصحيح عن ابى بن كعب من غير خلاف من الصحابة و هو”

‘সাহাবী হযরত উবাই বিন কাব (রা.) থেকে এটাই বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত, এতে সাহাবীগণের কোনো মতানৈক্য ছিল না।

 প্রখ্যাত ইমাম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন

” أجمع الصحابة على أن التراويح عشرون ركعة “

“তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত  এর উপর সব সাাহাবায়ে কিরামের ইজমা (সর্ব সম্মত ঐক্যমত) সংঘটিত হয়েছে।

  বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম ক্বাসতালানী (রহ.) লিখেছেন

‘ وقد عدوا ماوقع فى زمن عمر رضى الله تعالى عنه كالإ جماع ’’

‘হযরত উমর (রাঃ) এর যুগের অবস্থা  প্রায় ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্যমত পর্যায়ের।

ইমাম ইবনে কুদামা হাম্বলী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল মুগনীতে লিখেন

“أنه ما فعله عمر رضى الله عنه وأجمع عليه الصحابة رضى الله عنهم فى عصرهم أحق و أولى بالاتباع”

“হযরত উমর (রাঃ) যা করেছেন এবং যে বিষয়ে সব সাহাবায়ে কিরাম ঐ সময়ে ইজমা (সর্বসম্মত ঐক্য) হয়েছেন, তা অনুসরণের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য ও সর্বোত্তম বিষয়”।

    উল্লে¬খ্য যে, ইবনে কুদামা (রহ.) এর উপরোক্ত বক্তব্যে ইজমার গ্রহণযোগ্যতা, বিশেষ করে সাহাবীগণের ইজমা সর্বাপেক্ষা প্রাধান্যযোগ্য ও সর্বোত্তম অনুসরণীয় হওয়ার প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্যের জন্য লেখকের বই ‘মাযহাব মানি কেন’ দেখতে পারেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অভিমত

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতামত ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০ রাক‘আত তারাবীর ব্যাপারে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের ইজমা (সর্বসম্মত ঐক্যমত) হওয়ার বিষয়টা আহলে হাদীস বন্ধুদের আরো হৃদয়গ্রাহী হওয়ার জন্য ইমাম ইবনে তাইমিয়ার একটি উক্তি পুনরায় উল্লেখ করা খুবই জরুরী মনে করি। কারণ তিনি হলেন তাদের সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, আরব বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষক, বরেণ্য সাধক, শাইখুল ইসলাম। তিনি বলেন

” إنه قد ثبت أن أبى بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة فى قيام رمضان و يوتر بثلاثٍ ‘ فرأى كثير من العلماء أن ذلك هو السنة . لأنه أقامه بين المهاجرين و الأنصار- ولم ينكره منكرٌ .”

“এটা অবশ্যই প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) রমযানের তারাবীতে  লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত পড়তেন এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়তেন। তাই অসংখ্য আলেম এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এটিই সুন্নত।

কেননা উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের মধ্যে ২০ রাক‘আত পড়িয়েছেন। আর কোনো একজনও তাতে আপত্তি করেননি”।

  উল্লেখ্য যে, ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর শেষ বাক্যটি সুস্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছে যে, তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত হওয়ার ব্যাপারে সব সাহাবী ও তাবেয়ীগণের ইজমা (সর্বসম্মত ঐক্যমত) ছিল, এতে কারো কোনো আপত্তি ছিল না।

 দেড় হাজার বছরে তারাবীর ইতিহাস

উপরের আলোচনার দ্বারা অবশ্যই সুস্পষ্ট হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হতো। এমনকি তাঁদের একজনেরও কোনো আপত্তি ছিল না। এতে করে পবিত্র মক্কা-মদীনা ও গোটা মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতিও আশা করি সবার উপলব্ধি হয়েছে। কারণ অধিকাংশ সাহাবা পবিত্র মক্কা-মদীনাতেই অবস্থান করতেন। এছাড়া যারা হারামাইন শরীফাইনের বাহিরে অবস্থান করতেন তাঁরাও হারামাইন শরীফাইনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। তাই এ দু’শহরের সাহাবীগণের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো দ্বন্দ্ব হতো না।

অতএব ২০ রাক‘আত তারাবীর ব্যাপারে সাহাবী তাবেয়ী তথা গোটা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহর ইজমা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টা আরো সুস্পষ্ট হওয়ার লক্ষে তদানীন্তন হারামাইন শরীফাইনের (মক্কা-মদীনার) অবস্থাটা প্রিয় পাঠকগণের খিদমতে উপস্থাপন করার প্রয়াস পাবো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা তাবেয়ীনদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত পবিত্র মক্কা শরীফে নিয়মিতভাবে ২০ রাক‘আত তারাবীর নিয়ম চলে আসছে। এক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযী (রহ.) তাঁর নিজস্ব মতামত এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সহ অন্যান্য ইমামগণের মতামত ব্যক্ত করে লিখেন

 وأكثر أهل العلم ما روي عن عمر و علي وغيرهما من أصحاب النبي صلى الله عليه و سلم عشرين ركعة وهو قول الثوري و ابن المبارك و الشافعي وقال الشافعي وهكذا أدركت ببلدنا بمكة يصلون عشرين ركعة.

“অধিকাংশ আলেমগণ তারাবীর রাক‘আত প্রসঙ্গে ঐ মতই পোষণ করেন, যা হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.), এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যান্য সাহাবীগণ থেকে ২০ রাক‘আত বর্ণিত হয়েছে। আর তা ইমাম সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর মত। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন ; “আমি পবিত্র মক্কাবাসীকে ২০ রাক‘আত  তারাবীর নামায পড়তে পেয়েছি”।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) মক্কাবাসীদের আমল সম্পর্কে তাঁর প্রণীত বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম’ এ লিখেন

” و أحبُّ إلیَّ عشرون ‘ لأنه روى عن عمر رضى الله عنه و كذلك يقومون بمكة  ويوترون بثلاثٍ “

“তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়া আমার কাছে পছন্দনীয়। কেননা,

উমর (রা.) থেকে এমনই বর্ণিত আছে। আর মক্কাবাসীগণও তারাবীর নামায এভাবেই আদায় করেন এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়েন”।

বি. দ্র.

আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) ইমাম তিরমিযী ও শাফেয়ী (রহ.) এর বর্ণনা পদ্ধতিতে রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করেছেন। কেননা হযরত উমর(রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত তারাবীহ হতো এ কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে তাঁরা লিখেছেন “رُوى” অর্থাৎ ২০ রাক‘আত বর্ণিত হয়েছে। আর ‘বর্ণিত হয়েছে’ শব্দটা হাদীসের পরিভাষায় দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। অতএব বুঝা গেল তাদের ধারণা মতে উমর (রা.) এর যুগে ২০ রাক‘আত তারাবীহ হতো এ বর্ণনাটি দুর্বল। অন্যথায় এ ক্ষেত্রে তাঁরা “বর্ণিত হয়েছে” না লিখে “বর্ণনা করেছেন” লিখতে পারতেন।

সমাধান   رُوى ‘বর্ণিত হয়েছে’ এধরনের শব্দ হাদীসের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করার জন্য কেউ কেউ ব্যবহার করে থাকেন। তবে এ ক্ষেত্রে ইমাম তিরমিযী ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর অবহেলা রয়েছে। বিশেষত ইমাম তিরমিযী তাঁর কিতাবে অসংখ্য সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রেও এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করেছেন।

প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম সাখাবী, ইমাম নববী, জামালুদ্দীন কাসেমী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, এ ধরনের শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু কিছু মুহাদ্দিস ও ফক্বীহগণের অবহেলা রয়েছে, তাঁরা অনেক সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রেও এ ধরনের শব্দ প্রয়োগ করেছেন। অতএব ‘বর্ণিত হয়েছে’ এমন শব্দ প্রয়োগের ফলে হাদীসটি দুর্বল এমন কোনো ইঙ্গিত এখানে আছে বলার সুযোগ নেই।

মোটকথা, তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়া সাহাবায়ে কিরাম (রা.), পরবর্তী ইমাম ও আলেমগণ এবং মক্কাবাসীগণের আমল ছিল। মক্কা মুর্কারমায় কোনো যুগেই এর কম বা বেশী পড়া হয়েছে  এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় নেই। এ জন্য আজও সেখানে তারাবীর নামায ২০ রাক‘আতই পড়া হচ্ছে।

মদীনা মুনাওয়ারায় তারাবীহ

  এ প্রবন্ধের শুরু থেকেই আলোচনা করে আসছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই মদীনা শরীফে ২০ রাক‘আত তারাবীর সূচনা করেন। যুগ যুগ ধরে দেড় হাজার বছর যাবৎ এ পদ্ধতি চলে আসছে। পনেরশ বছরের ইতিহাসে মদীনা শরীফে ২০ রাক‘আতের কম তারাবীর নামায কেউ পড়েননি।

বরং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর কিছু অতি উৎসাহী মানুষ ৩৬ রাক‘আত তারাবীহ এবং তিন রাক‘আত বিতর সহ ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পড়েছেন। বিস্তারিত দলীল প্রমাণ সহ আলোচনা হয়েছে।

এপরিসরে প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হযরত আব্দুল আযীয বিন রুফাই (রহ.) এর বর্ণনাটি পুনরাবৃত্তি করবো

” كان أبى بن كعب يصلى بالناس فى رمضان بالمدينة عشرين ركعة .”و يوتر بثلاثٍ “

 “হযরত উবাই বিন কা‘ব (রা.) রমযান মাসে লোকদের নিয়ে মদীনাতে ২০ রাক‘আত তারাবীহ এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়তেন”।

শায়খ আতিয়্যা সালিম মাদানী (রহ.) এর অভিমত

আরব বিশ্বের প্রখ্যাত আলেম, মদীনা শরীফের মাহকামার অন্যতম বিচারপতি, মসজিদে নববীর সুদীর্ঘকালের স্বনামধন্য উস্তাদ শায়খ আতিয়্যা মুহাম্মদ সালিম (রহ.)। মসজিদে নববীতে তাঁর দরসে আরবের বড় বড় শায়খ, বিজ্ঞ আলেম ও ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও ছাত্ররাও বসতেন। আমি নিজেও ১৯৯৬ ইং থেকে ২০০০ ইং পর্যন্ত  অনেক দিন তাঁর দরসে বসেছি। রমযান মাসে তিনি তারাবীর নামাযের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতেন।

এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা ও তথ্যবহুল একটি কিতাবও তিনি লিখেছেন। গোটা জীবন তিনি মদীনায় অবস্থান করেছেন। তিনি মদীনার কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তিনি মদীনার সেই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে নববীতে সুদীর্ঘকালের উস্তাদ ছিলেন, তাই  ঐ মসজিদে  তারাবীর নামাযের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর লেখা তথ্যাবলী বেশী নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এ জন্য তাঁর উল্লেখিত কিতাবটি থেকে আংশিক আলোকপাত করবো।

তিনি তাঁর কিতাবের ভূমিকায় কিতাবটি লেখার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন  “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে তারাবীর নামায চলতে থাকে আর ওদিকে কিছু লোক ৮ রাক‘আত পড়ে নামায সমাপ্ত করে দেয়। তাদের ধারণা, তারাবীর নামায ৮ রাক‘আত পড়া উচিত, এর বেশী বৈধ নয়। এ ভাবে ঐ লোকগুলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে অবশিষ্ট নামাযের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকে। তাদের অশুভ নসীব দেখে মনে দুঃখ হয় ! তাই আমি এই কিতাব লেখার ইচ্ছা করেছি, যাতে তাদের সন্দেহ-সংশয় দূর হয়ে যায় এবং ২০রাক‘আত তারাবীহ পড়ার তাওফীক হয়।

আর যে সব গোড়া ধরনের লোক ইদানীং মসজিদে নববী থেকে ইশার নামায পড়েই বের হয়ে যায় যে, অন্যত্র কোনো মসজিদে গিয়ে ৮ রাক‘আত তারাবীহ পড়বে, তাদেরকে শুধু এটুকু বলে দেয়াই যথেষ্ট যে, মসজিদ থেকে বের হয়ে না তোমরা ওই হাদীসের উপর আমল করলে – যে হাদীসে ঘরে যেয়ে নফল নামায পড়ার ফযীলত উল্লিখিত হয়েছে। আর না তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে তারাবীহ পড়ার ফযীলত লাভ করলে, যে মসজিদে এক রাক‘আত নামায পড়া অন্যত্র এক হাজার রাক‘আত নামায পড়ার চেয়েও উত্তম।  অপর বর্ণনায় ৫০ হাজার রাক‘আতের চেয়েও উত্তম”।

      মদীনার অধিবাসী শায়খ আতিয়্যা সালিম তাঁর উল্লিখিত গ্রন্থে প্রতি শতাব্দীতে তারাবীর অবস্থা পৃথক পৃথকভাবে বিস্তারিত লিখেছেন। নি¤েœ অতি সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

 শায়খ আতিয়্যা সালিম (রহ.) লিখেন, দলীল প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছি, সারকথা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূণ্য যুগে এবং তাঁর পরেও সাহাবায়ে কিরাম ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়েছেন। (এর কম কেউ পড়েছে, ইতিহাসে এমন কোনো প্রমাণ নেই) বরং দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে কিছু অতি উৎসাহী লোক ৩৬ রাক‘আত তারাবীহ এবং তিন রাক‘আত বিতর মিলে ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পড়েছেন।

 হিজরী চতুথর্, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে তারাবীহ

এ শতাব্দীগুলোতে তারাবীর অবস্থা সম্পর্কে তিনি লিখেন

” عادت التراويح فى تلك الفترة كلها إلى عشرين ركعة فقط ‘بدلا من ست و ثلاثين .”

“ এই তিন শতাব্দীতে সবাই ৩৬ (ছত্রিশ) এর পরিবর্তে শুধু ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়তে থাকে”।

হিজরী অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তারাবীহ

এসম্পর্কে শায়খ লিখেন

” فكان يصلى التراويح أوَّل الليل بعشرين ركعة على المعتاد ‘ ثم يقوم  آخر الليل فى المسجد بست عشرة ركعة .”

“এযুগে প্রথম রাতে যথারীতি পূর্বের ন্যায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হতো। আর শেষ রাতে তখন ১৬ রাক‘আত পড়া হতো”।

শায়খ আতিয়্যা সালিম লিখেন :

” دخل القرن الرابع عشرو التراويح فى المسجد النبوى على ما هى عليه  من قبل .”

“চৌদ্দশ শতাব্দী শুরু হলো, মসজিদে নববীতে তখনো পূর্বের মতই চলতে থাকে”।

তিনি আরো লিখেন, এই শতাব্দীতেই সৌদি আরবের রাজত্ব পূর্ণ  প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাদের এই সুদীর্ঘ শাসনামলেও তারাবীর নামায যথারীতি ২০ রাক‘আতই  চলতে থাকে।

শায়খের ভাষ্য হলো নি¤œ রূপ

” ثم جاء العهدالسعودى‘ فتوحدت فيه الجماعة فى المسجد النبوى وفى المسجد الحرام للصلوات الخمس وللتراويح ، و عادت حالة الإمامة إلى أصلها موحدة متنظمة . أما عدد الركعات وكيفية الصلاة فكانت عشرين ركعة بعد العشاء ، و ثلاثا وترا ؛ فتكون التراويح قد استقر ت على عشرين ركعة على ما يدل عليه العمل فى جميع البلاد.”

“এ শতাব্দীতে সৌদি শাসনামলের সূচনা হয়, তখন মক্কা ও মদীনায় পাঁচ ওয়াক্তের নামায ও তারাবীর নামাযের ব্যবস্থাপনা অধিক সুসংহত এবং বিভিন্ন সময়ে জামা’আত পড়ার পরিবর্তে একই ইমামের পিছনে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে তারাবীর রাক‘আত সংখ্যা ও নামাযের পদ্ধতি পূর্বের ন্যায় ইশার পর ২০ রাক‘আত তারাবীহ ও ৩ রাক‘আত বিতর চলতে থাকে।

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত হওয়া ছিল সর্ব যুগের চিরমীমাংসিত একটি বিষয়, সে জন্য সব ভূখন্ডেই এ নিয়ম চালু হয়”।

মসজিদে নববীতে নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে শায়খ আরো সুস্পষ্টভাবে লিখেন

” يبدأ فضيلة الشيخ عبدالعزيز ، فيصلى عشر ركعات ٍ فى خمس تسليماتٍ ،… ثم يبدأها فضيلة الشيخ عبد المجيد فى العشر ركعات ٍأخرى مباشرة ، يصليها بخمس تسليماتٍ … فيكون العشرون ركعةً كاملةً بجزءٍ كاملٍ.”

“প্রথমে (মসজিদে নববীর তদানীন্তন ইমাম) শায়খ আব্দুল আযীয (রহ.) নামায শুরু করতেন। তিনি পাঁচ সালামে দশ রাক‘আত পড়াতেন। অতঃপর (অপর ইমাম) শায়খ আব্দুল মাজীদ (রহ.) পাঁচ সালামে দশ রাক‘আত পড়াতেন। এভাবে ২০ রাক‘আত পূর্ণ হতো এবং পূর্ণ এক পারা কুরআন পড়া হতো”।

শায়খ আতিয়্যা সালিমের অনুরোধ

উপরোক্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনার পর শায়খ আতিয়্যা সালিম (রহ.) লিখেন

” و فى نهاية هذا العرض التاريخى نستوقف القارئ الكريم نتسائل معه ؛ هل وجد التراويح عبر التاريخ الطويل أكثر من ألف عام فى مسجد النبى       – صلى الله عليه و سلم- منذ نشئتها إلى اليوم قد اقتصرت على ثمان ركعات أو قلت عن العشرين ركعة ؟ أم أنها أربعة عشر قرنا و هى على هذا الحال ما بين العشرين و الأربعين ، وهل سمع قولا ممن  تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ أو الذين سبقونا بالإيمان ؛ و لو من شخص واحد يقول : لا تجوز الزيادة على الثمان ركعات أخذا بحديث عائشة رضى الله عنها … و إذا لم يوجد طيلة َتلك المدة من يقول : لا تجوز الزيادة على الثمان ركعات ‘ و لا وجدَ طيلةَ هذه المدة من يقتصر على ثمان ركعات فى مسجد رسول الله – صلى الله عليه و سلم- جماعة ؛ فإن أقل ما يقال لهولاء الذين لا يرون جواز الزيادة على الثمان ركعات ‘ ولا يقتصرون على أنفسهم فيما ارتأوه بل يدعون غيرهم إليه ؛ فيقال لهم : إن إتباع الأمة من عهد الخلفاء الراشدين إلى اليوم ، و موافقة الجماعة من الصدر الأول إلى هذا العهد خير من المخالفة ، خصوصا من يصلى فى المسجد و مع الإمام.”

“উপরোক্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনার পর পাঠকদের খেদমতে আমার জিজ্ঞাসা, মসজিদে নববী (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদ)  প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাজার বছরেরও বেশী ইতিহাসে কখনো কি এতে তারাবীর নামায কোনো দিন ৮ রাক‘আত পড়া হয়েছে ? অথবা ২০ রাক‘আতের কম কি পড়া হয়েছে ? বরং চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস এ কথাই সাক্ষ্য দেয় যে, তারাবীর নামায সর্বদা ২০ রাক‘আত বা আরো বেশী পড়া হয়েছে।

আমি আরো জানতে চাই, কোনে া মুহাজির বা আনসার সাহাবী বা যারা সর্ব প্রথম ঈমান এনেছিলেন, তাঁদের কোনো একজনও কি বলেছেন যে , ৮ রাক‘আতের বেশী তারাবীহ পড়া জায়েয হবে না ? তাঁদের কোনো একজনও কি আয়েশা (রা.) এর হাদীসকে ৮ রাক‘আত তারাবীর পক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন ? যখন এই দীর্ঘকালে একজন মাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিও এমন পাওয়া যায় না, যিনি বলেছেন তারাবীর নামায ৮ রাক‘আতের বেশী পড়া জায়েয নয়, আর না কেউ বলেছেন এই দীর্ঘসময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে কোনো দিন জামা‘আতে ৮ রাক‘আত পড়া হয়েছে। তারপরেও যারা ৮ রাক‘আত নিয়েই অটল আছেন এবং অন্যদেরকে সেদিকে দাওয়াত দিচ্ছেন, তাদেরকে আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের তথা ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকল মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিক আমলের বিরোধিতা করার চেয়ে অনুসরণ করাই অধিক শ্রেষ্ঠ। বিশেষ করে যিনি মসজিদে ইমামের পিছনে জামা‘আতে তারাবীহ পড়বেন”।

১৯৯৬ইং মুতাবেক ১৪১৬ হিজরিতে আমি মদীনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছি। কয়েক মাস পরই আসে পবিত্র রমযান মাস। আছরের সময়ই পৌঁছে যেতাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে। তারাবীহ খতম করে ফেরত আসতাম ইউনিভার্সিটিতে। সময় সুযোগে মক্কা শরীফ যাওয়ার তাওফীক হতো।

প্রথম রমযানের কথা, ইশার নামায পড়ালেন মসজিদে নববীর প্রধান ইমাম শায়খ আব্দুর রহমান আল-হুযাইফী। তিনি মদীনা ইউনিভার্সিটিরও উস্তাদ। ইশার নামায শেষে দু’ রাক‘আত সুন্নত পড়েই শুরু করলেন তারাবীর নামায। দু’ রাক‘আত দু’ রাক‘আত করে পাঁচ সালামে তিনি দশ রাক‘আত সমাপ্ত করলেন। এরপর মধুর কন্ঠস্বর ইমাম সুবাইতী সাহেব এভাবেই অবশিষ্ট দশ রাক‘আত পড়ালেন।

ই‘তেকাফ করার নিয়্যতে ১৯ রমযান যাই মক্কা শরীফে। ইশার পূর্বক্ষণে পৌঁছি সেখানে। ততক্ষণে মক্কা শরীফের প্রসিদ্ধ ইমাম শুরাইম সাহেব ইশার নামায শুরু করেন মাত্র। ইশার পর সুললিত কন্ঠে তিনি তারাবীর প্রথম দশ রাক‘আত পড়ান। এরপর সামনে আসেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী তিলাওয়াতের অধিকারী, জনপ্রিয় ইমাম সুদাইসি সাহেব। তিনি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী তিলাওয়াতের মাধ্যমে অবশিষ্ট দশ রাক‘আত পূর্ণ করেন। সুদীর্ঘ চারটি বছর মক্কা মদীনায় এভাবেই তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়তে নিজ চোখে দেখেছি। মাঝে মধ্যে মদীনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মসজিদেও তারাবীহ পড়েছি। এতেও ২০ রাক‘আতই পড়া হতো।

পবিত্র মক্কা মদীনা বা সৌদি আরবের কোনো মসজিদে তখন ২০ রাক‘আতের কম তারাবীহ পড়া হতো-তা আমি কোথাও দেখিনি। হ্যাঁ, আমি দেখেছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মসজিদে ও আল্ল¬াহর ঘরে অতি নগন্য সংখ্যক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও যুবক শ্রেণী ৮ রাক‘আত নামায পড়ার পর নামাযীদের সামনে দিয়ে ও ঘাড়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বের হয়ে যায়। ঐ কপাল পোড়া ও হতভাগাদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই শায়খ আতিয়্যা সালিম তারাবীর নামাযের ঐতিহাসিক বইটি লিখেছিলেন। এর উদ্ধৃতি আমরা ইতি পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

উল্লেখ্য যে, কোনো বয়স্ক মুরব্বী এবং কোনো একজন আলেমকে কোনো দিন ৮ রাক‘আত পড়ে চলে যেতে আমি দেখি নাই। বরং মক্কা মদীনার বিজ্ঞ শায়খ এবং মক্কা ইউনিভার্সিটি ও মদীনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির কতিপয় বিচক্ষণ প্রফেসরগণের মুখের বাণী শুনেছি, “৮ রাক‘আত তারাবীর মতবাদ আমার বাপ-দাদার কাছে শুনি নাই, ছোট বেলায় শুনি নাই, যুবক বয়সে শুনি নাই ইদানীং তা শুনা যাচ্ছে এবং কিছু বাচ্চা ও যুবককে এর প্রতি অতি উৎসাহী ও উদ্যমী দেখা যাচ্ছে”।

বস্তুত প্রকৃত বিষয়টা এমনই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবী তাবেয়ী ও আইম্মায়ে মুজতাহিদগণের আমল আর পনেরশত বছরের ইতিহাসে “৮ রাক‘আত তারাবীর” কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই   আল্ল-ামা আতিয়্যা সালিম (রহ.) লিখেছেন

أن اتباع الأمة من عهد الخلفاء الراشدين إلى اليوم  و موافقة الجماعة من الصدرالأول إلى هذا العهد خير من المخالفة

‘‘খুলাফায়ে রাশেদীনের তথা ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম  উম্মাহর ধারাবাহিক আমলের বিরোধিতা করার চেয়ে তাদের অনুসরণ করাই শ্রেষ্ঠ”।

এ পরিসরে বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য, যারা সৌদি আরবের অনুসরণ করে বলে দাবি করে তাদেরও চিন্তা করার সময় এসেছে। সৌদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের প্রাণ কেন্দ্র পবিত্র মক্কা মদীনা এবং গোটা আরব দেশে ২০ রাক‘আত তারাবীহ হচ্ছে।

সৌদি আরবের বিজ্ঞ আলিম, মুফতী, কাযী প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতী আব্দুল্ল¬াহ বিন বায ও বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতী আব্দুল আযীয সহ (বিচিত্র কয়েকজন ব্যতীত) সবাই তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়েন।

পরিশেষে আমি তাদেরকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি, আপনারা আরো চিন্তা করুন ! যে কোনো সাধারণ মসজিদে জামাআতে নামায পড়লে এক রাক‘আতে ২৭ গুণ , মসজিদে নববীতে ৫০ হাজার গুণ, এবং আল্লাহর ঘরে এক রাক‘আতে হয় একলক্ষ রাক‘আত পড়ার সমতুল্য সওয়াব। আর রমজান মাসে সবই বৃদ্ধি পায় ৭০ গুণে। সুতরাং যারা মুসলমানদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করে মসজিদ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তারা কতো লক্ষ কোটি গুণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ! ?

তাই আসুন ! বাড়াবাড়ি ছেড়ে দেই, মতভেদ ভুলে যাই, মুসলমান পরস্পরকে বুঝতে চেষ্টা করি, ভাই ভাই হয়ে যাই, প্রতিহিংসা ছুড়ে ফেলি আস্তাকুড়ে। মতানৈক্য আপন গন্ডিতে রাখি, যেসব বিষয়ে মিল আছে সেগুলো আপন হয়ে এগিয়ে নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শকে আঁকড়ে ধরি মজবুত করে, প্রমাণ করি আমরা সত্যিকার মুসলমান।

আট রাক‘আত তারাবীহ প্রসঙ্গে কিছু কথা

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্র্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তারাবীর  নামায ২০ রাক‘আত পড়ে আসছে। হাদীস শরীফ ও সাহাবী তাবেয়ীগণের আমল ও উক্তির আলোকে যুগ যুগ ধরে নির্ভরযোগ্য ইমামগণ ও উলামায়ে কিরামের মত হলো  তারাবীর নামায ২০ রাক‘আত পড়া সুন্নত। তবে অনিবার্য অপরাগতাহেতু এর কম পড়ার অনুমতি আছে।

সাম্প্রতিককালে বিচিত্র একশ্রেণীর কিছু লোক ভিন্ন একটি মতবাদ রচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দাবি হলো  তারাবীর নামায হবে অনুর্ধ্ব আট রাক‘আত। তারাবীর নামায ৮ রাক‘আতের বেশী পড়া বিদআ’ত, নাজায়েয ও গুনাহের কাজ ইত্যাদি।

বলাবাহুল্য, এ মতবাদটি স¤পূর্ণ তাদের মনগড়াভাবে রচিত। তাদের অলসতা আর অবহেলাই এর পেছনে কাজ করছে। এদের মনোবাঞ্ছনাই এই মতবাদের একমাত্র ভিত্তি। তথাকথিত নতুন গবেষকদের চিন্তা প্রসূত  একটি সিদ্ধান্তকে শরীয়তে রূপান্তর করার জন্য তারা কয়েকটি অপ্রাসঙ্গিক অথবা দুর্বল ত্রুটিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন হাদীস পেশ করে। অনুসন্ধিৎসু সচেতন পাঠক মহল এগুলোর সঠিক সমাধান ও যথাযথ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জানতে চায়। তাই একে একে তাদের সব কটি সংশয়ের নিরসন করার প্রয়াস পাবো।

তারাবীর নামায ৮ রাক‘আত প্রমাণ করার জন্য উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি অপ্রাসঙ্গিক হাদীস তারা উল্লেখ করে থাকে। হাদীসটি হলো

عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ : أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا كَيْفَ كَانَتْ صَلَاةُ رَسُولِ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- فِي رَمَضَانَ فَقَالَتْ مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ  – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلَا فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلَا تَسَأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلَا تَسَأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّي ثَلَاثًا.”

“হযরত আবু সালামা (রা.) বলেন যে, তিনি হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেছেন, রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর নামায কেমন হত? আয়েশা (রা.) উত্তরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে এবং রমযান ছাড়া অন্য মাসেও এগারো রাক‘আতের বেশী পড়তেন না । তিনি চার রাক‘আত নামায এমনভাবে পড়তেন যে এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এরপর আরো চার রাক‘আত এমনভাবে পড়তেন যে এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এরপর তিনি তিন রাক‘আত নামায পড়তেন।

উল্লিখিত হাদীসটি বুখারী শরীফ সহ হাদীসের নির্ভরযোগ্য সব কিতাবেই লিপিবদ্ধ আছে। এই হাদীসটি আহলে হাদীস বন্ধুদের একটি বড় খুঁটি, তাদের একমাত্র সহীহ হাদীস।

 কিন্তু তারাবীর ক্ষেত্রে এই হাদীসটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। এতে তারাবীহ সস্পর্কীয় কোনো আলোচনা আদৌ নেই। অতএব এই হাদীসের আলোকে তারাবীর নামায কতো রাক‘আত হবে তা প্রমাণ করার কোনো অবকাশ নেই। নি¤েœ এর কয়েকটি তথ্য উপস্থাপন করা হলোÑ

এক. উপরোক্ত হাদীসেই উল্লেখ আছে যে, এতে তারাবীহ বিষয়ক কোনো আলোচনা নেই। কারণ এর ভাষ্য হলো রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে এবং রমযান ছাড়া অন্য মাসেও ১১রাক‘আতের বেশী পড়তেন না। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, এই হাদীসে এমন নামাযের কথা বলা হয়েছে , যা রমযান ছাড়া অন্য মাসেও পড়া হয়। অথচ আমরা জানি তারাবীর নামায শুধু রমযান মাসেই পড়া হয়। অতএব হাদীসে তারাবীহ ব্যতীত অন্য কোনো নামাযের বর্ণনা করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, তা হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামায। বস্তুত আয়েশা (রা.)  থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে আছে রাসূল  সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযানের শেষ দশকে অন্য সময়ের তুলনায় বেশী পরিশ্রম করতেন।  এ থেকে প্রশ্ন জাগে, রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে তাহাজ্জুদ নামায হয়তো বেশী রাক‘আত পড়তেন। আয়েশা (রা.) জানিয়ে দিলেন যে, রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসেও তাহাজ্জুদ নামায স্বাভাবিক ৮ রাক‘আতের বেশী পড়তেন না।

 দুই. আয়েশা (রা.)এর উল্লিখিত হাদীসের বর্ণনা  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম প্রথমে চার রাক‘আত পড়েছেন। এরপর চার রাক‘আত পড়েছেন।

লা-মাযহাবী ভাইদের ইমাম মুবারকপুরী (রহ.) ও আলবানী লিখেছেন রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম চার রাক‘আত নামায এক সালামে পড়েছিলেন।  সুতরাং বলতে হবে এই নামায অবশ্যই এমন নামায যা এক সালামে চার রাক‘আত করে পড়া হয়। আর তা হলো, তাহাজ্জুদ নামায। আর তারাবীর নামায তো লা-মাযহাবী ভাইয়েরাও দুই দুই রাক‘আত করেই আদায় করেন। মক্কা মদীনাসহ সব স্থানইে দুই দুই রাক‘আত করে আদায় করা হয়।

তাহাজ্জুদ নামায দু’ রাক‘আত অথবা চার রাক‘আত করে আদায় করা যায়। কিন্তু তারাবীর নামায তো সর্ব সম্মতিক্রমে দুই রাক‘আত করেই আদায় করা হয়। অতএব এই হাদীসে তারাবীর কোনো আলোচনাই নেই। আর যদি আপনারা গায়ের জোরে বলেন, এই হাদীসে তারাবীরই বিবরণ এসেছে- তাহলে আপনাদেরকে বলতে হবে, কেন আপনারা তারাবীর নামায দুই রাক‘আত করে পড়েন ?   আপনারাই তো  এ হাদীসের বর্ণনা মতো আমল করেননি, অন্যদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন কোন যুক্তিতে ? (!)

 তিন. এই হাদীসের বর্ণনাকারী আয়েশা (রা.) নিজেও কোনো দিন মনে করেননি যে, এতে ৮ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার কোনো ইঙ্গিত আছে অথবা আট রাক‘আতের বেশী পড়া যাবে না। কেননা, মসজিদে নববীতে আয়েশা (রা.) এর কামরার পার্শ্বে তাঁর জীবদ্দশায় সুদীর্ঘ ৪০টি বছরেরও বেশী কাল যাবৎ সাহাবী তাবেয়ীগণ তারাবীর নামায বিশ রাক‘আত পড়েছেন। যা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন ও নিজ কানে শুনেছেন। কিন্তু তিনি এর কোনো  প্রতিবাদও করেননি। এই হাদীসের আলোকে ৮ রাক‘আতের বেশী পড়া নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো  প্রমাণ থাকলে তিনি কখনো চুপ থাকতেন না। তিনি এর কোনো  প্রতিবাদ  করেছেন, দুনিয়াজুড়ে এমন কোনো  প্রমাণ নেই।

চার. এই হাদীসের মর্ম যদি সত্যিই এমন হতো যে, তারাবীর নামায আট রাক‘আতই পড়তে হবে তাহলে সাহাবী ও তাবেয়ীগণই সর্বপ্রথম এর মর্ম অনুধাবন করতেন এবং এ অনুযায়ী আমল করতেন। কিন্তু তাঁদের কেউ এই হাদীসকে ৮ রাক‘আত তারাবীর দলীল হিসেবে পেশ করেছেন বা এ অনুযায়ী আমল করেছেন এমন কোনো  প্রমাণ নেই।

পাঁচ. এই হাদীসটি যদি বাস্তবেই তারাবীহ বিষয়ক হতো তাহলে যুগে যুগে মুজতাহিদ ইমামগণের কেউ না কেউ তা গ্রহণ করতেন এবং এ অনুযায়ী আমল করতেন। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা,মালেক, শাফেয়ী, আহমদ এবং আহলে হাদীস ভাইদের মান্যবর ইমাম দাউদে যাহেরী, ইবনে হাযাম ও ইবনে তাইমিয়া কেউই বলেননি যে, উপরোক্ত হাদীসে তারাবীর নামায ৮ রাক‘আত পড়তে বলা হয়েছে। বরং এতে তারাবীর কোনো  প্রসঙ্গই নেই। এতে আছে তাহাজ্জুদ নামাযের বর্ণনা। তাইতো ইমাম সুয়ূতী রহ. লিখেছেন

“إن العلماء اختلفوا فى عددها  ولو ثبت ذلك من فعل النبى – صلى الله عليه وسلم- لم يختلف فيه.”

“উলামায়ে কিরাম তারাবীর রাক‘আত সস্পর্কে মতানৈক্য করেছেন, যদি (আয়েশা (রা.) এর হাদীসের মতো ) সহীহ হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর আমল দ্বারা প্রমাণ হতো তাহলে এতে কোনো  মতভেদ হতো না।

ছয়. আরবের বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের কর্মধারা ও মতামত ইতিপূর্বে স্ববিস্তারে আলোচনা করেছি । আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত বুখারী শরীফের উল্লিখিত হাদীসটি তাঁদের সামনে আছে। কিন্তু তারা কখনো বলেন না যে, এতে ৮ রাক‘আত তারাবীহ পড়তে বলেছে এবং ৮ রাক‘আতের বেশী পড়া যাবে না । বরং সৌদি আরবের অধিবাসী ড. শায়খ মুহাম্মদ ইলিয়াস ফয়সাল ও মসজিদে নববীর সুদীর্ঘকালের উস্তাদ , বিচারপতি শায়খ আতিয়্যা মুহাম্মদ সালিম প্রমুখ গ্র্যান্ড আলিমগণ এই নতুন মতবাদকে দাফন করার জন্য পুস্তক রচনা করেছেন । নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন চরমভাবে । সে দেশের প্রাক্তন ও বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতী, উলামায়ে কিরামের স্থায়ী বোর্ডের সদস্যবৃন্দ ২০ রাক‘আত তারাবীর মতাদর্শকেই আঁকড়ে ধরেছেন।

পবিত্র হারামাইন শরীফাইন (মক্কা মদীনা) সহ গোটা আরবে ২০ রাক‘আত তারাবীহ চলে আসছে। সুতরাং আয়েশা (রা.)এর হাদীসে ৮ রাক‘আত তারাবীহ প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা আছে বলে মনে করে না। বরং এর প্রসঙ্গ অন্য বিষয় । বলাবাহুল্য তা হলো তাহাজ্জুদ নামায। তাইতো তাঁরা ইশার নামাযের পর ২০ রাক‘আত তারাবীহ এবং শেষ রাতে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ আদায় করেন। এ থেকে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হলো যে, তাঁদের নিকট তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক নামায নয়। তাই বলে, তারাবীহ এক সময়ে এবং তাহাজ্জুদ অন্য সময়ে পড়েন

যে সব আহলে হাদীস ভাইয়েরা তারাবীহ ও তাহাজ্জুদকে একই নামায বলেন। উপরোক্ত আলোচনা থেকে তাদেরকেও শিক্ষা নিতে হবে । আমি তাদের বিভ্রান্তি মূলক ও স্ববিরোধী বক্তব্য শুনে খুবই বিস্মিত হই।

তারা  এক দিকে বলছে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই নামাযের দুই নাম মাত্র। ১১ মাসে যা তাহাজ্জুদ হিসেবে পড়া হয়, রমযান মাসে এরই নাম হয় তারাবীহ।  অপর দিকে বলে ৮ রাক‘আতের বেশী তারাবীহ পড়া বিদআত, না জায়েয ইত্যাদি । অথচ বুখারী ও মুসলিম শরীফের সহীহ হাদীসের আলোকে তাহাজ্জুদ নামায যতো রাক‘আত  ইচ্ছা পড়া যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম কে রাতের নামায সস্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন  مَثْنَى مَثْنَى فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمْ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى

“দুই রাক‘আত, দুই রাক‘আত করে পড়ো ,সুবহে সাদেকের পূর্বে বিত্র পড়তে আশনকা হলে শেষ দু’রাক‘আতের সঙ্গে আরো এক রাক’আত পড়ো , যা বিতর নামাযে পরিণত হবে”।

সৌদি আরবের মান্যবর আলেম ,স্থায়ী উলামা পরিষদের নায়েব, শায়খ মুহাম্মদ ছালেহ ইবনে উছাইমীন উপরোক্ত হাদীসের আলোকে লিখেছেন

” وإن زاد على إحدى عشرة فلا حرج.”

“আট রাক‘আত অথবা বিতরসহ এগারো রাক‘আতের বেশী পড়াতে কোনো অসুবিধা নেই”।

সহীহ বুখারী শরীফের বর্ণনায় আয়েশা (রা.)বলেন, রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর রাতের নামায সাত, নয় এবং এগারো রাক‘আত হতো ফজরের সুন্নত ব্যতীত।

 বুখারী শরীফের অপর বর্ণনায় আছে রাসুল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রাতে ফজরের সুন্নত ব্যতীতই ১৩ রাক‘আত পড়তেন।

অন্য হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম ইরশাদ করেন, তোমরা (তাহাজ্জুদ) ও বিতর পাঁচ রাক‘আত পড়, সাত রাক‘আত পড়, নয় রাক‘আত পড়, এগারো রাক‘আত পড় কিংবা তার চেয়ে বেশী পড়।

     হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রাতে ১৭ রাক‘আত তাহাজ্জুদ পড়তেন।

ইমাম বুখারী (রহ.) তিনি নিজেও প্রথম রাতে তারাবীহ এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তেন।

অতএব যারা বলেন তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই নামাযের দুই নাম, তারা এসব ক্ষেত্রে কি বলবেন?

বলাবাহুল্য, তাদের স্ববিরোধী বক্তব্য ‘তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক‘তা পরিহার করতে হবে। বলতে হবে তাহাজ্জুদ যতো রাক‘আত ইচ্ছা পড়া যাবে। আর তারাবীহ ২০ রাক‘আত পড়া সুন্নত। অপারগতাবশত কমও পড়া যাবে।

প্রিয় পাঠকগণ!

আমার সুদীর্ঘ আলোচনার সারমর্ম মাত্র কয়েকটি শব্দ, তা হলো আয়েশা (রা) এর পূর্বোল্লিখিত হাদীস রাসূহুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযানে বা রমযান ছাড়া ৮ রাক‘আতের বেশী নামায রাতে পড়তেন না। এতে তারাবীহ প্রসঙ্গে কোনো নির্দেশনা নেই; বরং এতে তাহাজ্জুদের নামাযের নির্দেশনা আছে । তারপরেও যদি কেউ গায়ের জোরে বলে এতে তারাবীর নামায সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে এবং এই হাদীসের আলোকে ৮ রাক’আতের বেশী তারাবীহ  পড়া যাবে না, তাদের জন্য উলামায়ে কিরামের আরো একটি সমাধান নি¤েœ পেশ করছি ।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসটির বর্ণনা গড়মিল- ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। উপরের বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল-াম ১১ রাক‘আতের বেশী পড়তেন না।

বুখারী শরীফের অপর বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রাতে ১৩ রাক‘আত নামায পড়তেন । অতঃপর ফজরের আযানের পর দুই রাক‘আত পড়তেন।

আহলে হাদীস ভাইদের মান্যবর ইমাম মুবারকপুরী (রহ.) লিখেন

” أنه قد ثبت أن رسول الله- صلى الله عليه و سلم – كان قد يصلى ثلاث عشرة ركعة سوى ركعتى الفجر .”

“রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, তিনি ফজরের সুন্নত ব্যতীতই ১৩ রাক‘আত নামায পড়তেন।”

বুখারী শরীফেরই অপর বর্ণনামতে আয়েশা (রা) বলেন

” سبع و تسع وإحدى عشرة سوى ركعتى الفجر .”

“রাসূল সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম ফজরের সুন্নত ব্যতীত রাতে সাত রাক‘আত, নয় রাক‘আত, এগার রাক‘আত নামায পড়তেন।”

আয়েশা (রা.) এর সব কটি বর্ণনা বুখারী শরীফ থেকে উদ্ধৃত। বুখারী শরীফের নাম শুনলেই আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুরা লুফে নেয়, এতে নাক গলানোর চেষ্টা করে না। কিন্তু আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এসব গড়মিল হাদীসগুলোকে মিল দিয়ে ৮ রাক‘আত তারাবীহ প্রমাণ করার জন্য তারা অসামান্য অসাধুতা ও চরম খেয়ানতের আশ্রয় নিয়েছে। অথচ যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম বলে আসছেন এই গড়মিল (اضطراب) বর্ণনা কোনো ক্ষেত্রেই প্রমাণযোগ্য নয়।

      তাই এ বর্ণনার দ্বারা তারাবীর নামায আট রাক‘আত এমনকি কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যাই প্রমাণ করার সুযোগ নেই। তবে এটুকু বলার অবকাশ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রাতের নামায (তাহাজ্জুদ ) কম বেশী পড়তেন। বিশেষত শরীর ক্লান্ত হলে তখন কম পড়তেন।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন

“اشكلت روايات عائشة على كثير من أهل العلم حتى نسب بعضهم حديثها إلى الاضطراب”.

“হযরত আয়েশা (রা) এর উক্ত বর্ণনাতে অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিধায় তাঁদের কেউ কেউ এ হাদীসটিকে ”ইজতিরাব” গড়মিল বর্ণনা বলে অভিহিত করেছেন।”

ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) লিখেছেন,

 ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন

“والصواب أن كل شيء ذكرته من ذلك محمول على أوقات متعددة وأحوال مختلفة بحسب النشاط وبيان الجواز”.

“আসল কথা হলো, আয়েশা (রা.) এর ভিন্ন ভিন্ন (কম বেশী) বর্ণনা থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম সময় ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মনের প্রসন্নতার উপর নির্ভর করে কখনো বেশী কখনো কম পড়তেন। এছাড়া কম পড়ারও যে অনুমতি আছে তা বুঝানোর জন্য কখনো কম পড়তেন।

  এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধান পেশ করেছেন উপমহাদেশের শীর্ষ হাদীস বিশারদ-                                                                                          আল্লামা আব্দুল হাই লাক্ষেèৗভী (রহ:)। তিনি লিখেন

” فمن ظن آخذا من حديث عائشة المذكور ههنا ‘ أن الزيادة على إحدى عشرة بدعة ؛ فقد ابتدع أمرا ليس من الدين.”

“যারা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসটি গ্রহণ করে মনে করে যে, এগারো রাক‘আতের বেশী পড়া বিদআত, তারা নিজেরাই একটি বিদআত সৃষ্টি করলো ,যা ইসলাম ধর্মে নেই”।

উপরোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে আহলে হাদীস আলিমগণের মতামত ভারত বর্ষে

আহলে হাদীস দলের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিম নবাব ছিদ্দীক হাসান খান (রহ) লিখেছেন

” يعلم من حديث كان رسول الله – صلى الله عليه و سلم- يجتهد فى رمضان ما لا يجتهد فى غيره – رواه مسلم ، أن عددها كثير .”

“মুসলিম শরীফে বর্ণিত সহীহ হাদীসের দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্ল¬াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম রমযান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় মুজাহাদা অনেক বেশী করতেন, এতে বুঝা যায় রমযানে তাঁর নামাযের রাক’আত সংখ্যাও বেশী হতো।

 তিনি অন্যত্র লিখেছেন

” بس آئى بزيادت عامل بسنۃ ہم باَشدْ .”

“আট রাক‘আতের বেশী তারাবীহ আদায়কারীও সুন্নতের উপর আমলকারী হিসেবে গণ্য হবে।”

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার উক্তি পূর্বেও উল্লেখ করেছি। তিনি লিখেছেন

” إنه قد ثبت أن أبى بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة فى قيام رمضان و يوتر بثلاثٍ ‘ فرأى كثير من العلماء أن ذلك هو السنة . لأنه أقامه بين المهاجرين و الأنصار- ولم ينكره منكرٌ .”

“এটা অবশ্যই প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কা’ব (রা.) রমযানের তারাবীতে লোকদের নিয়ে ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়তেন এবং তিন রাক‘আত বিতর পড়তেন। তাই অসংখ্য আলেম এই সিদ্ধান্তে পৌঁঁছেছেন যে, এটাই সুন্নত। কেননা, উবাই ইবনে কা’ব মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের মধ্যে ২০ রাক‘আত পড়িয়েছেন আর কোনো একজনও তাতে আপত্তি করেননি।

অতি দুর্বল, বর্জিত ও মিথ্যুক বর্ণনাকারীর হাদীস

   “যে কয়েকটি অমূলক বিষয় আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুদের মনে সংশয় সৃষ্টি করেছে, তন্মধ্যে হযরত জাবের (রা.) এর নামে উল্লি¬খিত অত্যন্ত দুর্বল ও বজির্ত সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীস। এই হাদীসটি একই সূত্রে দুই ধরনের ভাষ্যে বিভিন্ন কিতাবে উ¬েল্লখ আছে। এক ধরনের ভাষ্যে নি¤œরূপ

“عن يعقوب بن عبد الله قال حدثنا عيسى بن جارية عن جابر رضى الله تعالى عنه  قال:  صلى بنا رسول  الله  – صلى الله عليه وسلم-  فى رمضان ثمان ركعات والوتر.”

“ইয়াকুব ইবনে আব্দুল্লাহ হাদীস বর্ণনা করেন, ঈসা ইবনে জারিয়া থেকে , আর তিনি বর্ণনা করেন সাহাবী হযরত জাবের (রা.) থেকে- রাসূলুল্ল¬াহ্ সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে রমযান মাসে ৮ রাক’আত ও বিতর পড়েছেন”।

হযরত জাবের (রা.) এর নামে এই হাদীসটি একই সনদে অন্য ধরনের ভাষ্যেও বর্ণিত হয়েছে, তা হলো  নি¤œ রূপ

عن يعقوب بن عبد الله قال حدثنا عيسى بن جارية عن جابررضى الله عنه  قال : جاء أبىّ بن كعب فى رمضان فقال: يا رسول الله كان منى الليلة شيئ قال : و ما ذلك يا أبى ؟ قال نسوة فى دارى قلن إنا لا نقرأ  القران فنصلى خلفك بصلا تك فصليتُ بهن ثمان  ركعات و الوتر فسكت عنه و كان شبه الرضا.”

      “ইয়াকুব ইবনে আব্দুল্ল¬াহ হাদীস বর্ণনা করেন ঈসা ইবনে জারিয়া থেকে, আর তিনি বলেন, সাহাবী হযরত জাবির (রা.) বললেন, হযরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) রমযান মাসে রাসূলুল্ল¬াহ্ সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলেন, ইয়া  রাসূলাল্লাহ ! রাতে আমার একটি বিষয় ঘটেছে। তিনি বললেন তা কি হে উবাই ? হযরত উবাই উত্তরে বলেন , আমার পরিবারের মহিলারা বলল, আমরা তো কুরআন পড়তে পারি না , অতএব আমরা আপনার পিছনে জামাআতে নামায  পড়ব। অতঃপর আমি তাদেরকে নিয়ে  ৮ রাক’আত এবং বিতর পড়েছি।  রাসূলুল্ল¬াহ সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিরব থাকেন, যা তাঁর সম্মতির ইঙ্গিত বহন করে”।

উপরোক্ত হাদীস দু‘টিই সাহাবী হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত। হাদীস দু‘টিরই সনদ প্রায় এক ও অভিন্ন। হাদীসটি জাবের (রা.) থেকে যারা বর্ণনা করেছেন, একে একে তাদের কয়েকজনই অতি দুর্বল সন্দেহ ভাজন ব্যক্তি। তাদের কোনো একজন উল্লি¬খিত বিষয় বস্তু রচনা করে অথবা বিকৃত করে জাবের (রা.) এর নামে হাদীস হিসাবে চালিয়ে দিয়েছে। আসল রূপটা সুস্পষ্ট হওয়ার জন্য এর কয়েকজন বর্ণনাকারী সম্পর্কে বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণের মন্তব্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।

 ক. হযরত জাবের (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন ‘ঈসা ইবনে জারিয়া’। উপরোক্ত হাদীস দু’টি যতো কিতাবে লে¬খা আছে সর্বত্রই ঐ ঈসা ইবনে জারিয়ার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে । তার মাধ্যম ব্যতীত ঐ হাদীস দু’টির কোনো সূত্র নেই । তার সম্পর্কে বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ লাল সংকেত জারি করেছেন। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ, ইমাম ইবনে মাঈন (রহ.) বলেন

عنده مناكير”” “ঈসা ইবনে জারিয়ার কাছে আছে আপত্তিকর ন্যাক্কার জনক হাদীস”।

ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম নাসাঈ বলেছেন ” منكر الحديث” “সে আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী”।   ইমাম নাসাঈ আরো বলেন متروك الحديث” “সে পরিত্যাগযোগ্য বর্জিত ব্যক্তি”।  এভাবে ইমাম ইবনে আদী, সাজী প্রমুখ সর্বজন বিদিত ইমামগণ তাকে অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারীদের তালিকায় গণ্য করেছেন।                                                                                                     খ.দ্বিতীয় ব্যক্তি হলো “ঈসা ইবনে জারিয়া থেকে বর্ণনাকারী বা তারই ছাত্র ‘ইয়াকুব বিন আব্দুল্ল¬াহ কুম্মী’। তিনিও মতানৈক্যপূর্ণ ব্যক্তি । তার সম্পর্কে ইমাম বুছীরী (রহ.) বলেছেন”  “هوضعيف “সে দুর্বল”।

ইমাম ইবনে হাজার লিখেছেন ” صدوق يهم ”  সে কখনো ঠিক বলে আবার কখনো সংশয়ের জালে আবদ্ধ হয়।                                                                      ইমাম দারাকুতনী লিখেছেন  ليس بالقوى” “সে নির্ভরযোগ্য নয় ’             উপরে বর্ণিত হাদীস দ’ুটির কোনো সনদই উপরোক্ত উস্তাদ শাগরিদ ব্যতীত কোথাও আসে নাই। সর্বত্রই জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন ঈসা এবং ঈসা থেকে তার ছাত্র ইয়াকুব । আর তাদের অবস্থা যা উপরে আংশিক উল্লে¬খ হলো। এছাড়া ইয়াকুব থেকে হাদীসটি তার দুই ছাত্র বর্ণনা করেছে। তাদের একজনের নাম হলো, মুহাম্মদ ইবনে হুমাইদ।                                                সে তো পুরো মিথ্যুক ব্যক্তি। তার সম্পর্কে ইমাম ছালেহ্ আল আসাদী লিখেন

ما رأيت أحدا احذق بالكذب من رجلين: سليمان الشاذكونى ومحمد بن حميد

“মিথ্যার প্রতি অতি আসক্ত দু’জন অপেক্ষা আমি আর কাউকে দেখিনি”। তাদের একজন হলো সুলাইমান শাজকুনী এবং অপর জন হলো সেই মুহাম্মদ ইবনে হুমাইদ ( বা উপরোক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী )

   ইমাম যাহাবী তার সম্পর্কে লিখেন  “ ضعيف كذبه ابوزرعة ” সে অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী, ইমাম আবু যুর‘আ তাকে মিথ্যুক আখ্যায়িত করেছেন।                                                                                                                                                                                 ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন”  ينفرد عن الثقات بالمقلوب ““সে বিচিত্র বর্ণনা উলট পালট করে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিগণের নামে চালিয়ে দেয়”।  ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন “ فى حديثه نظر ” তার হাদীস সন্দেহজনক।

উল্লে¬খ্য যে, কোনো হাদীসের বর্ণনাকারীদের একজনও যদি বর্জিত, অতি দুর্বল অথবা মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত হয় , তার হাদীস দুনিয়ার কোনো ইমাম গ্রহণ করেন না এবং এ কারণে হাদীস একটি অপরটির দ্বারা শক্তিশালীও হয় না।  আর আমাদের আহলে হাদীস বন্ধুরা তো কোনো বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে কারো সামান্য আপত্তি পেলেই দুর্বল বলে ছুড়ে মারে। তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গবেষক আল্ল¬ামা আলবানী সাহেব লিখেন

“وهذا الذى أدين الله به  و أدعو الناس إليه أن الحديث الضعيف لايعمل به مطلقا.”

“আমি যা দ্বীন মনে করি এবং মানুষকে যে পথে ডাকি , তা হলো  দুর্বল হাদীস, কোনো ক্ষেত্রেই আমলযোগ্য নয়।

এ পরিসরে আমার প্রশ্ন হলো, তিনি তো দুর্বল হাদীস মাত্রই আমলযোগ্য নয় বলে দাবি করেন। তাহলে ৮ রাক’আত তারাবীর উপরোক্ত হাদীসটি তিনি কীভাবে গ্রহণ করেছেন ? এতে তো একজন বর্ণনাকারী হলো বর্জিত,পরিত্যাগযোগ্য ও আপত্তিকর, দ্বিতীয় জন অতি দুর্বল আর তৃতীয়জন হলো মিথ্যুক বর্ণনাকারী। সব মিলে দুর্বলতার গোডাউনে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এর পরেও হাদীসটি তার মাযহাব ও মতবাদের সহায়-সম্বল। তাই তিনি বর্জিত এ হাদীসটিকে লুফে নিলেন সাদরে। কিন্তু আমরা ২০ রাক’আত তারাবীর একাধিক বিশুদ্ধ দলীলের বিপরীতে তা গ্রহণ করতে পারি না।

এ পরিসরে উসূলে জারহ্ ও তা‘দীলের একটি নীতি নি¤েœ উল্লেখ করছি-‘‘ لا يقبل التوثيق لراوٍ اتفق الأئمة على تركه ’’ যে বর্ণনাকারীকে বর্জন বা পরিত্যাগ করার ব্যাপারে অধিকাংশ ইমামগণ ঐক্যমত পোষণ করেন সে ক্ষেত্রে বিচিত্র কারো সত্যায়ন গ্রহণ হবে না।

সংশয় চার :  একটি ভুল হাদীস

عن محمد بن يوسف عن السائب بن يزيد أنه قال: أمر عمر بن الخطاب  رضى الله تعالى عنه اُبَىْ بن كعب وتميما الدارى رضى الله تعالى عنهما أن يقوما للناس باحدى عشرة ركعة.

“মুহাম্মদ বিন ইউসুফের বর্ণনায় সায়েব বিন ইয়াযিদ (রা.) বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) নির্দেশ করেন হযরত উবাই ইবনে কা‘ব ও তামীমে দারী (রা.) কে যেন তারা লোকদের নিয়ে ১১ রাক‘আত পড়েন।

উল্লে¬খ্য যে, হাদীসটিতে তাদের ধারণামতে ৩ রাক’আত বিতর এবং ৮ রাক’আত তারাবীহ, মোট ১১ রাকাআত পড়ার নির্দেশ রয়েছে। হাদীসটি প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে সহীহ । কিন্তু হাদীস বিশারদগণ হাদীসটিকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত হাদীসটি ৪টি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে যে, উমর(রা.) উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) কে ২০ রাক’আত তারাবীহ পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আর মুহাম্মদ বিন ইউসুফের উপরোক্ত ৪র্থ সূত্রের শাখা বিবরণমতে ১১ রাক’আতের কথা উল্লেখ হয়েছে।

তাই ১১ রাক’আতের এক ব্যক্তির বর্ণনাটিকে হাদীস বিশারদ ইমামগণ ‘‘ شاذ ’’ বিচিত্র বর্ণনা, প্রত্যাখ্যাত ও ভুল বর্ণনা বলে আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে ৪টি সূত্রে বর্ণিত ২০ রাক’আত তারাবীর বর্ণনাটিকে তাঁরা প্রাধান্য দিয়েছেন ও সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তন্মধ্যে ইমাম মোল্ল¬া আলী কারী, তাজুদ্দীন সুবকী, ইমাম নববী, ওয়ালী উদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী, ইবনে র্আরাক, জালালুদ্দীন সুয়ূতী, ইবনে আব্দুল বার (রহ.) প্রমুখ ইমামগণ ২০ রাক’আতের সূত্রটিকে সহীহ্ বলেছেন।  ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) লিখেছেন

“روى غير مالك فى هذا الحديث احدى وعشرين وهو الصحيح….إلا أن الأغلب عندى أن قوله احدى عشرة وهم.”

“ইমাম মালেক ব্যতীত অন্যরা এই হাদীসের বর্ণনায় ১১ এর স্থানে ২১ উল্লে¬খ করেছেন। আর তা-ই সহীহ্। তবে আমার প্রবল ধারণা, ১১ শব্দটি ভুল”।

এছাড়া ১১ রাক’আতের এ বর্ণনাটি যেমন বিচিত্র, তেমনি গড়মিলও বটে। কেননা এই বর্ণনায় কখনো ১১ কখনো ১৩ আবার এতেই ২১ রাক’আতের কথা উল্লে¬খ আছে। এ ধরনের বর্ণনাকে হাদীস বিশারদগণ ‘ইজতিরাব’ গড়মিল বর্ণনা বলে আখ্যায়িত করেন। যা পরিত্যাগযোগ্য।

এ হাদীসের ব্যাপারে অনেক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনা ২০ রাক‘আত তারাবীর ২য় দলীল প্রসঙ্গে পেশ করেছি। পুনরায় দেখার অনুরোধ রইল।

এই হলো আহলে হাদীস ভাইদের ৮ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কীয় দলীল প্রমাণের ভান্ডার ! প্রথমটি অপ্রাসঙ্গিক, তারাবীর কোনো আলোচনাই এতে নেই। জোর জবরদস্তী অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ৮ রাক‘আত প্রমাণের প্রচেষ্টা চালান। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হলো, বর্জিত, পরিত্যাগযোগ্য, অতিদুর্বল- আপত্তিকর ও মিথ্যুক বর্ণনাকারীর বানানো হাদীস। আর চতুর্থটি হলো একটি ভুল ও গড়মিল বর্ণনা। যা নিয়ে তারা গোটা উম্মতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে নেমেছে। অঢেল টাকা পেয়ে বই-পুস্তক, লিফলেট-বিজ্ঞাপন ইত্যাদি ছড়াচ্ছে রাস্তায় রাস্তায় সর্বত্র প্রতিনিয়ত। অর্থের বলে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে লক্ষ-কোটি টাকার। বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে সরলমনা মুসলমানদের অন্তরে। আমি আশা করি আমার আহলে হাদীস ভাইয়েরাও এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটি সত্য অন্বেষণের মনোভাব নিয়ে পড়বেন এবং তাদের বাড়াবাড়ি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চিরাচরিত নীতি পরিহারের জন্য নতুন চিন্তাভাবনা করবেন।

তারাবীর নামায কি ৮ রাকাত? এ বেদআতের সূচনা কবে?

সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এ ব্যপারে একমত যে, তারাবীর নামায ন্যন্যতম ২০ রাকাআত। সালফে-সালেহীন ও পূর্ববর্তীদের অনেকে (নফলসহ) ৩৬ বা ৮০ রাকাআত পড়তেন; কিনতউ সালফ ও খলফ তথা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কোন ইমামই ২০ রাকাআতের চেয়ে কম পড়ার মত পোষণ করেন নি। এ ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ‘ইজমা’ (ঐক্যমত্য) রয়েছে। কেননা—

  • হাদীস শরীফে ২০ রাকাতের প্রমাণ হয়েছে।
  • খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত দ্বারাও ২০ রাকাত তারাবী ই প্রমাণিত।
  • মুহাজির, আনসার ও অন্যান্য সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের ইজমা (ঐক্যমত্য) এর আলোকেও তারাবীর নামা ২০ রাকাআত প্রমাণিত।
  • ইসলামের পুর্ণ্যযুগসমূহ তথা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈনের যুগে সমগ্রমুসলিম বিশ্বে ২০ রাকাআত তারাবীই পড়া হতো। এরপর থেকেলা-মাযহাবী ফেতনার সূচনাকাল পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ২০ রাকাত তারাবি পড়ার আমলই প্রচলিত ছিল। (৩ নং শিরোনামে দ্রষ্টব্য)।

এই ফেতনা শুরু হওয়ার পর থেকে কোন কোন মসজিদে (যেখানে তাদের কর্তৃত্ব বিদ্যমান) যদিও তারাবির নামায সংক্ষিপ্ত করে ৮ রাকাত পড়ার কুপ্রথা চালু হয়েছে, কিন্তু হক্কানী আলেমগণ সর্বদাই এর প্রতিবাদ করেছেন।  তাদের নিয়ন্ত্রিত হাতেগোনা গুটিকতক মসজিদ ছাড়া মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী সহ মুসলিম বিধ্বের সকল মসজিদে আজ পর্যন্ত সে ধারাই চলমান রয়েছে যা সাহাবায়ে কেরামের পুণ্যযুগ থেকে চলে আসছে।

 

১. তারাবীর নামায বিশ রাকাআত নয় এই বক্তব্য একটি অতি গর্হিত বেদআত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে নিয়ে তেরশো বছরের ( অর্থাৎ লা-মাযহাবী ফেতনার প্রদুর্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত) এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোন একটি মসজিদের ব্যাপারেও তারা এই তথ্য  দিতে পারবে না যে, সেখানে তারাবীর নামায শুধু আট রাকাআত পড়া হতো।

২. একজন সাহাবী, তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈর নামও উল্লেখ করা সম্ভব হবে না, যিনি আট রাকাআত তারাবীর প্রবক্তা ছিলেন বা বিশ রাকাত তারাবীর বিরোধীতা করতেন।
পরবর্তী যুগেও কিান সর্বজন-শ্রদ্ধেয় মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুফাসসির ও বুযুর্গ এমন পাওয়া যায় না, যিনি তারাবীর নাজায আট রাকাত সমাপ্ত করার প্রবক্তা ছিলেন বা বিশ রাকাত তারাবিকে অনর্থক বা বেদাত বলতেন।

৩. রোযা ও তারাবীহ বিধিবদ্ধ হওয়ার পর থেকে আহ পর্যন্ত মসজিদে হারাম বা মসজিদে নববীতে কোন এক রামযানে তারাবীর নামায শুধু আট রাকাত হয়েছে-এর স্বপক্ষে কোন সহীহ ও স্পষ্ট হাদীস বা ঐতিহাসিক বর্ণনা পেশ করা কোনক্রমেই সম্ভব না।

৪. ১২৮৪ হিজরী সনের দিকে প্রথমবার আকবরাবাদের একজন গাইরে মুকাল্লিদ মৌলভী যখন সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং উম্মাহর আমলে মুতাওয়ারাসের বিপরীতে ৮ রাকাতের মত প্রকাশ করে তখনই স্হানীয় উলামায়ে কেরাম এর প্রতিবাদ করেন। তৎকালীন আরেক গাইরে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন বাটালভী যখন আট রাকাআতের ফত্ওয়া দেন তখন তাদেরই একজন প্রথ্যাত আলেম গোলাম রাসূল ১২৯০ হিজরীতে এর প্রতিবাদে কিতাব লিখেন। তাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলীর পাশাপাশি তিনি এ কথা প্রমাণ করেন যে, ঐ সময়ও পুরো মুসলিম বিশ্বে তারাবীহ ২০ রাকাতেই পড়া হত। এত (কারো কোন দ্বিমত ছিলো না। (রাসায়েলে আহলে হাদীস: ২/২৯ ভুমিকা)

৫. তারাবীর নামায আট রাকাআতে সীমাবদ্ধ করার ধারণা এবং বিশ রাকাআতের বিরোধীতা করা যে শুধু একটি নব-আবিষ্কৃত বেদাআত, তাই নয়; বরং এটি শরীয়তের প্রমাণাদির সাথে সাংঘর্ষিকও বটে। অর্থাৎ

  1. এই মতটি তারাবীহ্সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও নির্দেশনার পরিপন্হী।
  2. এই মতটি খুলাফায়ে রামেদীনের সুন্নত-বিরোধী।
  3. এই মতটি সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য) এবং যুগযুগ ধরে চলে আসা আমলে মুতাওয়রাস তথা উম্মতের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারার পরিপন্হী।
  4. অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, এই মতটি এই নামাযের নামেরও পরিপন্হী। আমাদের লা-মাযহাবী বন্ধুরা যদি অন্তত এই বিষয়টিও অনুধাবন করতে সক্ষম হতেন যে, ‘তারাবীহ’ একটি আরবী শব্দ; যা ’তারাবীহা’ শব্দের বহুবচন। তারাবীহা বলা হয় প্রতি চার রাকাআত অন্তর বিরতিকে। যেহেতু এই নামাযে সর্বমোট ৫টি ’তারাবীহা’ বা বিরতি থাকে, তাই একে ‘তারাবীহ’ বলা হয়। যদি অন্য সব প্রমাণাদি বাদও দেওয়া হয়, তবু শুধু ’তারাবীহা’ শব্দটিই একথা প্রমাণ করে যে, এই নামাযে রাকাআত সংখ্যা আটের অধিক।
    কেননা আরবী ভাষায় বহুবচন কমপক্ষে ‘তিন’ বুঝিয়ে থাকে। যেহতেু আরবীতে দ্বিবচন ও বগুবচনের জন্য আলাদা আলাদা শব্দ ব্যবহৃত হয়। ’তারাবীহা’ শব্দটির দ্বিবচন হলো  ‘তারাবিহাতান’ এবং বহুবচন ‘তারাবীহ’। অতএব ‘তারাবীহ‘ নামে নামকরণের কারণে অন্তত তিনটি ‘তারাবিহ‘ বা বিরতি অবশ্যই থাকতে হবে।  বলাবাহুল্য, আট রাকাআতে মাত্র  ‍দু’টি বিরতি হতে পরে। অতএব এই নামাযের রাকাআত সংখ্যা আট হলে এর নাম “‘তারাবিহ’ না হয়ে ‘তারাবিহাতান’ হত।

 

আট রাকাআত তারাবি এর কোন সহীহ হাদীস এমনকি শরীয়তের কোন দলীল নেই

লা-সাযহাবী ভাইদের অনেকেই শরীয়তের প্রমাণাদির পরিপন্হী  এই বেদআতের প্রচলন করার জন্য নিন্মেক্ত অমূলক কথাগুলোর আশ্রয় নিয়ে থাকে।

ক. তারা দাবী করে থাকে যে, আট রাকাআত তারাবীর হাদীস সহীহ বুখারীতে আছে। অথচ সহীহ বুখারীর হাদীসটি তাহাজ্জুদের ব্যাপারে, তারাবীর ব্যাপারে নয়। নিচে হাদীসটি দেওয়া হলো:
“আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রহ:) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা (রা:)কে জিজ্ঞেস করেন, রমযান মাসে  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায কেমন হত? হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তিনি রমযানে ও রমযানের বাইরে এগারো রাকাআতের অধিক পড়তেন না। চার রাকাআত পড়তেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতার কথা তোমাকে কী বলব ! এরপর চার রাকাআত পড়তেন, যারদীর্ঘতা ও সৌন্দর্য হত অতুলনীয়। এরপর তিন রাকাআত পড়তেন।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং২০১৩,১১৪৭,৩৫৬৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং৩৭৩/১২৫

নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, উপরোক্ত হাদীসে ঐ নামাযের কথা উল্লেখিত হয়েছে, যা রমযান ও অণ্যাণ্য মাস তথা সারা বছর আদায় করা হয়। বলাবাহুল্য যে, তা হল তাহাজ্জুদের নামায। অতএব তাহাজ্জুদের নামাযের ব্যাপারে আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার রাকাআত করে আট রাকাআত পড়তেন। এরপর বিতর পড়তেন।

হাদীসের উদ্দেশ্য হল, সাধারণভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাজ আট রাকাআত পড়তেন। হাদীসের অর্থ এই নয় যে, নবীজী সর্বদাই তাহাজ্জুদের নামাজ আট রাকাআত পড়তেন। কেননা আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা) থেকে সহীহ বুখারীর অপর বর্ণনায় এসছে, রাসুললুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামুল লােইল তথা তাহাজ্জুদের নামায তের রাকাআত পড়তেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৬৪, ফাতহুল বারী:৩/২৬, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, বাব-১০

বিভিন্ন সহীহ হাদীসের আলোকে এ কথাও প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের নামায (ইশার দু রাকাআত সুন্নত ও বিতর ছাড়াই) কখনো কখনো ১৪বা ১৬ রাকাআতও হত। বরং কোন কোন বর্ণনা থেকে ১৮ রাকাআতের কথাও বুঝে আসে। (নাইলুর আওতার: ৩/২১-২২, হাদীস ৮৯৭; আত-তারাবীহ আকসারু মিন আলফি আমিন ফিল মাসজিদিন নাবিয়্যি: ২১-২৩)

 

বুঝা গেল,তারাবীহ তো দুরের কথা খোদ ’কিয়ামুল লাইল’-এর ব্যাপারেও এ কথা বলা ঠিক নয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর ব্যতীত সর্বদা আট রাকাআত পড়তেন।

খ. তাদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, আট রাকাআত  তারবীর হাদীস হযরত জাবের (রা:) এর বর্ণনায় ইবনে হিব্বান ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্হে রয়েছে, যা একটি সহীহ হাদীস।
বাস্তব কথা হল, হাদীসটি সহীহ নয় বরং তা যয়ীফ হওয়ার পাশাপাশি মুনকারও বটে। অর্থাৎ তা যয়ীফের মধ্যেও নিম্নমানের। হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়াকুব আলকুম্মী’; এ একজন শিয়া। অপর একজন হল ‘ইসা ইবনে জারিয়া’; যার ব্যাপারে রিজালশাস্ত্রের ইমামদের মন্তব্য হল, সে ‘মাতরূক’ ও  ‘মুনকারুল হাদীস’।  ইমাম আবু দাউদ (রহ), ইমাম নাসায়ী (রহ) প্রমুখ একথা বলেছেন। অর্থাৎ তার বর্ণনা ‘প্রমাণ প্রদানের ক্ষেত্রে তো নয়ই, ‘সমর্থন’ হিসেবেও উদ্ধৃত করা চলে না।  কেননা তার ব্যাপারে আপত্তিজনক কথাবার্তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করার অভিযোগ রয়েছে।
দ্রষ্টব্য: তাহযীবুল বামাল: ১৪/৫৩৩-৫৩৪, তাহযীবুত তাহযীর: ৮/২০৭; আল-কামেল, ইবনে আদী: ৬/৪৩৬-৪৩৮
ইমাম ইবনে আদী (রহ) ঈসা ইবনে জারিয়ার আলোচনায় এই হাদীস উল্লেখ  করে স্পষ্ট বলেছেন, হাদীসটি ‘মাহফুয নয়’। এ শব্দ (,াহফুয নয়) দ্বারা ইমাম ইবনে আদী (রহ)-এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে যে, সংশ্লিষ্ট হাদীসটি মওযূ বা মুনকার। অর্থাৎ তা দ্বারা প্রশাণ দেয়ার প্রশ্নই আসে না।
তাছাড়া এই মুনকার বর্ণনাটির মধ্যেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, তা শুধু এক রাতের ঘটনা ছিল। (কিয়ামুল লাইল, ইবনে নাসর:১৯৭

গ. কেউ কেউ এ সম্পর্কে হযরত উবাই (রা) এর প্রতি সম্বন্ধকৃত একটি ঘটনারও উল্লেখ করে থাকেন, যাতে আট রাকাআতের কথা উল্লেখ রয়েছে। অথচ এ কথাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয় যে, তা রমযান মাসের ঘটনা. নাকি অন্য মাসের। যদি রমযান  মাসের হয়ে থাকে তাহলে তা তাহাজ্জুদের ঘটনা, নাকি  তারাবীর। তাছাড়া সবচেয়ে বড়  কথা হলো  যে, এ বর্ণনাটিও সেই ’ঈসা ইবনে জারিযা ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে; যাকে বিজ্ঞ মুহাদ্দেসীনে কেরাম ‘মাতরূক’ ও ’মুনকারুল হাদীস’ আখ্যা দিয়েছেন। (রাকাআতে তারাবীহ, মুহাদ্দেস হাবীবুর রহমান আযমী:৩৬-৩৭)

ঘ. কেউ কেউ নিরূপায় হয়ে এই বলে বসেছে যে, তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই নামাযের দুই নাম। তাই তাহাজ্জুদ যখন আট রাকাত তারাবীও আট রাকাত।
এই কেীশলটি লা-মাযহাবীদের সবচেয়ে বড় কেীশল। এর ভিত্তিতেই তারা তাহাজ্জুদের হাদীসসমূহকে তারাবীর ব্যাপারে প্রয়োগ করে। অথচ  এটি একটি ভ্রান্ত ও দলীলবিহীন কথা।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, তাহাজ্জুদ সারা বছরের নামায আর তারাবীহ রমযান মাসের বিশেষ নামায। তাহাজ্জুদের নামায রমযানের রোযা ফরজ হওয়ারও আগে কেুরআনের আদেশক্রমে শুরু হয়েছে। অথচ তারাবীর সূচনা হয়েছে অনেক পরে; রমযানের রোযা ফরয হওয়ার পর হাদীসের মাধ্যমে।
মোটকথা তারবী ও তাহাজ্জুদ ভিন্ন ভিন্ন্ নামায। এ  দুটিকে এক মনে করা বা এক বলা মারাত্নক ভ্রান্তি।
যদি কোন লা-মাযহাবী আলেম কুরআনের কোন আয়াত বা কোন ‘সহীহ’ সরীহ (স্পষ্ট) হাদীস দ্বারা প্রমাণ করতে পারেন যে, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ একই  নামাযের দুই নাম; তবে তাকে তার কাঙ্খিত পুরস্কার প্রদান করা হবে।

ঙ. কেউ কেউ ইনসাফের মূলেকুঠারাঘাত করে হল আরেকটি মুনকার বর্ণনা  দ্বারাই প্রমাণ দিয়ে বসেছে। বর্ণনাটি হল, মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সায়েব ইবনে ইয়াযীদের উদ্বৃতিতে বলেছেন যে, হযরত উমার (রা) উবাই ইবনে কা’ব (রা) ও তামীম দারী (রা) কে এগারো রাকাআত পড়ানোর আদেশ করেছেন।
এ বর্ণনাটি সূত্র ও আনুষঙ্গিক বিচারে মুনকার হওয়া ছাড়াও এ কথা তো সবাই জানেন যে, হযরত উমার (রা) এর ‍যুগে যখন তারাবীর নামায বড় জামাআতে এক ইমামের পিছনে পড়ার নিয়ম চালু হয়; তখন সকলে এক ইমামের পিছনে ২০রাকাত  তারাবীহ পড়তেন এবং এ ব্যপারে কারো কোন  দ্বিধাদ্বন্দ্বও ছিল না।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ) প্রমুখ মহাদ্দিসগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বর্ণনাকারী ভূলক্রমে বিশ রাকাআতের স্হলে এগারো রাকাআতের কথা উল্লেখ করেছেন
তার এই ভ্রান্তির একটি প্রমাণ হল,সায়েব ইবনে ইয়যিীদ থেকে অপর বর্ণনাকারী ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা বর্ণনাটি সঠিকভাবে মনে রেখেছেন। তার বর্ণনায় বিশ রাকাআতের কথা উল্লেখিত হয়েছে; এগারো রাকাআত নয়।
(আল-ইস্তিযকার শরহুল মুআত্তা, ইবনে আব্দুল বার: ৫/১৫৪; রাকাআতে তারাবীহ, মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আযমী: ৩৭-৫৬)
এইখানে একটি বিষয় লক্ষনীয় যে, সায়েব ইবনে ইয়াযীদের এই বর্ণনার সমর্থনে ইম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্শধারা ছাড়াও আনো ৫টি হাদীষ রয়েছে; যাতে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) এর যুগে তারাবীর নামায বিশ রাকাআতই পড়া হত।
(দ্রষ্টব্য: মুআত্তা ইমাম মালেক: ৪০; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ২/২৮৫, ২৮৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৪/২২৬, হাদীস নং ৭৭৩৩; সুনানে কবরা  (বায়হাকী) : /৪৯৬,৪৯৭; সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার সাবেক গবেষক শাইখ ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মদ আনসারী রচিত তাসহীহু হাদীসি সালাতিত তারাবীহ  ইশরীনা রাকাআতান ওয়ররুদ্দু আলাল আলবানী ফী তাযঈফিহী’ ১১-২৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s