তাজাল্লিয়াতে সফদর : কথিত আহলে হাদীছের মুখোশ ‍উন্মোচন -৪

তাযাল্লিয়াতে সফদর-৪ (পাক ও হিন্দে ইসলাম কারা এনেছেন?)

পাক ও হিন্দে ইসলাম কারা এনেছেন? ‎

আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিদায়াতের জন্য আম্বিয়ায়ে আলাইহিস সালামের সিলসিলা জারী করেছেন। সর্ব প্রথম নবী আবুল ‎বাশার আদম আঃ ছিলেন। আর সর্বশেষ নবী সাইয়্যিদুর রাসূল খাতামুন নাবিয়্যীন, হযরত মুহাম্মদ সাঃ ছিলেন। হযরত আদম ‎আঃ থেকে নিয়ে হযরত ঈসা আঃ পর্যন্ত যত শরীয়ত বিশিষ্ট নবী এসেছেন, তাদের উপমা মৌসুমী ফুলের মত। যেমন গরম ‎মৌসুমের ফূলতো গরমকালে খুব সুন্দর দেখা যায়। কিন্তু শীতকাল আসলে তা শুকিয়ে যায়। আর ঝরে পরে শীতকালের ফুলের ‎জন্য যায়গা খালি করে দেয়। আর রাসূল সাঃ এর শরীয়ত ও দ্বীন হল বার মাসি ফুলের মত। যা প্রতিটি সিজনে প্রতিটি এলাকায় ‎আর প্রতিটি কালেই তার জ্বাজল্যতা আর রুপ শুধু বাড়েই। আর কিয়ামত পর্যন্ত তা বেড়েই চলবে। এটা এমন ফুল ,যা শুকিয়ে ‎যাবেনা আর কখনো ঝরেও পড়বেনা।

এমনিভাবে আম্বিয়ায়ে কিরাম একেকটি এলাকার নবী ছিলেন। কিন্তু নবীজী সাঃ কোন নির্দিষ্ট এলাকার নবী ছিলেন না। তিনি ‎হলেন বিশ্বনবী। যেন প্রথম আম্বিয়ায়ে কিরামের উপমা মোমবাতির মত। যা একটি গলি বা একটি এলাকা আলোকিত করতে ‎পারে। কিন্তু সারা দুনিয়াকে কেবল সূর্যই আলোকিত করতে পারে। সুতরাং সূর্য যখন উদিত হয় তখন রাতের মোমবাতির কোন ‎প্রয়োজন থাকেনা। নবীজী সাঃ এর সূর্যের আলোকময় নবুয়াত আসার পর তাওরাত ও যবুরের আলো নিষ্প্রোয়জনীয় হয়ে ‎যায়। ‎

নবীজী সা. এর দ্বীন বিশ্বব্যাপী। আর কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এই জন্যই এতে নতুন উদ্ভুত শাখাগত মাসআলার জন্য ‎ইজতিহাদের সুযোগ রাখা হয়েছে। ইজতিহাদী মাসায়েলের মাঝে যে ব্যক্তি কুরআন হাদিস থেকে উদ্ভাবন ও ইজতিহাদের ‎যোগ্যতা রাখেন না, তারা মুজতাহিদদের পথ প্রদর্শন অনুযায়ী কুরআন সুন্নাহ থেকে উদ্ভাবন করা মাসায়েলের উপর আমল ‎করবে। তাকে বলা হয় মুকাল্লিদ। আর যদি সে ইজতিহাদের যোগ্য ও নয়, আবার ইজতিহাদী মাসায়েলে মুজতাহিদের ‎তাকলীদও করেনা, তাকে গায়রে মুকাল্লিদ বলা হয়।

নবুয়াতকাল

নবীজী সা. এর মুবারক জমানায় শাখাগত মাসআলা সমাধান করার পদ্ধতি ছিল তিনটি। যথা-‎

১. যে ব্যক্তি নবীজী সা. এর খিদমতে উপস্থিত হতে পারতো, তিনি নবীজী সা. থেকে উক্ত মাসআলাটি জিজ্ঞেস করে নিতেন।

২. যে লোকেরা হযরত সা. থেকে দূরে থাকতেন, তাদের মাঝে কেউ কেউ হলেন মুজতাহিদ। তখন তিনি নতুন বিষয়ে ‎ইজতিহাদ করে সমাধান দিয়ে দিতেন। ‎

৩. তিনি যদি মুজতাহিদ না হতেন, তাহলে নিজের এলাকার কোন মুজতাহিদের তাকলীদ করে নিতেন। যেমন ইয়ামেনে ‎হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রা. ইজতিহাদ করতেন। আর বাকি সকল ইয়ামানবাসী তার তাকলীদে শখসী করতেন। অথচ ‎ইয়ামানবাসী নিজেরা আরবীভাষী। কিন্তু ইজতিহাদি মাসআলায় মুয়াজ বিন জাবাল রা. এর তাকলীদে শখসী বা একক অনুসরণ ‎করতেন। নবুয়তের জমানায় এমন একজন ব্যক্তির নামও পাওয়া যাবেনা, যার ব্যাপারে এটা প্রমাণ করা যাবে যে, তিনি ‎ইজতিহাদের যোগ্য নয় তাই ইজতিহাদ করতেন না, আবার কারো অনুসরণও করতেননা। সে সময় একজনও গায়রে মুকাল্লিদ ‎ছিলনা।

সাহাবাদের আমল

নবীজী সা. এর মৃত্যু হল ১১ হিজরীতে। সে সময় থেকে সাহাবাদের নবীজী সা. থেকে প্রশ্ন করে সমাধান পাবার পদ্ধতীটি বন্ধ ‎হয়ে যায়। এখনতো আর নবীজীকে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই। তাই এখন শাখাগত মাসআলা সমাধানকল্পে দু’টি পদ্ধতি ‎রয়ে গেল। মুজতাহিদ ইজতিহাদ করবে, আর সাধারণ লোকেরা তাকলীদ করবে। সুতরাং সাহাবাদের আমলে মক্কা মুকার্রমায় ‎হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা., আর মদীনা মুনাওয়ারায় হযরত জায়েদ বিন সাবিত রা., আর কুফায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন ‎মাসউদ রা. এর তাকলীদে শখসী বা একক অনুসরণ হচ্ছিল। আর সাহাবাদের হাজারো ফতোয়া দলিল ছাড়া হাদিসের কিতাবে ‎বিদ্যমান আছে। আর সকল লোকেরা দলিল জিজ্ঞেস করা ছাড়াই এসবের উপর আমল করেছেন। এটাকেই বলে তাকলীদ। ‎সাহাবীদের আমল, তাবেয়ীদের আমল, তাবে তাবেয়ীদের আমলে একজন ব্যক্তিও ছিলনা যে, আহলে সুন্নাত, আবার গায়রে ‎মুকাল্লিদ। কারো ব্যাপারে এটা বলা যাবেনা যে, তিনি মুজতাহিদও ছিলেন না, আবার মুকাল্লিদ ও নন। বরং তিনি গায়রে ‎মুকাল্লিদ ছিলেন। যেমনিভাবে খাইরুল কুরুনে কোন ব্যক্তি আহলে কুরআন নামে হাদিস অস্বিকারকারী ছিলনা। এমনিভাবে ‎কোন ব্যক্তি আহলে হাদিস নামে ফিক্বহ ও তাকলীদ অস্বিকারকারীও ছিলনা।

বিশ্বজনীনতা

যেহেতো নবীজী সা. এর ধর্ম ছিল বিশ্বব্যাপী। এইজন্যই তিনি কায়সার ও কিসরাকে চিঠি লিখেছিলেন। রোম আর সিরিয়া আর ‎ইয়ামান ইত্যাদির বিজয়ের ভবিষ্যতবাণী করেছেন। আর তা বাস্তবায়িতও হয়েছে। এমনিভাবে নবীজী সা. এই ভবিষ্যতবাণীও ‎করেছেন যে, ‎‏ يكون هذه الأمة بعث إلى السند والهند (مسند احمد-2/369)‏অর্থাৎ এই উম্মত হিন্দ ও সিন্ধেও হামলা করবে (মুসনাদে ‎আহমাদ-২/৩৬৯) তাইতো ৯২ হিজরীতে মুহাম্মদ বিন কাসেম রহ. এর নেতৃত্বে ইসলামী বাহিনী সিন্ধুতে হামলা করেছে। আর ‎৯৫ হিজরী পর্যন্ত সিন্ধু মুসলমানদের কাছে পদানত ছিল। মুহাম্মদ বিন কাসেম এসেছিলেন বসরা থেকে। আর বসরায় তখন ‎ইমাম হাসান বসরী রাহ. এর তাকলীদ হত। তারপর যখন ইমাম যুফার বসরা আসেন তখন সকল লোক হানাফী হয়ে যায়। ‎মোদ্দাকথা এই সিন্ধ বিজয়ীদের মাঝে একজনও গায়রে মুকাল্লিদ ছিলনা। আর নবীজী সা. গাজওয়ায়ে হিন্দের ব্যাপারে ‎বলেছেন যে, ‎عصابتان من امتى احرزهما الله من النار، عصبة تغزو الهند وعصبة تكون مع عيسى بن مريم، (مسند احمد-2/229 و نسائى-‏‏2/63)‏‎ অর্থাৎ আমার উম্মতের মাঝে দুই দলকে আল্লাহ তায়ালা আগুন থেকে হিফাযত করবেন। এক দল হল যারা হিন্দে ‎জিহাদ করবে, আর দ্বিতীয় দল হল যারা ঈসা আ. এর সাথে থাকবে।(মুসনাদে আহমাদ-২/২২৯, নাসায়ী শরীফ-২/৬৩) ‎সুতরাং এই ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী ৩৯২ হিজরীতে সুলতান মাহমুদ গজনবী রহ. হিন্দুস্তান বিজয় করেন। আর এখানে ইসলামী ‎খিলাফত কায়েম করেন।

এখানে যত মুসলিম হাকিম বংশীয়, যত গোলাম বংশীয় আর যত ঘুরি বংশীয়, আর যত খিলজী বংশীয়, সাদাত বংশীয়, ‎তুঘলোক বংশীয়, আর সুরী অথবা মোগল বংশীয়, সবাই ছিলেন সুন্নী হানাফী। এই দেশে ইসলাম, কুরআন হাদিস আনয়নের ‎ভাগ্য কেবল হানাফীদেরই ললাটেই আছে। সুতরাং নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানও একথা স্বীকার করে লিখেন যে, “যখন থেকে ‎ইসলাম এ এলাকায় আসে, তখন থেকে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা হল এই যে, যেহেতো অধিকাংশ লোক ‎বাদশার মত-পথ এবং মাযহাবের অনুসরণকেই পছন্দ করে, একারণেই সূচনা থেকে এখন
পর্যন্ত তারা হানাফী মাযহাবেই ‎প্রতিষ্ঠিত। আর এখানে এই মাযহাবের আলেম এবং ফারেগীনরাই বিচারক আর মুফতী ও হাকিম হয়ে থাকে”। (তরজুমানে ‎ওহাবিয়্যাহ-১০)‎

সুতরাং একথাটি একটি অকাট্যভাবে ঐতিহাসিক সত্য যে, এই দেশে ইসলাম ইংরেজদের রাজত্বের পূর্বে একজন গায়রে ‎মুকাল্লিদের নামও উপস্থাপন করা যাবেনা, যারা ইজতিহাদকে ইবলীশী কাজ আর মুজতাহিদকে মুশরিক বলেছে। দাতাগঞ্জ ‎বখশ নামে প্রসিদ্ধ সায়্যিদ আলী হাজয়িরী সাহেব রহ.(মৃত্যু-৪৬৫ হি.) তিনি যেদিন লাহোরে পৌঁছেন, যেদিন হযরত সাইয়্যিদ ‎হুসাইন জানঝানবী রহ. এর জানাযা প্রস্তুত করা হয়। তিনি তার নিজের লিখায় লাহোর আগমণের কারণ লিখেন এভাবে যে, ‎‎“আমি আলী বিন উসমান জালালী হই। আল্লাহ তায়ালা আমাকে কল্যাণ দান করুন। আমি একদা সিরিয়ার দামেস্ক শহরে রাসূল ‎সা. এর মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল রা. এর কবরের শিয়রের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন স্বপ্নে দেখছিলাম যে, আমি মক্কা ‎মুকার্রমার মাঝে আছি। আর নবীজী সা. বাবে বনী শাইবা থেকে এক বৃদ্ধ লোককে নিজের কোলে নিয়ে এমনভাবে ভিতরে ‎ঢুকছিলেন, যেমন কোন বাচ্চাকে মোহাব্বতের সাথে কোলে নেয়া হয়। আমি দৌড়ে নবীজীর খিদমতে উপস্থিত হলাম। আর ‎নবীজী সা. এর হাত ও পায়ে চুম্বন করতে লাগলাম। আর আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলাম। কোলের লোকটি কে? আর তার এই ‎সৌভাগ্যপূর্ণ অবস্থা কেন? রাসূল সা. এর কাছে আমার ভিতরগত অবস্থা প্রকাশিত হয়ে গেল। তিনি বললেন যে, ওনি আবু ‎হানীফা রহ.। যিনি তোমাদেরও ইমাম। আবার তোমাদের রাষ্ট্রের অধিবাসীদেরও ইমাম। ‎

আমার এই স্বপ্নের ব্যাপারে নিজেরও অনেক আশা আছে, সেই সাথে আমার দেশবাসীর জন্যও অনেক আশা-ভরসা নিহিত। ‎‎(তাইতো এই আশা পূর্ণ হয়েছে। এই দেশ হানাফীদের কেন্দ্র হয়েছে।) আর আমার এই স্বপ্নের কথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, ‎ইমাম আজম রহ. ঐ সকল হযরতদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যারা নিজের চারিত্রিক গুণাবলীর দিক থেকে নবী আদর্শে উৎসর্গিত। আর ‎শরয়ী বিধানের ক্ষেত্রে বাতি। যারা নববী আলোতে আলোকিত। তাইতো তাকে নিয়ে নবীজী সা. চলছেন। যদি তিনি নিজে ‎নিজে চলতেন, তাহলে তখন তিনি স্বীয় গুণে গুনান্বিত হতেন। আর নিজ গুনে যারা ফায়সালা দেয়, তারা ভুল ফায়সালাও দিতে ‎পারে, বা সঠিক ফায়সালাও দিতে পারে। আর যখন তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্বয়ং নবী সা. তখন নবীজী সা. এর স্বীয় ‎গুণাবলীর কারণে তার গুণাবলী উৎসর্গিত হয়ে গেছে। আর নবীজী সা. যেহেতো কোন ভুল ফায়সালা দেবার কোন সুযোগ নেই। ‎শুনে রাখ! এটি একটি বড় রহস্যময় বিষয়”। (কাশফুল মাহযুব-৮৬) ‎

মোটকথা ৫৮৯ হিজরীতে সুলতান মুয়িজুদ্দীন সাম ঘুরী আসলেন। আর দিল্লী পর্যন্ত পদানত করেন। সে সময় থেকে নিয়ে ‎১২৭৩ হিজরী পর্যন্ত আপনারা এই দেশের ইতিহাস পড়ে দেখুন। মাহমুদ গজনবী রহ. থেকে নিয়ে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত, এমনকি ‎সাইয়্যিদ আহমাদ শহীদ বেরলবী রহ. পর্যন্ত কোন গায়রে হানাফী গাজী, বিজেতা অথবা মুজাহিদ পাওয়া যাবেনা। ‎

কাশ্মীরের ব্যাপারে ঐতিহাসিক ফেরেস্তা লিখেন-“আমি দেখেছি এই দেশের সবাই ছিলেন হানাফী মাযহাবপন্থী”।(তারীখে ‎ফেরেস্তা-৩৩৭) আর এর পূর্বে রাশেদী এর বরাতে তিনি লিখেন-“হযরত শায়েখ আব্দুল হক সাহেব মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ. ‎বলেন-‎‏”اهل الروم وما وراء النهر والهند كلهم حنفيون،ط”‏‎ অর্থাৎ মা ওরাউন নাহার এবং হিন্দের সবাই ছিলেন হানাফী”। ‎‎(তাহসীলুত তায়াররুফ-৪৬) আর হযরত মুজাদ্দেদে আলফে সানী রহ. বলেন-“আহলে ইসলামের বড় অংশ ইমাম আবু ‎হানীফা রহ. এর অনুসারী ছিল”। (মাকতুবাত-২/৫৫) শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ. বলেন-“সকল শহরের আর ‎সকল দেশের বাদশা ছিল হানাফী। আর কাযী, অধিকাংশ শিক্ষক ও অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ছিল হানাফী” (কালিমাতে ‎তায়্যিবাত-১৭৭) এছাড়াও তিনি লিখেন যে, অধিকাংশ দেশ এবং প্রায় শহরেই আবু হানীফা রহ. এর মাযহাব অনুসারী ছিল। ‎‎(তাফহীমাতে ইলাহিয়া-১/২১২) অর্থাৎ অধিকাংশ ইসলামী রাষ্ট্র এবং দুনিয়াব্যাপী অধিকাংশ মুসলমান ছিল হানাফী। ইসলামী ‎দুনিয়ার অধিকাংশ অংশ হানাফী অনুসারী ছিল। আর এই মাযহাবের বদৌলতে কমপক্ষে হাজার বছর পর্যন্ত সমগ্র ইসলামী ‎দুনিয়ায় বিধান প্রয়োগিত হত। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ. সত্য মাযহাবের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন যে, “দ্বীন ‎ইসলামের প্রসারের সাথে দ্বীনে ইসলামের উপর হামলা এবং ফিতনার প্রতিরোধ করা হবে”। ‎

এটাইতো স্পষ্ট যে, পাক ও হিন্দে দ্বীনে ইসলামের প্রসারে হানাফীদের সাথে শরীক কেউ নাই। সারা দেশের মাঝে ইসলাম ‎হানাফীরাই ছড়িয়েছে। আর কাফেররা ইসলামে প্রবিষ্ট হয়ে হানাফীই হয়েছে। এই দেশে ইসলামের উপর দু’টি কঠিন সময় ‎এসেছে। একটি হল সম্রাট আকবরের নাস্তিকতার ফিতনা। দ্বিতীয় হল ইংরেজদের শাসন ও শোষণ। ‎

আকবর যখন ইমামে আজমের অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে নাস্তিকতার দাওয়াত দিতে শুরু করে, তখন মুজাদ্দেদে আলফে সানী রহ. ‎এবং শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ. এর প্রতিরোধে এই নাস্তিকতার ফিতনা মিটে যায়। আর ইংরেজদের শোষণের ‎প্রতিরোধে হানাফীরাই এগিয়ে আসে। গায়রে মুকাল্লিদ নওয়াব সিদ্দীক হাসান লিখেন-“কেউ শোনেনি যে, কোন ‎একেশ্বরবাদী, কুরআন ও সুন্নাতের অনুসারী ব্যক্তি ইংরেজদের সাথে বিদ্রোহ করার অপরাধে অপরাধী হয়েছে। অথবা ইবলীসী ‎ফিতনা আর বিদ্রোহের উপর অগ্রসর হয়েছে। যত লোক খারাপ ও মন্দ করেছে, আর ইংরেজ ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ‎তারা সবাই হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল। (তরজুমানে ওহাবিয়া-২৫)‎

মোটকথা আপনি ভারতবর্ষের ইসলামী ইতিহাস পড়ুন, সেখানে ইসলামী শক্তির মৌল প্রণোদনা হানাফীদের থেকেই পাবেন।

কোন হাদিস অস্বিকারকারী অথবা ফিক্বহ অস্বিকারকারী এক ইঞ্চি জমিনও কাফেরদের থেকে ছিনিয়ে এনে ইসলামী হুকুমতে ‎প্রবিষ্ট করায়নি। তাদের যুদ্ধতো কেবল এটাই যে, হানাফীদের ইসলাম সঠিক নয়। তাদের নামায সহীহ নয়। আল্লাহ তায়ালা ‎আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হানাফীদের উভয় জাহানে কামিয়াবী দান করুন। আমীন।

তাযাল্লিয়াতে সফদর-৫ (আমি যেভাবে হানাফী হলাম-প্রথম পর্ব)

আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে। চিন্তার বিষয় ছিল আমাকে কুরআন শরীফ কে শিখাবে? আমাদের গ্রামে একটি মসজিদ ছিল। ‎যেখানে প্রায় প্রতি জুমআর দিন ঝগড়া হত। বেরেলবীরা চাইত যে, এখানে তাদের মতাদর্শী ইমাম নিযুক্ত হোক। আর গায়রে ‎মুকাল্লিদরা চাইতো তাদের মদাদর্শী ইমাম নিযুক্ত হোক। আর আমাদের দেওবন্দী আক্বিদা সম্পন্ন ঘর ছিল একটা। যাকে কেউ ‎গণনায়ও ধরতনা। কখনো সখনো ঝগড়া যখন তীব্রতা লাভ করত, তখন ছয় সাত মাস যাবত মসজিদে কোন ইমামই হতনা। ‎কখনো দুই জামাত শুরু হয়ে যেত। আমার পিতা এই ব্যাপারে খুবই পেরেশানীতে ছিলেন। সর্বশেষে তিনি এই সীদ্ধান্ত নেন যে, ‎বেদাতীদের তুলনায় গায়রে মুকাল্লিদরা আক্বিদা-বিশ্বাসের দিক দিয়ে ভাল, তাই তাদের কাছেই আমাকে কুরআন শিখতে ‎পাঠালেন। অবশেষে কুরআন শরীফ শিখার জন্য আমাকে এক গায়রে মুকাল্লিদের কাছে পাঠানো হল।

শিক্ষা পদ্ধতী

যেহেতো আমি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। অক্ষর জ্ঞানতো ছিলই। তাই প্রথম পাড়া থেকে সবক শুরু হল। উস্তাদ সাহেব ‎দুই তিন আয়াত বলতেন আর আমি দোহরাতাম। তারপর আমাকে উস্তাদ সাহেব শোনাতেন যে, “আমি ওমুক হানাফী মুফতী ‎সাহেবকে পরাজিত করেছি, ওমুক হানাফী আলেমকে লা-জাওয়াব করে দিয়েছি। দুনিয়ার মাঝে কোন হানাফী বা বেরলবী নাই ‎যে আমার সামনে দাঁড়াতে পারে”। তারপর কোন একটা প্রচার পত্র নিয়ে বসে যেতেন। আর বলতেন-“দেখো! এই প্রচার ‎পত্রটি বিশ বছর পুরনো। এতে দুনিয়াজোড়া হানাফীদের চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে যে, একটি হাদিস দেখাও নবীজী সা. এর, যাতে ‎রফয়ে ইয়াদাইনকে বর্তমানে রহিত করা হয়েছে। একটি হাদিস দেখাও! যেখানে নবীজী সা. বলেছেন যে, আজ থেকে রফয়ে ‎ইয়াদাইনের বিষয় রহিত করে দেয়া হয়েছে। একটি হাদিস দেখাও! যেখানে নবীজী সা. বলেছেন যে, এক শতাব্দী পর আমার ‎দ্বীন রহিত হয়ে যাবে। আর ইমাম আবু হানীফার তাক্বলীদ আমার উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যাবে। এই প্রচারপত্রটি দেওবন্দ ‎পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা কোন হাদিস দেখাতে পারেনি। হাজার হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দেয়া হল, কিন্তু সামনে ‎দাঁড়াতে সাহস পায়নি কেউ”।

‎ উস্তাদের ব্যাক্ষাই আমার মত এ বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তির উপর খুব প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন তিনি একথা ‎বলতে লাগলেন যে, “আমি একবার দিল্লী যাচ্ছিলাম। তখন দেওবন্দ নামলাম। সেটা নামাযের সময় ছিল। তখন মাদরাসার ‎সকল উস্তাদ ও ছাত্ররা মসজিদে উপস্থিত ছিল। সে সময় আমি দাঁড়িয়ে প্রচারপত্রটি দেখিয়ে বলতে লাগলাম যে, এই ‎প্রচারপত্রটি বিশ বছর যাবত প্রতি বছর আপনাদের মাদরাসায় পাঠানো হয়, তারপরও আপনারা কেন হাদিস দেখান না? তখন ‎সেখানকার এক উস্তাদ লজ্জিত হয়ে নম্রতার সাথে আমাকে বলল যে, “মাওলানা সাহেব! আপনি জানেন আমরা হলাম হানাফী। ‎আমরাতো আবু হানীফা রহ. এর ফিক্বহ পড়ি, না হাদিস পড়ি, না কখনো হাদিস দেখেছি। আপনি বারবার আমাদের কাছে ‎হাদিস চেয়ে লজ্জা দেন কেন?”” ‎

উস্তাদের এই বাগড়ম্বতার পর আমি প্রচন্ড বিষ্মিত হয়ে যেতাম। কারণ আমি ঘরে শুনেছি যে, দেওবন্দ মাদরাসা হল পৃথিবীর ‎মাঝে সবচে’ বড় মাদরাসা। তো আমাদের উস্তাদ যখন তাদেরই লা জাওয়াব করে আসলেন, সেখানে আর হাদিস কোত্থেকে ‎পাওয়া যাবে?!‎

মতানৈক্য কি?‎

একদিন আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম-“উস্তাদজী! আপনি এবং আহলে সুন্নাতওলাদের মাঝে পার্থক্যটা কি?” তিনি ‎বললেন-“বেটা! কালিমা আমরা যেমন নবীজী সা. এর টাই পড়ি, তেমনি ওরাও তাই পড়ে। আমাদের মাঝে এতটুকু একতা। ‎কিন্তু আমরা যখন তাদের বলি যে, যার কালিমা পড়, কথাও তার মান! তখন তারা বলে-“না! আমরা কালিমা নবীজী সা. এর ‎টাই পড়ব, কিন্তু কথা মানব ইমাম আবু হানীফা রহ. এর”।” ‎

আমি উস্তাদজিকে জিজ্ঞেস করলাম-“ইমাম আবু হানীফা রহ. যদি মুসলমান আলেম থেকে থাকেন, তাহলে তিনি নিশ্চয় নবীজী ‎সা. এর কথাই মানুষকে মানতে বলতেন। কেননা খাইরুল কুরুনের মানুষের ক্ষেত্রে এমনটি কল্পনাই করা যায়না যে, তারা ‎জেনে বুঝে মানুষকে নবীজী সা. এর উল্টো কথা জানাবে”। উস্তাদজি বলেন-“ইমাম আবু হানীফা রহ. তো ভাল মানুষ ছিলেন। ‎কিন্তু তার জমানায় হাদিস সমূহ সংকলিত হয়নি। এই জন্য ইমাম আবু হানীফা রহ. অনেক মাসআলা কিয়াস করে বলে ‎দিয়েছেন। কিন্তু তিনি সাথে সাথে এটাও বলে দিয়েছেন যে, আমার যে বক্তব্যটি হাদিসের উল্টো পাবে তা ছেড়ে দিবে। কিন্তু ‎হানাফীরা এর উল্টো কাজটাই করে থাকে”।

সে সময় আমার এতটুকু জ্ঞান ছিলনা যে, তাকে প্রশ্ন করতাম যে, উস্তাদজি! সে সময় কি এত প্রয়োজন ছিল যে, প্রথমে ফিক্বহ ‎সংকলন করা হয়? আর হাদিস সংকলন করা হল পরে? সিহাহ সিত্তার সকল সংকলক সুনিশ্চিত আইয়িম্মায়ে আরবাআর পর ‎এসেছেন। কিন্তু কেউই নিজের কিতাবে না ফিক্বহে হানাফীর প্রতিরোধে কোন অধ্যায় স্থাপন করেছেন, না ফিক্বহে শাফেয়ী ‎প্রতিরোধে কোন অধ্যায় লিখেছেন। ‎

ইলমে হাদিস

উস্তাদজি আমাকে বলতেন-“যেমন কাপড় কাপড়ের দোকান থেকে পাওয়া যায়। চিনি চিনির দোকান থেকে পাওয়া যায়। ‎এমনিভাবে হাদিস শুধুমাত্র আহলে হাদিস থেকেই পাওয়া যায়। আর মাদরাগুলিতেতো হাদিস পড়ানোই হয়না। তুমি সারা ‎জীবন পা ঠুকরে ঠুকরে মরে যাবে, কিন্তু নবীজী সা. এর একটি হাদিস শোনারও সৌভাগ্য তোমার হবেনা। ওহে নবী সা. এর ‎কথা শ্রবণকারী! নবী কারীম সা. এর হাদিস কেবল এখানেই পড়ানো হয়। অন্য কোথাও নয়”। ‎

সে সময় আমার এত বুঝ হয়নি। একথাও জানা ছিলনা যে, এই আহলে হাদিসদের ভাই হল আহলে কুরআন। কিন্তু এটি ‎উস্তাদজির ধোঁকা ছিল যে, আমাকে বলনি যে, “কুরআন শুধু আহলে কুরআন থেকেই শিখা উচিত” কেননা তার সাথে আহলে ‎কুরআনের কি সম্পর্ক?‎

মোটকথা, আমাকে বিশ্বাস করানো হল যে, আমরা কিছু লোক মূলত নবীজী সা. কে মানি আর বাকি সবাই নবীজী সা.কে ‎মানেনা।

একশত শহীদের সওয়াব

আমার ভাল ভাবেই মনে আছে যে, নফল আদাই করা হতনা। বরং এতে ঠাট্টা করা হত। আর সুন্নাতেরও বিশেষ প্রয়োজন নেই। ‎কেননা হানাফীরা নফল এবং সুন্নাত পূর্ণ গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকে। হ্যাঁ, যে সকল সুন্নাত মৃত হয়ে গেছে, সেগুলি জিন্দা ‎করতে অনেক তাগিদ দেয়া হত। যেমন জামাতে নামাযের মাঝে পাশের মুসল্লির সাথে টাখনোর সাথে টাখনো মিলানো সুন্নাত। ‎যেটা মৃত হয়ে গেছে এটার উপর আমল করা একশত শহীদের সওয়াব পাওয়া যায়। এমনিভাবে জোড়ে আমীন বলা সুন্নাত। ‎নবীজী সা. বলেছেন যে, “যে ব্যক্তি আমীন বলা ছেড়ে দিবে সে আমার উম্মতের ইহুদি”। সুতরাং আমীন জোড়ে বলে যত ‎হানাফীদের কান পর্যন্ত সেই আওয়াজ পৌঁছানো যাবে তত শত শহীদের সওয়াব পাওয়া যাবে। আর ইহুদীদের কষ্ট দেবার ‎সওয়াবও পাওয়া যাবে।

হাকিকাতুল ফিক্বহ

উস্তাদজির কাছে মাওলানা ইউসুফ জীপুরীর “হাকিকাতুল ফিক্বহ” কিতাব আর মাওলানা মুহাম্মদ রফীক পাসরুরী সাহেবের ‎পুস্তিকা “সমশীরে মুহাম্দাদিয়া বর আক্বায়েদে হানাফিয়্যা” এবং “শময়ে মুহাম্মদি” কিতাব ছিল। উস্তাতজি আমাকে নিয়ে ‎বসতেন আর এই সকল কিতাব থেকে একেকটি মাসআলা পড়তেন। তারপর পাঁচ মিনিট পর্যন্ত আমি এবং উস্তাদজি কানে হাত ‎লাগিয়ে তওবা! তওবা! করতাম। হায়! হায়! এরকম নোংরা মাসআলা হিন্দুদের বইয়েও নাই। আয় আল্লাহ! যদি হিন্দুরা, ‎শিখেরা অথবা খৃষ্টানেরা এই মাসআলা জানে, তাহলে তারা মুসলমানদের কতটা নিচু মনে করবে?! ‎

মোটকথা হল আমাকে এই বিষয়টি বদ্ধমূল করে দেয়া হত যে, দুনিয়ার মাঝে হানাফী মাযহাব এমন একটি নোংরা মাযহাব, যা ‎থেকে হিন্দু, শিখ এবং ইয়াহুদী খৃষ্টানেরসহ সকল কাফেররাও আশ্রয় চাইবে।

কর্ম পদ্ধতি

আমার ব্রেইন যখন পোক্ত হয়ে গেল তখন আমার উস্তাদজি বলতেন-“একবার দু’ তিনজন সাধারণ হানাফী যুবককে ধরে আমি ‎বললাম-‘আমাকে তোমাদের হানাফী মাওলানা সাহেবের কাছে নিয়ে চল, সে যদি আমাকে একটি হাদিস দেখাতে পারে ‎তাহলে আমি হানাফী হয়ে যাব’। সেই বেচারারা আমাকে তাদের মাওলানা সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। আমি মাওলানা ‎সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম-“মাওলানা সাহেব! একটি হাদিস দেখাও! যেখানে নবীজী সা. বলেছেন যে, তাকে ছেড়ে আবু ‎হানীফার তাকলীদ করতে বলেছেন”। প্রশ্নটি করার পর আমি তাদের জবাব ভাল করে শুনিনা কখনো। বরং প্রতি দু’ মিনিট ‎পরপর আমি এই দুই যুবককে স্বাক্ষ্য বানিয়ে বলতাম-‘দেখ! মাওলানা সাহেবের একটি হাদিসও মুখে আসেনা। যখন ‎দ্বিতীয়বার আমি মাওলানা সাহেবকে বলতাম যে, ‘আপনারতো একটি হাদিসও মুখ দিয়ে বের হয়না’। তখন তিনি ‎স্বাভাবিকভাবেই ক্ষেপে যান। তখন আমি উঠে চলে আসলাম”। ‎

উস্তাদজি আনন্দচিত্তে আমাকে নিয়ে কয়েকটি গ্রামে ভ্রমণ করেছেন, আর আমার ব্যাপারে প্রচার করতেন যে, ‘দেখ! এই ছেলে ‎ওমুক হানাফী মুফতী সাহেবকে লা-জাওয়াব করে দিয়েছে। সে একটি প্রশ্নের জবাবও দিতে পারেনি। একটি হাদিসও দেখাতে ‎পারেনি। ‎جاء الحق وزحق الباطل ان الباطل كان زهوقا‎ অর্থাৎ সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত, নিশ্চয় মিথ্যা অপসৃতই হয়ই, এই ‎স্লোগান দিতে থাকতেন’।

ছয় নাম্বার

উস্তাদজি এই বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি বলতেন যে, হানাফীদের পর্যুদস্ত করার জন্য কুরআন হাদিস আর ফিক্বহ পড়ার ‎কোন দরকার নাই। নিম্নের কয়েকটি বিষয় ভাল করে পড়েই তাদেরকে পর্যুদস্ত করে একশত শহীদের সওয়াব পেতে পার। ‎

১. যখন কোন হানাফীর সাথে সাক্ষাত হয় তখন তাকে প্রশ্ন কর যে, আপনি যে ঘড়ি হাতে দিলেন এটা কোন হাদিস দ্বারা ‎প্রমাণিত? এরকম প্রশ্নের জন্য কোন ইলমের প্রয়োজন নেই। তুমি একটি ছয় বছরের বাচ্চাকে মেডিকেল ষ্টোরে পাঠিয়ে দাও। ‎সে ওষুধের উপর হাত রেখে প্রশ্ন করবে যে, এই ওষুধের নাম হাদিসের কোথায় আছে? এই প্রশ্নটির পর নিজের মসজিদে এসে ‎বলবে যে, আমি অমুক হানাফী মাওলানা সাহেবকে হাদিস জিজ্ঞেস করলাম, সে বলতে পারেনি। তারপর তখন সকল গায়রে ‎মুকাল্লিদ বাচ্চা ও বয়স্কদের উপর ফরজ হল, তারা প্রত্যেক অলিতে গলিতে এই প্রচারণা চালাবে যে, ওমুক হানাফী মাওলানা ‎সাহেব একটি হাদিসও জানেনা।

২. দ্বিতীয় নাম্বার হল এই যে, আল্লাহ না করুন যদি তুমি কোথাও ফেঁসে যাও, আর তোমাকে জিজ্ঞেস করে বসে যে, তুমি যে ‎পাঞ্জাবীতে পকেট লাগালে তার নাম হাদিসের কোথায় আছে? তখন ঘাবরিওনা, বরং তৎক্ষণাৎ তাকে জিজ্ঞেস কর যে, কোন ‎হাদিসে এর নিষেধাজ্ঞা আছে? আর শোরগোল শুরু করে দিবে যে, নিষেধাজ্ঞার হাদিস দেখাতে পারবেনা, ওমুক কাজ করারও ‎হাদিসও দেখাতে পারবেনা। তখন সকল গায়রে মুকাল্লিদরা এটা প্রচার করতে শুরু করবে যে, সে হাদিস কোত্থেকে পাবে? ‎সেতো সারা জীবন ফিক্বহ নিয়েই পড়ে থাকে।

৩. আর যদি কোন স্থানে এভাবে ফেঁসে যাও যে, ‘কোন হাদিসের কিতাব নিয়েই আসে, আর বলে যে, তুমি আহলে হাদিস, ‎অথচ কত হাদিসের উপর তোমাদের আমল নেই’। একথা শুনে ঘাবরানোর দরকার নেই, তখন হঠাৎ করেই কাশি দিয়ে বলতে ‎শুরু করবে যে, এই হাদিসের কোন ঠিক নেই, কোত্থেকে এনেছ? আমরাতো কেবল বুখারী মুসলিম আর বড় জোর সিহাহ সিত্তার ‎হাদিসই কেবল মানি। বাকি সব হাদিসের অধিকাংশ কেবল শুধু অস্বিকারই করিনা, বরং বিদ্রোপও করি। আর আমাদের হাসি ‎তামাশা দেখে বেচারা এতটাই লজ্জা পাবে যে, সে হাদিসের কিতাব লুকিয়ে জান বাঁচাতে ছুটে পালাবে।

৪. যদি কেউ এই ছয় কিতাবের মধ্য থেকে কোন হাদিস দেখিয়ে দেয়, যা তোমাদের বিপরীত। তখন তাড়াতাড়ি কোন শর্ত ‎নিজের পক্ষ থেকে লাগিয়ে দিবে যে, ‘ওমুক শব্দ দেখাও! তাহলে এক লাখ টাকা তোমাকে পুরস্কার দিব। যেমন মির্যায়ীরা বলে ‎থাকে যে, “এই শব্দে হাদিস দেখাও যে, জাগতিক শরীরসহ হযরত ঈসা আ. জীবিত আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সেটা সহীহ, ‎সুষ্পষ্ট, আর মারফু’ আর গায়রে মারজুহ, হতে হবে”। যেমন গায়রে মুকাল্লিদরা বলে থাকে যে, “রফয়ে ইয়াদাইন এর সাথে ‎রহিত হবার শব্দ দেখাও”। তখন নিজের বক্তব্যের উপর এতটা চিল্লাফাল্লা করবে যে, বিরোধি ব্যক্তি চুপ হয়ে যাবে।

৫. যদি কখনো সে শব্দটা পেয়েও যায়, আর দেখিয়ে দেয়, যে শব্দ তুমি জানতে চেয়েছিলে, তখন পূর্ণ শক্তিমত্তা দিয়ে জোরে ‎তিনবার ঘোষণা দিয়ে দিবে যে, এটা দুর্বল! দুর্বল!! দুর্বল!! তখন হাদিসও মানতে হলনা, আবার ভীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে ‎যে, দেখ! মাওলানা সাহেবের তাহকীকই নাই যে, এটা দুর্বল হাদিস।

৬. ছষ্ঠ ও শেষ নাম্বার হল-উস্তাদজি তাগীদ দিয়ে বলতেন যে, ‘যে নামায পড়েনা তাকে তাকে নামায পড়ার কথা বলা যাবেনা। ‎হ্যাঁ যে নামায পড়ে তাকে অবশ্যই বলবে যে, “তোমার নামায় হয়না”। ‎

ব্যাস। এই ছয় নাম্বার আমাদের ইলমে কালাম তথা তর্কশাস্ত্রের মেরুদন্ড ছিল। আমার পিতা নামায, রোযা, আর তাহাজ্জুদের ‎খুব পাবন্দ ছিলেন। তিনি খুবই ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন তার সাথে আমার ঝগড়া হত। আমি বলতাম তাকে-‎‎“আপনার নামায হয়না। আপনার দ্বীন আপনার তাহাজ্জুদ কিছুই কবুল হবেনা। আপনার কোন ইবাদতই গ্রহণযোগ্য নয়”। ‎আমার পিতা বলতেন-“ঝগড়া করনা, তোমার নামাযও হয়, আমার নামাযও হয়”। আমি বলতাম-“কত বড় ধোঁকা এটা! কি ‎এক খোদা দুই নামায নাজিল করেছেন? একটা মদীনায় আর একটা কুফায়? আমাদের নামায নবীজী সা. এর নামায, যা ‎আমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে। আপনাদের নামায কুফাবাসীর নামায। এটা আপনাদের সোজা জাহান্নামে নিয়ে যাবে”। আমার ‎পিতা বলতেন-“ফালতু প্যাচাল করনা”। আমি এটাকে আমার জীবনের বড় বিজয় মনে করতাম। আর অহংকারের সাথে ‎বলতাম-“আমিতো আপনাকে অনেক সম্মান করি, নতুবা ফিক্বহের গোমর ফাঁক করে দিতাম। যার ফলে সবার মাথা গরম হয়ে ‎যাবে”। ‎

এরকম করেই কেটে গেল কয়েক বছর।

স্থানান্তর

আমরা সেখান থেকে অন্যত্র চলে গেলাম। সেখানে কোন উৎসাহদাতাও ছিলনা। ছিলনা কোন সাবাশদাতাও। শহরের এক ‎মাদরাসায় এক সময় পড়তে চলে যাই। সেখানে আসবাকে ইলমুন নাহু আর বুলুগুল মারাম এবং নাসায়ী শরীফ ছিল। শিক্ষার ‎উদ্দেশ্য কোন কিতাব পূর্ণ পড়া ছিলনা, বরং ফাতিহা খালফাল ইমাম, রফয়ে ইয়াদাইন, আমীন জোরে বলা, সীনার উপর হাত ‎বাঁধা, টাখনো মিলিয়ে দাঁড়ানো, ইত্যাদি মাসআলা যদি এসে যেত তাহলে প্রথম বিভাগে পাশ করা সুনিশ্চিত ছিল। অবশ্য তখন ‎গ্রামেও সেই তুলকালাম অবস্থা আর বাকি ছিলনা।

খতমে নুবওয়াত আন্দোলন

সে সময় ৫৩ ঈসাব্দের খতমে নবুওয়াত আন্দোলন চলছিল। আমাদের লক্ষ্ণৌ সাহেবরা সেই আন্দোলনের বিরোধি ছিল। ‎কেননা তারা কাদিয়ানীদের মুসলমান বলত। সে সময় এলাকা ঘেঁটে দুই জন বুযুর্গ মানুষ হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ‎আব্দুল হান্নান সাহেব রহ. আর রাওয়ালপিন্ডির তায়ালীমুল কুরআন রাজাবাজারের সাবেক শাইখুল হাদিস হযরত মাওলানা ‎আব্দুল কাদির সাহেব রহ. গ্রেফতার অবস্থায় ছিলেন। এই দুই হযরতকে সাহওয়াল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এই জেলে ‎দারুল উলুম দেওবন্দের ফারেগ ওকারার খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের নেতা হযরত মাওলানা জিয়উদ্দীন সিহারওয়ী রহ. ও ‎ছিলেন। এই দুই জনই দারুল উলুম দেওবন্দের ফারিগ আর ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর খাস ছাত্র ‎ছিলেন। হযরত সিহারওয়ী রহ. দুইজনকেই রাজী করালেন যে, তারা মুক্তি পাবার পর ওকারাতে শিক্ষকতা করাবেন। সুতরাং ‎মুক্তির পর উভয় শায়েখ ওকারাতে আসলেন। হানাফীরা ওকারার মাঝে ইলম ও মারেফাতের এই অনাবিল বৃষ্টিকে অনেক ‎প্রচার করে। আর এই দুই হযরতকে শানদার অভ্যার্থনা জানায়।

বিতর্কের আকাংখা

সে সময় আমার গায়রে মুকাল্লিদ উস্তাদ খান্ডিলওয়ীর মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল জাব্বার সাহেব ছিলেন। তিনি আমাকে ডেকে ‎বললেন-“শোন! আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. এর ছাত্র এসেছে। তাদের সাথে বিতর্ক করতে হবে”। আমি তাচ্ছিল্যের ‎সাথে বললাম-“তারা কি করবে? খোদ ইমাম আবু হানীফা রহ. কবর থেকে উঠে এলেও আমাদের সাথে মুকাবিলা করতে ‎পারবেনা। আমাদের সাথে আছে হাদিস। আর তাদের কাছে কিয়াস তথা যুক্তি”। উস্তাদ সাহেব এতে খুব খুশি হলেন। অনেক ‎দু’আ করলেন। একটি প্রচারপত্র দিলেন, যার শিরোনাম ছিল “সারা পৃথিবীর হানাফীদের এগারো হাজার টাকা পুরস্কারের খোলা ‎চ্যালেঞ্জ”। তিনি বললেন-“এই ইশতিহার নিয়ে যাও! তোমার বিজয় অবশ্যাম্ভাবী।

ঈদাগাহ ময়দানে

সেই হযরতদের অবস্থান ঈদগাহ মাদরাসায় ছিল। আমি দেখলাম যে, হযরত মাওলানা আব্দুল হান্নান সাহেবের আশেপাশে ‎বহুত মানুষ। আর হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির সাহেবের কাছে কম মানুষ। প্রথম দর্শনেই আমি আন্দাজ করলাম যে, ‎তাদের মাঝে বড় আলেম কে? আমি পিছনের চেয়ারে বসে গেলাম। হযরতের কাঁধ এবং মাথার উপর হাত বুলাতে শুরু ‎করলাম। হযরত আমার দিকে দুই তিনবার তাকালেন। কিন্তু চুপ রইলেন। চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলেন-“কি কর?” আমি এই ‎সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলাম। চট করে পকেট থেকে প্রচারপত্রটি বের করে হযরতের সামনে খুলে দিলাম। আর আরজ করলাম ‎যে, ‘হযরত! আহলে হাদিসের লোকেরা আমাকে খুব চাপে ফেলেছে। তারা হাজার টাকা পুরস্কারও ঘোষণাও করেছে। কিন্তু ‎আমাদের ওলামাদের কাছে কোন হাদিসই নাই। আপনি কষ্ট করে তাড়াতাড়ি আমাকে রক্ষা করুন। আর হাদিস লিখে দিন। ‎যাতে এই এগার প্রশ্নের জবাব থাকবে’। হযরত বললেন-“আমি পাঞ্জাবে অধ্যাপনা খুব কম করেছি। আমার উর্দু বেশি ভালনা। ‎মাওলানা আব্দুল কাদির সাহেব পাঞ্জাবে অনেক অধ্যাপনা করেছেন। তার উর্দুও খুব ভাল। তার এই সকল মাসআলায় আগ্রহও ‎আছে। তুমি তার কাছ থেকে বুঝে নাও”। ‎

আমি উঠে হযরত মাওলানা আব্দল কাদির সাহেবের দিকে চললাম। এদিকে হযরত মাওলানা আব্দুল হান্নান সাহেব আওয়াজ ‎দিয়ে বললেন-“ছেলেটা বুদ্ধিমান তাকে ভাল করে বুঝান, আল্লাহর কাছে এই প্রত্যাশা রাখি যে, প্রথম চান্সেই তার থেকে ‎অন্ধকারচ্ছন্নতা বিদূরিত হবে”। হযরতের বলার পর আমার হাত থেকে মাওলানা সাহেব ইশতিহারনামাটি নিলেন। মাওলানা ‎সাহেব ইশতিহার পড়তে ছিলেন আর আমার চোখ ছিল মাওলানা সাহেবের চেহারার উপর। কিছুক্ষণ পরপর ঠোঁটে মুচকি হাসি ‎দেখা দিত। কখনো চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ পরিলক্ষিত হত। অবশেষে মাওলানা সাহেব পূর্ণ ইশতিহারটি পড়লেন।

Advertisements

2 thoughts on “তাজাল্লিয়াতে সফদর : কথিত আহলে হাদীছের মুখোশ ‍উন্মোচন -৪

  1. Nurullah says:

    আমি হানাফিও না গায়রে মুকাল্লিদও না আমি মুসলিম ” মিল্লাতা আবিকুম ইবরাহীম” এই ঝগরা কবে শেষ হবে।

  2. nahid ahmad says:

    আমি হানাফিও না গায়রে মুকাল্লিদও না, আমি মুছলিম। রাছূল আমাদের জন্য দুটি বিষয় রেখে গেছেন- কিতাবুল্লাহ্‌ ও ছুন্নাতু রাছূলিল্লাহ্‌। মুছলমানদের মধ্যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেদ সৃষ্টি করলে আপনারা তথা-কথিত হানাফী অথচ ইমাম আবূ হানীফার কথাকে অস্বীকার কারীরাই করেছেন। আপনাদের হানাফীদের মধ্যে কেউ আবার চিশতী, কেউ নক্বশ্‌বন্দী। আবার কেউ দেওবন্দী, এ রকম আরো কত কিছু। মুছলমানদের মাছলাক তো একটাই হওয়ার কথা। আপনাদের কথা শুনলে মনে হয়- জোরে আ-মী-ন বলা, বুকে হাত বাঁধা প্রভৃতি বিষয়ে গাইরে মুক্বাল্লিদরাই নতুন করে বলছে, এ বিষয়ে পূর্ববর্তী হাক্বানী-রাব্বানী উলামা কেউই কিছু বলেননি। তাহলে তো বিষয়টা এমন হয়ে গেল যে, আপনাদের থেকে ভিন্নমত পোষণকারী পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম ও ছিলেন দ্বীনী বিষয়ে অবুঝ নতুবা উদাসীন (আপনাদের মতো কর্কশ কন্ঠে বললে- ‘‘ফিতনাবাজ’’), আর কেবল আপনারাই ছমুঝদার।
    আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সত্য জানা ও পরিচয় করা এবং মানা আর অপরকে মায়া-মুহাব্বাত এবং হিকমাতের সাথে জানানোর তাওফীক্ব দান করুন। আ-মী-ন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s