তায্‌কিয়া (আত্নপরিশুদ্ধি) ও ইল্‌মে তাসাউফ (আত্নিক জ্ঞান) -১

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন –

 

১। يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ

 

إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ অর্থাৎ

সেদিন (কিয়ামতের দিন) কোন অর্থ সম্পদ এবং সন্তান সন্ততি কোন কাজে আসবে না ; সে ব্যক্তি ব্যতীত যে সুস্হ বা পরিচ্ছন্ন ক্বলব নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে। (সুরা শু’আরা ৮৮-৮৯)

২। فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ

বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষ স্থিত ক্বলবই (অন্তরই) অন্ধ হয়। – (সুরা হাজ্জ – ৪৬)

৩। طُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لاَ يَفْقَهُونَ

মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে তাদের ক্বলব(অন্তর) সমূহের উপর। বস্তুতঃ তারা বোঝে না।(সুরা-আত-তাওবা-৮৭)

৪। وَطَبَعَ اللّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لاَ يَعْلَمُونَ

আর আল্লাহ মোহর এঁটে দিয়েছেন তাদের ক্বলব(অন্তর বা মন) সমূহে। বস্তুতঃ তারা জানতেও পারেনি।

(সুরা-আত-তাওবা-৯৩)

৫। وَنَطْبَعُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لاَ يَسْمَعُونَ (সুরা-আরাফ-১০০)

বস্তুতঃ আমি মোহর এঁটে দিয়েছি তাদের ক্বলব(অন্তর বা মন) সমূহের উপর। কাজেই এরা শুনতে পায় না।

৬। وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ

যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন। (সুরা-আত তাগাবুন-১১)

৭। أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ

তাদের ক্বলবে(অন্তর বা মন) আল্লাহ ঈমানকে নির্ধারিত দিয়েছেন।(সুরা মুজাদালাহ-২২)

৮।

৯। وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ।

কিন্তু আল্লাহ তোমাদের ক্ললবে(অন্তর বা মন) ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন।

(সুরা-হুজুরাত-৭)

১০।قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ

মরুবাসীরা বলেঃ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুনঃ তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি; বরং বল, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। এখনও তোমাদের ক্ললবে(অন্তর বা মন) বিশ্বাস জন্মেনি। (সুরা হুজুরাত-১৪)

১১।يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لاَ يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُواْ آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ

হে রসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলেঃ আমরা মুসলমান, অথচ তাদের ক্ললব(অন্তর বা মন) মুসলমান নয়।(সুরা-মায়েদাহ ৪১)

১২।مَن كَفَرَ بِاللّهِ مِن بَعْدِ إيمَانِهِ إِلاَّ مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالإِيمَانِ وَلَـكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার ক্ললব(অন্তর বা মন) বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরীর জন্য মন উম্মুক্ত করে দেয় তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্যে রয়েছে শাস্তি।-সুরা নহল-১০৬

১৩।. إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ

যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের ক্ললব(অন্তর বা মন)(সুরা-আনফাল-২)

 

১৪।الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ

যাদের ক্ললব(অন্তর বা মন) আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভীত হয়। (সুরা হাজ্জ ৩৫)

১৫। إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ

যারা আল্লাহর রসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাদের ক্ললবকে(অন্তর বা মন) শিষ্টাচারের জন্যে শোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। (সুরা হুজরাত-৩)

 

فَمَن يُرِدِ اللّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلإِسْلاَمِ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاء كَذَلِكَ يَجْعَلُ اللّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لاَ يُؤْمِنُونَ

 

125

 

অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন,তাহার কাছে ইসলাম অনুসরণ আকাশে আরোহনের মতই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।যাহারা বিশ্বাস করে না আল্লাহ তাহাদিগকে এইরুপে লাঞ্ছিত করেন (আনআম-১২৫)।

 

পবিত্র হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে “জেনে রেখ, মানুষের দেহের মধ্যে এক খন্ড মাংশ পিন্ড আছে, যখন তাহা সংশোধিত হয়, তখন সমগ্র দেহ সংশোধিত হয়ে যায়। আর যখন তা দুষিত হয় তখন সমগ্র দেহটাইত দুষিত হয়ে যায়। মনে রেখ ওটাই ক্বলব”( বোখারী ও মুসলিম শরীফ)। অন্য এক হাদিসে পাওয়া যায় মানুষ যখন কোন পাপ কাজ করে তখন তার ক্বলবের মধ্যে কালি পড়ে যায়। আমরা রাসুল পাক (সাঃ) এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই বাল্য কালে উনার দুবার বুক খুলে সীনা পরিস্কার করা হয়েছে। অন্য হাদিসে পাওয়া যায় শয়তান প্রতিটি মানুষের ক্বলবের মধ্যে হাটু গেড়ে বসে থাকে। যখন সে জিকির শুরু করে তখন সে পালিয়ে যায়। আবার যখন আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হয় তখন শয়তান আবার ক্বলবে ফিরে এসে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রনা) দিতে থাকে।

 

يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَن88

 

যে দিবসে ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে আসবে না;

 

إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ 89

 

কিন্তু যে সুস্থ ক্বলব(অন্তর বা মন) নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।

 

ক্বলব শব্দের অর্থ অন্তর বা মন।এটি একটি মাংশের টুকরা।এর আকৃতি মসুর ডালের মত।বুদ্ধিকেন্দ্র ও জ্ঞান কেন্দ্র বুঝাতেও কখনও কখনও ক্বলব শব্দটি ব্যবহ্রত হয়।এর স্থান মানুষের বাম স্তনের ১ (এক) ইঞ্চি নীচে। অনেকে ক্বলব কে হৃদপিন্ড মনে করেন। আসলে এটা হৃদপিন্ড বা মস্তিস্ক নয় অন্য জিনিস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিরাও মনে করেন অন্তর বা মন হচ্ছে মানুষের বাম স্তনের নীচে। পবিত্র কোরআনে ক্বলবের অবস্থান সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে, “বস্তুত চক্ষুতো অন্ধ হয় না কিন্তু ঐ ক্বলব অন্ধ হয় যে ক্বলব হলো বুকের মধ্যে”। (সুরা হজ্ব ৪৬) রাসুল (সাঃ) ফরমান “নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের শরীর বা আকৃতির দিকে তাকান না , বরং তিনি তোমাদের ক্বলবের (মন বা অন্তর) দিকেই তাকান”। অতপর রাসুল (সাঃ) ক্বলবকে দেখানোর জন্য স্বীয় আঙ্গুল দ্বারা নিজের বুকের দিকে ইশারা করলেন (মুসলিম শরীফ) । রসুল পাক(সাঃ) আরো বলেন,”মানুষের ক্বলব আল্লাহ পাকের অতুলনীয় ও আলৌকিক দুই আঙ্গুলের মধ্যে। তিনি অন্তর সমুহকে(ক্বলব) যেমন ইছ্ছা তেমনি করে দেন” । আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় রসুল পাক(সাঃ) বলতেন,”হে অন্তরের(ক্বলব) আবর্তন ও বিবর্তনকারী আল্লাহ ।তুমি আমাদের ক্বলবকে তোমার আনুগত্যমুখী করে দাও।” ক্বলব সম্পর্কে রাসুল পাক (সাঃ) আরো বলেন “ক্বলব হলো সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গেঁর বাদশা” ( মেরকাত শরীফ ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৬২) অর্থাৎ একটি দেশের বাদশাহ ভাল হলে দেশের প্রজারাও যেমন ভাল হতে বাধ্য হয়, তদপ্রু একটি মানুষের ক্বলব বা অন্তর ভাল হলে নিজের কাজ কমর্ও ভাল হয়ে যায়। অপর দিকে একটি মানুষের ক্বলব খারাপ হলে তার কর্মকান্ডও খারাপ হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে ” তাদের ক্বলব সমুহের উপর ছাপ পড়ে গেছে। ফলে তারা বুঝে না।” ( সুরা তওবা, আয়াত-৮৭) । পবিত্র কোরআনে অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, “আমি তাদের ক্বলব সমুহের উপর ছাপ মেরে দিয়েছি। ফলে তারা শুনতে পায় না”(সুরা আ’রাফ-১০০)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ক্বলব যতটুকু ভাল তার আমলও তত ভাল আর যার ক্বলব যত নষ্ট ,তার আমলও তত নষ্ট বা খারাপ। পবিত্র কোরআনে আরও এরশাদ হচ্ছে “যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে আল্লাহ তার ক্বলবকে হেদায়াত দান করবেন”। (সুরা আন কাবুত ৯১)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে যে রাসুল, তাদের জন্য দুঃখ করবেন না যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়।যারা মুখে বলে আমরা ঈমান এনেছি, অথচ তাদের ক্বলব ঈমান আনেনি। (সুরা মায়েদা-৪১) । অন্যত্র কালাম পাকে এরশাদ হচ্ছে “কখনো না , বরং তারা যা কিছু (গোনাহ) উপার্জন করে তাই তাদের ক্বলবের উপর মরিচা ধরিয়ে দিচ্ছে”( সুরা মুতাফিফীন-১৩)। ক্বলবের মধ্যে এই মরিচা পড়তে পড়তে ক্বলব কাল হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। তখন আর ভাল মন্দের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।রাসুল পাক (সাঃ) ফরমান “তখন ভালকে ভাল জানার এবং মন্দকে মন্দ জানার ক্ষমতা রাখেনা” ( মুসলিম শরীফ-১ম খন্ড, ৮২ পৃঃ) । তওবা ও এস্তে-গফার করে নেয় তাহলে তার ক্বলব ছাফ হয়ে যায় আর যদি গুনাহ বাড়তে থাকে তাহলে দাগও বাড়তে থাকে ও অবশেষে এটা ক্বলবকে ঘিরে ফেলে” (তিরমিজি শরীফ)। সুতরাং কলব থেকে ময়লা পরিষ্কার করতে হলে কলব সংশোধন করা আবশ্যক। কলব সংশোধন হয়ে গেলে গুনাহ করতে মন চাইবে না। গুনাহর প্রতি ঘৃনা সৃষ্টি হবে। গুনাহ করতে খারাপ লাগবে ও কষ্ট বোধ হবে । অপর দিকে ইসলামের দিকে চলতে মনে ভাল লাগবে ও উৎসাহ বোধ হবে।

ক্বলবের পরিচ্ছনতা বা সুস্থতাকে এরকম ভাবে বোঝানো যেতে পারে। যখন কোন ব্যক্তির জ্বর হয়, তখন তার অবস্থা হয় একজন সুস্থলোকের সম্পুর্ন বিপরীত। অর্থ্যাৎ অসুস্থ্য ব্যাক্তির ঠান্ডা লাগে, ভাল এবং সুস্বাদু খাবার ভাল লাগে না বা তিক্ত লাগে। তদ্রুপ একজন লোকের ক্বলব বা মন যদি অসুস্হ বা ময়লা হয়ে যায়। তখন তারও আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভাল লাগে না। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে সব কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন সে সকল কাজ করতে মন চায় না। অপর দিকে যে সকল কাজ আল্লাহপাক করতে নিষেধ করেছেন, সে সকল কাজকে খুবই ভাল লাগে। অর্থাৎ একজন ময়লা বা অসুস্হ ক্বলব যুক্ত ব্যাক্তির নামাজ, রোজা, হ্জ্জ, যাকাত, দোয়া, সত্য কথা, বলা ইত্তাদি এসকল কাজ ভাল লাগেনা । অপর দিকে মিথ্যা কথা বলা, ঘুষ খাওয়া, অস্লীলতা, হিংসা ,অহংকার এসকল কাজ খূবই ভাল লাগে বা আনন্দ পায়। অপর দিকে একজন ব্যাক্তির ক্বলব বা অন্তর পরিস্কার বা সুস্হ হলে আল্লাহর আদেশ মানতে অর্থ্যাৎ নামাজ, রোজা, হ্জ্জ, যাকাত ইত্যাদি এবাদতে আনন্দ লাগে। অপর দিকে আল্লাহর নিষেধ কৃত কাজের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি হয় এবং ঐ সকল কাজ করতে মন চায় না।

বিষয়টাকে কোন কোন বুজুর্গব্যক্তি দুধ ও মাখনের সাথে তুলনা করেছেন। যেমন সাধারন দুধ কে যে কোন তরল পদার্থের সাথে রাখলে মিশে যায়। কিন্তু দুধ কে যদি ভাল ভাবে জ্বাল দিয়ে তা থেকে মাখন বের করা হয় তবে এই মাখন কোন তরল পদার্থের সাথে মিশে যায় না। সে তার স্বকীয়তা বজায় রাখবে ।তদ্রুপ একজন মুসলমান যদি সৎ কাজ, আল্লাহর এবাদৎ বন্দেগি ও সর্বাবস্হায় আল্লাহর যিকির বা স্মরনের মাধ্যমে একজন পরিস্কার বা সু্স্হ ক্বলব যুক্ত মুমিন হতে পারে, তবে সে যত প্রতিকুল অবস্থায়ই থাকুন না কেন, সর্বাবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চ্ষ্টো করবে অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ ঠিকভাবে মেনে চলবে এবং গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিবে না।

এখন কথা হচ্ছে আমাদের ক্বলব কিভাবে ময়লা ও অসুস্হ হয় এবং কি ভাবে এই ক্বলবকে পরিস্কার ও সুস্থ্য করা যায় এবং প্রকৃত ঈমানদার ও মুসলমান হওয়া যায়। এতক্ষনের আলোচনায় একথা প্রমানিত হলো যে আমদেরর ক্বলব বা মনে জং ধরতে পারে বা ময়লা হতে পারে বা অসুস্হ হতে পারে, আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ না মেনে চললে এবং অ-ইসলামিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে একবার মানুষের মন অসুস্হ ও কলুষিত হলে তখন তার আল্লাহর আদেশ নিষেধের ব্যাপারে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তখন সে তার নফসের খায়েস বা মনের আকাংখা পূরনের জন্যই সব কাজ করে থাকে। সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ বা বেহেস্তের আনন্দ ও দোযখের শাস্থির কথা মনে থাকে না বা বিশ্বাস করে না। তার সামনে যতই হাদিস বা কোরআনের আয়াত বা কোরআনের কথা বলা হোক না কেন কোন কথাই তার মনে দাগ কাটে না। অর্ধাৎ ধর্মের কথা শুনতে তার খারাপ লাগে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মনের অসুস্থতা ও জং বা ময়লা কিভাবে দুর করা যায় এবং এগুলো আমদের ক্বলব বা মন থেকে দুর করতে পারলে কি উপকার হবে। রাসুল পাক (সঃ) বলেন ” প্রতিটি বস্তু পরিস্কার করার জন্য একটি যন্ত্র বা রেত থাকে । তদ্রুপ মনের পরিচ্ছন্নতা আনার যন্ত্র হচ্ছে আল্লাহর জিকির বা স্বরণ”। রাসুল পাক (সঃ) বলেন “হে আল্লাহ আপনার জিকিরের দ্বারা আমাদের ক্বলবের তালা গুলো খুলে দিন।” রাসুল পাক (সাঃ) আরো বলেন “মানুষ যখন কোন খারাপ কাজ বা গুনাহ করে তখন তার ক্বলবের মধ্যে কালো দাগ পড়ে যায়”। রাসুল পাক (সঃ) আরে বলেন “নিশ্চয়ই ক্বলব সমুহে মরিচা পড়ে। যেমন ভাবে লোহার মধ্যে পানি লাগলে মরিচা পড়ে। তখন সাহাবায়ে কেরাম (রঃ) বললেন হে আল্লাহর রসুল (সাঃ) এটা পরিস্কার করার উপায় কি? জবাবে রাসুল পাক (সঃ) বললেন মৃত্যুকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করা আর কোরান তেলওয়াত করা”। জিকির শব্দের অর্থ আল্লাহর স্মরন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে যে কাজের দ্বারা সওয়াব হয় তাহাই জিকির। কারণ প্রতিটি সওয়াবের মুহুর্তেই আল্লাহর স্বরন হয়।

রসুল পাক (সঃ) কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে কোন বান্দা সবচেয়ে শ্রেষ্ট ও উচু মর্যাদার আধিকারী হবে ? জবাবে রসুলে পাক বললেন আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণকারী নারী ও পুরুষ গন। তখন আবার প্রশ্ন করা হলো আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারী অপেক্ষাও কি? জবাবে রসুল পাক (সঃ) বললেন হ্যা সে যদি তার তরবারী দ্বারা কাফের ও মুশরেকদেরকে এমন ভাবে কাটে যে , তার তরবারী ভেঙ্গে যায় আর সে নিজে রক্তে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তবওু তার চেয়ে আল্লাহর যিকিরকারী মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। (আহমদ, তিরমিজি, বাইহাকী,মিশকত)। রসুল পাক (সঃ) বলছেন :আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দ্বাতা আল্লাহর যিকিরের চেয়ে আর কোন জিনিস নাই। (বইহাকী, মিশকাত) রসুল পাক (সঃ) বলেছেন আমি কি তমাদিগকে এমন একটা আমলের কথা বলবোনা যা সকল আমল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তোমাদের মর্যাদাকে সবচেয়ে উচুকারী, সণ্বর্ ও রুপাদান করার চাইতেও শ্রেষ্ঠ এবং জিহাদে শত্রুদের সম্মুখীন হওয়া যে, তোমরা তাদেরকে মারবে আর তারা তোমাদের মারবে এভাবে জেহাদ করার চাইতেও উত্তম? তখন সাহাবা (সঃ) গন উত্তরে বললেন হ্যা অবশ্যই বলুন। তখন রাসুল (সঃ) বললেন : তা হলো আল্লাহর জিকির (আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, ইবনে আবিদ, দুনিয়া, হাকেম, বাইহাকী, জামে সগীর, মিশকাত শরীফ।) হযরত মায়াজ ইবনে আনাস (সঃ) থেকে বর্ণিত আছে জনৈক ব্যক্তি রসুল পাক (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন মুজাহিদ গণের মাঝে সর্বাধিক প্রতিদান ও সওয়াবের অধিকারী কোন ব্যক্তি হবে? রসুল পাক (সঃ) বললেন : যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ম্মরণ করে অথার্ৎ জিকির করে। অতপর জ্ঞাসা করা হলো রোজাদার গণের মধ্যে সর্বোচ্চ সওয়াবের অধিকারী কে হবে? তিনি (সঃ) বললেন যে রোজাদার আল্লাহর জিকির সবচেয়ে বেশী করবে। এরুপ ভাবে নামাজ, যাকাত, হজ্ব ,সদকা প্রভৃতি সম্পর্কেও জিঙ্গাসা করলো। তিনি প্রতিবার একই উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির সবচেয়ে বেশী করবে সেই সর্বোচ্চ প্রতিদান লাভ করবে।

যাবতীয় ইবাদত সমুহের মধ্যে জিকির বা আল্লাহর স্মরনই একমাএ একটি এবাদৎ যা কমকষ্টে সহজ পব্দতিতে করা যায় এবং অল্প আমলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। অজু অবস্থায়, অজু ছাড়া,বসা,দাড়ানো এবং শোয়া অবস্থায় এই এবাদৎ করতে কোন বাধা নেই। পবিত্র কোরঅনে সুরা বাকারায় আল্লাহ পাক বলেন – তোমরা আমাকে স্বরন করো আমিও তোমাদেরকে স্বরন করবো -১৫২”। বান্দা যদি আল্লাহকে স্বরন করে তবে আল্লাহও বান্দাকে স্বরন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

হযরত সাবেত বুনানী (রাঃ) বলেন , আল্লাহ পাক কখন আমাকে স্বরন করেন তা আমি জানি।লোকেরা আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহকে স্মরন করি ঠিক তখনই তিনি আমাকে স্মরন করেন।

এর বাকি অংশ তায্‌কিয়া (আত্নপরিশুদ্ধি) ও ইল্‌মে তাসাউফ (আত্নিক জ্ঞান) -২

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s