তথাকথিত আহলে হাদীসদের গোড়ার কথা

প্রায় দু’শত বছর ইংরেজদের গোলামীতে আবদ্ধ ছিল ভারত উপমহাদেশের সমস্ত মুসলমান। এ দেশের মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করে তাদের শাসন-শোষণ স্থায়ী করার হীন প্রচেষ্টায় ইংরেজ বেনিয়ারা বহুমুখীষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেবল ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে তারা ৫৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ করে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত ৩ বছরে হিংস্র হানাদাররা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহীদ করে ১৪ হাজার আলেমকে। আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে শহীদ করে অসংখ্য আলেম-উলামা ও নিরীহ মুসলমানদেরকে। ইজ্জতহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য মুসলিম মা-বোন। কারাবরণ করেন হাজার-হাজার মুসলমান। কেবল দিল্লী শহরেই তারা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে প্রায় দশ হাজার মাদ্রাসা।

অথচ সেই ইংরেজদের দালালী করেই আজ একটি দল তাদের মনগড়া ইসলাম (!) প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এমন অনেক ভ্রান্ত দলের যারা অনুসরণ করেন, তারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাই নিম্নে তাদের জন্য কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হল, এ থেকে যদি একজন মানুষও উপকৃত হয় তাহলে আমার এই পোস্ট স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি।

ইতিহাসের পাতায়ঃ

১।

“ মুযাহেরে হক্ব ” কিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা “ কুতুব উদ্দীন ” তাঁর “ তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযম ” গ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

“ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মায্হাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়, যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত-১২৭৫হিঃ)। তার এ ধরণের অসংখ্য ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারণে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) ১২৪৬ হিজরীতে তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর খলিফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যাপারে ফত্ওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মায্হাবের সম্মানীত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌঃ আব্দুল হক্ব ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌঃ আব্দুল হক্বকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন।

(এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)

মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারস পলায়ন করতঃ কোনভাবে আত্নরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবাবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।”

(তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযমঃ পৃঃ ১৬ খঃ ২, আল-নাজাতুল কামেলাঃ পৃঃ ২১৪, তান্বীহুদ্দাল্লীন, পৃঃ ৩১)

উপরোক্ত বিবরণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লা-মায্হাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সে “ ওহ্হাবী ” হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকে “ মুহাম্মদী ” বলে প্রচার করতো। পরবর্তীতে “ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম ” এ মর্মে ফত্ওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজ-পত্র থেকে “ ওহ্হাবী ” নাম রহিত করে আহ্লে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নবোদ্ভাসিত এ ফিরক্বাটিই আজ নিজেদের ব্যতীত অন্যান্য সবাইকে নবোদ্ভাসিত বা বিদ্য়া’তী বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক নয় কি !

২।

এ মর্মে তাদের দলেরই অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালক নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খানের কয়েকটি উক্তি আমাদের বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে, যেমন তার রচিত গ্রন্থ “ তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায় ” তিনি লিখেনঃ

“ আমাদের নতুন মায্হাবে আযাদী (অর্থাৎ তাক্বলীদ না করা) বৃটিশ সরকারী আইনেরই চাহিদা মোতাবেক। ”

(তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায়ঃ পৃঃ ২/৩)

৩।

আহলে হাদীস দলের একাংশের নাম “ গুরাবা আহলে হাদীস ”। এ অংশের নেতা মুহাম্মাদ মুবারকের উক্তি হলঃ

“ গুরাবা আহলে হাদীসের ভিত্তি হযরত মুহাদ্দিসীনদের সঙ্গে মতানৈক্য করার জন্যেই রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় বরং সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) এর বিরুদ্ধাচরণ করে ইংরেজদেরকে খুশী করাই ছিল এর বিশেষ উদ্দেশ্য। ”

(উলামায়ে আহ্নাফ আওর তাহরীকে মুজাহিদীনঃ পৃঃ ৪৮)

৪।

ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের প্রধান মূখপাত্র মিঞা নযীর হুসাইনের অন্যতম শিষ্য অকীলে আহলে হাদীস্ মোলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লিখেনঃ

“ ঐ আহলে হাদীস দল বৃটিশ সরকারের কল্যাণপ্রত্যাশী, চুক্তি রক্ষাকারী ও অনুগত হওয়ার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ প্রমাণ হলঃ তারা বৃটিশ সরকারের অধীনে থাকা, কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনের থাকার চেয়েও উত্তম মনে করে।”

(আল-হায়াত বা’দা্ল মামাতঃ পৃঃ ৯৩

৫।

তথাকথিত সেই মোলভী মুহাম্মাদ হুসাইন ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিপক্ষে “ আল-ইক্বতিছাদ-ফী মাসাইলিল জিহাদ ” নামক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে সে জিহাদ “ মান্ছুখ ” বা রহিত বলে ঘোষণা করে। এর ফলশ্রুতিতে সে ইংরেজের বিশ্বস্ত ও ভাড়াটে গোলামে গণ্য হয়। আর লাভ করে টাকা-পয়সার বিরাট অংক।

(হিন্দুস্থান কী পহলী ইসলামী তাহরীকঃ পৃঃ ২১২, আহলে হাদীস আওর ইংরেজঃ পৃঃ ৮৭)

৬।

তাইতো তারই বিশিষ্ট শিষ্য মৌলভী আলতাফ হুসাইন লিখেনঃ

“ হিন্দুস্তানে ইংরেজী গভার্মেন্ট আমরা মুসলমানদের জন্য খোদার রহমত। ”

(আল-হায়াত বা’দাল মামাতঃ পৃঃ ৯৩)

সম্মানিত পাঠক সমাজ! ইংরেজ আমলে ইসলাম ও মুসলমান্দের দুরবস্থার করুণ কাহিনী বলার অপেক্ষা রাখে না, যেদিন সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার এদেশের হাজার হাজার আলিম-উলামা ও মহামনীষীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল, আর দ্বীপান্তরের কঠিন বন্দিশালায় নিক্ষেপ করেছিল লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতাকে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল ইয্যতহারা মা-বোনদের গগন-বিদারী আর্তনাদে। জ্বালিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা আর ভস্মীভূত করেছিল লক্ষ কোটি কুরআন-কিতাব, তখনই হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দীসে দেহলভী (রহঃ) কর্তৃক দৃপ্তকন্ঠে ঘোষিত হল জিহাদের ফত্ওয়া, এ ফাত্ওয়ার বলে উলামায়ে কিরাম ও সমগ্র তৌহিদী জনতা ঝাপিয়ে পড়েন আযাদী আন্দোলনের জিহাদে। শহীদ হন হাজার হাজার বীর মুজাহিদ। আর ঠিক এমনি এক করুণ মুহূর্তে “ আহলে হাদীস ” নামধারী দলটি সেই ইংরেজ সরকারকে “ খোদার রহমত ” বলে আখ্যায়িত করে, আর তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হারাম বলে ফাত্ওয়া দিয়ে হালুয়া-রুটির সুব্যবস্থা করে। তারা কি মুসলমান ? তারা কী চায়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কোথায় তাদের গন্তব্য?

উপরোক্ত তথ্যাবলী থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার ভারতবর্ষে মুসলমানদেরকে দ্বিধা বিভক্ত করতঃ তাদের আধিপত্য মজবুত ও বিস্তার করার মানসে যে সমস্ত হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, এরই ফলশ্রুতিতে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কাদিয়ানী, বেরলভী ও তথাকথিত “ আহলে হাদীস ” তথা “ লা-মায্হাবী ” দল সে দিনের ঐ বৃটিশ জালিম তল্পীবাহকদেরই উত্তরাধিকারী ও দোসর।

৭।

ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, ১২৪৬ হিজরীর পর এই উপমহাদেশে সৃষ্ট বিদ্য়া’ত ও নতুন ফিরক্বাটিকে মুসলমানগণ যখন ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করতে থাকেন তখন তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদী বলে দাবী করে। সে হিসেবে মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী ও মৌঃ নজীর হুসাইন ভারতবর্ষের প্রথম মুহাম্মাদী নামের দাবীদার। অনুরূপ ভাবে তাদের তদানীন্তন অনুসারীরাও মুহাম্মাদী নামেই আত্নপ্রকাশ করতো। এ ধারায় নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান ১২৮৫ হিজরীতে মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী থেকে লিখিত ভাবে মুহাম্মাদী উপাধি লাভ করেন।

( মায্হাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহঃ পৃ – ৩৬ )

৮।

বর্তমানে অবশ্য গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী বা সালাফী নামে আত্নপ্রকাশ করে সউদী রিয়াল, দিনার, দিরহাম উপার্জনের মোহে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু ১২৪৬ হিজরীতে, তাদের উদ্ভবের সূচনালগ্নে যখন তেল পেট্রোলের পয়সার জমজমাট ছিল না, ওহ্হাবীদেরই যখন দুর্দিন দুর্ভিক্ষ চলছিল, বিশেষ করে ভারতবর্ষে ইংরেজ-বিরোধী ও ইংরেজ বিতাড়নের জিহাদে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করেছিল, তখন গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী নামের আখ্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই তারা তখন নিজেদের জন্য “ মুহাম্মদী ” এবং পরবর্তীতে “ আহলে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করার সম্ভাব্য সকল অপতৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের তৎকালীন অন্যতম মুখমাত্র মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লাহোরী বৃটিশ সরকারের প্রধান কার্যালয় এবং পাঞ্জাব, সি-পি, ইউ-পি, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাঙ্গালসহ বিভিন্ন শাখা অফিসে ইংরেজ প্রশাসনের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করত: তাদের জন্য “ আহ্লে হাদীস ” নাম বরাদ্দ দেয়ার দরখাস্ত পেশ করেন। এ দরখাস্তগুলোর প্রতি উত্তর সহ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত তৎকালীন “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায়ও প্রকাশ করা হয় যা পরে সাময়ীক নিবন্ধ আকারেও বাজারজাত করা হয়।

( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ২৪-২৬, সংখ্যা: ২, খ: ১১)

তাদের মানসিকতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করার জন্য পাঠক সমীপে তন্মধ্য হতে একটি দরখাস্তের অনুবাদ নিম্নে পেশ করছিঃ

“বখেদমতে জনাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী,
আমি আপনার খেদমতে লাইন কয়েক লেখার অনুমতি এবং এর জন্য ক্ষমাও পার্থনা করছি। আমার সম্পাদিত মাসিক “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায় ১৮৮৬ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলাম যে, ওহ্হাবী শব্দটি ইংরেজ সরকারের নিমক হারাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ শব্দটি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের ঐ অংশের জন্য ব্যবহার সমীচিন হবে না, যাদেরকে “ আহ্লে হাদীস ” বলা হয় এবং যারা সর্বদা ইংরেজ সরকারের নিমক হালালী, আনুগত্যতা ও কল্যাণই প্রত্যাশা করে, যা বার বার প্রমাণও হয়েছে এবং সরকারী চিঠি প্রত্রে এর স্বীকৃতিও রয়েছে।

অতএব, এ দলের প্রতি ওহ্হাবী শব্দ ব্যবহারের জোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সাথে সাথে গভার্মেন্টের বরাবর অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে আবেদন করা যাচ্ছে যে, সরকারীভাবে এ ওহ্হাবী শব্দ রহিত করে আমাদের উপর এর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক এবং এ শব্দের পরিবর্তে “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধন করা হোক।

আপনার একান্ত অনুগত খাদেম

আবু সাঈদ মুহাম্মদ হুসাইন

সম্পাদক, এশায়াতুস সুন্নাহ

দরখাস্ত মুতাবেক ইংরেজ সরকার তাদের জন্যে “ ওহ্হাবী ” শব্দের পরিবর্তে “ আহলে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করেছে। এবং সরকারী কাগজ-চিঠিপত্র ও সকল পর্যায়ে তদের “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধনের নোটিশ জারি করে নিয়মতান্তিকভাবে দরখাস্তকারীকেও লিখিতভাবে মঞ্জুরী নোটিশে অবহিত করা হয়।

সর্বপ্রথম পাঞ্জাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী মি: ডাব্লিউ, এম, এন (W.M.N) বাহাদুর চিঠি নং-১৭৫৮ এর মাধ্যমে ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৬ ইংরেজিতে অনুমোদনপত্র প্রেরণ করেন। অতপর ১৪ই জুলাই ১৮৮৮ইং সি,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৪০৭ এর মাধ্যমে এবং ২০শে জুলাই ১৮৮৮ইং ইউ,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৩৮৬ এর মাধমে এবং ১৪ই আগষ্ট ১৮৮৮ইং বোম্বাই গভার্মেন্ট চিঠি নং-৭৩২ এর মাধ্যমে এবং ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৮ মাদ্রাজ গভার্মেন্ট চিঠি নং-১২৭ এর মাধ্যমে এবং ৪ঠা মার্চ ১৮৯০ইং বাঙ্গাল গভার্মেন্ট চিঠি নং-১৫৫ এর মাধ্যমেদরখাস্তকারী মৌলভী আবু সাইদ মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভীকে অবহিত করা হয়।

( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ৩২-৩৯, সংখ্যা: ২, খ: ১১)

কোন মুসলিম জামাতের নাম অমুসলিম, মুসলামানদের চিরশত্রু খৃষ্টান নাছারাদের মাধ্যমে বরাদ্দ করার ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিরল। যা কেবল হিন্দুস্তানী গাইরে মুক্বাল্লিদদেরই গৌরব ও সৌভাগ্যের বিষয় (!) তাই তারা এ ইতিহাসটা অত্যন্ত গৌরবের সহিত নিজেরদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে তৃপ্তি লাভ করেছেন।

তথাকথিত আহলে হাদীসদের গোড়ার কথাঃ-

প্রায় দু’শত বছর ইংরেজদের গোলামীতে আবদ্ধ ছিল ভারত উপমহাদেশের সমস্ত মুসলমান। এ দেশের মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করে তাদের শাসন-শোষণ স্থায়ী করার হীন প্রচেষ্টায় ইংরেজ বেনিয়ারা বহুমুখ
ী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেবল ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে তারা ৫৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ করে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত ৩ বছরে হিংস্র হানাদাররা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শ
হীদ করে ১৪ হাজার আলেমকে। আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে শহীদ করে অসংখ্য আলেম-উলামা ও নিরীহ মুসলমানদেরকে। ইজ্জতহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য মুসলিম মা-বোন। কারাবরণ করেন হাজার-হাজার মুসলমান। কেবল দিল্লী শহরেই তারা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে প্রায় দশ হাজার মাদ্রাসা।

অথচ সেই ইংরেজদের দালালী করেই আজ একটি দল তাদের মনগড়া ইসলাম (!) প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এমন অনেক ভ্রান্ত দলের যারা অনুসরণ করেন, তারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাই নিম্নে তাদের জন্য কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হল, এ থেকে যদি একজন মানুষও উপকৃত হয় তাহলে আমার এই পোস্ট স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি।

ইতিহাসের পাতায়ঃ

১।

“ মুযাহেরে হক্ব ” কিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা “ কুতুব উদ্দীন ” তাঁর “ তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযম ” গ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

“ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মায্হাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়, যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত-১২৭৫হিঃ)। তার এ ধরণের অসংখ্য ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারণে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) ১২৪৬ হিজরীতে তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর খলিফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যাপারে ফত্ওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মায্হাবের সম্মানীত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌঃ আব্দুল হক্ব ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌঃ আব্দুল হক্বকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন।

(এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)

মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারস পলায়ন করতঃ কোনভাবে আত্নরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবাবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।”

(তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযমঃ পৃঃ ১৬ খঃ ২, আল-নাজাতুল কামেলাঃ পৃঃ ২১৪, তান্বীহুদ্দাল্লীন, পৃঃ ৩১)

উপরোক্ত বিবরণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লা-মায্হাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সে “ ওহ্হাবী ” হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকে “ মুহাম্মদী ” বলে প্রচার করতো। পরবর্তীতে “ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম ” এ মর্মে ফত্ওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজ-পত্র থেকে “ ওহ্হাবী ” নাম রহিত করে আহ্লে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নবোদ্ভাসিত এ ফিরক্বাটিই আজ নিজেদের ব্যতীত অন্যান্য সবাইকে নবোদ্ভাসিত বা বিদ্য়া’তী বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক নয় কি !

২।

এ মর্মে তাদের দলেরই অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালক নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খানের কয়েকটি উক্তি আমাদের বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে, যেমন তার রচিত গ্রন্থ “ তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায় ” তিনি লিখেনঃ

“ আমাদের নতুন মায্হাবে আযাদী (অর্থাৎ তাক্বলীদ না করা) বৃটিশ সরকারী আইনেরই চাহিদা মোতাবেক। ”

(তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায়ঃ পৃঃ ২/৩)

৩।

আহলে হাদীস দলের একাংশের নাম “ গুরাবা আহলে হাদীস ”। এ অংশের নেতা মুহাম্মাদ মুবারকের উক্তি হলঃ

“ গুরাবা আহলে হাদীসের ভিত্তি হযরত মুহাদ্দিসীনদের সঙ্গে মতানৈক্য করার জন্যেই রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় বরং সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) এর বিরুদ্ধাচরণ করে ইংরেজদেরকে খুশী করাই ছিল এর বিশেষ উদ্দেশ্য। ”

(উলামায়ে আহ্নাফ আওর তাহরীকে মুজাহিদীনঃ পৃঃ ৪৮)

৪।

ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের প্রধান মূখপাত্র মিঞা নযীর হুসাইনের অন্যতম শিষ্য অকীলে আহলে হাদীস্ মোলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লিখেনঃ

“ ঐ আহলে হাদীস দল বৃটিশ সরকারের কল্যাণপ্রত্যাশী, চুক্তি রক্ষাকারী ও অনুগত হওয়ার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ প্রমাণ হলঃ তারা বৃটিশ সরকারের অধীনে থাকা, কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনের থাকার চেয়েও উত্তম মনে করে।”

(আল-হায়াত বা’দা্ল মামাতঃ পৃঃ ৯৩

৫।

তথাকথিত সেই মোলভী মুহাম্মাদ হুসাইন ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিপক্ষে “ আল-ইক্বতিছাদ-ফী মাসাইলিল জিহাদ ” নামক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে সে জিহাদ “ মান্ছুখ ” বা রহিত বলে ঘোষণা করে। এর ফলশ্রুতিতে সে ইংরেজের বিশ্বস্ত ও ভাড়াটে গোলামে গণ্য হয়। আর লাভ করে টাকা-পয়সার বিরাট অংক।

(হিন্দুস্থান কী পহলী ইসলামী তাহরীকঃ পৃঃ ২১২, আহলে হাদীস আওর ইংরেজঃ পৃঃ ৮৭)

৬।

তাইতো তারই বিশিষ্ট শিষ্য মৌলভী আলতাফ হুসাইন লিখেনঃ

“ হিন্দুস্তানে ইংরেজী গভার্মেন্ট আমরা মুসলমানদের জন্য খোদার রহমত। ”

(আল-হায়াত বা’দাল মামাতঃ পৃঃ ৯৩)

সম্মানিত পাঠক সমাজ! ইংরেজ আমলে ইসলাম ও মুসলমান্দের দুরবস্থার করুণ কাহিনী বলার অপেক্ষা রাখে না, যেদিন সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার এদেশের হাজার হাজার আলিম-উলামা ও মহামনীষীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল, আর দ্বীপান্তরের কঠিন বন্দিশালায় নিক্ষেপ করেছিল লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতাকে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল ইয্যতহারা মা-বোনদের গগন-বিদারী আর্তনাদে। জ্বালিয়ে দিয়েছিল হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা আর ভস্মীভূত করেছিল লক্ষ কোটি কুরআন-কিতাব, তখনই হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দীসে দেহলভী (রহঃ) কর্তৃক দৃপ্তকন্ঠে ঘোষিত হল জিহাদের ফত্ওয়া, এ ফাত্ওয়ার বলে উলামায়ে কিরাম ও সমগ্র তৌহিদী জনতা ঝাপিয়ে পড়েন আযাদী আন্দোলনের জিহাদে। শহীদ হন হাজার হাজার বীর মুজাহিদ। আর ঠিক এমনি এক করুণ মুহূর্তে “ আহলে হাদীস ” নামধারী দলটি সেই ইংরেজ সরকারকে “ খোদার রহমত ” বলে আখ্যায়িত করে, আর তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হারাম বলে ফাত্ওয়া দিয়ে হালুয়া-রুটির সুব্যবস্থা করে। তারা কি মুসলমান ? তারা কী চায়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কোথায় তাদের গন্তব্য?

উপরোক্ত তথ্যাবলী থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার ভারতবর্ষে মুসলমানদেরকে দ্বিধা বিভক্ত করতঃ তাদের আধিপত্য মজবুত ও বিস্তার করার মানসে যে সমস্ত হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, এরই ফলশ্রুতিতে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কাদিয়ানী, বেরলভী ও তথাকথিত “ আহলে হাদীস ” তথা “ লা-মায্হাবী ” দল সে দিনের ঐ বৃটিশ জালিম তল্পীবাহকদেরই উত্তরাধিকারী ও দোসর।

৭।

ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, ১২৪৬ হিজরীর পর এই উপমহাদেশে সৃষ্ট বিদ্য়া’ত ও নতুন ফিরক্বাটিকে মুসলমানগণ যখন ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করতে থাকেন তখন তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদী বলে দাবী করে। সে হিসেবে মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী ও মৌঃ নজীর হুসাইন ভারতবর্ষের প্রথম মুহাম্মাদী নামের দাবীদার। অনুরূপ ভাবে তাদের তদানীন্তন অনুসারীরাও মুহাম্মাদী নামেই আত্নপ্রকাশ করতো। এ ধারায় নবাব ছিদ্দিক্ব হাসান খান ১২৮৫ হিজরীতে মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী থেকে লিখিত ভাবে মুহাম্মাদী উপাধি লাভ করেন।

( মায্হাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহঃ পৃ – ৩৬ )

৮।

বর্তমানে অবশ্য গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী বা সালাফী নামে আত্নপ্রকাশ করে সউদী রিয়াল, দিনার, দিরহাম উপার্জনের মোহে ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু ১২৪৬ হিজরীতে, তাদের উদ্ভবের সূচনালগ্নে যখন তেল পেট্রোলের পয়সার জমজমাট ছিল না, ওহ্হাবীদেরই যখন দুর্দিন দুর্ভিক্ষ চলছিল, বিশেষ করে ভারতবর্ষে ইংরেজ-বিরোধী ও ইংরেজ বিতাড়নের জিহাদে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার ওহ্হাবী বলে আখ্যায়িত করেছিল, তখন গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহ্হাবী নামের আখ্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই তারা তখন নিজেদের জন্য “ মুহাম্মদী ” এবং পরবর্তীতে “ আহলে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করার সম্ভাব্য সকল অপতৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের তৎকালীন অন্যতম মুখমাত্র মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লাহোরী বৃটিশ সরকারের প্রধান কার্যালয় এবং পাঞ্জাব, সি-পি, ইউ-পি, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাঙ্গালসহ বিভিন্ন শাখা অফিসে ইংরেজ প্রশাসনের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করত: তাদের জন্য “ আহ্লে হাদীস ” নাম বরাদ্দ দেয়ার দরখাস্ত পেশ করেন। এ দরখাস্তগুলোর প্রতি উত্তর সহ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত তৎকালীন “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায়ও প্রকাশ করা হয় যা পরে সাময়ীক নিবন্ধ আকারেও বাজারজাত করা হয়।

( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ২৪-২৬, সংখ্যা: ২, খ: ১১)

তাদের মানসিকতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করার জন্য পাঠক সমীপে তন্মধ্য হতে একটি দরখাস্তের অনুবাদ নিম্নে পেশ করছিঃ

“বখেদমতে জনাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী,
আমি আপনার খেদমতে লাইন কয়েক লেখার অনুমতি এবং এর জন্য ক্ষমাও পার্থনা করছি। আমার সম্পাদিত মাসিক “ এশায়াতুস সুন্নাহ ” পত্রিকায় ১৮৮৬ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলাম যে, ওহ্হাবী শব্দটি ইংরেজ সরকারের নিমক হারাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ শব্দটি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের ঐ অংশের জন্য ব্যবহার সমীচিন হবে না, যাদেরকে “ আহ্লে হাদীস ” বলা হয় এবং যারা সর্বদা ইংরেজ সরকারের নিমক হালালী, আনুগত্যতা ও কল্যাণই প্রত্যাশা করে, যা বার বার প্রমাণও হয়েছে এবং সরকারী চিঠি প্রত্রে এর স্বীকৃতিও রয়েছে।

অতএব, এ দলের প্রতি ওহ্হাবী শব্দ ব্যবহারের জোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সাথে সাথে গভার্মেন্টের বরাবর অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে আবেদন করা যাচ্ছে যে, সরকারীভাবে এ ওহ্হাবী শব্দ রহিত করে আমাদের উপর এর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক এবং এ শব্দের পরিবর্তে “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধন করা হোক।

আপনার একান্ত অনুগত খাদেম

আবু সাঈদ মুহাম্মদ হুসাইন

সম্পাদক, এশায়াতুস সুন্নাহ

দরখাস্ত মুতাবেক ইংরেজ সরকার তাদের জন্যে “ ওহ্হাবী ” শব্দের পরিবর্তে “ আহলে হাদীস ” নাম বরাদ্দ করেছে। এবং সরকারী কাগজ-চিঠিপত্র ও সকল পর্যায়ে তদের “ আহ্লে হাদীস ” সম্বোধনের নোটিশ জারি করে নিয়মতান্তিকভাবে দরখাস্তকারীকেও লিখিতভাবে মঞ্জুরী নোটিশে অবহিত করা হয়।

সর্বপ্রথম পাঞ্জাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী মি: ডাব্লিউ, এম, এন (W.M.N) বাহাদুর চিঠি নং-১৭৫৮ এর মাধ্যমে ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৬ ইংরেজিতে অনুমোদনপত্র প্রেরণ করেন। অতপর ১৪ই জুলাই ১৮৮৮ইং সি,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৪০৭ এর মাধ্যমে এবং ২০শে জুলাই ১৮৮৮ইং ইউ,পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৩৮৬ এর মাধমে এবং ১৪ই আগষ্ট ১৮৮৮ইং বোম্বাই গভার্মেন্ট চিঠি নং-৭৩২ এর মাধ্যমে এবং ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৮ মাদ্রাজ গভার্মেন্ট চিঠি নং-১২৭ এর মাধ্যমে এবং ৪ঠা মার্চ ১৮৯০ইং বাঙ্গাল গভার্মেন্ট চিঠি নং-১৫৫ এর মাধ্যমে দরখাস্তকারী মৌলভী আবু সাইদ মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভীকে অবহিত করা হয়।

( এশায়াতুস সুন্নাহঃ পৃ: ৩২-৩৯, সংখ্যা: ২, খ: ১১)

কোন মুসলিম জামাতের নাম অমুসলিম, মুসলামানদের চিরশত্রু খৃষ্টান নাছারাদের মাধ্যমে বরাদ্দ করার ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিরল। যা কেবল হিন্দুস্তানী গাইরে মুক্বাল্লিদদেরই গৌরব ও সৌভাগ্যের বিষয় (!) তাই তারা এ ইতিহাসটা অত্যন্ত গৌরবের সহিত নিজেরদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে তৃপ্তি লাভ করেছেন।

তথাকথিত আহলে হাদীসদের গোড়ার কথাঃ-

প্রায় দু’শত বছর ইংরেজদের গোলামীতে আবদ্ধ ছিল ভারত উপমহাদেশের সমস্ত মুসলমান। এ দেশের মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করে তাদের শাসন-শোষণ স্থায়ী করার হীন প্রচেষ্টায় ইংরেজ বেনিয়ারা বহুমুখ
ী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেবল ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে তারা ৫৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ করে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত ৩ বছরে হিংস্র হানাদাররা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শ
হীদ করে ১৪ হাজার আলেমকে। আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে শহীদ করে অসংখ্য আলেম-উলামা ও নিরীহ মুসলমানদেরকে। ইজ্জতহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য মুসলিম মা-বোন। কারাবরণ করেন হাজার-হাজার মুসলমান। কেবল দিল্লী শহরেই তারা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে প্রায় দশ হাজার মাদ্রাসা।

অথচ সেই ইংরেজদের দালালী করেই আজ একটি দল তাদের মনগড়া ইসলাম (!) প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এমন অনেক ভ্রান্ত দলের যারা অনুসরণ করেন, তারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাই নিম্নে তাদের জন্য কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হল, এ থেকে যদি একজন মানুষও উপকৃত হয় তাহলে আমার এই পোস্ট স্বার্থক হবে বলে আমি মনে করি।

ইতিহাসের পাতায়ঃ

১।

“ মুযাহেরে হক্ব ” কিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা “ কুতুব উদ্দীন ” তাঁর “ তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযম ” গ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

“ সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মায্হাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়, যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত-১২৭৫হিঃ)। তার এ ধরণের অসংখ্য ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারণে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) ১২৪৬ হিজরীতে তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর খলিফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যাপারে ফত্ওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মায্হাবের সম্মানীত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌঃ আব্দুল হক্ব ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌঃ আব্দুল হক্বকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন।

(এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)

মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারস পলায়ন করতঃ কোনভাবে আত্নরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবাবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।”

(তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযমঃ পৃঃ ১৬ খঃ ২, আল-নাজাতুল কামেলাঃ পৃঃ ২১৪, তান্বীহুদ্দাল্লীন, পৃঃ ৩১)

উপরোক্ত বিবরণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লা-মায্হাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সে “ ওহ্হাবী ” হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সে নিজেকে “ মুহাম্মদী ” বলে প্রচার করতো। পরবর্তীতে “ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম ” এ মর্মে ফত্ওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজ-পত্র থেকে “ ওহ্হাবী ” নাম রহিত করে আহ্লে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নবোদ্ভাসিত এ ফিরক্বাটিই আজ নিজেদের ব্যতীত অন্যান্য সবাইকে নবোদ্ভাসিত বা বিদ্য়া’তী বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক নয় কি !

২।

এ মর্মে তাদের দলেরই অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও পরিচালক নবাব ছিদ্দীক্ব হাসান খানের কয়েকটি উক্তি আমাদের বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে, যেমন তার রচিত গ্রন্থ “ তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায় ” তিনি লিখেনঃ

“ আমাদের নতুন মায্হাবে আযাদী (অর্থাৎ তাক্বলীদ না করা) বৃটিশ সরকারী আইনেরই চাহিদা মোতাবেক। ”

(তরজমানে ওহ্হাবিয়্যায়ঃ পৃঃ ২/৩)

৩।

আহলে হাদীস দলের একাংশের নাম “ গুরাবা আহলে হাদীস ”। এ অংশের নেতা মুহাম্মাদ মুবারকের উক্তি হলঃ

“ গুরাবা আহলে হাদীসের ভিত্তি হযরত মুহাদ্দিসীনদের সঙ্গে মতানৈক্য করার জন্যেই রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় বরং সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) এর বিরুদ্ধাচরণ করে ইংরেজদেরকে খুশী করাই ছিল এর বিশেষ উদ্দেশ্য। ”

(উলামায়ে আহ্নাফ আওর তাহরীকে মুজাহিদীনঃ পৃঃ ৪৮)

৪।

ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের প্রধান মূখপাত্র মিঞা নযীর হুসাইনের অন্যতম শিষ্য অকীলে আহলে হাদীস্ মোলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লিখেনঃ

“ ঐ আহলে হাদীস দল বৃটিশ সরকারের কল্যাণপ্রত্যাশী, চুক্তি রক্ষাকারী ও অনুগত হওয়ার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ প্রমাণ হলঃ তারা বৃটিশ সরকারের অধীনে থাকা, কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনের থাকার চেয়েও উত্তম মনে করে।”

(আল-হায়াত বা’দা্ল মামাতঃ পৃঃ ৯৩

৫।

তথাকথিত সেই মোলভী মুহাম্মাদ হুসাইন ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিপক্ষে “ আল-ইক্বতিছাদ-ফী মাসাইলিল জিহাদ ” নামক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে সে জিহাদ “ মান্ছুখ ” বা রহিত বলে ঘোষণা করে। এর ফলশ্রুতিতে সে ইংরেজের বিশ্বস্ত ও ভাড়াটে গোলামে গণ্য হয়। আর লাভ করে টাকা-পয়সার বিরাট অংক।

(হিন্দুস্থান কী পহলী ইসলামী তাহরীকঃ পৃঃ ২১২, আহলে হাদীস আওর ইংরেজঃ পৃঃ ৮৭)

৬।

তাইতো তারই বিশিষ্ট শিষ্য মৌলভী আলতাফ হুসাইন লিখেনঃ

“ হিন্দুস্তানে ইংরেজী গভার্মেন্ট আমরা মুসলমানদের জন্য খোদার রহমত। ”

(আল-হায়াত বা’দাল মামাতঃ পৃঃ ৯৩)

সম্মানিত পাঠক সমাজ! ইংরেজ আমলে ইসলাম ও মুসলমান্দের দুরবস্থার করুণ কাহিনী বলার অপেক্ষা রাখে না, যেদিন সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার এদেশের হাজার হাজার আলিম-উলামা ও মহামনীষীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল, আর দ্বীপান্তরের কঠিন বন্দিশালায় নিক্ষেপ করেছিল লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতাকে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্�

প্রশ্ন ::: নামধারী আহলেহাদীস দাবীদার ভাইয়েরা দাবী করেন যে, হাদীস শরীফে তাদের প্রসংশা করা হয়েছে।

সপক্ষে মুসতাদরাকে হাকিম এবং শরফে আসহাবিল হাদীস কিতাবের বরাতে নিম্নের হাদীসটি উল্লেখ করেন-
عن أبي سعيد الخدري ، أنه كان إذا رأى الشباب قال : مرحبا بوصية رسول الله صلى الله عليه وسلم ، أوصانا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نوسع لكم في المجلس ، وأن نفهمكم الحديث . فإنكم خلوفنا ، وأهل الحديث بعدنا

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হইতে বর্ণিত, তিনি যখন কোন যুবককে দেখতেন তখন বলতেন- তোমাদের জন্য রাসুল সা. এর অসিয়ত সম্পন্ন ধন্যবাদ, রাসুল সা. আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা যেন তোমাদের জন্য মজলিস প্রসস্ত করি এবং তোমাদেরকে যেন হাদীস শিক্ষা দিই। তোমরা আমাদের পরবর্তী অনুসারী এবং আমাদের পরে তোমরা আহলে হাদীস।
….. মুসতাদরাকে হাকেম১/৮৮, শরফে আসহাবে হাদীস ২১

প্রশ্ন হলো এই দাবীটা কতটুকু যথাযথ ?

উত্তর : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে পাকে এরশাদ করেছেন-
يضل به كثيرا و يهدى به كثيرا
অথ্যাত এই কোরআন দ্বারা অনেকেই গোমরা হবে আবার অনেকেই এই কোরআন দ্বারা হেদায়েত প্রাপ্ত হবে।দেখুন- সুরায়ে বাকারাহ/২৬।

বাস্তবিকই যুগে যুগে দেখা যায় সকল বাতিল ও গোমরা পথ ভ্রষ্ট দলগুলোই মানুষকে গোমরা ভ্রষ্ট করার মানসে তাদের সত্য হওয়ার পক্ষে কোরআন হাদীস দারা দলিল প্রমান পেশ করে থাকে। যেমন-

১. গোলাম আহমদ ক্বাদিয়ানী : নবুয়্যতের মিথ্যা দাবীদার, কোরআন দিয়ে তার নবুওয়াত প্রমান করার অপপ্রয়াস-
َمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ
এবং মরিয় পুত্র ঈসা বলল হে বনি ইসরাঈল আমি আল্লাহর রাসূল আমি বিদ্যমান থাকা তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারী এবং এমন এক নবীর সুসংবাদদানকারী যিনি আমার পরে আসবেন এবং যার নাম হবে আহমদ।
সুরা আসসাফ/৬।

গোলাম আহমদ দাবী করে এখানে আমি আহমদের কথা বলা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।

২. এমনিভাবে শিয়া, খারেজী, মুতাযিলা, বাহাই, কদরিয়া, জবরিয়া, কবরপুজারী, মাজারপুজারী ভন্ড, গোমরাহ, পথভ্রষ্ট সকল দলই কোরান দিয়ে তাদের দলকে উন্নিত করতে চায়।

৩. পীর, মাজার, কবর পুজারীরা বলে আল্লাহ আদম আ.কে সেজদা করার জন্য ফেরেস্তাকুলকে নিদ্যেশ দিয়েছেন। আর ইহা সেজদায়ে তাযীমি। তাই আমরা পীরকে কবরে মাজারে সেজদা করি নামাজি সেজদা নয় তাযিমী সেজদা যাহা কোরানের নিদ্যেশ। নাউযুবিল্লাহ।

৪. আমাদের দেশে আরেকটি গোমরাহ বাতিল দল রয়েছে যাহা নামধারী আহলে হাদীসদের বিপরীত তাদের নাম আহলে কোরান। যারা হাদীস-সুন্নাহকে সরাসরি অস্বীকার করে। দাবী করে কোরআন ছাড়া কিছু মানিনা, হাদিস-মাদিস কিছ্চু নাই সবই মানুষের বানানো।
দলিল দেয়-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (4)
অথ্যাত- তিনি নবী নিজ থেকে কোন কথা বলেন না যাহা বলে তাহা অহি বা কোরআন।
আননাজম/৩।

৫. এ ক্ষেত্রে নামধারী আহলে হাদীসরাও পিছিয়ে নেই তারাও মিথ্যা বানোয়াট ও অপ প্রচারে হরদম লিপ্ত। আসুন এবার নামধারী আহলে হাদীসদের উল্লেখিত দাবী সম্পর্কে আলোচনা করি।

ক. উল্লেখিত হাদীস খানা শরফ আসহাবুল হাদীস বাদে মুসতাদরাকে হাকীম নামক হাদীসের যে কিতাবের বরাত দেয়া হয়েছে উক্ত কিতাবে পাওয়া যায়নি। [সর্র্ট স্ক্রীনের দাবী রাখে]

খ. শরফ… কিতাবে এ হাদীস খানা উল্লেখ আছে, তবে হাদীস এর কোন কিতাব থেকে এ কিতাবে আনা হয়েছে তার কোন রেফারেন্স বা বরাত দেওয়া হয়নি।

গ. শত শত হাদীসের কিতাবের কোন কিতাবে এমন কোন হাদীস পাওয়া যায়না। ধরে নিলাম হাদীস খানা আছে, তবুও এ হাদীস দ্বারা নামধারী আহলে হাদীসদের প্রসংসা করা হয়েছে এ দাবী খানা সম্পূর্র্ণ অযৌক্তিক ও মিথ্যা- কারণ, হাদীস বিশারদগনের মতে যে খানে আহলে হাদীস শব্দ এসেছে সেখানে এর অথ্য হচ্ছে ‘মুহাদ্দিসীনে কেরাম’।
যেমন আহলে এলেম বললে ওলামায়ে কেরাম, আহলে কোরআন বললে, মুফাস্সিরীনে কেরাম, হাফেজ ও আমেলে কোরআনকে বুঝায়। সুতরাং আবু খুদরী রা. এর হাদীসের মানে হলো- আমরা যাদেরকে হাদীস শিক্ষা দিবো তারাই আমাদের পরে মুহাদ্দিস হবেন। যেমনটি হয়েছেন- মুহাদ্দিসীনগন সাবাহায়ে কেরামগন থেকে হাদীস নিয়েই মুহাদ্দিস হয়েছেন।

ঘ. নামধারী আহলে হাদীসদের দাবী যদি সত্যি হয় তাহলে, হাদীস অস্বিকারকারী নামধারী আহলে কোরআনরদের দাবী- যে আমাদের প্রসংসা করা হয়েছে হাদীস শরীফে তা সত্যি হবে না কেন?
যেমন- عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ لِلَّهِ أَهْلِينَ مِنَ النَّاسِ “، فَقِيلَ: مَنْ أَهْلُ اللهِ مِنْهُمْ ؟ قَالَ: ” أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللهِ وَخَاصَّتُهُ ”
আনাস রা. হইতে বণ্যিত রাসূল সা. বলেন- নিশ্চয় মানুষে মধ্যে কতেক মানুষ আল্লাহর পরিবার ভুক্ত [নৈকট্য প্রাপ্ত]।
জিজ্ঞাস করা হলো মানুষের মধ্যে কারা আহলুল্লাহ? রাসুল সা. বললেন “আহলে কোরান” তারা হলো আল্লাহর আহল ও আল্লাহর বিশেষ বান্দা।দেখুন- মুসনাদে আহমদ ১৯/২৯৬

অতএব নামধারী আহলে হাদীসদের যুক্তিঅনুসারে নামধারী আহলে কোরানরাই প্রসংসার দাবীদার। অথচ সকলেই জানি, মুনকারীনে হাদীস নামধারী আহলে কোরআন অবশ্বয় ভ্রষ্ট ও গোমরাহ।

ঙ. শুধুমাত্র মাত্র মুনকারীনে হাদীস [হাদীস অস্বীকারী] ব্যবীত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদা ধারণকারী সকল মুসলমনই আহলে হাদীস বাং হাদীস ওয়ালা। সুতরাং কোথাও যদি আহলে হাদীসের প্রসংসা করা হয় তাহলে এ প্রসংসা নামধারী আহলে হাদীসদের কেন হবে? এ প্রসংসা হাদীস সুন্নাহ পালনকারী সকল মুসলমানদের জন্যই হবে। নাপা ঔষধ খেলে রোগ ভাল হবে, কিন্তু নাপা লেবেল লাগিয়ে বোতলে চাউলের গুড়া রাখলে ভাল হওয়ার আশা করা ভন্ডামী আর গোমরাহী ছাড়া আর কি? আহলে হাদীস হলেইতো প্রসংসার দাবীদার, আর ব্রিটিশ থেকে অনুমোদিত আহলে হাদীসের নাম সর্বস্য লেবেল লাগিয়ে মুসলমানদের মাঝে দলাদলী, ফেরকাবাজী করলে কি ঐ প্রসংসা কোড়ানো সম্ভব?

শেষ কথা : কোরআনে উল্লেখি আহমদ মানে গোলাম আহমদ ক্বাদীয়ানী নয়, আহমদ হচ্ছে রাসুল সা. এর নাম।

হাদীসে উল্লেখিত আহলে কোরআন মানে নামধারী আহলে কোরআন [মুনকারীনে হাদীস] নয়, বরং হোফফাজে কোরআন ও আমেলে কোরআন।দেখুন-মুসনাদে আহমদ ১৯/২৯৬ ”
أهل القرآن” أي: حفظة القرآن الذين يقرؤونه آناء الليل وإطراف النهار العاملون به. “أهل الله” أي: أولياؤه المختصون به.

যেখানেই হাদীসের ব্যখ্যা সমূহে আহলে হাদীস এসেছে সেখা আহলে হাদীস মানে ব্রিটিশদের বানানো নামধারী আহলে হাদীস নয় বরং আহলে হাদীস মানে মুহাদ্দিসীন, হাদীস বিসারদ, হাদীস গবেষক। দেখুন-

মুসনাদে আহমদ : আকসামুল আহাদীস, ১/৬৮,
মিনহাজুততাহক্বীক, ১/১৪৮,
মাসনাদে আবুবকর, ১/২১৪,
মাসনাদে জোবায়ের ইবনুল আওয়াম, ৩/৪১,
মাসনাদে আবি ইসহাক সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, ৩/৫৪,
মাসনাদে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, ৪/৩৩৮,
মাসনাদে আবি হোরায়রা, ১৫/৪৫৫,
মাসনাদে আবি সাঈদিনিল খুদরী, ১৭/৭,
মাসনাদে আনাসবিন মালেক, ১৯/৩৫১,
সুনানে তিরমিযি, ১/১৫, ১/১৭, ১/৪১, ১,৭৩, ১/৮৪, ১/৮৬
সুনানে কোবরা লিল নেসাঈ, ১/৪, ১/৬৩২
আল মুয়াত্তা, রাওয়াতে মুহাম্মদ ইবনে হাসান, ১/৯, ১/১২/, ১/১৫
উমদাতুল ক্বারী সরহে বোখারী, ১/৫৬, ১/৮১, ১,১০৩
মিরকাত সরহে মিশকাত, ১/২৩, ১/২৫, ৪/৪৯৩

Advertisements

One thought on “তথাকথিত আহলে হাদীসদের গোড়ার কথা

  1. ধন্যবাদ ভাই, অনেক কিছু জানতে পারলাম। আসলে আমি বেশ কিছুদিন অনেক দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্যে দিনাতিপাত করছি। কে যে সত্য কথা বলছে এটা বোঝার জন্য খুব চেষ্টা করছি। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ দেখান।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s