অমুসলিম দেশে মুসলিমদের জরুরী মাসআলা

অমুসলিম দেশে মুসলিমদের জরুরী মাসআলা

জাষ্টিজ আল্লামা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী

অমুসলিম দেশে বসবাস

প্রশ্ন ঃ কোনো অমুসলিম দেশ যেমন, আমরিকা, ইউরোপের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার হুকুম কি? যারা অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছে, বা অর্জনের চেষ্টা করছে, তাদের কারো কারো বক্তব্য হলো, মুসলিম দেশে তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়। অন্যায়ভাবে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়, জেল খাটতে হয়। তাদের মালামাল ক্রোক করা হয়। যার ফলে তারা মুসলিম দেশ ছেড়ে কোন অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব অর্জনে বাধ্য হচ্ছে।

আবার কারো কারো বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের মুসলিম দেশে যখন ইসলামী হুকুমাত নেই, সুতরাং এদিক থেকে মুসলিম দেশ আর অমুসলিম দেশের মধ্যে পার্থক্য কি? ইসলামী বিধি-বিধান কায়েম না থাকার দিক থেকে উভয়টিই সমান। অথচ যে অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছি, তাতে আমাদের নাগরিক অধিকার অর্থাৎ, জান, মাল, ইযযত-আবরু আমাদের মুসলিম দেশ অপেক্ষা অধিক নিরাপদ। অমুসলিম দেশে বিনা অপরাধে, বিনা দোষে আমাদের গ্রেপ্তার হওয়ার কোনরূপ আশংকা থাকে না, বিনা কারণে জেল খাটতে হয় না। অথচ আমাদের মুসলিম দেশে বিনা দোষে বিনা অপরাধেও গ্রেপ্তারির ভয় থাকে, কারাগারে যাওয়ার ভয় থাকে।

উত্তর ঃ কোনো অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা, কিংবা সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করা, এটি এমন একটি মাসআলা, যার হুকুম স্থান কাল পাত্র ভেদে, প্রেক্ষাপট পরিস্থিতি এবং বসবাসকারীদের উদ্দেশ্য একেক রকম হওয়ার কারণে হুকুমও একেক রকম হয়ে যায়। যেমন,

(১) যদি কোনো মুসলমানকে সত্যিকারার্থে তার জন্মভূমিতে কোনোরূপ অপরাধ ব্যতীত গ্রেপ্তারি বা জেলে যেতে হয়, কিংবা তার মালামাল ক্রোক করা হয়, তার জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করা ছাড়া এসব অত্যাচার থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় না থাকে, এ পরিস্থিতিতে তার জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস এবং নাগরিকত্ব অর্জন বিনা বাক্যব্যয়ে জায়েয। তবে শর্ত হলো, দু’টি। এক. সেখানে আমলী জিন্দিগী তথা, ইসলামী বিধি-বিধান পরিপালনে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে হবে। দুই. সেখানকার প্রচলিত অশ্লীলতা, বেহায়াপনা-বেলেল্লাপনা থেকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে।

(২) এমনিভাবে কোনো ব্যক্তি যদি মুসলিম দেশে হন্যে হয়ে খোঁজাখোঁজি করা সত্ত্বেও জীবিকা উপার্জনের কোন সোর্স ব্যবস্থা করতে না পারে, এমনকি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যাপারে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে যায়, এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো অমুসলিম দেশে জায়েয কোনো চাকরি পেয়ে যায়, তাহলে উপর্যুক্ত দু’টি শর্ত সাপেক্ষে তার জন্য সেখানে যাওয়া এবং বসবাস করা জায়েয হবে। কেননা, হালাল জীবিকা অন্বেষণ করাও ফরজ ইবাদতসমূহের পর একটি অন্যতম ফরজ কাজ। আর জীবিকা উপার্জনের জন্য ইসলাম কোনো জায়গাকে নির্দিষ্ট করে দেয়নি। বরং জীবিকা উপার্জনের ব্যাপারে ইসলামের ব্যাপক অনুমতি রয়েছে যে, যেখান থেকে ইচ্ছা করবে সেখান থেকে জীবিকা উপার্জন করতে পারবে। যেমন কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে :

هو الذي جعل لكم الارض ذلولا فامشوا في مناكبها وكلوا من رزقه واليه النشور-

“আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন সুগম, সুতরাং তোমরা তাতে ভ্রমণ কর এবং তার দেয়া জীবিকা থেকে আহার কর, তোমাদেরকে তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে”। (সূরা মুল্ক ঃ আয়াত, ১৫)

(৩) এমনিভাবে কোনো ব্যক্তি যদি অমুসলিম দেশে এ নিয়তে বসবাস করে যে, সেখানে দ্বীনের দাওয়াত দিবে, কিংবা সেখানে বসবাসরত মুসলিমদেরকে ইসলামী হুকুম আহকাম শিক্ষা দিবে, কিংবা দ্বীনের উপর অটল অবিচল থেকে শরীয়তের বিধি-বিধান পালনের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করবে, এসব উদ্দেশ্যে সেখানে বসবাস করা শুধু কেবল জায়েযই নয়, বরং ছাওয়াবের অধিকারীও হবে। যেমন বহু সাহাবায়ে কিরাম এবং তাবেঈনগণ এধরনের নেক নিয়তে অমুসলিম দেশে বসবাস করছেন। যা পরবর্তীতে তাদের সুমহান জীবন চরিতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছে।

(৪) কোনো ব্যক্তির যদি স্বীয় মুসলিম দেশে এতটুকু জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা থাকে, যতটুকু দ্বারা সে নিজ শহরের স্টাটাস অনুযায়ী চলতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র জীবনসামগ্রীর আরো উন্নতি, আরো স্বচ্ছলতা-স্বাচ্ছন্দ, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার উদ্দেশ্যে কোনো অমুসলিম দেশে যেতে চায়, এসব উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া মাকরূহ। কেননা, এক্ষেত্রে ইহকালীন পরকালীন কোনো প্রয়োজন ছাড়া সেখানকার অশ্লীলতা বেহায়াপনায় নিজেকে নিজে ফেলে দেয়া হচ্ছে। আর বিনা প্রয়োজনে নিজের দ্বীন-ধর্ম, আখলাক-চরিত্র ইত্যাদিকে এক ঝুকির মধ্যে ফেলে দেয়া কোনো অবস্থাতেই সঠিক হতে পারে না। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা হলো, যারাই শুধুমাত্র সুখী, সমৃদ্ধি, ভোগ-বিলাসিতার উদ্দেশ্যে কোনো অমুসলিম দেশে বসবাস করছে, তাদের ধর্মীয় চেতনা একেবারে দুর্বল হয়ে যায়। এধরনের লোকেরা কুফরী পরিবেশে থেকে সেখানকার কালচারে উজ্জীবিত হয়ে যায়।

একারণে পবিত্র হাদীস শরীফে অত্যন্ত প্রয়োজন ব্যতীত, অমুসলিমদের সাথে বসবাস করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

যেমন, আবু দাঊদ শরীফে হযরত সামুরা ইব্ন জুনদুব (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন :

من جامع المشركين وسكن معه، فانه مثله –

“যে ব্যক্তি অমুলিমদের সাথে চলাফেরা করবে এবং তাদের সাথে বসবাস করবে, সেও তাদের অনুরূপ হবে”। (আবু দাঊদ, কিতাবুদ্দাহায়া)

হযরত জারীর ইব্ন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন :

انا بريئ من كل مسلم يقيم بين اظهر المشركين، قالوا يا رسول الله! لم؟ قال لا ترئ اي نارهما-

“সেসব মুসলমানদের ব্যাপারে আমার কোন দায়-দায়িত্ব নেই, যারা অমুসলিমদের সাথে বসবাস করে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেন, ইসলামের অগ্নি এবং কুফরীর অগ্নি উভয়টি এক সাথে থাকতে পারেনা। কোনটি মুসলমানের আগুন, কোনটি অমুসলিমের আগুন তোমরা তা পার্থক্য করতে পারবেনা”।

আল্লামা খাত্ত্বাবী (রহ.) রাসূলুল্লাহ স. এর এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, “একেক জনে এর ব্যাখ্যা একেক রকম করেছে। কারো কারো নিকট এর ব্যাখ্যা হলো, মুসলিম এবং অমুসলিম বিধানের দিক থেকে এক হতে পারেনা। বরং উভয়ের আহকাম ভিন্ন। কেউ কেউ বলেন, এই হাদীসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলা দারুল ইসলাম এবং দারুল কুফরকে পৃথক পৃথক করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য অমুসলিমদের দেশে বসবাস করা জায়েয নেই। কেননা, অমুসলিমরা যখন আগুন জ্বালাবে, সেসময় যেসব মুসলমান তাদের সাথে থাকবে, মনে হবে তারাও অমুসলিমদের অন্তর্ভূক্ত। ওলামায়ে কিরামের ব্যাখ্যা দ্বারা একথাও প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মুসলমান ব্যবসার উদ্দেশ্যেও যদি অমুসলিমদের দেশে গমন করে, তাহলে তার জন্য সেখানে বিনা প্রয়োজনে বেশি দিন বসবাস করা মাকরূহ। (মা‘আলিমুস সুনান লিল খাত্ত্বাবী ঃ ৩/৪৩৭)

আবু দাঊদ শরীফে মাকহূল (রহ.) থেকে মুরসাল রিওয়ায়াত, রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন : “নিজেদের সন্তান-সন্তুতিদেরকে অমুসলিমদের মাঝে ছেড়ে দিওনা”। (তাহযীবুস সুনান লি ইব্ন কায়্যিম ঃ ৩/৪৩৭)

একারণে ফুকাহায়ে কিরাম বলেন, শুধুমাত্র চাকরির উদ্দেশ্যে কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করা এবং তাদের সংখ্যায় বৃদ্ধি করা, এটি এমনি একটি কাজ, যার দ্বারা তার ন্যায়পরায়নতা-চরিত্র (عدالت) প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। (তাকমিলায়ে রাদ্দুল মুখতার ঃ ১/১০১)

(৫) কোনো ব্যক্তি সমাজে বড় নেতা হওয়ার জন্য, কিংবা অপরের উপর কতৃত্ব খাটানোর জন্য, বা অমুসলিম দেশের নাগরিকত্বকে মুসলিম দেশের নাগরিকত্বের উপর প্রাধান্য দেয় এবং উত্তম মনে করে, অথবা তাদের কালচার গ্রহণের জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করে, এসব উদ্দেশ্যে অমুসলিম দেশে বসবাস করা সম্পূর্ণ হারাম, যার জন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

অমুসলিম দেশে সন্তান পরিপালন

প্রশ্ন ঃ যেসব মুসলিম ব্যক্তি আমরিকা, ইউরোপ প্রভৃতি অমুসলিম দেশে বসবাস করছে, তাদের সন্তান-সন্তুতি সে পরিবেশে লালন পালন হওয়ার মধ্যে যদিও কিছু না কিছু লাভও রয়েছে, কিন্তু লাভ অপেক্ষা ক্ষতির আশংকা অনেক বেশি রয়েছে। বিশেষত সেখানকার অমুসলিম ইয়াহূদী খৃষ্টানদের ছেলেমেয়েদের সাথে উঠাবসা চলাফেরার ফলে তাদের কালচার গ্রহণের ব্যাপারে সমূহ এবং মারাত্মক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষত যাদের পিতামাতা ছেলেমেয়েদের চারিত্রিক খোজ খবর রাখে না কিংবা যাদের পিতামাতা মৃত্যু বরণ করেছে, তাদের অবস্থাতো আরো বেশি আশংকাজনক।

এখন প্রশ্ন হলো, উপরোল্লিখিত অপকারিতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে গমন এবং সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণে কোন অসুবিধা আছে কি না? উপরন্তু মুসলিম দেশে বসবাসকারী কারো কারো বক্তব্য হলো, আমাদের দেশে বিদ্যমান কমিউনিষ্ট এবং ধর্মহীন ব্যক্তিদের সাথে উঠাবসার করার কারণেওতো ছেলেমেয়দের অমুসলিম হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। বিশেষ করে সেসব ধর্মহীন ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে, মুসলিম দেশের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ। ধর্মহীন ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনাকে শিক্ষা সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত করে জনসাধারণের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যারা তাদের চিন্তা-চেতানায় একমত পোষণ না করে, তাদেরকে গ্রেপ্তার করে শাস্তিও দেয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম দেশে থেকে আমাদের সন্তান-সন্তুতিদের ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ার আরো বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। এরূপ পর্যায়ে অমুসলিম দেশে বসবাসের হুকুম কি হবে?

উত্তর ঃ অমুসলিম দেশে মুসলিম ছেলেমেয়েদের লেখা-পড়া এবং লালন-পালনের বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক বিষয়। সেখানকার পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের আলোকে (যা এক নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে) সেখানে বসবাস করা মাকরূহ বা হারাম।

তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সেখানে বসবাস করা যেহেতু বিনা বাক্যব্যয়ে জায়েয। আর প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়টি যেহেতু একটি যথার্থ প্রয়োজন, একারণে এমন পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাস করা যাবে। কিন্তু অভিভাবকগণ ছেলেমেয়েদের লালন-পালন এবং চারিত্রিক ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রাখবে। এছাড়া যেসব মুসলমান সেখানে স্থায়ীভবে বসবাস করে, তাদের উচিত সেখানে এমন একটি পূত-পবিত্র পরিবেশ কায়েম করা, যাতে করে পরবর্তীতে যেসব মুসলমান সেখানে আসবে, তারা যেন তাদের সন্তান-সন্তুতিদের আকায়িদ, আমল, আখলাক ইত্যাদির ব্যাপারে নিরাপদ থাকতে পারে।

মুসলিম নারীর অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ

প্রশ্ন ঃ কোন মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার হুকুম কি? উপরন্তু মুসলিম নারী যদি এই আশাবাদীও হয় যে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে সে পুরুষটি মুসলিম হয়ে যাবে। অতএব কোন অমুসলিমের মুসলিম হয়ে যাওয়ার আশায়, মুসলিম নারীর জন্য তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে কি না? এছাড়া এই মুসলিম নারীর মুসলিম সমাজে তার সমকক্ষ কোন পাত্রও পাওয়া যাচ্ছে না এবং জীবিকার সংকটের কারণে স্বয়ং উক্ত নারীর ধর্ম ত্যাগেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম নারীর অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ আছে কি না?

যদি কোন নারী মুসলিম হয়ে যায়, আর তার স্বামী অমুসলিম থেকে যায়, এক্ষেত্রে ঐ নারীর জন্য তার স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারবে কি না? অধিকন্তু উক্ত নারী এই আশাবাদী যে, বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক রাখলে স্বামীকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মুসলিম বানিয়ে ফেলবে। এছাড়া উক্ত স্বামী থেকে তার সন্তানও রয়েছে। স্বামীর সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে দিলে ছেলেমেয়েদের নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা ধর্মত্যাগের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে উক্ত নারীর জন্য তার অমুসলিম স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক রাখা জায়েয হবে কি না?

অথবা উক্ত নারীর তার স্বামীর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে যদিও আশাবাদী নয়, কিন্তু তার স্বামী তার সাথে উত্তম ব্যবহার করছে এবং যথাযথভাবে তার খোরপোষও আদায় করছে। আবার উক্ত নারীর এই আশংকাও করছে যে, সে যদি তার স্বামী থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তাহলে কোন মুসলিম পুরুষ তাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত হবে না। এক্ষেত্রে উক্ত নারীর জন্য তার অমুসলিম স্বামীর সাথে বৈবাহিক বন্ধন ঠিক রাখার কোন সুযোগ আছে কি না?

উত্তর ঃ কোন মুসলিম নারীর জন্য কোন অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কোন অবস্থাতেই জায়েয নেই। পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা :

ولا تنكحوا المشركين حتي يؤمنوا ولعبد مؤمن خير من مشرك ولو اعجبكم-

“কোন মুশরিকের সাথে তোমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়োনা, যতক্ষণ না তার ঈমান আনবে। অমুসলিম অপেক্ষা একজন মুসলিম দাস তোমাদের জন্য অধিক উত্তম, যদিও তারা তোমাদের নিকট পসন্দনীয় হয়”। (সূরা বাকারা ঃ আয়াত নং-২২১)

পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে :

لا هن حل لهم ولا هم يحلون لهن

“না মুসলিম নারী অমুসলিম পুরুষের জন্য হালাল, না অমুসলিম পুরুষ মুসলিম নারীর জন্য হালাল”। (সূরা মুমতাহিনা ঃ আয়াত নং-১০)

কোন অমুসলিমের মুসলিম হয়ে যাওয়ার আশায়, কোন মুসলিম নারীর অমুসলিমের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধের জায়েয হওয়ার কারণ হতে পারে না। এধরনের কোন কাল্পনিক আশা-আকাক্সক্ষা কোন হারামকে হালাল করতে পারে না।

এমনিভাবে কোন অমুসলিম নারী মুসলমান হলে জুমহুরে ওলামায়ে কিরামের নিকট শুধু তার ইসলাম গ্রহণের কারণেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। তবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর নিকট শুধু ইসলাম গ্রহণের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হবে না, বরং নারীর ইসলাম গ্রহণের পর তার স্বামীকেও ইসলাম গ্রহণের প্রতি দাওয়াত দেয়া হবে। সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে তাহলে পূর্ব বিবাহ ঠিক থাকবে। আর যদি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে, তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।

অতপর স্বামী যদি কিছু দিন পর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে দেখতে উক্ত নারীর ইদ্দত (তিন ঋতু বা গর্ভবতী হলে বাচ্চা প্রসব) অতিবাহিত হয়েছে কি না? যদি এখনো তার ইদ্দত অতিবাহিত না হয়, তাহলে স্বামীর ইসলাম গ্রহণের ফলে আগের বিবাহ আবার প্রত্যাবর্তন করবে। আর যদি তার ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে উভয়ে আবার নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এ ব্যাপারে সকল ফিকহ্বিদ একমত। সুতরাং স্বামীর ইসলাম গ্রহণের আশায় শরীয়তের অকাট্য বিধানে পরিবর্তন করা যাবে না।

মুসলিম মৃত ব্যক্তির লাশ অমুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা

প্রশ্ন ঃ আমরিকা এবং ইউরোপ দেশগুলোতে মুসলিম মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করার পৃথক কোন কবরস্থান নেই। সাধারণভাবে যেসব কবরস্থান রয়েছে, তাতে ইয়াহূদী খৃষ্টান প্রভৃতি ধর্মের লোকেরা সকলেই তাদের লাশ দাফন করে। এদিকে মুসলমানদের জন্য এসব কবরস্থান ছাড়া অন্য কোন জায়গায় লাশ দাফনের অনুমতিও নেই। এপরিস্থিতিতে মুসলমান মৃত ব্যক্তির লাশ অমুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করার হুকুম কি?

উত্তর ঃ স্বাভাবিক পরিস্থিতে মুসলিম মৃত ব্যক্তির লাশ অমুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করার জায়েয নেই। তবে প্রশ্নে বর্ণিত নিরুপায় অবস্থায় মুসলিম মৃত ব্যক্তির লাশ অমুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা জায়েয আছে।

মসজিদ বিক্রি করা

যদি আমরিকা এবং ইউরোপ দেশগুলোতে মুসলিম অধ্যুষিত কোন স্থান থেকে সকল মুসলমান অন্যত্র চলে যায়। এমতাবস্থায় পূর্বের স্থানের মসজিদটি বিরান কিংবা অমুসলিমদের দখলে এবং কব্জায় চলে যাওয়ার আশংকা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে উক্ত মসজিদকে বিক্রি করা জায়েয হবে কি না? কেননা, সাধারণত মুসলিমগণ মসজিদের জন্য জায়গা ক্রয় করে তাতে মসজিদ নির্মাণ করে। অতপর কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে অধিকাংশ মুসলিম যখন সে স্থান ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যায়, তখন মসজিদকে এভাবে রেখে গেলে, অন্য কোন অমুসলিম তা দখল করে ব্যক্তিতগ কাজে ব্যবহার করার আশংকা থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে উক্ত মসজিদটি বিক্রি করে তার পরিবর্তে অন্যত্র জায়গা ক্রয় করে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ অমুসলিম দেশগুলোতে যেসব স্থানে মুসলিমগণ নামায পড়ে, তা দু’রকম হয়। (১) যেখানে মুসলিমগণ নামায এবং দ্বীনি মাহফিল বা ধর্মীয় কাজকর্মের জন্য নির্ধারিত করে রাখে। কিন্তু এসব স্থানকে অন্যান্য শরয়ী মসজিদের ন্যায় ওয়াকফ করে শরয়ী মসজিদ বানায় না। এ কারণে এসব স্থানকে কোন কোন সময় মসজিদের পরিবর্তে অন্য নাম যেমন ‘ইসলামী মারকায’ বা ‘দারুসসালাত’ বা ‘দারুল জামা‘আত’ ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করে।

এধরনের জায়গার ব্যাপারে বিষয়টি অত্যন্ত সহজ। কেননা, এসব স্থানকে যদিও নামাযের জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এসব স্থানের মালিক এগুলোকে যখন শরয়ী মসজিদ হিসেবে ওয়াকফ করনি, সুতরাং এগুলো শরয়ী মসজিদ হয়নি। যার ফলে এসব স্থানের মালিকদের জন্য এগুলোকে বিক্রি করা জায়েয আছে। এব্যাপারে সকল ফিকহ্বিদগণ একমত।

(২) যেসব স্থানকে মুসলিমগণ অন্যান্য মসজিদের ন্যায় ওয়াকফ করে শরয়ী মসজিদ বানিয়ে নেয়। জুমহুরে ফিকহ্বিদ তথা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর নিকট এসব স্থান কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদের জন্যই হয়ে গিয়েছে। এগুলোকে কোন অবস্থাতেই বিক্রি করা জায়েয হবে না। এসব স্থান ওয়াকফকারীর মালিকানায়ও আর কখনো ফিরে আসবে না। (মুগনিল মুহতাজ ঃ ২/৩৯২, হাশিয়ায়ে হাত্ত্বাব ঃ ৬/৪২, হিদায়া মা‘আ ফাতহিল কাদীর ঃ ৫/৪৪৬)

পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদ (রহ.) এর মাযহাব হলো, যদি মসজিদের আশপাশ একেবারে বিরান হয়ে যায়, তার লোকজন অন্যত্র চলে যায়, সেখানে মসজিদের আর কোন প্রয়োজনই না থাকে, এ পরিস্থিতিতে মসজিদকে বিক্রি করা জায়েয আছে। (আল-মুগনি লি ইব্ন কুদামা মা‘আ শরহিল কাবীর ঃ ৬/২২৫)

ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর মাযহাব হলো, যদি ওয়াকফকৃত জমিনের প্রয়োজন একেবারেই না থাকে, তাহলে সে স্থান পুনরায় ওয়াকফকারীর মালিকানায় চলে আসে। ওয়াকফকারীর মৃত্যু হয়ে গেলে তার ওয়ারিসদের মালিকানায় চলে আসে। (হিদায়া মা‘আ ফাতহিল কাদীর ঃ ৫/৪৪৬)

সুতরাং ওয়াকফকারীর মালিকানায় ফেরৎ চলে আসলে, তা তার জন্য বিক্রি করাও জায়েয হবে।

আল্লামা ইব্ন কুদামা (রহ.) ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মাযহাবের দলীল হিসেবে হযরত উমর (রা.)-এর একটি লিখিত চিঠি পেশ করেন, যা তিনি হযরত সা‘দ (রা.)-কে সম্বোধন করে লিখেছিলেন। ঘটনাটি হলো, একবার কূফার বাইতুল মালে চুরি হয়েছিল। হযরহ উমর (রা.)কে যখন এ মর্মে অবহিত করা হয়েছিল, তখন তিনি পত্র মারফত নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, উক্ত মসজিদকে স্থানান্তরিত করে বাইতুল মালের নিকটে এমনভাবে নির্মাণ করবে, বাইতুল মাল যেন কিবলার দিকে থাকে। কেননা, মসজিদে সবসময়ই কেউ না কেউ উপস্থিত থাকে। (এভাবে বাইতুল মালও সংরক্ষিত হয়ে যাবে) (আল-মুগনী লি ইব্ন কুদামা ঃ ৬/২২৬)

জুমহুরে ফিকহ্বিদগণ মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জমিন বিক্রি করা না জায়েয হওয়া এবং তা ওয়াকফকারীর মালিকানায় ফেরৎ না আসার উপর প্রমাণ পেশ করেছেন হযরত উমর (রা.) এর ঘটনা দ্বারা। তাহলো, রাসূল স. এর যুগে তিনি যখন খায়বারের জমিন ওয়াকফ করেছেন, তখন ওয়াকফনামায় এই শর্ত অন্তর্ভূক্ত করেছেন :

أنه لا يباع اصلها، ولا تبتاع، ولا تورث، ولا توهب

“ভবিষ্যতে তা বিক্রিও করা যাবে না, ক্রয়ও করা যাবে না, তাতে উত্তরাধিকারও প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং কাউকে হেবাও করা যাবে না”। (বুখারী ও মুসলিম)

জুমহুরে ফিকহ্বিদ্দের আরেকটি প্রমাণ কুরআনে কারমীর আয়াত, ইরশাদ হচ্ছে :

وان المساجد لله فلا تدعو مع الله احدا

“সকল মসজিদ আল্লাহ তা‘আলার জন্য, সুতরাং এক আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করিওনা” (সূরা জ্বিন ঃ আয়াত-১৮)

উক্ত আয়াতের অধীনে আল্লামা ইবনুল আরাবী (রহ.) আহকামুল কুরআনে লিখেন :

اذا تعينت لله اصلا وعينت له عقد، فصارت عتيقة عن التمليك، مشتركة بين الخليقة في العبادة-

“ মসজিদ যখন খালিস আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, তখন বান্দার মালিকানা থেকে বের হয়ে যায়, শুধুমাত্র ইবাদত করার ব্যাপারে সকলেই অংশীদার থাকে”। (আহকামুল কুরআন লি ইব্ন আরাবী ঃ ৪/৮৬৯)

আল্লামা ইব্ন জারীর তাবারী (রহ.) হযরত ইকরিমা (রহ.)-এর উক্তি বর্ণনা করেন :

وان المساجد لله، قال: المساجد كلها

“নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। ইকরিমা (রহ.) বলেন, এর অধীনে সকল মসজিদ অন্তর্ভূক্ত”। (তাফসীর ইব্ন জারীর তাবারী ঃ পৃ ৭৩, পারা ঃ ২৯)

মোটকথা, উপরে বর্ণিত প্রমাণাদির ভিত্তিতে একথা পরিস্কার প্রতীয়মান হয় যে, এব্যাপারে জুমহুরে ফিকহ্বিদ্দের অভিমতই বিশুদ্ধ। সুতরাং কোন মসজিদ শরয়ী মসজিদ হয়ে যাওয়ার পর তা আর বিক্রি করা জায়েয হবে না। মসজিদকে বিক্রি করার অনুমতি দেয়া হলে, লোকেরা তাকে অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ন্যায় বেচাকেনা করতে থাকবে। এভাবে মসজিদ একটি ব্যবসায়ী পণ্যে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।

কিন্তু এব্যাপারে যেহেতু ফিকহবিদদের মতানৈক্যে রয়েছে এবং উভয়দিকেই কুরআন হাদীসভিত্তিক প্রমাণও রয়েছে। সুতরাং যদি কোন অমুসলিম দেশে মসজিদের আশপাশের সকল মুসলমান অন্যত্র চলে যায়, এছাড়া এর উপর অমুসলিমদের হস্তক্ষেপের কারণে এর অসম্মান হওয়ারও আশংকা থাকে এবং মুসলমানদের পুনরায় এখানে ফিরে আসারও সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে এমন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর মাযহাব গ্রহণ করত মসজিদ বিক্রি করার এবং এর মূল্য দ্বারা অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। তবে মসজিদ বিক্রিত মূল্য মসজিদ ছাড়া অন্য কোন খাতে ব্যয় করা জায়েয হবে না। (আল-মুগনী লি ইব্ন কুদামা ঃ ৬/২৬৮)

মসজিদ বিক্রির অনুমতি ঐ ক্ষেত্রে যখন মসজিদের আশপাশের সকল মুসলমান অন্যত্র চলে যায়, কোন মুসলমান সেখানে বিদ্যমান না থাকে। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে, অধিকাংশ মুসলমান চলে গিয়েছে, কিছু মুসলমান রয়ে গিয়েছে, বা মুসলমানদের আবার এখানে পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কারো নিকটই এমনকি ইমাম আহমাদ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর নিকটও মসজিদ বিক্রি করা জায়েয হবে না। (আল-মুগনী লি ইব্ন কুদামা ঃ ৬/২২৭)

নারীদের র্শয়ী মাহরাম ব্যতীত ভ্রমণ করা

প্রশ্ন ঃ অনেক মুসলিম রমনী জীবিকা উপার্জন কিংবা শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে একা একা অনেক দূর দূরান্তের ভ্রমণ করে থাকে। ভ্রমণে তাদের সাথে শরয়ী কোন মাহরামও থাকে না এবং অন্য কোন পরিচিত নারীও থাকে না। এক্ষেত্রে তাদের হুকুম কি? তাদের জন্য একা একা ভ্রমণ করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, “কোন মুসলিম রমনী তিন দিনের অধিক পথ (৪৮ মাইল) একা একা যেন ভ্রমণ না করে। হ্যাঁ! ঐ সময় ভ্রমণ করতে পারবে, যখন তার সাথে তার স্বামী কিংবা শরয়ী কোন মাহরাম থাকবে”। (মুসলিম শরীফ)

উপরোক্ত হাদীসে মুসলিম রমনীদের জন্য একা একা ভ্রমণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জুমহুরে ফিকহ্বিদগণ এই হাদীসের কারণেই ফরজ হজ্বের জন্যেও নারীদের শরয়ী মাহরাম ব্যতীত একা একা ভ্রমণ করাকে নাজায়েয বলেছেন। ফরজ হজ্ব অপেক্ষা শিক্ষা গ্রহণ এবং জীবিকা উপার্জন অনেক নি¤œস্তরের, যা একজন মুসলিম রমনীর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় না। কেননা, ইসলামী শরীয়ত বিবাহের র্পূবে তার ভরণ-পোষণের দায়-দায়িত্ব দিয়েছেন তার সম্মানিত পিতার উপর। আর বিবাহের পর তা যাবতীয় ব্যয়ভারের দায়িত্ব হলো তার স্বামীর উপর। ইসলাম নারীকে খুব প্রয়োজন ব্যতীত ঘর থেকে বের হওয়ারই অনুমতি প্রদান করেনি। সুতরাং জীবিকা উপার্জন কিংবা শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে একা একা ভ্রমণ কোন অবস্থাতেই জায়েয নেই।

হ্যাঁ! কোন নারীর ক্ষেত্রে যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে, তার স্বামীও নেই, পিতাও নেই এবং এমন কোন আত্মীয় স্বজনও নেই যে, তার ব্যয়ভারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। আবার তার নিজস্ব এত পরিমাণ সম্পদও নেই, যার দ্বারা সে তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এক্ষেত্রে জীবিকা উপার্জনের প্রয়োজনানুযায়ী শরয়ী পর্দার সাথে উক্ত নারীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি আছে। আর এ উদ্দেশ্য যখন স্বীয় দেশে সহজেই পূর্ণ করা সম্ভব, সুতরাং এর জন্য অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করার প্রয়োজন নেই। (আল-মুগনী লি ইব্ন কুদামা ঃ ৩/১৯০)

অমুসলিম দেশে মুসলিম রমণীর একা একা বসবাস করা

প্রশ্ন ঃ কোন কোন মসুলিম রমণী এবং যুবতী মেয়েরা আধুনিক শিক্ষা অর্জন কিংবা জীবিকা উপার্জনের জন্য অমুসলিম দেশে কখনো কখনো একা, আবার কখনো কখনো অমুসলিম মেয়েদের সাথে বসবাস করে। মুসলিম নারীদের জন্য এভাবে একা একা কিংবা অমুসলিম নারীদের সাথে বসবাস করার হুকুম কি? শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয আছে কি না?

উত্তর ঃ পূর্বের প্রশ্নে উত্তরে আমি বলেছি যে, মুসলিম রমণীদের জন্য জীবিকা উপার্জন কিংবা শিক্ষা গ্রহণের জন্য একা একা অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করা জায়েয নেই। এমনিভাবে সেখানে একা একা বসবাস করাও জায়েয নেই। হ্যাঁ! কোন নারী যদি শরয়ী মাহরামের সাথে অমুসলিম দেশে গিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করল। অতপর সেখনে তার মাহরামের মৃত্যু হয়ে গেল, বা কোন কারণে সেই মাহরাম অন্যত্র চলে গেল, আর নারী একা একা সেখানে রয়ে গেল। এক্ষেত্রে উক্ত নারীর জন্য সেখানে একা একা বসবাস করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই। তবে শর্ত হলো, নারী সেখানে শরয়ী পর্দার সাথে থাকতে হবে।

যেসব হোটেল রেঁস্তোরায় মদ এবং শূকর বিক্রি হয় সেখানে চাকরি করা

প্রশ্ন ঃ যেসব মুসলিম শিক্ষার্থী অমুসলিম দেশে শিক্ষা লাভের জন্য যায়, তাদের পড়া লেখার খরচের জন্য অধিকাংশ সময় সেখানে তাদরেকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হয়। কখনো তাদের এমন হোটেলে চাকরির ব্যবস্থা হয়, যেখানে মদ এবং শূকর বেচাকেনা হয়। এসব শিক্ষার্থীদের জন্য এধরনের হোটেলে চাকারি করা জায়েয হবে কি না?

প্রশ্ন ঃ কোন কোন মুসলমান অমুসলিম দেশে মদ তৈরী করে বিক্রি করার পেশাও গ্রহণ করে। এভাবে অমুসলিম দেশে মদ তৈরী করে বিক্রি করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য অমুসলিমদের হোটেলে চাকরি নেয়া জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, মুসলিম ব্যক্তি মদ, শূকর কিংবা অন্যান্য হারাম খাদ্য অমুসলিমদের সামনেও পরিবেশন করতে পারবে না। কেননা, মদ নিজে পান করা এবং অন্যের সামনে পেশ করা উভয়টিই হারাম।

হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন :

لعن الله الخمر وشاربها و ساقيها وبائعا ومبتاعها وعاصرها ومعتصرها وحاملها والمحمولة اليه –

“আল্লাহ তা‘আলা মদের উপর, তা নিজে পানকারীর উপর, অপরকে পানকারীর উপর, বিক্রেতার উপর, ক্রেতার উপর, তৈরীকারীর উপর, যার জন্য তৈরী করা হয়েছে তার উপর, বহনকারীর উপর এবং যার জন্য বহন করা হয়েছে এসবের উপর অভিসম্পাত করেছেন”। (আবু দাঊদ, কিতাবুল আশরিবা, হাদীস নং-৩৬৭৪, ৩/৩২৬)

এমনিভাবে বুখারী, মুসলিম, আবু দাঊদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবন মাজা, মুসনাদে আহমাদসহ হাদীসের সকল কিতাবে মদ পান করা, পান করানো, বিক্রি করা, ক্রয় করা, তৈরী করা, বহন করা এবং মদের সাথে যেকোন ভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়াকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

এই মাসআলাটি সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট যে, মদের ব্যবসা করাও হারাম, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করে নিয়ে যাওয়া বা অপরকে পান করানোও হারাম। হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা.)-এর ফতওয়া হলো, যদি কোন জায়গায় মদ তৈরী এবং বেচাকেনার প্রচলনও হয়ে যায়, সেখানেও কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য জীবিকা উপার্জন হিসেবে মদের পেশা গ্রহণ করা হালাল নয়। আমার জানা মতে কোন ফিকহ্বিদ এর অনুমতি প্রদান করেননি।

এলকোহল (মাদকদ্রব্য) মিশ্রিত ঔষধ পান করা

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশের অধিকাংশ ঔষধে ১%-২৫% পর্যন্ত এলকোহল মিশ্রিত থাকে। এধরনের ঔষধ সাধারণত ঠান্ডা, সর্দি, কাশি জাতীয় রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। প্রায় ৯৫% ঔষধে এলকোহল অবশ্যই থাকে। বর্তমান যুগে এলকোহল মুক্ত ঔষধ তালাশ করে পাওয়াও অত্যন্ত কঠিন। বরং বলতে গেলে অসম্ভব। এ পরিস্থিতিতে শরীয়তের দৃষ্টিতে এলকোহল যুক্ত ঔষধ সেবনের হুকুম কি?

উত্তর ঃ এলকোহল মিশ্রিত ঔষধের বিষয়টি এখন শুধুমাত্র অমুসলিম দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মুসলিম দেশসহ সারা পৃথিবীতে একই অবস্থা। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অভিমত অনুযায়ী এ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। কেননা, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর অভিমত হলো, আঙ্গুর এবং খেজুর ব্যতীত অন্যান্য দ্রব্য দ্বারা তৈরীকৃত মাদকদ্রব্যকে ঔষধ হিসেবে কিংবা শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে ততটুকু পরিমাণ পান করা জায়েয, যতটুকু পান করলে নেশা সৃষ্টি হয় না। (ফাতহুল কাদীর ঃ ৮/১৬০)

আর ঔষধে যে এলকোহল মিশ্রিণ করা হয়, তা বেশিরভাগই আঙ্গুর এবং খেজুর ব্যতীত অন্যান্য দ্রব্য যেমন চামড়া, মধু, ভেজিটেবল ইত্যাদির হয়ে থাকে। (ইন্সাইক্লোপেডিয়া অফ বৃটেন ঃ ১/৫৪৪)

সুতরাং ঔষধে মিশ্রিত এলকোহল যদি আঙ্গুর কিংবা খেজুর ব্যতীত অন্যান্য দ্রব্যের হয়ে থাকে, তাহলে ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর অভিমত অনুযায়ী সেসব ঔষধ ব্যবহার করা জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, তা নেশা সৃষ্টি করে এতটুকু না হতে হবে। আর চিকিৎসার প্রয়োজনে ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর অভিমত গ্রহণ করা যাবে।

পক্ষান্তরে ঔষধে মিশ্রিত এলকোহল যদি আঙ্গুর কিংবা খেজুর থেকে তৈরীকৃত হয়, তাহলে সে ঔষধ সেবন করা জায়েয হবে না। তবে কোন অভিজ্ঞ ডাক্তার যদি একথা বলে যে, এই রোগের চিকিৎসা এই ঔষধ ব্যতীত অন্য কোন ঔষধে সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রেও তা সেবন করা যেতে পারে। কেননা, এক্ষেত্রে আহনাফের নিকট হারাম দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয। (বাহরুর রায়িক ঃ ১/১১৬)

ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর নিকট খাঁটি হারাম পানীয়কে ঔষধ হিসেবেও কোন অবস্থাতেই সেবন করা জায়েয নেই। কিন্তু মদকে যদি কোন ঔষধে এমনভাবে মিশ্রণ করা হয় যে, এর দ্বারা মদের অস্তিত্ব একেবারে বিলীন হয়ে যায়, আর উক্ত ঔষধ দ্বারা এমন রোগের চিকিৎসা উদ্দেশ্য হয়, যা অন্য কোন পবিত্র ঔষধ দ্বারা সম্ভব না হয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা হিসেবে এধরনের ঔষধ সেবন করা জায়েয হবে। (নিহায়াতুল মুহতাজ ঃ ৮/১২)

এদিকে শুধুমাত্র এলকোহলকে ঔষধ হিসেবে কখনো ব্যবহার করা হয় না। বরং সর্বদা অন্য ঔষধের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং ফলাফল এটাই দাঁড়াবে যে, ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর নিকটও এলকোহল মিশ্রিত ঔষধ সেবন করা জায়েয।

মালিকী এবং হাম্বলীদের নিকট আমার জানামতে হারাম দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা একমাত্র হালাতে ইযতিরাব (নিরুপায় পরিস্থিতি) ব্যতীত জায়েয নেই।

মোটকথা, বর্তমান যুগে যেহেতু এধরনের ঔষধ সেবন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, একারণে হানাফী এবং শাফিঈ মাযহাব অনুযায়ী এলকোহল মিশ্রিত ঔষধ সেবনের অনুমতি দেয়া যেতে পারে।

জেলটিন ব্যবহারের হুকুম

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশে এমন কিছু জেলটিন পাওয়া যায়, যেগুলোর মধ্যে শূকর থেকে সংগৃহীত কমবেশি কিছু না কিছু উপাদান অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এধরনের জেলটিন ব্যবহারের হুকুম কি?

উত্তর ঃ যদি শূকর থেকে আহরিত উপাদান রসায়নিক কর্মকা-ের কারণে একেবারে পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে তার অপবিত্রতা এবং নিষিদ্ধতার হুকুমও পরিবর্তন হয়ে যায়। আর যদি তার উপাদান পরিবর্তন না হয়, তাহলে তার অপবিত্রতা এবং নিষিদ্ধতা অবশিষ্ট থেকে যায়। (যে বস্তুর মধ্যে তার উপাদান থাকবে তা ব্যবহার করা হারাম)

মসজিদে বিবাহ

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশে মুসলিম ছেলেমেয়েদের বিবাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অপরদিকে এসব বিবাহে গান বাজনা ইত্যাদিও হয়ে থাকে। এধরনের বিবাহের অনুষ্ঠান মসজিদে করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ রাসূলুল্লাহ স. এর হাদীস অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, বিয়ে শাদীর আক্দ মসজিদে অনুষ্ঠিত হওয়া মুস্তাহাব। কিন্তু গান বাজনা কোন অবস্থাতেই জায়েয নেই। সুতরাং যেসব বিয়ে শাদীতে অনৈসলামিক কর্মকা- হয়ে থাকে, সেসব বিবাহের আয়োজন মসজিদে করা জায়েয নেই।

মুসলিম ছেলেমেয়েদের নাম খৃষ্টানদের নামে রাখা

প্রশ্ন ঃ কোন কোন খৃষ্টান দেশ বিশেষ করে দক্ষিণ আমরিকা ছেলেমেয়েদের নাম একমাত্র খৃষ্টানদের নামেই রাখতে বাধ্য করে। অন্য কোন নাম রাখা নিষেধ। সরকার নামের লিষ্ট তৈরী করে দেয় এবং বলে দেয় ছেলেমেয়েদের নাম এখান থেকেই নির্বাচন করে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলিম ছেলেমেয়েদের নাম খৃষ্টানদের নামে রাখার হুকুম কি? জায়েয না হলে এর থেকে বাঁচার উপায় কি?

উত্তর ঃ সরকারের পক্ষ থেকে যদি একমাত্র খৃষ্টানদের নাম রাখতে বাধ্য করা হয়, তাহলে এক্ষেত্রে এমন নাম রাখবে, যা মুসলিম এবং খৃষ্টান উভয়ের নিকট গ্রহণযোগ্য। যেমন, ইসহাক, দাঊদ, সুলাইমান, মরিয়ম, লুবনা, রাহীল, সফুরা ইত্যাদি। আবার এটাও করা যেতে পারে যে, তাদের তৈরী লিষ্ট থেকে একটি নাম নির্বাচন করে তা সরকারী অফিসে রেজিষ্ট্রেশন করাবে। আর নিজস্ব বাসা বাড়িতে তাকে ইসলামী কোন নামে ডাকবে।

কিছুদিনের জন্য বিবাহ করা

প্রশ্ন ঃ যেসব মুসলিম ছাত্র ছাত্রী শিক্ষা অর্জনের জন্য অমুসলিম দেশে আসে, তার অনেকেই এখানে এসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। বিবাহের সময় এ নিয়ত থাকে যে, যতদিন এখানে থাকবে, ততদিন বিবাহ বন্ধন ঠিক থাকবে, লেখা পড়া শেষ করে যখন নিজ দেশে চলে যাবে, তখন বিবাহ বিচ্ছেদ করে দিবে। স্থায়ীভাবে এখানে থাকার কোন নিয়ত থাকে না। এসব বিবাহও সাধারণ অন্যান্য বিবাহের ন্যায় এবং একই শব্দেই অনুষ্ঠিত হয়। এধরনের বিবাহের হুকুম কি?

উত্তর ঃ যদি বিবাহের সমুদয় শর্ত বিদ্যমান থাকে। বিবাহের আকদে এমন কোন শব্দ উচ্চারণ না করা হয়, যা সাময়িক বিবাহ বুঝা যায়, তাহলে উক্ত বিবাহ বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। এধরনের বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীসূলভ সব ধরনের ফায়দাও অর্জন করা যাবে। লেখা পড়া শেষে বিবাহ বিচ্ছেদের নিয়ত দ্বারা বিবাহের বিশুদ্ধতার উপর কোন রকম প্রভাব ফেলবেনা। তবে ইসলামী শরীয়তে বিবাহ যেহেতু একটি স্থায়ী বন্ধন। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর উচিৎ বিবাহকে সর্বদা ঠিক রাখা। মারাত্মক কোন প্রয়োজন ব্যতীত তা বিচ্ছেদ না করা। আর বিবাহের সময় বিচ্ছেদের নিয়ত যেহেতু বিবাহের উদ্দেশ্যের পরিপন্থি। সুতরাং এমন নিয়ত রাখা ধর্মীয় দৃষ্টিতে মাকরূহ।

এ প্রশ্নের উত্তর আরো কিছু ব্যাপক আকারে করার প্রয়োজন মনে করি। তাহলো, ফিকহ্বিদ্দের বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়, এখানে তিনটি জিনিস ভিন্ন ভিন্ন।

(১) (نكاح متعة) নিকাহে মুত‘আ ঃ এর পদ্ধতি হলো, নারী পুরুষ কিছু দিন একসাথে বসবাস এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ভোগ করার ব্যাপারে চুক্তিব্ধ হয়। এতে সাধারণত বিবাহের শব্দও থাকে না এবং স্বাক্ষীদের উপস্থিতিকেও প্রয়োজন মনে করা হয় না। এ পদ্ধতি একেবারে হারাম। এর দ্বারা নারী পুরুষের মিলন ব্যাভিচারের হুকুম। আল্লাহ তা‘আলা সকল মুসলমানকে এর থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।

(২) (نكاح مؤقت) সাময়িক বিবাহ ঃ এর পদ্ধতি হলো, নারী পুরুষ উভয়ে নিয়মানুযায়ী দু’জন স্বাক্ষীর সম্মুখে বিবাহের শব্দ দ্বারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাথে সাথে একথাও সুস্পষ্টভাবে বলে যে, বিবাহটি নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য, পরবর্তীতে তা নিজে নিজেই শেষ হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিও একেবারে হারাম। এভাবে বিবাহ সংঘটিত হয় না এবং বিবাহের কারণে একের প্রতি অপরের যেসব দায় দায়িত্ব অর্পিত হয়, তাও অর্পিত হবে না।

(৩) নারী পুরুষ শরয়ী নিয়মানুযায়ী দু’জন স্বাক্ষীর সম্মুখে ইজাব কবুলের মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহটি কতদিনের জন্য এমন কোন কথা বলা হয় না। কিন্তু নারী পুরুষ উভয়ে কিংবা যে কোন একজনের এমন নিয়ত থাকে যে, নির্দিষ্ট কিছু দিন যাওয়ার পর আমরা তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ হয়ে যাব। ফিকহ্বিদ্দের আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এধরনের কৃত বিবাহ বিশুদ্ধ হবে। নারী পুরুষ উভয়ে স্বামী স্ত্রী হয়ে যায়। তাদের মাঝে বিবাহ বন্ধন স্থায়ীভাবে কায়েম হয়ে যায়। নিয়ত অনুযায়ী বিবাহকে বিচ্ছেদ করা অপরিহার্য নয়। বরং তাদের জন্য অপরিহার্য হলো, বিশেষ কোন প্রয়োজন না দেখা দিলে, বিবাহকে যেন বিচ্ছেদ না করে। তবে বিবাহের সময় বিচ্ছেদের নিয়ত যেহেতু মাকরূহ, সেহেতু বিচ্ছেদের নিয়তে যে বিবাহ হবে তাও মাকরূহ হবে। (ফতওয়ায়ে আলমগীরী ঃ ১/১৮৩, ফতওয়ায়ে শামী ঃ ২/৩১৯, ফাতহুল কাদীর ঃ ৩/১৫২)

নারীর জন্য প্রসাধনী ব্যবহার করে সাজ সজ্জিত হয়ে কর্মস্থলে যাওয়া

প্রশ্ন ঃ কোন মুসলিম রমনীর জন্য অপরকে আকর্ষণ করে, এমন সাজ সজ্জিত হয়ে, প্রসাধনী ব্যবহার করে এবং আঁটসাঁট পোষাক পরিধান করে কর্মস্থল কিংবা শিক্ষালয়ে যাওয়ার হুকুম কি?

উত্তর ঃ আমি উপরে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম যে, কোন মুসলিম রমনীর জন্য জীবিকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে বাহিরে যাওয়া জায়েয নেই। তবে যেসব প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নারীদের বাহিরে যাওয়ার ব্যাপারে শরীয়ত অনুমতি দিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে নারীদের জন্য অপরিহার্য হলো, তারা যেন সাজ সজ্জা পরিহার করে অত্যন্ত শরয়ী পর্দার সাথে ঘর থেকে বের হয়।

নারীদের গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে মুসাফাহা করা

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশে মুসলিম নারীদের কখনো কখনো অফিস কিংবা শিক্ষালয়ে গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে মুসাফাহা করতে হয়। এমনিভাবে মুসলিম পুরুষেরও কখনো কখনো গায়রে মাহরাম নারীদের সাথে মুসাফাহা করতে হয়। মুসাফাহা না করলে ক্ষতিরও আশংকা থাকে। এক্ষেত্রে মুসাফাহার হুকুম কি?

উত্তর ঃ পুরুষের জন্য গায়রে মাহরাম নারীর সাথে, কিংবা নারীর জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে কোন অবস্থাতেই মুসাফাহা করা জায়েয নেই। হাদীস গ্রন্থসমূহে এব্যাপারে রাসূল স. এর সুস্পষ্ট ইরশাদ বিদ্যমান রয়েছে। এব্যাপারে সকল ফিকহ্বিদগণও একমত।

নামায পড়ার জন্য গির্জা ভাড়া নেয়া

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশের মুসলিমগণ কোন কোন সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামায, জুম‘আর নামায এবং দু’ঈদের নামায আদায়ের জন্য খৃষ্টানদের গির্জা ভাড়া নেয়। অথচ সেখানে খৃষ্টানদের ছবি ইত্যাদিও বিদ্যমান থাকে। আর এসব গির্জা অন্যান্য হল অপেক্ষা কিছু কম ভাড়ায় পাওয়া যায়। আবার কখনো কখনো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের গির্জা মুসলমানদেরকে ভাড়া ব্যতীত এমনিতেই দিয়ে থাকে। এধরনের গির্জা ভাড়া নিয়ে নামায পড়া জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ নামায পড়ার জন্য গির্জা ভাড়া নেয়া জায়েয হবে। কেননা, রাসূল স. ইরশাদ করেন : جعلت لي الارض كلها مسجدا “আমার জন্য পুরো জমিনকে মসজিদ বানানো হয়েছে” তবে নামায পড়ার সময় সেখানে অবস্থিত মূর্তি ছবি ইত্যদিকে সরিয়ে দিবে। কেননা, যে ঘরে ছবি কিংবা মূর্তি ইত্যাদি থাকে সেখানে নামায পড়া মাকরূহ। (ফাতহুল বারী ঃ ১/৫৩২)

আহলে কিতাবদের জবেহকৃত জন্তুর গোশত খাওয়া

প্রশ্ন ঃ আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী-নাসারা) জবেহকৃত জন্তু এবং তাদের হোটেলে যেসব খাদ্য দ্রব্য পাকানো হয়, তা হালাল-হারাম হওয়ার দৃষ্টিতে হুকুম কি? কেননা, একথা নিশ্চিত বলা যাবে না যে, তারা জবেহের সময় বিসমিল্লাহ পড়েছে কি না?

উত্তর ঃ এব্যাপারে আমার রায়, যাকে আমি بيني وبين الله সঠিক মনে করি। তাহলো, শুধুমাত্র জবেহকারী আহলে কিতাব হলেই জবেহকৃত জন্তু হালাল হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং যে যাবত জবেহের সময় বিসমিল্লাহ না পড়বে এবং শরয়ী নিয়মানুযায়ী রগসমূহ না কাটা হবে, সে যাবত তা হালাল হবে না। যেমনিভাবে জবেহকারী শুধু মুসলিম হলেই জবেহকৃত জন্তু হালাল হয়ে যায় না, বরং জবেহের সমুদয় শর্ত পাওয়া যেতে হয়। ইসলাম আহলে কিতাবের জবেহকৃত জন্তুকে হালাল সাব্যস্ত করেছে আর অন্যান্য মুশরিকদের জবেহকৃত জন্তু হারাম সাব্যস্ত করেছে একারণেই যে, আহলে কিতাবগণ জবেহের সময় ইসলামের সমুদয় শর্তের প্রতি লক্ষ্য রাখে।

কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ইয়াহূদী-নাসারা জবেহের শর্তসমূহের প্রতি কোন খেয়ালই করে না, একারণে তাদের জবেহকৃত জন্তুর গোশত মুসলমানদের জন্য খাওয়া হালাল হবে না।

যেসব অনুষ্ঠানে অনৈসলামিক কর্মকা- হয় তাতে অংশগ্রহণ

প্রশ্ন ঃ অমুসলিম দেশে এমন কিছু অনুষ্ঠান হয়, যাতে মুসলিমদেরকেও দাওয়াত দেয়া হয়। সেসব অনুষ্ঠানে মদ ইত্যাদি পান করানো হয়। সেসব অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ দ্বারা মুসলমানদের অনেক ফায়দা হয় এবং অংশ গ্রহণ না করলে কিছু ক্ষতিও হয়। এক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য এসব অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ যেসব অনুষ্ঠানের খাদ্যে মদ, শূকর এবং গান বাজনা ইত্যাদি হয়ে থাকে, সেসব অনুষ্ঠানে মুসলমানদের অংশগ্রহণ জায়েয নেই। মুসলমানদের এসব অশ্লীল বেহায়াপনার সামনে মাথা নত করা উচিত নয়। বরং নিজেদের ধর্মের উপর অটল অবিচল থাকা উচিত। সেখানকার সকল মুসলিম যদি তাদের অনুষ্ঠান বর্জনের ব্যাপারে একমত হয়, তাহলে তারা নিজেরাই এসব অনুষ্ঠানে অনৈসলামিক কর্মকা- পরিহার করতে বাধ্য হবে।

মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা

প্রশ্ন ঃ কোন মুসলমানের জন্য আমরিকা কিংবা যে কোন অমুসলিম দেশের সরকারী অফিসে চাকরি করা জায়েয কি না?

উত্তর ঃ আমরিকা কিংবা কোন অমুসলিম দেশের সরকারী অফিসে মুসলিমদের চাকরি করাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে শর্ত হলো, তার দায়িত্বে এমন কোন কাজ যদি দেয়া হয়, যা মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর। তাহলে এধরনের কাজ পরিহার করে চলবে। এসব ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা না করা ওয়াজিব। যদিও এর দ্বারা তার চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মুসলিম ইঞ্জিনিয়ারের জন্য অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ডিজাইন তৈরী করা

প্রশ্ন ঃ কোন মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার এমন কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত, যেখানে ঘর, বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ইত্যাদির ডিজাইন তৈরী করা হয়, এগুলোর মধ্যে অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ডিজাইনও তৈরী করা হয়ে থাকে। মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার যদি অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ডিজাইন তৈরী করতে অস্বীকার করে, তাহলে তার চাকরি চলে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে মুসলিম ইঞ্জিনিয়ারের জন্য অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ডিজাইন তৈরী করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ মুসলিম ইঞ্জিনিয়ারের জন্য অমুসলিমদের উপাসনালয়ের ডিজাইন তৈরী করা জায়েয নেই। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

وتعاونوا علي البر والتقوي ولا تعاونوا على الاثم والعدوان

“তোমরা সৎকাজে একে অপরের সহযোগিতা কর। অন্যায় এবং গুনাহের কাজে একে অপরের সহযোগিতা করিওনা”। (সূরা মায়িদা, আয়াত নং-২)

গির্জায় চাঁদা দেয়া

প্রশ্ন ঃ কোন মুসলিম ব্যক্তি বা মুসলিম সংস্থার পক্ষ থেকে খৃষ্টানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও কিংবা গির্জায় চাঁদা দেয়া জায়েয আছে কি না?

উত্তর ঃ কোন মুসলিম ব্যক্তি বা মুসলিম সংস্থার পক্ষ থেকে খৃষ্টানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও কিংবা গির্জায় চাঁদা দেয়া বা কোন রকম সাহায্য সহযোগিতা করা কোন অবস্থাতেই জায়েয নেই।

গৃহকর্তার হারাম উপার্জন স্ত্রী সন্তাদের ভোগ-ব্যবহার করা জায়েয কি না?

প্রশ্ন ঃ কোন কোন মুসলিম পরিবার এমন রয়েছে, যাদের গৃহকর্তা নাজায়েয এবং হারাম জিনিসের ব্যবসা করে। কিংবা নাজায়েয চাকরি বা নাজায়েয উপায়ে অর্থোপার্জন করে। যেমন সুদ, ঘুষ, মদ, নাচ-গান ইত্যাদি। স্ত্রী সন্তানগণ হারাম উপার্জনকে পসন্দ না করলেও তাদের ভরণ-পোষণ নাজায়েয উপার্জন থেকেই চলে। এক্ষেত্রে স্ত্রী সন্তানদের জন্য গৃহকর্তার হারাম উপার্জন ভোগ-ব্যবহার জায়েয হবে কি না?

উত্তর ঃ এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান হলো, প্রথমত- স্ত্রী সন্তানদের কর্তব্য হচ্ছে, গৃহকর্তাকে হারাম উপায়ে আর্থোপার্জন থেকে বিরত রাখার পূণ চেষ্টা করা। পূর্ণ চেষ্টা সত্ত্বেও যদি হারাম উপার্জন পরিহার না করে, আর স্ত্রী অন্য কোন জায়েয উপায়ে স্বীয় ভরণ-পোষণ পূর্ণ করতে সক্ষম হয়, এ ক্ষেত্রে তার জন্য স্বামীর হারাম উপার্জন থেকে ভোগ ব্যবহার জায়েয নেই। কিন্তু অন্য কোন জায়েয উপায়ে যদি ভরণ-পোষণ পূরণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার জন্য স্বামীর হারাম উপার্জন থেকে ভোগ ব্যবহার করা জায়েয। হারাম ভক্ষণের গুনাহ স্বামীর উপর বর্তাবে। একই বিধান অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের জন্য। হারাম ভক্ষণের পাপ পিতার উপর বর্তাবে। আর প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানগণ নিজে জায়েয উপায়ে উপার্জন করে ভরণ-পোষণ ও যাবতীয় প্রয়োজনাদি পূরণ করবে। পিতার হারাম উপার্জন থেকে ব্যবহার করবে না। (ফতওয়া শামী ঃ ৬/১৯১, এইচ. এম. সাঈদ কোম্পানী)

ব্যাংকের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী ইত্যাদি ক্রয় করা

প্রশ্ন ঃ গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যাংক কিংবা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রয় করার হুকুম কি? এদিকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসব পণ্যসামগ্রী বন্ধক রেখে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদান করে।

উত্তর ঃ উপরে বর্ণিত পদ্ধতি সুদভিত্তিক হওয়ার কারণে তা নাজায়েয এবং হারাম। মুসলিমদের উচিত সুদী লেনদেনের পরিবর্তে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী অন্য কোন জায়েয পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করা। যেমন, ব্যাংক এক্ষেত্রে নিজেই সরাসরি কিস্তিতে বিক্রি করবে। অর্থাৎ, ব্যাংক প্রথমে প্রকৃত মালিক থেকে ক্রয় করে নিবে, অতপর উপযুক্ত মুনাফা সংযুুক্ত করে কাষ্টমারের নিকট তা আবার কিস্তিতে বিক্রি করবে।

والله اعلم

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s