আল্লাহ তা’আলা সম্পর্কে কথিত আহলে হাদীসদের শিরকী আকীদা

কথিত আহলে হাদীসরা বিভিন্ন ভ্রান্ত অজুহাদ দেখিয়ে আল্লাহ তা’আলাকে সর্বত্র বিরাজমান মানে না। যারা মাধ্যমে তারা পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত অবিশ্বাস করে না বা এসবের অপব্যাখ্যা করে। এটির ভত্তিতে নিজেদেরকে সহীহ আকীদার লোক বলে দাবী করে। অথচ তাদের এই আকীদার সাথে ইহুদী আকীদার মিল। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সম্পূর্ণ  বিপরীত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান এই সহিহ আকীদাটি পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট আয়াত থেকে চয়ন করা হয়েছে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, তারা যখন পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলোতে আটকে যাবেন তখন হঠাৎ আপনাকে বলে দেবে যে, আপনাদের ইমাম আবু হানীফাও তো এরূপ আকীদা রাখতেন। তাহলে আপনাদের আকীদা আর আপনাদের ইমামের আকীদের মধ্যে মতভেদ আছে। আরো বলবে আকীদার ক্ষেত্রে আপনারা আহলে সুন্নাহ থেকে বের হয়ে মাতুরদী আকীদা মানেন আর আমলের ক্ষেত্রে মানেন ইমাম আবু হানীফাকে। এগুলো তাদের প্রতারণামূলক কথা।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর ইস্তিওয়া মানা আর তথাকথিত আহলে হাদীসদের ইস্তিওয়া মানা এক নয়। সেটা নিয়েও আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। যেহেতু তাদের দাবী হলো কোরআন হাদীস মানে। তারা কোরআন হাদীসের ভিত্তিতে দুনিয়ার মুসলমানকে এক করার চেষ্টা করছেন। তাদের এসব প্রতারণামূল কথাগুলো আপনি সহজে অনুমান করতে পারবেন আমাদের এই কলামগুলো পড়লে। কোরআন হাদীস মানলে এবং কোরআন হাদীস ছাড়া কিছুই না মানলে তারা কোন মুখে আকীদার বেলায় এসে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কথা বলে থাকেন? আমলের বেলায় তাঁকে মুশরিক পর্যন্ত বলতে বাকী রাখেন না। কিন্তু আকীদার ব্যাপারে এলে তাদের সবচেয়ে বড় দলীল হলো ইমাম আবু হানফা। তাদের দাবী হলো তারা কোরআন হাদীসের ভিত্তিতে মুসলমানদের এক করবেন। অথচ এই লেখা পড়ার পর আপনি বুঝতে পারবেন স্বয়ং কয়েকটা আকীদা নিয়েও তাদের মধ্যে কত হাজার মতবিরোধ। তাহলে এর দ্বারা কি তারা এক করবেন নাকি যারা এপর্যন্ত এক আছেন তাদের ঐক্য ভেঙ্গে তছনছ করবেন?

বিষয়গুলো ভাল করে পড়ে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

 আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান :-

১-

ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

অতঃপর তিনি আরশে সমাসিন হন {সূরা হাদীদ-৩}

২-

قوله تعالى {وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ}

আর যখন আমার বান্দা আমাকে ডাকে, তখন নিশ্চয় আমি তার পাশেই। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই যখন সে ডাকে। {সূরা বাকারা-১৮৬}
৩-

قوله تعالى {وَنَحنُ أَقرَبُ إِلَيهِ مِن حَبلِ الوَرِيدِ} [ق 16]

আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬}
৪-
فَلَوْلا إِذَا بَلَغَتِ الْحُلْقُومَ (83) وَأَنْتُمْ حِينَئِذٍ تَنْظُرُونَ (84) وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لا تُبْصِرُونَ (85)

অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা {সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫}

৫-

{ وَللَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ } [البقرة-115]

পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত {সূরা বাকারা-১১৫}
৬-
قوله تعالى { وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنتُمْ } [ الحديد – 4 ]

তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪}

৭-

وقال تعالى عن نبيه : ( إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا (التوبة من الآية40

যখন তিনি তার সাথীকে বললেন-ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন {সূরা হাদীদ-৪০}
৮-

قوله تعالى مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلاثَةٍ إِلاَّ هُوَ رَابِعُهُمْ وَلا خَمْسَةٍ إِلاَّ هُوَ سَادِسُهُمْ وَلا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلا أَكْثَرَ إِلاَّ هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ( المجادلة – 7 )

কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন {সূরা মুজাদালা-৭}
৯-

وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ

আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত {সূরা বাকারা-২৫৫}

আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান হলে আকাশের দিকে কেন হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়?

আদবের জন্য। যদিও আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি ডান দিকেও আছেন, বাম দিকেও আছেন, উপরেও আছেন, নিচেও আছেন। সামনেও আছেন। বাম দিকেও আছেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার শান হল উঁচু, তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়।

যেমন কোন ক্লাশরুমে যদি লাউডস্পীকার ফিট করা হয়। চারিদিক থেকে সেই স্পীকার থেকে শিক্ষকের আওয়াজ আসে। তবুও যদি কোন ছাত্র শিক্ষকের দিকে মুখ না করে অন্যত্র মুখ করে কথা শুনে তাহলে শিক্ষক তাকে ধমক দিবেন। কারণ এটা আদবের খেলাফ। এই জন্য নয় যে, অন্য দিক থেকে আওয়াজ শুনা যায় না। তেমনি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান থাকা সত্বেও উপরের দিকে মুখ করে দুআ করা হয় আল্লাহ তায়ালা উুঁচু, সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত তুলে দুআ করা হয়।

জিবরাঈল উপর থেকে নিচে নেমে আসেন মানে কি?

এর মানে হল-যেমন পুলিশ এসে কোন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কারণ বলে যে, উপরের নির্দেশ। এর মানে কি পুলিশ অফিসার উপরে থাকে? না সম্মান ও ক্ষমতার দিক থেকে যিনি উপরে তার নির্দেশ তাই বলা হয় উপরের নির্দেশ? তেমনি আল্লাহ তায়ালা ফরমান নিয়ে যখন জিবরাঈল আসেন একে যদি বলা হয় উপর থেকে এসেছেন, এর মানেও সম্মানসূচক ও পরাক্রমশালীর কাছ থেকে এসেছেন। তাই বলা হয় উপর থেকে এসেছেন। এই জন্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালা কেবল আরশেই থাকেন।

আল্লাহ তায়ালা কি সকল নোংরা স্থানেও আছেন? নাউজুবিল্লাহ

এই উদ্ভট যুক্তি যারা দেয় সেই আহমকদের জিজ্ঞেস করুন। তার কলবে কি দু’একটি কুরাআনের আয়াত কি সংরক্ষিত আছে? যদি বলে আছে। তাহলে বলুন তার মানে সীনায় কুরআনে কারীম বিদ্যমান আছে। কারণ সংরক্ষিত সেই বস্তুই থাকে, যেটা বিদ্যমান থাকে, অবিদ্যমান বস্তু সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তো সীনায় যদি কুরআন বিদ্যমান থাকে, সেটা নিয়ে টয়লেটে যাওয়া কিভাবে জায়েজ? কুরআন নিয়েতো টয়লেটে যাওয়া জায়েজ নয়। তখন ওদের আকল থাকলে বলবে-কুরআন বিদ্যমান, কিন্তু দেহ থেকে পবিত্র কুরআন। তেমনি আমরা বলি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তিনি দেহ থেকে পবিত্র। সেই হিসেবে সর্বত্র বিরাজমান।

আল্লাহ তায়ালা দৌড়ান সালাফীদের এই ভ্রান্ত মতবাদ :-

পূর্বের আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছি যে, সালাফীদের আকিদা হলো আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন। এরা আল্লাহর জন্য উঠা, নামা, দৌড়ানো, স্থানান্তর হওয়া সব কিছুই সাব্যস্ত করে। এ পর্বে আল্লাহর দৌড়ানো সম্পর্কে আলোচনা করবো।

হাদীসে রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমার নিকট যে হেটে হাসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যায়। ” এই হাদীস থেকে তারা প্রমাণ দিয়েছে যে আল্লাহ পাক দৌড়ান। অথচ সহীহ আকিদার একজন শিশুও বুঝবে যে, এখানে দৌড়ানো দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য ও কবুল করা উদ্দেশ্য। যাই হোক, কতো বড় আশ্চর্যের বিষয়, এজাতীয় ভ্রান্ত বিশ্বাস রাখার পরেও এরা সহীহ আকিদার দাবী করে?

সউদি মুফতী বোর্ডের ফতোয়া:
*********************

সউদি মুফতী বোর্ডে প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহ তায়ালার কী দৌড়ানোর গুণ রয়েছে। তারা উত্তর দেয়, হ্যা আল্লাহর জন্য দৌড়ানোর গুণ রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা দৌড়ান। এ ফতোয়ায় সাক্ষর করেছে, ইবনে বাজ, আব্দুর রাজ্জাক আফিফী, আব্দুল্লাহ ইবনে গাদইয়ান, আব্দুল্লাহ বিন কুউদ।

ফতোয়া নং-৬৯৩২
[খ.৩, পৃ.১৪২]

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:
*****************
ইবনে উসাইমিন বলেন,

“আল্লাহ তায়ালার জন্য দৌড়ানোর গুণ প্রমাণিত। …….সুতরাং এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক”

[মাজমুউ ফাতাওয়া ও রসাইল, খ.১, পৃ.১৮২]

বিরোধী বক্তব্য:
**********

ইবনে জিবরীনের বক্তব্য:

ইবনে জিবরীন বলেন, ” দৌড়ানো আল্লাহর গুণ নয়। বরং দৌড়ানো দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দার প্রয়োজন পূরণে বিলম্ব না করা।”
বিস্তারিত:
http://audio.islamweb.net/audio/Fulltxt.php?audioid=149331

সালেহ আল-ফাউজানের বক্তব্য:

শায়খ সালেহ আল -ফাউজানের মতে, দৌড়ানো আল্লাহর কোন গুণ নয়।

বিস্তারিত:
http://www.alathary.net/vb2/showthread.php?12736-%C7%E1%E5%D1%E6%E1%C9-%E1%ED%D3%CA-%C8%D5%DD%C9-%E1%E1%E5-%C7%E1%DA%E1%C7%E3%C9-%D5%C7%E1%CD-%C7%E1%DD%E6%D2%C7%E4&s=9354b41efc504cacfee627988b532970

আলবানী সাহেবের আশ্চর্যজনক উত্তর:
*************************
আলবানী সাহেব দৌড়ানোর বিষয়ে আশ্চর্যজনক স্ববিরোধীতার আশ্রয় নিয়েছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,
” আল্লাহর তায়ালার অবতরণ ও আসার মতো দৌড়ানো আল্লাহর একটি গুণ”
[মাউসুয়াতুল আলবানী, খ.১, পৃ.২৫৮]

আল্লাহর আকার সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদা :-

এটি প্রমাণের ধারনাটি মূলত: ইহুদী ধর্ম থেকে এসেছে। ইহুদীরা আল্লাহ তায়ালাকে মানুষের আকৃতিতে বিশ্বাস করে। মানুষের প্রায় সব গুণাগুণ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করে থাকে। দেহবাদী আকিদার ক্ষেত্রে ইহুদীদের এসব জঘন্য আকিদা কাররামিয়া ও শিয়াদের মাধ্যমে ইসলামী আকিদায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে কাররামিয়াদের অনুসারী তথাকথিত সালাফীরাও এসব বাতিল আকিদা লালন করে এবং সমাজে দেহবাদী আকিদা প্রচার করতে থাকে।

আল্লাহর আকার সম্পর্কে ইহুদী আকিদা:

ওল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব জেনেসিসে রয়েছে,
And God said, Let us make man in our image, after our likeness: and let them have dominion over the fish of the sea, and over the fowl of the air, and over the cattle, and over all the earth, and over every creeping thing that creepeth upon the earth.

“প্রভূ বললেন, আমি আমার আকৃতিতে, আমার সাদৃশ্যে মানুষ সৃষ্টি করবো, যারা মাছ, সমুদ্র…..জয় করবে”

[বুক অব জেনেসিস, পরিচ্ছেদ-১, শ্লোক-২৬]

একই বইয়ের ২৭ নং শ্লোকে রয়েছে,

So God created man in his own image, in the image of God created he him; male and female created he them.

অর্থাৎ সুতরাং প্রভূ মানুষকে নিজের আকৃতিতে সৃষ্টি করলেন; প্রভূর আকৃতিতে মানুষকে সৃষ্টি করলেন। আর তাদেরকে সৃষ্টি করলেন পুরুষ ও মহিলা হিসেবে।
[বুক অব জেনেসিস, পরিচ্ছেদ-১, শ্রোক, ২৭]

অনলাইন ভার্সন:
http://studybible.info/KJV/Genesis%201:27

ইহুদীদের কিতাব থেকে আল্লাহর আকার প্রমাণ:

তথাকথিত সালাফীরা যে ইহুদীদের কিতাব থেকে তাদের এই আকিদাটি নিয়েছে, এটি আমাদের মৌখিক কোন দাবী নয়। বরং তাদের কিতাবেই বিষয়গুলো স্পষ্ট রয়েছে।

সালাফীদের বক্তব্য:

সালাফীদের অন্যতম শায়খ হলেন আব্দুল আজিজ রাজেহী ও শায়খ সালেহ ইবনে আব্দুল আজিজ আলুশ শায়খ। তাদের মতে আল্লাহ তায়ালার সুরত বা আকৃতি রয়েছে। এই সুরত হলো আল্লাহর শিকল বা গঠন ও অবকাঠামো। আল্লাহ তায়ালার এই গঠন ও অবকাঠামোর মাধ্যমে তিনি অন্যদের থেকে পৃথক হয়ে থাকেন। আল্লাহ তায়ালার বিদ্যমান হওয়ার জন্য এমন একটি সুরত বা গঠন প্রয়োজন, যার মাধ্যমে তিনি অস্তিত্বশীল হয়ে থাকেন।

[বয়ানু তা’লবিসিল জাহমিয়া, পৃ.৪৫৫]

সৌদি মুফতী বোর্ডের ফতোয়া:

সালাফীরা শুধু আল্লাহ তায়ালার আকার আছে, একথা বলেই ক্ষ্যান্ত হয় না। বরং তাদের মতে আল্লাহর আকার হলো মানুষের মতো। এর স্বপক্ষে তারা দলিল দিয়ে থাকে, আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এই হাদীস দ্বারা। তাদের মতে আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে আল্লাহর নিজের আকৃতি অনুযায়ী সৃষ্টি করেছেন। বরং তাদের নিকট আল্লাহর আকার ও মানুষের আকারের মাঝে একটি মা’নায়ে কুল্লী বা সামষ্টিক অর্থ রয়েছে। অর্থাৎ উভয়ের আকৃতি একই রকম। তবে এই মা’নায়ে কুল্লী বা সামষ্টিক অর্থ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আকৃতি মানুষের সাথে সাদৃশ্য রাখে না। অর্থাৎ আল্লাহর একটি গঠন বা আকৃতি রয়েছে যেটা মানুষের মতো। কিন্তু এই গঠন হুবহু মানুষের আকৃতির সাইজ, রং বা পরিমাপ এক নয়। তাদের নিকট আল্লাহর আকার ও মানুষের আকারের মাঝে গুণগত পার্থক্য বিদ্যমান কিন্তু সমষ্টিগতভাবে উভয় আকৃতি একই রকম। এই কথাটি সৌদি মুফতী বোর্ডের পক্ষ থেকে ফতোয়া দেয়া হয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ) ফতোয়া নং-২৩৩১

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:

“ইবনে উসাইমিনের মতে আল্লাহর গুণের সাথে মানুষের সাদৃশ্য রয়েছে। তার মতে আল্লাহর হাত ও মানুষের হাতের মাঝে সাদৃশ্য রয়েছে। আল্লাহর চোখ ও মানুষের চোখের মাঝে সাদৃশ্য রয়েছে। আল্লাহর চেহারার সাথে মানুষের চেহারার সাদৃশ্য রয়েছে। তবে আল্লাহর হাত হুবহু মানুষের হাতের মতো নয়।” অর্থাৎ ইবনে উসাইমিনের মতে আল্লাহর সাথে মানুষের সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু আল্লাহর হাত হুবহু মানুষের হাতের মতো নয়।
এই হুবহু জিনিসটা বোঝার জন্য ছোট্র একটি উদাহরণ দিচ্ছি,
আমরা জানি ত্রিভুজ কয়েক প্রকার। এর মধ্যে এক প্রকার ত্রিভুজ হলো, সমবাহু ত্রিভুজ। অর্থাৎ একটা ত্রিভুজকে অপর আরেকটি ত্রিভুজের কোণ ও বাহুর দিক থেকে সমান। একটাকে আরেকটা দিয়ে রিপ্লেস করা যায়। কিন্তু সমবাহু ত্রিভুজ ছাড়া অন্যান্ সব ত্রিভুজই একটা আরেকটার সাথে সাদৃশ্য রাখে। কিন্তু এগুলো তো একটা আরেকটা হুবহু একই রকম নয়।
সারকথা হলো, ইবনে উসাইমিনের মতো আল্লাহ তায়ালা ও মানুষের মাঝে সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু আল্লাহ ও মানুষ হুবহু এক নয়। আল্রাহর চেহারার সাথে মানুষের চেহারার সাদৃশ্য রয়েছে, কিন্তু আল্রাহ ও মানুষের চেহারা হুবহু এক নয়।

সালাফীদের শায়খ হামুদ বিন আব্দুল্লাহ তুয়াইজারী একটি কিতাব লিখেছে। কিতাবের নাম, আকিদাতু আহলিল ইমান ফি খালকি আদম আলা সুরতির রহমান ( মু’মিনের বিশ্বাস: আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে আল্লাহর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন)। সৌদি শায়খ ইবনে বাজ এই কিতাবের উপর একটি ভূমিকা লেখে দিয়েছে। কিতাবের ভূমিকায় ইবনে বাজ লিখেছে, আল্লাহ তায়ালার নিজ আকৃতিতে আদম আ. কে সৃষ্টি করেছেন এটি সালাফে সালেহীনের আকিদা। তিনি অন্যান্য আলেমদেরকে এটি বিশ্বাস করার আহ্বান জানিয়েছেন। হামুদ বিন আব্দুল্লাহ আত-তুয়াইজারী এ কিতাবটি একটি জঘন্য কিতাব। তার বক্তব্যগুলো স্পষ্ট মুজাসসিমাদের বক্তব্য। সে মূলত: দেহবাদী আকিদা প্রমাণের জন্য এই বই লিখেছে। এই তুয়াইজারী আল্লাহর আকৃতি প্রমাণের জন্য তাউরাত থেকে প্রমাণ দিয়েছে যে, আল্লাহর আকৃতি রয়েছে।

কথিত সালাফী আলেমদের বিরোধীতা:

সালাফী আলেমদের মাঝে শায়খ আলবানী আল্লাহর আকার বা আকৃতি অস্বীকার করেছেন। এছাড়াও ইবনে খোযাইমা তার কিতাবুত তাউহীদে আল্লাহর আকৃতি অস্বীকার করেছেন। আলবানী সাহেবের ছাত্র নাসীব রিফায়ীও আল্লাহর আকৃতি অস্বীকার করেছেন।

আলবানী সাহেবের বক্তব্য:
শায়খ আলবানী ইবনে বাজের ভূমিকা সমৃদ্ধ কিতাব “আকিদাতু আহলিল ইমান ফি খালকি আদম আলা সুরতির রহমান” ( মু’মিনের বিশ্বাস: আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে আল্লাহর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন) কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি তুয়াইজারীর লেখা এই কিতাব সম্পর্কে সহীহু আদাবিল মুফরাদে লিখেছেন,
” তুয়াইজারী “আকিদাতু আহলিল ইমান ফি খালকি আদম আলা সুরতির রহমান” ( মু’মিনের বিশ্বাস: আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে আল্লাহর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন) এই কিতাব লিখে সালাফী আকিদা ও রাসূল স. এর হাদীসের প্রতি নিকৃষ্ট কাজ করেছে।”

তুয়াইজারী সম্পর্কে শায়খ আলবানী বলেন, সে হাদীস নিয়ে কথা বলার যোগ্য নয় এবং আলেমদের বক্তব্য বিকৃত করে থাকে। অর্ধেক বক্তব্য উল্লেখ করে এবং অর্ধেক ছেড়ে দেয়।
[সহীহু আদাবিল মুফরাদ, ৩৭৫ পৃ.]

এছাড়াও দেখুন, ফাতাওয়াশ শায়খ আলবানী ফিল মদিনাতি ওয়াল ইমারত, পৃ,১৬-১৭। মুখতাসারু সহীহিলি বোখারী, খ.২, পৃ.১৭৮।

আলবানী সাহেব আল্লাহর আকৃতি অস্বীকার করায় অন্যান্য সালাফী শায়খরা তার উপর বেশ চটেছেন। সালাফীদের দু’জন শায়খ স্পষ্ট আলবানীর সমালোচনা করেছে। এরা হলেন, শায়খ আব্দুর রাজ্জাক আফিফী ও শায়খ আব্দুল্লাহ দাবিশ।

আব্দুর রাজ্জাক আফিফীর বক্তব্য:

“আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এটিই সঠিক। যদিও আলবানী ও নাসীব রিফায়ী এর বিরোধীতা করেছে”

[ফাতাওয়া ও রসাইল, পৃ.১৬০,, খ.১]

আব্দুল্লাহ দাবিশ এর বক্তব্য:
****************

শায়খ আব্দুল্লাহ দাবিশ আলবানী সম্পর্কে লিখেছে,
” আলবানীর মতটি আমি দেখেছি। এটি আহলে সুন্নতের বক্তব্যের বিরোধী এবং পথভ্রষ্ট জাহমিয়াদের বক্তব্যের অনুরুপ”
[দিফাউ আহলিস সুন্নাহ, পৃ.৫]

যারা আল্লাহর আকার সাব্যস্ত করে তাদের সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী রহ. এর বক্তব্য:

যারা আল্লাহর আকার সাব্যস্ত করেছে এবং আল্লাহর আকৃতিতে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে এধরনের বিশ্বাস রাখে, ইমাম কুরতুবী তাদেরকে মুশাববিহা বলেছেন। ইমাম কুরতুবী এধরনের আকিদা পোষণকারীদেরকে কাফের পর্যন্ত বলেছেন।

[আল-মুফহিম, খ.৬, পৃ.৫৯৮]

আল্লাহর সীমা আছে বলে সালাফীদের ভ্রান্ত মতবাদ :-

ইবনে বাজের বক্তব্য :-
******************
“ইবনে বাজের মতে আল্লাহর সীমা রয়েছে। তবে আল্লাহর সীমা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না।”
আমরা কুরআন ও হাদীসের কোথাও এধরনের কোথা পাইনি। আল্লাহ পাক ভালো জানেন, ইবনে বাজ এধরনের কথা কোথায় পেলেন। সীমা থাকা সম্পূর্ণ সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। এটি আল্লাহর জন্য সাব্যস্তের ব্যাপারে কেন এতো মরিয়া, আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। ত্বহাবী শরীফে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা সীমা-পরিসীমা থেকে পবিত্র। এই স্পষ্ট বক্তব্যের বিকৃত ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন,

ইবনে বাজ তার মাজমুউ ফাতাওয়া তে বলেছেন,
” আল্লাহর সীমা রয়েছে, তবে সেটা তিনিই জানেন, বান্দা জানেন না”

[মাজমুউ ফাতাওয়া, খ.২, পৃ.৭৮]

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:
*****************
ইবনে উসাইমিনের মতে হদ বা সীমা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি থেকে পৃথক। সৃষ্টি ও আল্লাহর মাঝে পার্থক্যের যে সীমা রয়েছে, সেটি আল্লাহর জন্য সত্য। অর্থাৎ ইবনে উসাইমিনের নিকট হদ বা সীমার অর্থ হলো, সৃষ্টি ও আল্লাহর মাঝে পার্থক্যের সীমা।

[শরহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়া, খ.১,পৃ.৩৭৯]

ইবনে জিবরীনের বক্তব্য:
********************
সালাফী শায়খ ইবনে জিবরীনের মতে আল্লাহ ও সৃষ্টির মাঝে একটি সীমা রয়েছে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি ও আল্লাহর মাঝে পার্থক্য করা হয়।

[আর-রিয়াজুন নাদিয়্যা, খ.২, পৃ.১৫]

সালেহ আল-ফাউজানের বক্তব্য:
********************

সালেহ আল-ফাউজানের মতে হদ বা সীমার অর্থ হলো, বাস্তবতা। অর্থাৎ আল্লাহর হদ আছে এর অর্থ হলো, আল্লাহ প্রকৃত পক্ষেই আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন।
সালেহ আল-ফাউজানের মতে, হদ দ্বারা কোন সীমা উদ্দেশ্য নয়।

[শরহু লুময়াতিল ই’তেকাদ, পৃ.২৯৭]

আলবানী সাহেবের বক্তব্য:
*****************

হাম্বলী মাজহাবের একজন আলেম মাহমুদ ইবনে আবিল কাসিম দাশতী একটা কিতাব লিখেছেন। তার কিতাবের নামটা আশ্চর্যজনক। ইসবাতুল হদ্দি লিল্লাহি তায়ালা ও বিয়ান্নাহু কাইদুন ও জালিসুন আলাল আরশ ( আল্লাহর সীমার প্রমাণ এবং আল্লাহ তায়ালা যে আরশে বসে আছেন, এর প্রমাণ)। সৌদি আরবের কয়েকজন শেইখ আবার এই নিকৃষ্ট কিতাবটিও তাদের আকিদার কিতাব হিসেবে ছেপেছে।

আলবানী সাহেব দাশতীর এই কিতাব সম্পর্কে বলেন,
” কুরআন ও সুন্নাহে (আল্লাহর সীমা ও বসার) কোন প্রমাণ নেই”
[মাখতুতাতু দারিল কুতুবিজ জাহিরিয়া, পৃ.৩৭৬]

আল্লাহর ছায়া সম্পর্কে সালাফীদের ভ্রান্ত আকিদা :-

আল্লাহ তায়ালার ছায়া (নাউযুবিল্লাহ) :

ইবনে বাজের বক্তব্য:
**************
সালাফীদের বিখ্যাত শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে বাজের মতে আল্লাহ তায়ালার ছায়া রয়েছে। তিনি তার কিতাবে স্পষ্ট বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার ছায়া রয়েছে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহর এই ছায়ার নীচে সাত শ্রেণির মানুষকে আশ্রয় দিবেন।

ইবনে বাজ তার মাজমুউ ফাতাওয়া ও মাকালাতে লিখেছেন,

প্রশ্ন: হাদীসে রয়েছে, যে দিন কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তার নিজ ছায়ার তলে স্থান দিবেন। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে এই গুণ সাব্যস্ত করা যাবে যে, আল্লাহর ছায়া রয়েছে?
উত্তর: হ্যা। যেমনটি হাদীসে রয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তার আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন। কিন্তু বোখারী মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, তিনি তার নিজ ছায়ায় স্থান দিবেন। সুতরাং ” আল্লাহ তায়ালার শান অনুযায়ী আল্লাহর ছায়া রয়েছে। ”
[মাজমুউ ফাতাওয়া ও মাকালাত, খ.২৮, পৃ.৪০২]

 সালাফীদের মধ্যে আকিদাগত স্ববিরোধ :-

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:

ইবনে উসাইমিনের মতে, এটি আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব ছায়া নয়। বরং আল্লাহর সৃষ্ট ছায়া। তিনি আকিদাতুল ওয়াসিতিয়া এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন,
” সে দিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্ট ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। কেউ কেউ ধারণা রাখে যে, এটি আল্লাহর নিজস্ব ছায়া। নিশ্চয় এটি বাতিল ও ভ্রান্ত। কেননা, এর দ্বারা সূর্য আল্লাহর উপরে হওয়া আবশ্যক হয়।”
[শরহু আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, খ.২, পৃ.১৩৬]

ইবনে উসাইমিন রিয়াজুস সালেহীন এর একটি ব্যাখ্যা লিখেছেন। রিয়াজুস সালেহীনের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন,

“ছায়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এমন ছায়া যা আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন সৃষ্টি করবেন। তার প্রিয় বান্দাদের যাকে ইচ্ছা এর নীচে ছায়া দান করবেন। এর দ্বারা আল্লাহর নিজের ছায়া উদ্দেশ্য নয়। ……যে ছায়া দ্বারা আল্লাহর নিজের ছায়া আছে বলে বিশ্বাস রাখে সে গাধার চেয়েও নির্বোধ”

[শরহু রিয়াজিস সালেহীন, খ.৩, পৃ.৩৪৭]

শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে নাসির আল-বাররাক এর বক্তব্য:

সালাফী শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে নাসের আল-বাররাক বলেন,
” ছায়া হলো আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহর দিকে ছায়ার সম্পৃক্ততা মুলত: ছায়ার মর্যাদা ও আল্লাহর মালিকানাধীন বোঝানো উদ্দেশ্য। এই হাদীস থেকে বলা যাবে না যে, আল্লাহর নিজের ছায়া রয়েছে”
[ফাতহুল বারীর টীকা, ২য় খন্ড, পৃ.৫০৩]

শায়খ আলবানীর বক্তব্য:

সালাফীদের শায়খ নাসীরুদ্দিন আলবানী কিয়ামতের দিনের ছায়া সম্পর্কে বলেন, আল্লাহর ছায়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর মালিকানাধীন ছায়া। যে ছায়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। এখানে আল্লাহর নিজের ছায়া উদ্দেশ্য নয়। তিনি লিখেছেন,
” আল্লাহর দিকে ছায়ার সম্পৃক্ততা আল্লাহর মালিকানা বোঝানোর জন্য। … এ ছায়া দ্বারা মুলত: আরশের ছায়া উদ্দেশ্য”

[মাউসুয়াতুল আলবানী, খ.১, পৃ.৩৬৬]

ইস্তাওয়া শব্দের ভুল ব্যাখ্যায় সালাফীদের ভ্রান্ত আকিদা ও আকিদাগত মতবিরোধ :

ইস্তাওয়া শব্দের ভুল অর্থ ও সালাফীদের ভ্রান্ত মতবাদ :

ইবনে উসাইমিনের বক্তব্য:

সালাফীদের ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-আকিদাতুল ওযাসিতিয়্যা নামে একটি আকিদার কিতাব লিখেছেন। আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যা ব্যাখ্যা লিখেছেন ইবনে উসাইমিন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, শরহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা। কিতাবটি দারু ইবনিল জাওযী প্রকাশ করেছে। ইবনে উসাইমিন এ কিতাবে লিখেছে,

” ইস্তাওয়ার অর্থ হলো, উচু হওয়া ও স্থির হওয়া”

[শরহুল আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, খ.১, পৃ.৩৫৭, দারু ইবনিল জাওযী]

ইবনে জিবরীনের বক্তব্য:

সালাফী শায়খ ইবনে জিবরীন আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যার একটি ব্যাখ্যা লিখেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, আত-তালিকাতুজ জাকিয়্যা। তিনি এ কিতাবে লিখেছেন,

” অধিকাংশ আহলে সুন্নতের মতে “ইস্তাওয়া” এর অর্থ হলো স্থির হওয়া (এটা জঘন্যতম মিথ্যা কথা)”

[আত-তা’লিকাতুজ জাকিয়্যা, পৃ.২১১-২১২, খ.১]

সালেহ আল-ফাউজানের বক্তব্য:

সালাফী শায়খ সালেহ আল-ফাউজান তার শরহু লুমআতিল ই’তেকাদ কিতাবে লিখেছে,
” সালাফে সালেহীন ইস্তাওয়ার একটি ব্যাখ্যা করেছেন ” স্থির হওয়া”

[শরহু লুময়াতিল ই’তেকাদ, পৃ.৯১]

সালাফী শায়খদের স্ববিরোধীতা:

পূর্বে যাকে আহলে সুন্নতের আকিদা, সালাফে সালেহীনের আকিদা হিসেবে উল্লেখ করা হলো, সে আকিদা সম্পর্কে সালাফী শায়খরা বলছেন, এসব আকিদা থেকে আমরা সম্পূর্ণ মুক্ত। এধরনের দ্বিমুখী কথা সত্যিই বিস্ময়কর। সালাফীদের বিখ্যাত শায়খ, সউদি মুফতী বোর্ডের সদস্য ড. বকর আবু যায়েদ এই আকিদাকে সালাফীদের সম্পর্কে মিথ্যাচার বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়ার মতে আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন। এমনকি তার মতে আল্লাহ তায়ালা মাছির পিঠেও বসতে পারেন। ইবনে তাইমিয়া যে আল্লাহর স্থির হওযার কথা বলেছেন, ড. বকর আবু যায়েদ এটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তার মতে যারা ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে এধরনের কথা বলে তারা ইবনে তাইমিয়ার উপর মিথ্যাচার করে। কারণ ইবনে তাইমিয়া আল্লাহর স্থির হওয়ার আকিদা রাখতো না। ড. বকর আবু যায়েদ লিখছেন,

” কিছু বিভ্রান্ত লোক ইবনে তাইমিয়া সম্পর্কে বলেছে, তিনি আল্লাহর আরশের উপর স্থির হওয়ার কথা বলেছেন। এটি ইবনে তাইমিয়ার উপর মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়”
[মু’জামুল মানাহিল লফজিয়্যা, পৃ.৯১]

আলবানীর বক্তব্য:

সালাফীদের শায়খ নাসীরুদ্দিন আলবানী লিখেছে,
” আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে স্থির হওয়ার কথা বলা বৈধ নয়। কারণ এটি মানুষের বৈশিষ্ট্য বা গুণ”
[মাওসুয়াতুল আলবানী, পৃ.৩৪]

আল্লাহ আরশের উপর বসে আছেন বলে সালাফীদের ভ্রান্ত আকিদা :-

ইস্তেওয়া শব্দের সঠিক অর্থ জেনে নিন (পর্ব-১-৩)

http://goo.gl/WuuBru

http://goo.gl/jJEAvP

http://goo.gl/5Eotmx

আল্লাহ সম্পর্কিত আকিদা : আল্লাহ তায়ালা স্থান ও দিক থেকে পবিত্র :-

http://goo.gl/Dv8hrt

এই পর্বে ইহুদী খৃষ্টান ধর্মের আকিদার সাথে মিল রেখে সালাফী, আহলে হাদিস দের আকিদা সেটা প্রমান করব :-

ইসলাম ধর্মে তাদের বিপরীত করার আদেশ রয়েছে কিন্তু সালাফীরা তাদের আকিদাহকে ধরেছেরেছে :

বলে দিনঃ অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়, যদিও অপবিত্রের প্রাচুর্য তোমাকে বিস্মিত করে। অতএব, হে বুদ্ধিমানগণ, আল্লাহকে ভয় কর-যাতে তোমরা মুক্তি পাও। ৫:৯৯-১০০”

তোমরা অগ্নিপূজকদের বিপরীত কর”। [(মুসলিম ২,৫১০]

“তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের স্বভাবের অনুসরণ করবে, প্রতি পদে পদে, এমনকি তারা যদি কোন ধাব(গুইসাপের গর্ত) এও প্রবেশ করে তবে তোমরাও তাই করবে।” আমরা (সাহাবাগণ) জানতে চাইলাম, “হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি কি ইহুদী ও নাসারাদের অনুকরণের কথা বলছেন?” তিনি বললেন, “নয়তো কারা?” (বুখারী, মুসলিম)

রসূলুল্লাহ ( সঃ) বলেন,
” যে ব্যক্তি যে জাতির সামঞ্জস্যতা অবলম্বন করবে সে কিয়ামতের দিন তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। ” [ আবূ দাউদ ৪/৪০৩১ মুসনাদে আহমদ ২/৫০]

___________________

 আরশে বসার ব্যাপারে ইহুদী আকিদা:

অল্ড টেস্টামেন্টের ফাস্ট কিং বইয়ে রয়েছে,
And Micaiah said, “Therefore hear the word of the LORD: I saw the LORD sitting on his throne, and all the host of heaven standing beside him on his right hand and on his left;
অর্থাৎ সুতরাং প্রভূর বাণী শোনো। আমি প্রভূকে তার কুরসীর উপর বসা দেখলাম এবং আসমানের সকল সৈন্য তার ডান ও বাম পাশে দাড়ানো ছিলো।
[ অল্ড টেস্টামেন্ট, দি বুক অফ ফাস্ট কিং, পরিচ্ছেদ ২২, শ্লোক, ১৯]

অনলাইন ভার্সন:
http://biblehub.com/1_kings/22-19.htm

অল্ড টেস্টামেন্টের দি বুক অব সামে রয়েছে,
you have sat on the throne, giving righteous judgment.

অর্থ: আপনি ন্যায়-পরায়ণ হিসেবে কুরসীতে উপবেশন করেছেন। [বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ,৯, শ্লোক, ৪।]

অল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব সামে রয়েছে,
God reigns over the nations; God sits on his holy throne.
অর্থ: প্রভূ জাতিসমূহের উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন, প্রভূ তার পবিত্র কুরসীতে বসলেন।
[ বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ, ৪৭, শ্লোক, ৮]

অনলাইন ভার্সন:
http://biblehub.com/psalms/47-8.htm

বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে রয়েছে,
and crying out with a loud voice, “Salvation belongs to our God who sits on the throne

অর্থাৎ উচু স্বরে চিৎকার করে কেদে উঠলো এবং বলল, আমাদের প্রভূর জন্য মুক্তি, যিনি তার কুরসীতে বসে আছেন।

[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৭, শ্লোক, ১০]

অনলাইন ভার্সন:
http://biblehub.com/revelation/7-10.htm

একই পরিচ্ছেদের ১৫ নং শ্লোকে রয়েছে,

“That is why they stand in front of God’s throne and serve him day and night in his Temple. And he who sits on the throne will give them shelter.

অথাৎ আরশে উপবেশনকারী তাদেরকে আশ্রয় দিবে।

[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৭, শ্লোক, ১৫]

অনলাইন ভার্সন,
http://biblehub.com/revelation/7-15.htm

একই বইয়ের ৪ নং পরিচ্ছেদে রয়েছে,
And when those beasts give glory and honour and thanks to him that sat on the throne, who liveth for ever and ever
অর্থাৎ তারা সেই সত্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলো যিনি আরশে বসে আছেন, যিনি চিরণ্জীব।
[The Book of Revelation, পরিচ্ছেদ, ৪, শ্লোক, ৯]
http://biblehub.com/revelation/4-9.htm

কাররামিয়াদের আকিদা:

১. মুহাম্মাদ ইবনে কাররামের একটি মৌলিক ভ্রান্ত আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা দেহ ও শরীর বিশিষ্ট। তার দেহের একটি সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে। তার মতে আল্লাহর দেহের নিচের দিকের কেবল সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে, যেই দিক আরশের সাথে সংশ্লিষ্ট।

২. ইবনে কাররামের আরেকটি আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপরের অংশ স্পর্শ করে আছেন।

৩. ইবনে কাররামের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর স্থির হয়ে আছেন। সত্ত্বাগতভাবে তিনি উপরের দিকে রয়েছেন। আরশ হলো আল্লাহর অবস্থানের স্থান।

বিস্তারিত দেখুন,
আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৩, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮, ই’তেকাদু ফিরাকিল মুসলিমিন, পৃ.১৭, আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৪, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮।

তথাকথিত সালাফী আকিদা:

১. সালাফীদের অন্যতম শায়খ হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদী। তিনি বেশ কিছু কিতাব লিখেছেন। এসব কিতাবের অন্যতম একটি কিতাব হলো কিতাবুত তাউহীদ। কিতাবুত তাউহীদের একটি ব্যাখ্যা লিখেছে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাব নজদীর নাতী শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে হাসান। তিনি কিতাবুত তাউহীদের এ ব্যাখ্যার নাম দিয়েছেন ফাতহুল মাজীদ। ফাতহুলী মাজীদ কিতাবুত তাউহীদের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এটি তাহকীক করে প্রকাশ করেছেন, শায়খ আব্দুল কাদের আর-নাউত। ফাতহুল মাজীদের ৪৮৫ পৃষ্ঠায় আল্লাহর আরশে বসার কথা রয়েছে। এখানে রয়েছে,
إذا جلس الرب علي الكرسي
“যখন প্রভূ কুরসীর উপর বসলেন”।

২. সউদি সরকারের সাবেক প্রধান মুফতী সালাফীদের অন্যতম শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শায়খও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আল্লাহর আরশে বসার আকিদা বর্ণনা করেছেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে মাকামে মাহমুদ বা প্রশংসনীয় মর্যাদা দ্বারা সম্মানিত করবেন। মাকামে মাহমুদ এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত দিবসে রাসূল স. কে শাফায়াতে উজমা বা সবচেয়ে বড় শাফায়াতের ক্ষমতা দান করবেন। শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহীম আলুশ শায়খ “মাকামে মাহমুদের” ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন,

” কেউ কেউ বলেছেন, মাকামে মাহমুদ হলো, ব্যাপক শাফায়াত বা সুপারিশ। কেউ কেউ বলেছেন, মাকামে মাহমুদ হলো, আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে আরশের উপরে তার পাশে বসাবেন। এটি আহলে সুন্নতের প্রসিদ্ধ বক্তব্য” উভয় বক্তব্যের মাঝে কোন বৈপরীত্ব নেই। উভয়ের মাঝে এভাবে সমন্বয় করা সম্ভব যে উভয়টি রাসূল স. কে দেয়া হবে। তবে আল্লাহর পাশে রাসূল স. কে বসানো হবে, এই ব্যাখ্যাটি অধিক যুক্তিসঙ্গত।
[ফতোয়া ও রসাইল, পৃ.১৩৬। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শায়খ, তাহকীক মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম ইবনে কাসেম, প্রথম প্রকাশ, ১৩৯৯ হি:, মাতবায়াতুল হুকুমিয়া, মক্কা]

৩. সালাফীদের বিখ্যাত একজন শায়খ হলেন সালেহ আল-উসাইমিন। শায়খ সালেহ আল-উসাইমিনের উস্তাদ হলেন, আব্দুর রহমান সা’দী। তিনিও আরব সালাফীদের মাঝে বেশ পরিচিত। আব্দুর রহমান সা’দীও আরশে বসার আকিদা পোষণ করেন। তিনি লিখেছেন,
” ইস্তেওয়ার একটি ব্যাখ্যা হলো, স্থির হওয়া বা বসা। এই ব্যাখ্যাটি সালাফ বা পূর্ববর্তীদের থেকে বর্ণিত”
[আল-আজইবাতুস সা’দিয়া আনিল মাসাইলিল কুয়েতিয়্যা, পৃ.১৪৭। তাহকীক, ড. ওলীদ আব্দুল্লাহ। ]

৪. বর্তমান সালাফীদের বিখ্যাত শায়খ হলেন সালেহ আল-উসাইমিন। তিনিওএই ইহুদীবাদী আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহর আরশে বসার আকিদাটি তিনিও স্বীকৃতি দিয়েছেন। শায়খ সালেহ আল-উসাইমিন তার মাজমুউল ফতোয়ায় ইবনুল কাইয়্যিম এর বক্তব্য এনেছেন। ইবনে তাইমিয়ার বিখ্যাত ছাত্র ইবনুল কাইয়্যূমও আরশে বসার আকিদা রাখতো। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান লিখেছেন,
” ইস্তাওয়া শব্দের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, বসা। ইবনুল কাইয়্যিম আস-সাওয়াইকুল মুরসালা (খ.৪, পৃ.১৩০৩) কিতাবে এই ব্যাখ্যাটি খারিজা ইবনে মুসআব থেকে বর্ণনা করেছেন। সূরা ত্বহার ৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লিখেছেন, বসা ছাড়া কখনও কি ইস্তাওয়া হয়?
[মাজমুউ ফাতাওয়া ও রসাইল, ইবনে উসাইমিন, খ.১, পৃ.১৩৫, দারুল ওযাতন]

৫. সালাফীদের অন্যতম বিখ্যাত শায়খ হলেন শায়খ সালেহ আল-ফাউজান। তিনি আব্দুল আজীজ বিন ফয়সাল আর-রাজেহীর একটি কিতাবের ভূমিকা লেখে দিয়েছে। কুদুমু কাতাইবিল জিহাদ নামক এই বইয়ে আব্দুল আজিজ রাজেহী আরশে বসার আকিদা সম্পর্কে লিখেছে,
“বসা ছাড়া কখনও কি ইস্তাওয়া হয়? এই কথাটি সঠিক। এর উপর কোন ধুলোবালি নেই। অর্থাৎ এটি নি:সন্দেহে সঠিক।”
[কুদুমু কাতাইবিল জিহাদ, পৃ.১০১]

৬. ইবনে তাইমিয়ার বিখ্যাত ছাত্র হলেন ইবনুল কাইয়্যিম। নাওনিয়াতু ইবনিল কাইয়্যিম নামে তার একটি কিতাব রয়েছে। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান ইবনুল কাইয়্যিমের এ কিতাবের উপর সংক্ষিপ্ত টীকা লিখেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, আত-তা’লিকুল মুখতাসার আলাল কাসিদাতিত নাউনিয়্যাহ। এ কিতাবে শায়খ ফাউজান আরশে বসার আকিদাটি স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন,
” মাকামে মাহমুদ এর ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহ তায়ালা রাসূল স. কে আরশে নিজের পাশে বসাবেন।”
[আত-তালীকুল মুখতাসার, সালেহ আল-ফাউজান, পৃ.৪৫৩]

 আশ্চর্যজনক স্ববিরোধীতা 

আকিদার ক্ষেত্রে সালাফী শায়খদের দোদুল্যমান অবস্থা দেখলে সত্যিই আশ্চর্য লাগে। এদের নির্দিষ্ট কোন দিক নেই। এখন পূর্বে থাকলে কিছুক্ষণ পরে ঠিকই পশ্চিমে যায়। এধরনের স্ববিরোধী অবস্থান বড় বিস্ময়কর। শায়খ সালেহ আল-ফাউজান অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় আল্লাহর বসার আকিদা স্বীকার করেছেন। যারা এটা অস্বীকার করে তাদেরকে দুর্বল মস্তিষ্কের আখ্যাযিত করেছেন। এমনকি তাদের কথা ধর্তব্য নয় বলেও রায় দিয়েছেন। অথচ তিনি আবার লিখেছেন,

প্রশ্ন: যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ইস্তাওয়া গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ তিনি আরশে বসেছেন, তার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী? এটা কি তা’বীল বা ব্যাখ্যার অন্তুর্ভূক্ত হবে?

১. উত্তর: এটি বাতিল ও ভ্রান্ত। কেননা বসা দ্বারা ইস্তাওয়ার ব্যাখ্যা করা হয় না।আর আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বলি না।
[শরহু লুময়াতিল ই’তেকাদ, পৃ.৩০৫]

২. শায়খ ইবনে জিবরীন সালাফীদের অন্যতম শায়খ। তিনি আল-জওয়াবুল ফাইক ফির রদ্দি আলা মুবাদ্দিলিল হাকাইক নামে একটা পুস্তক লিখেছেন। এই পুস্তকে তিনি আল্লাহর বসার আকিদাটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। এমনকি যারা এ আকীদাকে আহলে সুন্নতের আকিদা বা নজদের ওহাবী বা সালাফী আলেমদের আকিদা বলে থাকে, তাদেরকে মিথ্যুক বলেছেন। তিনি লিখেছেন,
“সালাফে সালেহীনের কিতাবে ইস্তাওয়া শব্দের ব্যাখ্যায় বসার কোন অর্থ উল্লেখ নেই। সুতরাং আহলে সুন্নতের দিকে এই আকিদা সম্পৃক্ত করা কিংবা সালাফী আলেমদের দিকে এই আকিদা সম্পৃক্ত করা, তাদের সম্পর্কে মিথ্যাচার বৈ কিছুই নয়।“

৩. শায়খ আলবানীর বক্তব্য:

শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতে যেসব হাদীসে স্পষ্টভাবে আল্লাহর দিকে বসার কথা উল্লেখ রয়েছে এগুলো জাল হওয়া বান্ছনীয়। কেননা এসব হাদীসের বক্তব্য মুনকার। কেননা আল্লাহর আরশে বসার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই। আর বসার কথা যেসব হাদীসে রয়েছে, সেগুলো কখনও রাসূল স. এর হাদীস হতে পারে না। কারণ আল্লাহর দিকে বসার সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে যে এটি রাসূলস. এর হাদীস নয়। শায়খ আলবানীর সব লেখা সংকলন করে একটি মউসুয়া বের করা হয়েছে। এই মউসুয়ার প্রথম খন্ডে আকিদা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম খন্ডের ৩৪৩ পৃষ্ঠার শিরোনাম হলো,
“আল্লাহ তায়ালা জন্য বসার আকিদাটি ভিত্তিহীন”
এখানে শায়খ আলবানী বলেছেন,

“ আল্লাহর বসার ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই। সুতরাং আল্লাহর দিকে বসার আকিদা সম্বলিত হাদীস জাল হওয়াটাই বান্চনীয়”

এছাড়া শায়খ আলবানী লিখেছে :

এ বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালার দিকে বসার কথা সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আরশে স্থির আছেন এটা সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহর বসার ব্যাপারে বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা নেই। সুতরাং এটি বিশ্বাস করা এবং তা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ হবে না।
[মুখতাসারুল উলু, পৃ.১৭, প্রথম সংস্করণ]

ইস্তেওয়া শব্দের সঠিক অর্থ ও সালাফীদের অপপ্রচার (পর্ব ২) :-

পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বহার ৫ নং আযাতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
“দয়াময় আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন”।

এই আয়াত ব্যবহার করে বাতিল আকিদার কিছু লোক বলে থাকে, আল্লাহ তায়ালা আরশে বসে আছেন নাউযুবিল্লাহ। এধরনের বাতিল বক্তব্যের সাথে এই আয়াতের কোন দূরতমত সম্পর্ক নেই। যারা এধরনের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে মানুষের আকিদা নষ্ট করার চেষ্টা করছেে তাদের ব্যপারে সচেতন হওয়া আবশ্যক। আমরা ইস্তেওয়া শব্দের অর্থের উপর সংক্ষিপ্ত কিছু পর্যালোচনা বিগত পর্বে উল্লেখ করেছি। আগ্রহী পাঠকগণ প্রথম পর্ব দেখতে পারেন। আমরা এই ধারাহাবিক আলোচনায় ইনশাআল্লাহ অনেক মুফাসসিরিন গনের বক্তব্য উল্লেখ করবো, যারা প্রত্যেকেই ইস্তেওয়া শব্দের সঠিক অর্থ উল্লেখ করেছেন।

৬. বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ত্ববরানী (মৃত:৩৬০ হি:) তার তাফসীরে কাবীরে বলেন,
والاستواء: الاستيلاء، ولم يـزل الله سبحانه مستوليا على الأشياء كلها، إلا أن تخصيص العرش لتعظيم شأنه
অর্থাৎ ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ, ইস্তিলা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তায়ালা সদা-সর্বদা সমস্ত বস্তুর উপর নিজের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন। তবে এখানে বিশেষভাবে আরশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আরশের গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে।
[আত-তাফসীরুল কাবীর, ইমাম ত্ববরানী, খ.৩, পৃ.৩৭২]

৭. ইমাম আবু বকর জাসসাস রহ. [মৃত:৩৭০ হি:] এর তাফসীর:
ইমাম আবু বকর জাসসাস তার বিখ্যাত কিতাব আহকামুল কুরআনে লিখেছেন,
“: قوله تعالى: {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى } [سورة طه:5] قال الحسن: استوى بلطفه وتدبيره، وقيل: استولى.اه
অর্থাৎ মহান আল্লাহর বাণী: দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।(সূরা ত্ব-হা, আয়াত নং৫)। ইমাম হাসান বলেন, তিনি নিজের দয়া, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার পূর্ণতা দান করেছেন। এবং কারও মতে ইস্তেওয়ার অর্থ হলো, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
[আহকামুল কুরআন, খ.৩, পৃ.৩২৫]
৮. ইমাম আবুল লায়স সামরকন্দী রহ(মৃত:৩৭৫ হি:) এর তাফসীর:
ইমাম আবুল লায়স বলেন,
ويقال استوى استولى
অর্থাৎ ইস্তেওয়ার আরেকটি অর্থ বলা হয়, ইস্তাওলা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
[তাফসীরে সমরকন্দী বা বাহরুল উলুম, খ.২, পৃ.৩৭৬]

৯. ইমাম আবু বকর ইবনে ফাউরক [মৃত:৪০৬ হি:] এর তাফসীর:
ইমাম আবু বকর ইবনে ফাউরক তার মুশকিলুল হাদীস কিতাবে বলেন,
: لأن استواءه على العرش سبحانه ليس على معنى التمكن والاستقرار، بل هو على معنى العلو بالقهر والتدبير وارتفاع الدرجة بالصفة، على الوجه الذي يقتضي مباينة الخلق. اهـ
অর্থাৎ আরশে র উপর আল্লাহর ইস্তেওয়া দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে তিনি আরশের উপর অবস্থান করেন বা আরশের উপর স্থির হয়েছেন। বরং কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার দ্বারা সমুন্নত হওয়া এবং গুণগত মর্যাদা উদ্দেশ্য। কেননা আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে পৃথক ও ভিন্ন।
[মুশকিলুল হাদীস, পৃ.২২৯]

১০ইমাম আবু মনসুর নাইসাপুরী রহ. [মৃত: ৪২১] এর বক্তব্য:
ইমাম আবু মনসুর নাইসাপুরী রহ. বলেন ,
إن كثيرا من متأخري أصحابنا ذهبوا إلى أن الاستواء هو القهر والغلبة
আমাদের পরবর্তী অনেক আলেম এমত গ্রহণ করেছেন যে, ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ হলো, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও প্রতাপ।
[আল-আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ.৩৭২]

১১. ইমাম আবু মুহাম্মাদ জুয়াইনী (মৃত: ৪৩৮ হি:) এর বক্তব্য:
ইমাম জুয়াইনী রহ. বলেন,
“ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ পূর্ণক্ষমতা দ্বারা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেষ্টণ করা। এর দ্বারা কখনও আল্লাহর স্থান, দিক, অবস্থানের জায়গা কিংবা সীমা উদ্দশ্যে নয়।”
[ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, খ.২, পৃ.১১০]

১২.ইমাম আবুল হাসান মাওয়ারদী রহ. [মৃত: ৪৫০ হি:] এর তাফসীর:
ইমাম আবুল হাসান মাওয়ারদী রহ. বলেন,
: { ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ } [سورة الأعراف: 54]: فيه قولان: …والثاني: استولى على العرش كما قال الشاعر :
قد استوى بِشْرٌ على العِراقِ ** من غير سَيفٍ ودمٍ مُهراقِ”اهــ

অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের বাণী: অত:পর আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। [সূরা আ’রাফ, ৫৪]। ইমাম মাওযারদী বলেন, ইস্তেওয়া শব্দের দু’টি অর্থ রয়েছে। …। দ্বিতীয় অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেমন কবি বলেছেন,
বিশর ইরাকের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কোন তরবারী চালনা কিংবা রক্তপাত ব্যতীতই।
[আন-নুকাতু ওয়াল উয়ূন, খ.২, পৃ.২২৯]

১৩. ইমাম আবু বকর বাইহাকী রহ. [মৃত: ৪৫৮ হি:] এর বক্তব্য:
ইমাম বাইহাকী রহ. বলেন
أن الاستواء هو القهر والغلبة، ومعناه أن الرحمن غلب العرش وقهره، وفائدته الإخبار عن قهره مملوكاته، وأنها لم تقهره، وإنما خص العرش بالذكر لأنه أعظم المملوكات، فنبه بالأعلى على الأدنى، قال: والاستواء بمعنى القهر والغلبة شائع في اللغة، كما يقال استوى فلان على الناحية إذا غلب أهلها، وقال الشاعر في بشر بن مروان: قد استوى بشر على العراق * * من غير سيف ودم مهراق. اهـ يريد أنه غلب أهله من غير محاربة

অর্থাৎ ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ হলো, কর্তৃত্ব ও ক্ণমতা বজায় রাখা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং একে নিজের ক্ণমতার অধীন করেছেন। আয়াতে বিষয়টি উল্লেখের বিশেষ ফায়দা হলো, আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে জানিয়েছেন, আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর ক্ণমতার অধীন। এবং তিনি কারও অধীন নন। আর এক্ণেত্রে বিশেষভাবে আরশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এজন্য যে, আরশ আল্লাহর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। সুতরাং তিনি সবচেয়ে বড় সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সমস্ত ছোট সৃষ্টিও আল্লাহর ক্ণমতা ও কর্তৃত্বের অধীন। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অর্থে ইস্তেওয়া শব্দটির ব্যবহার আরবী ভাষায় ব্যাপক পরিচিত। যেমন বলা হয়, , অমুক উক্ত অন্চলের উপর ইস্তেওয়া করেছে বা নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশর ইবনে মারওয়ান সম্পর্কে কবি বলেন, বিশর ইরাকের উপর নিজের ক্ণমতা প্রতিষ্ঠা করেছে। কোন রক্তপাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই। এখানে কবি
উদ্দেশ্য নিয়েছেন, কোন যুদ্ধ ছাড়া বিশর ইরাকের মানুষের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
[আল-আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ.৪১২]

১৪. ইমাম আবুল হাসান নাইসাপুরী রহ. [মৃত: ৪৬৮ হি:]এর তাফসীর:

ইমাম আবুল হাসান নাইসাপুরী রহ. তার আল-ওজীয নামক তাফসীরে লিখেছেন,
{ اسْتَوَى } أي استولى.اهـ
ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ হলো ইস্তাউলা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
১৫. ইমাম আবু ইসহাক শিরাজী রহ. [মৃত: ৪৭৬ হি:] এর তাফসীর:
ইমাম আবু ইসহাক শিরাজী রহ. বলেন,
الاستواء بمعنى الاستيلاء، استوى على العرش أي استولى عليه، يقال استوى فلان على الملك أي استولى عليه

অর্থাৎ ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ হলো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ইস্তাওয়া আলাল আরশ এর অর্থ হলো, আরশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। আরবী ভাষায় বলা হয়, অমুক ব্যক্তি দেশে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
[আল-ওয়াজীয, খ.২, পৃ.১৫]

স্রষ্টাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদানে ইহুদী ধর্ম :-

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহ এর আকিদা হল আল্লাহর সাথে কারো কোন তুলনা নেই। আল্লাহর আকার-আকৃতি কেমন তা মানুষের কল্পনার বাইরে তিনি গায়েব (অদৃশ্য) মানুষের মত তার হাত, পা, দেহ এসব কল্পনা করা মারাত্মক পথভ্রষ্টতা। প্রভুর সাথে যেমন কারো শরিক নেই প্রভুর সাথে কারো তুলনা বা সাদৃশ্যও স্থাপন করা বাতিলের কাজ, মুর্খের কাজ।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

وجاوزنا ببني إسرائيل البحر فأتوا على قوم يعكفون على أصنام لهم قالوا يا موسى اجعل لنا إلها كما لهم آلهة

অর্থ: আর আমি বনী ইসরাইলকে সাগর পার করে দিয়েছি, তখন তারা এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে পৌঁছলো, যারা নিজেদের বানানো কতোগুলো প্রতিমার পূজায় রত ছিলো। বনী ইসরাইল বলল, হে মুসা, আমাদের জন্য এরূপ একটি উপাস্য নির্ধারণ করে দেন, যেরূপ এদের উপাস্য রয়েছে।

[সূরা আ’রাফ, আয়াত নং ১৩৮।]

পবিত্র কুরআনে আরও স্পষ্টভাবে বনী ইসরাইলের এই মানসিকতা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা মহান আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং রীতিমত মূর্তি বানিয়ে তার পূজা শুরু করেছে। তারা সর্বদা আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সদৃশ একটি সত্ত্বা বলেই বিশ্বাস করতো।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

واتخذ قوم موسى من بعده من حيلهم عجلاً جسداً له خوار

অর্থ: আর মুসার সম্প্রদায় তাঁর অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার সমূহ দিয়ে একটি গো-বৎসের আকৃতি বানালো, যার আওয়াজ ছিলো।

[সূরা আ’রাফ, আয়াত নং ১৩৮।]

তাদের এই বাছুর পূজা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সূরা অন্য আয়াতে বলেন,

فَأَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَهُ خُوَارٌ فَقَالُوا هَٰذَا إِلَٰهُكُمْ وَإِلَٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِيَ

অর্থ: “এরপর সে তাদের জন্য একটি বাছুর বানালো, যা একটি দেহ ছিলো, যাতে গরুর আওয়াজ ছিলো। তখন তারা বলতে লাগল, তোমাদের এবং মুসার মাবুদ তো এটাই, মূসা তো ভুলে গেছে।”

[সূরা ত্বহা, আয়াত নং ৮৮।]

বাইবেলের বুক অব এক্সোডাসে রয়েছে,

Now when the people saw that Moses delayed to come down from the mountain, the people assembled about Aaron and said to him, “Come, make us a god who will go before us”

অর্থ: যখন লোকেরা দেখল মুসা আ. পাহাড় থেকে অবতরণ করতে বিলম্ব করছে, তারা হারুন আ. এর নিকট একত্রিত হয়ে বলল, “আমাদের জন্য এমন একটা প্রভূ তৈরি করো, যে আমাদের সামনে চলা-ফেরা করবে”

[বুক অব এক্সোডাস, পরিচ্ছেদ, ৩২, শ্লোক, ১।]

একই বইয়ে রয়েছে,

After leaving Sukkoth they camped at Etham on the edge of the desert. By day the LORD went ahead of them in a pillar of cloud to guide them on their way and by night in a pillar of fire to give them light, so that they could travel by day or night.

অর্থ: তারা সুকুত থেকে যাত্রা করলো এবং মরুভূমির প্রান্তে ইছাম নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলো। দিনের বেলায় প্রভূ তাদের সামনে মেঘের স্তম্ভ হয়ে চলছিলো এবং রাতে আগুনের স্তম্ভ হয়ে তাদেরকে আলো দিচ্ছিল , যেন তারা দিনে ও রাতে ভ্রমণ করতে পারে।

[বুক অফ এক্সোডাস, পরিচ্ছেদ, ১৩, শ্লোক, ২০-২১।]

বাইবেলে রয়েছে,

Moses and Aaron, Nadab and Abihu, and the seventy elders of Israel went up. and they saw the God of Israel. There was under his feet as it were a pavement of sapphire stone, like the very heaven for clearness. But God did not raise his hand against these leaders of the Israelites; they saw God, and they ate and drank.

অর্থ: মুসা, হারুন, নাদাব, আবিহু এবং বনী ইসরাইলের সত্তরজন বয়স্ক লোক পাহাড়ে আরোহণ করল। তারা ইসরাইলের প্রভূকে দেখল। প্রভূর পায়ের নিচে যেন নীলকান্ত মণি পাথর ছিলো, যা ছিলো আকাশের মতো স্বচ্ছ। প্রভূ ইসরাইলের নেতাদের দিকে তার হাত প্রসারিত করলেন না। তারা প্রভূকে দেখল, আহার করল এবং পান করলো।

[বুক অব এক্সোডাস, পরিচ্ছেদ, ২৩, শ্লোক, ৯-১১।]

বুক অব জেনেসিসে রয়েছে,

Whoever sheds the blood of man, by man shall his blood be shed, for God made man in his own image.

অর্থ: যে মানুষের রক্ত ঝরাবে, তার রক্তের বিনিময়ে হত্যাকারীর রক্ত ঝরানো হবে। কেননা প্রভূ মানুষকে নিজের আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।

[বুক অব জেনেসিস, পরিচ্ছেদ, ৯, শ্লোক, ৬।]

The LORD said to Moses, “Behold, I will come to you in a thick cloud, so that the people may hear when I speak with you and may also believe in you forever.” Then Moses told the words of the people to the LORD. The LORD also said to Moses, “Go to the people and consecrate them today and tomorrow, and let them wash their garments; and let them be ready for the third day, for on the third day the LORD will come down on Mount Sinai in the sight of all the people.

অর্থ: প্রভূ মুসাকে বললেন, মনে রেখো, আমি তোমার নিকট পাতলা মেঘের আবরণে আগমণ করবো। আমি যখন তোমার সঙ্গে কথা বলব, মানুষ যেন শুনতে পায়। সম্ভবত: তারা তোমার উপর স্থায়ী বিশ্বাস স্থাপন করবে। অত:পর মুসা আ. প্রভূর বাণী লোকদেরকে শোনাল। প্রভূ মুসাকে আরও বলল, মানুষের কাছে যাও। আজ ও আগামীকাল তাদেরকে পবিত্র করো এবং তারা যেন তাদের কাপড় পবিত্র করে। তারা যেন তৃতীয় দিনের জন্য প্রস্তুত হয়। তৃতীয় দিন সব মানুষের চোখের সামনে প্রভূ সিনাই পর্বতে নেমে আসবে।

[বুক অব এক্সোডাস, পরিচ্ছেদ,১৯, শ্লোক, ৯-১১।]

অল্ড টেস্টামেন্টের দি বুক অব সামে রয়েছে,

you have sat on the throne, giving righteous judgment.

অর্থ: আপনি ন্যায়-পরায়ণ হিসেবে কুরসীতে উপবেশন করেছেন।

[বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ,৯, শ্লোক, ৪।]

বাইবেলের পুরাতন নিয়মে রয়েছে,

In my distress I called upon the LORD, and cried unto my God: he heard my voice out of his temple, and my cry came before him, even into his ears. Then the earth shook and trembled; the foundations also of the hills moved and were shaken, because he was wroth. There went up a smoke out of his nostrils, and fire out of his mouth devoured: coals were kindled by it.

আমার বিপদের মুহূর্তে আমি প্রভূকে ডাকলাম এবং আমার প্রভূর নিকট ক্রন্দন করলাম। তিনি তার উপাসনালয়ের বাইরে থেকে আমার আওয়াজ শুনলেন। আমার ক্রন্দন তাঁর নিকট পৌছল। এমনকি তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করল। অত:পর ভূমি প্রকম্পিত হলো এবং ঝাকুনি দিল। পাহাড়ের ভিত নড়ে উঠল। কেননা প্রভূ রাগান্বিত ছিলেন। তার নাক থেকে ধুয়া বের হলো এবং তার মুখ থেকে আগুন বের হলো, সেই আগুনে কয়লা জ্বলে উঠল।

[বুক অব সাম, পরিচ্ছেদ, ১৮, শ্লোক, ৬,৭,৮।]

আল্লাহ সম্পর্কে ভ্রান্ত দেহবাদী আকিদার স্বরুপ বিশ্লেষণ : মুগিরিয়া, ইউনুসিয়া,জাওয়ারিবি, শয়তানিয়া ফির্কা :

¯স্রষ্টাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদানে বাতিল ফেরকাসমূহ  আসমানী ধর্মসমূহের মধ্যে ¯্রষ্টাকে সৃষ্টির স্তরে নামিয়েছে ইহুদীরা। খ্রিষ্টানরা স্বয়ং সৃষ্টিকে ¯্রষ্টা বানিয়েছে। এভাবে মূল তাউহীদের আক্বিদায় মারাত্মকভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে কুফুর-শিরকে নিপতিত হয়েছে। পরবর্তীতে মুসলমানদের অনেক বাতিল ফেরকা ইহুদী-খ্রিষ্টানদের এসব কুফুরী-শিরকী আক্বিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন সময়ে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের কুফুরী আক্বিদাগুলো মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। ইহুদী বর্ণনার দ্বারা প্রভাবিত মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম শিয়ারা এসব কুফুরী আক্বিদা প্রচার করে। এদের পাশাপাশি একদল অজ্ঞ মুহাদ্দিস কুরআন-সুন্নাহের বাহ্যিক শব্দ অনুসরণের নামে ইহুদীদের এসব কুফুরী আক্বিদা প্রচার করতে থাকে।

এবাবে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের কুফুরী আক্বিদাগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলমানদেও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এবং কুরআন সুন্নাহের অনুসরণের ধুয়ো তুলে তারা অনেক সাধারণ মানুষকেও এসব কুফুরী আক্বিদার দিকে পরিচালিত করে। আল্লাহ তায়ালার নাম ও গুণাবলী বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে এসব বাতিল ফেরকাসমূহের পরিচিতি স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক।

শিয়াদের মুজাসসিমা[১] ও মুশাববিহা[২] ফেরকা:

ইহুদী-খ্রিষ্টানদের কুফুরী আক্বিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক শিয়া-রাফেযী আল্লাহ তায়ালার জন্য সৃষ্টির গুণাবলী সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির স্তরে নামিয়েছে। মানুষের মতো রক্ত-মাংসের প্রভূ হিেেসব গ্রহণ করেছে। বাস্তবে এরা মুসলমান দাবী করলেও এরা হিন্দুদেরই সমগোত্রীয়।

এদের নিজেদের মধ্যে অনেক দল রয়েছে। প্রত্যেক দলের এক একজন নেতা রয়েছে। এদের মতাদর্শের মধ্যে সামান্য কিছু বাহ্যিক পার্থক্য দেখা গেলেও আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেয়ার ক্ষেত্রে সব মতবাদই অভিন্ন। শিয়াদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মুজাসসিমাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।হিশামিয়া:বাতিল ফেরকা বিষয়ে অভিজ্ঞ ইমাম ও ঐতিহাসিকগণ হিশামিয়া দ্বারা দু’টি বাতিল ফেরকা উদ্দেশ্য নেন। একটি ফেরকার জনক হলো, হিশাম ইবনে হাকাম (মৃত: ১৯০ হি.)। অপর ফেরকার জনক হলো, হিশাম ইবনে সালিম আল-জুয়ালিকি।[৩]

ইমাম বাগদাদী রহ. এর মতে ফেরকাটি শিয়াদের ইমামের ধ্যান-ধারণা, আল্লাহর শরীর সাব্যস্তরণের ভ্রষ্টতা এবং আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অভিন্ন। ইমাম ইসফারাইনী রহ. বলেন,وهم الأصل في التشبيهঅর্থ: আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদানে এই দলটি হলো মূল।[৪]

ইমাম শাহরাস্তানীর মতে হিশামিয়া মূলত: একটি ফেরকা, দুই ব্যক্তির দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এদের মতাদর্শও এক। এরা মূলত: একজন আরেকজনের অনুগামী ছিলো।  তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদানে অগ্রগামী ছিলো হিশাব ইবনে হাকাম। হিশাব ইবনে সালেম আল-জুয়ালিকি ছিলো তার অনুগামী এবং তারা উভয়ে একই পথে হেঁটেছিলো।[৫]হিশাম ইবনে হাকাম এর উপনাম ছিলো আবু মুহাম্মাদ। সে বনী শাইবান এর আযাদকৃত গোলাম ছিলো। বাগদাদ থেকে কুফায় স্থানান্তরিত হয় এবং সেখানেই বসবাস করে। সে শিয়াদের অন্যতম একজন বক্তা ছিলো। খলিফা মা’মুনের সময় সে ইন্তেকাল করে।[৬]

ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. হিশাম ইবনে হাকাম ও তাঁর অনুসারীদের আক্বিদা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন,

الهشامية أصحاب هشام بن الحكم الرافضي، يزعمون أن معبودهم جسم له نهاية وحد طويل عريض طوله مثل عرضه، وعرضه مثل عمقه لا يوفي بعضه على بعضه. ولم يعينوا له طولاً غير الطويل. وإنما قالوا: طوله مثل عرضه على المجاز دون التحقيق، وزعموا أنه نور ساطع، له قدر من الأقدار. في مكان دون مكان. كالسبيكة الصافية كاللؤلؤة المستديرة من جميع جوانبها.ذو لون وطعم ورائحة. لونه هو طعمه، هو رائحته، ورائحته هي محسته. وهو نفسه لونه. ولم يعينوا لوناً ولا طمعاً هو غيره. وزعموا أنه هو اللون وهو الطعم، وأنه قد كان لا في مكان، ثم حدث المكان بأن تحرك الباري فحدث المكان بحركته فكان فيه. وزعم أن المكان هو العرش.وذكر أبو الهذيل في بعض كتبه أن هشام بن الحكم قال إن ربه جسم ذاهب جاء، فيتحرك تارة ويسكن أخرى، ويعقد مرة ويقوم أخرى، وإنه طويل عريض عميق، لأن ما لم يكن كذلك دخل في حد التلاشي. قال: فقلت له: فأيهما أعظم إلهك أو هذا الجبل وأومأت إلى جبل أبي قبيس قال: فقال هذا الجبل يوفي عليه، أي هو أعظم منه. وذكر ابن الراوندي أن هشام بن الحكم كان يقول: إن بين إلهه وبين الأجسام المشاهدة تشابهاً من جهة من الجهات، لولا ذلك ما دلت عليه.وحكي عنه خلاف هذا وأنه كان يقول إنه جسم ذو أبعاض لا يشبهها ولا تشبهه، وحكى عنه الجاحظ أنه قال في ربه في عام واحد خمسة أقاويل، مرة رغم أنه كالبلورة وزعم مرة أنه كالسبيكة. وزعم مرة أنه غير ذي صورة، وزعم مرة أنه بشبر نفسه سبعة أشبار، ثم رجع عن ذلك وقال هو جسم لا كالأجسام.وزعم الوراق أن بعض أصحاب هشام أجابه مرة إلى أن الله عز وجل على العرش مماس له وأنه لا يفضل عن العرش ولا يفضل العرش عنه

অর্থ: হিশাম ইবনে হাকাম শিয়ার অনুসারীদেরকে হিশামিয়া বলা হয়। তাদের আক্বিদা-বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালার শরীর রয়েছে। শরীরের সমাপ্তি ও সীমা-পরিসীমা রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ রয়েছে। আল্লাহর শরীরের দৈর্ঘ্য প্রস্থের সমান। শরীরের প্রস্থ এর গভীরতার সমান। আল্লাহর শরীরের কোন অংশ একে-অপরের পরিপূরক নয়। তারা আল্লাহর জন্য দৈর্ঘ্য সাব্যস্ত করেছে কিন্তু এই দৈর্ঘ্যরে সুনিদিষ্ট কোন পরিমাণ উল্লেখ করেনি। আল্লাহর দৈর্ঘ্য তার প্রস্থের সমান এজাতীয় কথা তারা অনেক সময় রূপক অর্থে ব্যবহার করে।  তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা হলেন, একটি উজ্জ্বল আলো। এই উজ্জ্বল আলোর সুনির্দিষ্ট একটা পরিমাপ রয়েছে। এটি কোন স্থানে রয়েছে, তবে তা সুনির্দিষ্ট নয়।   তিনি উজ্জ্বল ধাতু-মিশ্রণের মতো। চতুর্দিক থেকে গোলাকার  মণি-মুক্তার উজ্জ্বল।আল্লাহর রঙ, স্বাদ ও ঘ্রাণ রয়েছে। আল্লাহর রঙ তার স্বাদের অনুরূপ। আল্লাহর রঙ তার ঘ্রাণেরও অনুরূপ। আল্লাহর ঘ্রাণ তার স্পর্শ অনুভূতির প্রকাশ। সেটিই আবার তার রঙ। তারা আল্লাহর সত্তার অতিরিক্ত কোন রঙ বা ঘ্রাণ সাব্যস্ত করেনি। বরং তাদের নিকট স্বয়ং এই রঙ ও ঘ্রাণই আল্লাহ। তাদের বিশ্বাস হলো, আদিতে আল্লাহ তায়ালা কোন স্থানে ছিলেন না। অত:পর আল্লাহ তায়ালা নড়া-চড়া করেন, ফলে স্থান সৃষ্টি হয়। তিনি নতুন সৃষ্ট এই স্থানে থাকেন। তাদের বিশ্বাস হলো, নতুন সৃষ্ট এই স্থান হলো আরশ।আবুল হুজাইল তার একটি কিতাবে লিখেছে, হিশাম ইবনে হাকামকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই পাহাড় বড় না তোমার প্রভূ বড়। সে বলল, প্রভূ বড়। আমি তাকে আবু কুবাইস পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ইবনে রাওয়ান্দী বলেন, হিশাম ইবনে হাকাম বলত, বাহ্যিক শরীর ও তার প্রভূর মাঝে একটি বিশেষ দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে। যদি এটি না থাকত, তাহলে আল্লাহর প্রমাণ পাওয়া যেত না।কেউ তার এই বক্তব্যের বিপরীত বক্তব্য তার থেকে বর্ণনা করেছে। সে বলত, আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিশিষ্ট সত্তা। তবে তার সঙ্গে তুলনীয় কিছু নেই এবং তিনিও কারও সাদৃশ্য রাখেন না। ইমাম জাহেয তার থেকে বর্ণনা করেন, সে একই বছরে আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে পাঁচ ধরনের মতবাদ তৈরি করতো। কখনও সে বলত, আল্লাহ তায়ালা উজ্জ্বল মণি-মুক্তার মতো। কখনও ধারণা করতো আল্লাহ তায়ালা মিশ্রধাতুর মতো। কখনও  বিশ্বাস করতো আল্লাহ তায়ালা আকার-আকৃতি বিশিষ্ট নন। কখনও বলত, আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতের পরিমাপ হিসেবে সাত বিঘাত। অত:পর, এসব থেকে ফিরে এসে নতুন মতবাদ চালু করলো যে, আল্লাহ তায়ালার দেহ রয়েছে, তবে অন্যান্য দেহ এর মতো নয়।ওয়াররাক বলেন, হিশামের কিছু অনুসারী তাকে উত্তর দিয়েছিলো, আল্লাহ তায়লা আরশের উপর আরশ স্পর্শ করে আছেন। তিনি আরশ থেকে বড় নন এবং আরশও তার থেকে বড় নয়। [৭]

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী রহ. হিশাম ইবনে হাকামের আক্বিদা সম্পর্কে বলেন,
وكان يزعم أن الله تعالى جسم. وغيَّر مذهبه في سنة واحدة عدة تغيرات. فزعم تارة أن الله تعالى  كالسبيكة الصافية، وزعم مرة أخرى أنه كالشمع الذي من أي جانب نظرت إليه كان ذلك الجانب وجهه. واستقر رأيه عاقبة الأمر على أنه سبعة أشبار، لأن هذا المقدار أقرب إلى الاعتدال ليس بجسم، لكن صورته صورة الآدمي، وهو مركب من اليد والرجل والعين لأن أعضاءه ليست من لحم ولا دم

অর্থ: “সে বিশ্বাস করতো আল্লাহ তায়ালা দেহ ও শরীর বিশিষ্ট। একই বছরে সে তার মতাদর্শ কয়েকবার পরিবর্তন করতো। কখনও ধারণা করতো আল্লাহ তায়ালা উজ্জ্বল মিশ্র ধাতুর মতো। কখনও বিশ্বাস করতো আল্লাহ তায়ালা মোমবাতির আলোর মতো; যেদিক থেকে দেখা হয় সেদিকেই এর মুখ থাকে। সর্বশেষ সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আল্লাহ তায়ালা সাত বিঘাত বিশিষ্ট। কেননা এই পরিমাপ ভারসাম্যের অধিক নিকটবর্তী। সর্বশেষ সে বলতো, আল্লাহ তায়ালা দেহ  বিশিষ্ট নন। তবে তিনি মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট। তিনি হাত, পা, চোখ ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। তবে তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ রক্ত-মাংশের নয়।”[৮]

হিশাম ইবনে সালেম আল-জুয়ালেকী:ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. হিশাম ইবনে সালিম আল-জুয়ালেকী এর আক্বিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে বলেন,

الهشامية أصحاب هشام بن سالم الجواليقي يزعمون أن ربهم على صورة الإنسان، وينكرون أن يكون لحماً ودماً، ويقولون: هو نور ساطع يتلألأ بياضاً وأنه ذو حواس خمس بحواس الإنسان، له يد ورجل وأنف وأذن وعين وفم، وأنه يسمع بغير ما يبصر به، وكذلك سائر حواسه عندهم متغايرة

অর্থ: হিশাম ইবনে সালেম আল-জুয়ালেকীর অনুসারীদেরকেও হিশামিয়া বলা হয়। তাদের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট। তবে তারা আল্লাহর জন্য মানুষের মতো রক্ত-মাংশ সাব্যস্ত করে না। তারা বলে, আল্লাহ তায়ালা হলেন উজ্জ্বল আলো। যেটি উজ্জ্বল সাদা আলোয় জ্বল জ্বল করে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের মতো পঞ্চ ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট। আল্লাহ তায়ালার হাত, পা, নাক, কান, চোখ ও মুখ রয়েছে। তিনি যা দিয়ে শ্রবণ করেন সেটি তার দর্শনের অঙ্গ থেকে ভিন্ন। এভাবে আল্লাহ তায়ালার সকল ইন্দ্রিয় ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।”[৯]

ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. বলেন,وحكى أبو عيسى الوراق أن هشام بن سالم كان يزعم أن لربه وفرة سوداء وأن ذلك نور أسودআবু ইসা আল-ওররাক বলেন, হিশাম ইবনে সালেম বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহ তায়ালার কালো গোফ রয়েছে। আর এই কালো গোফ কালো আলো বিশিষ্ট।[১০]ইমাম শাহরাস্তানী রহ. বলেন,قال إنه تعالى على صورة إنسان أعلاه مجوف وأسفله مصمت.. ليس بجسم لكن صورته صورة الآدمي وهو مركب من اليد والرجل والعين، لأن أعضاءه ليست من لحم ولا دمঅর্থ: হিশাম ইবনে সালেম এর আক্বিদা-বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট। আল্লাহর শরীরের উপরের অংশ ফাঁকা গহ্বর বিশিষ্ট এবং নিচের অংশ নিñিদ্র। আল্লাহ তায়ালা দেহ বিশিষ্ট নয়। তবে আল্লাহর আকৃতি মানুষের আকৃতির মতো। তিনি  হাত, পা, চোখ ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। আল্লাহর অঙ্গ-প্রতঙ্গ রক্ত-মাংসের নয়।”[১১]

[১] যারা আল্লাহর শরীর, দেহ ও অঙ্গ-প্রতঙ্গ সাব্যস্ত করে তাদেরকে মুজাসসিমা বলে। [২] যারা আল্লাহর জন্য সৃষ্টির গুণাবলী সাব্যস্ত করে তাদেরকে মুশাববিহা বলে। [৩]  আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.৪৭। [৪] আত-তাবসীর ফিদ দিন, পৃ.২৫। [৫]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১৮৪। [৬] আল-ফিহরিস্ত, ইবনে নাদীম, খ.১, পৃ.১৪১। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খ.৪, পৃ.৫৪৪। [৭]  মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, পৃ.৩১-৩৪। তাদের মতবাদ সম্পর্কে অবগত হতে আরও দেখুন, আত-ম্বীহ ওয়ার রাদ, পৃ.২৪। আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০, ৪৭।  আল-বুদউ ওয়াত তা’রীখ,  খ.৫, পৃ.১৩২। আত-তাবসীর ফিদ দীন, পৃ.২৪, ৭০। আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১৮৪। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খ.১০, পৃ.৫৪৪। [৮]  ই’তেকাদু ফিরাকিল মুসলিমিন, পৃ.৩৪ ও ২০৯। [৯]  মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, পৃ.৩৪ ও ২০৯। [১০]  মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, পৃ. ২০৯। [১১]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.২১০।

মুগিরিয়া ফেরকা:

মুগিরা ইবনে সাইদ আল-ইজলি (মৃত:১১৯ হি:) ও তার অনুসারীদেরকে মুগিরিয়া বলা হয়। ইমাম যাহাবী মুগিরা ইবনে সাইদ সম্পর্কে বলেন,
وكان هذا الرجل ساحراً فاجراً شيعياً خبيثاًঅর্থ: সে যাদুকর, পাপী, শিয়া ও নিকৃষ্ট প্রকৃতির লোক ছিলো।

মুগিরিয়া ফেরকার আক্বিদা সম্পর্কে ইমাম আব্দুল কাহের বাগদাদী রহ. বলেন,
ومنها إفراطه في التشبيه، وذلك أنه زعم أن معبوده رجل من نور على رأسه تاج من نور، وله أعضاء على صور حروف الهجاء، وأن الألف منها مثال قدميه والعين على صورة عينيه، …ومنها أنه تكلم في بدء الخلق فزعم أن الله تعالى لما أراد أن يخلق العالم تكلم باسمه الأعظم فطار ذلك الاسم ووقع تاجاً على رأسه. وتأول على ذلك قوله تعالى: (سبح اسم ربك الأعلى) وزعم أن الاسم الأعلى إنما هو ذلك التاج. ثم إنه بعد وقوع التاج على رأسه كتب بإصبعه على كفه أعمال عباده. ثم نظر فيها فغضب من معاصيهم فعرق، فاجتمع من عرقه بحران أحدهما مالح والآخر عذب. ثم اطلع في البحر فأبصر ظله فذهب ليأخذه فطار فانتزع عيني ظله فخلق منها الشمس والقمر، وأفنى باقي ظله وقال: لا ينبغي أن يكون معي ثم خلق الخلق من البحرين فخلق الشيعة من البحر العذب النير فهم المؤمنون وخلق الكفرة وهم أعداء الشيعة من البحر المظلم المالح

অর্থ: তার ভ্রান্ত বিষয়গুলোর একটি হলো সে আল্লাহ তায়ালাকে নিকৃষ্টভাবে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদান করতো। সে বিশ্বাস করতো, আল্লাহ তায়ালা  আলোকময় এক ব্যক্তি, যার মাথায় নূরের মুকুট রয়েছে। আরবী বর্ণমালার আকৃতি অনুযায়ী আল্লাহর আকৃতি রয়েছে। আরবী বর্ণমালার আলিফ আল্লাহর পায়ের উদাহরণ। আরবী আইন অক্ষরটি আল্লাহর চোখের অনুরূপ। সে বিশ্বাস করতো, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির শুরুতে কথা বলেন। সে ধারণা করতো আল্লাহ তায়ালা যখন মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছা করেন তিনি তার ইসমে আ’জম উচ্চারণ করেন। এই ইসমে আজম উড়ে গিয়ে তার মাথায় বসে এবং এটি তার মুকুট হয়। সে তার বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে পবিত্র কুরআনের আয়াত উপস্থাপন করে এর বিকৃত ব্যাখ্যা করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনি আপনার প্রভূর নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন, যিনি মহান। সে এই আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা করে বলেছে, এখানে সম্মানিত নাম দ্বারা আল্লাহর মুকুট উদ্দেশ্য। আল্লাহ তায়ালার মাথায় এই মুকুট আসার পর তিনি তার দুই আঙ্গুল দ্বারা হাতের তালুর উপরে বান্দার আমল লিপিবদ্ধ করেছেন। অত:পর তিনি এই আমলগুলোর দিকে দৃষ্টি বুলান। বান্দার গোনাহ দেখে তিনি রাগান্বিত হয়ে যান। এই রাগের কারণে তিনি ঘর্মাক্ত  হয়ে যান। তার ঘাম থেকে দু’টি সমুদ্র প্রবাহিত হয়। একটি লবণাক্ত, অপরটি সুমিষ্ট। এরপর তিনি সমুদ্রের দিকে উঁকি দেন। সেখানে তিনি নিজের ছায়া দেখতে পান। তিনি সেটা ধরতে যান। কিন্তু ছায়া উড়ে যায়। এরপর তিনি তার নিজ ছায়া থেকে চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেন। অবশিষ্ট ছায়াকে তিনি নি:শেষ করে দেন। অত:পর তিনি বললেন, এগুলো আমার সাথে থাকা উচিৎ নয়। দুই সমুদ্র থেকে তিনি মাখলুককে সৃষ্টি করলেন। সুমিষ্ট পানির সমুদ্র থেকে শিয়াদেরকে সৃষ্টি করেন এবং লবণাক্ত  ও অন্ধকার সমুদ্র থেকে শিয়াদের শত্রুদেরকে সৃষ্টি করেন।”[১]

বয়ানিয়া ফেরকা:বয়ান ইবনে সাময়ান (মৃত:১১৯)  ও তার অনুসারীদেরকে বয়ানিয়া ফেরকা বলা হয়। সে কুফার অধিবাসী ছিলো। বয়ান ইবনে সাময়ানের আক্বিদা-বিশ্বাস ছিলো,

وكان يزعم أنه يعرف الاسم الأعظم، وأنه يهزم به العساكر ৃثم أنه زعم أن الإله الأزلي رجل من نور، وأنه يفنى كله غير وجهه. وتأول على ذلك قوله: (كل شيء هالك إلا وجهه) وقوله: (كل من عليها فان) وقوله (ويبقى وجه ربك) ورفِع خبر بيان هذا إلى خالد بن عبد الله القسري في زمان ولايته في العراق فاحتال عليه حتى ظفر به

অর্থ: সে বিশ্বাস করতো যে সে ইসমে আ’জম জানে। এর মাধ্যমে সে সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে বলে প্রচার করতো। তার আক্বিদা ছিলো, আল্লাহ তায়ালা নূরের তৈরি একজন লোক। আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তার এই মতের স্বপক্ষে সূরা কাসাস এর ৮৮ নং আয়াত, সূরা আর-রহমানের ২৬ ও ২৭ নং আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করতো। সূরা কাসাস এর ৮৮ নং আয়াতের অর্থ: আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সূরা আর-রহমানের ২৬ ও ২৭ নং আয়াতের অর্থ: ভূ-পৃষ্ঠের উপর যা কিছু রয়েছে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। কেবল আপনার প্রভূর চেহারা অবশিষ্ট থাকবে।বয়ান ইবনে সাময়ানের এসব ভ্রান্ত আক্বিদা সম্পর্কে ইরাকের গভর্ণর খালেদ ইবনে আব্দুল্লাহ কাসারী অবগত হন। তিনি তাকে গ্রেপ্তার করে শূলিতে চড়ান। [২]

ইউনুসিয়া ফেরকা:

বিখ্যাত শিয়া ইউনুস ইবনে আব্দুর রহমান ও তার অনুসারীরা বয়ানিকা ফেরকা নামে পরিচিত। তার আক্বিদা ছিলো, ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালাকে বহন করে। ইমাম শাহরাস্তানী রহ. বলেন,زعم أن الملائكة تحمل العرش والعرش يحمل الرب تعالىঅর্থ: সে বিশ্বাস করতো যে ফেরেশতাগণ আরশ বহন করছে এবং আরশ আল্লাহ তায়ালাকে বহন করছে।[৩]

জাওয়ারিবি ফেরকা:

দাউদ জাওয়ারিবি ও তার অনুসারীরা জাওয়ারিবি ফেরকা নামে পরিচিত। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন,

رأس في الرافضة والتجسيم من مرامي جهنم

অর্থ: মুজাসসিমা ও শিয়াদের গুরু এক জাহান্নামী।[৪]

ইমাম শাহরাস্তানী রহ. তার আক্বিদা সম্পর্কে বলেন,
يحكى عن داود أنه قال: أعفوني عن الفرج واللحية، واسألوني عما وراء ذلك فإن في الأخبار ما يثبت ذلك. وقال: إن معبوده جسم ولحم ودم ومع ذلك جسم لا كالأجسام، ولحم كاللحوم  ودم لا كالدماء، وكذلك سائر الصفات، وحكي أنه قال هو أجوف من أعلاه إلى صدره مصمت ما سوى ذلك وأن له وفرةً سوداء وله شعر قطط

অর্থ: দাউদ জাওয়ারিবি থেকে বর্ণিত, সে বলতো, আমাকে আল্লাহর গুপ্তাঙ্গ  ও দাঁড়ি ছাড়া আর সব কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো। কেননা, হাদীসে এই দু’টো ছাড়া সব কিছু আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। সে বিশ্বাস করতো, আল্লাহ তায়ালা শরীর, রক্ত, গোশত বিশিষ্ট। এগুলো থাকা সত্ত্বেও তার শরীর অন্য কোন শরীরের মতো নয। আল্লাহর গোশত অন্য কারও গোশতের মতো নয় এবং তার রক্ত অন্য কারও রক্তের মতো নয়।  আল্লাহর অন্য সব গুণ সম্পর্কে একই কথা। তার থেকে বর্ণিত আছে, সে বলতো, আল্লাহ তায়ালা উপরের অংশ থেকে বুক পর্যন্ত ফাঁপা গহ্বর বিশিষ্ট এবং পরবর্তী অংশ ফাঁপা নয়। আল্লাহর কালো গোফ রয়েছে এবং কোকড়ানো চুল রয়েছে।[৫]

শয়তানিয়া ফেরকা:

শয়তান আত-তাক ও তার অনুসারীদেরকে শয়তানিয়া ফেরকা বলা হয়। শয়তান আত-তাক এর প্রকৃত নাম হলো, মুহাম্মাদ বিন আলী আল-কুফী। সে শিয়াদের বড় একজন ইমাম  ছিলো। মুশাববিহা ও মুজাসসিমাদের আক্বিদা প্রচার করতো। সে হিশাম আল-জুয়ালেকীর অনেক মতাদর্শ গ্রহণ করেছিলো।[৬]
তার আক্বিদা  সম্পর্কে ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. বলেন,

وقال إن الله تعالى على صورة إنسان ربانيসে বলতো, আল্লাহ তায়ালা মানুষের আকৃতির অনুরূপ আকৃতি বিশিষ্ট।[৭]

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী রহ. শয়তান তাকের আক্বিদা সম্পর্কে বলেন,
الشيطانية أتباع شيطان الطاق وهم يزعمون أن الباري تعالى مستقر على العرش والملائكة يحملون العرش. وهم وإن كانوا ضعفاء بالنسبة إلى الله تعالى. لكن الضعيف قد يحمل القوي كرجل الديك التي تحمل مع دقتها جثة الديك

অর্থ: শয়তান তাকের অনুসারীদেরকে শয়তানিয়া বলা হয়। তাদের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশে অবস্থান করেন এবং ফেরেশতাগণ আরশ বহন করে। ফেরেশতারা যদিও আল্লাহর তুলনায় দুর্বল কিন্তু কখনও দুর্বল সবলকে বহন করতে পারে। যেমন, মোরগের পা দু’টি চিকন হওয়া সত্ত্বেও মোরগের শরীর বহন করে।[৮]

আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে রাফেযী শিয়াদের কুফুরী আক্বিদা ও তাদের বিভিন্ন ফেরকা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো। এই আলোচনার মৌলিক একটি উদ্দেশ্য হলো, বর্তমানেও বিভিন্ন নামে এসব আক্বিদা আমাদের সমাজে প্রচার করা হচ্ছে সে বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দেয়া। ইসলামের তেরশ’ বছর আগে এসব কুফুরী আক্বিদার সূচনা হলেও এগুলো নি:শেষ হয়ে যায়নি। বরং বর্তমানে নতুনরূপ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে মানুষকে এসব কুফুরীর দিকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ পাক মুসলিম উম্মাহকে এধরণের ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন।

[১] ্আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, ২৩১-২৩৩। আরও দেখুন,  আল-ফিসাল, ইবনে হাজাম, খ.৪, পৃ.১৪১। আত-তাবসীর, পৃ.৭০,  আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানী, পৃ.১৭৬, আল-কামেল, ইবনুল আসীর, খ.৪, পৃ.৪২৯।

[২]  আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক,  পৃ.২২৭-২২৮। বিস্তারিত জানতে দেখুন,  আল-ফিসাল, খ.৪, পৃ.১৪১। আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, পৃ.১৫৩।

[৩]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১৮৮।
[৪] লিসানুল মিজান, খ.২, পৃ.৪২৭।

[৫]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৫। আল-ফিসাল, খ.৪, পৃ.১৩৯।

[৬] আল-বুদউ ওয়াত তারিখ, খ.৫, পৃ.১৩২।

[৭]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১৮৭।

[৮] ই’তেকাদু ফিরাকিল মুসলিমিন, পৃ.৬৩।

আল্লাহ সম্পর্কে ভ্রান্ত দেহবাদী আকিদার স্বরূপ বিশ্লেষণ : মুশাববিহা ও মুজাসসিমা ফেরকা (পর্ব ২) :-

মুকাতেলিয়া ফেরকা:

মুকাতিল ইবনে সুলাইমান আল-বালখী (মৃত:১৫০ হি:) ও তার অনুসারীদেরকে মুকাতিলিয়া ফেরকা বলা হয়। মুকাতিল ইবনে সুলাইমান তাফসীর শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলো, কিন্তু আক্বিদার ক্ষেত্রে সে ছিলো মুশাববিহা ও মুজাসসিমা। হাদীস শাস্ত্রে মুহাদ্দিসদের ঐকমত্য অনুসারে সে পরিত্যক্ত।

ইমাম যাহাবী রহ. সিয়ারু আ’লামিন নুবালাতে লিখেছেন,
أجمعوا على تركه
অর্থ: হাদীস শাস্ত্রে সে পরিত্যাক্ত হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের ইজমা হয়েছে।[১]

মুকাতিল ইবনে সুলাইমান মুজাসসিমা হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার আক্বিদা বিশ্বাস বাতিল হওয়ার ব্যাপারেও কারও দ্বিমত নেই।
ইমাম আবুল হাসান আশআরাী রহ. তার সম্পর্কে বলেন,

حكي عن أصحاب مقاتل أن الله جسم وأن له جثةً وأنه على صورة الإنسان لحم ودم وشعر وعظم وجوارح وأعضاء من يد ورجل ورأس وعينين مصمت وهو مع ذلك لا يشبه غيره ولا يشبهه غيره

অর্থ: মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের অনুসারীদের থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তায়ালা দেহ ও শরীর বিশিষ্ট। তিনি মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট। আল্লাহর গোশত, রক্ত, চুল, হাড্ডি ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেমন হাত, পা, মাথা ও দু’ চোখ রয়েছে। এগুলো থাকা সত্ত্বেও তিনি কারও সঙ্গে সাদৃশ্য রাখেন না এবং কেউ তার সদৃশ নয়।[২]

মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এর আক্বিদাগত ভ্রান্তি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও ইবনে তাইমিয়া রহ. তার ওকালতি করার অনর্থক চেষ্টা করেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. মুজাসসিমা প্রীতি খুবই আশ্চর্যজনক। তিনি মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এর অনর্থক ওকালতি করে লিখেছেন,

وأما مقاتل فالله أعلم بحقيقة حاله والأشعري ينقل هذه المقالات من كتب المعتزلة وفيهم انحراف عن مقاتل بن سليمان فلعلهم زادوا في النقل عنه أو نقلوا عن غير ثقة وإلا فما أظنه يصل إلى هذا الحد

অর্থ: মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ ভালো জানেন। ইমাম আবুল হাসান আশআরী মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের এসব বক্তব্য মু’তাজিলাদের থেকে বর্ণনা করেছে। সম্ভবত তারা মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে অতিরঞ্জন করেছে অথবা বিশ্বস্ত নয় এমন বর্ণনাকারীদের বর্ণনা গ্রহণ করেছে। নতুবা আমি মনে করি না, সে আক্বিদার ক্ষেত্রে এতোটা নি¤œ স্তরে পৌঁছেছিল।[৩]অথচ মুকাতিল ইবনে সুলাইমান মুজাসসিমা হওয়ার বিষয়টি কারও কাছে অস্পষ্ট নয়। ইবনে তাইমিয়া রহ. এর এই মুজাসসিমা প্রীতি তাকে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত করেছে। মুজাসসিমাদের প্রতি এই অনর্থক প্রীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেও মুজাসসিমাদের আক্বিদা প্রচার করেছেন এবং সেগুলো সমর্থন করেছেন।

খতীব বাগদাদী নিজ সনদে ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন,أتانا من المشرق رأيان خبيثان جهم معطل ومقاتل مشبه অর্থ: পূর্ব দিক থেকে আমাদের নিকট দু’টি নিকৃষ্ট মতবাদ এসেছে। ১. জাহাম ইবনে সাফওয়ান আল্লাহ তায়ালার গুণাবলী অস্বীকার করে। ২. মুকাতিল ইবনে সুলাইমান আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদান করে।[৪]

ইমাম আবুল হাসান আশআরী রহ. মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এর আক্বিদা বর্ণনা করে লিখেছেন,

إن الله جسم وله جثه وإنه على صورة الإنسان لحم ودم وشعر وعظم..وهو مع ذلك لا يشبه غيره، ولا يشبهه غيره

অর্থ: আল্লাহ তায়ালা শরীর ও দেহ বিশিষ্ট। তিনি মানুষের আকৃতির মতো। তার  গোশত, রক্ত, চুল ও হাড় রয়েছে। আল্লাহ তায়ালার এগুলো থাকলেও তিনি কারও সাথে সাদৃশ্য রাখেন না এবং কোন কিছু তার সদৃশ নয়।[৫]

মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের মতাদর্শ একটু লক্ষ্য করুন। সে আল্লাহর জন্য শরীর সাব্যস্ত করেছে। রক্ত, মাংশ সাব্যস্ত করেছে। অথচ নিজেকে বাঁচানোর জন্য বলেছে, আল্লাহ তায়ালা কারও সাথে সাদৃশ্য রাখেন না। পরবর্তী আলোচনায় মুশাববিহাদের এই প্রতারণামূলক বক্তব্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই দেখতে পাবেন। তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য মানুষের আকৃতি সাব্যস্ত করলেও সেটা সাদৃশ্য দেয়া হয় না। আল্লাহর জন্য হাড্ডি ও চুল সাব্যস্ত করলেও সাদৃশ্য দেয়া হয় না। তারা মূলত: সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছে। আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেয়ার পর বলবে যে আল্লাহ তায়ালার সাথে কিছুই সাদৃশ্য রাখে না। মুশাববিহারা এধরনের স্ববিরোধীতার আশ্রয় নিয়েই তাদের কুফুরী আক্বিদা সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচার করে থাকে।

ইমাম জাহাবী রহ. মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে বলেন,

مقاتل بن سليمان.. متروك الحديث وقد لطخ بالتجسيم مع أنه كان من أوعية العلم بحراً في التفسيرমুকাতিল ইবনে সুলাইমান হাদীসের ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত। সে আল্লাহর শরীর সাব্যস্তের নোংরা আক্বিদায় বিশ্বাসী ছিলো। অথচ সে প্রচুল ইলমের অধিকারী ছিলো এবং তাফসীর শাস্ত্রে সমুদ্রের মতো গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলো।[৬]

ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসগণের বর্ণনা অনুযায়ী মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এই নিকৃষ্ট আক্বিদায় বিশ্বাসী হওয়ার মূল কারণ ছিলো সে ইহুদী-খ্রিষ্টানদের বর্ণনা গ্রহণ করতো এবং তাদের আক্বিদা-বিশ্বাস চর্চা করতো। ইসরায়েলী বর্ণনা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদান করতো। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এ প্রসঙ্গে বলেন,

كانت له كتب ينظر فيها إلا أني أرى أنه كان له علم بالقرآن

অর্থ: তার কাছে (ইহুদী-খ্রিষ্টানদের) কিছু কিতাব ছিলো, সে এগুলো দেখতো। তবে সে তাফসীর শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলো।[৭]ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে বলেন,

كان يأخذ عن اليهود والنصارى علم القرآن الذي يوافق كتبهم وكان مشبها يشبه الرب بالمخلوقين. وكان مع ذلك يكذب في الحديث অর্থ: সে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের নিকট থেকে তাফসীর শিখতো। ইহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের কিতাব থেকে এই তাফসীর বর্ণনা করতো। সে একজন মুশাববিহা ছিলো। আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য প্রদান করতো। এছাড়া সে হাদীস শাস্ত্রে মিথ্যুক ছিলো।[৮]

ইমাম আহমাদ ইবনে সাইয়ার রহ. তাঁর সম্পর্কে বলেন,
مقاتل متروك الحديث كان يتكلم في الصفات بما لا تحل الرواية عنه

অর্থ: মুকাতিল ইবনে সুলাইমান হাদীসের ক্ষেত্রে পরিত্যাক্ত। আল্লাহর গুণাবলীর ক্ষেত্রে সে এমন সব মতবাদ প্রচার করতো যা বর্ণনা করাও বৈধ নয়।[৯]

ইমাম যাহাবী রহ. তার সম্পর্কে বলেন,ظهر بخراسان الجهم بن صفوان ودعا إلى تعطيل صفات الله عز وجل.. وظهر في خراسان في قبالته مقاتل بن سليمان المفسر وبالغ في إثبات الصفات حتى جسم وقام على هؤلاء علماء التابعين وأئمة السلف وحذروا من بدعهم

অর্থ: খোরাসানে জাহাম ইবনে সাফওয়ানের আবির্ভাব হয়। সে মানুষকে আল্লাহ তায়ালার গুণাবলী অস্বীকারের প্রতি আহ্বান করে। একই সময়ে খোরাসানে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের আবির্ভাব হয়। সে আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্তের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করে, এমনকি সে আল্লাহর দেহ সাব্যস্ত করে। এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাবেয়ী ও সালাফে-সালেহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সতর্ক করেন এবং তাদের প্রচারিত বিদয়াত থেকে মানুষকে সচেতন করেন।[১০]

খতীব বাগদাদী রহ. তাফসীর বিষয়ে তার জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। খতীব বাগদাদী রহ. বলেন, সে মানুষের তাফসীর একত্র করে নিজের নামে চালিয়ে দিতো এবং মুফাসসিরদের কাছ থেকে শোনা ব্যতীত তাদের বর্ণনা উল্লেখ করতো।[১১]

মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের আক্বিদাগত ভ্রান্তির ব্যাপারে কোন সংশয় নেই। এ ব্যাপারে কোন ইমামের দ্বিমত নেই। মুজাসসিমাদের প্রতি অন্যায় প্রীতির কারণে ইবনে তাইমিয়া রহ. মুকাতিল ইবনে সুলাইমান সম্পর্কে যা কিছু বলেছে তার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই। নিজস্ব কিছু ধারণার উপর ভিত্তি করে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর পক্ষে এধরনের ভিত্তিহীন মন্তব্য খুবই আশ্চর্যজনক।

আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দেয়ার বিষয়টি শুধু মুকাতিল ইবনে সুলাইমান এর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে অনেক মুহাদ্দিসই এসব ইসরাইলী বর্ণনা দ্বারা প্রভাবিত এই ভ্রান্ত আক্বিদায় নিপতিত হয়েছিলো। মুহাদ্দিসরা শুধু এগুলো বর্ণনা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং এগুলো তাদের আক্বিদা হিসেবে প্রচার করেছে এবং এর বিরোধীতাকারীদেরও মারাত্মক সমালোচনা করেছে। অনেকে এক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রসর হয়ে আহলে কিতাবদের বর্ণনাগুলো রাসূল স. এর হাদীস বলে চালিয়ে দিয়েছে এবং এভাবেই আল্লাহর গুণাবলীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের জাল বর্ণনার উদ্ভব হয়েছে।

ইমাম শাহরাস্তানী রহ. বলেন,

وزادوا في الأخبار أكاذيب وضعوها ونسبوها إلى النبي عليه الصلاة والسلام وأكثرها مقتبس من اليهود فإن التشبيه فيهم طباع حتى قالوا اشتكت عيناه فعادته الملائكة وبكى على طوفان نوح حتى رمدت عيناه وإن العرش ليئط من تحته أطيط الرحل الجديد وإنه ليفضل من كل جانب أربعة أصابع

অর্থ: তারা আল্লাহর গুণাবলীর বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা বর্ণনার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে এবং এগুলোকে রাসূল স. এর হাদীস হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। এসব বর্ণনার অধিকাংশ ইহুদীদের কাছ থেকে নেয়া। কেননা আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়ার বিষয়টি ইহুদীদের স্বভাবজাত ছিলো। এমনকি তারা বলত, আল্লাহর দুই চোখ অসুস্থ হয়ে পড়লে ফেরেশতা তার শুশ্রুষা করেন। নূহ আ. এর তুফানের সময় আল্লাহ তায়ালা এতো ক্রন্দন করেন যে তার দুই চোখ ফুলে ওঠে। নতুন বাহনে আরোহণের সময় যেমন আওয়াজ হয় তেমনি আল্লাহ তায়ালা যখন আরশে আরোহণ করেন  তখন আওয়াজ হয়। তিনি আরশের চার দিক থেকে চার আঙ্গুল পরিমাণ পৃথক রয়েছেন।[১] অনেক মুহাদ্দিস ইহুদীদের এসব বর্ণনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুশাববিহাদের আক্বিদা পোষণ করতো। তাদের লিখিত আক্বিদা বিষয়ক কিতাবগুলো তাদের এই ভ্রান্তির স্পষ্ট প্রমাণ। আস-সুন্নাহ, আল-ইবানা বা আর-রদ্দু আলাল জাহমিয়া নামে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেসব কিতাব লিখেছে এগুলো পড়লে বোঝা যায়, তারা ইসরাইলী বর্ণনা দ্বারা কতটা প্রভাবিত ছিলো।  এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, অনেক মুহাদ্দিস শুধু ইসরাইলী বর্ণনা একত্র করার উদ্দেশ্যে কিতাব লিখেছেন। তারা এর থেকে কোন আক্বিদা প্রমাণ করেননি এবং এর বিপরীত আক্বিদা পোষণকারীদেরও সমালোচনা করেননি। আমরা সেসব মুহাদ্দিসগণ সম্পর্কে আলোচনা করছি না। বরং যেসব মুহাদ্দিস রীতিমত এগুলো দ্বারা তাদের আক্বিদা প্রমাণ করেছেন এবং এর বিপরীত আক্বিদা পোষণকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন, আমরা কেবল তাদের সম্পর্কে আলোচনা করছি।আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী রহ. বলেন,

على أنه حيث سمى كتابه (السنة) يفيد أن ما حواه  ذلك الكتاب هو العقيدة المتوارثة من الصحابة والتابعين.. فلا حاجة إلى مناقشته فيما ساقه من الأسانيد… فيتبين بذلك الفرق بين ذكر شيء في كتاب يسميه مؤلفه باسم (السنة) وبين ذكره في كتاب لا يسمى بمثل هذا الاسم، لأن الثاني لا يدل على أن جميع ما فيه مما يعتقده مؤلفه، بل قد يكون جمع فيه ما لقي من الروايات تاركاً تمحيصها للمطالع بخلاف الأول فلا نناقش المؤلف في الأسانيد بل نوجه النقد إلى المؤلف مباشرة من جهة أن ما حواه هو معتقده

অর্থ: যেহেতু সে এই কিতাবের নাম রেখেছে কিতাবুস সুন্নাহ, তার এই নামকরণ দ্বারা বোঝা যায় সে এই কিতাবে যা কিছু লিখেছে এগুলো সাহাবা ও তায়েবীগণ থেকে পরম্পরাসূত্রে বর্ণিত আক্বিদা। সুতরাং তার লিখিত কিতাবের সনদ নিয়ে আলোচনার কোন প্রয়োজন পড়ে না।  স্পষ্টত: লেখক তার কিতাব যদি আস-সুন্নাহ হিসেবে নামকরণ করে তাহলে তার মধ্যে ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য থাকে।  কেননা যারা তাদের কিতাবকে এজাতীয় নামে নামকরণ করেনি তারা বর্ণনাগুলো সংকলনের সময় তাদের আক্বিদা প্রমাণকে মুখ্য গণ্য করে না। অনেক সময় একই বিষয়ক সকল বর্ণনা একত্র করার উদ্দেশ্যে বর্ণনা উল্লেখ করে থাকে। প্রথম ব্যক্তি এর বিপরীত। সে মূলত: এসব বর্ণনা দ্বারা তার আক্বিদার প্রমাণ দিয়েছে। সুতরাং আমরা এসব বর্ণনার সনদ বিশ্লেষণ ছাড়া সরাসরি তার লেখকের আক্বিদা বিশ্লেষণ করবো, কেননা সে তার আক্বিদার কিতাবে যা কিছু লিখেছে সেটি তার আক্বিদা হিসেবেই লিখেছে। [২] যারা তাদের আক্বিদার কিতাবে ইসরাইলী বর্ণনাগুলো উল্লেখ করেছে তারা মূলত: এসব বর্ণনা দ্বারা তাদের আক্বিদা প্রমাণ করতে চেয়েছে। সুতরাং এক্ষেত্রে বর্ণনা দুর্বল না সহীহ, সেটা এখানে মুখ্য নয়। বরং সে এই বর্ণনা থেকে যে আক্বিদা প্রমাণ করেছে সেটাই মুখ্য। সুতরাং যেসব মুহাদ্দিস তাদের আক্বিদার কিতাবে ইহুদীদের এসব ভ্রান্ত আক্বিদা বর্ণনা করে নিজেদের আক্বিদা প্রমাণের চেষ্টা করেছে, তাদের এসব বর্ণনার সনদ বিশ্লেষণ করার পূর্বে তাদের আক্বিদা নিযে প্রশ্ন করা হবে। জাল, যয়ীফ ও ইসরাইলী বর্ণনা দ্বারা কেউ যদি আক্বিদা প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তবে তাকে শুধু একারণে নির্দোষ বরা যাবে না যে, সে জাল বর্ণনা এনেছে। বরং এসব জাল বর্ণনা থেকে সে কী কী ভুল আক্বিদা প্রমাণ করতে চেয়েছে সেগুলোও বিশ্লেষণ করা হবে।  বিষয়টি সালাফী শায়খরাও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

ড. রেজা বিন না’সান লিখেছেন,إن علماء السلف قد ألفوا كتباً كثيرة وقد أطلق على كثير منها اسم الإبانة…. وأحيانا يطلقون على هذه المؤلفات اسم (السنة) أو (شرح السنة) – وعد كتباً منها كتاب السنة لعبد الله بن أحمد، والسنة لابن أبي عاصم، ثم قال- ويهدف مؤلفو هذه الكتب إلى إبراز عقيدة السلف كما كانت خالصة من شوائب الفرق الأخرى وشبهها، وذلك من خلال روايتهم للآثار الواردة في هذه العقيدة. ويكاد يكون موضوع هذه الكتب ونهجها واحداً وهو كما قلنا رواية الأحاديث الواردة في جميع أبواب العقيدة السلفية وذكر عقائد السلف الصالح

অর্থ: পূর্ববর্তী আলেমগণ (আক্বিদা বিষয়ক) অনেক কিতাব লিখেছেন। তদের অনেক কিতাবের নাম আল-ইবানা। কখনও কখনও তারা এসব আক্বিদার কিতাবের নাম দিয়েছে আস-সুন্নাহ অথবা শরহুস সুন্নাহ। এজাতীয় কিতাবের মধ্যে রয়েছে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছেলের কিতাব আস-সুন্নাহ এবং ইবনে আবি আসেম এর লেখা আস-সুন্নাহ। এসব কিতাবের লেখকদের মূল উদ্দেশ্য হলো, সালাফে-সালেহীনের আক্বিদা বিশ্বাস সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা। অন্যান্য বাতিল ফেরকার ভ্রান্তি স্পষ্ট করে সালাফে-সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদা বর্ণনাই ছিলো এসব কিতাব লেখার মূল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের আক্বিদা প্রমাণের জন্য এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সত্য কথা হলো, আক্বিদা বিষয়ক এজাতীয় সকল কিতাব রচনার পদ্ধতি একই। সেটি হলো, তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বিদা বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যেক অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট আক্বিদা ও এসম্পর্কিত হাদীস উল্লেখ করেছেন।[৩]

[১]  আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৬।

[২]  মাকালাতুল কাউসারী, পৃ৩২৬।

[৩]  ইবনে বাত্তা এর লেখা আল-ইবানা এর তাহকীক, খ.১, পৃ.৪৮।

কাররামিয়া ফেরকা:

এই ফেরকার আক্বিদা-বিশ্বাস জানার পূর্বে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া জরুরি। প্রথমত: মুশাববিহা ও মুজাসসিমাদের অন্যান্য ফেরকা সময়ের পরিবর্তনে বিলুপ্ত হলেও এই ফেরকার আক্বিদা বিশ্বাস এখনও মুসলিম সমাজে প্রচলিত। এই ফেরকার প্রবর্তকের মৃত্যুর সঙ্গে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এই ফেরকার অনেক আক্বিদা-বিশ্বাসই বর্তমানে সালাফী আক্বিদার মোড়কে আমাদের সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমান সালাফী আক্বিদা মূলত: পূর্ববর্তী মুজাসসিমা ও মুশাববিহা আক্বিদার নতুন রূপ, যা নতুন মোড়কে সাধারণ মানুষের নিকট উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ফেরকার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন শ্লোগান, কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এই ফেরকা সাধারণ মানুষের মাঝে আক্বিদাগত ভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়। এই ফেরকার অনেকেই বাহ্যিক ইবাদত বন্দেগি দ্বারা সাধারণ মানুষকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতো এবং তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতো কুফুরী আক্বিদা সমূহ। এভাবে তারা ইসলামের কয়েক শতাব্দীব্যাপী মুসলমানদের একটি শ্রেণীকে আক্বিদার ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত করেছে। সময়ের পরিবর্তনে এদের মতাদর্শে নিত্য-নতুন মতবাদের উদ্ভব হয়েছে। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে কাররামিয়া ফেরকাটি মূলত: মুসলমানদের মাঝে ইহুদী আক্বিদার প্রতিনিধিত্ব করেছে। কাররামিয়া ফেরকার উত্তরসূরী হলো বর্তমান সময়ের সালাফী ও আহলে হাদীস ফেরকা। কাররামিয়াদের ভ্রান্ত আক্বিদা-বিশ্বাস উল্লেখের পরে এদের ইতিহাস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করবো ইনশাআল্লাহ।কাররামিয়া ফেরকার প্রতিষ্ঠাতা:কাররামিয়া ফেরকার প্রতিষ্ঠাতা হলো আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে কাররাম। সে সিজিস্তানে জন্মগ্রহণ করে এবং সেখানেই বড় হয়। সে সিজিস্তান থেকে খোরাসানে প্রবেশ করে, পরবর্তীতে নিশাপুরে ফিরে আসে। এবং সেখানে তার ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার শুরু করে। সিজিস্তান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর নিশাপুরে গেলে সেখান থেকেও সে বিতাড়িত হয়। পরবর্তীতে সে বাইতুল মুকাদ্দাসে অবস্থান শুরু করে। সেখানেই সে ২৫৫ হি: ইন্তেকাল করে।

ইবনে কাররাম মূলত: ইবাদত বন্দেগী ও বুযুর্গীর মাধ্যমে মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতো। সে খুবই সামান্য ইলম অর্জন করেছিলো। প্রত্যেক মাযহাব থেকে কিছু কিছু নিয়ে নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে। দুনিয়া বিমুখতা ও খোদাভীতি দেখিয়ে নিজের দিকে সাধারণ মানুষকে ভিড়াতো। তার এসব কৌশলের কারণে অনেক সাধারণ মানুষ তার ভক্ত হয়। এমনকি তার একদা তার অনুসারীদেরকে গ্রেপ্তার করা হলে প্রায় সত্তর হাজারী অনুসারী গ্রেপ্তার হয়।তার মৃত্যুও সময় বাইতুল মুকাদ্দাসে তার অনুসারী ছিলো প্রায় বিশ হাজার। সিজিস্তান ও খোরাসানে এরকম হাজার হাজার অনুসারী ছিলো।[১২]কাররামিয়াদের ভ্রান্ত কুফুরী আক্বিদা-বিশ্বাস:কাররামিয়াদের অনেক ফেরকা ও মতবাদ রয়েছে। ভ্রান্ত ফেরকার উপর লিখিত গ্রন্থগুলোতে এদের অনেক ফেরকার নাম পাওয়া যায়। ইমাম আবু মনসুর বাগদাদী রহ. আল-ফরকু বাইনাল ফিরাক এর মধ্যে এদের তিনটি দলে ভাগ করেছেন। ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী রহ. এদেরকে ছয়টি দলে বিভক্ত করেছেন। ইমাম শাহরাস্তানী রহ. এদের বারটি দলের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা তাদের বিভিন্ন ফেরকা সম্পর্কে আলোচনার পরিবর্তে তাদের মৌলিক আক্বিদাগুলো এখানে তুলে ধরবো।মুহাম্মাদ ইবনে কাররামের একটি মৌলিক ভ্রান্ত আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা দেহ ও শরীর বিশিষ্ট। তার দেহের একটি সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে। তার মতে আল্লাহর দেহের নিচের দিকের কেবল সীমা ও সমাপ্তি রয়েছে, যেই দিক আরশের সাথে সংশ্লিষ্ট।[১৩]ইবনে কাররামের আরেকটি আক্বিদা হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপরের অংশ স্পর্শ করে আছেন।[১৪]

ইবনে কাররামের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর স্থির হয়ে আছেন। সত্ত্বাগতভাবে তিনি উপরের দিকে রয়েছেন। আরশ হলো আল্লাহর অবস্থানের স্থান।ইবনে কাররামের নিকট আল্লাহ তায়ালা চলা-ফেরা করেন, তিনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করেন, তিনি উপর থেকে নিচে অবতরণ করেন।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইবনে কাররামের মতে আল্লাহ তায়ালার ভার বা ওজন রয়েছে। ইমাম বাগদাদী রহ. বলেন,

وأعجب من هذا كله أن ابن كرام وصف معبوده بالثقل وذلك أنه قال في كتاب عذاب القبر في تفسير قوله تعالى “إذا السماء انفطرت”  إنها انفطرت من ثقل الرحمن عليها

অর্থ: পূর্বোক্ত কুফুরী আক্বিদাগুলোর চেয়ে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আক্বিদা হলো মুহাম্মাদ ইবনে কাররাম আল্লাহ তায়ালার জন্য ওজন বা ভার সাব্যস্ত করেছে। সে তার আজাবুল কবর বইয়ে সূরা ইনফেতার এর প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর ওজন সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন (অর্থ:) যখন আসমান বিদীর্ণ হবে।[১৫] সে এর ব্যাখ্যায় লিখেছে, আসমান আল্লাহর ভারে বিদীর্ণ হবে।[১৬]ইবনে কাররামের আরেকটি কুফুরী আক্বিদা হলো, সে আল্লাহর জন্য কাইফিয়াত বা অবস্থা সাব্যস্ত করেছে। ইমাম বাগদাদী রহ. লিখেন,ثم إن ابن كرام ذكر في كتابه عذاب القبر باباً له ترجمة عجيبة فقال: باب في كيفوفية الله عز وجل، ولايدري العاقل من ماذا يتعجب أمن جسارته على إطلاق لفظ الكيفية في صفات الله عز وجل؟ أم من قبح عبارته عن الكيفية بالكيفوفية، وله من جنس هذه العبارة أشكال ৃ وقد عبر عن مكان معبوده في بعض كتبه بالحيثوثية وهذه العبارات لائقة بمذهبه السخيف

অর্থ: ইবনে কাররাম তার আজাবুল কবর নামক কিতাবে একটি আশ্চর্যজনক পরিচ্ছেদ লিখেছে। পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছে, আল্লাহর কাইফিয়াত বা অবস্থার বর্ণনা। আমি জানি না, একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার এই পরিচ্ছেদের নাম দেখে আশ্চর্যন্বিত হবে না কি আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে কাইফিয়াত বা অবস্থা সাব্যস্তের মতো ধৃষ্টতা দেখে আশ্চর্য হবে, না কি তার নিকৃষ্ট শব্দ ব্যবহারে আশ্চর্য হবে? সে আরবী কাইফিয়াত শব্দ থেকে বিকৃত শব্দ কাইফুফিয়াত বানিয়েছে। সে এজাতীয় আরও অনেক বিকৃত শব্দ ব্যবহার করেছে। সে তার একটি কিতাবে আল্লাহর স্থান সাব্যস্তের জন্য হাইসুসিয়াত শব্দ ব্যবহার করেছে। এধরনের বিকৃত শব্দ শুধু তার নিকৃষ্ট মাযহাবেরই উপযুক্ত।[১৭]

মুহাম্মাদ  ইবনে কাররাম ও তার অনুসারীদের ভ্রান্ত আক্বিদাসমূহ:

ইমাম আব্দুল কাহের বাগদাদী,  ইমাম ইসফারাইনী, ও ইমাম শাহরাস্তানী রহ. মুহাম্মাদ ইবনে কাররাম ও তার অনুসারীদের আক্বিদা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আমরা তাদের মৌলিক আক্বিদাগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করছি,

১. আল্লাহ তায়ালার পরিমাপ ও সীমা রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা রয়েছে। পরিভাষা অনুযায়ী দৈঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বিশিষ্ট বস্তুকে মূলত: দেহ বলা হয়। এজন্য প্রত্যেক মুজাসসিমা আল্লাহ তায়ালার দেহ সাব্যস্ত করে থাকে।

২. আল্লাহ তায়ালাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা সম্ভব। এমনকি আল্লাহ তায়ালাকে স্পর্শ করা সম্ভব। কারণ তাদের মতে আল্লা তায়ালা জিসম বা দেহবিশিষ্ট। আর প্রত্যেক দেহ বিশিষ্ট বস্তু র্শ করা সম্ভব।

৩. আল্লাহ তায়ালা আরশ স্পর্শ করে আছেন। কেননা তিনি আরশের উপর বসে আছেন। তাদের কারও কারও মতে তিনি আরশ থেকে পৃথক অবস্থায় আরশের উপরে রয়েছেন।

৪.আল্লাহ তায়ালার অঙ্গ-প্রতঙ্গ রয়েছে। যেমন, হাত, চোখ, পা ইত্যাদি।

৫. অধিকাংশ মুজাসসিমার মতে আল্লাহ তায়ালা সব দিক থেকে সীমাবদ্ধ। তাদের কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তায়ালা নিচের দিক তথা আরশের দিক থেকে সীমাবদ্ধ এবং আরশ ব্যতীত অন্যান্য দিকে অসীম।

৬. আল্লাহ তায়ালার শোনা, দেখা, ইলম, কুদরত মোট কথা সব গুণ নশ্বর। এগুলো আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে সৃষ্টি হয়।

৭. আল্লাহ তায়ালার কোন কাজের জন্য নড়া-চড়া প্রয়োজন। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা কিছু করার জন্য নড়া-চড়া বা হরকত করেন। তাদের কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তায়ালার নড়া-চড়াই হলো আল্লাহর কাজ।[১৮]

[১] সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খ.৭, পৃ.২০২।  বিস্তারিত জানতে দেখুন, আত-তারীখুল কাবীর, খ.৮, পৃ.১৪। আল-জারহু ওয়াত তা’দীল, খ.৭, পৃ.৩৪৫, মিজানুল ই’তেদাল, খ.৪, পৃ.১৭২।

[২] মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, পৃ.১৫২, ২০৯।

[৩] মিনহাজুস সুন্নাহ, খ.২, পৃ.৬১৮।

[৪]  তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.১৬৪, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খ.৭, পৃ.২০২।

[৫] মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, পৃ.২৫১।

[৬]  তাযকিরাতুল হুফফায, খ.১, পৃ.১৭৪। তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.১৬২।

[৭]  তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.১৬১।

[৮]  আল-মাজরুহুন, খ.২, পৃ.১৫। আরও দেখুন, ওফায়াতুল আইয়ান, খ.৫, পৃ.২৫৫,  আজ-জুয়াফা, ইবনুল জাওযী, খ.১, পৃ.১৩৬।

[৯]  তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.১৬২।

[১০] ত্ববাকাতুল হুফফায, খ.১, পৃ.১৫৯।

[১১] তারীখে বাগদাদ, খ.১৩, পৃ.১৬২।  তাহযীবুল কামাল, খ.২৮, পৃ.৪৩৬।

[১২] আত-তাবসীর ফিদ দীন, পৃ.৬৫। আল-মুনতাজিম, ইবনুল জাওযী, খ.১২, পৃ.৯৮।

[১৩] আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৩, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮,  ই’তেকাদু ফিরাকিল মুসলিমিন, পৃ.১৭।

[১৪] আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৪, আল-মিলালু ওয়ান নিহাল, পৃ.১০৮।

[১৫] সূরা আল-ইনফিতার, আয়াত নং ১।

[১৬]  আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৭।

[১৭] আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃ.২০৭।

[১৮] আল-কাশিফুস সগীর, সাইদ আব্দুল-লতিফ ফুদা, পৃ.৩১-৩২।

আল্লাহর দয়া ছাড়া কারো আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না :-

→→  নবীজি রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যারা আবদাল শ্রেণীর অলিআল্লাহ, তারা নামাজ-রোজার বিনিময়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে না। তবে তারা বদান্যতা, হৃদয়ের পবিত্রতা এবং মানুষকে হেদায়েতের বিনিময়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে।’

রেফারেন্স :
★ [ইয়াহ্উল উলুম, হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী

→→ হযরত জিবরাঈল (আঃ) নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে এসে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি পাহাড়ের উচ্চ চূড়ায় পাঁচশ বছর ধরে আল্লাহ পাকের ইবাদতে মশগুল ছিল। ঐ পাহাড়ের চারদিক লবণাক্ত পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। আল্লাহ তা’আলা তার জন্য পাহাড়ের অভ্যন্তরে সুপেয় পানির ঝর্ণা এবং একটি আনার গাছের সৃষ্টি করেন।
প্রতিদিন সেই ব্যক্তি আনার ফল খেত এবং পানি পান করত। আর পানি দিয়ে অযূ করত। সে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে এই দু’আ করল- হে আল্লাহ্‌! আমার দেহ থেকে রূহ যেন সেজদারত অবস্থায় কবয করার ব্যবস্থা করা হয়।
আল্লাহ্‌ তা’আলা তার এই দু’আ কবুল করেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেন- আমি আসমানে আসা যাওয়ার সময় তাকে সেজদারত দেখতাম। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তা’আলা তার সম্পর্কে বলবেনঃ আমার এই বান্দাকে আমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করাও। ঐ ব্যক্তি বলবে না, বরং আমার আমলের বরকতে।
তখন নির্দেশ আসবে- আমার নিয়ামতের বিপরীতে তার কৃতামল পরিমাপ কর। পরিমাপ করে দেখা যাবে, পাঁচশ বছরের ইবাদাত খতম হয়ে গেছে একটি চোখের নিয়ামতের বিনিময়ে।
তখন আল্লাহ্‌ পাক নির্দেশ দিবেনঃ আমার বান্দাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও। ফেরেশতারা তখন তাকে নিয়ে রওয়ানা হবে। কিছুদূর যাওয়ার পর ঐ ব্যক্তি আরয করবে হে আল্লাহ্‌! আমাকে তোমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করাও। নির্দেশ আসবে তাকে ফিরত নিয়ে আস।
আল্লাহ্‌ পাকের নিকট ফিরিয়ে আনার পর তাকে নিচের প্রশ্নগুলো করা হবে আর সে বলবেঃ-
– তোমাকে কে সৃষ্টি করেছেন?
– আল্লাহ, আপনি।
– এই কাজটা তোমার আমল না আমার রহমতের বরকতে হয়েছে?
– আপনার রহমতে।
– তোমাকে পাঁচশ বছর ইবাদাত করার শক্তি ও তাওফীক কে দিয়েছে?
– হে আল্লাহ্‌! আপনি।
– সমুদ্রের মাঝে পাহাড়ের উপর তোমাকে কে পৌঁছিয়েছে? লবণাক্ত পানির মাঝে সুপেয় পানির ব্যবস্থা কে করেছে? আনার গাছ কে সৃষ্টি করেছে? তোমার দরখাস্ত মুতাবেক সেজদার মাঝে কে তোমার রূহ কবয করার ব্যবস্থা করেছে?
-হে পরওয়ারদিগার! আপনি।
তখন ইরশাদ হবেঃ এই সব কিছু আমার রহমতে হয়েছে এবং আমার রহমতেই তোমাকে জান্নাতে দাখিল করছি।

রেফারেন্স :

★ ইমাম নববী : রিয়াযুস স্বালেহীনঃ ২/৫৩,৫৪

এখন সহিহ হাদিস থেকে :

→→ তাওহীদ পাবলিকেশন। গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮১/ সদয় হওয়া।  হাদিস নাম্বার:৬৪৬৪ |

6464 | ٦٤٦٤

عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم قَالَ سَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَاعْلَمُوا أَنْ لَنْ يُدْخِلَ أَحَدَكُمْ عَمَلُهُ الْجَنَّةَ وَأَنَّ أَحَبَّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ.

‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ঠিকভাবে নিষ্ঠাসহ কাজ করে নৈকট্য লাভ কর। জেনে রেখ, তোমাদের কাউকে তার ‘আমাল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ‘আমাল হলো, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয় যদিও তা অল্প হয়।

রেফারেন্স :

★ বুখারী ৬৪৬৪, ৬৪৬৭;
★ মুসলিম ৫০/১৭, হাঃ ২৮১৮,
★ মুসনাদে আহমাদ ২৪৯৯৫,
★ বুখারী : আধুনিক প্রকাশনী- ৬০১৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০২০

→→ তাওহীদ পাবলিকেশন। গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮১/ সদয় হওয়া। হাদিস নাম্বার:৬৪৬৩

| 6463 | ٦٤٦۳

آدَمُ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم لَنْ يُنَجِّيَ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُهُ قَالُوا وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ وَلاَ أَنَا إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ بِرَحْمَةٍ سَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَاغْدُوا وَرُوحُوا وَشَيْءٌ مِنْ الدُّلْجَةِ وَالْقَصْدَ الْقَصْدُ تَبْلُغُوا.

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কস্মিনকালেও তোমাদের কাউকে তার নিজের ‘আমাল কক্ষনো নাজাত দিবে না। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেনঃ আমাকেও না। তবে আল্লাহ্ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত রেখেছেন। তোমরা যথারীতি ‘আমাল করে নৈকট্য লাভ কর। তোমরা সকালে, বিকালে এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদাত কর। মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। মধ্য পন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

রেফারেন্স :

★ আল আদাবুল মুফরাদ: ইমাম বুখারী, হাদিস  নং-৪৬৩
★ মুসলিম ৫০/১৭, হাঃ ২৮১৬
★ বুখারী : আধুনিক প্রকাশনী- ৬০১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬০১৯

→→ ইসলামিক ফাউন্ডেশন। গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৬২/ রোগীদের বর্ণনা। হাদিস নাম্বার:৫২৭১

| 5271 | ۵۲۷۱

আবূল ইয়ামান (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তোমাদের কাউকে তার নেক আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম হবে না। লোকজন প্রশ্ন করল: ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তার করুণা ও মেহেরবানীর দ্বারা ঢেকে না দেন। কাজেই মধ্যপন্থী অবলম্বন কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বেশী বয়স পাওয়ার দরুন) তার নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে মন্দ লোক হলে সে লজ্জিত হয়ে তওবা করার সুযোগ লাভ করতে পারবে।