তারাবীর নামায বিশ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা

তারাবীর নামায বিশ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আালামীনের জন্য; দুরূদ ও সালাম প্রিয় নবী, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি । আল্লাহ তা’আলা   মভমানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর  ইবাদত বা আনুগত্যের জন্য, আর দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন খিলাফাত বা প্রতিনিধিত্বের জন্য।  আমলের মাধ্যমে মানুষ তার খিলাফতের কর্তব্য পালনে সক্ষমতা অর্জন করে, পরিণতিতে সে আল্লাহর ওয়ালী বা বন্ধুর মর্যাদায় ভূষিত হয় ।
আল্লাহর ভালবাসা লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো নামায । নামাযের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্য লাভ করে । বেশী বেশী নামাযের দ্বারা আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়ার কথা বুখারী শরীফসহ হাদীসের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে । রমযান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস; রমযান মাস তাকওয়া অর্জনের মাস । সুতরাং এ মাসে কিয়ামুল লাইল বা  তারাবীহ উক্ত লক্ষ অর্জনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ।

তারাবীহ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঃ
তারাবীহ শব্দটি বহু বচর, এর একবচন হলো তারবীহাতুন যার আভিধানিক অর্থ হলো ঃ বিশ্রাম গ্রহণ, শান্তি উপভোগ করা ।
তারাবীহ নামাযের পারিভাষিক অর্থঃ
‘রমযান মাসে ইশার নামাযের পর যে সুন্নত নামায কায়েম করা হয়, তা হলো তারাবীহর নামায।’ (কামূসুল ফিকহি লুগাতান ওয়া ইস্তিলাহান ) ।
তারাবীহ নামাযের নাম করণের কারণ ঃ
১.  যেহেতু প্রতি ৪ রাকাত পর পর বিরতির মাধ্যমে বিশ্রাম নেয়া হয় তাই এর এ নাম করণ করা হয়েছে ।  (উল্লেখ্য যে, চার রাকাত নামায পড়তে যতক্ষণ সময় লাগে, প্রতি চার রাকাত পর ততক্ষণ বিরতি দেয়া উত্তম; কিন্তু এতে অনেকের অসুবিধা হয় বিধায় আজকাল এত দীর্ঘ বিরতি দেয়া হয় না । তবও খেয়াল রাখতে হবে, যেন তারাবীহ নামাযে খুব ভেশী তাড়াহুড়া করা না হয় ; কেননা এটা তারাবীহ )শান্তি ও বিশ্রাম) এর বিররীত ) ।
২. তারাবীহ নামাযের মাধ্যমে মুমিন বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে চির সুখের (বিশ্রাম ও শান্তির) আবাসন জান্নাত লাভের সৌভাগ্য অর্জনে সমর্থ হয়, তাই একে তারাবীহ নাম করণ করা হয়েছে ।
তারাবীহ নামাযের বিধান ঃ
১.    তারাবীহ নামায ২০ রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা ।
২.    জামাআতে আদায় করা সুন্নত ।
৩.    তারাবীহ নামাযে কুরআন শরীফ খতম করা সুন্নত ।
৪.    একা পড়লেও ২০ রাকাত সুন্নত ।
৫.    মহিলাদের জন্যও ২০ রাকাত সুন্নত ।

তারাবীহ নামাযের ফযীলতঃ
‘যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত সওয়াবের নিয়াতে রমযান মাসে তারাবীহ পড়বে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে । ( মুসলিম শরীফ, কন্ড-২ পৃষ্ঠাঃ ২৫৯; শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩ পৃষ্ঠাঃ ১৭৬; সহীহ ইবনে খুজাইমাহ, খন্ড-৩ পৃষ্ঠাঃ ২৩৯  )।
‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি (দিনের বেলায় ) রোযা ফরয করেছেন, আর আমি তোমাদের জন্য ( রাতের বেলায়) তারাবীহর নামাযকে সুন্নত করেছি; অতএব যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের নিয়তে রোযা পালন করবে ও রাতে তারাবীহর নামায আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হবে যেরূপ নবজাতক মাতৃগর্ভ থেকে ( নিষ্পাপ অবস্থায়) ভূমিষ্ট হয়। (নাসায়ী শরীফ, খন্ড-১ পৃষ্ঠাঃ ২৩৯ ) ।
তারাবীহর নামায ওয়াজিব না হয়ে সুন্নত হওয়ার প্রেক্ষাপটঃ
হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, একদা রমযানের মধ্য রজনীতে নবী কারীম সা. বের হয়ে মসজিদে গেলেন এবং তারাবীহর নামায পড়লেন ( কিছু সাহাবীও তাঁর সাথে শামিল হলেন ) । দিনের বেলায় সাহাবীদের মাঝে পরষ্পরে এনিয়ে আলোচনা হলো । দ্বিতীয় রাতেও নবী কারীম সা. হুজরা থেকে বের হয়ে মসজিদে গেলেন এবং তারাবীহর নামায পড়লেন বহু সাহাবীও তাঁর সাথে তারাবীহর নামাযের জামাতে শরীক হলেন । পরদিন এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রচার হয় ।  তৃতীয় রজনীতেও নবী কারীম সা. ও সাহাবায়ে কেরাম জামাতের সাথে তারাবীহর নামায আদায় করলেন; এ রাতে লোক সংখ্যা অনেক বেশী হয় । দিনের বেলায় বিষয়টি সকলের জানাজানি হয়ে যায় । ূঅতঃপর যখন চতুর্থ রাত এলো, মুসল্লি সাহাবীগণের সমাগমে সমজিদ কানায় কানায় ভরে গেল; কিন্তু নবী কারীম সা. হুজরা থেকে বের হলেন না । ফজরের নামাজান্তে নবী কারীম সা. ভাষণ দিলেন এবং বললেনঃ তোমরা সকলে যে গত রাতে তারাবীহর নামায আমার সাথে জামাতে পড়ার জন্য মসজিদে এসে ছিলে তা আমি জানতাম । তবে আমার ভয় হচ্ছিল যে, যদি এভাবে পড়ার কারণে তা তোমাদের উপর ফরয করে দেয়া হয় তখন তোমরা তা আদায় করতে কষ্ট হবে । (বুখারী শরীফ, খন্ড-১ পৃষ্ঠাঃ ২৬৯; মুসলিম শরীফ, খন্ড-১ পৃষ্ঠাঃ ২৫৯ )।

২০ রাকাত তারাবীহ সম্পর্কীত কতিপয় হাদীস ঃ
(১)
عن ابن عباس رضی الله عنه قال ان رسول الله صلی الله عليه وسلم کان يصلی فی رمضان عشرين رکعة والوتر
‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী কারীম সা. রমযানে ২০ রাকাত (তারাবীহর নামায) পড়েতেন এবং বিতির ।’  ([ক] আল মুসান্নাফ ফিল হাদীস ওয়াল আসার- ইবনে আবীশায়বাহ র., খন্ড-২ পৃষ্ঠাঃ ১৬৪, হাদীস-৭৬৯২; [খ] আল মুজামুল কারীর- মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়া, খন্ড-১১, পৃষ্ঠাঃ ৩৯৩, হাদীস-১৬১০৬’ [গ] আল মুজামুল আসওয়াত, খন্ড-১ পৃষ্ঠাঃ ২৪৩, হাদীস- ৭৮৯ এবং খন্ড-৫, পৃষ্ঠাঃ ৩২৪, হাদীস-৫৪৪০); [ঘ] আল মুনতাখাব মিন মুসনাদি আবি ইবনে হুমাইদ র.,  পৃষ্ঠাঃ ২১৮, হাদীস-৬৫৩; [ঙ] আস সুনানুল কুবরা- বায়হাকী র., খন্ড-২ পৃষ্ঠা ঃ ৬৯৮, হাদীস-৪২৮৬ ।

(২)
عن يزيد بن رومان انه قال کان الناس يقومون فی زمان عمربن الخطاب رضی الله عنه فی ثلاث وعشرين رکعة
‘হযরত ইয়াযিদ ইবনে রূমান রা. বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. এর খিলাফতের সময় মানুষ ২৩ রাকাত  (বিতিরসহ তারাবীহর নামায) এর মাধ্যমে রাত জাগরণ করতো ।’ ([ক] মুআত্তা-ইমাম মালিক র., খন্ড-১, পৃষ্ঠাঃ ১১০, হাদীস-২৮১; [খ] সুনান- আবু দাউদ, খন্ড-১ পৃষ্ঠাঃ ৬৯৯, হাদীস-৪২৮৯) ।

(৩)
عن الحسن رضی الله تعالی عنه قال ان عمربن الخطاب رضی الله تعالی عنه جمع الناس علی ابی بن کعب فڪان يصلی لهم عشرين رڪعة
‘হযরত হাসান রা. বলেন, হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. মানুষকে হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর পিছনে একত্রিত করলেন; তখন উবাই ইবনে কাআব রা. তাদের ইমামতি করে ২০ রাকাত নামায পড়তেন ।’ (আবূ দাউদ, খন্ড-২ পৃষ্ঠাঃ ৬৫, হাদীস-১৪২৯)।

(৪)
عن شتيربن شڪل رضی الله تعالی عنه قال ان رسول الله صلی الله عليه وسلم ڪان يصلی  فی رمضان عشرين وڪعة والوتر
‘হযরত শুতাইর ইবনে শাকাল রা. বলেন, নবী কারীম সা. রমযানে ২০ রাকাত (তারাবীহর নামায) পড়তেন এবং বিতির ।, (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২ পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৮০ )।
(৫)
عن علی ابن ابی الحسناء عنه قال ان علیا رضی الله تعالی عنه امر رجلايصلی بهم فی رمضان عشرين رڪعة والوتر
‘হযরত ইবনে আবিল হাসান রা. বলেন, হযরত আলী রা. এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন রমযানে ২০ রাকাত (তারাবীহ নামায) পড়তে ।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২ পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৮১ )।
(৬)
عن نافع ابن عمر قال کان ابن ابی مليکة رضی الله عنه يصلی بنا فی رمضان عشرين رڪعة
‘হযরত নাফে ইবনে উমর রা. বলেন, হযরত ইবনে আবী মুলাইকা রা. আমাদেরকে সাথে নিয়ে রমযানে ২০ রাকাত (তারাবীহ নামায ) পড়তেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২, পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৮৩)।
(৭)
عن عبد العزيز بن رفيع قال کان ابی بن کعب رضی الله عنه يصلی با لناس فی رمضان بامدينة عشرين رکعة
‘হযরত আব্দুল আযীয ইবনে রুফাই রা. বলেন, হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. রমযানে মদীনা শরীফে সকলের সাথে ২০ রাকাত (তারাবীহ নামায) পড়তেন; আর বিতির পড়তের তিন রাকাত ।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২, পৃষ্ঠাঃ ১৬৩)।

(৮)
عن الحارث انه کان يؤم الناس فی رمضان بالليل بعشرين رکعة ويوتر بثلاث
‘হযরত হারিস রা. বলেন, তিনি রমযানে ২০ সরাকাত (তারাবীহ নামায) এ মানুষের ইমামতি করতেন; আর বিতির পড়তের তিন রাকাত ।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২, পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৮৫)।

(৯)
عن ابی البختری انه کان يصلی خمس ترويحات فی رمضان ويوتر بثلاث
‘হযরত আবুল বাখতারী রা. বলেন, তিনি রমযানে পাঁচ তারবীহাহ (বিশ্রাম-বৈঠক) [৫ী৪=২০ রাকাত] পড়তেন; আর বিতির পড়তেন তিন রাকাত ।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২. পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৮৬)।

(১০)
عن عطاء قال ادرکت الناس وهم يصلون ثلاثا و عشرين رکعة بالوتر
‘হযরত আতা রা. বলেন, আমি দেখতে পেয়েছি লোকেরা (রমযানে তারাবীহর নামায) বিতিরসহ ২৩ রাকাত পড়ে ।’  (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২, পৃষ্ঠা” ১৬৩)।

(১১)
عن سعيد بن عبيد ان علی بن ربيعة کان يصلی بهم فی رمضان خمس ترويحات ويوتر بثلاث
‘হযরত সাঈদ ইবনে উবাইদ রা. বলেন,আলী ইবনে রবীআহ রা. তাদের সাথে রমযানে পাঁচ তারবীহাহ (বিশ্রাম-বৈঠক) [৫ী৪=২০ রাকাত] পড়তেন; আর বিতির পড়তের তিন রাকাত ।’ মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ র., খন্ড-২, পৃষ্ঠাঃ ১৬৩, হাদীস-৭৬৯০)।

২০ রাকাত তারাবীহ সম্পর্কে আরবের ফকীহগণের মতামতঃ
ইমাম মোল্লা আলী কারী র. বলেন, ‘তারাবীহ নামায ২০ রাকাত , এ বিষয়ে সকল সাহাবীগণ ইজমা (ঐক্যমত) হয়েছেন । । (মিশকাত-শরহে মিশকাত, খন্ড-৩, পৃষ্ঠাঃ ১৯৪)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s