টিভি ভিসিআর সিডি ও ডিশ এন্টিনার শরয়ী বিধান

টিভি ভিসিআর সিডি ও ডিশ এন্টিনার শরয়ী বিধান

মুফতী আব্দুর রহীম বিন হুসাইন

টিভি, ভিসিআর, সিডি ও ডিশ এন্টিনা বিশ্বব্যাপী এক শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম। বিজ্ঞানের এক আশ্চর্য সৃষ্টি। এগুলো এমন কিছু চিত্র প্রদর্শন করে যা ধীরে ধীরে চারিত্রিক অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল নাচগান, খেলা-ধুলা ও অশ্লীল ছবি প্রদর্শনের জন্যই ব্যবহৃত হয়। তাই এগুলো মানব সমাজে অতি ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া বিস্তার করে। এসব বিনোদনের ফলে বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যার কারণে সামাজিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে সর্বজনবিদিত মানবিক মূল্যবোধের কবর রচিত হয়েছে। কেননা আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সংরক্ষণের জন্য মানুষের মাঝে দু’টি গুণ আমানত রেখেছেন। একটি হচ্ছে লজ্জাশীলতা, অপরটি হচ্ছে আত্মমর্যাবোধ। এ গুণদ্বয় নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যমান। অবশ্য “হায়া” গুণটি নারীর মাঝে তুলনামূলক অধিক। তাই একে নারীর অলংকার উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পক্ষান্তরে মর্যাদাবোধকে পুরুষের প্রতীক ও বিশেষত্ব গণ্য করা হয়। টিভির স্ক্রীনে প্রদর্শিত চিত্রাবলীর মাধ্যমে এসব গুণ বিনষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে মানবতার বিলুপ্তি ঘটছে। মোদ্দাকথা, বেহায়াপনা, ধর্মদ্রোহীতা, মানবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত হয়েছে এগুলো। ফলে প্রচলিত টিভি, ভিসিআর, সিডি ও ডিশ এন্টিনার ব্যবহার বহু অপরাধবিষয়ক বস্তুর মিলনকেন্দ্র হওয়ায় শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তা বর্জনীয়, অবৈধ ও মারাত্মক গুনাহের কারণ হয়েছে। তবে এর জন্য টিভি ও ভিসিআর নামক মেশিনদ্বয় দায়ী নয়, বরং এ মেশিনগুলোর ব্যবহারকারীগণ এর জন্য দায়ী। তাই ঈমানদার সমাজের কর্তব্য হবে, সব রকমের অন্যায় অপরাধ ও গুনাহের কাজ হতে টিভি ও ভিসিআর নামক যন্ত্রদ্বয়কে মুক্ত করা এবং ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণে শরীয়তসম্মত পন্থায় গড়ে তোলা। কারণ, এর ফলে সমাজে যে খোদায়ী আজাব আসবে তা হতে আমরা কেউ রক্ষা পাব না। টিভি, ভিসিআর ও ডিশ এন্টিনা ব্যবহার অনেকগুলো কারণে হারাম। যথা-

১. শরীয়ত পরিপন্থী প্রোগ্রাম।

২. অশ্লীলতা সম্প্রচার।

৩. অবৈধ গান-বাজনা নাটক উপস্থাপন।

৪. উলঙ্গপনা ও অপসংস্কৃতির প্রচার প্রসার।

৫. অবৈধ ছবি ও ফটো ব্যবহার।

এ কারণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কারণ ছবি ও ফটোর ব্যবহার। অতএব এখানে ছবির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হচ্ছে। দেশের কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ একথা বলে থাকেন যে, বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা তক্বী উসমানী দা. বা. টিভি, ভিসিআর, ভিডিও ক্যাসেট ইত্যাদির ছবিকে বৈধ বলেছেন, তাই টিভি ও ভিসিআর দেখা জায়েয হবে।” এ সকল ইসলামী চিন্তাবিদদের জ্ঞাতার্থে আল্লামা তকী উসমানী দা. বা. এর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হল :

“টেলিভিশন ও ভিডিও এর ব্যবহার হারাম। এতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা এতে বহু অপরাধের সংমিশ্রণ রয়েছে। যেমন অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, উলঙ্গ নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি। কিন্তু টিভি ও ভিসিআর এসব অন্যায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হলে শুধু ফটোর দিকে তাকলে হারাম হবে কি না এ ব্যাপারে আমার কিছু কথা আছে। যেহেতু ছবি হারাম হয় যখন বস্তুর আকৃতি কোন জায়গায় স্থায়িত্ব লাভ করে। আর যে ছবির কোন অস্তিত্ব স্থায়ী না হয় তার সম্পর্ক ছবির তুলনায় ছায়ার সাথে বেশি মনে হয়। টিভি ও ভিডিও এর ছবি কোন স্থানে স্থায়ী পর্যায়ে আসে না। হ্যাঁ শুধু ফিল্ম ও রীলে করা ছবি হলে তা স্থায়ী হয়ে থাকে। এ কারণে মানুষ যদি সরাসরি টিভির স্ত্রীন বা ক্যামেরার সামনে গিয়ে কথা বলে, সে অবস্থায় তার ছবি ক্যামেরা বা টিভির পর্দায় স্থায়ী হয় না, বরং ক্যামেরা থেকে টিভির পর্দায় আলোকচিত্রের বিন্দুগুলো স্থানন্তরিত হয় মাত্র। অতঃপর যে ব্যক্তিকে টিভির পর্দায় দেখা যায়, সে সরে গেলে ছবিটিও মিটে যায়। আর ভিডিও ক্যাসেটেও প্রাণীর ছবিটি স্থায়ী হয় না, বরং তার বৈদ্যুতিক বিন্দুগুলো ক্যাসেটে সংরক্ষণ হয়। এসব বিন্দুর মাধ্যমেই টিভি ও ভিডিওতে সেট করলে তার আকৃতি প্রকাশ পায়। কিন্তু তার এ ছবিটি ক্যাসেট ও সিডির মধ্যে স্থায়ীভাবে মউজুদ থাকে না, বরং প্রকাশ হয়ে আবার তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং স্থায়ীভাবে বস্তুটির কোন ছবি কোথাও মওজুদ না থাকায় এ ধরনের ছায়াকে ফটো বা ছবি বলা মুশকিল মনে হয়। আল্লাহ রহমত করুন ঐ ব্যক্তিকে যে আমাকে এ ব্যাপারে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। (তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিম ৪/১৬৪)

বিষয়টির সারমর্ম হযরত তাকী উসমানী দা. বা. অন্য কিতাবে এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, টিভিতে তিন ধরনের প্রোগ্রাম সম্প্রচার হয়ে থাকে।

এক.

টিভিতে এমন বস্তু দেখানো হয় যার ছবি প্রথমেই ফিল্ম বা রিলের মাধ্যমে ধারণ করে রাখা হয়, ঠিক সেই ফিল্মে ও রিলে ধারণকৃত ফটোকে বড় করে টিভির স্ক্রীনে সম্প্রচার করা হয়। অতঃপর টিভির পর্দায় বস্তুটির ফিল্মকৃত ছবি ও ফটো দর্শক দেখতে পায়। টিভির এ ধরনের ছবি অবশ্যই নিষিদ্ধ ছবির আওয়তায় পড়ে, যা ধারণ করা ও দেখা হারাম হওয়ার মধ্যে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

দুই.

টিভিতে এমন প্রোগ্রামও প্রচার করা হয় যার সাথে কোন ধরনের ফিল্ম ও রিলের সম্পৃক্ততা নাই বরং প্রোগ্রামটিকে পূর্বে কোন ফিল্ম বা ফিতার সাহায্য ছাড়া সরাসরি টিভিতে প্রচার করা হয়। যেমন কোন লোক টিভি স্টুডিওতে গিয়ে বক্তব্য রাখছে, অথবা ভিডিও ক্যামেরা অন কোথাও নিয়ে ফিল্মে ধারণ করা ছাড়া কোনো বক্তব্য, ওয়াজ ইত্যাদি সরাসরি প্রচার করা হচ্ছে। আর দর্শক টিভির পর্দায় প্রাণী বস্তুটির আকৃতি সরাসরি দেখতে পাচ্ছে। এ ধরনের ফটো বেশির ভাগ আলেমের মতে নিষিদ্ধ ফটোর আওতায় পড়ে, যা তোলা ও দেখা হারাম। তবে হযরত মাওলানা তাক্বী উসমানী দা. বা. এ ফটোকে হারাম বলা থেকে বিরত রয়েছেন। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চয়তার সাথে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। কেননা এ জাতীয় ফটোর মধ্যে ফটোটি স্থায়ীত্ব পায় না, কোন জায়গায় স্থায়ীভাবে ধারণ করেও রাখা হয় না। যার কারণে টিভির পর্দায় যা দেখা যায় তাকে ফটো না বলে ছায়া বলার অবকাশও রয়েছে। আর ছায়া নিশ্চিত হলে নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত করা সমীচীন হবে না। তার উদাহরণ হলো এমন যে, কোন ব্যক্তি দুরবিন দিয়ে অনেক দূরের দৃশ্য দেখতে পায় এর মাধ্যমে যা দেখা যায় আসলে তা সে দৃশ্যের ছায়া মাত্র। যাকে ছবি বলা চলে না। ঠিক তদ্রুপ টিভির এ জাতীয় ফটোকেও ছায়া বলা যেতে পারে। যা অবৈধ ছবির অন্তর্ভুক্ত হবে না।

তিন.

টিভিতে আর এক ধরনের প্রোগ্রাম সম্প্রচার করা হয়। যেটা সরাসরিও না আবার কোন ফিল্মের মধ্যমেও ফটো করে প্রচার করা হয় না বরং অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের ভিডিও ক্যাসেট এবং সিডির মাধ্যমে পূর্বে রেকর্ড করা হয় যা পরবর্তিতে টিভির স্ক্রীনে সম্প্রচার করা হয়। ভিডিও ক্যাসেট ও সিডিতে কোন ধরনের রিল, ফিতা বা ফিল্ম কিছুই বিদ্যমান থাকে না। বরং বৈদ্যুতিক অসংখ্য বিন্দুর সাহায্যে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রোগ্রামগুলির রেকর্ড করা হয়ে থাকে। বিশ্বের সিংহভাগ আলেমের দৃষ্টিতে এ জাতীয় সিডি, ভিডিও ইত্যাদির সাহায্যে সম্প্রচারিত ফটো সন্দেহাতীতভাবে হারামের অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারেও আল্লামা তকী উসমানী কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে বলেন যে, এ ধরনের দৃশ্যকে বস্তুর ফটো বলা চলে না বরং ছায়া বলা যায়। কেননা সিডি বা ভিডিও কেসেটের মধ্যে আলোকচিত্রের সাহায্যে অসংখ্য বিন্দুর আকারে প্রোগ্রামগুলো রেকর্ডিং করা হয়, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই, যেমন ফিল্মের ফটোতে রয়েছে। এ কারণেই দুরবিন লাগিয়ে দেখতে চাইলেও সিডি ক্যাসেটে কোন ধরনের ছবি দেখা যায় না। সুতরাং টিভির চ্যানেল ও প্রোগ্রামকে যদি উপরোল্লিখিত দ্বীন, ধর্ম ও মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করা হয়, তাহলে শুধু এ জাতীয় ফটোর কারণে টিভির প্রোগ্রামকে অবৈধ বলা যাবে না। অবশেষে মাওলানা তাকী উসমানী বলেন, উপরোক্ত তথ্যবহুল কথাগুলো নিছক আমার ব্যক্তিগত চিন্তার ফলাফল মাত্র। এটি আমার কোন সিদ্ধান্তও নয় ফতোয়াও নয়। আর এ ধরনের তাত্ত্বিক কথা জনসাধারণকে বলার মতোও না। অন্যথায় এর দ্বারা মানুষকে মানব বিধ্বংসী টিভি ভিডিও-র দিকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। অথচ টিভি বৈধ হওয়ার জন্য যে সব শর্তাবতলী উপস্থিত থাকা জরুরী, তা এ যুগে টিভির জগতে কল্পনাও করা যায় না। তাই বর্তমানে টিভি ও সিডির প্রোগ্রাম দেখা বা রাখা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও অবৈধ। (তাকরীরে তিরমিযি : ২/৩৫২)

আল্লামা তকী ওসমানী দা. বা. এর উপরোক্ত বক্তব্যের বিশ্লেষণ-

(ক)

হযরত আল্লামা তাকী উসমানী দা. বা. এর এ বক্তব্য থেকে বর্তমান যমানার অনেক আলেম ও পণ্ডিতগণ টিভি, ভিডিও ও সিডি ক্যাসেটের প্রোগ্রামকে বৈধ প্রমাণের অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন। ইসলামের নামে টিভি চ্যানেলে বিভিন্ন নামে প্রোগ্রাম করে সুনাম কামানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত আছেন। অনেকে নিজের ধর্মীয় মাহফিলগুলোকে সিডি, ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে ফটোসহ ধারণ করে দ্বীনের বড় দায়িত্ব পালন করার দাবী করছেন। অথচ তারা জানেন না যে, আল্লামা তাকী ওসমানীর উপরোক্ত বক্তব্য আরম্ভই হয়েছে টিভি-ভিডিওকে হারাম বলার মাধ্যমে। এখন যারা মাওলানা ওসমানীর বক্তব্যের শেষাংশের মর্ম ভাল করে বুঝার দাবী করে টিভি, ভিডিও দেখাকে জয়েয মনে করেন, তারা মাওলানার বক্তব্যের প্রথম অংশটি কেন বাদ দিলেন এটা আমাদের বোধগম্য নয়। তাছাড়া মাওলানা ওসমানীর বক্তব্যের শেষাংশের দ্বারা টিভি ভিডিওকে যারা জায়েয মনে করেন তারা কি জানেন না যে, টিভি, ভিডিও ও সিডির অবৈধ হওয়ার কারণ শুধু ফটো নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত নয় বরং এ সব বস্তু হারাম হওয়ার আরো বহু কারণ রয়েছে। যার দিকে হযরত মাওলানা তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই এ কথা কখনো বলা যাবে না যে, টিভির ফটো নিষিদ্ধ ফটোর আওতায় পড়ে না বা টিভি-ভিডিও দেখা বৈধ হবে।

(খ)

হযরত মাওলানা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, “এটি আমার কোন ফতোয়া নয় বরং প্রাথমিক একটি চিন্তামাত্র। আমার এ চিন্তা ধারায় যিনি আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন আল্লাহ তাকে রহমত করুন!” তাহলে এমন একটি উক্তির উপর নির্ভর করে শত শত বছরের মুফতী ও উলামায়ে কেরামের ফতোয়াকে উপেক্ষা করে যারা টিভি, ভিসিআর, সিডি ও ভিডিওকে বৈধ বলতে চায়, তারা আসলে ইসলামকে যুগের সাথে মিলিয়ে একটি মডার্ণ ইসলাম তৈরি করতে চায় নতুবা এত পরিষ্কার ভাষায় মাওলানা ওসমানীর বক্তব্য পেয়ে যে, “টিভি-ভিডিও হারাম, তবে ছবিগুলো নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত নয়; এবং এটিও একটি সিদ্ধান্তহীন নিতান্ত চিন্তার প্রাথমিক ফলাফল মাত্র” তারা মাওলানার এই বক্তেব্যের উপর আমল না করে নিছক একটি সম্ভাবনাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে টিভিকে বৈধ বলার দুঃসাহস করলো কীভাবে?

(গ)

টিভির মধ্যে আমাদের জানা মতে সিংহভাগ প্রোগ্রামই ফিল্ম ও রীল বা ফিতার মাধ্যমে ছবি ও বক্তব্যকে ক্যাসেট করার পন্থায় প্রচারিত হয়ে থাকে। হযরত মাওলানা তো এ ধরনের ছবিকে বৈধ বলে ফতওয়া দেননি। অথচ যারা মওলানার এ বক্তব্যের ভিত্তিতে টিভি, ভিডিও-কে জায়েয করার চেষ্টা করছেন, তারা তো প্রোগ্রামের প্রকারভেদ বাদ দিয়ে সব রকমের ছবি বা প্রোগ্রামকে বৈধ বলা শুরু করেছেন।

হযরত মাওলানা দা. বা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার এ সন্দেহ বা যুক্তি খণ্ডন করে সঠিক পথ প্রদর্শন করে দিবেন তার উপর আল্লাহ দয়া করুন।” হযরত মাওলানার এ উদার নীতির সম্মুখে হাকীমূল উম্মত মুজাদ্দেদুল মিল্লাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর ‘তাসহীহুল ইলম ফি তাকবীহুল ফিল্ম’ নামক প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলোচিত ঐতিহাসিক ফাতওয়া ও যুক্তিটি তুলে ধরা বাঞ্ছনীয় মনে হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবি উঠানো সর্ব অবস্থায় গুনাহ, চাই তা ফটো হোক, প্রতিমা সদৃশ হোক অথবা না হোক। (জাওয়াহেরুল ফিকহ : ৩/২৫৫)

একই প্রবন্ধে হযরত থানবী রহ. উল্লেখ করেন, টিভি, ভিডিও ভিসিআরে মুসলমানদের কর্তব্য হলো, এ সকল অন্যায় কাজের পথ রুদ্ধ করা। আর দর্শকদেরকে এ সকল অশ্লীল ও বেহায়াপনা সম্পর্কে অবহিত করে বারণ করা আবশ্যক। অন্যথায় ভয়ংকর শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে। (জাওয়াহেরুল ফিকহ : ৩/২৫৮)

মুফতী শফী রহ. তার ছবির বিধানবিষয়ক যুগোপযোগী প্রবন্ধ শিরোনামের অধীনে উল্লেখ করেন, যে সকল ছবি তোলা এবং সংরক্ষণ করা নাজায়িয ইচ্ছাকৃতভাবে তা দেখাও নাজায়িয। অবশ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টিগোচর হলে শরয়ী দৃষ্টিকোণে কোন অসুবিধা নেই। যেমন সংবাদ পত্র পাঠ করাই মূল উদ্দেশ্য। অনিচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ছবি নজরে আসলে কোন সমস্যা নেই।

মাসআলা : সিনেমায় প্রদর্শিত ছবি দেখা শুধু এ কারণেই হারাম যে তাতে ঘুর্ণায়মান/চলমান ছবি প্রদর্শিত হয়, যদিও তা অন্য সকল অন্যায় ও অশ্লীলতা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। তাছাড়া যখনি এ সকল ফিল্মে প্রদর্শিত বাস্তব প্রোগ্রামসমূহ অবলোকন করা হয়, তখন তা বহু অন্যায় গর্হিত ও হারাম বিষয়ে পরিপূর্ণ পাওয়া যায়। যা অনেক অপরাধ ও গুনাহের অতি নিকটবর্তী কারণ হয়ে দাড়ায়। অতএব এসব তামাশার দর্শন ও প্রদর্শন সবই নাজায়েয। (জা. ফি. ৩/২৩৯-২৪০)

হযরত মাওলানা তক্বী উসমানী দা. বা. এর অভিমতের বিশ্লেষণ করত: বিখ্যাত ফকীহদ্বয় হযরত থানবী রহ. ও মুফতী শফী রহ.-এর সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত পেশ করার পর রশীদ আহমাদ লুধিয়ানবী রহ. এর ফাতওয়া উল্লেখ করা সমীচীন মনে করে নিম্নে তা তুলে ধরা হলো। তিনি তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আহসানুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেন যে, “ভিডিও ক্যামেরা ও টিভি এ দুটি যন্ত্র ফটো নির্মাণের সর্বাধুনিক একটি মাধ্যম। অতীতে যা হাতে তৈরী হতো বর্তমানে অতি সহজে তা মেশিনে তৈরী হয়। এখানে এ যুক্তিটি সঠিক নয় যে, এটা স্থায়ীরূপে সংরক্ষিত না থাকায় তা নিষিদ্ধ ছবির আওতায় পড়ে না। কারণ বিষয়টি যদি এরূপই হত তাহলে টিভির স্ক্রীনে চাকচিক্যপূর্ণ চলমান নর্তন কুর্দন অবস্থায় দৃশ্যমান চিত্র কিভাবে দেখা সম্ভব হয়? আসলে এগুলোই ফটো ও ছবি, যা ক্যাসেট বা সিডিতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক উপায়ে করা হয়েছে যা দুরবিন দিয়েও দেখা যায় না। অথচ যতবার ভিসিআর ও টিভি চালিয়ে দেয়া হয় পূর্ণ চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যদি কেউ বলে যে, দৃশ্যটি সিডিতে সংরক্ষিত থাকে না বরং প্রতিমুহূর্তে বিলুপ্ত হতে থাকে আর নতুনভাবে সৃষ্টি হতে থাকে তাহলে বলতে হবে, এটাতো ফটোগ্রাফীর ছবি থেকেও মারাত্মক ভয়ংকর। এতে বারংবার ফটো তোলার গুনাহ হতে থাকবে এবং দেখার গুনাহও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তেমনিভাবে টিভি, ভিডিও-এর ছবিকে শুধু ছায়া বলা, ছবি না বলাও যুক্তি সঙ্গত হবে না। কেননা ছায়া তো আসল বস্তুর সাথে স্থির থাকে। আসলটি বিলুপ্ত হলে তার সাথে ছায়াও বিলুপ্ত হতে বাধ্য। অথচ দেখা যায়, প্রাণীটি মারা গেলেও তার আকৃতি টিভি ও সিডিতে বহুকাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে। তাহলে এটা ছায়া হয় কী করে? কিছুক্ষণের জন্য যদি মেনে নেওয়া হয় যে, টিভি, ভিসিয়ার ও সিডির ছবি মূলত ছবি নয় বরং ছায়া এবং অস্থায়ী হওয়ায় তা নিষিদ্ধ ফটো নয়, তাহলে বলবো যে, ফটোর অন্তর্ভুক্ত হওয়া কিংবা না হওয়ার আসল মাপকাঠি র্ওফ্ তথা সাধারণ লোকদের সমাজ অনুপাতে হওয়াই বাঞ্ছনীয়, বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্ম অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়। মূলত এ জন্যই ইসলামী শরীয়তে সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্তের মাপকাঠি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রকে উপেক্ষা করে স্বাভাবিক সহজ আলামতকে সাব্যস্ত করে দিয়েছে। এগুলো হওয়ার কারণেই শরীয়তের কোন হুকুম অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উপরে ন্যস্ত রাখা ইসলাম সমীচীন মনে করেনি। তাই এ রকম বলা যে, অডিও ক্যাসেট এবং টিভির রীল করা দৃশ্যগুলো হলো ফটো বা ছবি এবং ভিডিও সিডি ও টিভির সরাসরি প্রোগ্রামের দৃশ্যগুলো হলো ছায়ামাত্র, ছবি ও ফটো নয়; এসব বৈজ্ঞানিক যুক্তি জনসাধারণের বুঝার উর্ধ্বে। উল্লেখ্য যে, অতীত যামানায় সিনেমা, বায়স্কেপকেও ছবি বা ফটো নয় বলে কেউ কেউ জায়েয বলেছিলেন। এতে জাতির কোনই লাভ হয়নি, বরং ধীরে ধীরে এর দ্বারা নৈতিক চরিত্র অধঃপতনের শিকার হয়েছে। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৯/৮৮)

সিনেমার কুফল ও ক্ষতি

বিভিন্ন শিকার ধরার ভিন্ন ভিন্ন টোপ থাকে। শিকারীই ভাল জানে, তার কাঙ্খিত শিকারের লোভনীয় টোপ কোনটি। ফলে সে ঝোপ বুঝে কোপ মারার মত টোপ ফেলে, আর ওদিকে অসতর্ক শিকার বস্তুটি স্বাদে-আহ্লাদে সে টোপ গিলতে থাকে। অথচ সে জানে না যে, এই বিষ টোপ তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিবে। “মসনবী শরীফে” আছে, ইবলীস বিতাড়িত হওয়ার সময় একটি মনুষ্য টোপ চেয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা ধনদৌলত পোশাক-আশাক ও বাহনাদি তাকে দেখালেন কিন্তু দক্ষ মানব শিকারী ইবলীস বললো, আরো লোভনীয় টোপ চাই। এবার আল্লাহ দেখালেন নারী ফিতনা। ইবলীস নেচে উঠল খুশিতে। সে সর্বপ্রথম টোপ ফেলে হযরত আদম ও হাওয়া আ. এর সামনে। তখনই মানবকুলের জনক-জননী আল্লাহর নবী আদম ও হাওয়াকে বেহেশত হতে বের করার মাধ্যমে ইবলিসের হাতে খড়ি হলো। ঝানু মানব শিকারী ইবলিসের হালের প্রধান ৩টি তীর হচ্ছে নর-নারীর অবাধ মেলা-মেশা, চলচ্চিত্র ভূবন ও কলমবাজি।

ফাইটিং ছবি আর নাচ-গান, রং ঢং দিয়ে তনুমনে যে জিনিসটি নতুন আমেজ সৃষ্টি করে তারই নাম সিনেমা। আধুনিক বিশ্বে বড় বড় ছবির মাধ্যমে বিনোদনের নতুন পরিবেশ তৈরির জন্য এটা বিজ্ঞানীদের দান। যুবক যুবতীদের মাঝে প্রেম, প্রেমের মিলন, ফাইটিং-মারদাঙ্গা ও অশ্লীলতা, বেহায়াপনা-বেলাল্লাপনা শিক্ষা দানের জন্য সিনেমা হচ্ছে আধুনিক ব্যবস্থা। সমাজ আর সরকার এসবের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। অথচ সিনেমা আমাদের মুসলিম জাতির জন্য ব্যাপক সর্বনাশ ডেকে আনছে।

সিনেমার কারণে যে সমস্ত ক্ষতি হচ্ছে তার কয়েকটি নিম্নরূপ-

১. সিনেমা অবাধ মেলা-মেশা শেখাচ্ছে।

২. সিনেমা লজ্জা-শরমের পর্দা অপসারণ করছে।

৩. সিনেমা পরের মেয়ে অপহরণ করার পদ্ধতি শেখায়।

৪. সিনেমা শিক্ষা দেয়, জীবন জ্বালা দূর করার জন্য নোংরা আস্তানায় ভোগের মত্ততা নিয়ে কিভাবে ডুবে থাকা যায়।

৫. সিনেমা শিক্ষা দিচ্ছে, মুরব্বীদের থেকে দাবি আদায়ে কিভাবে কড়া কড়া ডায়ালগ ছাড়তে হয়।

৬. সিনেমা শিখাচ্ছে, মানবিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে পাশবিকতা আয়ত্ত করে হিংস্রতা প্রদর্শন করে কিভাবে বীর হতে হয়।

৭. সিনেমা শিখাচ্ছে, বেশ-ভুষায়, চুল আর চেহারায় কিভাবে ঘন ঘন পরিবর্তনের রং লাগাতে হয়।

৮. সিনেমা শিখিয়েছে, পরের মেয়ে কিভাবে ছলে বলে কলে কৌশলে বশ করে নিতে হয়।

৯. সিনেমা শিখিয়েছে, কিভাবে সমাজকে চমক লাগিয়ে দেবার মত প্রেম-কাহিনীর জন্ম দেয়া যায়।

১০. সিনেমা শিখিয়েছে, খুন-খারাবি করে কিভাবে হিরো হতে হয়।

১১. সিনেমা শিখিয়েছে প্রকাশ্যে দিবালোকে হাইজ্যাক ও লুটপাট করে কিভাবে রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়।

১২. সিনেমা শিখিয়েছে অতি সন্তর্পণে পরের সম্পদ চুরি করে কিভাবে নিরাপদে পলায়ন করা যায়।

১৩. সিনেমা শিখিয়েছে অপকর্মের অভিনয়ে একজনকে হুজুর সাজিয়ে দ্বীনের প্রতি কিভাবে দর্শকদের বীতশ্রদ্ধ করা যায়।

১৪. সিনেমা শিখিয়েছে কীভাবে পরকীয়া প্রেম করা যায়।

মোটকথা যা কিছু অপকর্ম সমাজে হচ্ছে বা হতে পারে দর্শকদেরকে তা প্রশিক্ষণ দিয়ে শেখায় সিনেমা। উপরন্তু সিনেমায় অভিনয়কারীরা কোন দিন খালেছ তওবা করে পরহেযগার হয়ে গেলেও তাদের দিগম্বর দেহ বছরের পর বছর দর্শকরা উপভোগ করতেই থাকে ও গোনাহে জারিয়ার একটি বহুল মাধ্যম হয়ে থাকে। হালের নতুন খবর হল সিনেমা ব্যবসা এখন খুবই মন্দা। দেশের এক তৃতীয়াংশ সিনেমা বন্ধ হয়ে গেছে দর্শক সংকটের কারণে। বাকীগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। হয়ত কেউ এ সংবাদে খুশি হতে পারেন। খুশির সংবাদই বটে যদি মানুষ ক্ষতিকর দিকগুলি বিবেচনা করে সিনেমা-বিমুখ হত। কিন্তু ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা আজ টেলিভিশনের বদান্যতায় প্রতিটি ঘরই একেকটি মিনি সিনেমা হল হয়েছে। পয়সা ও সময়ের তেমন অপচয় না হওয়ায় সিনেমা ছেড়ে সকলেই টিভিমুখী। উপরন্তু ডিশ লাইন সিনেমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিয়েছে। যার ফলে সিনেমা ব্যবসায় ধস নেমেছে। ঈমানের শক্তি দিয়ে আমাদেরকে এ সব থেকে ফিরে থাকতে হবে। হাদীসে এসেছে : “যদি কোন দিন রমণীর সৌন্দর্যের প্রতি কোন মুসলমানের আকষ্মিক দৃষ্টি পড়ে যায় অতঃপর সে তার চক্ষু বন্ধ করে নেয় তবে আল্লাহ তাকে একটি ইবাদতের তাওফীক দিবেন, যার মধুরতা সে আস্বাদন করবে।” (আহমদ/ মিশকাত : ২/২৭০)

এসব অবৈধ দৃশ্য অবলোকন না করে যে ধৈর্য ধারণ করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে যে আকর্ষণীয় দৃশ্য প্রস্তুত করে রেখেছেন তা কোন চোখ কোন দিন দেখেনি, কোন কান কোন দিন শোনেনি ও কোন অন্তর কোন দিন কল্পনাও করেনি। আল্লাহ আমাদেরকে মেহনত করে, ঈমান মজবুত করে এ পঁচা নোংরা দৃশ্য পরিহার করে ঐ অদৃশ্য, অশ্র“ত ও অকল্পনীয় পবিত্র দৃশ্য দেখার যোগ্য হওয়ার তাওফীক দান করুন!

2 thoughts on “টিভি ভিসিআর সিডি ও ডিশ এন্টিনার শরয়ী বিধান

  1. Siddiqur Rahman says:

    Jajha-Kallahu Khair !
    Quran Hadith ar Dolil Soho Mas’ala ti Somadhan Hoya Dorkar !

  2. […] Source: টিভি ভিসিআর সিডি ও ডিশ এন্টিনার শরয়ী … […]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s