ইসলামে নারীর মর্যাদা

ইসলামে নারীর মর্যাদা

যুগে যুগে নারীর অবস্থান ইউনানী সমাজেঃ রুমান সমাজেঃ ইহুদী সমাজেঃ খৃষ্ঠান সমাজেঃ হিন্দু সমাজেঃ অন্ধকার যুগেঃ অন্ধকার যুগে বিবাহঃ কন্যাসন্তান কুলক্ষণঃ জীবন্ত কবরঃ শিল্পবিপ্লব এবং নারী স্বাধীনতাঃ ইসলামে নারীর মর্যাদাঃ ইসলাম নারীকে দিয়েছে বাঁচার অধিকারঃ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সমান মর্যাদার মানুষ ঘোষনা দিয়েছঃ নারীদেরও রয়েছে অধিকার পুরুষের উপরঃ জান্নাত মায়ের পদতলেঃ নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণঃ কন্যাসন্তান কুলক্ষন নয়ঃ
بسم الله والصلاة والسلام على رسول الله
ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বড় অপবাদ ইসলাম নারীর মর্যাদা দেয়নি৷ অমুসলিমদের সাথে সাথে আজকাল কিছু অতি মডার্ন মুসলমানরাও এই শ্লোগান দেন৷ তবে আর যাই হোক ব্যাপারটিকে পুঁজি করে মুসলমান নামধারী অনেকেই অমুসলিম বিশ্বে তাঁদের অবস্থান সুসংহত করে নিজেদেরকে তথাকথিত প্রগতিবাদী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন৷ আসলে ইসলাম যে সঠিক একটি জীবন ব্যবস্থা এটাও তার একটি প্রমাণ৷ নারী-পুরুষ সৃষ্ঠিগত পার্থক্যই প্রমাণ করে অধিকারে অধিকারে পার্থক্য আছে৷ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের ফেয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে৷ কিন্ত্ত প্রথমে প্রাক ইসলামিক যুগে নারীর অবস্থান কিঞ্চিত আলোচনা করা সংগত হবে বলে মনে করি৷
যুগে যুগে নারীর অবস্থানঃ
এখানে অতি সংক্ষেপে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও সমাজে নারীর অবস্থান তুলে ধরা হল৷
ইউনানীদের সমাজেঃ
ইউনানীদের সমাজে নারীরা ছিল পন্য দ্রব্যের মত, বাজারে বিকিকিনি হত, তাদের কোন স্বাধীনতা বা ন্যুনতম মর্যাদা ছিলনা৷ পিতৃসম্পত্তিতে নারীর যেমন ছিলনা কোন অধিকার তেমনি কোন অধিকার ছিলনা তার তালাকেরও৷
রুমান সমাজেঃ
রুমানদের সমাজে ছেলে বা মেয়ে সন্তানকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য ছিলনা জন্মদাতা পিতা৷ জন্মের পর শিশুটিকে তার জন্মদাতা পিতার পায়ের কাছে রাখা হত, কোলে তুলে নিলে বুঝা গেল পিতা শিশুটিকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেছে৷ নতুবা শিশুটিকে ময়দানে রাখা হত, ছেলে সন্তান হলে কেউ হয়তোবা নিয়ে যেত আর মেয়ে সন্তান হলে এই অবস্থায় ক্ষুধা-পিপাসা ও অতিশয় গরম কিংবা ঠান্ডায় এক সময় মারা যেত৷ মেয়ে সন্তানের সম্পত্তির মালিকানার অধকার ছিলনা৷
ইহুদী সমাজেঃ
ইহুদীদের কোন কোন গোষ্ঠী নারীদেরকে পুরুষের সেবিকা ছাড়া আর কিছু মনে করতনা৷ কন্যা সন্তান বিক্রি করা পিতার জন্য বৈধ ছিল৷ পুত্র সন্তানের অবর্তমানে কন্যা সন্তানের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কোন অংশ ছিলনা৷ ইহুদীরা মনে করে নারীরা অভিশাপ কারণ বিবি হাওয়া আদমকে নিষিদ্ধ ফল আহারে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন৷
খৃষ্ঠান সমাজেঃ
খৃষ্ঠানরা মনে করত বিবাহ একটি অপবিত্র কাজ, এ থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব, প্রভূর (আল্লাহ) কাছে অবিবাহিত বিবাহিতের চেয়ে প্রিয়৷ তারা মনে করত নারীরা শয়তানের বাহন ও হাতিয়ার৷ পঞ্চম শতাব্দিতে তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যীশু খৃষ্ঠের মাতা বিবি মারয়াম ছাড়া আর কোন নারী জাহান্নাম থেকে রেহাই পাবেনা৷ নারীরা মানবাত্মা কি না এ নিয়ে তারা বিতর্ক করত৷
হিন্দু সমাজেঃ
এই নিকট অতীতেও হিন্দু ধর্মে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর বাঁচার কোন অধিকার ছিলনা৷ স্বামীর চিতায় জীবন্ত আত্মাহুতি দিতে হত স্ত্রীকে৷ প্রভুর তুষ্টির জন্য নারীদেরকে বলি দেয়া পূণের কাজ মনে করা হত৷
অন্ধকার যুগেঃ
ইসলামের পূর্ববর্তী যুগকে আইয়ামে জাহিলিয়্যাত বা অন্ধকার যুগ বলা হয়৷ এই যুগে নারী বাজারে বেচাকেনা হত, নারীদেরকে সামাজিক প্রয়োজনে উপহার হিসাবে অন্যের হাতে তুলে দেয়া হত৷ নারী এক হাত থেকে অন্য হাতে আদান প্রদান হত৷ উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর কোন অধিকার তো ছিলইনা বরং খোদ নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসাবে ভাগ-ভাটোয়ারা করে নেয়া হত৷ স্বামীর উপর নারীর কোন অধিকার ছিলনা৷ তালাকের কোন সীমা যেমন ছিলনা তেমনি ছিলনা বহু বিবাহের কোন শেষ সংখ্যা৷
অন্ধকার যুগে বিবাহঃ
সহীহ বুখারী শরীফে আম্মাজান হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
أن النكاح في الجاهلية كان على أربعة أنحاء فنكاح منها نكاح الناس اليوم يخطب الرجل إلى الرجل وليته أو ابنته فيصدقها ثم ينكحها ونكاح آخر كان الرجل يقول لامرأته إذا طهرت من طمثها أرسلي إلى فلان فاستبضعي منه ويعتزلها زوجها ولا يمسها أبدا حتى يتبين حملها من ذلك الرجل الذي تستبضع منه فإذا تبين حملها أصابها زوجها إذا أحب وإنما يفعل ذلك رغبة في نجابة الولد فكان هذا النكاح نكاح الاستبضاع ونكاح آخر يجتمع الرهط ما دون العشرة فيدخلون على المرأة كلهم يصيبها فإذا حملت ووضعت ومر عليها ليال بعد أن تضع حملها أرسلت إليهم فلم يستطع رجل منهم أن يمتنع حتى يجتمعوا عندها تقول لهم قد عرفتم الذي كان من أمركم وقد ولدت فهو ابنك يا فلان تسمي من أحبت باسمه فيلحق به ولدها لا يستطيع أن يمتنع به الرجل ونكاح الرابع يجتمع الناس الكثير فيدخلون على المرأة لا تمتنع ممن جاءها وهن البغايا كن ينصبن على أبوابهن رايات تكون علما فمن أرادهن دخل عليهن فإذا حملت إحداهن ووضعت حملها جمعوا لها ودعوا لهم القافة ثم ألحقوا ولدها بالذي يرون فالتاط به ودعي ابنه لا يمتنع من ذلك فلما بعث محمد صلى اللهم عليه وسلم بالحق هدم نكاح الجاهلية كله إلا نكاح الناس اليوم ( البخاري)
জাহিলিয়্যাতের যুগে বিবাহ ছিল চার ধরনের৷ (১) একটি বিবাহ ছিল বর্তমান যুগের বিবাহের মত৷ বিবাহের পয়গাম দিয়ে মোহর ধার্য্য করে পুরুষ মহিলাকে বিবাহ করত (২) স্বামী তার স্ত্রীকে বলে দিত হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার পর অমুক (বড়লোক) পুরুষের সাথে শয়ন করবে, এরপর গর্ভ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্বামী তার স্ত্রীকে স্পর্শ করতনা৷ গর্ভ নিশ্চিত হওয়ার পর ইচ্চা করলে স্বামী স্ত্রী সহবাস করত৷ ভাল সন্তান লাভের আশায় এটা করা হত৷ এই বিবাহকে “নিকাহুল ইসতিবদ্বা” বলা হত৷ (৩) অনুন্য দশজন একজন মহিলাকে ভোগ করত, গর্ভ ধারণ করলে সন্তান প্রসব করার পর ঐ নারী ওদের সবাইকে ডেকে পাঠাত, সামাজিকভাবে হাজির হতে এবং মানতে বাধ্য বিধায় ওরা সবাই হাজির হলে মহিলা তার পছন্দমত একজনের নাম ধরে বলত হে অমুক এটা তোমার সন্তান৷ (৪) চতুর্থ প্রকার বিবাহ ছিল, ব্যভিচারিনী মহিলাগণ তাদের ঘরের দরজায় বিশেষ ধরনের সাইন লাগিয়ে রাখত, যার ইচ্ছা সঙ্গ নিতে কোন বাধা ছিলনা৷ মহিলা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের পর সংশ্লিষ্ট সবাই হাজির হত এবং সাদৃশ্য দেখে সন্তানের পিতা নির্ধারণ করা হত৷ অতঃপর সত্য দ্বীন নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হলে পরে তিনি জাহিলিয়্যাতের সমস্ত বিবাহ প্রথা মূলোত্‎পাটন করে আজকের বিবাহ প্রথাকে স্বীকৃতি দেন৷ (বুখারী শরীফঃ কিতাবুন নিকাহ ৪৭৩২, আবূদাঊদঃ কিতাবুত্তালাক্ব ১৯৩৪)
কন্যাসন্তান কুলক্ষণঃ
জাহিলিয়্যাতের যুগে কন্যাসন্তান প্রসবকে কুলক্ষণ মনে করা হত৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র ক্বুরআন শরীফে এরশাদ করেছেনঃ
وإذا بشر أحدهم بالأنثى ظل وجهه مسودا وهو كظيم ، يتوارى من القوم من سوء ما بشر به ، أيمسكه على هون أم يدسه في التراب ، ألا ساء ما يحكمون
“আর যখন তাদের কাউকে সুসংবাদ দেয়া হয় মেয়ে সন্তানের তখন তার মুখমন্ডল কালো হয়ে, আর সে হয় বড়ই ব্যথিত৷ সে লোকদের থেকে নিজেকে লুকোয় তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে তার গ্লানির জন্য, সে কি একে রাখবে হীনতা / বেইজ্জতী স্বত্তেও, না তাকে মাটিতে পুতে ফেলবে? তাদের ফায়সালা কতইনা নিকৃষ্ট৷” (সূরা নহলঃ ৫৮-৫৯)
জীবন্ত কবরঃ
প্রাক ইসলামিক যুগে বেইজ্জতীর ভয়ে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত৷ পবিত্র ক্বুরআনে করীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেনঃ
وإذا الموءودة سئلت ، بأي ذنب قتلت – التكوير
“আর যখন জীবন্তপ্রোথিত কন্যাসন্তানকে প্রশ্ন করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল” (সুরা তাকওয়ীর ৮-৯)
সুনান দারিমীতে বর্ণিতঃ
عن مسرة بن معبد من بني الحارث بن أبي الحرام من لخم عن الوضين أن رجلا أتى النبي صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله إنا كنا أهل جاهلية وعبادة أوثان فكنا نقتل الأولاد وكانت عندي ابنة لي فلما أجابت وكانت مسرورة بدعائي إذا دعوتها فدعوتها يوما فاتبعتني فمررت حتى أتيت بئرا من أهلي غير بعيد فأخذت بيدها فرديت بها في البئر وكان آخر عهدي بها أن تقول يا أبتاه يا أبتاه فبكى رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى وكف دمع عينيه فقال له رجل من جلساء رسول الله صلى الله عليه وسلم أحزنت رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال له كف فإنه يسأل عما أهمه ثم قال له أعد علي حديثك فأعاده فبكى حتى وكف الدمع من عينيه على لحيته ثم قال له إن الله قد وضع عن الجاهلية ما عملوا فاستأنف عملك (الدارمي 2)
এক ব্যক্তি নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে এসে আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা ছিলাম জাহিলিয়াতের যুগের মানুষ৷ আমরা মুর্তি পুজা করতাম আর হত্যা করতাম আমাদের সন্তানদেরকে৷ আমার একটি কন্যাসন্তান ছিল৷ সে যখন কথা বলতে শুরু করল, আমি ডাকলে সে খুব খুশী হত, একদিন আমি তাকে ডাকলাম, সে আমাকে অনুসরন করল৷ তাকে নিয়ে অনতি দূরে আমার পারিবারিক একটি কুপের কিনারে পৌঁছলাম৷ আমি তার হাতে ধরলাম এবং তাকে কুয়ায় ফেলে দিলাম৷ সর্বশেষ যে কথাটি সে আমার উদ্দেশ্যে বলেছিল তা ছিল “ও বাবাগো, ও বাবাগো”৷ এতদশ্রবনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব কাঁদলেন৷ অবস্থা দেখে উপস্থিত একব্যক্তি লোকটিকে বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিয়েছ৷ হুজুর তখন তাকে বললেন থামো, এই লোকটি এমন একটি বিষয় জিজ্ঞাসা করতে এসেছে যা তাকে শোকাভিভুত করেছে৷ অতঃপর হুজুর পুণরায় আগন্ত্তক লোকটিকে বললেন ঘটনাটি আবার বর্ণনা কর৷ লোকটি পূণরায় ঘটনাটি বর্ণনা করলে হুজুর খুব কাঁদলেন এবং এরশাদ করলেনঃ আল্লাহ জাহিলিয়াতের সমস্ত কিছু ক্ষমা করে দিয়েছেন, নতুন করে আমল শুরু কর৷ (দারিমী ২)
শুধু তাই নয়, কন্যাসন্তান জীবন্ত কবর দেয়াকে পূণ্যের কাজ মনে করা হত৷ যেমন ইমাম আহমদ (রাহঃ) বর্ণনা করেছেনঃ
عن سلمة بن يزيد الجعفي قال انطلقت أنا وأخي إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم قال قلنا يا رسول الله إن أمنا مليكة كانت تصل الرحم وتقري الضيف وتفعل وتفعل هلكت في الجاهلية فهل ذلك نافعها شيئا قال لا قال قلنا فإنها كانت وأدت أختا لنا في الجاهلية فهل ذلك نافعها شيئا قال الوائدة والموءودة في النار إلا أن تدرك الوائدة الإسلام فيعفو الله عنها ( أحمد 15358)
হযরত সালামাহ ইবনে ইয়াযীদ আলজু’ফী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এবং আমার ভাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মা মুলাইকা আত্মীয়তা বজায় রাখতেন, মেহমানের কদর করতেন, ইত্যাদী ইত্যাদী ভাল আমল তাঁর ছিল, তিনি জাহিলিয়াতের যুগে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁর ঐ ভাল আমলগুলী কি কাজে আসবে? হুজুর বললেন না৷ আমরা বললাম তিনি জাহিলিয়াতের যুগে আমাদের এক বোনকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন, এই কাজটা কি তাঁর কোন উপকারে আসবে? হুজুর বললেন তারা উভয় জাহান্নামী তবে যদি সে ইসলাম কবুল করে আর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন৷ (মুসনাদ ইমাম আহমদ ১৫৩৫৮)
হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাদ্বিঃ) থেকে বর্ণিতঃ
عن عمر بن الخطاب في قوله تعالى ” وإذا الموءودة سئلت ” قال جاء قيس بن عاصم إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله إني وأدت بنات ( في رواية ثمان / وفي رواية اثنتي عشرة / وفي رواية ثلاث عشرة) لي في الجاهلية قال : أعتق عن كل واحدة منهن رقبة ، قال يا رسول الله صلى الله عليه وسلم إني صاحب إبل ، قال : فانحر عن كل واحدة منهن بدنة ( ابن كثير 4/510)
ক্বায়স ইবনে আছিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জাহিলিয়্যাতে আমার কয়েকটি (একটি বর্ণনায় ৮, অন্য বর্ণনায় ১২, আরেকটি বর্ণনায় ১৩) কন্যাসন্তান জীবন্ত কবর দিয়েছি৷ হুজুর বললেন জনপ্রতি একজন গোলাম আজাদ করে দাও৷ ক্বায়স বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার উট আছে৷ হুজুর বললেন জনপ্রতি একটি উট আজাদ কের দাও৷ (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪/৫১০)
শিল্পবিপ্লব এবং নারী স্বাধীনতা বা নারী অধিকারঃ
শিল্পবিপ্লবের ফলশ্রুতিতে জীবন বাঁচাতে কল কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হয় মহিলারা৷পরিণতিতে জান-মান রক্ষা ও চাহিদা পুরণের অনাকাংখিত সংগ্রামে নারী জাতিকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, মুসলিম দেশ ও সমাজে নারী স্বাধীনতাবাদীদের জন্য তা পারফেক্ট লেসন হতে পারে৷ নারীর চাহিদা ও দূর্বলতার সুযোগে মালিকগণ পারিশ্রমিক দিয়েছে পুরুষের অর্ধেক, শ্রম আদায় করেছে কড়ায়-গন্ডায় পুরুষের সমান৷ সাথে সাথে মালিকের মন পাওয়ার জন্য নারীকে কুরবানী দিতে হয়েছে নারীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার ইজ্জত-আব্রু৷ সুতরাং ইউরুপে নারী অধিকার আন্দোলন ছিল সময়ের দাবী এতে কোন সন্দেহ নেই৷ যদি সমান পারিশ্রমিক, ইজ্জত রক্ষা, সমাজ ও সংসারে ন্যায্য অধিকারের জন্য কোন সমাজে কখনো নারীদের আন্দোলন করতে হয়, ইসলাম অবশ্যই সেই আন্দোলন সমর্থন করে৷ কিন্ত্ত নারী অধিকার আন্দোলনের নামে ইসলামের পারিবারিক বিধি-বিধান, পর্দা প্রথার বিরোধিতা এবং জরায়ুর স্বাধীনতা তথা অবাধ যৌন স্বাধীনতার আন্দোলন ইসলাম কখনো সমর্থন করেনা৷ ইসলাম নারীকে যে জীবন, ইজ্জত ও অধিকার দিয়েছে নারীকে এমন জীবন, ইজ্জত ও অধিকার দুনিয়ার কোন সমাজ ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত দিতে পারেনি৷
ইসলামে নারীর মর্যাদাঃ
ইসলাম নারীকে দিয়েছে বাঁচার অধিকারঃ
আইয়ামে জাহিলিয়্যাতে কন্যা সন্তানের, হিন্দু ধর্মে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর ছিলনা বাঁচার অধিকার৷ সর্বপ্রথম ইসলাম নারী জাতিকে দিয়েছে বাঁচার অধিকার৷ যেই হিন্দু সমাজে সাতসকালে বিধবা দর্শন কুলক্ষন বিশ্বাস করা হত, ইসলামের আন্দোলন ও প্রভাবের ফসল সেই সমাজে বিধবা ইন্দিরা গান্ধীকে পুরুষেরা প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে, সাত সকালে তাকে দেখার জন্য মানুষ গভীর রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছে৷
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সমান মর্যাদার মানুষ ঘোষনা দিয়েছেঃ
এমন এক দিন ছিল যখন বিশ্ববাসী নারীকে মানুষ বিশ্বাস করতনা৷ মানুষ বিশ্বাস করলেও বিশ্বাস করতনা নারীর আত্মা কোন মানবাত্মা৷ মানবাত্মা বিশ্বাস করলেও মনে করা হত নারীকে সৃষ্ঠি করা হয়েছে কেবলমাত্র পুরুষের ভোগের বস্ত্ত হিসাবে৷ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সমান মর্যাদার মানুষ ঘোষনা দিয়েছে৷
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ
” يأيها الناس اتقوا ربكم الذي خلقكم من نفس واحدة ” ( النساء 1)
” হে মানবজাতি! ভয় করো তোমাদের প্রতিপালককে, যিনি তোমাদেরকে একটিমাত্র আত্মা থেকে সৃষ্ঠি করেছেন৷” (সূরা নিসাঃ ১)
” يأيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثى وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا ” ( الحجرات 13)
” হে মানবজাতি! নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্ঠি করেছি এবং বিভক্ত করেছি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে পরিচয় করতে পারো৷” (সূরা হুজুরাতঃ ১৩)
নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন
” إنما النساء شقائق الرجال ” ( الترمذي ، أبو داود ، أحمد)
নারীদেরও রয়েছে অধিকার পুরুষের উপরঃ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ
ولهن مثل الذي عليهن بالمعروف
নারীদেরও রয়েছে অধিকার পুরুষের উপর যেমন পুরুষের রয়েছে নারীদের উপর৷ (সূরা বাক্বারাঃ ২২৮)
জান্নাত মায়ের পদতলেঃ
বিশ্ববাসী যখন বিশ্বাস করত নারীরা হচ্ছে অভিশাপ, জাহান্নামের গেইট, শয়তানের হাতিয়ার সমগ্র বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষনা দিলেন ” الجنة تحت أقدام الأمهات ” ” জান্নাত মায়ের পদতলে” رضا الرب في رضا الوالدين ، وسخط الرب في سخط الوالدين ” ” মাতাপিতার সন্ত্তষ্টিতে মালিকের সন্ত্তষ্টি, মাতাপিতার অসন্ত্তষ্টিতে মালিকের অসন্ত্তষ্টি৷”
নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণঃ
নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ এবং আদমকে প্ররোচিত করার জন্য হাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে বাইবেলে (জেনেসিস/আদিপুস্তকঃ চাপ্টার ৩)৷ কিন্ত্ত পবিত্র ক্বুরআনে আদম ও হাওয়া উভয়ের কথা সমানভাবে বলা হয়েছে৷ দেখুন সূরা বাক্বারা ৩৬, সূরা আ’রাফ ২২/২২৷ বরং এক জায়গায় শুধূমাত্র আদমের কথা বলা হয়েছে৷ দেখুন সূরা ত্বাহা ১২০-১২১৷
কন্যাসন্তান কুলক্ষন নয়ঃ
কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণকে কুলক্ষন, দুঃসংবাদ এবং লজ্জা ও দারিদ্রতার কারণ মনে করা হত৷ পবিত্র ক্বুরআন এই বিশ্বাসের বর্ণনা দিতে যেয়ে প্রথমেই বলেছে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ কুলক্ষন বা দুঃসংবাদ নয়৷
وإذا بشراَحَدُهُمْ بِالاُنْثى ظَلَّ وَجْهُه مُسوَدًّا وَّهُوَ كَظِيْمٌ يَتَوَارى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَ بِه اَيُمْسِكُه على هُوْنٍ اَمْ يَدُسُّه فِيْ التُّرَابِ اَلاَ سَاءَ مَا يَحْكُمُوْن النحل 58/59
“আর যখন সুসংবাদ দেয়া হয় তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের, তার মুখমন্ডল কালো হয়ে যায় আর সে হয় বড়ই ব্যথিত৷ সে মুখ লুকায় লোকদের থেকে তাকে যে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে তার গ্লানির কারণে, সে কি একে (জীবিত) রাখবে বেইজ্জতী সত্ত্বেও না তাকে পুতে রাখবে (জীবিত কবর দিবে) মাটিতে৷ তাদের ফায়সালা কতইনা নিকৃষ্ট৷” (সূরা নহল ৫৮-৫৯)
আম্মাজান হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ
একজন মহিলা তার দুটি মেয়ে সাথে নিয়ে আমার কাছে কিছু চাইল৷ আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া কিছু ছিলনা, আমি খেজুরটি তাকে দিলে সে খেজুরটিকে দুইভাগ করে দুই মেয়েকে দিয়ে দিল, সে নিজে কিছুই খেলনা৷ এরপর সে চলে গেল৷

মুহাম্মাদ আইনুল হুদা
(ইসলামিক কাউন্সিল অব্‎ আমেরিকা মদীনা মসজিদ, নিউইয়র্ক, এর একটি খোতবা)

মহিলাদের ইমামতিঃ একটি হাদীসের অপব্যাখ্যা

ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম হওয়া স্বত্তেও যদিও কোন কোন মুসলিম দেশে ভোট দিয়ে মুসলমানগণ নারীদেরকে একটি দেশ ও জাতির নেতৃত্বের শীর্ষপদে আসীন করেছেন কিন্ত্ত এটাকে কেউ আজ পর্যন্ত ইসলামাইজ অর্থাত্‎ কুরআন হাদীস দিয়ে নারী নেতৃত্বকে জায়েজ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন বলে খুব একটা শুনা যায়নি৷ অতি সাম্প্রতিক ফিতনা তথা মহিলাদের পুরুষ মহিলা সকলের নামাজের ইমামতি জায়েজ প্রমাণের জন্য ঐ দলের জৈনক লেখক একটি হাদীসের আশ্রয় নিয়েছেন এবং তাঁর সুবিধামত অনুবাদ করে মুসলিম সমাজকে নলেজ দিতে চাচ্ছেন যে, ইসলাম ধর্মে মহিলাদের পুরুষ-মহিলা সকলের নামাজের ইমামতি জায়েজ৷
হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ, ইমাম আবূ দাঊদ এবং ইমাম দারুক্বুত্বনী৷ খুব দূরে না গিয়ে হাদীসটি এই তিন কিতাবে মিলিয়ে দেখে নিলেই উনাদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য৷ দেখুন মুসনাদ ইমাম আহমদঃমুসনাদুল ক্বাবাইলঃবাবু মা জা-আ ফী ইমামাতিল মারআহ, সুনান আবূ-দাঊদঃকিতাবুস সালাহঃবাবুন ফী জিকরিল জামাআতি ওয়া আহলিহা ওয়া সিফাতিল ইমাম৷
মূল হাদীসটি পেশ করার আগে লেখকের অনুবাদটি দেখুনঃ
(Evidence for Women Leading Congregational Prayers):
“The Prophet (peace be upon him) commanded Umm Waraqah, a women who had collected the Quran, to lead the people of her area in prayer. She had her own mu’adhdhin (person who performs the call to prayers)
এই অনুবাদের মাধ্যমে প্রমাণ করা হচ্ছে নামাজে এলাকার লোকদের ইমামতি করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সাঃ) উম্মে ওয়ারাক্বাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে আদেশ করেছিলেন, সুতরাং মহিলাদের জন্য পুরুষ-মহিলা সকলের নামাজের ইমামতি জায়েজ৷
এবার মূল হাদীস ও তার অনুবাদ পেশ করা যাকঃ
عَنْ أُمِّ وَرَقَةَ بِنْتِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ الْأَنْصَارِيِّ وَكَانَتْ قَدْ جَمَعَتِ الْقُرْآنَ وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أَمَرَهَا أَنْ تَؤُمَّ أَهْلَ دَارِهَا وَكَانَ لَهَا مُؤَذِّنٌ وَكَانَتْ تَؤُمُّ أَهْلَ دَارِهَا ( حم : مسند القبائل : باب ما جاء في إمامة المرأة ، د : كتاب الصلاة 500)
উম্মে ওয়ারাক্বাহ বিনতে আব্দুল্লাহ ইবনিল হারিছ আল-আনসারী, যিনি ক্বুরআন শরীফ জমা করেছিলেন/কুরআন শরীফ পড়েছিলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরবাসীদের নামাজের ইমামতি করার জন্য উম্মে ওয়ারাক্বাহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তিনি ঘরবাসীদের নামাজের ইমামতি করতেন৷
কেউ মনে করতে পারেন “ঘরবাসী” (আহলে দার) বলতে তো পুরুষ-মহিলা সবাইকেই বুঝায় আর যেহেতু এই বর্ণনায় কাউকে বিশেষিত করা হয় নাই সুতরাং মহিলাদের জন্য পুরুষ-মহিলা সকলের নামাজের ইমামতি জায়েজ৷
আসুন এবার দারুক্বুত্বনীতে বর্ণিত একই হাদীস ও তার অনুবাদ দেখিঃ
عن أم ورقة : أن رسول الله صلى الله عليه وسلم أذن لها أن يؤذن لها ويقام وتؤم نساءها ( دار قطني : كتاب الصلاة : باب في ذكر الجماعة وأهلها وصفة الإمام)
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মে উম্মে ওয়ারাক্বাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে অনুমতি দিয়েছিলেন যে, আজান ও ইক্বামত দেয়া হবে এবং তিনি (উম্মে ওয়ারাক্বাহ) মহিলাদের নামাজের ইমামতি করবেন (ওয়া তাউম্মা নিসা-আহা)”
সুতরাং প্রমাণিত হল উম্মে ওয়ারাক্বাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে মসজিদ, আর্টগ্যালারী কিংবা কোন চার্চের কনফারেন্স হলের মত কোন জায়গায় পুরুষ-মহিলা সকলের নামাজের ইমামতি করার অনুমতি দেয়া হয় নাই বরং তাঁর নিজ ঘরে মহিলাদের নামাজের ইমামতি করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল৷
সুনান ইবনে মাজাহ শরীফ থেকে দীর্ঘ একটি হাদীসের সংশ্লিষ্ট অংশটি উল্লেখ করে আমার আলোচনা শেষ করতে চাই৷
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهم عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ .. .. .. أَلَا لَا تَؤُمَّنَّ امْرَأَةٌ رَجُلًا ( جه : كتاب إقامة الصلاة والسنة فيها : باب في فرض الجمعة )
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে দেয়া এক খুতবায় এরশাদ করেছেনঃ ……… “আলা লা তাউম্মান্না ইমরাআতুন রাজুলান” খবরদার কোন মহিলা যেন পুরুষের ইমাম না হয়৷ (ইবনে মাজাহঃকিতাব ইক্বামাতিস সালাহঃবাব ফী ফারদ্বিল জুমুআহ)

মুহাম্মাদ আইনুল হুদা
প্রকাশঃ সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা, নিউইয়র্ক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s