তাজাল্লিয়াতে সফদর : কথিত আহলে হাদীছের মুখোশ ‍উন্মোচন -৩

তাযাল্লিয়াতে সফদর-২ (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হানাফী)

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العلمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين، اما بعد-‏

প্রিয় পাঠকেরা! এই দুনিয়ার মাঝে অনেক ধর্ম পাওয়া যায়, কিন্তু এর মাঝে সত্য ধর্ম শুধু ইসলামই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-‎নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালার কাছে মনোনিত ধর্ম হল ইসলাম (সূরা আলে ইমরান-১৯) “ আর যারা ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম চায় তা ‎কখনো গ্রহণীয় হবেনা। আর সে আখেরাতে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”। (সূরা বাকারা-৮৫) ‎

এমনিভাবে মুসলমানদের মাঝে বেশ কিছু ফিরক্বা পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের মাঝে নাজাত পাবে শুধু আহলে সুন্নাত ওয়াল ‎জামাআত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-“নাজাতপ্রাপ্ত হবে তারা যারা আমার এবং সাহাবাদের মত ও পথে থাকবে” ( ‎তিরমীজী শরীফ, হাদিস নং-২৬৪১) তিনি আরো বলেন-“আমার এবং আমার খুলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নত অবশ্যই আঁকড়ে ‎ধর” (তিরমিজী শরীফ) নবীজী আরো ইরশাদ করেন-“যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে আমার থেকে নয়” (বুখারী ‎শরীফ-হাদিস নং-৪৭৭৬) আর এক বর্ণনায় নবীজী সাঃ তার সুন্নাত পরিত্যাগকারীকে বলেছেন অভিশপ্ত (মিশকাত শরীফ) ‎আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ছাড়া বাকি দলকে জাহান্নামী বলেছেন নবীজী সাঃ (তিরমীজী শরীফ, হাদিস নং-২৬৪১) ‎হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ বলেন-যখন নবীজী সাঃ থেকে আয়াতে কারীমা-‎يوم تبيض وجوه‎ এর তাফসীর পৌঁছানো হয়, ‎তখন নবীজী সা. ইরশাদ করেন-“যাদের চেহারা কিয়ামতের দিন আলোকিত হবে তারা হল “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত”। ‎আর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ ও এরকম ইরশাদ করেছেন (আদ দুররুল মানসুর-২/৬৩) নবীজী সাঃ আরো বলেন- “হাসান ‎রাঃ এবং হুসাইন রাঃ আহলে সুন্নাতের চোখের শীতলতা”।(আল কামিল লি ইবনে আছীর-৪/৬২)‎

ব্যাখ্যা

নবীজী সাঃ বলেন-আমার উম্মতের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এ দু’টিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে রাখলে তোমরা পথভ্রষ্ট ‎হবেনা, আল্লাহ তায়ালা কিতাব, এবং আমার সুন্নাত (মুয়াত্তা মালিক-হাদিস নং-৭০২) কুরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালার ‎সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ কিতাব। যা সর্ব প্রকার সন্দেহ থেকে পবিত্র। তা শাব্দীক ইলহাম তথা ওহীয়ে মাতলু’। আর নবীজী সা. এই ‎কিতাবের উপর খোদ আল্লাহ তায়ালার বুঝানোর হিসেবে তিনি যে আমলী নমুনা আমাদের সামনে পেশ করেছেন তাই হল ‎সুন্নাত। আর এতে আহলে সুন্নাত এর অর্থটাও বুঝে এসে গেল। অর্থাৎ যারা কুরআন পাকের উপর নিজের সিদ্ধান্ত নয় বরং ‎রাসূল সা. এর আমলী নমুনা সামনে রেখে আমল করে তাদেরকেই বলা হয় “আহলে সুন্নাত”। কেননা শব্দটা কুরআনের আর ‎আমলের নমুনা হল নবীজী সা. এর। আর এইতো সুন্নাত!‎

ওয়াল জামা’আত

যেমন কুরআনে কারীম সহীহভাবে বুঝার জন্য কেবল আরবী ভাষাই যথেষ্ট নয়। বরং নবীজী সা. এর আমলী জীবনই হল এর ‎সহীহ তাফসীর। এমনিভাবে রাসূল সা. আগত উম্মতদের জন্য সাহাবায়ে কিরামের জন্য একটি বিরাট দল তৈরী করলেন, যারা ‎তাঁর তত্বাবধানে তাঁরই সুন্নাতের আমল করেছেন। আর পরবর্তী আগত উম্মতের জন্য তারা সুন্নাতের আমলী নমুনা হলেন। ‎তারা শুধু নবীর নিগারানীতেই তৈরী হননি, বরং আল্লাহ তায়ালাও তাদের পূর্ণাঙ্গ তত্বাবধায়ন করেছেন। সাথে সাথে ‎رضى الله ‏عنهم ورضو عنه‎ (আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ তায়ালার উপর সন্তুষ্ট।) সার্টিফিকেটও আল্লাহ তায়ালা ‎দিলেন। ‎

নবীজী সা. তাগীদের সাথে হুকুম করেছেন-‎عليكم بالجماعة‎ এই জামাআতকে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধর। নবীজী সা. জামাআত ‎থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে শয়তানের লোকমা বলেছেন। আর ঐ বকরীর সাথে তুলনা করেছেন- যে রাখালের নিয়ন্ত্রণ এবং ‎বকরীর পাল থেকে বেরিয়ে কোন নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ)‎

শায়েখ ইবনে তাইমিয়া র. বলেন-‎فاهل السنة والجماعة هم المتبعون للنص والإجماع‎ অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হল ঐ ‎সকল লোক-যারা কুরআন সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মতের অনুস্বরণ করে (আল মানহাজুস সুন্নাহ-৩/২৭২)‎

পূর্ণাঙ্গ দ্বীন

আল্লাহ তায়ালা তাঁর শেষ এবং এবং পূর্ণাঙ্গ কিতাবের মাঝে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা দিয়েছেন-‎الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ ‏وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلامَ دِيناً [المائدة:3]‏‎ অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ ‎করে দিলাম, আর তোমাদের উপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। আর তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে নির্বাচিত করলাম ‎ইসলামকে।(সূরা মায়িদা-৩)‎

শক্তিশালী দ্বীন

রাসূল সাঃ যেই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনে ইসলাম নিয়ে এসেছেন গোটা পৃথিবীর জন্য। আরবে তা নবীজী সা. এর জীবদ্দশায়ই পরিপূর্ণ ‎বিকাশ লাভ করে। বাকি অনারবে নবীজীর সাহাবা যারা নবীজীর সুন্নাতের নমুনা ছিলেন তাদের দ্বারা তা বিকাশ লাভ করে। ‎একথার সুসংবাদতো খোদ কুরআনে কারীমেই বিদ্যমান-“আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন ঐ সকল লোকদের জন্য যারা ‎তোমাদের মাঝে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের পৃথিবীতে খলীফা বানাবো, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের বানিয়েছি। ‎এবং তাদের জন্য নির্বাচিত দ্বীনকে তাদের জন্য দৃঢ় করে দিব। আর তাদের জন্য ভীতিকে নিরাপত্তা দিয়ে পাল্টে দিব। তারা ‎আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কারো শরীক করবেনা। তারপরও যারা কুফরী করবে তারাই নাফরমান”। (সূরা নূর-৫৫)‎

সুতরাং যেই দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা হুজুর সা. উপর হয়েছিল তা সাহাবায়ে কিরামের মেহনত এবং চেষ্টায় দুনিয়ায় মজবুতির সাথে ‎প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই পবিত্র জামাআত, যাদের সুন্দর উল্লেখ্যতা আমাদের নামের মাঝে জামাআত নামে চলে এসেছে। আহলে ‎সুন্নাত ছাড়া কোন আহলে বিদআতের নাম না ওয়াল জামাআত না এর দ্বারা সাহাবাদের জামাআত উদ্দেশ্য।

দ্বীনি বিষয় সংকলন

কুরআনে কারীমের পূর্ণাঙ্গ আমলী ব্যাক্ষা সুন্নাত। এই সুন্নাতের পূর্ণাঙ্গ আমলী নমুনা সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন, যারা নীবজী সা. ‎এর তত্বাবধানে তৈরী হয়েছিলেন। তাদের মাধ্যমে নবীজী সা. এর সুন্নাত দুনিয়ায় বিকাশ লাভ করেছে। নবীজী সা. ‎হেদায়াতের সূর্য ছিলেন। আর তাঁর সাহাবারা রা. ছিলেন তারকার মত। তাদের মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। ‎এই সকল পবিত্রাত্মাদের জীবন জিহাদে অতিবাহিত হয়েছে। তাদের এই সুযোগ ছিলনা যে, তারা নবীজীর সুন্নাতকে সাজানো ‎গোছানোভাবে সন্নিবিষ্ট করবেন। কিন্তু এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, যে দ্বীন কিয়ামত পর্যন্তের জন্য এল। তার ‎সহজ এবং সাধারণ্যের বুঝার অনুকূল করে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাক্ষাসহ একত্রিত করে দেয়া হবে। যেন কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানরা ‎এ থেকে তাদের প্রিয় নবীজী সা. এর সুন্নাতের উপর সহজে আমল করতে পারে। এই কারণে এই মহান কর্ম সাহাবায়ে ‎কিরামের শেষ জমানায় শুরু হয়। আর সংকলনের প্রথম পদক্ষেপ সাইয়্যিদুনা ইমামে আজম নু’মান বিন সাবেত আবু হানীফা ‎কুফী রহ. সূচনা করেন। আর এর সুসংবাদও কুরআনে কারীম এবং হাদিসে বিদ্যমান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-“তোমরা ‎শুন! তোমাদের আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য আহবান করা হচ্ছে, তোমাদের মাঝে কিছু লোক এমন আছে যারা কৃপণতা করে, ‎আর যারা কৃপণতা করে, তারা মূলত নিজের সাথেই কৃপণতা করে। আল্লাহ তায়ালাতো অমুখাপেক্ষি, তোমরাই মুখাপেক্ষি, ‎সুতরাং তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে তোমাদের বদলে অন্য এক জাতিকে নিয়ে আসবেন। তারা তোমাদের মত ‎হবেনা”। (সূরা মুহাম্মদ-৩৮)‎

আল্লামা উসমানী রহ বলেন-“অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যেই হিকমত এবং উপকারিতার জন্য বান্দাদের খরচ করার হুকুম ‎দিয়েছেন তা অর্জিত হওয়া তোমাদের উপর নির্ভরশীল নয়। যদি এমন হয় যে, তোমরা কৃপণতা করবে, আর তার আদেশ থেকে ‎মুখ ফিরিয়ে নিবে, তাহলে তিনি তোমাদের স্থানে অন্য এক জাতিকে দাঁড় করিয়ে দিবেন, যারা তোমাদের মত কৃপণ হবেনা। ‎বরং অনেক আনন্দের সাথেই আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালন করবে। আর তার রাস্তায় খরচ করবে। যেভাবেই হোক আল্লাহ ‎তায়ালার হিকমত এবং উপকারিতাতো পূর্ণ হবেই কিন্তু এই সৌভাগ্য থেকে তোমরা হবে বঞ্চিত।

হাদিসের মধ্যে এসেছে সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেন-“হে আল্লাহর রাসূল! দ্বিতীয় জাতি কারা হবে? যাদের দিকে ইঙ্গিত করা ‎হল?” নবীজী সা. হযরত সালমান ফারসী রা. এর উপর হাত রেখে বললেন-“‎ এর জাতি” আর বললেন-“আল্লাহর কসম! যদি ‎ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্র পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তাহলে পারস্যের লোকেরা তা সেখান থেকেও নামিয়ে নিয়ে আসবে”। (বুখারী শরীফ-‎হাদিস নং-৪৩১৫ মুসলিম শরীফ-হাদিস নং-৬৬৬২) আলহামদুলিল্লাহ! সাহাবায়ে কিরামা এরকম নজীরবিহীন কর্মতৎপরতা ‎আর ঈমানের জোশ দেখিয়েছেন যে, তাদের স্থলে অন্যদের রাখার সুযোগই হয়নি। এমনকি পারস্যবাসী ইসলামে প্রবিষ্ট হয়ে ‎ইলম ও ঈামানের শানদার প্রকাশ করেছেন। আর এমন জবরদস্ত দ্বীনী খিদমাত করেছেন যে, যা দেখে যে কেউ চিন্তা ছাড়াই ‎স্বীকার করবে যে, নিশ্চয় হুজুর সা. এর ভবিষ্যতবাণীর তারাই ছিলেন উদ্দেশ্য। যারা প্রয়োজনের সময় আরবের স্থলাভিষিক্ত ‎হতে পারতেন। হাজারো উলামায়ে কিরাম ও আইয়িম্মায়ে কিরামের দিকে না তাকিয়েও শুধু ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ‎বিদ্যমানতাই এই ভবিষ্যতবাণীর সত্যতার জন্য যথেষ্ঠ। বরং মহান ভবিষ্যতবাণীর পূর্ণাঙ্গ এবং প্রথম মিসদাক হযরত আবু ‎হানীফা রহ.। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা স্বাক্ষরতাহীন (আহলে আরব) ব্যক্তিদের উল্লেখের পর ইরশাদ করেন-“আর নবীকে ‎পাঠানো হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি জাতির জন্য যারা এখনো তার সাথে একত্র হয়নি, আর তিনিই পরাক্রমশালী ও ‎হিকমতওয়ালা। আর এসব আল্লাহ তায়ার করুণা, আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছে দান করেন। আর আল্লাহ তায়ালা বড়ই ‎করুণাকারী” (সূরা জুমআ-৩-৪)‎

আল্লামা উসমানী রহ. বলেন-“হযরত শাহ সাহেব রহ. লিখেন যে,-আল্লাহ তায়ালা আরবদের সৃষ্টি করেছেন এই দ্বীনকে ‎প্রতিষ্ঠার জন্য যাদের পিছনে রয়েছে অনারবী কামেল লোকেরা”। হাদিসের মধ্যে এসেছে-“যখন নবীজী সা. কে এই আয়াত‏ ‏آخرون منهم لما يلحقوا بهم‎ ‎و‎ এর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হল তখন নবীজী সা. হযরত সালমান ফারসী রা. এর কাঁধে হাত রেখে ‎বললেন-“যদি ইলম বা দ্বীন “সুরাইয়া” পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তাহলে তাঁর জাতি পারস্যের লোকেরা সেখান থেকেও তা নিয়ে ‎আসবে। শায়েখ জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহ. প্রমুখগণ একথা স্বীকার করেছেন যে, এই ভবিষ্যতবাণীর বড় মিসদাক (লক্ষ্য) হল ‎ইমামে আজম আবু হানীফা রহ.”। (তাফসীরে উসমানী হাশিয়া নং-৭)‎

সুতরাং এই ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী সাইয়্যিদুনা ইমাম আজম আবু হানীফা রহ. দ্বীন সংকলন করেছেন। যেহেতো কুরআনে ‎কারীমের দ্বিতীয় নাম “লুকায়িত দ্বীন”। যার পূর্ণাঙ্গতা নবীজী সা. এর উপর, শক্তিশালীত্ব সাহাবায়ে কিরামের দ্বারা, আর ‎সংকলনের মহান দায়িত্ব প্রথম হবার সৌভাগ্য হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর হয়েছে। আর একারণেই সর্বসম্মতভাতে তার ‎উপাধী আবু হানীফা নির্ধারিত হয়েছে, অর্থাৎ দ্বীনে হানীফের প্রথম সংকলক।

ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মূল নাম নু’মান। ইবনে হাজার মক্কী রহ. নু’মান এর তিনটি অর্থ লিখেছেন-‎

১. “নিয়ামত থেকে ইসমে মুবালাগা”, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা পূর্ণ হবার ঘোষণা দিয়েছেন। তাহলে ‎সবচে’ বড় নিয়ামতের সংকলন যার হাতে হয়েছে তিনি অবশ্যই নামের সাথে মিলে নু’মান।

২. “নু’মান” এক ঘাসের নাম। যার খুশবো বহুদূর পর্যন্ত পাওয়া যায়। বিশ্বনবী সা. এর সার্বজনীন সুন্নাতের খুশবো বিশ্বব্যাপী ‎ছড়িয়েছেন হযরত নুমান বিন সাবেত রাহ.। অন্য কোন ইমামের মাজহাব তার চারপাশেই ছড়েনি। এই জন্যই তিনি নামের ‎সাথে মিলে “নু’মান”।

৩. “নু’মান” ঐ রক্তকে বলে যার উপর জীবন নির্ভরশীল। যা শরীরের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে পৌঁছে। তিনি প্রিয় নবীজীর প্রিয় ‎সুন্নাতকে এরকম ব্যাক্ষা করেছেন যে, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের ছোট বড় প্রায় সকল মাসআলার সমাধান সুন্নাত ‎থেকে অনুসন্ধান করে নিয়েছেন। এই অর্থেও তিনি “নুমান”। এছাড়া তার ফিক্বহ পরবর্তীদের জন্য মূল ভিত্তির কাজ দেয়। ‎

ইমাম মালিক রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. সবাই তার থেকে উপকৃত হয়েছেন। তাই এই অর্থেও ‎তিনি নামের সাথে মিলে ‘নুমান”। ‎

তার উপাধী “ইমামে আজম” কারণ নবীজী সা. বলেছেন-‎أعظم الناس نصيبا في الإسلام أهل فارس‎ অর্থাৎ ইসলামে বড় অংশ ‎পারস্যবাসীর! (কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল-হাদিস নং-৩৪১২৬)‎

বিষয়টি সুষ্পষ্ট। যাদের ইসলামে বড় (আজম) অংশ হবে, তাদের ইমামও বড় (আজম) হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই ইমাম আবু ‎হানীফা রহ. এর উপাধী “ইমামে আজম”। সাহাবায়ে কিরামের পর তাঁকেই মানুষ আজম মেনেছেন। আর দুনিয়ার মাঝে এক ‎বিশাল জামাআত এখনো তার মুকাল্লিদ বা অনুসারী। ‎

মোদ্দাকথা হল-রাসূল সা. হিদায়াতের সূর্য। সাহাবায়ে কিরাম হিদায়াতের তারকা। আর আর সুরাইয়া তারকা পর্যন্ত পৌঁছাকারী ‎ব্যক্তিত্ব হযরত ইমামে আজম রহ.। আহলে সুন্নাতের মাঝে আমাদের নিসবত হিদায়াতের সূর্য পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে। ওয়াল ‎জামাআতের মাঝে আমাদের নিসবত হিদায়াতের তারকাপুঞ্জ পর্যন্ত সুরাইয়া তারকায় পৌঁছাকারী হানাফী ইমামের সাথে।

রাসূল সা. দ্বীন আনয়নকারী। সাহাবায়ে কিরাম দ্বীনকে প্রসারকারী। আর চার মাজহাবের ইমাম দ্বীনকে লিখাকারী। সাহাবায়ে ‎কিরাম সুনিশ্চিতভাবে ঐ দ্বীনই প্রসার করেছেন যা নবী সা. এনেছেন। আর আইয়িম্মায়ে কিরাম ঐ দ্বীনই লিখেছেন যা ‎সাহাবায়ে কিরাম প্রসার করেছেন। আমাদের এই নাম “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হানাফী’ আমাদের মাজহাবের ‎নিরবচ্ছিন্ন সনদ। যা নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরার আমলের উপর নির্ভরশীল। নবী কারীম সা. এর সুন্নাত সাহাবায়ে কিরাম স্বচক্ষে ‎দেখেছেন। আর এর উপরই নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল প্রচলন হয়েছে। আর ইমাম সাহেব রহ. সাহাবীদের দেখেছেন। তাদের ‎নিরবচ্ছিন্ন আমল দেখেছেন। তাদের নিরবচ্ছিন্ন আমলকে কিতাবে সংকলন করেছেন। আর আমল হিসেবে পূর্ণ দুনিয়ায় তা ‎নিরবচ্ছিন্নতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেক স্থানে সুন্নাতের উপর আমল প্রচলন হয়ে গেছে। যেমনিভাবে আমাদের এই নাম ‎নবীজী সা. পর্যন্ত মিলিত। এমনিভাবে এই নামে পূর্ণাঙ্গতাও রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত তারতীবের সাথে চার ‎দলিলে শারইয়্যাহকে মানেন। কিতাবুল্লাহ, সন্নাতে রাসূল, ইজমায়ে উম্মাত, কিয়াস। এই নামের মাঝে চারটি দলিলেরই ‎সমাবেশ আছে। ‎

সুন্নাতে রয়েছে কুরআনের শব্দের আর নবীজী সা. এর আমলী নমুনা। ওয়াল জামাআতের মাঝে ইজমা এবং হানাফী কিয়াস ‎অন্তর্ভূক্ত।

‎ ফিক্বহে হানাফীর চার আসাস(ভিত্তি) ‎

‎ কিতাব, সুন্নাত, ইজমা, কিয়াস

এখন এই বিস্তারিত এবং সনদপূর্ণ মত ও পথের উল্টো কথিত আহলে হাদিসদের পর্যালোচনাও জেনে নিন। প্রফেসর আব্দুল্লাহ ‎ভাগলপুরী নিজের কিতাবে লিখেন-“কতটা আফসোসের ব্যাপার যে, খৃষ্টান, আর মির্যায়ীরা যে কাফের তারাতো তাদের ‎নিসবত তাদের নবীর দিকে করে ঈসায়ী এবং আহমদী বলে। আর তোমরা মুসলমান হয়ে নিজ নবী ছেড়ে নিজের ইমামের ‎দিকে করে হানাফী বলো। কি মির্যায়ী এবং ঈসায়ীরা ভাল না? যারা নিজেদের নিসবত অন্তত তাদের নবীর দিকে করে যারা ‎তাদের নিসবত তাদের ইমামের দিকে করে তাদের তুলনায়?” (আসলী আহলে সুন্নাত-৩) তিনি আরো বলেন-“আসল বাপ ‎রেখে অন্য কারো দিকে নিসবত করা কোন শরীয়তের মাসআলা? যখন নবীজী সা. আমাদের রুহানী পিতা। তো পিতাকে ছেড়ে ‎অন্য কারো দিকে নিসবত করার অর্থ হল যে, হয়তো নবীজী তাদের পিতা নয়!!!! নতুবা তারা ভুলে আছে। রাসূল সা. ‎বলেছেন-“যেই ব্যাক্তি তার পিতা থেকে নিজের নিসবত ভেঙ্গে দেয়া সে কুফরী করল। সাথে সাথে তার জন্য জান্নাত ‎হারাম”।(আসলী আহলে সুন্নাত-৪)‎

সম্মানিত পাঠক/পাঠিকাগণ! আপনারা আহলে হাদিসদের মৌলিকত্ব দেখেন-সমস্ত হানাফী মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী, ‎মুহাদ্দিসীন, ফুক্বাহা, মুফাসসিরীন, ওয়ালী আল্লাহদের মাঝে যারা নবীকে ছেড়ে দিয়েছেন। তারা ঈসায়ী আর মির্যায়ী থেকেও ‎জঘন্য। তাদের মাঝে কেউই নিজেরে বাপ থেকে নয়। তারা সবাই কাফের! তাদের উপর জান্নাত হারাম!! এরকম আহলে ‎হাদিসের জন্য জীবন উৎস্বর্গ হোক!‎

একটু বুঝে শুনে বলুন-ইসলামের কোন সংস্করণ কিংবা কোন প্রকার সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্র নয় যে, শাফেয়িয়্যাত, এবং ‎হানাফিয়্যাত ও ইসলামের কোন প্রকার হবে। সোস্যালিজম হোক বা গণতন্ত্র হোক বা হানাফিয়্যাত বা শাফিয়ীয়্যাত কিংবা ‎দেওবন্দীয়্যাত হোক অথবা বেরলবীয়্যাত হোক, এসব কিছুই ইসলামের মাঝে অতিরঞ্জন। যা ইসলামে একেবারেই নেই। ‎‎(আসলী আহলে সুন্নাত-১৩) ‎

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! কথিত আহলে হাদিসদের হাদিসের উপর আমলের পরিণাম দেখুন! দুনিয়াতে কোথাও মুসলমান ‎পাওয়া যায়??‎

ইখতিলাফ এবং স্বাতন্ত্রতা

সাহাবায়ে কিরামের মাঝে এ ব্যাপারে ঐক্যমত্ব ছিল যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. সবচে’ উত্তম ছিলেন। এজন্য কাউকে ‎আবু বকরী বলা হয়না। তারপর হযরত ওমর রা. এর ব্যাপারেও কোন মতভেদ ছিলনা। এজন্য কাউকে ওমরী বলা হয়না। ‎হযরত উসমান রা. এবং হযরত আলী রা. এর ব্যাপারে কিছু ইখতিলাফ ছিল।

জমহুর সাহাবীরা হযরত উসমান রা. কে হযরত আলী রা. থেকে উত্তম বলতেন। স্বাতন্ত্রতার জন্য হযরত উসমানকে উত্তম ‎বলাকারীদের উসমানী বলা হয়। আর আলী রা. কে উত্তম বলাকারীদের আলিয়ী বলা হয়।

কিছু তাবেয়ীকে উসমানী এবং আলিয়ী বলার বর্ণনা বুখারী শরীফের ১ নং খন্ডের ৪৩৩ নং পৃষ্টায় আছে। ‎

কুরআনে পাকের ক্বিরাতের মাঝে যখন ইখতিলাফ হয় তখন স্বাতন্ত্রতার জন্য ক্বারী আসেম রহ. এর ক্বিরাত এবং ইমাম হামযাহ ‎রাহ. এর ক্বিরাত রাখা হল। এটাকে কেউতো এই উদ্দেশ্য নেয়নি যে, এটা আল্লাহর কুরআন নয়, বরং ক্বারী আসেমের বানানো! ‎হাদিসের মাঝে মতভেদ হলে বলা হয় এটা আবু দাউদের হাদিস আর এটা বুখারীর হাদিস। এই কথার উপরও কেউ কুফরীর ‎নিসবত করেনাতো! ‎

ঠিক এমনি হাল ফিক্বহী বিষয়ে মতভেদের সময় ‘হানাফী” আর “শাফেয়ী” বলাটা। আমরা ঈসায়ীদের বিপরীতে নিজেকে ‎মুসলমান বলি। আহলে বিদআতি খারেজী মুতাজিলীদের বিপরীতে নিজেদের আহলে সুন্নাত বলি। আর শাফেয়ীদের বিপরীতে ‎নিজেদের হানাফী বলি। ‎

যেমন আমরা ভারতীদের বিপরীতে নিজেদের পাকিস্তানী বলি। (আমরা বলি বাংলাদেশী-অনুবাদক) জাতিভেদের বিপরীতে ‎বলি আমরা পাঞ্জাবী, লাহোরীদের বিপরীতে এসে বলি ওকারওয়ী। ওকারওয়ী পাঞ্জাবী, পাকিস্তানিকে মেনে বলা হয়। ছেড়ে ‎নয়। বেচারা প্রফেসর সাহেবের এই অবস্থা হল যে, “নাকি” শব্দের ব্যবহারও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেননা। এই শব্দটি ‎একই প্রকারের ক্ষেত্রে আসে। যেমন আজ শনিবার নাকি রবিবার? আজ নভেম্বর নাকি ডিসেম্বর? সুতরাং প্রশ্ন হবে-“তুমি ‎মুহাম্মদী না ঈসায়ী? তুমি হানাফী না শাফেয়ী?” কিন্তু একথা বলা ভুল এবং হাস্যকর যে, “তুমি পাকিস্তানী না পাঞ্জাবী? আজ ‎নভেম্বর না শনিবার? তুমি হানাফী না মুহাম্মদী?” ‎

যে লোক উর্দুর একটি শব্দের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানেনা সে কুরআন হাদিস ঘোড়ার ডিম বুঝবে! আল্লাহ তায়ালা ‎আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে সকল প্রকার সন্দেহ থেকে হিফাযত করুন। আমীন হে রাব্বুল আলামীন।

তাযাল্লিয়াতে সফদর-৩ (গবেষণা এবং গবেষণার হকদার)

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! আজ দুনিয়ার মাঝে ইলমী বন্দর এমন কিছু স্বাধীনচেতা লোক দখল করে নিয়েছে যে, তাদের অজ্ঞতাতো একটি বড় ফিতনা ছিল, কিন্তু এই স্বাধীনচেতা মনোভাব আরো একটি নতুন ফেতনার জন্ম দিয়েছে। যাদের দেখা যায় যে, তারা দ্বীনের মাঝে গবেষণাও সম্পাদনার দাবিদার। আর ঐদ্ধত্বের সাথে বলে “আমরা গবেষণা করছি” এই কথা বলার মাঝে তাদের অনেক গর্ব আর ধোঁকা আছে।

গবেষণার হুকুম

এর মাঝে কোন সন্দেহ নেই যে, দ্বীনে ইসলাম একটি নীরিক্ষিত ধর্ম। যেখানে গবেষণা করার হুকুম দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-يا ايها الذين آمنوا ان جائكم فاسق بنبإ فتبينوا ان تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم ندمين،(سورة الحجرات-6)

অর্থাৎ হে মুমিনরা! যখন তোমাদের কাছে কোন ফাসিক ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসে, তখন তা অনুসন্ধান কর। যদি তোমরা না জেনে কোন জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড় তাহলে অবশেষে তোমরা যা করেছো তার উপর লজ্জিত হবে। (সূরা হুজুরাত-৬)

শাইখুল ইসলাম আল্লামা উসমানী রহ. বলেন-অধিকাংশ বিবাদ আর বাদানুবাদের সূচনা হয় মিথ্যা সংবাদের উপর ভিত্তি করে। এজন্য প্রথমেই এই মতভেদ ও দলাদলির এই ফেতনাকে বন্ধ করার শিক্ষা দেয়া হল। অর্থাৎ খবর শুনেই যাচাই না করে গ্রহণ করনা। সুতরাং বুঝা গেল “দ্বীন ও দুনিয়ার সকল ফিতনা ফাসাদের মূল ভিত্তি হল যাচাই বাছাইহীন হয়ে পড়া। যদি দুনিয়াতে গবেষণাহীন বিষয়ের উপর আমল করা হয় তাহলে দুনিয়াতে ক্ষতি হবে। আর দ্বীনের মাঝে যদি গবেষণাহীন বস্তুর উপর আমল করা হয় তাহলে দ্বীন বরবাদ হয়ে যাবে।

গবেষণা-সম্পাদনার হকদার

যেমন দুনিয়াতে প্রত্যেক বিষয়ে ঐ ব্যক্তির গবেষণাকেই গবেষণা ধরা হয়, যে উক্ত বিষয়ের উপর পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা অর্জন করেছে। অযোগ্য ব্যক্তির গবেষণাকে নয়।

যেমন হীরার মত জওহরের বিষয়ে অভিজ্ঞ জওহরীর কথা গ্রহণীয় হবে, কোন মুচির কথা নয়। স্বর্ণের মত অলংকারের বিষয়ে অভিজ্ঞ স্বর্ণকারের যাচাই বাছাই গ্রহণীয় হয়, কোন কামারের কথা নয়। আর আইনী বিষয়ে একজন আইনজ্ঞের গবেষণা গ্রহণীয় হবে, কোন ক্যানভাসারের নয়। এমনিভাবে দ্বীনের ক্ষেত্রে দ্বীনী বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির গবেষণা গ্রহণীয় হবে, কোন অর্বাচিনের নয়। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা গবেষণার হুকুম দিয়ে, কারা গবেষণা করার হকদার তা’ও বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-وَإِذَا جَاءهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُواْ بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُوْلِي الأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْلاَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لاَتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلاَّ قَلِيلاً (سورة النساء-83) আর যখন তাদের কাছে পৌঁছে কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের সংবাদ তখন তারা তা প্রচার করে দেয়। আর যদি তারা তা পৌঁছে দিত রাসূল সা. পর্যন্ত এবং তাদের মাঝের জ্ঞানীদের কাছে, তাদের মাঝে যার উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী তার তা উত্তমভাবে জানত। যদি আল্লাহ তায়ালার করুণা ও রহমত তোমাদের উপর না হত তাহলে তোমাদের মাঝের কিছু লোক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত। (সূরা নিসা-৮৩)

শাইখুল ইসলাম আল্লামা উসমানী রহ. বলেন-“অর্থাৎ এই মুনাফিক ও কম বুঝের মুসলমানের একটি খারাবী এই যে, তাদের কাছে যখন কোন সংবাদ আসে, তখন তারা তা যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রচার করা শুরু করে। আর এতে অধিকাংশ ক্ষতি এবং ফিতনা মুসলমানদের উপরই আপতিত হয়। মুনাফিকরা মুসলমানদের কষ্ট দেবার জন্য আর কম বুঝের মুসলমানরা না বুঝার কারণে এমননটি করে থাকে।

কোথাও থেকে কোন সংবাদ আসলে উচিত হল প্রথমে তা নেতার কাছে পৌঁছে দেয়া, অথবা তার স্থলাভিষিক্তের কাছে। যখন তিনি তা যাচাই বাছাই করে মেনে নেন, তাহলে তার বলা অনুযায়ী বিষয়টি প্রচার করবে, এবং এর উপর আমল করবে।

এই আয়াতে কারীমায় মহান রাব্বুল আলামীন গবেষণার হক আল্লাহর নবী সা. কে দিয়েছেন, তারপর গবেষণার যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়েছেন। যাদের পরিভাষায় “মুজতাহিদীন” বলা হয়।

আহলে ইস্তিম্বাত তথা গবেষণা-সম্পাদনার হকদার

ইস্তিম্বাত আরবী শব্দ। যার অর্থ হল-“আল্লাহ তায়ালা যেই পানি জমিনের নিচে সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রেখে দিয়েছেন। সেই পানিকে কুপ ইত্যাদী বানিয়ে বের করা”। আল্লাহ তায়ালা ইজতিহাদ এবং ফিক্বহের এমন সহজবোধ্য উপমা দিয়েছেন যা প্রত্যেক ব্যক্তি সহজেই বুঝতে পারবে। এই উপমা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রথম কথাতো এটা বুঝালেন যে, মানুষের জীবন ধারণের জন্য যেমন পানির প্রয়োজন। এছাড়া অযু-গোসল, কাপড় পরিস্কার করা, খানা পাকানো কিছুই সম্ভব নয়, তেমনি ইসলামী জীবনের জন্য ফিক্বহ জরুরী। ইবাদত হোক বা মুয়ামালা হোক বা ব্যবসা হোক, কিংবা রাজনীতি। শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি হোক বা রাষ্ট্রীয় সাজা হোক। মোটকথা জীবনের এমন কোন অংশ নেই, যাতে ফিক্বহের দিক নির্দেশনার কোন প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয় কথা এটা বুঝিয়ে দিলেন যে, ফিক্বহ ও ইস্তিম্বাত কারো ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয়, যেমন কুপের নিচে যেই পানি আছে তা আল্লাহ তায়ালারই সৃজনকৃত। ঐ ব্যক্তির সৃষ্টি নয়, যে কুপ খনন করে তা বের করেছে। যখন কোন ব্যক্তি এই কুপের পানি পান করে, তখন এই বিশ্বাস নিয়ে পান করে যে, এই কুপের প্রতিটি পানির ফোটা মহান আল্লাহ তায়ালার অপার সৃষ্টি। একটি ফোটাও ঔ ব্যক্তির নয়, যে তা খনন করে পানি বের করেছে। সে শুধু নিজের মেহনত এবং মেধার সাহায্যে তা আবিস্কার করেছে। যাতে আল্লাহর সৃষ্টি উপকার পায়।

এমনি মুজতাহিদীনরা প্রতিটি মাসআলাকে উসূলে ফিক্বহের আলোকে সাধারণ মুসলমানদের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। যেন আল্লাহ ও তার রাসূল সা. এর এই সকল মাসআলার উপর আমল করা সহজ হয়ে যায়। এইজন্য উসূলে ফিক্বহের মাঝে প্রতিটি মুজতাহিদের একটাই শ্লোগান- ” القياس مظهر لا مثبت “অর্থাৎ আমরা কিয়াসের সাহায্যে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলের মাঝে লুকায়িত বিষয়কে প্রকাশ করি, নাউজুবিল্লাহ! এসব মাসআলা কখনোই আমরা নিজেরা বানিয়ে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূরের দিকে নিসবত করিনা।

তৃতীয় কথা হল-এটা বুঝিয়ে দিলেন যে, যেদিন আল্লাহ তায়ালা মাটি সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই তার নিচে পানি সৃষ্টি করেছেন। তবে এটাকে বের করা প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীল ছিল। কোন এলাকায় চার হাজার বছর আগেই কুপ খনন করা হল, আর কোন এলাকায় চার হাজার বছর পর। তবে যেখানেই পানি বের করা হল, তা আল্লাহ তায়ালারই সৃষ্টিকৃত। কোন জ্ঞানী মানুষ এটা বলবেনা যে, যেসব এলাকায় প্রথমে পানি বের হল, তা আল্লাহ তায়ালার সৃজনকৃত ছিল, আর যেসব এলাকায় পরে পানি বের করা হল, তা কোন মানুষের বানানোর পানি! প্রথম শতাব্দীতে চার ইমাম যেসব মাসআলা ইজতিহাদ করেছেন তা কুরআন সুন্নাহেরই মাসআলার বর্ণনা ও ব্যাক্ষা ছিল। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, সাহাবায়ে কিরামের পবিত্র জীবন জিহাদে অতিক্রান্ত হয়েছে। তাই তাদের এই মহান কর্মটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাক্ষা এবং সংকলনের সুযোগ হয়নি। এই সৌভাগ্য চার ইমামের ভাগ্যে জুটেছে। যখন কুরআন ও সুন্নাহের প্রকাশিত এবং লুকায়িত মাসায়েলের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ও ব্যাক্ষার একদম সহজ পদ্ধতি ও সাধারণ্যের জন্য সহজ বর্ণনায় সংকলন করে দিলেন, যেন কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের কুরআন ও সুন্নাহের উপর আমলা করা সহজ হয়ে যায়।

 

সারকথা

যেমন এক ব্যক্তি কুপ বানিয়ে নিল, আর হাজারো মানুষ তা থেকে পানি পান করতে লাগল। অযু গোসল করে নামায আদায় করতে লাগল। খানা পাকিয়ে খেতে লাগল। এখন কোন ব্যক্তি এই কুপের এ নাম প্রচার করে দিল যে, “এটা “চৌধূরী নওয়াব দ্বীনের কুপ”। এই জন্য এই কুপের মধ্যে যেসব পানি আছে এটা আল্লাহ তায়ালার সৃজনকৃত পানি নয়। বরং চৌধুরী নওয়াব দ্বীনের সৃজনকৃত পানি। চৌধুরী নওয়াব দ্বীন আল্লাহর সাথে শরীক করেছে। সুতরাং যে লোক এই কুপের পানি পান করবে তারা মুশরিক?! এর দ্বারা না অযু সহীহ, না গোসল সহীহ! না নামায সহীহ! না রোযা!”

তখন কি কোন জ্ঞানী মানুষ লোকটির প্রলাপের উপর কান দিবে? একই অবস্থা এখানেও যে, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন রহ. কিতাব ও সুন্নাতের মাসায়েলকে প্রকাশ করেছেন, এবং একে কুপের আকৃতি
দিয়েছেন। মুকাল্লিদরা এসকল মাসায়েল অনুযায়ী নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, জিহাদ ইত্যাদী আমল করে থাকে। আমাদের গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুরা কখনো তো বলে-“এই পানিতো আল্লাহর সৃজনকৃত পানি নয়, নতুবা এর প্রতিটি পানিতে আল্লাহর নাম লেখা দেখাও” কখনো বলে “ সারা জীবন একই কুপের পানিতে অযু করা এটাতো ‘তাকলীদে শখসী’ সুতরাং এটা শিরক‍! প্রত্যেক নামাযীর জন্য আবশ্যক সে ফজরের নামাযের অযু ঘরের কুপ থেকে করবে, যোহরের অযু অন্য জেলার কুপ থেকে করবে, আসরের অযু অন্য প্রদেশের কুপ থেকে করবে। মাগরীবের অযু অন্য রাষ্ট্রের কুপ থেকে করবে! আর ইশার অযু অন্য গ্রহের কুপ থেকে করবে! নতুবা একই কুপের পানি দিয়ে সকল নামাযের অযু করাটা ‘তাকলীদে শখসী’ আর এটা শিরক”।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলেন-“ যেহেতো আমরা কুপের প্রতি মুখাপেক্ষি, তো যেই কুপের পানি সহজে ব্যবস্থা হয় সারা জীবন সেই এক কুপের পানি পান করা, এই পানি দিয়ে সারা জীবন খানা পাকানো, এই পানি দিয়েই সারা জীবন অযু গোসল করা অবশ্যই জায়েজ। এটাকে শিরক বলে সকল মুসলমানকে কাফের বানানো দ্বীনের কোন খিদমাত নয়।

 

 

মৌল আলোচ্য বিষয়

ইস্তিম্বাত এর অর্থ স্পষ্ট করার পর আসল কথার দিকে মনোনিবেশ করছি যে, দ্বীনের মাঝে গবেষণা করার হক শুধু দুই ব্যক্তিত্বের রয়েছে। তারা হলেন ১. নবীজী সা. ২. মুজতাহিদীনরা।

রাসূল সাঃ এর মাকাম

নবীজী সা. দ্বীনের ক্ষেত্রে নিজের পক্ষ থেকে কোন কিছুই বলেন না। বরং আল্লাহ তায়ালার পয়গামই বান্দা পর্যন্ত পৌঁছান। আর শুধু পৌঁছানইনা, বরং শিখানও। সাথে এর মৌলিকত্বের অবস্থানও স্পষ্ট করেন। তিনি তার বক্তব্য কর্ম এবং মৌনতার মাধ্যমে এই পয়গামের ব্যাক্ষা করেন। তিনি শুধু মুবাল্লিগ (পৌঁছানোকারী) এবং মু’লিম (জানানোকারী) ই নন, বরং আল্লাহ তায়ালার তত্বাবধানে এর ব্যাক্ষাও করেন। তিনি কাজী এবং বিচারকও। তিনি আল্লাহর বিধান কার্যকর করেন। তার পূর্ণ জীবন অহীর ছাঁচে ঢাকা হবার ধরুন গোটা পৃথিবীর জন্য তিনি ওসওয়ায়ে হাসানা। তিনি দ্বীনের সকল ফায়সালার ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। এটা মূলত আল্লাহ তায়ালার একটি বড় করূণা এবং মেহেরবানী ছিল যে, তিনি তার পবিত্র অহীর ব্যাক্ষা তার নিজের তত্বাবধানে নিষ্পাপ পয়গম্বর সা. কে দিয়ে করালেন। যেন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিধান বুঝা, এবং আমল করার মাঝে কোন প্রকার পেরেশানী উপস্থিত না হয়। তারা যেন বন্দেগীর হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে পারে। কিন্তু শয়তান যে বনী আদমকে গোমরাহ করার কসম খেয়ে এসেছিল, সে কত মানুষকেই না নিজের অনুসারী করে নিয়েছে। তারা মনে করে যে, “আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যকার মাধ্যম নবীজী সা.” একথা ঠিক আছে। কিন্তু তার ভুমিকা হল একজন ডাকপিয়ন এবং পত্রবাহকের মত। আল্লাহ তায়ালার বাণীকে পৌঁছে দেয়া তার কাজ। বুঝানো এটা আমাদের কাজ! এই সকল লোকেরা দ্বীনের নামে লোকদের বদ্বীন করছে। আর শয়তানের অনুসারী হয়ে একথা বলতে শুরু করেছে যে, রাসূল সা. মাখলুক তথা সৃজিত। আর তার কথাকেও মেনে নিলে, একজন মাখলুকের কথাকে মানা হবে। অর্থাৎ তাকে খোদার আসনে বসানো হবে। আর এটাতো শিরক। সুতরাং নবীজী সা. এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী আর নিজের মনের প্ররোচনা অনুপাতে এক নতুন ইসলাম বানিয়ে নিল। এই নতুন ইসলামকে আল্লাহ তায়ালার ইসলাম আর আসল ইসলামকে নবীজী সা. এর বানানো ইসলাম সাব্যস্ত করেছে। আর নিজেদের নাম রেখেছে “আহলে কুরআন”।

এই সকল লোকেরা নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে কুরআন নাম দেয়। যাদের ইংরেজদের শাসনামলের আগে কোন কুরআনের অনুবাদ ছিলনা। তারাই এখন কুরআনের মালিক হয়ে গেল। আর গোটা উম্মত নবীজী সা. সহ সবাইকে মুনকিরে কুরআন তথা কুরআন অস্বিকারকারী আখ্যা দিল (নাউজুবিল্লাহ)। সাধারণ মানুষদের ধোঁকা দেয় এই বলে যে, আহলে কুরআন কোন নতুন দল নয়, বরং যখন থেকে কুরআন সে সময় থেকেই আহলে কুরআন আছে। কখনো কখনো বলে-“যখন কুরআন সত্য তখন আহলে কুরআনও সত্য, তোমরা কুরআনকে সত্য মেনে আহলে কুরআনকে মিথ্যা বলতে পারনা। প্রথমে (আল্লাহ হিফাযত করুন) তোমরা কুরআনকে মিথ্যা বল তারপর আহলে কুরআনকে মিথ্যা বল”।

যখন আহলে কুরআনদের বিভ্রান্তি, যা তারা কুরআনের নামে উপস্থাপন করে একে ভুল প্রমাণ করা হয়, তখন তারা পালিয়ে যায়, আর বলে ‘আমরা একে মানিনা। আমরা কেবল কুরআন মানি’। আজকের আহলে কুরআন যদি সত্যি কুরআনকে মানতো, তাহলে তারা অবশ্যই নবীজী সা. কে মেনে নিত। তাকে কেন ছেড়ে দেয়? এমনিভাবে তারা বিভ্রান্তিও ছড়ায়, আবার নিজেকেও বাঁচিয়ে রাখে। খোদ কুরআনে এই পদ্ধতীকেই শয়তানের অনুসরণ আখ্যা দেয়া হয়েছে। কুরআনের অনুসরণ নয়।

মুজতাহিদের মাকাম

শরীয়তের ব্যাপারে অজ্ঞ ব্যক্তি মুজতাহিদ হয়না। শরীয়তের ব্যাপারে অভিজ্ঞ ও বিদগ্ধ ব্যক্তি হন মুজতাহিদ। তারা যদিও নিষ্পাপ নন। কিন্তু অভিযুক্তও নন যে, তাদের ইজতিহাদের উপর কোন অভিযোগ উত্থাপন করা হবে। কেননা তারা তাদের প্রতিটি ইজতিহাদের উপর সওয়াব পান। যদি তারা ইজতিহাদে সঠিক হন, তাহলে পান দু’টি সওয়াব। আর ভুল করলে পান একটি সওয়াব। আর উম্মতের মাঝে এই মাকাম মুজতাহিদ ছাড়া কারো ভাগ্যে নেই যে, যাদের ভুলের উপরও একটি সওয়াবে ওয়াদা করা হয়েছে। মুজতাহিদের অবস্থান ইস্তিম্বাতের ব্যাক্ষায় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখানে দুই ব্যক্তিত্বেরই দ্বীনের মাঝে গবেষণা ব্যাক্ষা, আর সুবিস্তৃতির অধিকার রয়েছে। এই দুই ব্যক্তিত্বই দ্বীনের পাহারাদার। এটাও আল্লাহ তায়ালার বড় রহমত এবং করূণা যে, তিনি গবেষণা এবং ইজতিহাদের ভার আমাদের মত দূর্বলদের ঘাড়ে চাপাননি। বরং মুজতাহিদীনদের গবেষণার উপর আমল করার হুকুম দিয়ে, এক হিসেবে অযোগ্য লোকদের বিকৃতি থেকে দ্বীনকে হিফাযত করেছেন। অন্য দিক থেকে আমাদের পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা আর মানসিক প্রশান্তির দৌলত দান করেছেন। আমাদের পূর্ণ নিশ্চয়তা রয়েছে যে, মুজতাহিদীনদের পথপ্রদর্শন অনুযায়ী আমল করা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণীয়। আর তাদের একটি পূণ্য সুনিশ্চিত আর দ্বিতীয়টি আল্লাহ তায়ালার দয়া আর করূণার উপর নির্ভরশীল।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালার দয়া এবং মেহেরবানীরও কিছু লোক কদর করেনি। আর মুজতাহিদীনদের সাথে শত্রুতা করে নিজের কম বুঝ এবং অবুঝ মন নিয়ে দ্বীনের নতুন নতুন ব্যাক্ষা দিতে শুরু করেছে। মুজতাহিদীনদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ এবং তার রাসূল সা. এটাই বলেছেন যে, তারা আল্লাহ এবং তার রাসূল সা. এর মাসআলাই বলে থাকে। কিন্তু এইসব লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে এই প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে যে, মুজতাহিদীনরা আল্লাহ এবং রাসূল সা. এর বিপরিত মাসআলা বলছেন। মুজতাহিদদের তাকলীদ তথা অনুসরণ করা শিরক ফির রিসালাত তথা নবীজীর নবুয়্যতের মাঝে শরীক হবার শামিল। সমস্ত হানাফী শাফেয়ী, মালেকী এবং হাম্বলীরা মুশরিক। আইয়িম্মায়ে কিরাম দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে দিয়েছে। এই সকল লোকেরা আইয়িম্মায়ে কিরামদের ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মন-পূজায় মনোনিবেশ করেছে। আর নিজেদের নাম আহলে হাদিস রেখেছে। তারা তাদের ভাইদের(আহলে কুরআন) মত বলতে শুরু করেছে যে, আহলে হাদিস কোন নতুন দল নয়। এটা যখন থেকে হাদিস সে সময় থেকেই আহলে হাদিস আছে। যখন বলা হয় যে, “মালাকাহ এবং কাটুরিয়ার সময়কালের পূর্বের কোন হাদিসের অনুবাদ এবং টিকা অথবা ব্যাক্ষার কোন নজীর গায়রে মুকাল্লিদদের মধ্য থেকে কেউ করেছে দেখাওতো”। তখন তারা তা দেখাতে পারেনা। কিন্তু একথা বড় গলায় বলে বেড়ায় যে, যখন হাদিস সত্য, তো আহলে হাদিসও সত্য! যখন তাদের বলা হয় যে, “যখন তোমরা কুরআনকে সত্য মনে কর আর এই নব্য আহলে কুরআনকে মিথ্যা মনে কর, তাহলে একথা কেন সঠিক নয় যে, হাদিস সত্য কিন্তু তোমাদের এই নব্য আহলে হাদিস দল মিথ্যা!” অথচ হাদিসের যত কিতাব পাওয়া যায় সবই মুজতাহিদীনদের লিখা অথবা মুকাল্লিদদের লিখা। যাদের উল্লেখ তবক্বাতে হানাফিয়্যা তবক্বাতে মালিকিয়্যাহ, তবক্বাতে শাফিয়িয়্যাহ, এবং তবক্বাতে হাম্বলিয়্যাহ এর মাঝে উল্লেখিত। কোন ইতিহাসবিদ তবক্বাতে গায়রে মুকাল্লিদীন বা তবক্বাতে মুনকীরীনে হাদিস নামে কোন কিতাবতো লিখেনি।

হাদিসের সনদপূর্ণ একটি কিতাবও পাওয়া যায়নি, যেখানে ইজমায়ে উম্মত এবং ইজতিহাদ মানাকে হারাম বা শিরক বলা হয়েছে। ফিক্বহ মানাকে অস্বিকার করেছেন, এমন একজন লিখকের নামও গ্রহণযোগ্য বরাত দিয়ে উল্লেখ করা যাবেনা যে, তিনি মুজতাহিদও নন আবার মুকাল্লিদ ও নন। তার মাঝে ইজতিহাদের আহলিয়্যাত ও ছিলনা, আবার তিনি কারো তাকলীদও করেননি।

অযোগ্যের মাকাম

নবীজী সা. এবং মুজতাহিদীনদের ছাড়া কাউকে কিতাব ও সুন্নাতের মাঝে সম্পাদনার যোগ্য বলেননি। যখন সে অযোগ্য তাই তাকে যোগ্যের তাকলীদ তথা অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। অযোগ্য হয়ে দ্বীনের ব্যাক্ষা করা তার কাজ নয়।

রাসূল সা. এর কাছে একজন কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন-“যখন আমানতের খিয়ানত হতে থাকবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর”। প্রশ্নকারী বললেন-“হযরত! আমানত কিভাবে খিয়ানত হবে?” নবীজী সা. বললেন-“যখন কোন বিষয় অযোগ্য ব্যক্তির কাছে সোপর্দ করা হবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর”। (বুখারী শরীফ-১/১৪১)

নবীজী সা. একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা খোলাসা করে দিলেন। যখন ডাক্তারী প্রেসক্রিপশন কোন ওকীল লিখতে শুরু করে দিবে, তখন ডাক্তারীর উপর কিয়ামত আসবেনা? যখন স্বর্ণের কাজ কামার করতে থাকবে, তখন কি উক্ত বিষয়ে কিয়ামত আসবেনা? এমনি যখন দ্বীনের ব্যাক্ষার কাজ অযোগ্য লোকেরা করতে শুরু করবে, তখন কি দ্বীনের উপর কিয়ামত আসবেনা? নবীজী সা. ইরশাদ করেন-“দ্বীনী ইলম (কুরআন সুন্নাহের শব্দ) উঠিয়ে নেয়া হবেনা (বরং কিতাব ও সুন্নাহ এটিই থাকবে) কিন্তু এর আলেমদের উঠিয়ে নেয়া হবে। এমনকি কেউ আর বাকি থাকবেনা। তখন লোকেরা মুর্খদের নিজেদের পথিকৃত বানাবে, আর তারা না জেনেই ফতওয়া দিতে থাকবে, ফলে ফতওয়াদাতা নিজেও গোমড়া হবে অন্যদেরও গোমড়া করবে। (বুখারী শরীফ-১/২০) দ্বীনের আসল আলেম মুজতাহিদীনরাই হন। তারপর নকলকারী ওলামায়ে কিরাম।

এই নব্য দলটি আহল তথা যোগ্য হয়ে ইজতিহাদের মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনা, ফলে নিজেও গোমড়া হয়, অন্যকেও গোমড়া করে। যদিও লোকদের ধোঁকা দেবার জন্য তাদের গোমড়াহীর নাম রেখেছে সুন্দর। যেমন হাদিস অস্বিকারকারীদের ধোঁকাবাজী নাম হল আহলে কুরআন। শুধু নাম পাল্টালেই হলনা, মৌলিকত্বতো পাল্টায়নি। তাহরীফুল কুরআনের নাম তাফহীমুল কুরআন রাখলে কি তার হাকিকত পাল্টে যায়? গালাগালির নাম যদি উপদেশ রাখা হয়, তাহলে কি হাকিকত পাল্টে যায়? কখনো নয়।

যেমনিভাবে আহলে কুরআন প্রত্যেক ফাসেক, ফাযের, অজ্ঞদের কুরআন বুঝানোর অধিকার দেয়। কিন্তু নিষ্পাপ নবী সা. এর অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। এমনিভাবে আহলে হাদিস নামধারীরা প্রত্যেক ফাসেক, ফাযের, আর মুর্খদের ইজতিহাদের অধিকার দিয়ে দেয়। কিন্তু আইয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, যাদের মুজতাহিদ হওয়া ইজমায়ে উম্মত তথা উম্মতের সর্বসম্মতে প্রমাণিত। আর যারা তাদের প্রতিটি ফায়সালায় পূণ্যপ্রাপ্ত। তাদের থেকে অধিকার ছিনিয়ে নেবার দুঃসাহস দেখায়। আহলে কুরআন আর আহলে হাদিস এর একই মিশন যে, লোকেরা নিষ্পাপ নবী সা. আর পূণ্যপ্রাপ্ত মুজতাহিদদের ছেড়ে, অজ্ঞদের নিজের ধর্মের পথিকৃত বানাবে। যারা নিজেরাও গোমড়া। আবার অন্যকেও গোমড়া করে।

গবেষণা না ঝগড়া?

স্বাভাবিকভাবে আহলে কুরআন বলা হয় যারা বলে যে, “মুহাদ্দিসীনরা নিষ্পাপ ছিলনা। আমরা গবেষণা করে তাদের ভুলকে ভুল আর সহীহকে সহীহ বলি”।

আহলে হাদিস বলা হয় যারা বলে-“মুজতাহিদরাতো মাসুম ছিলনা। আমরা গবেষণা করে তাদের ভুল এবং সহীহ ইজতিহাদকে যাচাই করি। এর মাঝে প্রথম কথাটি সহীহ। কিন্তু কথাটি অর্ধেক। যেমন মুহাদ্দিসীনরা মাসুম নয়, তেমন আহলে কুরআনওতো মাসুম নয়! আর যেমন মুজতাহিদীনরা মাসুম নয় তেমনি আহলে হাদিসওতো মাসুম নয়। কিন্তু কথা এখানে মাসুম এবং গায়রে মাসুমের নয়। কথা এখানে হল যোগ্য আর অযোগ্যের। মুহাদ্দিসীনরা তাদের বিষয়ে যোগ্য, আর আর আহলে কুরআনরা চাই সে তাদের দলের যত বড় লিখকই হোকনা কেন, যেমন সাবেক আহলে আহলে হাদিস মুহাম্মদ আসলাম জিরাচপুরী, সাবেক আহলে হাদিস গোলাম আহমদ পারভেজ। কিন্তু মুহাদ্দিসীনদের সামনে হাদিস বিষয়ে তারা অযোগ্য। তাদের কথাকে গবেষণা বলা যাবেনা, বরং তা অযোগ্যের ঝগড়া বলা যায়। যা শরীয়তে গোনাহে কবীরা।

এমনিভাবে মুজতাহিদীন এবং গায়রে মুকাল্লিদদের মাঝে পার্থক্য এটা নয় যে, মুজতাহিদরা মাসুম নয় আর গায়রে মুকাল্লিদরা মাসুম! বরং পার্থক্য হল- মুজতাহিদীনরা উম্মতের ঐক্যমত্বের ভিত্তিতে ইজতিহাদের যোগ্য আর তারা উম্মতের ঐক্যমত্বের ভিত্তিতে অযোগ্য। একারণেই অযোগ্যদের মুজতাহিদীনদের সাথে মত-পার্থক্যে লিপ্ত হওয়াটা চাই সে তার দলের যত বড় ব্যক্তিই হোকনা কেন (যেমন মুহাম্মদ জুনাঘরী যার দিকে নিসবত করে আহলে হাদিসরা নিজেদের মুহাম্মদীও বলে) কিন্তু ইজতিহাদে সে অযোগ্য। মুজতাহিদীনদের বিরোধিতা করা গবেষণা নয়, বরং অযোগ্যের ঝগড়া।

রাসূল সা. যখন বাইয়াত নিতেন তখন তার মাঝে একটি অঙ্গিকার এটাও করাতেন যে, الا تنازع الامر اهله অর্থাৎ আমরা যোগ্য ব্যক্তিদের বিরোধিতা করবোনা। আশ্চর্য কথা হল-যেটা আসলে ঝগড়া! সেটাকে তারা গবেষণা বলে!

সওয়াব নাকি গোনাহ?

এটাতো পড়েছেন যে, মুজতাহিদ থেকে যদি ভুলও হয়, তো এতে সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু অযোগ্য তার সম্পূর্ণ বিপরিত। অর্থাৎ সে যদি সহীহ কথাও বলে তবুও তার সওয়াবের বদলে গোনাহ হবে। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন যে, যে ব্যক্তি কুরআন নিজের রায়ের দ্বারা বিশ্লেষণ করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নিল। (তিরমিজি শরীফ) আরো ইরশাদ করেন-“যে ব্যক্তি কুরআনে নিজের সীদ্ধান্ত আরোপ করে, সে যদি সঠিকও করে তবু সে গোনাহগার হবে”।(তিরমিজী শরীফ) ইমাম নববী রহ. বলেন-“সমস্ত মুসলমান এ ব্যাপারে একমত যে, মুজতাহিদ প্রত্যেক ইজতিহাদের উপর সওয়াব পায়। যদি ইজতিহাদে সঠিক করে, তবে পাবে দু’টি সওয়াব। একটি ইজতিহাদের, অন্যটি সঠিকতার। আর যদি ইজতিহাদে ভুল করে, তবে একটি সওয়াব ইজতিহাদের পাবে। হ্যাঁ! কোন অযোগ্যকে ইজতিহাদের হুকুম করা কখনো জায়েজ নয়। বরং সে গোনাহগার হবে। তার হুকুম কার্যকরও হবেনা। যদিও সে সঠিকতার অনুরূপ হয় বা বিপরিত। কেননা তার হককে পাওয়াটা, এটি কেবলি কাকতালীয়। কোন শরয়ী উসুলের উপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং সে সমস্ত বিধানের ক্ষেত্রে গোনাহগার হবে। হক অনুযায়ী হোক বা বিপরিত। আর তার বের করা সব বিধান পরিত্যাক্ত হবে। তার কোন আপত্তি শরীয়তে গৃহিত হবেনা। সে জাহান্নামী। (শরহে মুসলিম-২/৭৬)

আফসোস! যে, আহলে কুরআন আর আহলে হাদিস এই কবিরা গোনাহে লিপ্ত, যার ঠিকানা জাহান্নাম ছাড়া কিছু নয়, এর নাম রেখেছে গবেষণা!! আর একে কুরআনের উপর আমল আর হাদিসের উপর আমল নাম দিয়েছে!!

মুক্তি না ধ্বংস?

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন-নবীজী সা. নিশ্চয় ইরশাদ করেছেন যে, তিনটি জিনিস মুক্তি দিবে। আর তিনটি জিনিস ধ্বংস করবে। তিনি বলেন-“নাজাত দিবে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহকে ভয় করা। ভালো-মন্দ উভয় হালাতে হক কথা বলা। ধনী হোক বা গরীব হোক মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। আর ধ্বংসকারী হল-নিজের মন-রিপুর পিছনে চলা। কৃপণতা করা। নিজের সীদ্ধান্তের উপর গর্ব করা। তিনটির মাঝে এটি সবচে’ বেশি ধ্বংসকারী (মিশকাত শরীফ) যে ব্যক্তি নিজের সীদ্ধান্তের উপর গর্ব করে তার থেকে হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।(মিশকাত শরীফ)

হযরত শায়েখ আব্দুল গনী মুজাদ্দেদী মাদানী রহ. اعجاب كل ذى رأى برأيه এর মাঝে হযরত মোল্লা আলী ক্বারী মক্কী রহ. এর বক্তব্য নকল করেন-اى من غير نظر إلى الكتاب والسنة واجماع الأمة والقياس على أقوى الأدلة وترك الإقتداء بنحو الأئمة الأربعة অর্থাৎ কুরআন সুন্নাহ ইজমা কিয়াসের উপর থেকে দৃষ্টি ফিরায় আর ছেড়ে দেয় চার ইমামের অনুসরণ (হাশিয়ায়ে ইবনে মাজাহ-৪/২৯০) অর্থাৎ আদিল্লায়ে আরবাআ তথা দলিল চতুষ্টয় এবং চার ইমামের অনুস্বরণ ছেড়ে দেয়, তারাই এই হাদিসের দ্বারা উদ্দেশ্য। আর এটাই ধ্বংসের কারণ।

মোটকথা বের হল এই যে, দ্বীনের গবেষণা-সম্পাদনা তা’ই, যা আদিল্লায়ে শরইয়্যার আলোকে মুজতাহিদীনদের থেকে প্রমাণিত। যে কথার উপর তাদের ইজমা হয়েছে সেটা হুজ্জতে ক্বাতিয়িয়্যাহ তথা অকাট্য দলিল। আর যে কথার মাঝে মতভেদ হবে সেটা বিস্তৃত রহমত।

অন্ধ তাকলীদ তথা অনুসরন

আজ কালের কিছু লোক এই অপবাদ ছড়ায় যে, এটাতো অন্ধ তাকলীদ।

আফসোস! এই বেচারারা অন্ধ তাকলীদের অর্থও জানেনা। অন্ধ তাকলীদ এটাকে বলে, যেখানে অন্ধ অন্ধের পিছনে চলে। তখন উভয়ে কোন গর্তে নিপতিত হয়। এটা অন্ধ তাকলীদ। আর যদি অন্ধ দৃষ্টিবান মানুষের পিছনে চলে, তো এই দৃষ্টিবান ব্যক্তি এই অন্ধকেও তার চোখের বরকতে সকল গর্ত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবে। আর মানজিলে মাকসাদে পৌঁছিয়ে দিবে।

আইয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন (নাউজুবিল্লাহ) অন্ধ নয়। তারা দৃষ্টিবান।

তবে অন্ধ ব্যক্তি আছে। আছে অন্ধ মুকাল্লিদও। যারা নিজেরাও অন্ধ। তাদের পথিকৃত ও অন্ধ। অর্থাৎ তাদের ইজতিহাদের চোখ নাই। এই জন্যই নবীজী সা. বলেছেন যে, যে মুর্খকে দ্বীনের পথিকৃত বানায়, সেই মুর্খ নিজেও গোমড়া হয়, আর তার অনুসারীদেরও গোমড়া করে। এর নাম অন্ধ তাকলীদ।

আল্লাহ তায়ালা নিষ্পাপ নবী সা. আর পূণ্যবান মুজতাহিদীনদের গবেষণা-সম্পদনার উপর আমলে করার তৌফিক দান করুন। আর নব্য নব্য ফেতনা থেকে হিফাযত করুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s