তাজাল্লিয়াতে সফদর : কথিত আহলে হাদীছের মুখোশ ‍উন্মোচন -৫

নিয়ত

হযরত সর্বপ্রথম এটা বললেন যে, “বেটা! নিয়ত ঠিক করে নাও! যদি কোন ব্যক্তি এই নিয়তে মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, দ্বীন ‎বুঝে আমল করবে, তো মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য আলাদা সওয়াব পায়। আর এই মাসআলার উপর আমল করার সওয়াব ‎পায় আলাদা। আর যদি কোন ব্যক্তি এই নিয়তে মাসআলা জিজ্ঞেস করে যে, খারাপ ও ফিতনার জন্য হয়, তাহলে মাসআলা ‎জিজ্ঞেস করা ও ফিতনার গোনাহ আলাদা আলাদা পায়। আমিতো এই নিয়তে তোমাকে মাসআলা বুঝাব যে, এতে ‎একনিষ্টভাবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিই উদ্দেশ্য থাকবে। এতটুকুই যথেষ্ট”। আমি বললাম-“আমিও আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট ‎করার জন্যই বুঝতে চাই”।

দলিল দেয়া কার জিম্মায়?‎

হযরত বললেন-“এই ইশতিহারে অনেক ধোঁকাবাজি আছে। কিন্তু মাওলানা সাহেবের ধোঁকা মাওলানা সাহেবই বুঝতে পারে। ‎সবাই এটা বুঝতে পারেনা। যদিও ইশতিহারের লেখক নিজেকে আহলে হাদিস দাবি করেছে, কিন্তু সে মূলত হাদিস ‎অস্বিকারকারী। কেননা প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে যে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন যে, ‎البينة على المدعى ‏‎ অর্থাৎ “দলিল হল ‎দাবিকারীর জিম্মায়” দুনিয়ার সকল আদালতে সর্বদা বাদির কাছেই দলিল চাওয়া হয়। আর এই এগার মাসআলায় বাদি হল ‎গায়রে মুকাল্লিদরা। সুতরাং দলিল দেয়া তাদের জিম্মায় আবশ্যক। কিন্তু নিজের দুর্বলতার উপর পর্দা ঢাকার জন্য আমাদের ‎জিম্মায় তা প্রয়োগ করার অপচেষ্টা করছে। এর একটি উপমা দেখ-‘রাফেজীরা আযানের শব্দে কিছু অতিরিক্ত শব্দ বলে, যেমন ‎তারা বলে যে, আশহাদু আন্না আলিয়্যান অলীআল্লাহ….’ এখন আমাদেরতো এই অধিকার আছে যে, তাদেরকে এই প্রশ্ন করা ‎যে, “আপনারা কোন আয়াত বা হাদিস কিংবা কমপক্ষে হযরত আলী রা. থেকে এই সকল শব্দ প্রমাণিত তা দেখান”। কিন্তু ‎কিয়ামত পর্যন্ত তারা তার প্রমাণ দেখাতে পারবেনা। তারা তাদের মুর্খ লোকদের ধোঁকা দেবার জন্য এই প্রশ্ন বানায়, যেমন এই ‎গায়রে মুকাল্লিদরা বানিয়েছে। গায়রে মুকাল্লিদদের মত যদি এরকম প্রশ্ন বানানো হয় যে, “সারা দুনিয়ার গায়রে মুকাল্লিদরা ‎এক হয়ে একটি সহীহ সুষ্পষ্ট, মারফু’ এবং গায়রে মাজরুহ এমন হাদিস উপস্থাপিত করুক, যাতে হুজুর সা. অথবা হযরত আলী ‎রা. আজানের মাঝে অতিরিক্ত বাক্য সংযোজিত করতে নিষেধ করেছেন?” আর নিষেধাজ্ঞার হাদিস দেখালে এক লাখ টাকা ‎নগদ পুরস্কার দেয়া হবে মর্মে ঘোষণা দেয়া হয়! তুমি তোমার উস্তাদ থেকে এরকম হাদিস লেখিয়ে নিয়ে আস। নতুবা শিয়া ‎মতবাদ সত্য আর গায়রে মুকাল্লিদদের মতবাদ মিথ্যা একথা মেনে নাও। ‎

কি সারা দুনিয়ার সকর গায়রে মুকাল্লিদরা মিলে একটি হাদিসও দেখাতে পারবে এ ব্যাপারে?”‎

আমি বললাম-“আমরা কেন হাদিস দেখাব? যারা এই বাক্যগুলি অতিরিক্ত দেখাচ্ছে তারা তাদের প্রমাণ দেখাবে। এটাইতো ‎যৌক্তিক। আমাদের নিষেধাজ্ঞার হাদিস তাদেরকে দেখানোর কি প্রয়োজন? এই প্রশ্নটিতো কেবলি একটি ধোঁকা।”‎

তিনি বললেন-“তাহলে রফয়ে ইয়াদাইন তোমরা কর, আর আমাদের কাছে নিষেধাজ্ঞার হাদিস চাওয়াটাও তেমনি একটি ‎ধোঁকা। দেখ! কুরআন পাকের প্রথম সূরা ফাতিহা। এরই নাম উম্মুল কুরআন তথা কুরআনের মা। আর এরই মাঝে অনেক ‎বিবাদ। কেউ ‎فاتحة على الطعام‎ তথা ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্য খানা পাকিয়ে মানুষকে খানা খাওয়ানোর সময় ফাতিহা পড়া ‎নিয়ে ঝগড়া করে। আর কেউবা ‎فاتحة خلف الإمام‎ তথা ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়া নিয়ে ঝগড়ায় মাতে। ‎

মৌলিকভাবে ফাতিহার ক্ষেত্রে দু’টি মাসআলা। একটি হল মাসআলায়ে তাওহীদ তথা একত্ববাদের বিষয়। অন্যটি মাসআলায়ে ‎তাক্বলীদ তথা অনুসরণের বিষয়। ফাতিহা আলা তয়ামদের তাওহীদ ভাল নয়। আর ফাতিহা খালফাল ইমাম দলের তাক্বলীদ ‎ভাল নয়। অর্থাৎ ফাতিহাকে মানার মত মন এই দুই দলের কারো নেই”।

তারপর তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন-“আচ্ছা! যদি তোমার বিতর্ক ফাতিহা আলাত তয়াম গ্রুপের সাথে হয়। সে সময় যখন তুমি ‎তাকে প্রশ্ন করবে যে, ‘ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে খানা পাকিয়ে ফাতিহা পড়ার উপর হাদিস নিয়ে আস’। তখন কি তাদের এই ‎প্রশ্ন করার অধিকার থাকবেনা যে, ‘সারা দুনিয়ার গায়রে মুকাল্লিদরা মিলে শুধুমাত্র একটি সহীহ সুষ্পষ্ট, মারফু’ এবং গায়রে ‎মাজরুহ এমন হাদিস উপস্থাপিত কর, যাতে হুজুর সা. বিশেষ করে ঈসালে সাওবাবের নিয়তে খানা সামনে রেখে ফাতিহা ‎পড়তে নিষেধ করেছেন। বিশেষভাবে এটা করতে নিষেধ করেছেন এই মর্মে হাদিস দেখাতে পারলে এক লাখ টাকা নগদ ‎পুরস্কার দেয়া হবে’। এরূপ হাদিস কি তুমি দেখাতে পারবে?”‎

আমি বললাম-“আমাদের কাছে নিষেধাজ্ঞার হাদিস কেন চাইবে?”‎

তিনি বললেন- “কি শুয়াইব আ. এর জাতির মত তোমাদের নেবার বাটখারা একটি। আর দেবার বাটখারা অন্যটি সাব্যস্ত ‎করলে নাকি? হুজুর সা. এর ফরমান কি মনে নেই যে, ‘তোমরা নিজের ভাইয়ের জন্য তা’ই পছন্দ কর যা নিজের জন্য পছন্দ ‎কর’”।!

বিশেষ দলিল চাওয়া

তিনি বললেন-“বাদীর কাছে প্রমাণতো চাওয়া যায়, কিন্তু বিশেষ প্রমাণ চাওয়া বৈধ নয়। এটাতো কাফেরদের তরীকা ছিল। ‎তারা সে সকল মুজিজাকে মানত না, যা নবীজী সা. থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বরং তারা নিজেদের পক্ষ থেকে শর্ত লাগিয়ে ‎ফরমায়েশী মুজিজা দেখানোর জন্য আবেদন করল। তারপর যখন তাদের ফরমায়েশী মুজিজা দেখানো হয়নি, তখন তাদেরতো ‎কেবল এই অধিকার ছিল যে, তারা বলবে যে, ‘আমাদের দাবিকৃত মুজিজা নবীজী সা. দেখাতে পারেনি’। কিন্তু তারা উল্টো ‎অপপ্রচার শুরু করল যে, নবীজী সা. এর কোন মুজিজা’ই নেই।

এটার উপমা এমন যে, এক ব্যক্তি এসে বলল-‘আমি অনেক গোনাহগার। ষাট বছর বয়স হয়ে গেছে। কখনো নামায পড়িনি। ‎আজ তওবা করতে এলাম। আপনি আমাকে নামায পড়ার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি শিক্ষা দিন। কিন্তু একটি শর্ত আছে। সেটা হল নামাযের ‎রাকাত সংখ্যা ও কুরআন থেকে দেখাতে হবে। সানা পড়ার বিষয়টিও। তাশাহুদ, দরুদ শরীফের শব্দও কুরআন থেকে দেখাতে ‎হবে। কারণ আমি আল্লাহর ইবাদত কেবল তার কিতাব থেকেই করতে চাই। অন্য কারো কথা মানিনা’। তাহলে কি তুমি তাকে ‎এই সব বিষয় কুরআন থেকে দেখাতে পারবে? যদি না দেখাতে পার, আর সে একথা বলতে শুরু করে যে, ‘কুরআন থেকে ‎নামায শিখাতে পারনা’। তার এই কথা বলা ঠিক আছে। কিন্তু সে যদি এটা বলতে শুরু করে যে, এই মাসআলার কোন প্রমাণই ‎নাই!! তাহলে একথাটি কি ভুল নয়? এটাকেই বলে দলিলকে খাস করে ফেলা। ‎

যদি কোন আদালতের সাথে এরকম আচরণ করা হয়, তাহলে আদালত সারা জীবনেও কোন মামলা নিষ্পত্তি করতে পারবেনা। ‎যেমন-আদালত বাদির কাছে তার নিজের পক্ষে স্বাক্ষী পেশ করার জন্য বলল। তখন বাদি যদি কোন স্বাক্ষি পেশ করে তাহলে ‎উক্ত স্বাক্ষির খুঁত বের করার তোমার পূর্ণ হক আছে। কিন্তু বিশেষ দলিলের উপর তোমার জিদ ধরাকে আদালত মানবেনা। ‎যেমন বাদি যায়েদকে স্বাক্ষি বানাল। তোমাকে আদালত বলল –এই স্বাক্ষির কোন খুঁত থাকলে তুমি বল। কিন্তু তুমি যদি বল-‎‎‘আমি একে স্বাক্ষিই মানিনা। বরং বাদশা বা তার নায়েব যদি স্বাক্ষি দেয় তাহলে আমি মানব’। তাহলে কি আদালত তোমার ‎এই উদ্ভট কথা মানবে?”‎

ঈমান নবীর উপর নাকি শর্তের উপর?‎

হযরত আরো বলেন-“কাফেররা নবীর উপর বিশ্বাস রাখেনি, রেখেছে তাদের দাবিকৃত বিষয়ের উপর। এমনিভাবে তুমি মন ‎থেকে এই কথা দূরিভূত করে দাও যে, তোমাদের ঈমান নবী সা. এর উপর। কখনোই নয়। বরং তোমাদের ঈমান হল ‎তোমাদের উস্তাদের শর্তের উপর। যেমন কাফেররা নবী সা. কে বলত যে, ‘যা আমরা বলছি, তা আল্লাহ তায়ালা থেকে বলিয়ে ‎নাও। অথবা আল্লাহ তায়ালা থেকে করিয়ে নাও। যদি এমন করতে পার তাহলে তা মানব। নতুবা নয়। এমনিভাবে তোমাদের ‎উস্তাদ তোমাদের একটি ইবারত লিখে দেয়, আর বলে যে, এর হুবহু শব্দ আল্লাহর নবী সা. থেকে বলিয়ে নাও। তাহলে আমরা ‎মানব। নতুবা এর আগে নবীজী সা. যা কিছু নিজে বলেছেন তা আমরা মানবনা”।

আমি মনে মনে বুঝতে ছিলাম। মাওলানা সাহেব যা কিছু বলছেন ঠিকইতো বলছেন। আমাদের যদি হাজারো হাদিস শুনিয়ে ‎দেয়া হয়, আমরা তা মানিনা। বরং এসব বাতিল বলে ছেড়ে দেই। কারণ আমাদের উস্তাদ যে শব্দ বলেছেন তা হুজুর সা. কেন ‎বলেননি এই কারণে। এটাতো খোদ নবীজী সা. কে পরামর্শ দেয়া যে, আপনি যদি কোন মাসআলা বলতে চান, তাহলে শব্দ ‎আমাদের থেকে জেনে নিন। আর শর্তও আমাদের জিজ্ঞেস করে নিন। কেননা যদি আমাদের শর্ত মেনে আমাদের অনুকূল শব্দ ‎আপনি না বলেন, তাহলে আমরা তা কখনোই মানবনা।

একটি প্রশ্ন

আমি বললাম-“হযরত! আপনি নিজেওতো এমন প্রশ্ন বানাতে পারেন, যাতে শুধু হাদিস জানতে চাওয়া হবে। আর সাথে সাথে ‎পুরস্কারের ওয়াদা থাকবে এতে। আর আমাদের উস্তাদও এ ধরণের হাদিস পেশ করতে সক্ষম হবেনা। বরং একে কেবল ধোঁকা ‎বলতে পারবে। যেমন এই প্রশ্নগুলিকে ধোঁকা বলেছেন”। হযরত মুচকি হাসি দিয়ে বললেন-“কি ধোঁকাও ভাল কাজ যে, আমি ‎তা করতে শুরু করব?”‎

আমি বললাম-“আমাকে বুঝানোর জন্য আপনি অবশ্যই একটি প্রশ্ন বানিয়ে দিন”। একথা শুনে হযরত এই প্রচারপত্রের ‎উল্টোপিঠে একটি প্রশ্ন লিখলেন যে, “আপনি নিজের শর্তানুযায়ী একটি সহীহ, সুষ্পষ্ট, মারফু’ গায়রে মাজরুহ এমন হাদিস পেশ ‎করুন। যাতে প্রমাণিত হয় যে, শরয়ী দলিল শুধুমাত্র সহীহ, সুষ্পষ্ট, মারফু’ গায়রে মাজরুহ হাদিসের উপরই নির্ভরশীল। যদি ‎এমন হাদিস দেখাতে পারেন, তাহলে আমি আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার দিব”। মাওলানা সাহেব এটা লিখে ‎এর উপর দস্তখত করে দিলেন। আমি তখন ভাবতে ছিলাম। আমার উস্তাদ বলতেন যে, চ্যালেঞ্জতো পঞ্চাশ হাজার টাকার কমে ‎করবেনা। কিন্তু পাঁচ পয়সার চ্যালেঞ্ছের উপরও কখনো দস্তখত করবেনা। অথচ মাওলানা সাহেব নিশ্চিন্তমনে পঞ্চাশ হাজার ‎টাকার চ্যালেঞ্ছের উপর দস্তখত করে দিলেন!! ‎

প্রত্যাবর্তন

আসি তারপর সেই প্রচারপত্রটি নিয়ে উঠলাম। ফিরে এলাম। উস্তাদজি ব্যাকুল হয়ে আমার অপেক্ষায় গেটে পাইচারী করছেন। ‎আমাকে দেখেই বলে উঠলেন-“কেউ আমার ইশতিহারের উপর হাত লাগাতে পারেনা”। আমি বললাম-“আজতো ভাল করেই ‎হাত লাগিয়ে দিল একজন। আর তিনি নিজেও একটি হাদিস আপনার কাছ থেকে জানতে পাঠাল। আপনি যদি তা লিখে দিতে ‎পারেন, তাহলে তিনি আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কার দিবেন। তিনি দস্তখতও করে দিয়েছেন। উস্তাদজি! আপনি হাদিস ‎লিখে দিন, আমি পুরস্কার নিয়ে আসি”। ডিসেম্বরের তীব্র শীতের সময় ছিল। উস্তাদজি প্রশ্নটি একবার পড়তেই তিন বার কপাল ‎থেকে ঘাম মুছলেন। উস্তাদজির ঘামের তীব্রতা দেখে প্রশ্নের ওজন আমার আন্দাজ হয়ে যায়। এদিকে মহান আল্লাহ তায়ালার ‎পক্ষ থেকে আমার হিদায়াতের সময় ঘনিয়ে আসছিল। উস্তাদজি প্রশ্নটি শেষ করেই প্রথমে বললেন-“এই শর্তটি ধোঁকাবাজীর ‎জন্য লাগানো হয়েছে”। একথা শুনেই আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সড়ে গেল। আমি বললাম-“হযরত! ধোঁকা দ্বীনের ‎মাঝে? আবার কুরআন ও হাদিসের মাঝে? একথাইতো আমাকে আজ মাওলানা সাহেব বুঝালেন যে, আমাদের ঈমান নবী সা. ‎এর উপর নয়, বরং উস্তাদের বানানো শর্তের উপর! আর আজ আপনি নিজেই নিজের শর্তকে ধোঁকা বলছেন? তাহলে আমি যাব ‎কোথায়?” ‎

‎ না পাইলাম মুর্তি না পাইলাম স্রষ্টারে, না আছে এদিকে পথ না আছে ওদিকেরে।

আরো একটি প্রশ্ন

উস্তাদজির ক্লাশরুমে টেবিলের উপর তার কিতাবাদীর কপি থাকত। এর মাঝে মোটা মোটা দু’টি কপি ছিল। একটির উপর ‎লিখা-“দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর বুখারী শরীফের তাক্বরীর”। আর অন্যটির উপর ‎লিখা “দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক সাইয়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এর তিরমিযী শরীফের তাক্বরীর”। ‎একদিন আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম-“উস্তাদজি! এই মুশরিকদের কিতাব আপনার কাছে কেন রাখেন?” সে সময় ‎ওলামায়ে আহনাফকে মুশরিক বলাটা আমাদের কাছে অনেক সওয়াবের কাজ আর উস্তাদজিকে খুশি করার মুক্ষম পদ্ধতি ছিল। ‎উস্তাদে মুহতারাম এতে খুব খুশি হলেন। সাবাশ দিতে দিতে বললেন-“বেটা! মাসআলার ব্যাপারে আমাদের সাথে তাদের ‎মতভেদ আছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের জ্ঞান দ্বারা ভরপুর করে দিয়েছেন। আমি এই কপিগুলি পড়া ছাড়া না বুখারী পড়তে ‎পারি। না তিরমিযী”। হযরতের এই কথা আমার মনে ধাক্কা দিল। আমি বললাম-“উস্তাদজি! আপনি ধোঁকাবাজি এই লোকদের ‎সাথে করছেন। যাদের কপি পড়া ছাড়া আপনি বুখারী বুঝেন না, বুঝেন না তিরমিযীও”। উস্তাদজি আমার কথা শুনে আমাকে ‎বললেন-“যাও! এখান থেকে চলে যাও! এখানে আর কখানো আসবেনা”। আমি বললাম-“উস্তাদজি! আপনি হাদিসটা লিখে ‎দিন। আমি পুরস্কার নিয়ে আসি”। উস্তাদজি রেগে আমাকে একটি থাপ্পড় মারলেন-“ভাগো এখান থেকে!”‎

দ্বিতীয়বার হযরতের কাছে গমণ

সেদিন আসরের পর আমি হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির সাহেবের খিদমতে হাজির হলাম। আমি তাকে বললাম-“হযরত! ‎এই কথাতো নিশ্চিত হয়ে গেল যে, এই প্রশ্নগুলি কেবলি ধোঁকাবাজি। কিন্তু আমাকে এটা বলুন যে, আপনারা হাদিসের বিপরীতে ‎ইমাম আবু হানীফার কথাকে কেন প্রাধান্য দিয়ে থাকেন?” হযরত বললেন-“এটা পুরোপুরি মিথ্যা কথা!” হযরত আমাকে ‎পড়ার জন্য ‘ইলাউস সুনান’ কিতাবটি দিলেন। যার সাথে উর্দু অনুবাদও ছিল। তারপর যখন আমি হাদিস পড়তে শুরু করলাম ‎তখন অবাক হয়ে গেলাম! এটা কত বড় মিথ্যা! যা আমরা সকাল সন্ধ্যা জপ করি! ‎

একদিন আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করি যে, “উস্তাদজি! ‘ইলাউস সুনানে’ থাকা হাদিস আপনি কেন মানেন না? আর এসবের ‎উপর আমলকারীকে আপনি যুক্তিপূজারী বলেন কেন? আর এই কিতাবের কোন পূর্ণাঙ্গ জবাব কোন গায়রে মুকাল্লিদ লিখে ‎থাকলে তা আমাকে বলুন। আমি সেটাও পড়ব”। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের পর আমি বুঝতে পারি এর জবাব দেবার ক্ষমতা সারা ‎দুনিয়ার গায়রে মুকাল্লিদদের নেই। ‎

আমি সেই ইলাউস সুনান কিতাবটি সেই মাদরাসায় বসেই পড়তাম। তখন উস্তাদজি খুবই রাগ করতেন। কখনো কখনো ‎আমাকে মেরেছেনও। আমার বুঝে আসতনা যে, আহলে হাদিস হাদিসের এত দুশমন কেন? আমি বলতাম-“আপনি আমাকে ‎হাদিস কেন পড়তে দেন না?” তিনি শুধু একটি কথাই ধমকের সাথে বলতেন যে, “এই হাদিসের কিতাব তুমি আমার ‎মাদরাসায় বসে পড়তে পারবে না”। ‎

আমি একদিন মসজিদের দেয়ালে সুন্দর করে এই হাদিস লিখে দিলাম যে, “হুজুর সা. থেকে নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত ‎আছে যে, ‎اسفروا بالفجر فانه اعظم للأجر‎ অর্থাৎ নবীজী সা. ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা ফজরের নামায ফর্সা হলে পড় তাহলে ‎সওয়াব বেশি পাবে। সেদিন শোরগোল লেগে গেল। “এই হাদিস কে লিখল? কেন লিখল? প্রহার কর তাকে। বহিস্কার কর ‎তাকে”।

পরদিন দেয়ালে এই হাদিস লিখলাম যে, ‎ابردوا بالصلاة فان شدة الحر من فيح جهنم‎ অর্থাৎ তোমরা জোহরের নামায ঠান্ডা অবস্থায় ‎পড়, কেননা তীব্র গরম জাহান্নামের শ্বাস থেকে হয়”। এ কারণে আমাকে জবাবদিহী করতে হয়েছে। আমাকে বলা হয়-“তুমি ‎ফেতনা সৃষ্টি করছ কেন?” পরের নামাযের আগে আমি দেয়ালে এই হাদিস লিখে দিলাম যে, “‎فقيه واحد اشد على الشيطان من الف ‏عابد‎ এক ফক্বীহ শয়তানের উপর এক হাজার আবেদের চে’ শক্তিশালী। আমি আন্দাজ করে নিলাম-এই সকল লোকদের ‎হাদিসের প্রতি যতটা বিদ্বেষ আর কারো এমনটি নেই।

তৃতীয়বার

আমি আবার মাওলানা সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলাম-“তাক্বলীদে শখসী কাকে বলে?” আমি ‎বললাম-“শিরক”। ‎

‎-“যত মুহাদ্দিসগণের উল্লেখ তবক্বাতে হানাফিয়্যা, তবক্বাতে মালিকিয়্যাহ, তবক্বাতে শাফিয়িয়্যাহ, আর তবক্বাতে হানাবেলার ‎মাঝে আছে এই সবাই কি মুশরিক?” ‎

আমি বললাম-“নিঃসন্দেহে”। ‎

‎-“তাহলেতো সিহাহ সিত্তাহ লিখকরা সব মুশরিক হয়ে যায়। তুমি কি বুলুগুল মারাম পড়? ইবনে হাজার শাফেয়ীও তাহলে ‎মুশরিক হয়ে গেছেন! তুমিতো নাসায়ী শরীফ পড়? তিনিওতো ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মুকাল্লিদ। সুতরাং মুশরিক”। ‎

এসব কথা শুনে আমি উস্তাদের কাছে এলাম। জিজ্ঞেস করলাম-“কোন মুহাদ্দিস বা গ্রহণযোগ্য কোন ইতিহাসবিদ ‎মুহাদ্দিসীনদের তালিকায় কোন কিতাব তবক্বাতে গায়রে মুকাল্লিদীনদের নামে লিখেছেন? লিখে থাকলে আমাকে দেখান”। ‎উস্তাদ সাহেব খুব নারাজ হলেন। “তুমি ফেতনাবাজী শুরু করেছো! ছাত্রদের ‘ইলাউস সুনানের’ হাদিস শুনাচ্ছো! আর ‎মসজিদের দেয়ালে হাদিস লিখে লিখে লাগাচ্ছ! আমরা এ বিষয়টি সহ্য করব না। তুমি এসব করা বন্ধ কর। হাদিস শুনানো আর ‎লিখা থেকে ফিরে আস। নতুবা মাদরাসা থেকে বের হয়ে যাও। আমাদের কাছে তবক্বাতে গায়রে মুকাল্লিদীনদের কোন কিতাব ‎নেই”। ‎

আমি আবার হযরতের কাছে এলাম। হযরত বললেন-“ইংরেজদের শাসনামলের পূর্বে গায়রে মুকাল্লিদদের কোন কিতাব, কোন ‎মাদরাসা, কোন কবর, কোন তরজমায়ে কুরাআন, কোন তরজমায়ে হাদিস ছিলনা। থাকলে দেখাও। তাদের লেখা কোন ‎নামাযের পূর্ণাঙ্গ কিতাব থাকলে দেখাও”। এসব কথা আমি যখন আমার উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম তখন তার চেহারা ‎ফ্যাকাসে হয়ে যায়। অগ্নিশর্মা হয়ে আমাকে বললেন-“ফিতনাবাজী ছাড়া তোমার আর কোন কাজ নেই?”‎

একটি মজার ঘটনা

একদিন নাসায়ী শরীফের ক্লাশ চলছিল। পড়া চলছিল “ক্বিরাত খালফাল ইমাম” নিয়ে। আমিও ক্লাশে ছিলাম। কিন্তু কিতাব ‎হাতে ছিলনা। উস্তাদজি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমার কিতাব কই?” ‎

আমি বললাম-“কামরায়”।

‎-“নিয়ে আসনি কেন?” রেগে বললেন উস্তাদজি।

‎-“এটাতো মুশরিকের লেখা কিতাব। আমি এতে হাত লাগাব কেন?”‎

উস্তাদজি প্রচন্ড শকট খেলেন। চুপ হয়ে গেলেন। ইমাম নাসায়ী নিজেই অধ্যায় স্থাপন করেছেন-‎باب تأويل قوله تعالى واذا قرئ ‏القرآن فاستمعوا له وانصتوا لعلكم ترحمون‎ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বাণী-“যখন তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন ‎তোমরা তা শোন, এবং চুপ থাক যেন তোমাদের উপর রহম করা হয়” এর ব্যাক্ষা। এর পর তিনি হাদিস আনলেন-‎اذا قرأ ‏‎ ‎فانصتوا‎ অর্থাৎ “যখন তিলাওয়াত করা হয় তখন চুপ থাক”। যেন আল্লাহ এবং তার রাসূল উভয়েই বলছেন-“যখন ইমাম ‎ক্বিরাত শুরু করবে, তখন মুক্তাদীরা চুপ থাকবে”। এই আয়াত এবং হাদিস উস্তাদজির মতের বিপরীত ছিল। উস্তাদজি এই ‎হাদিসকে বাতিল করার জন্য কসরত শুরু করলেন। বললেন-“আবু খালিদ আহমর মুদাল্লিস (যিনি ধোঁকাবাজী করেন)। এই ‎হাদিসটি মিথ্যা। আবু খালেদ আহমরের কোন মুতাবি’ (অনুসারী) দুনিয়াতে কোন হাদিসের কিতাবে নেই। আমি আল্লামা ‎আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী সাহেবের সাথে কথা বলেছি, তিনিও তার কোন মুতাবি’ দেখাতে পারেন নি। আমি আট দশটি বিতর্ক ‎অনুষ্ঠানে তা উত্থাপন করেছি, কেউ এর সঠিক জবাব দিতে পারেনি”। ‎

আমিতো মুতালাআ করে বসেছিলাম। মনে মনে উস্তাদজির এই মিথ্যাচারের কারণে প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল। কিন্তু চুপ করে রইলাম। ‎উস্তাদজির দৃষ্টি আমার উপর নিপতিত হল। বললেন-“ঐ হানাফী! খালেদের কোন মুতাবি’ আছে?” অথচ আমি তখনো হানাফী ‎হইনি। রাগের বশে তিনি আমাকে হানাফী বলে সম্বোধন করলেন। ‎

আমি বললাম-“উস্তাদজি আপনি মুখ উপরের দিকে করে বসে থাকেন। তাই আপনার মুতাবি’ চোখে পরেনা। আপনি আপনার ‎চোখটা একটু কিতাবের দিকে বুলান। দেখুন এই কিতাবেই মুতাবি’ মুহাম্মদ বিন সাআদ আনসারী বিদ্যমান আছে। আমি উঠে ‎গিয়ে আঙ্গুলি সেই রাবীর উপর ধরলাম”। উস্তাদজি এবার রাগে গালাগালি শুরু করে দিলেন। আমি আস্তে করে তাসবীহ বের ‎করে তার সামনে রেখে দিলাম। তিনি বললেন-“এটা কি?” আমি বললাম-“আপনি আপনার গালির যেই তাসবীহ আছে সেটা ‎শেষ করুন। তারপর আমাকে বলুন আপনার সামনে থাকা এই মুতবি’ কেন আপনার চোখে পরেনি?” একথা শুনেই তিনি ‎আমাকে লাঠি দিয়ে পিটাতে শুরু করলেন। আর আমাকে মাদরাসা থেকে বাহির করে দিলেন। ‎

এখন আমি ইলাউস সুনান আর হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাসান সাহেব মুহাদ্দিসে ফয়েজপুরী রহ. এর “সিত্তা জরুরিয়্যা” “আদ ‎দালিলুল মুবীন” ইত্যাদী পড়তে লাগলাম। তখনো আমার মাথা থেকে গায়রে মুকাল্লিদিয়্যাতের ভূত নামেনি। যখনি কোন ‎ফিক্বহী মাসআলা দেখতাম। তখনি এর পক্ষে কোন হাদিস আছে কিনা এর পিছনে লেগে যেতাম। কয়েক মাস পর আমার মন ‎হঠাৎ পাল্টে গেল। এখন আমি যখন কোন আয়াত ও হাদিস দেখি তখন এই প্রশ্ন মনে জাগরিত হয় যে, আমি যা বুঝছি তা কি ‎মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মত নতুন? না আমাদের আকাবীর ও পূর্বসূরীরা ও এমনি বুঝেছিলেন। ‎

তো এখন আর নিজস্ব মতামত আর নিজের জ্ঞানের উপর পূর্ণ নির্ভরশীলতার রোগ ব্রেইন থেকে দূরিভূত হয়েছে। আর গায়রে ‎মুকাল্লিদিয়্যাতের অসুখটাও মন থেকে সেরে গেছে। আর আমি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হানাফী মতাদর্শী হয়ে গেলাম। ‎

দুআ করবেন-আল্লাহ তায়ালা যেন এই সত্য মত ও পথের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দেন। আমীন।

তাযাল্লিয়াতে সফদর (আমি যেভাবে হানাফী হলাম-শেষ পর্ব)

বিশেষ দলিল চাওয়া

তিনি বললেন-“বাদীর কাছে প্রমাণতো চাওয়া যায়, কিন্তু বিশেষ প্রমাণ চাওয়া বৈধ নয়। এটাতো কাফেরদের তরীকা ছিল। ‎তারা সে সকল মুজিজাকে মানত না, যা নবীজী সা. থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বরং তারা নিজেদের পক্ষ থেকে শর্ত লাগিয়ে ‎ফরমায়েশী মুজিজা দেখানোর জন্য আবেদন করল। তারপর যখন তাদের ফরমায়েশী মুজিজা দেখানো হয়নি, তখন তাদেরতো ‎কেবল এই অধিকার ছিল যে, তারা বলবে যে, ‘আমাদের দাবিকৃত মুজিজা নবীজী সা. দেখাতে পারেনি’। কিন্তু তারা উল্টো ‎অপপ্রচার শুরু করল যে, নবীজী সা. এর কোন মুজিজা’ই নেই।

এটার উপমা এমন যে, এক ব্যক্তি এসে বলল-‘আমি অনেক গোনাহগার। ষাট বছর বয়স হয়ে গেছে। কখনো নামায পড়িনি। ‎আজ তওবা করতে এলাম। আপনি আমাকে নামায পড়ার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি শিক্ষা দিন। কিন্তু একটি শর্ত আছে। সেটা হল নামাযের ‎রাকাত সংখ্যা ও কুরআন থেকে দেখাতে হবে। সানা পড়ার বিষয়টিও। তাশাহুদ, দরুদ শরীফের শব্দও কুরআন থেকে দেখাতে ‎হবে। কারণ আমি আল্লাহর ইবাদত কেবল তার কিতাব থেকেই করতে চাই। অন্য কারো কথা মানিনা’। তাহলে কি তুমি তাকে ‎এই সব বিষয় কুরআন থেকে দেখাতে পারবে? যদি না দেখাতে পার, আর সে একথা বলতে শুরু করে যে, ‘কুরআন থেকে ‎নামায শিখাতে পারনা’। তার এই কথা বলা ঠিক আছে। কিন্তু সে যদি এটা বলতে শুরু করে যে, এই মাসআলার কোন প্রমাণই ‎নাই!! তাহলে একথাটি কি ভুল নয়? এটাকেই বলে দলিলকে খাস করে ফেলা। ‎

যদি কোন আদালতের সাথে এরকম আচরণ করা হয়, তাহলে আদালত সারা জীবনেও কোন মামলা নিষ্পত্তি করতে পারবেনা। ‎যেমন-আদালত বাদির কাছে তার নিজের পক্ষে স্বাক্ষী পেশ করার জন্য বলল। তখন বাদি যদি কোন স্বাক্ষি পেশ করে তাহলে ‎উক্ত স্বাক্ষির খুঁত বের করার তোমার পূর্ণ হক আছে। কিন্তু বিশেষ দলিলের উপর তোমার জিদ ধরাকে আদালত মানবেনা। ‎যেমন বাদি যায়েদকে স্বাক্ষি বানাল। তোমাকে আদালত বলল –এই স্বাক্ষির কোন খুঁত থাকলে তুমি বল। কিন্তু তুমি যদি বল-‎‎‘আমি একে স্বাক্ষিই মানিনা। বরং বাদশা বা তার নায়েব যদি স্বাক্ষি দেয় তাহলে আমি মানব’। তাহলে কি আদালত তোমার ‎এই উদ্ভট কথা মানবে?”‎

ঈমান নবীর উপর নাকি শর্তের উপর?‎

হযরত আরো বলেন-“কাফেররা নবীর উপর বিশ্বাস রাখেনি, রেখেছে তাদের দাবিকৃত বিষয়ের উপর। এমনিভাবে তুমি মন ‎থেকে এই কথা দূরিভূত করে দাও যে, তোমাদের ঈমান নবী সা. এর উপর। কখনোই নয়। বরং তোমাদের ঈমান হল ‎তোমাদের উস্তাদের শর্তের উপর। যেমন কাফেররা নবী সা. কে বলত যে, ‘যা আমরা বলছি, তা আল্লাহ তায়ালা থেকে বলিয়ে ‎নাও। অথবা আল্লাহ তায়ালা থেকে করিয়ে নাও। যদি এমন করতে পার তাহলে তা মানব। নতুবা নয়। এমনিভাবে তোমাদের ‎উস্তাদ তোমাদের একটি ইবারত লিখে দেয়, আর বলে যে, এর হুবহু শব্দ আল্লাহর নবী সা. থেকে বলিয়ে নাও। তাহলে আমরা ‎মানব। নতুবা এর আগে নবীজী সা. যা কিছু নিজে বলেছেন তা আমরা মানবনা”।

আমি মনে মনে বুঝতে ছিলাম। মাওলানা সাহেব যা কিছু বলছেন ঠিকইতো বলছেন। আমাদের যদি হাজারো হাদিস শুনিয়ে ‎দেয়া হয়, আমরা তা মানিনা। বরং এসব বাতিল বলে ছেড়ে দেই। কারণ আমাদের উস্তাদ যে শব্দ বলেছেন তা হুজুর সা. কেন ‎বলেননি এই কারণে। এটাতো খোদ নবীজী সা. কে পরামর্শ দেয়া যে, আপনি যদি কোন মাসআলা বলতে চান, তাহলে শব্দ ‎আমাদের থেকে জেনে নিন। আর শর্তও আমাদের জিজ্ঞেস করে নিন। কেননা যদি আমাদের শর্ত মেনে আমাদের অনুকূল শব্দ ‎আপনি না বলেন, তাহলে আমরা তা কখনোই মানবনা।

একটি প্রশ্ন

আমি বললাম-“হযরত! আপনি নিজেওতো এমন প্রশ্ন বানাতে পারেন, যাতে শুধু হাদিস জানতে চাওয়া হবে। আর সাথে সাথে ‎পুরস্কারের ওয়াদা থাকবে এতে। আর আমাদের উস্তাদও এ ধরণের হাদিস পেশ করতে সক্ষম হবেনা। বরং একে কেবল ধোঁকা ‎বলতে পারবে। যেমন এই প্রশ্নগুলিকে ধোঁকা বলেছেন”। হযরত মুচকি হাসি দিয়ে বললেন-“কি ধোঁকাও ভাল কাজ যে, আমি ‎তা করতে শুরু করব?”‎

আমি বললাম-“আমাকে বুঝানোর জন্য আপনি অবশ্যই একটি প্রশ্ন বানিয়ে দিন”। একথা শুনে হযরত এই প্রচারপত্রের ‎উল্টোপিঠে একটি প্রশ্ন লিখলেন যে, “আপনি নিজের শর্তানুযায়ী একটি সহীহ, সুষ্পষ্ট, মারফু’ গায়রে মাজরুহ এমন হাদিস পেশ ‎করুন। যাতে প্রমাণিত হয় যে, শরয়ী দলিল শুধুমাত্র সহীহ, সুষ্পষ্ট, মারফু’ গায়রে মাজরুহ হাদিসের উপরই নির্ভরশীল। যদি ‎এমন হাদিস দেখাতে পারেন, তাহলে আমি আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার দিব”। মাওলানা সাহেব এটা লিখে ‎এর উপর দস্তখত করে দিলেন। আমি তখন ভাবতে ছিলাম। আমার উস্তাদ বলতেন যে, চ্যালেঞ্জতো পঞ্চাশ হাজার টাকার কমে ‎করবেনা। কিন্তু পাঁচ পয়সার চ্যালেঞ্ছের উপরও কখনো দস্তখত করবেনা। অথচ মাওলানা সাহেব নিশ্চিন্তমনে পঞ্চাশ হাজার ‎টাকার চ্যালেঞ্ছের উপর দস্তখত করে দিলেন!! ‎

প্রত্যাবর্তন

আসি তারপর সেই প্রচারপত্রটি নিয়ে উঠলাম। ফিরে এলাম। উস্তাদজি ব্যাকুল হয়ে আমার অপেক্ষায় গেটে পাইচারী করছেন। ‎আমাকে দেখেই বলে উঠলেন-“কেউ আমার ইশতিহারের উপর হাত লাগাতে পারেনা”। আমি বললাম-“আজতো ভাল করেই ‎হাত লাগিয়ে দিল একজন। আর তিনি নিজেও একটি হাদিস আপনার কাছ থেকে জানতে পাঠাল। আপনি যদি তা লিখে দিতে ‎পারেন, তাহলে তিনি আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কার দিবেন। তিনি দস্তখতও করে দিয়েছেন। উস্তাদজি! আপনি হাদিস ‎লিখে দিন, আমি পুরস্কার নিয়ে আসি”। ডিসেম্বরের তীব্র শীতের সময় ছিল। উস্তাদজি প্রশ্নটি একবার পড়তেই তিন বার কপাল ‎থেকে ঘাম মুছলেন। উস্তাদজির ঘামের তীব্রতা দেখে প্রশ্নের ওজন আমার আন্দাজ হয়ে যায়। এদিকে মহান আল্লাহ তায়ালার ‎পক্ষ থেকে আমার হিদায়াতের সময় ঘনিয়ে আসছিল। উস্তাদজি প্রশ্নটি শেষ করেই প্রথমে বললেন-“এই শর্তটি ধোঁকাবাজীর ‎জন্য লাগানো হয়েছে”। একথা শুনেই আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সড়ে গেল। আমি বললাম-“হযরত! ধোঁকা দ্বীনের ‎মাঝে? আবার কুরআন ও হাদিসের মাঝে? একথাইতো আমাকে আজ মাওলানা সাহেব বুঝালেন যে, আমাদের ঈমান নবী সা. ‎এর উপর নয়, বরং উস্তাদের বানানো শর্তের উপর! আর আজ আপনি নিজেই নিজের শর্তকে ধোঁকা বলছেন? তাহলে আমি যাব ‎কোথায়?” ‎

‎ না পাইলাম মুর্তি না পাইলাম স্রষ্টারে, না আছে এদিকে পথ না আছে ওদিকেরে।

আরো একটি প্রশ্ন

উস্তাদজির ক্লাশরুমে টেবিলের উপর তার কিতাবাদীর কপি থাকত। এর মাঝে মোটা মোটা দু’টি কপি ছিল। একটির উপর ‎লিখা-“দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর বুখারী শরীফের তাক্বরীর”। আর অন্যটির উপর ‎লিখা “দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক সাইয়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. এর তিরমিযী শরীফের তাক্বরীর”। ‎একদিন আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম-“উস্তাদজি! এই মুশরিকদের কিতাব আপনার কাছে কেন রাখেন?” সে সময় ‎ওলামায়ে আহনাফকে মুশরিক বলাটা আমাদের কাছে অনেক সওয়াবের কাজ আর উস্তাদজিকে খুশি করার মুক্ষম পদ্ধতি ছিল। ‎উস্তাদে মুহতারাম এতে খুব খুশি হলেন। সাবাশ দিতে দিতে বললেন-“বেটা! মাসআলার ব্যাপারে আমাদের সাথে তাদের ‎মতভেদ আছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের জ্ঞান দ্বারা ভরপুর করে দিয়েছেন। আমি এই কপিগুলি পড়া ছাড়া না বুখারী পড়তে ‎পারি। না তিরমিযী”। হযরতের এই কথা আমার মনে ধাক্কা দিল। আমি বললাম-“উস্তাদজি! আপনি ধোঁকাবাজি এই লোকদের ‎সাথে করছেন। যাদের কপি পড়া ছাড়া আপনি বুখারী বুঝেন না, বুঝেন না তিরমিযীও”। উস্তাদজি আমার কথা শুনে আমাকে ‎বললেন-“যাও! এখান থেকে চলে যাও! এখানে আর কখানো আসবেনা”। আমি বললাম-“উস্তাদজি! আপনি হাদিসটা লিখে ‎দিন। আমি পুরস্কার নিয়ে আসি”। উস্তাদজি রেগে আমাকে একটি থাপ্পড় মারলেন-“ভাগো এখান থেকে!”‎

দ্বিতীয়বার হযরতের কাছে গমণ

সেদিন আসরের পর আমি হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির সাহেবের খিদমতে হাজির হলাম। আমি তাকে বললাম-“হযরত! ‎এই কথাতো নিশ্চিত হয়ে গেল যে, এই প্রশ্নগুলি কেবলি ধোঁকাবাজি। কিন্তু আমাকে এটা বলুন যে, আপনারা হাদিসের বিপরীতে ‎ইমাম আবু হানীফার কথাকে কেন প্রাধান্য দিয়ে থাকেন?” হযরত বললেন-“এটা পুরোপুরি মিথ্যা কথা!” হযরত আমাকে ‎পড়ার জন্য ‘ইলাউস সুনান’ কিতাবটি দিলেন। যার সাথে উর্দু অনুবাদও ছিল। তারপর যখন আমি হাদিস পড়তে শুরু করলাম ‎তখন অবাক হয়ে গেলাম! এটা কত বড় মিথ্যা! যা আমরা সকাল সন্ধ্যা জপ করি! ‎

একদিন আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করি যে, “উস্তাদজি! ‘ইলাউস সুনানে’ থাকা হাদিস আপনি কেন মানেন না? আর এসবের ‎উপর আমলকারীকে আপনি যুক্তিপূজারী বলেন কেন? আর এই কিতাবের কোন পূর্ণাঙ্গ জবাব কোন গায়রে মুকাল্লিদ লিখে ‎থাকলে তা আমাকে বলুন। আমি সেটাও পড়ব”। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের পর আমি বুঝতে পারি এর জবাব দেবার ক্ষমতা সারা ‎দুনিয়ার গায়রে মুকাল্লিদদের নেই। ‎

আমি সেই ইলাউস সুনান কিতাবটি সেই মাদরাসায় বসেই পড়তাম। তখন উস্তাদজি খুবই রাগ করতেন। কখনো কখনো ‎আমাকে মেরেছেনও। আমার বুঝে আসতনা যে, আহলে হাদিস হাদিসের এত দুশমন কেন? আমি বলতাম-“আপনি আমাকে ‎হাদিস কেন পড়তে দেন না?” তিনি শুধু একটি কথাই ধমকের সাথে বলতেন যে, “এই হাদিসের কিতাব তুমি আমার ‎মাদরাসায় বসে পড়তে পারবে না”। ‎

আমি একদিন মসজিদের দেয়ালে সুন্দর করে এই হাদিস লিখে দিলাম যে, “হুজুর সা. থেকে নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত ‎আছে যে, ‎اسفروا بالفجر فانه اعظم للأجر‎ অর্থাৎ নবীজী সা. ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা ফজরের নামায ফর্সা হলে পড় তাহলে ‎সওয়াব বেশি পাবে। সেদিন শোরগোল লেগে গেল। “এই হাদিস কে লিখল? কেন লিখল? প্রহার কর তাকে। বহিস্কার কর ‎তাকে”।

পরদিন দেয়ালে এই হাদিস লিখলাম যে, ‎ابردوا بالصلاة فان شدة الحر من فيح جهنم‎ অর্থাৎ তোমরা জোহরের নামায ঠান্ডা অবস্থায় ‎পড়, কেননা তীব্র গরম জাহান্নামের শ্বাস থেকে হয়”। এ কারণে আমাকে জবাবদিহী করতে হয়েছে। আমাকে বলা হয়-“তুমি ‎ফেতনা সৃষ্টি করছ কেন?” পরের নামাযের আগে আমি দেয়ালে এই হাদিস লিখে দিলাম যে, “‎فقيه واحد اشد على الشيطان من الف ‏عابد‎ এক ফক্বীহ শয়তানের উপর এক হাজার আবেদের চে’ শক্তিশালী। আমি আন্দাজ করে নিলাম-এই সকল লোকদের ‎হাদিসের প্রতি যতটা বিদ্বেষ আর কারো এমনটি নেই।

তৃতীয়বার

আমি আবার মাওলানা সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলাম-“তাক্বলীদে শখসী কাকে বলে?” আমি ‎বললাম-“শিরক”। ‎

‎-“যত মুহাদ্দিসগণের উল্লেখ তবক্বাতে হানাফিয়্যা, তবক্বাতে মালিকিয়্যাহ, তবক্বাতে শাফিয়িয়্যাহ, আর তবক্বাতে হানাবেলার ‎মাঝে আছে এই সবাই কি মুশরিক?” ‎

আমি বললাম-“নিঃসন্দেহে”। ‎

‎-“তাহলেতো সিহাহ সিত্তাহ লিখকরা সব মুশরিক হয়ে যায়। তুমি কি বুলুগুল মারাম পড়? ইবনে হাজার শাফেয়ীও তাহলে ‎মুশরিক হয়ে গেছেন! তুমিতো নাসায়ী শরীফ পড়? তিনিওতো ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মুকাল্লিদ। সুতরাং মুশরিক”। ‎

এসব কথা শুনে আমি উস্তাদের কাছে এলাম। জিজ্ঞেস করলাম-“কোন মুহাদ্দিস বা গ্রহণযোগ্য কোন ইতিহাসবিদ ‎মুহাদ্দিসীনদের তালিকায় কোন কিতাব তবক্বাতে গায়রে মুকাল্লিদীনদের নামে লিখেছেন? লিখে থাকলে আমাকে দেখান”। ‎উস্তাদ সাহেব খুব নারাজ হলেন। “তুমি ফেতনাবাজী শুরু করেছো! ছাত্রদের ‘ইলাউস সুনানের’ হাদিস শুনাচ্ছো! আর ‎মসজিদের দেয়ালে হাদিস লিখে লিখে লাগাচ্ছ! আমরা এ বিষয়টি সহ্য করব না। তুমি এসব করা বন্ধ কর। হাদিস শুনানো আর ‎লিখা থেকে ফিরে আস। নতুবা মাদরাসা থেকে বের হয়ে যাও। আমাদের কাছে তবক্বাতে গায়রে মুকাল্লিদীনদের কোন কিতাব ‎নেই”। ‎

আমি আবার হযরতের কাছে এলাম। হযরত বললেন-“ইংরেজদের শাসনামলের পূর্বে গায়রে মুকাল্লিদদের কোন কিতাব, কোন ‎মাদরাসা, কোন কবর, কোন তরজমায়ে কুরাআন, কোন তরজমায়ে হাদিস ছিলনা। থাকলে দেখাও। তাদের লেখা কোন ‎নামাযের পূর্ণাঙ্গ কিতাব থাকলে দেখাও”। এসব কথা আমি যখন আমার উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম তখন তার চেহারা ‎ফ্যাকাসে হয়ে যায়। অগ্নিশর্মা হয়ে আমাকে বললেন-“ফিতনাবাজী ছাড়া তোমার আর কোন কাজ নেই?”‎

একটি মজার ঘটনা

একদিন নাসায়ী শরীফের ক্লাশ চলছিল। পড়া চলছিল “ক্বিরাত খালফাল ইমাম” নিয়ে। আমিও ক্লাশে ছিলাম। কিন্তু কিতাব ‎হাতে ছিলনা। উস্তাদজি জিজ্ঞেস করলেন-“তোমার কিতাব কই?” ‎

আমি বললাম-“কামরায়”।

‎-“নিয়ে আসনি কেন?” রেগে বললেন উস্তাদজি।

‎-“এটাতো মুশরিকের লেখা কিতাব। আমি এতে হাত লাগাব কেন?”‎

উস্তাদজি প্রচন্ড শকট খেলেন। চুপ হয়ে গেলেন। ইমাম নাসায়ী নিজেই অধ্যায় স্থাপন করেছেন-‎باب تأويل قوله تعالى واذا قرئ ‏القرآن فاستمعوا له وانصتوا لعلكم ترحمون‎ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বাণী-“যখন তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন ‎তোমরা তা শোন, এবং চুপ থাক যেন তোমাদের উপর রহম করা হয়” এর ব্যাক্ষা। এর পর তিনি হাদিস আনলেন-‎اذا قرأ ‏‎ ‎فانصتوا‎ অর্থাৎ “যখন তিলাওয়াত করা হয় তখন চুপ থাক”। যেন আল্লাহ এবং তার রাসূল উভয়েই বলছেন-“যখন ইমাম ‎ক্বিরাত শুরু করবে, তখন মুক্তাদীরা চুপ থাকবে”। এই আয়াত এবং হাদিস উস্তাদজির মতের বিপরীত ছিল। উস্তাদজি এই ‎হাদিসকে বাতিল করার জন্য কসরত শুরু করলেন। বললেন-“আবু খালিদ আহমর মুদাল্লিস (যিনি ধোঁকাবাজী করেন)। এই ‎হাদিসটি মিথ্যা। আবু খালেদ আহমরের কোন মুতাবি’ (অনুসারী) দুনিয়াতে কোন হাদিসের কিতাবে নেই। আমি আল্লামা ‎আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী সাহেবের সাথে কথা বলেছি, তিনিও তার কোন মুতাবি’ দেখাতে পারেন নি। আমি আট দশটি বিতর্ক ‎অনুষ্ঠানে তা উত্থাপন করেছি, কেউ এর সঠিক জবাব দিতে পারেনি”। ‎

আমিতো মুতালাআ করে বসেছিলাম। মনে মনে উস্তাদজির এই মিথ্যাচারের কারণে প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল। কিন্তু চুপ করে রইলাম। ‎উস্তাদজির দৃষ্টি আমার উপর নিপতিত হল। বললেন-“ঐ হানাফী! খালেদের কোন মুতাবি’ আছে?” অথচ আমি তখনো হানাফী ‎হইনি। রাগের বশে তিনি আমাকে হানাফী বলে সম্বোধন করলেন। ‎

আমি বললাম-“উস্তাদজি আপনি মুখ উপরের দিকে করে বসে থাকেন। তাই আপনার মুতাবি’ চোখে পরেনা। আপনি আপনার ‎চোখটা একটু কিতাবের দিকে বুলান। দেখুন এই কিতাবেই মুতাবি’ মুহাম্মদ বিন সাআদ আনসারী বিদ্যমান আছে। আমি উঠে ‎গিয়ে আঙ্গুলি সেই রাবীর উপর ধরলাম”। উস্তাদজি এবার রাগে গালাগালি শুরু করে দিলেন। আমি আস্তে করে তাসবীহ বের ‎করে তার সামনে রেখে দিলাম। তিনি বললেন-“এটা কি?” আমি বললাম-“আপনি আপনার গালির যেই তাসবীহ আছে সেটা ‎শেষ করুন। তারপর আমাকে বলুন আপনার সামনে থাকা এই মুতবি’ কেন আপনার চোখে পরেনি?” একথা শুনেই তিনি ‎আমাকে লাঠি দিয়ে পিটাতে শুরু করলেন। আর আমাকে মাদরাসা থেকে বাহির করে দিলেন। ‎

এখন আমি ইলাউস সুনান আর হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাসান সাহেব মুহাদ্দিসে ফয়েজপুরী রহ. এর “সিত্তা জরুরিয়্যা” “আদ ‎দালিলুল মুবীন” ইত্যাদী পড়তে লাগলাম। তখনো আমার মাথা থেকে গায়রে মুকাল্লিদিয়্যাতের ভূত নামেনি। যখনি কোন ‎ফিক্বহী মাসআলা দেখতাম। তখনি এর পক্ষে কোন হাদিস আছে কিনা এর পিছনে লেগে যেতাম। কয়েক মাস পর আমার মন ‎হঠাৎ পাল্টে গেল। এখন আমি যখন কোন আয়াত ও হাদিস দেখি তখন এই প্রশ্ন মনে জাগরিত হয় যে, আমি যা বুঝছি তা কি ‎মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মত নতুন? না আমাদের আকাবীর ও পূর্বসূরীরা ও এমনি বুঝেছিলেন। ‎

তো এখন আর নিজস্ব মতামত আর নিজের জ্ঞানের উপর পূর্ণ নির্ভরশীলতার রোগ ব্রেইন থেকে দূরিভূত হয়েছে। আর গায়রে ‎মুকাল্লিদিয়্যাতের অসুখটাও মন থেকে সেরে গেছে। আর আমি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হানাফী মতাদর্শী হয়ে গেলাম। ‎

দুআ করবেন-আল্লাহ তায়ালা যেন এই সত্য মত ও পথের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দেন। আমীন।

তাযাল্লিয়াতে সফদর [জনৈক কথিত আহলে হাদীসের সাথে মুলাকাত ও কথোপথন]

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। যিনি দ্বীন বুঝার জন্য আমাদের ফুক্বাহাদের দিকে মনোনিবেশ করার আদেশ দিয়েছেন (সূরা তাওবা-১২২)। আর শয়তানের ধোকা থেকে বাঁচতে রাসূল সা. এর অনুসরণ করার সাথে উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী মুজতাহিদদের অনুসরনের আদেশ দিয়েছেন,(সূরা নিসা-৮৩)। আর অগণিত সালাম ও দরূদ ঐ রাহমাতাল্লিল আলামীনের উপর, যিনি ফিক্বহকে কল্যাণ ফক্বীহদের কল্যাণী বলে ঘোষণা দিয়েছেন (বুখারী মুসলিম)। আর মুজতাহিদের সঠিকতার উপর দু’টি পূণ্য, আর ভুলের উপর একটি পূণ্যের ঘোষণা দিয়েছেন। আর বলেছেন যে, “একজন ফক্বীহ শয়তানের উপর হাজারো আবেদ থেকে শক্তিশালী”। আর তার আহলে বাইত ও এবং সাহাবায়ে কিরামের উপর যারা সর্ব প্রকার জান-মাল ও মাতৃভূমি কুরবানী দিয়ে দ্বীনকে ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। তাদের মাঝে দু’টি দল ছিল। একটি ছিল মুজতাহিদদের দল অপরটি মুকাল্লিদদের (মিয়া নজীর হুসাইন প্রণিত মিয়ারুল হক)।

এমন একজনের নামও বলা যাবেনা, যার ইজতিহাদের যোগ্যতাও রাখতেন না, আবার কোন মুজতাহিদের তাক্বলীদ ও করতেন না। যাদের বলা হত গায়রে মুকাল্লিদ। আর তাদের উপর রহমত বর্ষিত হোক তাদের পরের আইয়িম্মায়ে দ্বীন বিশেষ করে চার ইমামদের উপর যাদের সংকলন ও ব্যাখ্যায় কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ হুজুর সা. এর সুন্নাতের উপর আমল করাটা সহজ হয়ে গেছে।

পর সমচার

এই দুনিয়ায় বিভিন্ন ধরণের মানুষ আছে। কিছু লোক এমন আছে যাদের আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের খিদমতের জন্য নির্বাচিত করে নিয়েছেন। যারা রাত দিন তালীম শিক্ষকতা, লিখনীর মাধ্যমে নসীহত ও তাবলীগ করে দ্বীন প্রচার করে যাচ্ছেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে দৃঢ়তা নসীব করুন। আর সর্ব প্রকার শত্রুতা আর ফিতনা থেকে হিফাযত করুন।

এর ঠিক উল্টো কিছু লোক এটাকেই কল্যাণধর্মী কাজ মনে করে যে, সাদাসিধা মুসলমানদের মনে কিছু ওয়াসওয়াসা ঢেলে দিবে, যার ফলে তারা দ্বীন থেকে সরে যাবে। অথবা কমপক্ষে সন্দেহ-সংশয়ে নিপতিত হবে। এমনি এক ব্যক্তির সাথে আমার একদা সাক্ষাৎ হয়।

সে লোকটি এক শ্বাসে নিজের পরিচয় দিল। আরবীতে এমএ ডিগ্রিধারী। ইসলামিয়াতে এমএ। সেই সাথে ওকালতে সার্টিফিকেটও আছে। আর দ্বীনী বিষয়ে রয়েছে প্রচুর পড়াশোনা। রয়েছে অগাধ পান্ডিত্ব।

আহলে হাদীস

লোকটি বলল-আমি আহলে হাদীস! আমি বললাম-আপনার বড় ভাই এখান থেকে উঠে গেল, যে বলেছে সে নাকি আহলে কুরআন।

একথা শুনে লোকটি বলতে লাগল-“আহলে কুরআনের শব্দ ইসলামী পরিভাষায় হাফেজে কুরআনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর ফযীলতের ব্যাপারে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু ইংরেজদের আমলে এই নামটি সুন্নাত অস্বিকারকারীদের রাখা হয়। যারা একটি গোমরাহ ফিরক্বা। এ পবিত্র নাম নিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয়। কখনো বলে-‘যখন কুরআন সত্য, তো আহলে কুরআন সত্য’। কখনো বলে-‘যখন থেকে কুরআন তখন থেকেই আহলে কুরআন। সকল সাহাবাই আহলে কুরআন ছিলেন’। কখনো হাফেজে কুরাআনের ফাযায়েলকে নিজের উপর প্রয়োগ করে সরল মানুষদের বিভ্রান্ত করে”।

আমি বললাম-“এমনিভাবে ইসলামী সমাজে আহলে হাদীস মুহাদ্দিসীনদের বলা হতো। মুহাদ্দিসীন সনদের বিশ্লেষণ করতেন। আর ইংরেজদের আমলে আহলে হাদীস ফিক্বহ অস্বিকারকারীদের বলা হতে লাগল। আর এসব লোকেরাও সাধারণ মানুষদের এভাবে বিভ্রান্ত করে যে, যখন থেকে হাদীস, তখন থেকেই আহলে হাদীস। সকল সাহাবাই আহলে হাদীস তথা ফিক্বহের অস্বিকারকারী ছিলেন। আবার কখনো কখনো মুহাদ্দিসীনদের ফাযায়েলকে নিজেদের উপর প্রয়োগ করে, যা খুবই গর্হিত কাজ”।

আমি তাকে বললাম-“আপনি যখন আজ পর্যন্ত একটি হাদীসও সনদসহ বিশ্লেষণ করেন নি, তাহলে আপনি কী করে আহলে হাদীস গেলেন?”

লোকটি বলতে লাগল-আমি শুধুমাত্র কুরআন ও হাদীসকেই মানি। ফিক্বহ এবং কোন উম্মতের সিদ্ধান্তকে মানি না। এজন্য আমরা আহলে হাদীস।

আমি বললাম-কি কুরআন শরীফ প্রায় প্রতিটি মুসলমানদের ঘরে থাকে। আপনি বলুন হাদীস কাকে বলে?

বলতে লাগল-“রাসূল সাঃ এর বক্তব্য, কর্ম এবং তাক্বরীর অর্থাৎ যে কাজটি তার সামনে হয়েছে কিন্তু আল্লাহর নবী কিছু বলেন নি সেগুোলাকে হাদীস বলে।

আমি বললাম-আপনি হাদীসের সে সংজ্ঞা দিলেন তা কুরআনের কোন আয়াতের অনুবাদ?

-কোন আয়াতের নয়।

-তাহলে এ সংজ্ঞাটি কোন হাদীসের অনুবাদ?

-কোন হাদীসেরই না।

-এ সংজ্ঞাটি কুরআনেও নেই, হাদীসেও নেই, তাহলে এ সংজ্ঞাটি আপনি নিলেন কোত্থেকে?

-কোন মুহাদ্দিস উম্মত এটি বর্ণনা করেছেন। আর সর্বপ্রথম কোন উম্মত মুহাদ্দিস কত বছর পর এটি বর্ণনা করেছেন সেটাও আমার মনে নেই।

-আপনার দাবিতো এটা ছিল যে, আপনি এজন্য আহলে হাদীস যে, শুধুমাত্র কুরআন ও হাদীসের কথা মানেন, কোন উম্মতের কথা মানেন না, অথচ আপনি হাদীসের সংজ্ঞাই এক উম্মত থেকে চুরি করেছেন তাহলে আপনি আহলে হাদীস রইলেন কিভাবে?

নিশ্চুপ হয়ে গেল কথিত আহলে হাদীস লোকটি।

আমি এবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম-কুরআনে কারীমের সকল আয়াতের মত সকল হাদীসও কি মুতাওয়াতির [নিরবচ্ছিন্ন সূত্রাবদ্ধ] এবং চূড়ান্ত সহীহ?

-না। সকল হাদীস মুতাওয়াতির নয়। সব সহীহ ও নয়। বরং অনেক হাদীস দুর্বল আছে। এমনকি জাল হাদীসও আছে।

-আপনি আমাকে শুধুমাত্র একটি হাদীস লিখে দেন যেটাকে আল্লাহ অথবা তার রাসূল সাঃ সহীহ বলেছেন। আর একটি হাদীস এমন দেখান যেটাকে আল্লাহ অথবা তার রাসূল দুর্বল বা জাল বলেছেন।

-একটি হাদীসকেও আল্লাহ ও তার রাসূল সহীহ-হাসান, বা দুর্বল ও জাল বলেন নি।

-তাহলে আপনি কোন হাদীসকে সহীহ, কোন হাদীসকে হাসান, কোন হাদীস দুর্বল ও জাল কি হিসেবে বলেন?

-নিজেদের সিদ্ধান্ত অথবা উম্মতের মুহাদ্দিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাদীসকে সহীহ-দুর্বল ইত্যাদি বলে থাকি।

-তাহলেতো আপনি আহলে রায়, অথবা আহালে রায়ের মুকাল্লিদ তথা অনুসারী হয়ে গেলেন, আহলে হাদীসতো আর বাকি রইলেন না।

এবার লোকটি বেশ ঘাবরে গেল। চিন্তিত হয়ে বলতে লাগল-আপনার কাছে হাদীস ও দুর্বল হওয়ার কি নিদর্শন আছে?

আমি বললাম-যে হাদীসকে চার মুজতাহিদ ইমাম গ্রহণ করেছেন, আর সবার এগুলোর উপর নিরবচ্ছিন্ন আমল আছে আমরা বলি-উক্ত হাদীসকে আল্লাহ ও রাসূল সহীহ বলেন নি, দুর্বলও বলেন নি, তবে ঐক্যমত্বের কারণে এটা সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর যেসব মাসআলায় মতভেদপূর্ণ হাদীস আছে সেসব ক্ষেত্রে মুজতাহিদে আযম রহঃ যে হাদীসের উপর আমল করেছেন, সেই সাথে হানাফীদের এর উপার নিরবচ্ছিন্ন আমল আছে সেটাকে আমরা সহীহ মানি। কেননা আমাদের ইমাম রহঃ বলেছেন যে, “আমার মাযহাব সহীহ হাদীসের উপর”। আর মুজতাহিদের কোন হাদীস অনুযায়ী আমল করাটাই হল মুকাল্লিদদের জন্য জন্য উক্ত হাদীসটি সহীহ। এজন্য আমরা বলি-“যেমন এ হাদীসটিকে আল্লাহ এবং তার রাসূল সাঃ সহীহ বলেন নি, বলেন নি দুর্বলও। আর যেখানে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে সেখানে আল্লাহ তায়ালা মুজতাহিদদের ইজতিহাদ [উদ্ভাবন] করার অধিকার দিয়েছেন। আমাদের ইমাম সাহেব এ হাদীসে উল্লেখ হওয়া মাসআলাকে গ্রহণ করেছেন। এখন যদি তাঁর ইজতিহাদ সঠিক হয়, তাহলে তিনি পাবেন দু’টি সওয়াব। আর যদি ভুল হয় তাহলে পাবেন। আমলটি সুনিশ্চিত আল্লাহর কাছে মকবুল। আমাদের ইমামের এই ইজতিহাদের বিপরীত যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ বা রাসূল সাঃ থেকে সুষ্পষ্ট প্রমাণ করে যে, যে হাদীসের উপর আমাদের মুজতাহিদ ইমাম আমল করেছেন সেটিকে আল্লাহ বা রাসূল সাঃ মনগড়া তথা জাল বলেছেন , তাহলে আমরা আমাদের ইমামের ইজতিহাদকে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা মেনে নিব। কিন্তু আমাদের নবীজী সাঃ বর্ণিত স্বীকৃত কল্যাণী যুগের মুজতাহিদে আযম রহঃ যেটাকে গ্রহণ করেছেন সেটাকে ছেড়ে দিয়ে অকল্যাণী যুগের কোন ব্যক্তির কথা আমরা মানতে রাজী নই। হাদীস গ্রহণ ও বর্জনের ব্যাপারে আমাদের মূলনীতিটি কুরআন সুন্নাহর বিরোধী হলে শুনাও। আমরাতো মন থেকে তাহলে আপনাদের শুকরিয়া জানাবো।

বাকি রইল আপনার কথা-“আপনারা নিজেদের সিদ্ধান্ত অথবা কোন গায়রে মুজতাহিদ উম্মতের সিদ্ধান্তানুযায়ী কোন হাদীসকে সহীহ, কোন হাদীসকে দুর্বল বলে থাকেন।”

তাহলে বুঝা গেল আপনাদের এ আমলটি কোন দলিলের উপর নির্ভরশীল নয়। কেননা আপনাদের কাছেতো কেবল আল্লাহ ও তার রাসূলের কথাই দলিল। আর আপনারা সুনিশ্চিত আল্লাহও নন, আবার রাসূলও নন। আপনাদের গায়রে মুজতাহিদ উম্মতীও আল্লাহ ও নন, আবার রাসূল ও নন। তাহলেতো আপনাদের কোন হাদীসকে না সহীহ বলা উচিত, না দুর্বল। কিন্তু আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কাছেও আপনাদের এসব কথা কোন দলিলের উপর নির্ভরশীল নয়। কেননা আপনি যেমন ইজমা নন, তেমনি আপনার মাঝে না মুজতাহিদের শর্ত আছে। সুতরাং যেটাকে গবেষণা বলছেন সেটা কোন দলিলের উপর নির্ভরশীল নয়। কেননা এক্ষেত্রে না আপনাকে আমরা আল্লাহ মানি, না রাসূল মানি। না ইজমা মানি। না মুজতাহিদ মানি। আপনি নিজেই বলে দিন যা বলতে আমাদের বাধ্য করছেন যে, আপনাদের গবেষণা মানা মানে হল নিজেদের আপনারা আল্লাহ বা রাসূল মনে করেন! নিজেদের মুখে স্পষ্টতো একথা বলেন না যে, আপনারা খোদা বা রাসূল [আল ইয়াজু বিল্লাহ] কিন্তু যখন আমরা ইজমা ও মুজতাহিদের বিপরীতে আপনাদের দলিলহীন কথা মানি না, তখন শোরগোল করে দেন যে, আমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা মানি না।

এবার আপনি নিজেই একবার ভেবে দেখুন আপনাদের অপপ্রচার কতটা জঘন্য!

আপনিতো খুব বাহাদুর পুরুষ। তাই না? আপনি জানেন কি মুহাদ্দিসীনরা হাদীসের তিন প্রকার করেছেন। যথা-

১-মারফু’ তথা সেসব হাদীস যাতে রাসূল সাঃ এর বক্তব্য, কর্ম ও তাক্বরীর উল্লেখ করা হয়েছে।

২-মাওকুফ তথা সেসব হাদীস যাতে সাহাবীদের বক্তব্য, কর্ম ও তাক্বরীর উল্লেখ করা হয়েছে।

৩-মাকতু’ তথা সেসব হাদীস যাতে তাবেয়ীদের বক্তব্য, কর্ম ও তাক্বরীর উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত নিজের মুজতাহিদের পথপ্রদর্শনে এই তিন প্রকারকেই মানি। আপনারাও কি এ তিন প্রকারকে মানেন?

সে বলল-অবশ্যই না! আমরা কেবল প্রথম প্রকারকেই মানি।

-আপনি কি কোন আয়াত বা হাদীস পেশ করতে পারবেন যাতে রয়েছে যে, যারা হাদীসের তিন প্রকারকেই মানে তাদের যুক্তিপূজারী আরা যারা তিন ভাগের একভাগকে অস্বিকার করে তাদের আহলে হাদীস বলা হয়?

সে বিরক্ত হয়ে বলল-আপনি কথায় কথায় আয়াত ও হাদীস জানতে চান কেন?

-এ কারণে যে, আপনি শুরুতেই এ দাবী করেছেন যে,-আপনি কুরআন-হাদীস ছাড়া অন্য কিছু মানেন না। একথা এখন আপনার বুঝে আসল যে, আপনাদের ভাই “আহলে কুরআন” যেমন তাদের দাবী অনুযায়ী সকল মাসায়েল সরাসরি কুরআন থেকে দেখাতে পারবে না, তেমনি আপনারাও আপনাদের দাবি অনুযায়ী সকল মাসায়েল হাদীস থেকে দেখাতে পারবেন না।

মুহাদ্দিসীনে কিরাম সহীহ হাদীস ১০ প্রকার বর্ণনা করেছেন যা মুকাদ্দামায়ে নববীতে আছে। যাতে মুরসাল হাদীস এবং মুদাল্লিসীনদের মুআন আন হাদীসও সহীহের প্রকারে শামীল হয়েছে। আমরা এ ১০ প্রকার সহীহকেই মানি। আর নিজেদের মুজতাহিদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এসবের উপর আমলও করি। আপনারাও কি এ ১০ প্রকারকে সহীহ মেনে এসবের উপর আমল করেন?

-না আমরা সব ক’টিকে মানি না। বরং ৫ প্রকার মানি। আর বাকি ৫ প্রকারকে মনগড়া ও জাল বলে আখ্যায়িত করি।

-আপনি কোন আয়াত বা হাদীস উপস্থাপন করতে পারবেন, যাতে লিখা আছে যে, যারা হাদীস সহীহ হওয়ার ১০ প্রকার মানে তাদের যুক্তিপূজারী আর আর অর্ধেকের বেশি হাদীসকে অস্বিকার করে তাদের বলা হয় “আহলে হাদীস”? “নিজের ফাঁদে নিজেই আটক” এ প্রবাদ বাক্য আপনাদের বেলায়ই যথোপযুক্ত।

একটি মাসআলা

কোন ব্যক্তি যদি এ অসিয়ত করে যে, আমি আমার এতটুকু পরিমাণ সম্পদ হাদীসের আহলদের জন্য ওয়াক্বফ করলাম, তাহলে সে ওয়াক্বফ এর হকদার কে হবে? তো ওলামায়ে কিরাম বলেছেন যে, ইমাম শাফেয়ী রহ^ এর মুকাল্লিদ যদি হাদীসের ছাত্র হয় তাহলে সে এর হকদার হবে। আর যদি হাদীসের ছাত্র না হয় তাহলে হকদার হবে না। তবে হানাফীরা এর হকদার হবে, চাই হাদীসের ছাত্র হোক বা না হোক। এজন্য যে, হানাফীরা মুরসালা হাদীস এবং খবরে ওয়াহেদকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে [আদ দুররুল মুখতার]।

এর দ্বারা জানা গেল, যে গায়রে মুকাল্লিদরা হাদীসের খিদমাতের নামে বর্হিরাষ্ট্র থেকে টাকা নেয়। আর সারাদিন সহীহ হাদীস সমূহকে দুর্বল ও মনগড়া বলে প্রচারণা চালায় তাদের জন্য শরীয়তের দৃষ্টিতে এ টাকা গ্রহণ জায়েজ হবে না।

আরো একটি ছলনা

আমি বললাম-আপনাদের মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ জিপুরী এ একটি কিতাব আছে, “হাকীকাতুল ফিক্বহ” নামে। সে কিতাবে একটি শিরোনাম আছে-“আহলে কুফীদের হাদীসের জ্ঞান”। সেটাতে তিনি বলেন-‘যদি আহলে কুফীরা এক হাজার হাদীস শুনায়, তাহলে ৯৯৯টিকে নিক্ষেপ করে দাও। আর বাকি একটির উপর সন্দেহ রাখবে, কখনো সহীহ বিশ্বাস করবে না’।

লোকটি দ্রুত বলে বসল-আহলে কুফাদের হাদীসের সাথে কী সম্পর্ক?

-আস! অভিজ্ঞতা নিয়ে নাও! আমি সিহাহ সিত্তা থেকে হাদীস বের করবো, যাতে একজন কুফী রাবী পাওয়া যাবে, সেটাকে সিহাহ সিত্তা থেকে বের করে দিবে।

-“তাহলে সিহাহ সিত্তাতে থাকবে কি? সেখানে মাটি উড়তে থাকবে”। তড়িঘরি জবাব দেয় লোকটি।

-এমন কোন আয়াত বা হাদীস আছে নাকি যে, কুফাবাসীর বর্ণিত সহীহ হাদীসকে এজন্য অস্বিকার করে যে, এটা কুফাবাসী বর্ণনা করেছেন, তাদের বলা হবে “আহলে হাদীস”। আর যারা কুফাবাসী ও হেজাজবাসী, সবার বর্ণিত সহীহ হাদীস মানে তাদের বলা হয় যুক্তিপুজারী?

http://jamiatulasad.com/

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s