কোয়ান্টাম মেথড : একটি ভয়াবহ ফিৎনা

মুরাকাবা ইলমে তাসাওউফের একটি প্রসিদ্ধ অধ্যায়। যুগ যুগ ধরে ওলি আউলিয়াদের মাঝে এর চর্চা হয়ে আসছে। মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার ভালবাসা জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করাই এর উদ্দেশ্য। সদা এক আল্লাহর স্মরণ অন্তরে থাকলে মানুষের পক্ষে তাঁর নাফরমানী সম্ভব নয়। মুরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাকে দেখছেন এবং আমার সাথে আছেন এই বোধ জাগ্রত করে তোলারই চেষ্টা করা হয়। প্রসিদ্ধ হাদীসে জিব্রাঈলে যাকে ‘ইহসান’ বলে সঙ্গায়ীত করা হয়েছে। ‘‘তুমি এমন ভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যেন তুমি তাকে দেখছ, আর তুমি তাকে দেখতে না পেলেও তিনি তোমাকে দেখছেন’’। মুরাকাবার মাঝে মনকে সকল ধরনের চিন্তা মুক্ত করে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুধু মাত্র একটি বিষয়ে ভাবা হয়। এবং লাগাতার দীর্ঘ সময় ধরে অনবরত কল্পনা করা হয়।
ইসলামের এই মুরাকাবার ন্যায় অন্যান্য ধর্মের সাধকদের মাঝেও আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য মন নিয়ন্ত্রনের সাধনা করতে দেখা যায়। হিন্দু যোগীদের যোগ্যধ্যান এবং বৌদ্ধদের বিপাসন ধ্যান এর অন্যতম। তবে মুসলমান সূফী-ওলীদের মুরাকাবা আর অমুসলিমদের ধ্যান বা যোগ সাধনার মাঝে তফাত সাত সমুদ্রের। কারণ প্রত্যেকেই এর রিয়াযত মুজাহাদা বা সাধনা করে থাকে নিজ নিজ ধর্মের আক্বিদা-বিশ্বাস ও রীতিনীতির অনুসরণে। ইসলাম একমাত্র একত্ববাদের ধর্ম, আর বাকী সব বহু ইশ্বরবাদে বিশ্বাসী নাস্তিক যেমন বৌদ্ধ সমাজ। কাজেই ধ্যানের ক্ষেত্রেও এসকল বিশ্বাসের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
ধ্যান- মুরাকাবার মৌলিক উৎসের মাঝে গবেষণা করে পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন মন নিয়ন্ত্রনের পদ্ধতি, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘মেডিটেশন’। তাদের গবেষণায় বের হয়ে এসেছে মন-মস্তিস্কের মাঝে ধ্যানের প্রভাব। তারা দেখতে পেয়েছে যে ধ্যানের মাধ্যমে মানুষের মনে যে বিষয় গেথে দেয়া হয় সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সে অনুসারে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ মনের বিশ্বাস অন্য অঙ্গকে প্রভাবিত করে। রোগ মুক্তি ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে এই ধ্যানের ফরমুলা অনুসরণ করে এক জন রোগীর মনের অবস্থা পরিবর্তন করা গেলে অনেকটা সফলতা পাওয়া যাবে। ৬০/৭০ দশকে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের মাঝে এনিয়ে চলে ব্যাপক গবেষনা। এবং তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মানষিক ও শারীরিক উভয় ধরনের রোগ সারাতে মেডিটেশন কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারে। এসকল গবেষণার মাঝে অনেকটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষক ডা: হার্বার্ট বেনসন। দীর্ঘ গবেষণার পর ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তার ‘রিলা ক্সেশন রেসপন্স’ গ্রন্থে তিনি লেখেন যে, একাগ্র বিশ্বাস নিয়ে মেডিটেশন বা প্রার্থনা করে কিভাবে অনিদ্রা, সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা এবং ব্যাথা-বেদনায় আক্রান্ত রোগীরা আরোগ্য লাভ করতে পারে। তিনি বলেন, উদ্বেগ উৎকন্ঠার কারণে যে রোগ-বালাই হয় প্রচলিত চিকিৎসায় তাতে খুব একটা কাজ হয় না। বরং ৬০Ñ ৯০% নিরাময় হয় রোগীর বিশ্বাসের কারণে। ‘আমি সুস্থ হবো’ এ বিশ্বাসের ফলে রোগীর দেহের নিউরো-ইমিউনোলজিকেল সিস্টেম নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠে, বদলে যায় রোগের কোষগত নেতিবাচক স্মৃতি। এ বিশ্বাসকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্লাসিবো ইফেক্ট’। তদ্রুপ ক্যালিফোর্নিয়ার কার্ডিওলজিষ্ট ডা: ডীন অরনিশের গবেষণায় বেরিয়ে আসে হৃদরোগ নিরাময়ে মেডিটেশনের কার্যকারিতা। বাইপাস সার্জারি বা এনজিও প্লাস্টি ছাড়াও হৃদরোগের চিকিৎসা সম্ভব তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তিনি সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালে ৪০ জন গুরুতর হৃদরোগীকে এক বছর ধরে মেডিটেশন যোগব্যায়াম ও কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করানোর মাধ্যমে হৃদরোগ থেকে মুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। এভাবে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মেডিটেশন নামক বৈজ্ঞানিক ধ্যান পশ্চিমা সমাজে। টাইম ম্যাগাজিনের আগষ্ট ২০০৩ সংখ্যার ‘দি সায়েন্স অফ মেডিটেশন’ প্রচ্ছদ নিবন্ধে সুস্পষ্ট ভাবে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ১ কোটি মানুষ এখন নিয়মিতভাবে মেডিটেশন করছে।
বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাময়ের জন্যে এই মেডিটেশন চর্চার ব্যাপক প্রচলন ঘটছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো বাংলাদেশে প্রচলিত কোয়ান্টামের মেডিটেশন। এখানে নিরাময়ের গন্ডি থেকে বেরিয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার কথা বলা হচ্ছে। নিরাময়ের বিশ্বাসের স্থলে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘মুক্ত বিশ্বাস’। দ্বীন ইসলাম যেভাবে আক্বায়েদ (বিশ্বাস) আ’মাল, মুয়ামালা, মুয়াশারা, ও আখলাক এই পাঁচ ভাগে মানুষকে জীবন বিধান দিয়েছে তদ্রুপ কোয়ান্টাম মেথডের মাধ্যমে বর্ণিত সকল ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্ট করা হয়েছে। ‘সফলতার পঞ্চসূত্র’ নামে পাঁচটি মনগড়া বিষয় ঠিক করা হয়েছে সঠিক জীবনদৃষ্টি অর্জনের জন্যে। এই জীবনদৃষ্টি প্রয়োগ করে যে কোন ধর্মের লোক নিজ ধর্মে অবিচল থেকেও সে হতে পারে এক ‘অনন্য মানুষ’ ইনসানে কামেল। সুখ-শান্তি, সফলতা ও সুস্বাস্থ্য সবই অর্জন সম্ভব এই সূত্র অবলম্বনে।
গুরুজী শহীদ আল বোখারী মহাজাতক (আসল নাম জানা নেই) বাংলাদেশের এক জন প্রসিদ্ধ জ্যোতিষী। তিনিই উদ্ভাবন করেছেন ‘কোয়ান্টাম মেথড’ নামক এই বৈজ্ঞানিক ধ্যান পদ্ধতি। যদিও তিনি ডা: বেনসন বা ডা: ডীন অরনিশের মত চিকিৎসাবিদ নন। কিন্তু তাদেরই বাতলানো বৈজ্ঞানিক ফর্মূলা থেকে সূত্র সংগ্রহ করে নিজের গবেষণালব্দ জোতির্বিদ্যার বিভিন্ন দর্শন যোগকরে আবিস্কার করেছেন এক আলাদিনের চেরাগ মার্কা ধ্যান ‘মেডিটেশন’। এতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্মের লোকদের আকৃষ্ট করতে সকল ধর্মের কিছু কিছু আদর্শ বিশ্বাস ও রীতিনীতির মিশ্রণ করা হয়েছে। তাই কোয়ান্টাম মেথড পশ্চিমাদেশে প্রচলিত নিরাময়ের মেডিটেশন পদ্ধতি নয় বরং একটি জীবন ব্যবস্থা ও মতবাদ। যেখানে ধ্যান চর্চার নামে বিজ্ঞান ও সকল ধর্ম-মতবাদের সমন্বয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন দিক নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ঠিক অনেকটা বাদশাহ আকবরের ভ্রান্ত দ্বীনে এলাহীর মত।

এব্যাপারে ধারাবাহিক লেখা পেয়েছি  মাসিক আল-আবরারে। সেগুলো ট্যাক্স ফাইল না পাওয়ায় এখানে দেওয়া সম্ভব হয়নি। পড়তে আগ্রহীগণ নিম্ন লিংকে দেখুন।

http://monthlyalabrar.wordpress.com/

Advertisements

2 thoughts on “কোয়ান্টাম মেথড : একটি ভয়াবহ ফিৎনা

  1. দয়া করে কি এই লেখাটি পড়বেন? http://quantummethodbd.wordpress.com/
    আগাম ধন্যবাদ রইল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s